ভেজা ভেজা ঠান্ডা বাতাশে কেঁপে উঠলো নোবেল। বাস থেকে নেমেই বুঝতে পারলো আজ রাতে জোস একটা ঘুম হবে। ছোট্ট ব্যাগটা হাতে নিয়ে বাড়ীর পথে দ্রুত পায়ে এগুলো সে। বৃস্টি আসার আগেই বাসায় পৌছাতে হবে। ছেলেদের একটা বয়স থাকে, যখন তাদের মধ্যে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে সিক্সথ সেন্স জিনিশটা কাজ করে। তা না হলে রাস্তার মোড়ের বিশাল পাঁচতলা বাড়ীটার টপ ফ্লোরের বারান্দায় তার চোখ পড়ার কোন কারন থাকতে পারেনা। শ্রাবণী ..., এটা অবস্যই শ্রাবণী। অজান্তেই থেমে যায় নোবেল। েখনো মোবাইল ফোন জিনিশটা এতো চালু হয়নি, শ্রাবণীর মোবাইল নেই, কি করে ডাকবে সে শ্রাবণীকে? আর শ্রাবণী এখানেই বা এলো কি করে? ওর তো এখন ভার্সিটিতে থাকার কথা। শ্রাবণীর শেষ চিঠিটা পেয়েছিলো সে দুদিন আগেই, তখনো সে হলেই ছিল। অসহায় ভাবে এদিক সেদিক তাকায় নোবেল। বাতাশের যা শব্দ, নীচ থেকে চিৎকার করে ডাকলেও শ্রাবণী তার ডাক শুনতে পাবে না কোন ভাবেই। মোনে মোনে চিৎকার করে শ্রাবণী বলে ডেকে ওঠে সে। একবার, দুবার, তিনবার। শ্রাবণী শুনতে পায় না। মাথা ঘুরিয়ে অন্ধকার হয়ে আসা আকাশের দিকে দেখে নোবেল। আবার হাটতে শুরু করে বাসার দিকে।
“কি রে, তুই হঠাৎ, কোন খবর না দিয়ে” অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন মা। “ভাল লাগছিলনা, চলে এলাম” দায়সারা একটা জবাব দিয়ে নিজের ঘরে চলে এলো নোবেল। কাপড় ছেড়ে অনেক্ষন ধরে গোসল করল সে। চুল মুছতে মুছতে মিউজিক সেন্টার চালু করলো, “শাওনো রাতে যদি, স্বরণে আসে মোরে”, গতবার যাবার আগে এই গানটাই শুনেছিল সে, আজ সন্ধ্যা মিলিয়ে যাওয়া এই বৃস্টি ভেজা সময়টাতে যেন তার কল্পনার সংগি হতেই আবার বেজে উঠলো সেই গানটা।
ঘুম না হওয়া লাল চোখ নিয়ে নোবেল যখন বি.সি.এস.আই.আর সেমিনার রুমে পৌছালো, তখনো সেমিনার শুরু হতে বিশ মিনিট বাকি। ঝটপট গত ছয় মাসে তৈরী করা পেপারটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিল নোবেল। আজকের প্রেজেন্টেশানের উপর নির্ভর করছে তার ভবিস্যৎ। স্কলারশিপটা পেয়ে গেলে তাকে সম্ভবত জীবনে আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। শ্রাবণীর ফ্যামিলির কাছেও নিজেকে যোগ্য বলে প্রমান করতে পারবে সে, তাদের বিয়েতে আর কোন বাধা থাকবেনা।
সেমিনার শেষ হতে হতে বিকেল হয়ে গেছে। বাইরে বেড়িয়েই স্কুটার ডাকলো নোবেল, বাসায় যাবার তর সইছেনা তার। কিন্তু সবার আগে যদি শ্রাবণীকে জানাতে পারতো সুখবরটা। তার স্কলারশিপটা হয়ে গেছে। আর মাত্র তিন মাস বাকি, এর মধ্যেই তাকে গুছিয়ে নিতে হবে সবকিছু, সবকিছুই। পৃথিবীটা আজ নতুন লাগছে নোবেলের কাছে। অফিস ফেরত মানুষের ভীড়ে তৈরী হওয়া জ্যাম আজকের মত এত অসহনীয় লাগেনি কোনদিন। স্কুটারের কেন পাখা থাকেনা?
চারিদিক ঝিকমিক করছে আলোয়। পাঁচতালাটা আজ সেজেছে নতুন সাজে। বাসার মোড়ে পৌছেই নোবেলের সব আনন্দ মাটি হয়ে গেছে। ভয়ঙ্কর একটা আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছে সে। তবে কি ... ... ? এই কারনেই কি শ্রাবণীর ঢাকায় আসা? পাঁচতলায় কি শ্রাবণীর কোন রিলেটিভের বাসা? ভাল ছেলে পেলে অনেকেই মেয়ে ঢাকায় নিয়ে এসে বিয়ে দিয়ে দেন। নাহ, সে আর কিছুই ভাবতে পারছেনা।
তাকে দেখেই মা ধরে নিয়েছেন যে তার স্কলারশিপটা হয়নি। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে চুপ করে শুয়ে আছে সে। তার এত দিনের সাজানো পৃথিবী, নিজ হাতে গড়া শত শত সপ্ন আর কোন দিন পূরন হবে না। কি করবে সে এই স্কলারশিপটা দিয়ে, কি করবে বিদেশে গিয়ে? শ্রাবণী ছাড়া তার এই সবের কোন দাম আছে?
বাজী ফোটার প্রচন্ড শব্দে যেন বাস্তবে ফিরে আসে নোবেল। আচ্ছা, বিয়েতো শ্রাবণীর নাও হতে পারে। হয়তো কোন কাজিনের, অথবা অন্য কোন ফ্লাটের কারো। হয়তে খামখাই সে চিন্তা করছে। মুহুর্তে ভাল হয়ে যায় মন। দরজায় টোকা দেন মা। এক লাফে উঠে দরজা খোলে সে। “ আমি আর তোমার বাবা একটু বাইরে যাচ্ছি, তুমি বাসায় থাকো, আমার ফিরতে দেরি হবে ” মা বললেন। কথা না বারিয়ে মা কে সালাম করে নোবেল “ মা, আমার স্কলারশিপটা হয়ে গেছে ”। দুহাতে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন মা। চুমু খান কপালে। “এতক্ষন বলিসনি কেন? আমি তো তোর চোখমুখ দেখে ভাবলাম স্কলারশিপটা বুঝি হয়নি, যা, তোর বাবাকে সালাম করে আয়”। মমতাময়ীর চোখে পানি।
আলকিতো চোখমুখ নিয়ে বেরিয়ে গেলেন মা বাবা, দরজা বন্ধ করে খাবার টেবিলের কাছে এগিয়ে যায় নোবেল। এক গ্লাস পানি খেয়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা দেয়। চোখে পড়ে একটা বিয়ের কার্ড, টেবিলের ওপর রাখা। খামের উপর প্রেরকের ঠিকানায় সেই পাঁচতলা বাড়ীর নাম লিখা। হৃৎপিন্ডের অবস্থান এখন নোবেলের গলার খুব কাছে। দ্রুত হাতে খাম থেকে বের করে কার্ডটা, সুন্দর হরফে লিখা বধূর নামের উপর চোখ আটকে যায় তার।
~ প্রথম পর্ব শেষ ~

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

