somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শ্রাবনী (শেষ পর্ব)

২০ শে মার্চ, ২০০৯ বিকাল ৩:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



নীলয় ঘুমিয়ে ছিল। সকাল সাতটা বাজে মাত্র। এমন সময় নোবেল গিয়ে তার ঘুম ভাঙ্গালো। কড়া গলায় একটা ঝারী দিতে গিয়েও থেমে গেল নীলয়। নোবেলের চোখমুখ ফোলা ফোলা, রাতে এক ফোটা ঘুমায়নি, দেখেই বোঝা যচ্ছে। ক্যান্টিনে নাস্তার অর্ডার দিয়ে নোবেলকে নিয়ে এক কোণায় বসলো নীলয়। এটা সেটা কথা বলতে বলতে নাস্তা শেষ করলো ওরা। কেন তার মোন খারাপ, এটা নিয়ে একটা কথাও বলেনি নোবেল, কিন্তু নীলয় জানে এক সময় ঠিকই সব কিছু বলবে সে, না হলে এতো সকালে তার কাছে আসতোন। নোবেলকে সেই সুযোগটা করে দিতেই নীলয় তাকে নিয়ে গিয়ে বসলো বড় দিঘীটার পাশে। অনেক্ষন দিঘীর জলের দিকে তাকিয়ে থেকে এক সময় নীলয়কে সব কিছু বলে গেলো নোবেল।

“সত্যি কি তুই ভালবাসিস শ্রাবনীকে?” প্রশ্ন করে নীলয়। “বাসি দেখেই তো কস্ট পাই” যেন অন্ধকার কনো কূপ থেকে উঠে আসছে নোবেলের কথা গুলো। “তাহলে এই সামান্য কারনে তুই ঢাকা ছাড়লি কেন?” কোন উত্তর পাবেনা জেনেও প্রশ্নটা করলো নীলয়। “দেখ নোবেল, প্রথমত তুই একটা বোকামি করেছিস ঢাকা ছেড়ে, আরেকটা বোকামি করেছিস খালাম্মাকে শ্রাবনীর কথাটা না বলে। এখন তুই তোর নিজের সাথে বুঝে দেখ, যদি তুই সত্যি শ্রাবনীকে ভালবেসে থাকিস, সত্যি যদি তুই বিয়ে করতে চাস তাকে, তাহলে এখনও সময় আছে তোর ভূল গুলো শুধরে নেবার“ একটানা কথা বলে থামলো নীলয়। আরও কিছুক্ষন কথা বলে উঠলো ওরা, রুমে ফিরতে ফিরতে দুপুর হয়ে গেল। নোবেলকে ঢাকার বাসে তুলে দিয়ে হলে ফিরে গেলো নীলয়, তার আগে দুইটা জরুরী ফোন কল সেরে নিলো।

অনেক রাতে বাসায় ফিরে এল নোবেল। পরদিন সকালে উঠেই গিয়ে দাড়ালো সেই জায়গাটায়, যেখানে শ্রাবনীর সাথে দেখা করে সে। অপেক্ষার প্রহর কেটে যায়, কিন্তু শ্রাবনী আসেনা। দুপুরবেলা মন খারাপ করে ঘরে ফেরে নোবেল। বিকেলে আবার গিয়ে বসে সেই জায়গাটাতে, কথা বললো বন্ধুদের সাথে, শ্রাবনীর সাথে দেখা হয়না।

পরদিন সকালে আবার সেই একই জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায় নোবেল। “আরে, নোবেল যে, কেমন আছেন” কখন তার পাশে এসে দাড়িয়েছে নীল টয়োটা, খেয়ালই করেনি নোবেল। চমকে ওঠে সে শোয়েবের কথা শুনে। সৌজন্য বিনিময়ের পর শোয়েব বললো “শ্রাবনীকে বাসে তুলে দিয়ে এলাম, ওর বাসা থেকে ডেকে পাঠিয়েছে হঠাৎ করেই”। বলেই চোখ টিপলো। তারপর নোবেলের অবাক দৃস্টি অনুসরন করে আবার বললো “আরে ভাই, বিয়েশাদির ব্যাপার, শ্রাবনী নিজেও জানেনা অবস্য, কিন্তু আমি জানি। আপনার বান্ধবী খুব শিঘ্রী বিয়ের পিড়িতে বসতে যাচ্ছে”। যতটা সম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে হালকা কিছু রশিকতা করে শোয়েবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ীর পথ ধরলো নোবেল।

কেন মানুষের জীবনটা এমন হয়? শ্রাবনীকে সে ভালবাসে, অনেক ভালবাসে, কিন্তু সেই শ্রাবনী যদি তার জীবনে না থাকে, তা হলে কি করে একা একা বাঁচবে সে? এতদিন পর যখন তাদের সাজানো সপ্নটা সত্যি হতে যাচ্ছে, তখনি কি এমন হতে হবে? পৃথিবী এত নিষ্ঠুর কেন? ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পরে নোবেল। দুপুরে উঠে সোজা চলে আসে হলে।

নীলয়ের বিছানা ফাকা, ঘন্টা খানেক সেই বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থেকে নোবেল, গান শোনে। নীলয়কে সে ঠিক বুঝতে পারেনা কখনই। এই ছেলেটা সবার বন্ধু, সবাই তাকে ভালবাসে, কিন্তু কেউই তার খুব কাছে যেতে পারেনা। সে রুমে নেই, কোথায় গেছে, কখন আসবে – কেউ জানেনা। নোবেল কেন তার জন্য বসে আছে, তাও জানেনা। শুধু জানে, এই ছেলেটার কাছে সব কিছু বলা যায়।

দুদিন পর শ্রাবনীর একটা চিঠি পায় নোবেল। ছোট্ট একটা চিঠি। “বাসা থেকে আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে, আমার বাঁধা দেয়ার ক্ষমতা নেই। ক্ষমা কোরো, ভাল থেকো”।

পরের কয়েকটা দিন নোবেলের একটা ঘোরের মদ্ধে কাটে। নীলয় তাকে অসম্ভব ব্যাস্থ করে রাখে সারাটা দিন। এভাবে আগে কোন দিন নীলয়ের কাজের সাথে নিজেকে জড়ায়নি নোবেল, অথবা নীলয় জড়াতে চায়নি তাকে। নীলয় কি তাকে শ্রাবনীর কথা মনে করার, কস্ট পাবার সূযোগ না দেয়ার জন্য এই কাজটা করছে? বুঝতে পারেনা নোবেল, কিন্তু গ্রামের খুব সাধারন কিছু মানুষের মাঝে মিশে গিয়ে তাদের সূখ দুঃখের সাথী হতে বেশ ভালই লাগছে তার। কিন্তু মন থেকে কস্টটা যাচ্ছেনা কিছুতেই। ভালবাসা হারানোর কস্ট অনেক গভীর। এই আজব সম্পর্কটার গভীরতা সূখের দিন গুলোতে যতটা না বোঝা যায়, তারচেয়ে বেশী বোঝা যায় কস্টের মাঝে। হারিয়ে ফেলার পর বোঝা যায় সেই মানুষটা কতো আপন ছিলো।

“নীলয়, মা’কে শ্রাবনীর কথা কিছু বলিসনা, মা আমাকে অনেক ভালোবাসে, খামোখা কস্ট পাবে মা” বাসে বসে কথা বলছিলো দুই বন্ধু। মা ডেকে পাঠিয়েছেন, ঢাকায় যাচ্ছে নোবেল। নীলয়ের নাকি কি কাজ আছে, সেও সঙ্গি হয়েছে নোবেলের। ভীষণ কস্ট হচ্ছে তার, কিন্তু ঢাকায় না গিয়েও উপায় নেই। নীলয় সাথে যাওয়ায় ভালোই লাগছে, একা থাকাটা আরও বেশী কস্টকর হত নোবেলের জন্য।

বাসায় ঢুকে অবাক হয়ে যায় নোবেল। কেমন যেন একটা উৎসব উৎসব ভাব বাসায়। কাজিনরা অনেকেই তার বাসায়, অথচ মা ফোনে তেমন কিছুই বলেননি তাকে। হয়তো কনো ফ্যামিলি ফাংশন আছে, অথবা অন্য কিছু, নোবেলের ভাল লাগছেনা কিছুই। নীলয়কে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো নোবেল।

“দেখ বাবা, তোকে না জানিয়ে আমরা তোর জন্য মেয়ে ঠিক করে ফেলেছি। হাতে বেশী সময় নেই, তুই নিজেই তো জানিস। আজকেই এনগেজমেন্ট। মেয়ে তোর অপছন্দ হবে না। আমরা সন্ধার পর যাব। তুই ঝটপট গোসল করে শেইভ করে নে বাবা। তারপর একটু রেস্ট কর” হতবাক নোবেলকে কথা কয়টা বলেই চলে গেলেন মা। মাথা পুরো এলমেলো লাগছে তার। সে কি না করে দেবে মা’কে? কি ভাবে বলবে? কি যুক্তি দেখাবে এখন? সবার এই খুশী এক নিমিষে কি সে শেষ করে দেবে এখন? নীলয়টাও যে কোথায় গেলো।

কিছুই করতে পারেনি নোবেল। এমন পরিস্থিতিতে কিছু করা সম্ভবও না। নোবেল মনে মনে ক্ষমা করে দেয় শ্রাবনীকে। আসলে জীবনের নিজস্ব একটা গতী আছে, জীবন থেমে থাকেনা কখনই। বেঁচে থাকতে হলে মানুষকে আপোষ করতেই হয়। সময়ের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিতেই হয়। ভালোবাসার মানুষ গুলোর দিকে তাকিয়ে, প্রিয় মুখ গুলোর তাকিয়ে, জন্মদাতা মা বাবা’র দিকে তাকিয়ে, আপন সন্তানের দিকে তাকিয়ে মানুষ নতুন আশার আলো দেখতে পায়। নিজের সূখটা তখন খুব সাধারন হয়ে যায়।

আলো ঝলমলে ড্রয়িং রুমে নিজের আত্ত্বীয় স্বজন আর আনেক অপরিচিত মানুষের মাঝে বসে আছে নোবেল। পরিচিত হচ্ছে অনেকের সাথে, টুকটাক প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। এমন সময় কনেকে নিয়ে ঘরে আসেন কনের মা, বড় বোন আর ভাবী। কনেকে বসানো হয় তার উলটো দিকের সোফায়। মাথা নীচু করে থাকে নোবেল। “নোবেল সাহেব, দেখেন তো, আমার বোনকে কেমন লাগছে আজকে” পরিচিত একটা কন্ঠে স্বচকিত হয় নোবেল। আলো ঝলমলে ঘরটার সমস্ত আলোকে ম্লান করে দিয়ে তার সামনে বসে হীরের দ্যুতী ছড়াচ্ছে শ্রাবনী। নোবেলের শ্রাবনী। আর শ্রাবনীর ঠিক পেছনে, দরজার গায়ে হেলান দিয়ে কোকের গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে আছে নীলয়, মূখে তার দুস্টুমির হাসি।

~ সমাপ্ত ~

এই গল্পটা আমার খুব কাছের কনো বন্ধুর জীবনের কাহিনী হতে পারে, অথবা নিছক কল্পনা, কি বা এসে যায় তাতে? জীবন তো এমনই, কখনই থেমে থাকেনা

শ্রাবনী (প্রথম পর্ব)

শ্রাবনী (২য় পর্ব)
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মে, ২০০৯ রাত ৮:০৮
১১টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×