তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা
ক'টা বাজে এখন? তিনটা হবে - আনমনে কথা বলে প্রমা। পাহারাদারের বাঁশীর শব্দ এখন তার সময় মাপার সঙ্কেত। পাশের ঘরে শুয়ে অনন্ত, অচেতন গভীর ঘুমে। "একটু কি দেখে আসবো ওকে? ভয় দেখানোও যেতে পারে" - দুষ্টুমি ঝিলিক দিয়ে ওঠে প্রমার চোখে। আস্তে করে নেমে আসে খাট থেকে, নিঃশব্দে হেটে যায় দরজা পর্যন্ত, "আহারে ... বেচারা টেবিল ল্যাম্প বন্ধ না করেই ঘুমিয়েছে" - অস্ফুট উচ্চারন প্রমার। টেবিল ল্যাম্পের আলোতে ঘুমন্ত অনন্তকে বড় সুন্দর, বড় আপন মনে হয় ওর। অজান্তেই হাত চলে যায় পেটের ওপর, ওখানে একতিল একতিল করে বেড়ে উঠছে অনন্তর সন্তান।
প্রথম দু'মাসে তেমন কিছু টের পায়নি প্রমা। ঘরের কাজ, বাইরে ঘোরা - কোন কিছুই বাদ থাকেনি, অথচ এখন মনে করতেই ভয় ভয় লাগে। কত কিছুই যে হয়ে যেতে পারতো। এখন প্রমা প্রতিটা পদক্ষেপ মেপে চলে। সাবধানে বিছানায় এসে ওঠে সে। খুবই অবাক লাগে তার, অনন্ত - তার অনন্তর গায়ের গন্ধে এখন বমি পায় তার। কি বিব্রতকর অবস্থা। প্রথম দিকে লজ্জায় কুঁকড়ে থাকতো সে, বলতে পারতোনা অনন্তকে, আবার মানতেও পারতোনা। কিন্তু এটা তো সবারই হয়, যে মানুষটার সন্তান তার সত্বার গভীরে বড় হচ্ছে প্রতি মুহুর্তে, সেই মানুষটাকেই তার গন্ধ লাগে। অনন্ত নিজে থেকেই বুঝে নিয়েছিলো, মনে হয় তার কুঁচকে যাওয়া চোখ মুখ দেখেই, তার পর থেকে আলাদা খাটে ঘুমায় তারা। প্রমা জানেনা আর কতদিন এমন চলবে, ভাল লাগেনা ওর, অনন্তর বুকের মধ্যে বেড়ালছানার মত গুটিশুটি মেরে ঘুমাতে ইচ্ছে করে।
টুপ টুপ করে পানি পড়ার শব্দ হচ্ছে, ঘুম ভেঙ্গেই বুঝতে পারে প্রমা। এত মৃদু শব্দে কারও ঘুম ভাঙ্গার কথা না, অথচ তার ভাঙ্গলো। এখন এমনি হচ্ছে, শব্দ আর গন্ধের ব্যাপারে সেনসিটিভিটি বেড়ে গেছে অনেক। অনন্ত বলে - বায়োনিক উয়োম্যান হয়ে গেছে প্রমা। মনে হতেই হাসি ছড়িয়ে যায় প্রমার মুখে। দেয়াল ঘড়িতে সময় তখন সকাল ৯টা পেড়িয়েছে। তার মানে অনন্ত চলে গেছে অফিসে। যাবার আগে এই ঝুড়ি ফলমূল, গ্লাসে পানি, স্প্রাইটের ক্যান আর পাতলা করে বানান ছোট্ট কয়েকটা আটার রুটি আর এক টুকরা গুড় রেখে গেছে টেবিলে। রুটিগুলোর দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে ওঠে প্রমা, নিঁখুত গোল রুটি, দেখেই বোঝা যায় বানাবার পর গুড়ো দুধের খালি কৌটো চাপা দিয়ে কেটে নেয়া। এটাও কি ভালবাসা? প্রিয়তমাকে নিঁখুত গোল রুটি উপহার দেবার চেষ্টা? হাসতে থাকে প্রমা।
সাবধানে বিছানা ছাড়ে প্রমা। শরীর সামলে নিতে একটু দাঁড়াতে হয় ওর। মর্নিং সিকনেসটা অনেক কমে গেছে এখন, কমে এসেছে অন্য অনেক উপসর্গ। পেট'টা বেলুনের আকৃতি পেয়েছে। মমতায় হাত বোলায় প্রমা পেটের ওপর। ভেতর থেকে সাড়া দেয় প্রমার অন্তরস্থিত প্রান, নড়ে ওঠে, যেন ঘুম ভেঙ্গে আড়মোড়া ভাংছে জানের টুকরোটা।
মুখ ধোয়া দরকার, বেসিনের দিকে এগিয়ে যায় প্রমা। সকালে ট্যাঙ্কে পানি ছিলোনা বলে পানির কল পুরোটা বন্ধ করেনি অনন্ত। পানি আসার পর ফোটা ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে ছড়িয়ে গিয়েছে মেঝের অনেকটা যায়গায়। শোবার ঘরের পর্দা টানা থাকায় আলো আসছেনা বেশী ওদিকটায়, ফলে পানির ধারাটা থেকে গেল প্রমার চোখের আড়ালেই।
ক্রমশ ...
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০০৯ দুপুর ১২:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



