এমনি করে সবার আদরে, দোয়ায়, ভালবাসায় একটু একটু করে বেড়ে ওঠে বাচ্চাটা। জন্মের অষ্টম দিনে বড় বড় দুটি চোখ খুলে পৃথিবী দেখে সে। প্রায় স্বচ্ছ গায়ের চামড়া স্বাভাবিক হয়ে আসে। খাওয়া দাওয়া করার সময়টা একটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসেন জাহানারা বেগম। বাচ্চাটা এখন দিনের বেলায় ঘুমায় তার মা'র কাছেই, রাতে তাকে কোল থেকে নামান না মমতাময়ী নানী।
বাচ্চাটার বয়স সেদিন আঠারো দিন। সকাল থেকেই অকারনে কান্না করছিলো সে। ঘুমিয়ে গিয়েও বার বার চমকে চমকে জেগে উঠছিলো। দুপুরের দিকে ডাক্তার নিয়ে আসা হয় বাসায়, ডাক্তার দেখে বলেন ঠান্ডা লেগেছে বাচ্চার। শ্বাস নিতে পারছেনা ঠিক মত, সে জন্য কান্না করছে। ডাক্তার একটি ঔষধের নাম লিখে দিলেন, যেটা সেই ছোট শহরে পাওয়া যাবেনা, বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হবে। তখন ডাক্তার বাচ্চাটিকে একটা ইঞ্জেকশন দিলেন, বাচ্চা ঘুমিয়ে গেলো তখনই, ডাক্তারও চলে গেলেন।
এক থেকে দেড় ঘন্টা পর পর বাচ্চাটা স্বাভাবিক ভাবে জেগে ওঠে খাবার জন্য। ৩ ঘন্টা পেড়িয়ে যাবার পরেও যখন বাচ্চা জাগলোনা, তখন সন্দেহ হলো সবার। পেড়িয়ে গেলো আরও একটি ঘন্টা, জাগার নামগন্ধ নেই বাচ্চাটার। তখন সদর হাসপাতালের বড় ডাক্তারকে নিয়ে আসা হলো বাসায়। ইঞ্জেকশনের নাম আর পরিমান দেখেই তার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি জানালেন - যে ইঞ্জেকশনটা দেয়া হয়েছে, সেটা বড়দের জন্য, পরিমানটাও প্রায় তিন সপ্তাহের বাচ্চার জন্য ভায়াবহ রকমের বেশী। বাচ্চা ঘুম থেকে না জেগে স্রেফ না খেতে পেয়ে মরে যেতে পারে। হাসপাতালে এত ছোট বাচ্চার চিকিৎসার তেমন ভাল ব্যবস্থা নেই, আর সেলাইন দেয়া ছাড়া এর কোন বিকল্প নেই দেখে বাসাতেই তাকে রাখা হলো। তার ছোট্ট শরীরে ঢোকানো হলো সেলাইনের সুঁচ, বাচ্চাটা নড়লোনা পর্যন্ত। বাসার সবাই কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া পড়া শুরু করলেন। এ ছাড়া আর কিছুই করার ছিলোনা সে সময়।
সে রাতে সময় যেন থেমে গিয়েছিলো। ঘড়ির কাটা নড়ছিলোনা সহজে। ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বাচ্চাটা ঘুমুচ্ছিলো মরার মতই। তার মা আর নানী অপলক তাকিয়ে ছিলেন তার মুখের দিকে, উৎকন্ঠায় তাদের হৃৎপিন্ড খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে আসছিল যেন। বাচ্চাটার ছোট্ট বুকটা মৃদু ওঠানামায় প্রানের অস্থিত্ব জানান দিচ্ছিলো শুধু। ক্রমেই যেন কমে যাচ্ছিলো নিঃশ্বাসের গতী। গোলাপী গায়ের চামড়া ফ্যাকাশে থেকে সাদায় রুপান্তরিত হচ্ছিলো। সবাই চোখের সামনে দেখছিলেন মৃত্যুর ভয়ঙ্করতম রুপ।
রাত চারটার পরে হঠাৎ করে একটু নড়ে ওঠে বাচ্চাটার ঠোট দুটো। কেঁদে ওঠার মত সামান্য শব্দ করে ওঠে সে। ছোট্ট দেহটাতে যেন প্রানের স্পন্দন ফিরে আসতে থাকে। অল্প কিছুক্ষন পরেই নড়ে ওঠে বাচ্চাটা। ডাক্তারের নির্দেশ মত নার্স তখনই খুলে দেয় সেলাইনের সুঁচ। ক্রমে গায়ের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ফিরে আসে তার। ঘন্টা খানেক পর কেঁদেও ওঠে, একটু খেয়ে সতের আঠারো ঘন্টা পর কাঁথা ভেজায়। সবাই সস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তখন।
একে একে দিন কেটে যায়। স্বাভাবিক নিয়মে বেড়ে ওঠে বাচ্চাটি। তার মা ও ক্রমেই শিখে নেয় বাচ্চা সামলানোর কৌশল গুলো। জন্মের চল্লিশ দিনের দিন মা ছেলেকে নিতে আসেন বাচ্চার বাবা। বাচ্চাটির সেবারেই প্রথম গাড়ীতে ওঠা। গাড়ীতে উঠে সে ছোট্ট দুটি হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মা'কে। আর বড় বড় অবাক চোখদুটি মেলে এদিক সেদিক দেখতে থাকে। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে তাদের বিদায় দেন জাহানারা বেগম।
[গল্পের এই অংশটুকু নানীর কাছ থেকে শোনা। এর পরের আংশটি বলেছেন মা। আমার খুব প্রিয় একটা গল্প আমার ছোটবেলার গল্প]
ক্রমশ...
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুলাই, ২০০৯ রাত ১:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


