somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার ১১০ ট্যাকার ঘুম :-< /:)

১০ ই জানুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৪:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মার্চ মাসে কোয়ান্টাস যখন ঘোষনা করে যে ওরা ২০% ষ্টাফ ছাটাই করবে, তখন ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনাই যে আমার কপালে কি পরিমান দুর্ভোগ আছে :(( আমার কাজ ছিলো রাতে। কোয়ান্টাস এয়ারওয়েজের ইন্টারন্যাশনাল ক্যাটারিং সার্ভিসে ছোট একটা জব করতাম। কাজ তেমন কিছুই না, সপ্তাহে ৬ দিন, রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সারা রাত ঘুরাঘুরি। কোন সমস্যা হলে সমাধান দেয়া, ২৮টা ক্যামেরায় চোখ রাখা আর চান্স পেলেই ব্লগিং, ফোরাম আর ফেইসবুকে নৃত্য করা :D



এপ্রিল মাসের আমাকে একটা ইমেইল করে জানায় যে মে মাস থেকে আমার শিফটটাই এই লো ট্রাফিক সিজনের জন্য ক্যানসেল করা হইছে, তার মানে আমার কোন জব নাই :| অক্টোবর থেকে জানুয়ারী পর্যন্ত প্রচুর লোক থাকে প্লেনে। সে সময়ে নাইট শিফট শেষ করে রাত ৩টার দিকে, মর্নিং শিফট শুরু হয় ৪টা থেকে। প্রায়দিনেই ২১~২৩ ঘন্টা কাজ চলে। ডাল সিজনে রাত ১০টা ১১টার মধ্যেই নাইট শিফট শেষ হয়ে যায়, মর্নিং আরম্ভ হয় ৫টা থেকে। কাজেই এ সময়ে আমার তেমন কাজ আসলেও থাকেনা ;)

মাথায় বাজ পড়লেও মনে একটাই আশা ছিলো যে এই লাইনের অনেক দিনের অভিজ্ঞতা আর চেনা জানা লোকের সাহায্য পেলে কাজ পেতে দেরী হবেনা। অনেকদিন রাতে ঘুমাইনা, কাজেই সপ্তাহ খানেক ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম, শুধু খেতাম আর ঘুমাতাম :P কিন্তু বিশ্বমন্দার ধাক্কা যে কি জিনিস সেটা টের পেলাম নতুন কাজ খুঁজতে বের হয়ে :| দিন যায়, কোথাও নতুন কাজ পাইনা, সবাই শুধু বলে - ডাকবে, কেউ ডাকেনা, অনেকে বিরক্ত হয়ে ফোন ধরাই ছেড়ে দিলো। চারিদিকে শুধু ছাটাই আর ছাটাই। একটা উদাহরন দেই। আগে একজন ওয়ার্কার ফ্লোরে এক ঘন্টায় ৮০০ স্কয়ার মিটার কাজ করতে পারে বলে ধরা হোত, এখন সেটা রাতারাতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০০ স্কয়ার মিটারে। তার মানে সোজা কথায়, আগে যেখানে ৩ জন লোক কাজ করতো, এখন সেখানে কাজ করবে দুজন। সমান তালেই কমে গেছে উপরের দিকের পোষ্ট গুলো। কাজেই যাদের জব আছে, তারা মাটি কামড়ে পড়ে আছে আর দুঃস্বপ্ন দেখছে যে এই বুঝি একটা ইমেইল ছাটাইয়ের বার্তা নিয়ে এলো। পার্ট টাইম ওয়ার্কার থেকে কর্পোরেট বড় কর্তারা - কেউই বাদ ছিলেননা ছাটাইয়ের লিষ্টে।



আমার চোখের সামনে তখন অন্ধকার, দিনের বেলা টর্চ জ্বালাইয়া চলার মত অবস্থা :-/ মাঝে মাঝে টুকটাক কাজ করি, যে যখন ডাকে, তার কাজ করে দেই, কখনও রেষ্টুরেন্টে, কখনও ক্লিনিং, কখনও কম্পিউটার মেরামত। খাওয়া আর বাসাভাড়ার টাকা উঠানোই কষ্টকর।

এমন সময় নতুন একটা কন্ট্রাক্টের কাজের অফার পাই, সপ্তাহে ৭ দিন, সারা রাত কাজ। রাতে কাজ করতে এমনিতেও আমার কোন সমস্যা নাই, সমস্যা শুধু ছিলো ৭ দিন কাজ নিয়ে, কিন্তু সে সময়ে না করে দেবার সাহস বা অবস্থা কোনটাই ছিলো না। কাজ শুরু হয় জুলাই মাসের ৪ তারিখ থেকে। যে বিল্ডিংয়ে কাজটা, সেখানে আমি সিডনীতে নতুন আসার সময় কাজ করেছিলাম, কাজেই ভালই হলো আমার জন্য। এখানেও কাজ তেমন কিছুনা, নাইট শিফটের ওয়ার্কারদের দিকে নজর রাখা, আর কিছু পেপার ওয়ার্ক। সারা রাত জেগে থাকতে হবে দেখে নিজেই আগ বাড়িয়ে কিছু বাড়িতি কাজ নিয়ে নাই, আমি তো জানি যে ওরা কোন ভাবেই এই সময়ের মধ্যে সব কাজ শেষ করতে পারবে না, ফলে কাজের মান খারাপ হবে, তখন বস্‌দের প্রথম ঝাড়ী আমাকেই শুনতে হবে :|



সেই থেকে সপ্তাহে ৭ দিন কাজ করি :| সকালে বাসায় ফিরে ঘুমাই, যদিও প্রায় দিনেই ঘুম হয়না। আমি যখন ঘুমাই, তখন বাকিরা (এই বাসায় ৫টা রুমে মোট ৯ জন ছেলে থাকে) জেগে ওঠে। ওরা শব্দ করে, আর আমার ঘুমের ১২টা বাজায় X( কাজ চলে যাবার পর বেশী ভাড়ার হাউজ ছেড়ে দিয়ে কম ভাড়ায় শেয়ারে একটা রুমে উঠেছি, কাজেই খুব বেশী আশা করাটাও উচিৎ না। আমার একার ঘুমের জন্য তো ওরা রান্নাবান্না, গান শোনা, গল্প করা, হাসাহাসি বাদ দিয়ে দেবে না :|

প্রতিদিন একটু একটু করে জমতে থাকে আমার ঘুম। প্রথম দিকে সপ্তাহে কোন একদিন সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত ঘুমিয়ে পুষিয়ে নিতাম, পরে সেটাও বন্ধ হয়ে গেলো। সারা রাত কাজ করে এসে আমি বিছানায় চোখ খুলে জেগে থাকি, ঘড়ির কাটা দ্রুত সময় মেপে চলে - আমার ঘুম আর আসেনা। এদিকে রাতে আবার কাজ, সেটা মনে করে জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা করি, কিন্তু ঘুমানো কি এত সহজ? ঘুম ঘুম চোখে কম্পিউটারের সামনে বসে থাকি, কিছুই ভাল লাগেনা। ব্লগ লেখা, ফোরামিং, ফেইসবুক, চ্যাটিং সব মাথায় উঠেছে। বাসায় কথা বলাও কমে গেছে অনেক। শুধু আদিত্য কথা বলতে চাইলে মানা নেই। :D হয়তো অনেক সাধ্য সাধনা করে ঘুমিয়েছি, এমন সময় উনার কথা বলতে ইচ্ছে হলো পাপার সাথে, সে কথা ২০ সেকেন্ডের হলেও আমি কল দেই ওকে। আমার সন্তানকে আমি কাছে থেকে আদর দিতে পারিনা, সে কারনে ওর জন্য বাকি সব কিছুতে কোন কমতি রাখতে চাইনা।



একটানা ৪ মাস কাজ করে নভেম্বরের ৫ তারিখ থেকে ২ দিন ছুটি নিয়েছিলাম। কিন্তু সে সময়েও একটা খ্যাপের কাজ করেছিলাম বলে ঘুমানো হয়নি সেভাবে। তারপর থেকে আবার ভীষন কাজের চাপ যাচ্ছে। ভেবেছিলাম ক্রিসমাসে অন্তত একদিন ছুটি পাবো। কিন্তু এ বছরই প্রথম আর সবার সাথে আমাদেরও ক্রিসমাসে কাজ করতে হয়েছে :(( যা হোক, এর মাঝে গত কয়েক সপ্তাহ আমার ঘুমের মহা সমস্যা গেছে। ঘুমের অভাবে মাথা খারাপ হবার যোগার।

অনেক ভেবে চিন্তে আমার সাথে কাজ করে ইন্ডিয়ান একটা ছেলেকে ট্রেনিং দিয়েছি কয়েক সপ্তাহ যাতে মাঝে মাঝে ছুটি নিলে ও কাজটা চালিয়ে নিতে পারে। গতকাল ছিলো আমার সেই কাঙ্খিত ছুটির দিন। সকালে ৬.৩০এর ট্রেন ধরে আমি বাসায় ফিরবো, মনের আনন্দে ট্রেনেই ঘুমিয়ে গেছি, জেগে দেখি আমার ষ্টেশনের পরের ৩ নম্বর ষ্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়লো মাত্র :(( কি আর করা, পরের ষ্টেশনে নেমে আবার উল্টোদিকে ফিরে এলাম। বাসায় পৌছুতেই আরেক বসের কল, "কাজে যাবেন? খ্যাপের একটা কাজ আছে"। যেহেতু রাতে আজ কাজ নেই, তাই মানা করার প্রশ্নই ওঠে না। সেই কাজ শেষ করে ফিরতে ফিরতে দুপুর ৪টা (এখন সন্ধ্যা হয় ৮.৩০'র দিকে :|)। বাসায় ফিরে দেখি রান্না নেই কোন, গরুর মাংস আর পুঁই শাক রান্না করে, গোসল করে, নামাজ পড়ে খেতে খেতে ৮টা বেজে গেছে। এরপর বাসায় একটু কথা বলে শুতে গেছি ৯টার আগেই। ৯.৪৫'এ এশার নামাজের সময়। কিছুক্ষন পরে উঠে নামায পড়ে নেবো মনে করে ঘুমিয়ে গেছি, সে ঘুম ভেঙ্গেছে পরদিন, মানে আজ দুপুর ১২.৩৮'এ। শনিবার রাতে কাজ করলে পেতাম ১১০ ডলার, তার বদলে পেলাম ১৫ ঘন্টা ঘুম, খারাপ না, কি বলেন ;);)

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জানুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৫:২৭
৪০টি মন্তব্য ৩৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×