পরদিন সকালে স্বভাবতই দেরি করে ঘুম ভাঙ্গবার কথা, বাংলাদেশের সময় থেকে সিডনীর সময় তখন পাঁচ ঘন্টা এগিয়ে। কিন্তু সকাল আটটার দিকেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। উঠে প্রথমে কিছুই বুঝতে পারিনা, নতুন ঘর, নতুন বিছানা, সর্বপরি নতুন একটা দেশ। একটু পর বিছানা ছেডে উঠি, বিশাল কাঁচের দরজা সরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াই। রাতের বেলা যখন এসেছিলাম, তখন রাস্তায় গাড়ীর হেডলাইটের আলো ছাড়া আর কিছুই দেখিনি। এখন দেখি আমার বারান্দার সামনে একটা ছোট পার্ক, চারিদিকে সবুজ গাছপালায় ভর্তি। যতদুর চোখ যায়, দালানকোঠার আবয়ব যেন ঢেকে আছে সবুজের গালিচায়। উপরে নীল আকাশটা যেন একটু বেশী নীল আমাদের দেশের চাইতে। কারনটা বুঝতে সময় লাগেনা, এদেশের বাতাসে ধুলোর পরিমান আমাদের দেশের তুলনায় কম। একঝাক কবুতর উড়ে এসে বসে পার্কের বেঞ্চে, মাটিতে, প্রায় কয়েক’শ হবে সংখ্যায়। আমাদের দেশে জালালী কবুতর বলে এগুলোকে। মনে হয় বাবুকে কোলে করে এনে কবুতর দেখাই। চমকে উঠি হঠাৎ, এখানে তো আমার সোনামনিটা আসেনি, আমি আমার বুকের মানিকটাকে ফেলে চলে এসেছি এই স্বপ্নরাজ্যে, একা।
বুকের ভেতর ভায়াবহ শুন্যতাটাকে আড়াল করার শক্তি আমার নেই। কিন্তু এটাই বাস্তবতা। যা হোক, বারান্দা থেকে চলে আসি ভেতরে, কিচেনে গিয়ে চা বানাই, দেখি হাউজমেটরা সবাই ঘুমিয়ে আছে। চা খেতে খেতে আমার বারান্দায় গিয়ে বসি। নগরীর ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে তখন, রাস্তায় গাড়ীর লম্বা লাইন, কিন্তু হর্ণের শব্দ নেই একটুও। ট্রাফিক লাইটের সংকেত মেনে চলছে সবাই, ট্রাফিক পুলিশের সাহায্য নিষ্প্রয়োজন।
চা খেয়ে আশে পাশে ঘুরে দেখতে বের হই। বাসার সামনেই অনেক দোকানপাট। একটা বাংলাদেশী দোকানও আছে। চাইনিজদের শাকসব্জির দোকান দেখলাম, কিন্তু কাছে গিয়েই মোন খারাপ হয়ে গেলো। শাকগুলোর অবস্থা এমন তেনাতেনা। আমাদের বাজারে দেখতাম – খানিকটা পঁচা, পোকায় কাটা আর পুরানো হয়ে যাওয়া শাকসব্জি কাজের বেটিরা খুব অল্প দামে কিনে নেয়, বা এমনিতেই দিয়ে দেয় দোকানীরা, সেই সবও এর চাইতে ভাল। পরে জেনেছি এরা সপ্তাহে এক বা দুই দিন ওগুলো আনে দোকানে, সারা সপ্তাহ বিক্রি করে, যেদিন সাপ্লাই আসে, সেদিন কিনতে পারলে তাজাটা পাওয়া যায়। অষ্ট্রেলিয়াতে তখন আমের সময়, সুন্দর গন্ধ আমগুলোর, কিন্তু দাম দেখে মাথা ঘুরে যাওয়ার যোগার। ২টা আমের দাম পাঁচ ডলার। তারাতারি বের হয়ে আসি দোকান থেকে। বাইরে আসতেই হাত টেনে ধরে উস্কখুস্ক চেহারার এক লোক, আফ্রিকান জঙ্গলীদের মত চেহারা। বলে – ২০ সেন্ট দিয়ে যা, কথা না বাড়িয়ে ২০ সেন্ট দিয়ে দেই। ভয়াবহ একটা হাসি দিয়ে চলে যায় লোকটা। আমি ফিরে আসি বাসায়, দেখি সোফায় বসে টিভি দেখছে হাউজমেট। ওকে বলি ঘটনাটা। ওকে বলি ঘটনাটা, সে বলে বিরাট বাঁচা বেঁচে গেছি। ওরা মাঝে মাঝেই মানুষের ওয়ালেট কেড়ে নেয়, মারও দেয়। পুলিশ ওদের কিছু বলেনা, ওরা অষ্ট্রেলিয়ার আদিবাসী।
দুপুরের জন্য রান্না শুরু করে ছেলেটা। ছোট্ট সাদা সাদা মাছ, আলু দিয়ে ঝোল। কি যে মজা লাগে খেতে ধবধবে সাদা ভাতের সাথে। খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে যাই, ঘুম ভাঙ্গে রাতের বেলা। খেয়ে দেয়ে টিভি দেখতে বসি, অচেনা সব চ্যানেল আর বিরক্তিকর সব প্রোগ্রাম। পরিচিত একটা চ্যানেলও খুঁজে পাইনা। রাত দশটার দিকে বন্ধু কাজ শেষ করে আসে, ওর গাড়ীতে এই প্রথম যাই সিডনী শহর দেখতে।
রাতের বেলা সিডনী সিটিতে ঢুকে মনে হলো এরাও আমার মত রাতে ঘুমায় না। গোটা শহরটা জেগে আছে এই রাত এগারোটাতেও। আলোয় ঝলমল করছে চারিদিক। কিন্তু রাস্তায় কোন জ্যাম নেই, গাড়ীর ইঞ্জিনের শব্দ ছাড়া নেই অন্য কোন আওয়াজ। মাঝে মাঝে কিছু ক্যাফে থেকে গানের শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। ঘুরতে ঘুরতে বন্ধু পরদিনের প্রয়োজনীয় কাজগুলোর তালিকা আর জায়গা দেখিয়ে দিলো। রাত একটার দিকে ফিরে এলাম বাসায়।
পরদিন সকালে প্রথমেই গেলাম রেল ষ্টেশনে, উদ্যেশ্য ব্যাঙ্কে যাবো। টিকেট কাউন্টারে টিকেট নিয়ে শটেশনে ঢোকার মুখে দেখি অদ্ভুৎ সিষ্টেম। টিকেটটা ভিজিটিং কার্ডের মত আকারের, সেটা অটোমেটিক গেটের একদিকে ঢুকিয়ে দিকে মুহুর্তে আমার সামনে এসে বের হয়ে যায়, টিকেটটা টেনে নিলে খুলে যায় দরজা। ভেতরে গিয়ে দেখি পুরোনো ধাঁচের সব ট্রেন, তবে দোতলা। ডিসপ্লেতে দেখে দেখে আমি যে ষ্টেশনে যাব সেই ট্রেনটা কোত্থেকে ছাড়বে সেটা খুঁজে বের করে প্লাটফর্মে চলে গেলাম। যথা সময়ে ট্রেন এলো, ট্রেনের দরজা খোলার ২০ সেকেন্ডের মধ্যেই বন্ধ হয়ে গেল দরজা, কিন্তু এর মাঝেই যাত্রীদের ওঠা নামা শেষ।
যা হোক, ব্যাঙ্কে পৌছে দশ মিনিটেই ব্যাঙ্ক একাউন্ট খোলা হয়ে গেলো। একটা ফর্মে শুধু নাম আর জন্ম তারিখ লিখে সাইন করে দিলাম, পাসপোর্ট দেখে বাকি কাজ ওরাই করে দিলো, বললো ব্যাঙ্ক কার্ড আমার বাসার ঠিকানায় চলে যাবে দুই দিনের মধ্যে।
বাইরে এসে ঢুকে পরলাম মোবাইলের দোকানে। একটা দোকানে হাজার রকম মোবাইল থাকেনা এখানে। এক একটা সার্ভিস প্রোভাইডারের দোকানে নির্দিষ্ট কিছু মডেলের সেট। হাতে দেশ থেকে নিয়ে আসা অল্প কিছু টাকা, কাজেই ১২৯ ডলার দিয়ে কিনলাম নোকিয়া ৩১২০ মডেলের সেট, যেটা এখনও কাজ করছে।
চলবে ...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


