আগের পর্বঃ পর্ব - ১, পর্ব - ২
সিডনীতে আসার দ্বিতীয় দিনটা কেটে গেলো অনেক কাজের মধ্যে, মনে আছে, সেদিন বৃষ্টি ছিলো। কাজেই রাস্তাঘাটে তেমন কিছু ভাল ভাবে দেখতে পারিনি। তাই পরদিন সকাল বেলাতেই বের হয়ে গেলাম সিডনী দেখবো বলে। ঝকঝকে রোদেলা সকাল, গরম পড়ছে অনেক। আমি গিয়ে দাঁড়ালাম রেল ষ্টেশনে, কিন্তু এদিন ওদিক তাকিয়ে আপনা থেকেই চোখ বন্ধ হয়ে এলো
যা হোক, ট্রেনে চেপে প্রথমেই গেলাম সার্কুলার কিউতে, যেখানে সিডনীর বিক্ষ্যাত অপেরা হাউজ আছে। অপেরা হাউজ আগে বহুবার ছবিতে দেখেছি, কিন্ত সেটা যে এত বেশী বড়, এত বিশাল, তা বুঝিনি।
অবাক চোখে রিতিমত হা করে তাকিয়ে ছিলাম অপেরা হাউজের দিকে। আমার মত আরও অনেকেই দেখতে এসেছিলো অপেরা হাউজ। এত এত লোক, কেউ তেমন কোন কথাই বলছিলনা। অপেরা হাউজের বিশালতার কাছে নিজেকে অনেক বেশী ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিলো আমার। অনেক্ষন বসে ছিলাম অপেরা হাউজের পাশে নির্জন একটা কোণে। হয়তো - সুন্দর কোন জায়গা প্রিয়জনকে সাথে নিয়ে দেখতে হয়, একা একা দেখলে মনের মাঝে একটা শুন্যতার সৃষ্টি হয়।
অপেরা হাউজের অবস্থান সাগরের পাশেই। দেশে থাকতে চিটাগাং যাইনি কখনও, কাজেই সাগর দেখাও হয়নি। সিডনীতে এসে এই আমার প্রথম সাগর দেখা। এত নীল পানি, আর পরিস্কার, ছোট ছোট ঢেউ, তাতে চলছে নানা রকম জলযান। ছোট ছোট লঞ্চ আর স্পীড বোট সাগরের জলরাশি এলোমেলো করে ছুটে যাচ্ছে বিভিন্ন্য দিকে।
অপেরা হাউজ থেকেই দেখা যায় সিডনী হার্বার ব্রিজ। বিশাল একটা ব্রিজ, লোহার কাঠামো, অর্ধচন্দ্রাকৃতি। এর নীচ দিয়ে চলে যায় বড় বড় সব জাহাজ। সে সব জাহাজের আকৃতি দেখলেও ভয় লাগে
অপেরা হাউজ থেকে বের হয়ে জীবনের প্রথম ট্রামে চড়লাম, হালকা ট্রেনের বগি, অনেকটা ছোটবেলায় শিশুপার্কে চড়া লাইট ট্রেনের মতই। সারা শহরটা ঘুরি ট্রামে চেপে। কিছু কিছু যায়গা দেখে রাখি পরের দিন আসবো বলে। এখানে আমার কোন আত্নীয়স্বজন নেই, যে আমাকে সাথে করে ঘুরে বেড়াবে। বন্ধুটি ক্লাস, কাজ আর নিজের সংসার নিয়ে অনেক ব্যস্ত। তবে একটা কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি। আমাদের বাসায় যে ছেলেটি সবচাইতে পুরানো, সে আমাকে এসব ব্যাপারে কোন সাহায্য করেননি, তার মত হচ্ছে আমি দেখে দেখে ঠেকে ঠেকে শিখবো। কিন্তু অনেক ব্যাপারে আমার বেশ কয়েকদিন পর্যন্ত অনেক বেশী খরচ হয়ে গেছে, কিন্তু সে বলে দিলে এই খরচটুকু বাঁচাতে পারতাম। বাঁচাতে পারতাম অনেক সময়। এখানে থাকতে এসেছি, শিখবো তো আমি সবই। উদাহরণ দেই - আমি যেখানে যেখানে গেছি, সিঙ্গেল ট্রেন টিকেট কেটে গেছি। এখানে একসপ্তাহের টিকেট কিনতে পারা যায়, যে কোন ষ্টেশনে নেমে যাওয়া যায়, ওটা কিনলে আমার এক সপ্তাহে কমপক্ষে ৫৫ ডলার বাঁচতো।
যা হোক, ট্রাম থেকে টাউন হল ষ্টেশনে নেমে যাই। একটু হেটে যাই মার্কেট ষ্ট্রিটে সিডনী টাওয়ারের কাছে। কিন্তু সিডনী টাওয়ারে ওঠার টিকেটের দাম আর বিশাল লম্বা লাইন দেখে ফিরে আসি। গিয়ে ঢুকি নীচের তলায় মার্কেট প্লেসে। অনেক অনেক দোকান, কিছু দোকান ঘুরে দেখি, জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছোঁয়া মনে হয়। একটা গেইম শপে ঢুকে গেইমের দাম দেখে মুর্ছা যাবার অবস্থা
সন্ধ্যের দিকে বাসায় ফিরে আসি। একাকিত্বটা চেপে ধরে আবারও। মনে হয় বাইরে থাকাই ভালো, অনেক কিছু ভুলে থাকা যায়। রাতে ফোন করতে চাই বাসায়, কিন্তু ফোনে কথা বলছে হাউজ মেট, ওর কথা আর শেষ হয়না। শেয়ার করে এক বাসায় থাকায় এই বিড়ম্বনাটা সইতে হয়েছে অনেক। কাজেই টেক্সট করে করেই এক সময় ঘুমিয়ে যাই। স্বপ্নে দেখি বাবুকে, আমার কোলের কাছে খেলা করছে। ঘুম ভেঙ্গে যায় মাঝ রাত্রীতে। নীচে একটা পেট্রোলপাম্প আছে, সারা রাত খোলা থাকে। সেখান থেকে কিনে আনি সিডনীর প্রথম সিগারেট। গত ছয় মাসে একটাও খাইনি, বলতে গেলে ছেড়েই দিয়েছিলাম, কিন্তু একাকিত্ব আমাকে আবার বাধ্য করে সিগারেট ধরাতে।
চলবে ...
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে অক্টোবর, ২০১০ রাত ১০:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



