somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বপ্নরাজ্যে ~স্বপ্নজয়~ (পর্ব - ৩)

২৪ শে অক্টোবর, ২০১০ রাত ৯:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আগের পর্বঃ পর্ব - ১, পর্ব - ২

সিডনীতে আসার দ্বিতীয় দিনটা কেটে গেলো অনেক কাজের মধ্যে, মনে আছে, সেদিন বৃষ্টি ছিলো। কাজেই রাস্তাঘাটে তেমন কিছু ভাল ভাবে দেখতে পারিনি। তাই পরদিন সকাল বেলাতেই বের হয়ে গেলাম সিডনী দেখবো বলে। ঝকঝকে রোদেলা সকাল, গরম পড়ছে অনেক। আমি গিয়ে দাঁড়ালাম রেল ষ্টেশনে, কিন্তু এদিন ওদিক তাকিয়ে আপনা থেকেই চোখ বন্ধ হয়ে এলো :| মানে লজ্জায় তাকাতে পারিনা কোনদিকে, এমন অবস্থা। ইংরেজী ছবিতে দেখা বিদেশ আর চোখের সামনে দেখা বিদেশের পার্থক্যটা বুঝতে পারলাম হাড়ে হাড়ে :P গরমের সময় মেয়েরা যে জামা কাপড় পড়ে সেটা আদৌ জামা, না জামার নীচে পড়ার ছোট জামা - সেটা বুঝতে পারছিলাম না :P এই ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য সদ্য বাংলাদেশ থেকে রফতানীকৃত আমি ঠিক সহ্য করতে পারছিলামনা :P মনে মনে বলি "তোদের কি বাপ ভাই নাই?" :P

যা হোক, ট্রেনে চেপে প্রথমেই গেলাম সার্কুলার কিউতে, যেখানে সিডনীর বিক্ষ্যাত অপেরা হাউজ আছে। অপেরা হাউজ আগে বহুবার ছবিতে দেখেছি, কিন্ত সেটা যে এত বেশী বড়, এত বিশাল, তা বুঝিনি।



অবাক চোখে রিতিমত হা করে তাকিয়ে ছিলাম অপেরা হাউজের দিকে। আমার মত আরও অনেকেই দেখতে এসেছিলো অপেরা হাউজ। এত এত লোক, কেউ তেমন কোন কথাই বলছিলনা। অপেরা হাউজের বিশালতার কাছে নিজেকে অনেক বেশী ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিলো আমার। অনেক্ষন বসে ছিলাম অপেরা হাউজের পাশে নির্জন একটা কোণে। হয়তো - সুন্দর কোন জায়গা প্রিয়জনকে সাথে নিয়ে দেখতে হয়, একা একা দেখলে মনের মাঝে একটা শুন্যতার সৃষ্টি হয়।

অপেরা হাউজের অবস্থান সাগরের পাশেই। দেশে থাকতে চিটাগাং যাইনি কখনও, কাজেই সাগর দেখাও হয়নি। সিডনীতে এসে এই আমার প্রথম সাগর দেখা। এত নীল পানি, আর পরিস্কার, ছোট ছোট ঢেউ, তাতে চলছে নানা রকম জলযান। ছোট ছোট লঞ্চ আর স্পীড বোট সাগরের জলরাশি এলোমেলো করে ছুটে যাচ্ছে বিভিন্ন্য দিকে।



অপেরা হাউজ থেকেই দেখা যায় সিডনী হার্বার ব্রিজ। বিশাল একটা ব্রিজ, লোহার কাঠামো, অর্ধচন্দ্রাকৃতি। এর নীচ দিয়ে চলে যায় বড় বড় সব জাহাজ। সে সব জাহাজের আকৃতি দেখলেও ভয় লাগে :| সার্কুলার কিউই আসলে ওদের জাহাজঘাটা। এখান থেকে যাত্রীরা সমুদ্রপথে চলে যায় আশে পাশের গন্তব্যে, আবার দূর দুরান্তের জাহাজও ছাড়ে এখান থেকে। আর পর্যটকদের মূল আকর্ষণও এখানেই। অপেরা হাউজ, হার্বার ব্রিজ, রয়াল বোটানিকাল গার্ডেন আর অসংখ্য রেস্তোরা। রেস্তোরাগুলো খোলা থাকে দিনরাত। অনেক বাংলাদেশী ছেলে কাজ করে এগুলোতে। ঘুরতে ঘুরতে একটা রেস্তোরায় বসি, মেনূ দেখে বুঝতে পারিনা কোনটাতে হারাম খাবার মানে বরাহের মাংস (ওদের ভাষায় পর্ক, বেকন, হ্যাম) আছে। খাবারের অর্ডার নিতে আসা ছেলেটা জিজ্ঞ্যেস করে আমি কোথা থেকে এসেছি, বলি বাংলাদেশ থেকে, সে ভেতরে গিয়ে পাঠিয়ে দেয় বাংলাদেশি একটা ছেলেকে। ওর সাথে টুকটাক কথা বলে চিকেন বার্গার, কোক আর ফেঞ্চ ফ্রাই অর্ডার করি :P সেইফ খাবার :) যদিও চিকেনটা হালাল না, তবুও খাওয়া চলে। এ দেশে অনেকেই খুব বেঁছে হালাল খাবার খান, আবার রাত্রী বেলায় করেন মদ্যপান :P আমার কাছে এটা ভন্ডামী বলে মনে হয়। আমি চেষ্টা করি হালাল খাবার খেতে, না পেলে পর্ক, বেকন, হ্যাম ছাড়া খাবার খাই। উপায় তো নেই, এই দেশে হালাল খাবার পাওয়া মুশকিল। সাধারনত লেবানীজ শপগুলোতে হালাল খাবার পাওয়া যায়, তবে সব লেবানীজ শপেও হালাল খাবার দেয়না :|



অপেরা হাউজ থেকে বের হয়ে জীবনের প্রথম ট্রামে চড়লাম, হালকা ট্রেনের বগি, অনেকটা ছোটবেলায় শিশুপার্কে চড়া লাইট ট্রেনের মতই। সারা শহরটা ঘুরি ট্রামে চেপে। কিছু কিছু যায়গা দেখে রাখি পরের দিন আসবো বলে। এখানে আমার কোন আত্নীয়স্বজন নেই, যে আমাকে সাথে করে ঘুরে বেড়াবে। বন্ধুটি ক্লাস, কাজ আর নিজের সংসার নিয়ে অনেক ব্যস্ত। তবে একটা কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি। আমাদের বাসায় যে ছেলেটি সবচাইতে পুরানো, সে আমাকে এসব ব্যাপারে কোন সাহায্য করেননি, তার মত হচ্ছে আমি দেখে দেখে ঠেকে ঠেকে শিখবো। কিন্তু অনেক ব্যাপারে আমার বেশ কয়েকদিন পর্যন্ত অনেক বেশী খরচ হয়ে গেছে, কিন্তু সে বলে দিলে এই খরচটুকু বাঁচাতে পারতাম। বাঁচাতে পারতাম অনেক সময়। এখানে থাকতে এসেছি, শিখবো তো আমি সবই। উদাহরণ দেই - আমি যেখানে যেখানে গেছি, সিঙ্গেল ট্রেন টিকেট কেটে গেছি। এখানে একসপ্তাহের টিকেট কিনতে পারা যায়, যে কোন ষ্টেশনে নেমে যাওয়া যায়, ওটা কিনলে আমার এক সপ্তাহে কমপক্ষে ৫৫ ডলার বাঁচতো।



যা হোক, ট্রাম থেকে টাউন হল ষ্টেশনে নেমে যাই। একটু হেটে যাই মার্কেট ষ্ট্রিটে সিডনী টাওয়ারের কাছে। কিন্তু সিডনী টাওয়ারে ওঠার টিকেটের দাম আর বিশাল লম্বা লাইন দেখে ফিরে আসি। গিয়ে ঢুকি নীচের তলায় মার্কেট প্লেসে। অনেক অনেক দোকান, কিছু দোকান ঘুরে দেখি, জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছোঁয়া মনে হয়। একটা গেইম শপে ঢুকে গেইমের দাম দেখে মুর্ছা যাবার অবস্থা :P দেশে ৫০ টাকায় সিডি কিনে সে সব গেইম বহু আগেই শেষ করে ফেলেছি :D এখানেও দাম ৫০ ($৪৯.৯৫), কিন্তু টাকায় নয়, ডলারে :|



সন্ধ্যের দিকে বাসায় ফিরে আসি। একাকিত্বটা চেপে ধরে আবারও। মনে হয় বাইরে থাকাই ভালো, অনেক কিছু ভুলে থাকা যায়। রাতে ফোন করতে চাই বাসায়, কিন্তু ফোনে কথা বলছে হাউজ মেট, ওর কথা আর শেষ হয়না। শেয়ার করে এক বাসায় থাকায় এই বিড়ম্বনাটা সইতে হয়েছে অনেক। কাজেই টেক্সট করে করেই এক সময় ঘুমিয়ে যাই। স্বপ্নে দেখি বাবুকে, আমার কোলের কাছে খেলা করছে। ঘুম ভেঙ্গে যায় মাঝ রাত্রীতে। নীচে একটা পেট্রোলপাম্প আছে, সারা রাত খোলা থাকে। সেখান থেকে কিনে আনি সিডনীর প্রথম সিগারেট। গত ছয় মাসে একটাও খাইনি, বলতে গেলে ছেড়েই দিয়েছিলাম, কিন্তু একাকিত্ব আমাকে আবার বাধ্য করে সিগারেট ধরাতে।

চলবে ...
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে অক্টোবর, ২০১০ রাত ১০:০১
১৫টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×