somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... সুমন ও আমরা সোহরাওয়ার্দি উদ্যান (চারুকলার বিপরীতে, ছবির হাটের পাশে)

সুমন ও আমরা অমীমাংসিত পার্থক্যে আমাদের বেচে থাকা ও সুমনদের মরে যাওয়া
এটা কোন রঙ্গমঞ্চ নয়
এ নয় খেলার জন্য খেলা
একটা জীবন
দারুণ ইঁদুর
কেটে কেটে জলরেখা
তবে হুইসেল বাজুক কেটলির অন্ধকারে
ফেনা উঠুক ভাতের রাতে।
(সুমন প্রবাহন)


এটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়েই আছে যে, সুমনের মৃত্যু একটা খাপ না খাওয়া মানুষের উপায়হীন আত্মাহুতি। আদতে কি তাই ? পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, সমাজ, মিডিয়া, রাষ্ট্র, আইন সবাই একসাথে এই সিদ্ধান্ত যে নিল সে উপায়হীন আত্মহত্যা করেছে, তার কারণ কি? এই বিবিধ কাঠামো জীবন সম্পর্কে যে ধারণা চালু রাখছে সেখানে কোন্ কোন্ বৈশিষ্ট্যের কারণে সুমনের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে খুব সহজেই প্রতিষ্ঠা করা যায়, তা কি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন না? আপনাদের সবার ভেতর কি সেই বৈশিষ্ট্যগুলো বিরাজমান? যাদের মধ্যে বিরাজমান তারা কি আত্মহত্যা করবেন? অথবা এমনওতো হতে পারে সুমনের মৃত্যুকে যেহেতু আত্মহত্যা হিসেবে কিছু ব্যক্তি বৈশিষ্ট্যের সুবাদেই প্রতিষ্ঠা করা গেছে; তাই যে কোন পরিস্থিতিতে উল্লেখিত বিবিধ কাঠামো সরাসরি এখানে আগতদের যে কাউকেই হত্যা করে বলতে পারে "এটা হল আত্মহত্যা"। কারণ আমরা সকলেই সুমনের সাথে সম্পর্কিত। ইতিহাস আমাদের সকলকেই সেই সম্পর্কের দায় হিসেবে উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর সাথে বোঝাপড়ার বাসনায় স্থাপন করে । সেই ইতিহাসে সুমনরা যদি বিনা চ্যালেঞ্জে আত্মহত্যার কাতারে দাঁড়ায় তবে হত্যা-আত্মহত্যার কানামাছি খেলাতে আত্মহত্যা সবসময়ই কানামাছি হয়ে ঘুরতে থাকবে, আর হত্যাকান্ডগুলো আত্মহত্যাকে নিয়ে খুনসুটি করে যাবে।

আমাদের আয়োজন:
১.আলোচনা
২. প্রাচ্যনাটের প্রযোজনায় কবিতার উপস্থাপনা
৩.গান

আলোচক:
১.সলিমুল্লাহ খান
২.সেলিম মোরশেদ
৩.কাজল শাহনেওয়াজ
৪.রথো রাফি
৫.তৈমুর রেজা

গান:
মুয়ীয মাহফুজ, প্রবর রিপন, অভিজিত দাস, কফিল ভাই, রাজু, পদ্ম


আয়োজনে: সুমন প্রবাহন স্মরণ প্রয়াস
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/29043139 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/29043139 2009-11-14 01:01:21
সুমন প্রবাহন,পতন ও প্রার্থনায় একজন কবির প্রস্থান অনন্ত জাহিদ

‘অন্ধকার রাতে নিজস্ব নক্ষত্রের পাহারায়
অনেক চেনা কবরের অচেনা অন্ধকারে
কংকালের গলা জড়িয়ে ধরি
মা, আমার গায়ে খুব জ্বর!’
এ-ই একজন কবির নিয়তি। প্রত্যেক কবির আছে কবিতার নিজস্ব সংজ্ঞা। আরো সত্য- সারা জীবন সে হয়তো সংজ্ঞার মরীচিকায় তৃষ্ণাতুর - ছায়াহীন, নিঃসঙ্গ। তাই কবিতা বহুরুপা। তাই কবিকে সংজ্ঞার কারাগারে খোঁজা অর্থহীন। তাকে আমরা খুঁজবো কবিতায় এবং শুধুই কবিতায়।

‘স্বজনেরা তাকায় আমার চোখে
খোঁজে আমাকে অর্থাৎ সুমনকে
সুমন তো নেই
বসে আছে সুমনের শবদেহ
চিনতে কি পাও আমায়
আমি! আমি! সুমন
তোমাদেরই ভাই-বোন
আমাকে পেয়ে বসেছে এমন নশ্বরতায়
নিজেকে ছাপিয়ে নিজেই হয়ে উঠি
নিজের স্বজন’ (ফিরে দেখা)

এই স্বতন্ত্র উচ্চারনের স্বজন কবি সুমন প্রবাহন আজ আক্ষরিক অর্থেই সকল নশ্বরতার আড়ালে! স্বরচিত এই না থাকা রচনা করছিলেন তখন, যখন তিনি ছিলেন মুখোশের কোলাহলে। সত্যদ্রষ্টাগণ বন্ধুহীন। আজ তাকে বারবার এবং প্রকৃত উপায়ে কাছে পাবার জন্য খোলা রইল তার কাব্যগ্রন্থ ‘পতন ও প্রার্থনা’। মাত্র ৩২ বছর জীবনের বোধিত্বে, বুকে মহাকাল ধারণ ক’রে, দু’হাত মেলে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ভূতগ্রস্থ মহাশূন্যে। কবি স্বাতন্ত্র্য ধারণ করেন কিন্তু অস্বীকার করেন বিচ্ছিণœতা। তার থাকা এবং না থাকা মানুষের ভীড়ে, কিন্তু একা। জীবন ও সৃষ্টির উম্মাদনায় সুমন প্রবাহন ছিলেন মানুষের অব্যক্ত প্রত্যাশার দলিলে। যে- মানুষের মাঝে জাতি-ধর্ম-রাষ্ট্রের কাঁটাতার নেই। যে মানুষটি স্বীকার করে না কোন বিভেদের মন্ত্র। বিভ্রান্ত বাংলাদেশে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্তিহীন সুমন জেনে গিয়েছিলেন
‘আমি হিন্দু কি মুসলিম সেই প্রশ্ন
আজ আমার কাছে প্রশ্ন নয়
মনে হয় মানুষ আমি
অনেক সংশয় বৃষ্টি আর ঝড়ে হেঁটে
এই সিদ্ধান্তে আমি স্থির’ (বাস)

বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পর যে-প্রজন্ম অর্থবহ মুক্তির জন্য লড়াই করেছে বা বেড়ে উঠেছে, বুক পেতে মৃত্যুকে পরাস্ত করেছে নূর হোসেনের মতো, পুঁজি শাসিত বিশ্ব ব্যবস্থার সমান্তরালে গণতন্ত্রের আপাত স্বস্তির জন্য, তাদের পিঠেই হাসতে হাসতে ছুরি চালিয়ে দিয়েছে হাড় পাকা রাজনীতিবিদেরা।
‘গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ’ কবিতায় ইতিহাসের নির্মোহ পাঠক এই কবি ব্যবচ্ছেদে আরো নির্মোহ
‘গণতন্ত্র তুমি আমার
কাছে আর
জনগণের মুখচ্ছবি নও
তুমি গুটিকয় মানুষের আঙ্গুলের ইশারা’

সুমনের কবিতায় নিজের বাস্তবতা দেশের বাস্তবতার অভিন্ন। এমনকি প্রাণ-প্রাঞ্জল নিঃসঙ্গ এই গ্রহটির বাস্তবতাও যেন তার ব্যক্তিগত জীবনেরই বাস্তবতা। ধনিকের তালিকায় ফিদেল ক্যাস্ত্রো এলে, ক্যামোফ্ল্যাশে মিকাইল সুমনকে পাকড়াও করলে, যে রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে সংশয়ের দোলা-কে আপন কে পর-সেখানে দাবি নিজেই এসে হাজির হয় নবী মোস্তফার কাছে। এমন বহুকোণ ইঙ্গিতের মূলেও কবি বিশ্বাসে অবিচল তিনিই আছেন কেন্দ্রে। অথবা কেন্দ্রে সেই ‘আমি’ যে সৃষ্টি ও স্রষ্টায় একাকার। ‘যেন আমিই ছিলাম’ কবিতাটির মতো আরো ক’টি কবিতায় ইসলামিক পুরাণ ও প্রসঙ্গ ব্যবহৃত হয়েছে কুশলী প্রজ্ঞায়।
বারবার পাঠ করার মতো ‘ইমাম’ শিরোনামের কবিতাটি বাংলার ভাটিয়ালি, নবাণ্নসহ সকল দেশজতা আত্মস্থ ক’রে, দেশে দেশে যুদ্ধের তান্ডব পেরিয়ে সুমনকে পৌঁছে দেয় পুনরুত্থানের দিকে। পিতা যীশুর প্রতীক্ষা যেন শান্তি সন্ধানের উপায়। যে কোনো মহত কবিতার মতো এ-কবিতাটি খন্ডিত রূপে উপস্থাপনের সুযোগ নেই। প্রতি পাঠে নতুন ভাবনার দিশারী। সকল হতাশা যে আশার সধৈর্য অপেক্ষা হ’তে পারে এবং সর্বকালকে ধারণ করতে পারা বিশ্বাসী উচ্চারণই যেহেতু ধর্মশ্লোকে
রূপান্তরিত হয় এবং এ-কবিতাটি যেহেতু প্রবাহনের প্রার্থণার স্পষ্ট রূপায়ন, সেহেতু উদ্ধৃতি সংস্কৃতিতে সংযত থাকাই শ্রেয়। গ্রন্থের নাম-কবিতা দু’টোও সে পর্যায়ভুক্ত।

কবিতার কাছে এলে বেশি ক’রে মনে পড়ে কে-না ভালবাসার কাঙ্গাল। সে-কাঙ্গালপনায়ও ভাণহীন সুমন। এ-ভালোবাসা সার্বজনীন। কিন্তু যারা সৃষ্টি করেন, যারা মিশে থাকতে চান সৃষ্টির উৎসবে, তাদেরও আশ্রয় চাই। তারাও তো হল্লায় ভাসতে চান বন্ধুত্বের সবুজ জলাশয়ে। কিন্তু কই সেই নির্মল জলাধার - নিসর্গের ঢেউয়ে একান্ত সুজন। আজ স্রষ্টা সমাজও ঈর্ষার এঁদো ডোবায় অহেতুক পাথরের ঢেউ। সৃষ্টি নয়, স্রষ্টাই যেন সকল অস্ত্রের নিশানা। কিন্তু বিচলিত ছিলেন না সুমন প্রবাহন। কবিতা-যাপনে তিনি সকল ঈর্ষার উর্দ্ধে নিজেকে স্থাপন করতে পেরেছিলেন। একই সঙ্গে নিজের কালখন্ডে নিজের উপস্থিতি সম্পর্কে ছিলেন সচেতন। দুই সহস্রাব্দের সংক্রান্তিতে তাই উচ্চারণ করতে পারেন - ‘কবিতায় ঈর্ষা আমি প্রত্যাখ্যান করেছি
মেনেছি শূন্য অতিক্রম করবে
গত সহস্রাব্দ
প্রতিশ্র“তি দেবে
নতুন সহস্রাব্দ
আমরা সুন্দরের উপাসক
ঋণ গত শতাব্দীর
ফেলে আসা শতাব্দী তোমাকে ভালবাসি।,
(আমি আসছি)

সর্বময় প্রেম যুগলের মধ্যেই প্রকাশিত- প্রত্যাশায়, প্রত্যাখ্যানে; অথবা চাওয়া না-চাওয়া পেরিয়ে কোনো নির্লিপ্ত ধ্যানে। ধ্যানী সুমনের মানসপ্রতিমা যেন ‘বন্ধু শেতপদ্ম’। দু’চার শব্দের প্রতীকে সুমন যে প্রেম চিত্রিত করেছেন তা মোহময়। ‘শ্বেতপদ্ম’ কবিতাটি এ গ্রন্থের বাকি কবিতার মেজাজ থেকে আলাদা। এ-কবিতাটির সূত্রেই বলা নেয়া যাক সুমন প্রবাহনের কবিতা অলঙ্কারের ভারে মোটেই জর্জরিত নয়। যে উপমা-প্রতীক-চিত্রকল্প-ছন্দে কবিতাকে আবিস্কারের ধারা বিদ্যমান, তা থেকে সতর্ক দূরত্বে নিজেকে ব্যক্ত করেছেন সুমন প্রবাহন। চেষ্টা তাড়িত, সজ্জা ক্লান্ত কবিতার ভূবনে ‘পতন ও প্রার্থনা’ উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। কবিতা বিমুখ পাঠকও যদি সুমনের মুখোমুখি হন তাহলে তাকে সম্পূর্ণ নিরাশ হ’তে হবে না। আবার ‘চলে যাবো দূর বলয়ে’ কবিতায় ‘আগুন কিরিচ সকালে’র দৃশ্য ধারাবাহিক পাঠকের জন্য তোলা রইল। এ-কবিতার শেষ ঘোষণা পন্ডিতকে তুষ্ট না - করলেও এ-কথা জানিয়ে রাখি - শ্রেষ্ঠতম কবিরও সবটুকু প্রশ্নহীন নয়। ভালোয়-মন্দে মিলিয়ে যেমন মানুষ, কবিতা ও তাই - যেহেতু কবিতা মানুষেরই জন্য।

কবি শিল্পীগণ চয়ন করেন আকাশকুসুম - ঐ ব্যক্তি মানুষটিকে নিয়ে কী পাঠক কী সাধারণের যে অলীক আগ্রহ বা উপেক্ষা তার জবাবে ‘পতন ও প্রার্থনা’ মেলে ধ’রে সোজাসুজি বলা যায় Ñ প্রকৃত কবি’র জীবনই কবিতা; কবিতাই তার জীবন। কালই চিহ্নিত করবে কালজয়ীকে। তবু, একই কালের সহযাত্রী হিসেবে পক্ষপাত আড়ালের চেষ্টা ছাড়াই সবিনয়ে বলি - সুমন প্রবাহন সকল ভনিতা ও আড়ালের খোসা ছাড়িয়ে ফলের মতো, বীজের মতো বাংলা কবিতায় রেখে গেছেন নিজেকে। সেটা তার নিকোটিন তৃষ্ণা হোক অথবা স্মিত পরিহাসে পায়ের বীমা করতে চাওয়াই হোক না কেন। ... আর আছে তার গ্রাম। যে গ্রাম বাংলার পাঁজরে-প্রান্তরে। যে গ্রাম কুমার কীর্তনখোলার পাড়ে পাড়ে - মায়ায়, মাধুর্যে অবিকল বাস্তবতায়।
‘সাদা বক ওড়ে সাত আকাশের বাঁকে
দুধ-ভাত
হোগলা পাতার মাদুরে
মা যদি ডাকে।’

মাত্র চার লাইনের এই ‘মা’ কবিতার প্রসঙ্গে পাঠককে জানাই - মায়ের আকস্মিক মৃত্যুকে ‘আক্ষরিক’ অর্থেই মেনে নিতে পারেননি সুমন। অবিশ্রাম জীবন যন্ত্রণা ও দুর্ঘটনার পাশাপাশি এই শূন্যতা মানসিক বিপর্যয়ের পথ ভেঙ্গে কবি সুমন প্রবাহনকে পৌছে দেয় ১৯শে এপ্রিল, ২০০৮ এ। এ-দিন দুপুরে নিজ ঘরে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন কবি।

(কবি অনন্ত জাহিদের সাথে আমার পরিচয় সুমন প্রবাহনের মৃত্যু পরবর্তী সময়ে। শূন্যমাতাল’র কবিতা সংগ্রহের জন্য অভিজিৎ দাস আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন অনন্ত জাহিদের সাথে। তাঁর সাথে আমার কখনও দেখা হয়নি, এরমধ্যে একবার ঢাকা এসে আমাকে ফোন করেছিলেন কিন্তু তখন একটা কাজে বরিশাল ছিলাম। ফোনে সুমনের স্মারক গ্রন্থ এবং শূন্যমাতাল নিয়ে কথা হতো এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন। শূন্যমাতালের সম্পাদনা করতে আমি তাঁকে প্রস্তাব দিলে বলেন, আমি করব কিন্তু আমার মতো করে; এটা ছিলো তার মৃত্যুর তিন চারদিন আগে। অনন্ত জাহিদ নিজ ঘরে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন ৩০ মার্চ, ২০০৯ এ। তাঁর সাথে কথা বলবার সময়ে তাঁকে আমার কখনও অস্বাভাবিক মনে হয়নি।)- তসলিম মুস্তাফিজ
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28997530 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28997530 2009-08-21 17:56:22
মৃত্যুর পরে পুনর্মূল্যায়ন - এটা ঈশ্বরের রীতি না; মানুষেরই রীতি। লুবনা চর্যা

সুমন প্রবাহন আত্মহত্যা করেছে, এটা কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য না। আত্মহত্যা একটা নেশা। যে কোনো স্বাধীন নাগরিক এ নেশাটা নিতে পারে। তাহলে চলো একটা মাছরাঙা হয়ে ঘুরে আসি এই নেশার
রাজ্যে - ফ্যান্টাসি কিংডমে -

মাত্র এক মুহুর্তের ব্যাপার। মাছরাঙা তার উৎসুক মাথাটা ঢুকিয়ে দ্যায় জলের স্বচ্ছ দেয়ালে। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের জীবন... চলছে, যেমন চলে আমাদের জীবন : কাসরুম, লুকিয়ে সঙ্গম, প্রবল বিচ্ছিন্নতা, দুইটা গরুযুক্ত লাঙ্গলের গাড়িতে চড়ছে চাষা, জোছনায় শীতল পাটির উড়ন্ত কার্পেটে বাউল গান, কল্কে আদান প্রদান করলে চির শত্রুও হয়ে যায় চির সখা, শিল্পের প্রতিযোগিতা, বিরক্তিকর জ্যাম, আটপৌরে দায়িত্ব পালন - এইসব আরও অনেক কিছু। বেশ তো ভালই। কদর্যটাও সুন্দর; কারণ, শূন্যতায় তো কদর্যও নেই! তাই বলি সুমন এ কাজটা না করলেও পারতো। অতি সংবেদনে প্রবাহিত হয়ে সুমন প্রবাহনের মতো আমরাও মন খারাপ করি, অভিযোগ করি, হতাশা কিংবা প্রতিবাদের স্বরলিপি লিখি; সব মিলিয়ে কেলাসিত হয় প্রচ্ছন্ন এক ঘৃণা। কিন্তু আমরা যে ঘৃণা করবো এটা আমাদের পিতামাতারা জানতো না । তাই অনেক সময় বুঝে উঠতে পারে না, জোর করে পথে আনতে চায়। ফলে আমরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে যাই। এই ফিলিংস সম্পর্কে টোকাই শিশুদের কাছে প্রশ্ন তুলি। ওরা অবলীলায় দার্শনিকের মতো উত্তর দ্যায়, যেন এইটা একটা বলার মতো কিছু হইলো? ছোট ডানায় নিজের মতো করে ওড়ে আস্তাকুড়ের আশেপাশে, সন্ধে বেলায় রেষ্টুরেন্টের দামী দামী এটো খাদ্য খেয়ে শালুক ফুলের মতো হাসে। ওদের দেখেও সুমন শিক্ষা নিতে পারতো। সুমন এই কাজটা ক্যানো করতে গ্যালো? অতো বেশী কবি হইতে ওরে কে কইছিলো? ও কি জানতো না পৃথিবীটা ঠিক কাব্যিক না, চার্লি চ্যাপলিন যেমন হাস্যকর স্ট্রাগল চালিয়ে যায় লোহা লক্করের আস্তানায়। লোহা লক্করের শ্বাপদ, লোহা লক্করের সরীসৃপ লোহার দাতে হা করে আছে। তুমি মগ্ন হয়ে পড়লেই তোমাকে শিকার করে ফেলবে। এজন্য দীর্ঘ দীর্ঘ শতাব্দী ধরে তোমাকে জেগে থাকতে হবে, মানে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকতে হবে তোমার অস্তিত্বের প্রয়োজনে। আবারও Survival of the fittest?? সুমনের মনে হয়েছিলো : ক্যানো হবে? আমাদেরও মনে হয় : এমনটা ক্যানো হবে? বিবর্তনের সিড়ি বেয়ে এটা এসেছে, আমরা কেউ ঘোড়ার মতো পিঠে করে বয়ে আনি নি। অথচ তার ভোগান্তি পোহাতে হয় সবখানি। হয়তো সামন্ত সমাজের নিবিড় ঘনিষ্ঠতা ও এ্যাকে অপরের বিষয়ে যথেচ্ছ হস্তক্ষেপে বিরক্ত হয়ে মানুষেরা আত্মবিভোর বা আত্মকেন্দ্রিক হতে চেয়ে আবিষ্কার করেছিলো ব্যক্তি স্বাধীনতা। শেষে নিজের ফাদে নিজেই ধরা। কিন্তু আরও গভীর করে ভাবতে হবে - কিভাবে ব্যক্তি স্বাতন্ত্রকে অক্ষুন্ন রেখেও সামষ্টিকতাকে ছোয়া যাবে? সুমন থাকলে ওকে সাথে নিয়েই ভাবা যেতো। ভাবতে ভাবতে ও হয়তো আত্মহত্যার কথা ভুলে যেতো।

সুমন প্রবাহনের কবিতা সুমনের আত্মার কেটলি হতে অজস্র ধূম্রকুণ্ডলীর বাতাসে মিশতে চাওয়া। কারণ, বাতাস তো আন্তর্জাতিক।
এই লেখায় আমি সম্ভবত অনেক উদ্ধৃতি উল্লেখ করে ফেলবো। কিন্তু বলার আসলে কি আছে! সুমনের কথা সুমনই বলুক -

সুমনের কবিতায় মানুষের মীথ থেকে উঠে আসা সার্বজনীন কিছু শব্দের উপস্থাপন দেখি; যেমন : বোধি, আত্মা, মানুষ, কবি, প্রজ্ঞা, জাতিস্মর, শূন্য, মহাশূন্য ইত্যাদি...

ভূতগ্রস্থ মহাশূন্যে ঝাঁপিয়ে মেলেদি' দু'হাত
শুনশান পতন নামে অস্তিত্বের চরাচরে
পতন ডানার এ ঝাঁপে হারিয়ে ফেলি সময়
বুকের ভিতর ওৎ পাতে সময়হীন মহাকাল
স্থানিকতা শূন্য এ যাত্রায়,
যা দেখি সেখানে চোখ নয়
যেখানে চোখ সেখানে দৃষ্টি নয়।
(পতন)

আর আসবেন তিনি; হাজারও মানুষের প্রত্যাশা এই
হাজারও মানুষ বৃষ্টিমুখী
অগ্রহায়ণের রোদে পোহাবেন শীত
মৃত মানুষদের কল্যাণ হোক
বলবেন তিনি।
(ইমাম)

আমরাও যাব ঠিক হয়তো বাণিজ্যে নয়
যেভাবে প্রাচীন প্রজ্ঞা দূরগামী হতো
(মৃত্যুক্ষুধা)

সাদা পাত্রে ধরা আত্মা আমার যেন সবুজ আপেল
(কেউ নই শূন্য মাতাল)

দ্যাখো আমার পকেটটা হাতিয়ে
দ্যাখো কি আছে সেখানে
ইচ্ছে করলে তুমি আমার
লিঙ্গটাও হাতিয়ে দেখতে পারো
কেননা মানুষ তো নই আমি।
(ভ্যান চালক)

কোন খোঁজ ব্যর্থ নয়
চোখে রেখো অই ভস্ম
হে বোধি, বৃক্ষ আমার!
হে প্রকৃত রণ!
ফিরে আসবো সংকোচনে
পাটি গোটাতে গোটাতে ছায়াপথে পথে কালো গহ্বর নিয়ে হাতে
(কেউ নই শূন্য মাতাল)


অসংখ্য নঞর্থক শব্দের সমৃদ্ধতা আছে সুমনের কবিতায়। নঞর্থক পৃথিবীর নঞর্থক ইন্সট্রুমেন্টস, যেমন :

যায় দিন ভালো
আসে দিন কালো
(বুকের বোতাম খুলে দিলেই মাছ ছিলো)

ঐ যে পৃথিবী নীল গ্রহ আমার
(কেউ নই শূন্য মাতাল)

ভাঙনও ভেঙ্গে যাবে একদিন
বিশ্বাস মাত্র।
যদিও চারিদিকে চৈত্রের চৌচির
রক্তের কণিকায় কণিকায় বিশ্বাস হত্যার প্রেত নাচে।
(চারিদিকে চৈত্রের চৌচির)

হাটে হাটে যত শ্যাম তার বেশী শকুন।
(হাড়ে-পাঁজড়ে রূপকথা)

বুকে বিষ নিয়ে মুখে মিষ্টি আমার
(টাইম মেশিন)

নিজের ঘরে নিজেই কবর খুঁড়ি
শুয়ে পড়ি কবরের হা-এ
আমায় ঘিরে উৎসব নাচায় মৃত কংকালেরা
চোখে চোখ রেখে পায়ে আমিও নাচি
আর হঠাৎ বেরিয়ে পড়ি কবর ফেটে
দেখো নখ গজিয়েছে, দেখো দাঁত
কানামাছি ভোঁ ভোঁ যাতে পাবি তাকে ছোঁ
যে আমাকে ছোঁয় তাকে মৃত্যু ছোঁবে।
(আওয়াজ)

রেভুল্যূশন অ'র ডেথ
মৃত্যু যে দুঃখ আনে
ওরকম একটি দুঃখ
আমারও তৈরির ইচ্ছে
নির্লজ্জ গোপন প্রাণে।
(আমাদের পোশাক, কমরেড)

কিছুতেই অন্যরকম হতো না
যদি বায়ে ভর করে হাঁটতাম
তবে ডানেও একই ফলাফল হতো
কিছুতেই অন্যরকম হতো না
অনিবার্য আমার পায়ে পায়ে হাঁটে।
(দোলনা)
এগুলো আসলে নঞর্থকতা, না কি নঞর্থকতার প্রতি অভিযোগ?

তেমনি কিছু বিস্ময়ের সমাবেশ দেখি সুমনের কবিতায়। এগুলো প্যাসিমিস্টও, আবার অপটিমিস্টও। প্যাসিমিস্ট বিস্ময়গুলো আগে খুজে দেখি :

বৃষ্টি দেখে আর আশ্চর্য হবো না
শীত নামলেও না
বরং রোদ পোহানো বিস্ময়কর কিছুটা
জলত্যাগে শিশ্নের নালায় যে প্রবাহ
সেটা বিস্ময়কর।
(নিকোটিনের আহ্বান)

একদিন আমি ভাবনাকে
মিলতে দেখি বস্তুর সাথে
হতভম্ব হয়ে পড়ি
বস্তু আর জীবের সংকেতে সংকেতে
বিপন্ন বোধ করি
এভাবে নিষ্ঠুর আর বিপন্ন মানুষ
কখনও দেখিনি
(বাস)

এর প্রতিপিঠে অপটিমিস্ট বিস্ময় :

বস্তুবাদী পৃথিবীর সাফল্য আমি জানি
জেনে যতটা অবাক
তারও চেয়ে গভীর বিস্ময়
ওই সূর্যের আলো
(কয়েক মিনিটের সুখ)

ঘুরে ফিরে প্রকৃতির ছায়া ঢালে সুমনের ব্যক্তিক ছায়ায় -

পর্যটন কর্পোরেশন কি ভাবছেন
মাতালদের নিয়ে; নাইবা ভাবলাম
ভাবতে পারি
দীঘি নিয়ে, মাছ নিয়ে
জোনাকিরাও থাকতে পারে শালবনে
(বারো অগ্রহায়ণ : ১৪১২)

বরং কিছুক্ষণ
বড়শি হাতে
ছোট নদী, খালে
কাটুক সময়
মাছদুপুর আজ নামুক
মহাকালের লগ্ন কুড়িয়ে।
(আমার গ্রাম)

সুমন তো নিজেই প্রকৃতির একটা পার্ট। তারপর আবার সে তার অস্তিত্ব নিয়ে ঢুকে যাচ্ছে প্রকৃতির অন্যান্য পার্টস-এ।

চোখে যতদূর তদ্দুর সবুজ বৃত্ত মাঠে
সূর্য তার রোদের ঝাঁপি তুলতে বিকেল করে
মাঠ জুড়ে টমেটোর ছোপ ছোপ লাল।
চোখ থেকে ধীরে চুন-সুরকী খসে খসে পড়ে।
(চোখে যতদূর তদ্দুর সবুজ বৃত্ত মাঠ)

'ঠেলে ধরি ঢেউয়ের দেয়াল' কবিতাটা তো পুরোই একটা আ্যনিমেশন। তার থেকে কিছু অংশ -
হুম্ করে ওঠে সমুদ্রসিংহ
ছুটে আসে ঢেউয়ের হাতি
পালে পালে।
ঘাড়ের রগ ফুলিয়ে ঠেলে ধরি ঢেউয়ের দেয়াল
দিক বদলাল তাই পৃথিবীর হাওয়া।
(ঠেলে ধরি ঢেউয়ের দেয়াল)

তবুও আমি খিঁচে মেজাজে সারাটা বেলা' চারুকলা
নেমে যাই পাতালপুরীতে, শুয়ে থাকি
বসে পড়ি 'বাড়ি নাই' - গান গাই।

আমাকে বুঝতে পারে ঘিরে থাকা গাছ দেবতারা
ঝুঁকে পড়ে বলে, মন খারাপ ?
(কলকিতে পোড়ে আত্মা আমার)
গাছ দেবতারা যদি ঝুকে পড়ে জিজ্ঞেস করে, মন খারাপ? তাহলে তো যে কারোর ই মন ভালো হয়ে যেতে বাধ্য।

সুমন কিছুকাল আ্যস্ট্রোনোমিকাল আ্যসোসিয়েশনেও ঘোরাঘুরি করেছে। মহাবৈশ্বিক ব্যাপার বা বিভিন্ন নাম নত্রের গ্লাস হতে রোদ্দুরের মতো ছলকে পড়তে দেখি ওর কবিতায়।

সূর্য! দেখি তোমাকেও
কখনও কন্যা রাশিতে কখনও তুলা, বৃষ-মেষ-বৃশ্চিকে
দেখি গ্রহণের অক্টোপাসে, তবু
প্রশ্নহীন, পকেটে অসংখ্য ছায়াপথ

ভেসে যাই ছুটে ছুটে
যেন ধূমকেতু-আন্তঃনাক্ষত্রিক।
ক্রমপ্রসারমান ছায়াপথ থেকে
ছায়াপথে। বেড়াই। সাদা কিংবা কালো-
গুহা গহ্বরে,
(কেউ নই শূন্য মাতাল)

রেডিওর দ্যুতি ছড়াতে ছড়াতে
এই যে ছুটছি, ছুটে যাচ্ছি আলোর গতিতে গোপন কোয়াসার।
(কেউ নই শূন্য মাতাল)

কৃষ্ণপরে আকাশ রাতে
গ্যালাক্সিটার প্রান্ত টেনে চাদর জড়াই
লোকে বলে, পাতা জুড়ে জোনাকির ঢল।

হেসে উঠলে
ঘুমের হা-এ
ঢুকে পড়ে ডজন দুই কৃষ্ণ গহ্বর
(চোখে যতদূর তদ্দুর সবুজ বৃত্ত মাঠ)

কিছুদিন থিয়েটারেও কাজ করেছিলো। তার ছাপ -
আমাকে মেলায় নিয়ে যেয়ো
নিয়ে যেয়ো মঞ্চে
(হার্ড টক)

সুমনের জীবনে মায়ের প্রভাব ব্যাপক। ফ্রয়েডীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সরে এসেও আমরা এর তাৎপর্য বুঝি। মায়ের মৃত’্যতে সুমন দিশেহারা হয়ে পড়েছিলো, মরুদ্যান উধাও হলে ছায়াপ্রার্থী পাখিদের যে অবস্থা হয়। মা-ই ছিলো মানবীয় পরিমণ্ডলে তার সবচেয়ে সফল যোগসূত্র। 'মা' কবিতাটি সম্পূর্ণ এখানে উদ্ধৃত হলো :

সাদা বক ওড়ে সাত আকাশের বাঁকে
দুধ-ভাত
হোগলা পাতার মাদুরে
মা যদি ডাকে।
(মা)

আর এখানে তো আরও তীব্র আকুতি -

অন্ধকার রাতে নিজস্ব নত্রের পাহারায়
অনেক চেনা কবরের অচেনা অন্ধকারে
কংকালের গলা জড়িয়ে ধরি
মা, আমার গায়ে খুব জ্বর!
(পতন)

বাবা ছিলো সবচেয়ে ব্যর্থ যোগসূত্র!

মানুষের চোখে মুখে প্রাণ নেই
এ মৃত্যুমুখো মানুষ দেখতে ভালোলাগে না
তেলাপোকা ডিম পাড়ে এমন দৃশ্যও চোখে পড়ে
সামনে ঘোরাফেরা করে প্রতিমুখ
বাবার গায়ে কাফনের গন্ধ
(নিকোটিনের আহ্বান)

চিন্তিত মেধায় কেঁদে
তোমার মা আজ শয্যাশায়ী
তোমার বাবাকে মা করো
ফিরে এসো ঘরে'
(নিখোঁজবিজ্ঞপ্তি)
ক্ষমা করার প্রশ্ন ক্যানো আসে? তার মানে, অভিমান ছিলো।

সুমন চেয়েছিলো বাবার সম্পদ থেকে নিজেকে বিযুক্ত করে নিজের শিকড় দিয়েই মাটি থেকে জলকণা পেতে।

আমি পিতার সম্পদে
ভর করতে যেয়ে
কখন হারিয়ে ফেলেছি
নিজেরই মেরুদণ্ড
আর ঈশ্বর তুমি কৃপা করো,
দরোজা খোলো
আমি নিজের পথেই দাঁড়াতে চাই
সম্মানের গালিচায়
(কয়েক মিনিটের সুখ)

সুমনের কবিতাগুলো প্রধানত মনোলগ। ডায়ালগ বা বহুলগ নয়। শহরকেন্দ্রিক এই আ্যলাইনেশনের চিত্র আমরা পাশ্চাত্য কবিতায়, নাটকে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে, দর্শনে এমনকি সংগীতে বহু আগে থেকেই দেখি। আমাদের সাহিত্যে জীবনানন্দ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা তাদের সমসাময়িক কাল হতে শুরু। ভাবতে অবাক লাগে, এই আমরাই একসময় সবার জন্যে ছাড়া ভাবতে পারতাম না। যার ভিতর 'সৎ' বিষয়টা ছিলো, অর্থ্যাৎ বেশি 'আমি আমি' ভাব ছিলো - তাকে সবাই ঘৃণা করতো। তাকে পরিত্যাগ করা হতো। আশির দশকের কবিতায় নি:সঙ্গতার একটা স্পষ্ট অবয়ব তৈরী হয়েছে। তারপরে নব্বই এবং নব্বই পার হয়ে এই দশকের শেষপ্রহরে সুমন প্রবাহনের আত্মহনন - সময়টা হিসেব করলে নি:সঙ্গতার ম্যাকলারেন কারের গতিবৃদ্ধির হারটা অনুভব করা যায়।

একাকীত্ব বোধ তৈরীর অনেক আগে থেকেই
আমি একা
(একা)

যেন বহুকাল হলো অনেক দুপুর
আমার পা চিরে শেকড় নামে
চামড়া ফেটে গজ গজ করে ডালপালা।
তদ্দুর সবুজ বৃত্ত মাঠ
(চোখে যতদূর তদ্দুর সবুজ বৃত্ত মাঠ)

জানা হয়তো নেই তোমার
আমি হাওয়া হতে রঙধনুর
ডাক পাই
আগুন জ্বলে গ্যারেজের
শুয়ে থাকি টঙে
এখনও রোডে গল্প চলে
আমি অনুপস্থিত।
(হার্ড টক)

বারবারই সুমন চেষ্টা করেছে সমমনাদেরকে নক করতে। নিজের অসুস্থতার বাক্স তাদের কাছে উন্মুক্ত করতে। কিন্তু এ ধরনের একটা বাক্স আমাদের প্রত্যেকেরই আছে। তাই কেউই অন্যের বাক্সের তত্ত্বাবধান করতে আগ্রহী হয় নি। তার আরেকটা কারণ হচ্ছে, এ বাক্সের খোলে বন্দী আছে কিছু সংক্রামক ভাইরাস। সুমন নিজেও সেই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। অহেতুকই সে ওটাকে নিজের অসুস্থতা ভেবে মনোকষ্টে ভুগেছে। বরং ওটা একটা জ্বলজ্বলে সালফারযুক্ত বীভৎস খুলি, আর আমরা একেকটা আয়না। আয়নাতে রিফেকশনটা আসে; আমরা তখন ভুল করে নিজেকেই দায়ী করি।

পাহাড় কেমন আছে জানি না
দীর্ঘকাল দেখা হয় না
তাকে আমার ব্যাধি দেখিয়ে বলবো
আমি অসুস্থ।
(১৯৪২ - এ লাভস্টোরি)

কী এক সর্বভুক তেলাপোকার মতো অস্তিত্বের ক্ষীণতা
অস্থির নিয়তি যেন পিছু ছাড়ে না
কিছু দেখে শান্তি নেই
কিছু ছুঁয়ে শান্তি নেই
দাঁড়িয়ে বসে শুয়ে কোথাও শান্তি নেই
শান্তি পেয়েও যেন শান্তি নেই।
(পতন ও প্রার্থনা)

রাজনীতি সম্পর্কে সুমনের স্বচ্ছ এবং সহজ কনসেপ্ট বিস্মিত করে। জনসংযোগহীন একটা মানুষ - সে সংযুক্ত ছিলো সর্বত্র, সবকিছুতে।

একটা ক্ষুধার্ত কুকুর রাস্তায় হাঁটছে
- আমার মন্বন্তরের ব্যথা মনে হয়
(শ্রমঘামে নিষ্পাপ বেদনা)

জেরুজালেমে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে
পৃথিবীতে শান্তি ফিরবে কিনা
এ নিয়ে আমি কোন কুতর্কে যাবো না
শুধু জানি
জেরুজালেমে ইতিহাস চিরকাল অশান্ত
যেন চিরকাল কান্না
সেই ঢেউ পৌঁছে যায় পৃথিবীর
-কানায় কানায়
(ইমাম)

এবং ধনিকের তালিকায়
ফিদেল ক্যাস্ত্রো এলে
আমি তার মর্ম উদ্ধারে থাকি !
(যেন আমিই ছিলাম)

জেনারেল আমার মৃত্যুযন্ত্রণা বেশিক্ষণ স্থায়ী না হয়
জেনারেল দ্রুত; দ্রুত করো
আর আত্মায় ভর করে চলে যাবো
নিঃশব্দে অস্পৃশ্যালয়ে
(রাত একটা পনেরো মিনিট)

জেনারেল এসব কথা হয়তো আপনি জানেন
আপনার উপস্থিতিতে আমি বলে উঠি, ইয়েস্ স্যার
এবং হাঁটি, বাম ডান... বাম...
এবং আমি ফাঁসি কাঠে
জেনারেল ফাঁসির কাঠে আমার দীর্ঘশ্বাস
আপনি মনে রাখবেন।
আমার ফায়ারবক্সটা খুঁজে পাচ্ছি না
জেনারেল সিগারেট
জেনারেল ম্যাচটা ধরুন
আমার হাতটা উড়ে গেছে।
(রাত একটা পনেরো মিনিট)
কী প্রহসন!

তপ্ত ভূখণ্ডে পা, তপ্ত সূর্যে ঠেকিয়ে মাথা সুমন শিশুত্বে চেয়েছে পরিত্রাণ, ভেবেছে এভাবে হয়তো সম্ভব।

তবু আমি যত আলাপই করি
অর্থাৎ যে ভঙ্গিতে তোমার একান্ত হয়ে রই
মনে রেখো!
শিশুরা আমায় অলৌকিকভাবে রক্ষা করলো।
(রোদের গন্ধ)

শিশুদেরকে সুমন সরাতে চেয়েছে সার্বিক ভাঙন থেকে। কেননা, তারা তো উত্তর প্রজন্ম। তারা এখনও দূষণমুক্ত।

মনে হয়
সুদীর্ঘ আদিম হতে এই যে মানবযাত্রা
এর শেষফল এই শিশু
যতনের হীরামণি !
(রাত একটা পনেরো মিনিট)

শিশুতোষ মজায় মেতে উঠতে দেখি সুমনকে, তখন তার সব অবসাদ কেটে গ্যাছে।

কিন্তু বাড়ন্ত দেয়ালে
জোনাকি কোণঠাসা হলে
আমরা গাছের সমাদর বাড়াব
আমরা আরও আরও ঋতুপ্রবণ হব
মেঘ আসলে বলব
' কানা মেঘারে' !
(জমি যে জমিদার)

সোনালী বিড়ি ধরানোটা খুবই ভালো লেগেছে -

মাঠে যাই বরং,
ক্ষেতের আল বেয়ে
হাটু জলে ছল ছল জল-শব্দে হেঁটে যাই
একটু জিরিয়ে নিই ক্ষেতের টঙে
স্টোভের ছাই আগুনে, ধরিয়ে নিই সোনালী বিড়ি।
(চারিদিকে চৈত্রের চৌচির)

এ্যাতো দগ্ধ একটা মানব সন্তান যখন বুভুক্ষুর মতো লেখে শান্তির কথা, তখন ক্যামোন লাগে?

বরং খুব সকালে নয়
ভোরে উঠবো
চাদর মুড়ি দিয়ে কুয়াশায়
ভাঁপা পিঠা খাব
বরং কিছুটা পথ হেঁটে
একটা সিগারেট ধরাবো
মোড়ের দোকানে চা
রোদ উঠলে
চাদরের গায়ে সূর্য জড়াবো,
ফিরে
আমার বিছানায় শুয়ে থাকবে দীর্ঘঘুম।
(পেন্সিল স্কেচ)
একদম সাধারণ, অথচ কী স্বপ্ন আচ্ছদিত! পড়ার পর আমারও ইচ্ছে করছে কুয়শার পরত পরত ঝিল্লী সরিয়ে পথের পাশে ভাপা পিঠা ভোজন শেষে একটা সিগারেট ধরাতে।

সেতুর উপর আমরা ক’জনা ডানা মেলে
গাঙচিল হয়ে উড়ি
(পতন ও প্রার্থনা)

বাঁশি বাজে খুব
বাঁশি বাজে খুব
আমি সুরের পাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়ি
(রাত একটা পনেরো মিনিট)
তাতে কি তুই একটু ভালো থাকবি?

সুমনের মধ্যে যে আগ্নেয়গিরিটার অঙ্কুরন ও বৃদ্ধিসাধন ঘটেছিলো, সেটা বিস্ফোরন ছাড়াই ভ্যানিশ হতে পারতো - যদি এসব কথা শেয়ার করার মতো সে কাউকে পেতো। কবিতায় তো লেখাই যায়, কিন্তু মানুষের তো মানুষ বন্ধুরও দরকার হয়। এক্ষেত্রে বারবার তাকে বিমুখ হতে হয়েছে। আক্ষেপ করে বলেছে -
কেউ নেই তোমার
বন্ধু কোন।
নিজেকে এই কথা জানিয়ে
চুপচাপ বসে থাকি বিছানায়।
(ফিরে দেখা)

এই অবস্থাটা কাটাতে কল্পনা করেছে -

কেন যে গাছ জন্ম হল না
একবার পাশাপাশি দাড়াতে পারলে
আর দূরত্বের ভয় থাকতো না।
(বন্ধুত্ব ও দূরত্ব)

প্রেম নিয়ে কী লিখবো, তাই ভাবছি। বিষয়টা আমার কাছে এ্যতোটাই দ্ব্যর্থবোধক এবং বায়বীয় যে, কিছুই বলার নাই। আবার যেটুকু ধারণা প্লাস কল্পনা ছিলো, তাও এ্যাতো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে - আসলেই অস্বস্তিতে পড়ে গেছি।
কিন্তু সুমন সত্যিই প্রেমে পড়েছিলো।

আমি এমন বিকল অসুস্থ নিকট কারাগারে
ভাবছি প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গহীনতায়
যারা জানে কোন এক নারী প্রিয়তার কথা
অথচ মুখ ফুটে বলি নি কখনো
তবু না বলা কথাও রাষ্ট্র হয়ে যায়
(আমি আসছি)
বন্ধুরা তো জানবেই। এইসব অদরকারী খবরগুলা বন্ধুরাই রাখে।


সুমন চেয়েছিলো বিশ্বাসকে টিকে থাকতে দ্যাখার আশ্বাস; শীতলতা, আর একটু ছায়া.... কটকটে রোদে কি তাকানো যায়?

একদিন আমার গায়ে আগুন ধরে যায়
কামনায়
লোমকূপ বেয়ে ঘাস গজিয়ে ওঠে
সমুদ্রগর্ভে নেমে পড়ি
ডলফিন ডলফিন
তোর শরীর ছুঁয়ে স্রোতে ভাসি
(পেন্সিল স্কেচ)

এখানে তো ক্যামোন একটা অগ্নিলিপ্ত শিহরণ-

থাকো কিংবা নাই থাকো তোমাকেই ছুঁয়ে থাকি
ছোঁয়া! কি এমন আণবিক খেয়া
যে আমায় লেজারের আঙরাঙ্গা করে তোলে
আর ভেঙে দেয় মন্ত্রে মন্ত্রে শৃঙ্খল নির্দেশ।
(হাড়ে -পাঁজরে রূপকথা)

এক পরাবাস্তব ভয় গ্রাস করেছে সুমনকে, আমাদের সবাইকে। ভয়টা অবশ্য অতি বাস্তবই। ভয়ই বলে দেবে, ক্যানো এ্যাতো ভয়?
পিঁপড়ে খেয়ে গেছে ঘাসফড়িং প্রজাপতি যত
এমনকি তেলাপোকা
আমি পিঁপড়েদের বলে দিয়েছি
আমার কাছে চক আছে
কিছু দৃশ্যের বিরল বাস্তবতার মুখোমুখি।
(নিকোটিনের আহ্বান)

জানলায় ফাঁক গলে যে রোদ
জ্যামিতি খেলে মেঝেতে
মোটা লেজের একটা টিকটিকি ভয় দেখায়
এখানে রহস্যময় দোকানগুলো খোলা আছে
তারা লোকে লোকে রহস্য বিক্রি করে
(নিকোটিনের আহ্বান)

শিকারি কার্তুজে ডাল থেকে খসে পড়ে
হলুদ পাখির আত্মা
বুঝি আত্মার বেদনা ভর করে।
উপত্যকা ঘিরে নামে মৃত্যুঢোঁড়া সাপ
কাফন ডানার চাদর মেলে দেয় প্রেতের শাসন
দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে গুটিকয় রক্তচোষা বাদুর ভাম
ঝকমারি আলোর অশ্লীলতায়
চোখ ফেটে রক্ত বইতে থাকে
(আওয়াজ)


ওর আপত্তিগুলো, ক্ষোভগুলো স্যাটায়ারে পরিণত হয় এভাবে :

হায় আশা পালালে তুমিও
'করতলের ঘা যে চাতুর্যে ফাঁকি দেয় মশা।'
(নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি)

বীমা কোম্পানি আসে না আমার কাছে
পায়ের বীমা করাতাম
না হাঁটতে হাঁটতে পায়ের যতটুকু মূল্য বাড়ল
তা বুঝিয়ে দিতে।
(বারো অগ্রহায়ণ : ১৪১২)

তবু শখের বিমান উড়ে গেলে পর
হ্যাঙারে বসে গাড়ি ভাবে - যুগটা বিমানের
(বুকের বোতাম খুলে দিলেই মাছ ছিলো)

অন্ধকারে থাকি অন্ধকার মাখি অন্ধকারে ঠাঁই
অন্ধকারে দেখি
থাকেন তিনি আলোকিত সাঁই
এ খেলায় বড় মজে উঠি, দারুণ পুলক
শান্তি চেয়ে আমি ধনুক প্রবণ।
(হে শূন্য)

ক্ষেপে গিয়ে প্রতিশোধও নিতে চেয়েছে -

দোযখের কসম
আমার কিরিচে অগ্নিময়
হবে কিছু মানুষের লাশ
আর আমি হাসতে হাসতে
পৃথিবীর
কাছে নিজেকে
খুনি প্রমান করে
বলবো গুডবাই পৃথিবী।
(চলে যাবো দূর বলয়ে)

স্রোত
যেন বা নদী বয়
শিরায় উপশিরায়
ড্রাকুলা
কাল আমি মোম
পোড়াবো সূর্যদেহে।
(অন্ধকার গলিপথে)

বহুবিধ প্রত্যাখ্যানের কান্তিতে নিপীড়িত হয়ে সুমন যখন বিম্বিত তরল পদার্থে রুপান্তরিত হয়, তখন সে প্রার্থনা করে...

পাল তুমি কোথায়!
আমাকে পাল তোলো পাল তোমার পালে।
(মণিহীন কাফন মানুষ)

ভোর দাও প্রভু
দেখা দাও যাপনলিপিতে
যেখানে উত্থান যে কোনও পতিত পার্বণে
তোমারই আশায় দিন বয়ে যায়
ঝরাপালকে ঝরাপাতায়।
(পতন ও প্রার্থনা-২)

মিলন হোক কোনও ঊর্ধ্বলোকে
যেখানে শুনশান বাতাস কথা কয়
(পতন ও প্রার্থনা-২)

রহস্যময়তার এত ভার সইছে না যে আর, তুমিও
অংশ হও আমার যাতনার।
(পতন ও প্রার্থনা-২)

বন্ধু টেনো না রিকশার হুড
বৃষ্টিপরীর গানে ভিজুক আজ
পুরোটা শহর।
(পতন ও প্রার্থনা-২)

স্নিগ্ধ এক বাঙালি জোনাকি সুমনের সহচর। অন্ধকার মেঠোপথে তার আলোতে সুমন উপকৃত হয়।

শালিক তুমি সমাজ গড়ো
পালকের সমাজ
চর্র্যাপদ হয়ে আমি
এখানে এই যে বাঙালি
আমরা রিকশা ভালোবাসি-
রিকশার চিত্রকর- ভালোবাসি
(বারো অগ্রহায়ণ : ১৪১২)

আমার হজমের দাপট
প্রবাদিত হয় মাঠে মাঠে কৃষ্ণকুলে

জমা হয়
কুমার পাড়ার হাড়ির খুলিতে।
(চোখে যতদূর তদ্দুর সবুজ বৃত্ত মাঠ)

ধানের অজস্রে ভীত গোলা
প্রতাপশালী মাছের নদী
আর গাভীর দুধে তটস্থ গোয়ালা
পরিব্রাজক ইবনে বতুতা, আল-বেরুণী কিংবা হিউয়েন সাং
পৃষ্ঠাজুড়ে সে রাজ্যের যশ প্রতিপত্তি।
(প্রত্ন সাম্রাজ্য)

সুমনের লেখায় একটা ব্যতিক্রমী জিনিস ল্য করি, সেটা হচ্ছে আরবী-ফারসী-উর্দু শব্দের কিঞ্চিৎ ব্যবহার। এ ধরনের শব্দ ব্যবহার আজকাল তেমন দেখি না।

তবু সত্য
তবু সত্য 'হোস নে কারও এন্তেজারি'
(কয়েক মিনিটের সুখ)

এই নাও কিছু অক্ষর সম্বল আমার
কিছু যাদুকরী ছবি
আর একখণ্ড কিতাব
(পতন ও প্রার্থনা)
আরও আছে।


'হারিকেনের চিকনি' এই আঞ্চলিক শব্দটার ব্যবহার বেশ মধুর।
এখন নিশি রাতে
আমার কবি হারিকেনের চিকনি বেয়ে
গলে গলে ছড়িয়ে পড়ে
(জেগে জেগে ছুটে বেড়ায় মেঘে মেঘে)

শূন্যতার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই সুমনের মধ্যে। এটা কোনো বস্তুগত শূন্যতা না। এটা বোধ করার শূন্যতা, যা উৎড়িয়ে যায় জ্ঞানের সীমা। যা পাসপোর্টের সীমা লঙ্ঘন করে বস্তুজগত বা প্রাণীজগৎ - যেখানেই ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারে। ফলে তার মনোজগৎ কাজ করে ভিন্ন এক মাত্রায়। সবাই তা বুঝতে পারে না। ফলে সুমন বা সুমনের মতো জনকে এসব কথা চেপে যেতে হয়। যে কারণে চর্যাপদের কবিরা নিয়োছিলো সন্ধ্যাভাষার আশ্রয়।

সূক্ষ্মতা আজকাল বড় ভয় পাই
যে বন্ধনে আমি
অসীমের বাঁধনে
তার রূপ আমি
লোকালয়ে ভয়েই বলি না
(রজনীগন্ধা)
বললেই তো পাগল, সিজোফ্রেনিক ইত্যাদি উপাধিতে চিহ্নিত হবার আশঙ্কা...

ভাবি, শূন্য হয়ে এক থেকে আজ অই সাত-
খণ্ড।
নিজেরই তৈরি যে নরক - কোন, গ্যাসচেম্বার
হাইরাইজ কুঠুরিতে ফেরো
ক্লান্ত ফাইল তুমি
তোমার গ্রাউন্ড ফোরের নিচে খুঁজে পাই
ডাইনোসরের পা-পায়ের ছাপ
(কেউ নই শূন্য মাতাল)

যখন আমি বুঝতে পারি
মাটির ঘ্রাণ মানুষের সীমানা
পড়তে পারি পাতা ও পতঙ্গ
তখন কে আমার পায়ে
পড়িয়ে দেয় এমন বিভ্রম
(কয়েক মিনিটের সুখ)

পথে পথে পৃথিবীর যত পথ
দলে দলে মিশে গেছে ওই চোখের গহন শৈশবে
কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে
ডানার বিস্তারে ভাসমান
অসংখ্য ছায়াপথ, সৌরলোক গ্রহাণুপুঞ্জে
ধাবমান যত সৌন্দর্যের ভিড়-নুলো ভিখারি
ওই চোখের সম্মোহনে।
ওই দৃষ্টি-পেশিল পাইথন গভীর সামুদ্রিক চাপে
শত শত মৃত্যুকে গেঁথে ফেলে।
ধমনী শিরায় কি এক জোয়ার-ভাটার তোড়ে উছলে দেয়
ধাঁধা লাগে
আর তাতে দিকে দিকে ভূমিষ্ঠ হই আমি।
(হাড়ে -পাঁজরে রূপকথা)

একনিষ্ঠ হয়ে পতিত হতে হতে পতনের দীর্ঘপথে সুমন কিছু আপ্তবাক্য নিপে করে উপর থেকে ঝুকে তাকিয়ে থাকা হিংসুক দেবদূতদের চোখে-মুখে।

গৌণই মুখ্য রাখে সবকাল
মহাকাল সংখ্যালঘু খুব নিঃসঙ্গে সুস্থ হয়।
(পতন ও প্রার্থনা ২)

চির মানবের সাযুজ্য আমি জানি
তাই ভিন্ন কিছু কিছুতেই ভাবি নি।
(রজনীগন্ধ্যা)

বিলীন হয়েছে, হবে
জন্মের পর নিরানব্বই ভাগ বীজ
টিকে আছে তার ওপারের একজন।
(কেউ নই শূন্য মাতাল)

পথ তো বৃত্তাকার কালও তাই
শুধু পোশাক পাল্টায়
(পতন ও প্রার্থনা-২)

বৃক্ষবাসী পাখির মতো সুমন ফিরতে চেয়েছে গোধূলিতে কিংবা সূর্যাস্তের পরও একটু দেরী করে। ফিরতে চেয়েছে শিশিরমাখা পৃথিবীর কাছে, অন্য এক ভোরকে ফিরে পাওয়ার সাহসে।

আমি নিজের কবরের পাশে বসে থাকি আর দেখি
মার্বেল দুপুর। জাতি-উপজাতি ভেদ। ভেদে আমার মন নেই।
মাঠে ধূলোখেলা।
প্রিয়তমাসু তোমাকে লিখছি, আসব আমি
ডানপিটে এক বিকেল পেরিয়ে
যেখানে সূর্য করে মেঘের সাথে খেলা
বসে থাকি নির্জনে কোনও এক পাখিবেলায়।
(বসুন্ধরা)

রেঁনেসাস নিয়ে কিছুই ভাবিনা আর
রেঁনেসাস গৃহবন্দি
কীর্তনখোলা নদীতে
আমাদের স্নান
-বৃথা নয়।
বৃথা নয়
কাঠবিড়ালি
(হার্ড টক)

স্বল্প যতিচিহ্নে সুমনের কবিতাগুলো কবিত্বসুলভ ফ্যান্টাসি নয় এ্যাকেবারেই। এর যতো লাবণ্য, কেদ, অভিযোগ, সন্দেহ, মর্ষকামিতা, কৌতূহল, সাংগীতিকতা - সবই একজন স্বপ্নাহত মানুষের নিউরোনের টাইপ রাইটার থেকে খসে পড়া। শেষের দিকের সুমনের লেখায় যথেষ্ট পরিবর্তন আসছিলো। কিন্তু সুমন এই আংশিক পরিবর্তনে তৃপ্তি পায় নি, ও চেয়েছিলো সর্বাংশে তুমুল পরিবর্তন।

মনে পড়ছে, সুমনের নির্বাপনের পর ওর বাড়িতে কয়েকজন বন্ধুর সাথে গিয়েছিলাম। সুমন তার বিছানায় শুয়ে ছিলো। একজন নিবিড় স্বজন, যে সুমনকে তার বিশ্বাসমতে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইতো, সে সুমনের হাতের বেকে যাওয়া আঙ্গুলগুলো সোজা করে দেয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু আঙ্গুলগুলো জেদীর মতো আবার বেকে গ্যালো। লোকচুর অগোচরে সুমন আবারও প্রতিবাদ করলো। দেখে আমার হাসি পেলো। মরে গিয়েও সুমন প্রবাহন কথা শুনবে না। সুমন তো অবাধ্য। সুমন, শ্রদ্ধা করি তোকে দোস্ত।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28993375 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28993375 2009-08-13 20:28:09
মাতাল পুনরুত্থান MATAL PUNORUTTHAN -এ নিমন্ত্রণ রইলো শুন্যমাতাল'র প্রকাশনা Publication ritual of “SHUNNOMATAL” ,কালনেত্র'র পুনরুত্থান পর্ব, Resurrection of “KALNETRO” এবং and প্রয়াত কবিবন্ধু a memorial honor to our late poet-friend সুমন প্রবাহন SUMON PROBAHON স্মরণে--


গান ও কবিতা পাঠ: Musical gathering and interpretation of poetry

কালনেত্র ও শুন্যমাতাল'র প্রকাশনা পর্ব Kalnetro & Shunnomatal publication’s ritual সময়সূচি: ৮ আগস্ট, ০৯ Time: 8 August, 09 শনিবার, বিকাল ৪ টা Saturday, 4 p.m স্থান: ছবির হাট Venue: Chhobir haat (চারুকলার বিপরীতে) (opposite of Charukala) সুমন প্রবাহন স্মরণ প্রয়াশ ও কালনেত্র Suman Probahon Shoron Proyash & Kalnetro

গান Musical gathering

কফিল আহমেদ Kafil Ahmed
প্রাচ্যনাট Prachyanat
কৃষ্ণকলি Krishnokali
মনোসরণি Monosoroni
চিরকুট Chirkut
পুনম Punam
অনম Onam
চিৎকার Chitkar
হাশেম Hashem
জুবায়ের Jubayer
অভিজিৎ দাস Ovijit Das
রাজু Raju
শীতল Shital
ফিউড ৮৬ Feud 86

এবং আরো অনেকে and others

কবিতা পাঠ Reciting of poetry

সাদি তাইফ Sadi Tayef
ইমরান মাঝি Imran Mazhi
লুবনা চর্যা Lubna Charja
সাঈদ জুবেরী Sayeed Jubary
বিবৃতি তানভীর Bibriti Tanveer
নৃপ অনুপ Nripo Anup
প্রবর রিপন Probor Ripon
মুয়ীয মাহফুজ Muiz Mahfuj
অভিজিৎ দাস Ovijit Das
ইউসুফ বান্না Usuf Banna
মঞ্জুরুল আহসান Manjurul Ahsan
রহমান মাসুদ Rahman Masud
ইয়ন Eon
নাফিস আমিন Nafis Amin
তসলিম Taslim









]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28990085 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28990085 2009-08-07 10:31:18
মাতাল পুনরুত্থান MATAL PUNORUTTHAN শুন্যমাতাল'র প্রকাশনা Publication ritual of “SHUNNOMATAL” ,কালনেত্র'র পুনরুত্থান পর্ব, Resurrection of “KALNETRO” এবং and প্রয়াত কবিবন্ধু a memorial honor to our late poet-friend সুমন প্রবাহন SUMON PROBAHON স্মরণে--


গান ও কবিতা পাঠ: Musical gathering and interpretation of poetry

গান Musical gathering

কফিল আহমেদ Kafil Ahmed
প্রাচ্যনাট Prachyanat
কৃষ্ণকলি Krishnokali
মনোসরণি Monosoroni
চিরকুট Chirkut
পুনম Punam
অনম Onam
চিৎকার Chitkar
হাশেম Hashem
জুবায়ের Jubayer
অভিজিৎ দাস Ovijit Das
রাজু Raju
শীতল Shital
ফিউড ৮৬ Feud 86

এবং আরো অনেকে and others

কবিতা পাঠ Reading of poems

সাদি তাইফ Sadi Tayef
ইমরান মাঝি Imran Mazhi
লুবনা চর্যা Lubna Charja
সাঈদ জুবেরী Sayeed Jubary
বিবৃতি তানভীর Bibriti Tanveer
নৃপ অনুপ Nripo Anup
প্রবর রিপন Probor Ripon
মুয়ীয মাহফুজ Muiz Mahfuj
অভিজিৎ দাস Ovijit Das
ইউসুফ বান্না Usuf Banna
মঞ্জুরুল আহসান Manjurul Ahsan
রহমান মাসুদ Rahman Masud
ইয়ন Eon
নাফিস আমিন Nafis Amin
তসলিম Taslim

কালনেত্র ও শুন্যমাতাল'র প্রকাশনা পর্ব Kalnetro & Shunnomatal publication’s ritual

সময়সূচি: ৮ আগস্ট, ০৯ Time: 8 August, 09
শনিবার, বিকাল ৪ টা Saturday, 4 p.m স্থান: ছবির হাট Venue: Chhobir haat (চারুকলার বিপরীতে) (opposite of Charukala)

সুমন প্রবাহন স্মরণ প্রয়াশ ও কালনেত্র Suman Probahon Shoron Proyash & Kalnetro]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28989974 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28989974 2009-08-07 00:27:13
কুমারী (অপ্রকাশিত কবিতার খাতা থেকে) সুমন প্রবাহন

টেনে ধরি ছেড়ে দেই
ছেড়ে দিয়ে রেখে দেই
রাখলে ভালো লাগে
ভালো লাগলে রাখি
রাখতে রাখতে আঁকি
আঁকতে আঁকতে শিখি
শিখতে গেলেই বহুদুর
দুরেই যত ফাঁকি
আহা পাখি!
ফাঁকি কোথায় রাখি!
খোঁপা! বাঁধা!
চুল, বাঁধো না আমাকে!
ভালো হতো
জন্ম যদি উকুন হতো
কুটুর কুটুর ঝুলতাম, জললতায়
ভাবতাম, লতাপাতা গুল্মঝাড়
সৌন্দর্য নাকি
কুহকের পাতাবাহার
পাতায় পাতায় রঙ ছড়ানো
রঙের ভুত যায় তাড়ানো?
খুলে দাও! এত বাঁধন কেন
আসনে বসলে সভাপতি
ফিতা কাটে, গিট খোলে
ফিতার দুই চোখ - পুরুষ হোক।
সুতোয় টান! বাধা চিরকালীন
বাধনগুলো খোলার অপেক্ষাধীন
ভেতরে ভেতরে তাধিন্ তাধিন্।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28985862 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28985862 2009-07-29 21:52:35
ইমাম (কাব্যগ্রন্থ: পতন ও প্রার্থনা) সুমন প্রবাহন

(মাঝি, ইবন, রিপন, মুয়ীয, অভিজিৎ আমি এখনও বেঁচে আছি)

আর আসবেন তিনি; হাজারও মানুষের প্রত্যাশা এই
হাজারও মানুষ বৃষ্টিমুখী
অগ্রহায়ণের রোদে পোহাবেন শীত
মৃত মানুষদের কল্যাণ হোক
বলবেন তিনি।
ছড়িয়ে পড়বে আশীর্বাদ পিতার
যদি মেষপালন হয় আমাদের সংস্কৃতি
যদি ভাটিয়ালি হয় আমাদের গান
যদি লাঠিয়াল বাহিনী নেমে পড়ে
চরে চরে
তবে ধান কাটার মৌসুম আসুক
নবান্নের উৎসব আসুক পাড়ায় পাড়ায়
এ বছর কৃষকেরা পেয়ে যাবে ফসলের ন্যায্য মূল্য
এ বছর মজুদদারেরা মধ্যবিত্তদের কথা ভাববেন
আমাদের শিল্পমূল্য কতটুকু
এ নিয়ে
সমালোচকেরা যাই ভাবুন
আমরা কিন্তু কবিতা লিখব

দেশে দেশে যুদ্ধ বাঁধে
আমরা কান রাখি রেডিওতে, টিভিতে
কতজন যোদ্ধা কিংবা সাধারণ
এ বছর
বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হলো
এ সংবাদ আমরা শুনি
চা খেতে খেতে।
আর তাকিয়ে থাকি প্রান্তরের কুয়াশায়

জেরুজালেমে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে
পৃথিবীতে শান্তি ফিরবে কিনা
এ নিয়ে আমি কোন কুতর্কে যাবো না
শুধু জানি
জেরুজালেমে ইতিহাস চিরকাল অশান্ত
যেন চিরকাল কান্না
সেই ঢেউ পৌঁছে যায় পৃথিবীর
-কানায় কানায়
হয়তো জেরুজালেম সে জন্যই কাঁদে, কাঁদাতে
আর যিশু
সাবমেরিনগুলো ঘোরে তোমার জন্য
মিগ কিংবা এফ-সিক্সটিন ওড়ে
তোমার জন্য
ব্যারাকে মিসাইলগুলো ঘুমোয় তোমার জন্য
সৈন্যরা প্রার্থনা করে যিশু তোমার জন্য
বনের বাঘেরা, মহিষেরা
এমনকি হরিণেরা তোমার জন্য
ওড়ে প্রজাপতি, বউপাখি, দোয়েল, ফিঙে
শাপলা ফোটে তোমার জন্য
যদি পাতা ঝরে পড়ে শীত এসে গেলে
যদি গাছগুলো ন্যাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে
হলুদ পাতা সমেত
তবে আমি হেঁটে যাব
সেই বিবর্ণ পাতার পথ ধরে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28969920 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28969920 2009-06-26 17:16:14
সুমন প্রবাহন, বন্ধু তুমি পৌছুলে কী ? অভীক সোবহান
'আমি তোমার সাথে একমত নই। অ্যালেনের প্রয়োজন ছিল চিৎকারের তাই সে 'হাউল' লিখেছে। আমরা কেন লিখব ? এটা অন্য সময় অন্য যুগ'। কুমার নদীর ধারের ক্ষীণতনু ব্রীজের রেলিং এ বসে সুমন আমাকে বলছিল। আমি তখন অ্যালেন, বিট আর হাংরি জেনারেশের ইতিহাস পড়ে মুগ্ধ। দিন নাই রাত নাই কবিতা কবিতা করে মাথা নষ্ট । প্রিয় শ্লোক - প্রচারবিমুখ মুক্তিযোদ্ধা কবি মুস্তফা আনোয়ারের (১৯৪৩-২০০৬) 'আগামী দিন কবিতার দিন। নিরেট, শক্ত, ঘন কবিতা আমরা পাব ! সে আশাতেই আজও পথে পড়ে আছি।'

সে সময়টা নতুন মিলিনিয়ামের শুরু, ১৯৯৯ হতে থেকে পরবর্তী কয়েকটা বছর। ফরিদপুরের গুড়বচাজার এলাকায় 'ভূমিজ'র সাপ্তাহিক অড্ডা কিংবা চরকমলাপুর ব্রীজ - আমাদের প্রিয় বিকেল বা সন্ধ্যা। আমাদের অর্থাৎ আমি, প্রমোজ হাসান, আবু তাহের সরফরাজ, সিদ্ধার্থ সংকর ধর, বদরুন নাহার কিংবা আমাদের সবুজ শহরের নিয়মিত অথিতি - আকরাম খান, বরকত উল্লাহ মারুফ এবং উজ্জল দুটি নাম - তৌহিদ এনাম (১৯৭৮-২০০৪) আর সুমন প্রবাহন (১৯৭৬-২০০৮)। মনে আছে সুমনের সাথে তৌহিদের প্রথম পরিচয় করিয়ে দেই শাহবাগে। মনে আছে পরিচয়ের মুহূর্তে তৌহিদ সুমনকে স্বাগত জানিয়েছিল সুমনেরই লেখা থেকে 'ভাবছি দিয়াশলাইয়ের প্রথম কাঠিতে আগুন জলে ক'জনার'। ওরা দুজনই এখন কেবল স্মৃতি, কেবল মলাট বন্দী কবিতার বই। ১৯৯৭ হতে ২০০১ দিকে আজিজের বাঁ-দিকের সিড়িটাতে তরুনদের আড্ডাটা বেশি হত। দোতলা-তিনতলার হাফ ল্যান্ডিং এ। ১৯৯৯ পর হতে কালনেত্ররা অর্থাৎ সুমন প্রবাহনরা খুব সরব। তখনও কফিল আহমেদ আর আবু হাসান শাহরিয়ার তরুনদের সাথে নিয়ে মহা আড্ডায় ব্যস্ত। তখনও রিফাত চৌধুরীকে শুধু আজিজ সুপারমার্কেট আর কাটাবন চেনে, টিভির দর্শক নয়। তখন কালনেত্র সহ বেশ কিছু লিটল ম্যাগকে ঘিরে তরুন কবিদের দুরন্তপনায় একটা নতুন প্রজন্মের আগাম বার্তা - শূন্য দশক। আমরা যারা রাজধানীর বাইরে থেকে লেখালেখি করতাম, তাদের সাথে শাহবাগের কবিদের সখ্যতা-পরিচিতি কম ছিল। সেটাই স্বাভাবিক। যদিও পরিধিবাসী হবার কারনে খুব আগ্রহ নিয়ে খোজ খবর রাখতাম ঢাকায় নতুন কি পত্রিকা এল, কারা লিখছে। ইতোমধ্যেই কোন এক ছোট কাগজে শামসুর রাহমান বলেছেন, তরুনদের মাঝে সুমন প্রবাহনের কবিতা তার ভাল লাগে। সে যাই হোক সুমন ব্যতিক্রম অন্য অর্থে - সে খুঁজে বের করেছিল আমাদের। এ ভাবেই সুমনের সাথে ছোট কাগজ 'দ' (খুলনা) ও 'ভূমিজ' (ফরিদপুর) এর লেখকদের অসম্ভব আন্তরিক একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে, পুরোপুরি বন্ধুত্বে রূপ নেয় । আসলে ঢাকা থেকেও জীবনানন্দের দেশে বেড়ে ওঠা সুমন প্রবাহিত হতে চেয়েছিল নতুন দশকে নিজ শহর শুধু নয়, এমনকি দৈশিক পরিমন্ডল ছেড়ে মহাবিশ্ব জুড়ে। ওর লেখা পড়লে এ বিষয়টা সহজেই চোখে পরে। সব সময়ই বলত ঢাকার চেয়ে ফরিদপুর কিংবা বরিশাল কত নির্ভার, কত সহজ - গলা খুলে গান গাইতে ইচ্ছে করে। ওর কন্ঠটা ছিল বেশ জোড়াল, তবে একটু ভাঙা ধরনের। কফিল ভাইয়ের গানগুলো সুমনের গলায় পারফেক্ট ছিল। একের পর এক সিগারেট পোড়াবার ফাকে শুনেছি বুক টান করা গান কুমার নদীতীরের প্রিয় কবিতা পাঠশালায়। সুমনকে খুব পছন্দ করলেও ব্যক্তিগত ব্যস্ততা- বিশেষত একাডেমিক ব্যস্ততার কারনে একনাগারে অনেক সময় কাটানো হয়নি। নানা ঝামেলায় ওর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বেশ আগেই। কিন্তু তথাকথিত এন্টি-স্ট্যাবলিশমেন্ট এর নামে একাডেমির ওপর বিরূপ মনোভাব দেখিনি ওর মাঝে। বিশেষত এডুকেশনের ব্যাপারে খুব উৎসাহ দিত, অন্তত আমাকে ।

সবই ঠিক, তবুও কোথায় যেন সুর কেটে যাচ্ছিল সুক্ষভাবে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষে ঢাকায় চলে এলাম। কথা ছিল নিয়মিত দেখা হবে সুমনের সাথে। প্রথম প্রথম ফোনে কথা হত। কিন্তু হঠাৎ আজিজে কিংবা বইমেলা ছাড়া সময় হত না সামনা-সামনি। এরই মাঝে ফরিদপুরের এক বন্ধু বলল সুমন বেশ কয়েকবার ওখানে গিয়েছে। হয়ত খুব ভোরে কিংবা মধ্যরাতে। কোথাও নিজেকে মেলাতে পারছেনা নাকি। শুনে মন খারাপ হল খূব। সে পর্যন্তই, বাস্তবতা বড় কঠিন। আমাদের ওকে সময় দেওয়া দরকার। কিন্তু ঠিক উল্টো করলাম আমি এবং আমরা। ও খুব একটা আসে না আর শাহবাগে। তবু হঠাৎ হঠাৎ দেখা হয় আজিজ সুপার মার্কেটে। । দেখা হলে বলে বই কিনতে এসেছিল। হাতে থাকে বই। হঠাৎ বলে ওঠে 'চল তোমার বাসায় যাব, অনেক কথা আছে ' কিংবা 'প্রমোজের ফোন নম্বরটা দাও, ওকে দেখি না বহুদিন'। হয়ত আমার বাসায় তখন আড্ডা দেবার পরিবেশ থাকে না, হয়ত পরদিন সকালে জরুরী কাজ থাকে তাই বাড়ি ফিরে অনেক প্রস্তুতি। ও বুঝতে চায়না। সরাসরি না করতে খারাপ লাগে, নানা রকম কথা বলি। তার পর সুমনকে বাদ দিয়ে বাড়ি ফিরি। মনে জমে থাকে পাপ, জমে থাকে ব্যথা। এমনই একদিন আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে দেখা, হাতে বই। জিজ্ঞাসা করতেই বলল 'টেড হিউজ'। ওর পছন্দ সব সময়ই আমার উল্টো । আমার ভাল লাগে 'সিলভিয়া প্লাথ'র কাব্যিক মৃতুভয়, কনফেশন আর রোমাঞ্চকর স্বেচ্ছা মৃত্যু। আমি যখন বলি এ্যালেনের 'হাউল'। ও তখন শুনিয়ে ছিল 'কফিল আহমেদে'র প্রাণময় গান। জীবন ও ভাল বাসত। আমাকে আর বদরুনকে এক সাথে দেখলে বলত, 'দু'জন কবি মিলে সংসার ! তোমাদের দেখে অবাক হই!' আমি ওর একাকিত্বটা বুঝে তাড়াতাড়া বলতাম বদরুন তো আর কবিতা তেমন লিখে না, সে এখন গল্পকার। সুমন সে কথায় গা না করে বলত একদিন বাসায আসবে দেখতে কেমন সংসার করছি আমরা। আসলে জীবনের প্রতি সুমনের ছিল সুতীব্র পিপাসা। খুব বেশি কিছু চায়নি। এই তো ২০০৮ এর বইমেলার একমাস আগে দেখা হল আজিজে আর এপ্রিলে সব শেষ। ওর মৃত্যুর মাস খানেক আগে, সামাজিক-সাংসারিক ভাবনা-দূর্ভাবনার মাঝে বদরুনকে শোনাচ্ছিলাম খুব প্রিয় কিছু লাইন - 'নাগালহীন হাওড়ে তবু কিছু পোড়া পাখি জেনে যায় / ভালো থাকা সেতো- / ডানার নিচে ঠোঁট গুজে এক পায়ে ডাহুক দুপুর'(এক পায়ে ডাহুক দুপুর-সুমন প্রবাহন)। কবিতায় লিখেছিল এমন সব - সরল জীবনের মাদকতা। শেষ পর্যন্ত দেখে যাবার একটা লোভ ওর ছিল। তাইতো দীর্ঘ বিরতিপর এই বইমেলার আগে চেষ্টা করেছিল পান্ডুলিপিটাকে ছাপার রূপ দেবার। হঠাৎ ওর লেখা দেখা গেল কোন এক দৈনিকের সাময়িকীতে। চেষ্টা করেছিল জীবনকে আর একবার গুছিয়ে নেবার, অন্তত একজন কবির মত করে কিংবা লেখকের, একজন বোধ সম্পন্ন মানুষের। সুমনের রেখে যাওয়া 'পতন ও প্রার্থনা' পান্ডুলিপির নাম কবিতা 'পতন ও প্রার্থনা ১ ও ২' এর ঠিক আগের প্রস্তুতিমূলক কবিতা 'হার্ড টক' এ দেখি কনফেশনের দায় ও পূর্ববর্তী সমষ্টিগত কবি জীবনের মূল্যায়ন। ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়া কিন্তু হতাশা নয়। ও লেখে 'মুক্ত থাকতে যেয়ে আজ বন্দি/.. নেত্রের লেখক...[কালনেত্র] /কুমার নদী ! [ফরিদপুর] তোমার সাথে দেখা হল না /. . . কেমন আছে অম্বিকাপুর [ফরিদপুর]/ আমি তার মানবিক সাহায্যপুষ্ট/. . . কীর্তনখোলা [বরিশাল] নদীতে/ আমাদের স্নান/ - বৃথা নয়।/. . .এখনও রোডে গল্প চলে/ আমি অনুপসি'ত/. . .আমি তোমাদের জানাতে চেয়েছিলাম / সহজ সৌন্দর্যের ঐশ্বরিক গুন/. . .বুকটানে আমাদের [ছোট কাগজ বুকটান, কফিল আহমেদের গানের অ্যালবাম] / যৌথতা কী করে অস্বীকার করি। / কী করে অস্বীকার করি / আমার পতন / যত প্রার্থনা ।”

আসলে খুব বেশী কিছু নয়। ও চেয়ে ছিল সহজ সৌন্দর্যের ঐশ্বরিকতা . . .আপন কবিতার খাতা কিন্তু আমাদের ব্যর্থতা, আমাদের ব্যস্ততা . . . আমরা ওকে দিতে পারিনি কিছুই। এমনকি সাত দিনে একটা ঘন্টা, এক মাসে একটা দিন কিংবা ছ'মাসে একটা মিনিট ! ও লিখেছিল 'বন্ধু তুমি পৌছুলে কী / জানার অপেক্ষায় আমি / আজও আজও হিসেব রাখিনি দিন' (সাপ দুপুরে ডুমনি-সুমন প্রবাহন)। কিন্তু আমার বেঁচে গেছি জীবনের তরে কেননা 'একজন বেঙারিং যুবক হারিয়ে পালিয়েছে' (নিঁেখাজ বিজ্ঞপ্তি-সুমন প্রবাহন)।

কবিতা সূত্র: লাস্ট বেঞ্চ, মে ২০০১(ছোট কাগজ)। ভূমিজ, সেপ্টেম্বর ২০০৩ (ছোট কাগজ)। পতন ও প্রার্থনা (কাব্যগ্রন্থ)- সুমন প্রবাহন।
বি:দ্র: কবি অভিক সোবহানের দেয়া ফেইসবুকের পোস্ট থেকে তুলে দেয়া হল- সুমন প্রবাহন স্মরণ প্রয়াস।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28968623 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28968623 2009-06-23 22:47:51
গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ (কাব্যগ্রন্থ:পতন ও প্রার্থনা ) সুমন প্রবাহন

কারাগারে আমি
তবু গৃহমায়া ফেলে
যতটা সম্ভব আমি দেখে নিয়েছি
তোমাকে বাংলাদেশ
যেন পথে পথে বিভ্রান্ত তুমি

তোমার আছে অভিন্ন গ্রাম
নদী শহর বন্দর
তবু তোমার চিন্তার উৎসে
সে কোন ভাটা
যারই উজানে উজানে
তুমি এমন বিভ্রান্ত

গণতন্ত্র তুমি আমার
কাছে আর
জনগণের মুখচ্ছবি নও
তুমি গুটিকয় মানুষের আঙ্গুলের ইশারা
তুমি ওঠো বসো
নির্দেশে নির্দেশে
আমি এখনও তোমার
ভূগোল পাশে শিশু ছাত্র

যদি না নদী পায় অব্যাহতি
যদি স্রোতের প্রবাহে
ভরে না ওঠে
তোমার শস্যমাঠ
তবে বৃথাই আমার কবিজন্ম
বৃথা আমার যাবতীয় পাঠ
যদি না পৃথিবীর শীর্ষে
আমি না আঁকি তোমার
মানচিত্র
তবে আমার মানুষের যাবতীয়
যন্ত্রণা প্রবাহ
মিথ্যাই
মিথ্যা আমার শিল্প সংকল্প
তুমি আবার আমাকে
উজাড় করো
তোমার মাঠে মাঠে
তোমার ফসলের কান্তিতে
আমার জঠরের যাবতীয় ক্ষুধা
তোমাকে দু'চোখে পান করবো
এই বিভূতিতে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28957424 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28957424 2009-05-29 15:22:19
আজ মুয়ীয মাহফুজের কাব্যগ্রন্থ "হুইসেল বাজছে চোর পালাচ্ছে" এর প্রকাশনা

এ বইটি মুয়ীয মাহফুজের প্রথম কাব্যগ্রন্থ।

প্রচ্ছদ করেছেন:শিল্পী শাওন আকন্দ
প্রকাশ করেছে:সুমন প্রবাহন স্মরণ প্রয়াস
পাওয়া যাবে:বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে, "কালনেত্র" স্টলে।
মূল্য:৭৫ টাকা

ফ্ল্যাপ:

বিষের থালায় ভাসমান মাছির ঘূর্ণনের ছন্দে প্রেয়সীর চোখে ডুবতে থাকে বাকাচাঁদ।তবুও এই দ্বিধার মাছিটিই যেন আমাদের অবচৈতন্যের সেই সামগ্রিকতার আহবান!পদ্মপুকুরের স্বচ্ছ জলে ভেসে থাকে মূলতঃ নিজেরই অবিকল রুপ,তাই অঙ্কনশৈলী,রঙের ব্যাবহার কিংবা পার্সপেক্টিভস-এ জল নিখুঁত শিল্পী হলেও সে পোর্ট্রেট যে আতœপ্রেমের ফাঁদ!তাই বাধ্য হয়েই ফিরে আসা-নিজের ডাকে নিজেরই সাড়া দেয়া।
অগ্নিপূজারী কবির আরাধ্য আগুনের শীতলতা স্বয়ং অগ্নিদেবকেও জমাট বরফে পরিণত করে।আগ্নেয়গিরির বৃত্তাকার জ্বালামুখ ধরে অসীম বছর ধরে হেঁটে চলে কবি-সংগে রয়ে যায় দ্রুতগতি,ধীরগতি এবং মনুষ্যরুপের কিংবদন্তী।মাঝ বরাবর ভেঙে যাওয়া আয়নার কাছ থেকে শোনা যায় যে সব আগামীকালে রুপকথা-তা কি কবিতা নাকি নৈঃশব্দ্যের আবছায়া?
চিন্তার সঙ্গে মনোদৈহিক সম্পর্ক রয়েছে বলেই হাজার হাজার মাইল দূরের সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাওয়া -পত্রপতনের শব্দে ও নৈঃশব্দে উচ্চারণগুলো চিৎকার হয়ে ওঠে-আর এই চীৎকার,যা কিনা আপাত অর্থহীন-তা-ই হয়ে ওঠে জীবনের প্রিয় উপাখ্যান।মনুষ্যসঙ্গ বা নিঃসঙ্গতা উভয়ই হয়ে ওঠে নেশার উপাত্ত!
প্রগতির অতি বিচ্ছিন্ন সুরে গভীরভাবে কান পেতে কবি শুনতে পায় কৃপাহত্যার ডাক শুনতে পায়,সেইখানে সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত থাকে সপ্তম সুরে বেজে চলা অজস্র চীৎকার ভরা দাবীসমূহ।গর্তে উঁকি দিয়ে তলদেশে তলানী সদৃশ জল দেখে হাসি পায় তার।সকলেই যখন জলকে নিজস্ব সম্পদজ্ঞানে আড়াল করে রাখে তার বিপরীতে কবি তখন সাগরকে খরাক্রান্ত গ্রামের পথ দেখিয়ে দেয়।
শ্রেণীচ্যুতির প্রাক্কালে কোন চামড়াটি সংরক্ষন প্রয়োজন?নতুনটি,নাকি পুরাতন?দু'টি পোশাকই যখন একটি যুদ্ধের শিবির নির্ধারণী ইউনিফর্ম হয়ে ওঠে। দু'টিই যখন ব্যাক্তি বিরুদ্ধে,তখন কবির সেইসব ক্যামোফ্লেজের প্রয়োজন হারায়।তখন কবি ও একটি শ্রমিক পিপড়ার ক্লান্তির ভঙ্গিতে কোনো পার্থক্য থাকেনা।এমনকি কবি বিভেদ হারায় তার জৈবরুপের,দ্বৈতসত্তার।শাহরিক নারী হয়ে কবি কৃষকের হাত ধরে সবুজ সমুদ্রে ভেসে ভেসে পৌছে যায় কৃষক ময়ুরের দেশে!
আবার শয়নভংগির অনাচারে যখন সবুজ ঘাস হয়ে ওঠে হলুদাভ,সামাজিক গান কন্ঠস্থ হলেও যখন প্রাণে বাজে না নতুন কোনো সুর- ঠিক তখনই অপরকে বিষপানে প্রলুব্ধ করে তার তার তিক্ত বিষের পেয়ালায় চিনি গুলতে গুলতে জানতে চাওয়া হলো সুইসাইডের পর তার কবিতাগুলোর কি হবে-পিঁপড়ে হয়ে সেই অক্ষরগুলো অনির্দিস্ট কোনো গন্তব্যে পৌছে যাবে এ নিশ্চয়তা নিয়ে ধ্রুপদী আত্নার প্রস্থান ঘটে।

এক ও দশের নিশ্চল দশার সময়ে কে কার কৃপাহত্যা করবে এইসব ফ্যালাসী তাড়িয়ে কবি মুয়ীয মাহফুজের কৃপাহত্যার সহযোগী হই,পলায়নপর চোরের পেছনে বেজে চলা হুইসেলের ধ্বনি আপনিও কি শুনতে পাচ্ছেন না?

(অভিজিৎ দাস)

আজ মংগলবার,১০ ফেব্রুয়ারী বিকেল ৪:৩০ মিনিটে চারুকলার শুকনো পুকুরে(ড্রাই পন্ডে) ঢা: বি ,কবি মুয়ীয মাহফুজের কাব্যগ্রন্থ "হুইসেল বাজছে চোর পালাচ্ছে" এর প্রকাশনা হবে
সামান্য গান বাজনা হবে।
আপনারা সকলে সময় সুযোগ থাকলে অবশ্যই চলে আসবেন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28909140 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28909140 2009-02-10 12:06:40
আজ ছিলো সুমনের ৩৩ তম জন্মদিন সুমনের এই জন্মদিনে ওকে দেয়ার মতো আমাদের কি-ই বা আছে।ওর একটা কবিতার শিরোনাম ছিলো "কেউ নই শুন্য মাতাল"।তাই আমারা,শুন্যতার মদে বিমোহিত মাতাল বন্ধুরা সুমনকে উৎসর্গ করে একটি কবিতাপত্র প্রকাশ করলাম আজ।

পত্রিকার নাম রাখা হয়েছে "শুন্যমাতাল"
প্রকাশ করেছে সুমন প্রবাহন স্মরন প্রয়াস।
এ সংখ্যায় লিখেছেন:
সুমন প্রবাহনের দু'টি অপ্রকাশিত লেখা।
সাইদ র'মান
লুবনা চর্যা
মুয়ীয মাহফুজ
তুহিন দাস
নৃপ অনুপ
প্রবর রিপন
বিবৃতি তানভীর
সাইদ জুবেরী
অভিজিৎ দাস
ওয়াসিমুল বারী

এছাড়া সুমনের একটি অপ্রেরিত চিঠিও মুদ্রিত হয়েছে।
মূল্যঃ১০ টাকা।
প্রচ্ছদ ও নামাংকণঃসাইদ র'মান।
এ সংখ্যার সম্পাদকঃঅভিজিৎ দাস
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28867883 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28867883 2008-11-11 23:39:18
দৈনিক জনকন্ঠে পতন ও র্প্রাথনা নিয়ে মামুন রশীদ-এর একটি আলোচনা সময়ের চেয়ে এগিয়ে 'পতন ও প্রার্থনার' ভাষা

একবার কাছাকাছি দাড়াঁতে পারলে/ আর দূরত্বের ভয় থাকতো না। সুমন প্রবাহনের এই কবিতার মতোই পাঠকের কাছাকাছি দাঁড়ানোর আকুলতা সব কবিরই। তবে তা সবার কপালে জোটে কী-না, এ নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে। পাঠককে নিজের অন্তর্বেদনা অন্তগর্ত বোধ অনূভূতি জানানোর তাগিদ থেকেই শিল্পকর্ম সৃষ্টির প্রয়াস। নিজেকে ব্যক্ত করার তাগিদ থেকে নিজের কথাকে অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার লক্ষ্য নিয়েই শিল্পকর্ম। তবে সবার লক্ষ্য যেমন এক নয় তেমনি সবার জানানোর মাধ্যমও এক নয়। আর ভিন্নতা নিয়েই শিল্পকর্মের ভূবন। এ ভূবনেরই বাসিন্দা কবি সুমন প্রবাহন। যদিও শরীরী অবস্থান তথা পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন তিনি স্বেচ্ছায়। পৃথিবীতে স্বল্পকালীন সময় অবস্থান করে তিনি জীবনের যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, জীবনের জটিলতা মানবীয় ইতিহাসের যে বৈচিত্র্যময়তা খুঁজে পেয়েছেন আর সেগুলোর বহির্প্রকাশ যেভাবে কবিতায় তুলে এনেছেন তাতে করে তাঁকে কবি বলতে দ্বিধা থাকবে না কারও। তাঁর কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে নিজের ভেতরের এককিত্ব সমাজের চলমানতা ফুটিয়ে তুলেছেন অসম্ভব শৈল্পিক মমতায়।সর্বমোট ৬৪ টি কবিতায় সাজানো সুমন প্রবাহনের প্রথম এবং শেষ কাব্যগ্রন্থ নতুন কোন কবিতা। আর আলোর মুখ দেখবে না। লেখার টেবিলের কাগজ কলম নতুন কোন কবিতা রচনায় কাব্যর যন্ত্রনাকাতরতা অথবা পরিতৃপ্তির ভাষা পড়তে পারবে না। সুমনের প্রতিটি কবিতায় ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর একাকিত্ব। নিজের ভেতরে ক্রমশ একা হয়ে যাওয়া অন্য এক সুমন প্রবাহন। তাই তাঁর কবিতায় বারে বারে ফিরে এসেছে অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধাচরণ, মৃত্যু চেতনা, নগর জীবনের অসংলগ্ন, ব্যক্তি মানুষের অভিঘাত এসব কিছুই তাঁর কবিতায় মূর্ত হয়ে ওঠে একজন শক্তিমান কাব্যর মতো। তাই কবি বলে ওঠেন, ‘যে আমার রোদ বিকেলের/শান্তি কেড়ে নেয়/ যে আমার বিচ্ছিন্ন করে/ ভাই থেকে বোন থেকে/ এমনকি পিতা / দোযখের কসম/ আমার কিরিচে অগ্নিময়/ হবে কিছু মানুষের লাশ/ আর আমি হাসতে হাসতে/ পৃথিবীর/ কাছে নিজেকে/ খুনি প্রমাণ করে/ বলবো গুডবাই পৃথিবী।’ (চলে যাবো দূর বলয়ে)। সুমন প্রবাহনের কাব্যতায় এই অন্তরঙ্গতা তাঁর এই জ্বলে ওঠার প্রয়াস হতাশা ক্রমশ একা হয়ে যাওয়াই কি তবে তাঁকে আত্মহননের দিকে ঠেলে দিয়েছিল? তবে যে হতাশ বোধ রাজনীতি ও সমাজ সচেতনা সুমন প্রবাহনকে বিচ্ছিন্ন করেছে সেই সব অনুষঙ্গই তাঁকে তাঁর সময় থেকে এগিয়ে দিয়েছে। শূন্য দশকের কবিতার যে ভাষা বিষয় ও বক্তব্য তাঁর থেকে অনেকটাই এগিয়ে সুমন। তাই শুধু কল্পনার রঙিন পাখা নয় বাস্তবতার জমিনে নেমে এসে বলতে পারেন, জেরুজালেমে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে/ পৃথিবিতে শান্তি ফিরবে কিনা/ এ নিয়ে আমি কোন কর্তকে যাবো না/ শুধু জানি/ জেরুজালেমে ইতিহাস চিরকালে অশান্ত/ যেন চিরকাল কান্না/ সেই ঢেউ পৌছে যায় পৃথিবির কানায় কানায়...।(ইমাম)। সুমন প্রবাহনের কাব্যভাষা কাব্যবোধই তাকেঁ এগিয়ে দিয়েছে সময়ের থেকে। তাই শূন্য দশকের কবি হয়েও সুমন পাঠক বিচ্ছিন্ন নন পাঠককে কাছে টানার মন্ত্র শিখিয়ে দিলেন তাঁর সাথীদের। এই অগ্রগামিতাই সুমন প্রবাহনকে পাঠাকপ্রিয় করে তুলবে এই আশা।
পতন ও প্রার্থনা: সুমন প্রবাহন, প্রকাশক : সুমন প্রবাহন স্মরণ প্রয়াস, প্রকাশকাল: জুন ২০০৮, প্রচ্ছদ: সুমন প্রবাহনের ড্রইং অবলম্বনে, মূল্য: ১০০ টাকা।
মামুন রশীদ

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28865750 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28865750 2008-11-07 00:30:55
সুমন প্রবাহনের কাব্যগ্রন্থ 'পতন ও প্রার্থনা' নিয়ে 'সমকাল'এ বিজয় আহমেদের একটি আলোচনা click it


বইয়ের আলোচনাটি সকলের সুবিধার্থে নীচে দেয়া হলো।

সুমন প্রবাহনের কবিতা-

ক'দিন দেখা হয়নি অথচ যেন বহুকাল...
বিকেল বারান্দায় বসে ভাবছি তোমার কথা
সামনের লেকের সিথানে পাশাপাশি দুটি তালগাছ
দাঁড়িয়ে আছে
তাদের ছায়া জড়িয়ে আছে গোধুলি আলোর জলে
ভাবছি,
কেন যে গাছজন্ম হলো না
একবার কাছাকাছি দাঁড়াতে পারলে
আর দূরত্বের ভয় থাকত না।
[বন্ধুত্ব ও দূরত্ব; পতন ও প্রার্থনা]

কবিতাটি অকাল প্রয়াত কবি সুমন প্রবাহনের। আর সুমন প্রবাহন কে? সুমন কেউ নন। একজন কবি। শূন্য দশকের একদম শুরুতেই লেখা শুরু করেছিলেন। তার কবিতা ছাপা হতো 'কালনেত্র' অথবা 'লাস্টবেঞ্চ' নামক ছোট কাগজে। আমরা কয়েকজন, মানে আমি ও রুদ্র আরিফ, যখন প্রথম যাই আজিজ মার্কেটে, ততদিনে সুমন প্রবাহনরা আজিজ মার্কেটে নিয়মিত যান। সুমনকে সবচেয়ে বেশি দেখলাম 'বুকটান' প্রকাশের আগে থেকে। প্রায় বিকেল অথবা রাতেই দেখতাম টি-শার্টের ওপরে বোতাম না লাগানো শার্ট পরে, কিছুটা বোহেমিয়ান আরো কিছুটা রাগী ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছেন কফিল আহমেদের সঙ্গে।
তারপর 'বুকটান' প্রকাশিত হলো। আমরা শামিমুল হক শামীম ভাইয়ের 'লোক'-এ বসে দেখলামও সেই সংখ্যাটা। প্রচ্ছদটা সুন্দর। লেখাগুলোও চমৎকার। আর ছিল কফিল আহমেদের একটা সাক্ষাৎকার এবং অনেক গান। আর সম্পাদকের দায়িত্বে থাকায় এমন ভালো একটা লিটল ম্যাগাজিনের জন্য প্রশংসার প্রাপ্যই ছিলেন সুমন।
'বুকটান' প্রকাশিত হওয়ার পর অনেকদিন দেখিনি সুমনকে। দেখিনি বলছি কারণ সুমনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল মাত্র একবার; কিন্তু কথা হয়নি কখনো! তারপর আমি, রুদ্র আরিফ, মামুন খান অথবা ফেরদৗস মাহমুদ যখন তিন-চার-পাঁচ বছর হেঁটে হেঁটে পার করে দিলাম আজিজ মার্কেটের বারান্দায়; ততদিনে সুমন প্রবাহন, সেই টি-শার্টের ওপারে বোতাম খোলা শার্টের কবি, একদম অনুপস্থিত। কবিতাও দেখিনি কোনো লিটলম্যাগে। ফলে জানতে ইচ্ছে হতো, কোথায় আছেন সুমন প্রবাহন এবং তার বন্ধুরা। যাদের কাছে খোঁজ নিতাম, কেউই খোঁজ দিতে পারেনি।
তারপর হঠাৎই একদিন বলা নেই, কওয়া নেই শুনলাম সুমন প্রবাহন চলে গেছেন, কেবলই স্মৃতি-কাতরতার এক চির অচিন দেশে। যে দেশকে বলি নির্জন। কেবলই লেবুপাতার সুঘ্রাণময় আর অনুভূতিশীল। ভাবি, তাই সুমন নিজেই বেছে নিলেন এমনতর স্মৃতিকাতর এক দেশ, তাই ভালোই আছেন সেখানে। আবার যেহেতু মায়ের পাশেই তার থাকার ঘর, সেহেতু ভাবি খারাপইবা থাকবেন কেন? এমন ভাবতে ভাবতেই পড়ি মুয়ীয-প্রবরসহ তার শোকাহত বন্ধুদের আকুতি। তখন নিজেরও কেমন জানি হু-হু দীর্ঘশ্বাসে পেয়ে বসে! কেমন মন খারাপ করা একটা অনুভূতি। চারদিকে উড়ে বেড়ায়। ভাবি, আজকে সুমনের অনেক বন্ধুই ছবি আঁকে। গান গায়। কেউ নাটক বানিয়ে বিখ্যাত। কেউবা সিনেমা বানাবে বলে ছক কষছে। ভাবি, এসব করার কথা তো সুমনেরও ছিল। তখন খুব রাগ হয়। ভাবি, কেন এভাবে চলে যাওয়া। চলে যাওয়াটাই যেহেতু এক প্রকার জুয়া খেলা, সেহেতু বেঁচে থেকে যদি জীবনের সঙ্গেই জুয়া খেলতেন সুমন! তাহলে কেমন হতো? আর কিছু না হোক, হয় হেরে যেতেন। নতুবা জিতে যেতেন। তাও তো আমাদের জানার সম্ভাবনাটুকু ছিল, যে আপনি জিতে গেছেন অথবা হেরে গেছেন। অথচ আপনি করলেন কী, এমন এক দেশে চলে গেলেন, যেখানকার জুয়ার আসরগুলো অনেক দীর্ঘ, অনেক রাত্রিজুড়ে চলতেই থাকে, সেসব জুয়াড়ির আড্ডা, যার খবর আমাদের এ পৃথিবীতে পৌঁছাতেই পারে না। ঠিক এ জায়গাতেই আফসোস। এ জায়গাতেই বিনম্র মন খারাপের সূচনা।

ওপরের কথাগুলো মনে পড়ল সুমন, আপনার কাব্যগ্রন্থ 'পতন ও প্রার্থনা' দেখার পর। মাসুদ ভাই বইটা দেওয়ার পর থেকে অনেকবার আমি বইটার প্রচ্ছদ দেখেছি। যতবার প্রচ্ছদটা দেখেছি, ততবার আনমনা হয়েছি, একটু একটু করে হলেও। আর যখন পড়লাম প্রচ্ছদের স্কেচগুলো, সুমন আপনারই আঁকা, তখন মনটা খারাপ হলো আরো বেশি।
সুমন, আপনি লিখেছেন,
কুয়াশা যাপিত জ্যোৎস্নায়
সবুজের অন্ধকার পাহারা দু'পাশে
সাথে বাঁকে বাঁকে বাতাসের আপ্যায়ন
মাঝখানে আমি পথ, পথে-
নিকোটিন আহ্বানে সিগারেট নিই
বারবার জ্বালাতে নিয়েও জ্বলছে না
ভাবছি,
দিয়াশলাইয়ের প্রথম কাঠিতে আগুন জ্বলে ক'জনার!
(আগুন ভাগ্য)
প্রথম দাবিতে আগুন জ্বালানো ভাগ্যবানদের তালিকায় আর কে কে আছেন, তা হয়তো জানি না? কিন্তু এটা জানি, সেসব ভাগ্যবানের মতো আপনি একজন। আপনার কাব্যগ্রন্থটি হাতে পাওয়ার পর তাই মনে হলো। যখন দেখলাম বইটির প্রকাশক হিসেবে লেখা আছে 'সুমন প্রবাহন স্মরণ প্রয়াস'। তার মানে বইটা বন্ধু-বান্ধবরাই করেছে, তাই না? এতটুকু ভাবার পর, আরো একটা কথা মনে এলো, বন্ধু-বান্ধবরাইবা এত গুছিয়ে কেন আপনার বইটা করবে সুমন? বলেন তো দেখি? যাই হোক, নিশ্চয়ই আপনার প্রতিটা বন্ধুর অশেষ স্মৃতি রয়েছে আপনাকে ঘিরে। একসঙ্গে অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়ারও প্রতিশ্রুতিও হয়তো ছিল, কারো সঙ্গে? তাই না? এই যে স্মৃতি, এই যে প্রতিশ্রুতিগুলো, যা বহন করছে আপনার বন্ধুরা, এ বইটাও আসলে সেসব স্মৃতি, প্রতিশ্রুতি, আবেগ, কান্না ও প্রেমের প্রামাণ্য সংকলন।
মানে জাগতিকভাবে আপনার শরীরটা হয়তো আপনার কোনো একজন বন্ধু অথবা একজন পাঠককে ফাঁকি দিতে পারবে, কিন্তু আপনার মেধা, মনন ও কবিতা, কোনোদিন কি পারবে আর এড়াতে কাউকে? পারবে না! কারণ 'পতন ও প্রার্থনা' মানেই আপনি। আর সুমন প্রবাহন মানেই 'পতন ও প্রার্থনা'। আর ঠিক এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আপনিও যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন সুমন প্রবাহন।
এই এক নিয়তিতাড়িত জীবন আমাদের। আমরা যা চাই, তা মোটেও পাই না। আপনি অন্ধকারকে নিজের বউ ভেবেছিলেন। আরো ভেবেছিলেন, কোনো এক পাখির কান্না ঠিকই আপনার জীবন হয়ে ঝরে যাবে। আর এসব ভেবে একদিন খুব করে লুকাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লুকিয়ে গিয়ে, দূরের কোনো চায়ের দোকানে বসে, বন্ধুদের দিকে মুচকি হাসি ছুড়ে দেওয়ার যে খেলাটা আপনি খেললেন, সেখানেও তো ধরা খেয়ে গেলেন সুমন? পারলেন কই হারাতে। বন্ধুরা তো ধরে-বেঁধে ঠিকই এই শহরেই ফিরিয়ে আনল 'পতন ও প্রার্থনা'য়।

একজন কবির অথবা লেখকের পরিণত লেখাগুলোর জন্য কতদিন বেঁচে থাকা উচিত? ধরি যে কমসে কম হলেও ২০ কি ২৫ বছর? তাই না? একজন কবি অথবা লেখকের এই সময়টুকু লাগেই। নিজের জন্যই। নিজেকে পাওয়ার জন্যই। অনুশীলনে অনুশীলনে নিজেকে পাকিয়ে, নিজের আসলটুকু তুলে আনার জন্য। অথচ কেউ যদি এ সময়টুকু না পায়? তাহলে?
তাহলে আর যাই হোক, আমরা কবির জীবিতকালের সেই ক্ষুদ্র সময়টুকুতেই হাত চালাব।'পতন ও প্রার্থনা' কবি সুমন প্রবাহনের সেই ক্ষুদ্র কবি জীবনেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কখনো কবি ছোট ছোট বাক্যেই বলার চেষ্টা করেছেন। নিজের অনুভূতিকে প্রকাশের তাড়নায় সবসময় কবির কণ্ঠ, কী আশ্চর্যরকম নমিত, ভাবি আর অবাক হই। সুমন যেন নিজের কথাগুলো বলতে চাইতেন নির্জনেই, নীরবেই। আর এই নীরবতার কারণেই বোধহয় তিনি বলেছিলেন, 'বুঝি কাকও অনুভব করে আমাকে?' আর এই অনুভূতিশীল নির্জনতাই কি এভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিল, নিজেকে শেষ করে ফেলার শক্তি অর্জনে।

একটা কবিতা কবি উৎসর্গ করেছেন, এভাবে, মিরাজ, তসলিম, ভালোবাসায় [১২ অগ্রহায়ণ : ১৪১২] এবং 'ইমাম' নামের কবিতাটা উৎসর্গ করেছেন অনেকটা এভাবে, 'মাঝি, ইবন, রিপন, মুয়ীয, অভিজিৎ, আমি এখনো বেঁচে আছি'। 'ইমাম' নামের কবিতাটা এভাবে উৎসর্গ করার মানেটা কী? ভাবি? ভেবে অবাক হই? কেনইবা এই কথা, আমি বেঁচে আছি এখনো? কেনইবা এত সংশয়ে ছিলেন সুমন? এক টাকার নিজের কবিতাটাকেই অস্ত্র হিসেবে কেন তুলে ধরলেন না আপনি?

তবে সুমন আপনার যা যা হওয়ার কথা ছিল, আর যা যা হওয়া হয়নি আপনার, এ রকম সব অপূর্ণতা ভোগাবে আমাদেরও। আর অজস্র শ্রদ্ধা সুমন প্রবাহন আপনার প্রতি। আপনার কবিতার প্রতি। আপনার একান্ত নৈসঙ্গের প্রতি!
বিজয় আহমেদ
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28862936 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28862936 2008-11-01 12:12:41
আওয়াজ (কাব্যগ্রন্থ : পতন ও প্রার্থনা ) সুমন প্রবাহন

উপুড় হয়ে কান পাতি পেতে রাখি
পৃথিবী গোলকে
মাটির পাঁজর চিরে ভেসে আসে ওঁম
ওঁম ফেটে বেরিয়ে পড়ে শিবের গোঙানি।
কে তুমি ধ্বংস সাজাও
কে তুমি মিথ্যে প্রহসনে!

শিকারি কার্তুজে ডাল থেকে খসে পড়ে
হলুদ পাখির আত্মা
বুঝি আত্মার বেদনা ভর করে।
উপত্যকা ঘিরে নামে মৃত্যুঢোঁড়া সাপ
কাফন ডানার চাদর মেলে দেয় প্রেতের শাসন
দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে গুটিকয় রক্তচোষা বাদুর ভাম
ঝকমারি আলোর অশ্লীলতায়
চোখ ফেটে রক্ত বইতে থাকে
কে?
কেউ নও কারো নই!
নিজের ঘরে নিজেই কবর খুঁড়ি
শুয়ে পড়ি কবরের হা-এ
আমায় ঘিরে উৎসব নাচায় মৃত কংকালেরা
চোখে চোখ রেখে, পায়ে আমিও নাচি
আর হঠাৎ বেরিয়ে পড়ি কবর ফেটে
দেখো নখ গজিয়েছে, দেখো দাঁত
কানামাছি ভোঁ ভোঁ যাতে পাবি তাকে ছোঁ
যে আমাকে ছোঁয় তাকে মৃত্যু ছোঁবে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28847278 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28847278 2008-09-24 10:03:47
কেউ নই শূণ্য মাতাল (কাব্যগ্রন্থ : পতন ও প্রার্থনা ) সুমন প্রবাহন

প্রশ্নহীন আমি, পকেটে অসংখ্য ছায়াপথ
চোখে চাঁদের আকাশ, পায়ে তপ্ত কাঁচের কণা, ধূলিস্তর
এখানে ডানা মেলেছে উঁচু-নিচু বধির প্রান্তর
এখানে ছিঁড়ে গেছে বাতাসের কণ্ঠনালী
দূরে শিলাকঠিন পাহাড়
শুকনো সাগর
অনাহারী ঝর্ণা।

কলঙ্ক! তবু রাজটীকা

ঐ যে পৃথিবী নীল গ্রহ আমার
সূর্য! দেখি তোমাকেও
কখনও কন্যা রাশিতে কখনও তুলা, বৃষ-মেষ-বৃশ্চিকে
দেখি গ্রহনের অক্টোপাসে, তবু
প্রশ্নহীন পকেটে অসংখ্য ছায়াপথ

ভেসে যাই ছুটে ছুটে
যেন ধূমকেতু-আন্তঃনাক্ষত্রিক।
ক্রমপ্রসারমান ছায়াপথ থেকে
ছায়াপথে। বেড়াই। সাদা কিংবা কালো-
গুহাগহ্বরে,

সে আমার পর্যটন নয়, ধ্যান।
সাদাপাত্রে ধরা আত্মা আমার যেন সবুজ আপেল
ঝলসানো ব্লেডে কেটে দু'ভাগ
দ্বিধা থরোথরো, ভিতরে তবুও
হাজার বছর লাঠিতে ভর সলোমন
কমলা পিরাণে প্রাচীন গাছের নীচে মুদ্রিত চোখে-
বিলীন হয়েছে, হবে
জন্মের পর নিরানব্বই ভাগ বীজ
টিকে আছে তার ওপারের একজন।

ভাবি, শূণ্য হয়ে এক থেকে আজ অই সাত-
খণ্ড।
নিজেরই তৈরি যে নরক-ক্লোন, গ্যাসচেম্বার
হাইরাইজ কুঠুরিতে ফেরো
-ক্লান্ত ফাইল তুমি
তোমার গ্রাউন্ড ফ্লোরের নীচে খুঁজে পাই
ডাইনোসরের পা-পায়ের ছাপ
নিঃশ্বাস
শিৎকার
শিলাস্তরে কেঁপে ওঠা রণের দামামা।

রেডিওর দ্যুতি ছড়াতে ছড়াতে
এই যে ছুটছি, ছুটে যাচ্ছি আলোর গতিতে গোপন কোয়াসার।
আমাকে পাওনি-পেয়েছে নূরের কণা
অথচ এত অহং দাবানল!
পুড়ে যাচ্ছে মাইল মাইল জনমনভূমি
ধ্বসে যাচ্ছে পাহাড়, জনপদ

কোন খোঁজ ব্যর্থ নয়
চোখে রেখো অই ভস্ম
হে বোধি, বৃক্ষ আমার!
হে প্রকৃত রণ!
ফিরে আসবো সংকোচনে
পাটি গোটাতে গোটাতে ছায়াপথে পথে কালোগহ্বর নিয়ে হাতে
ঘূর্ণিপাকে উড়ে উড়ে যাবে বইয়ের খইয়ের পাতা।
তৈরি থেকো শেষ বারুদ-কাঠি
তৈরি থেকো হে বিরাট ধ্বস!

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28843869 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28843869 2008-09-16 10:58:08
বন্ধুত্ব ও দূরত্ব (কাব্যগ্রন্থ: পতন ও প্রার্থনা) সুমন প্রবাহন

ক'দিন দেখা হয়নি অথচ যেন বহুকাল...
বিকেল বারান্দায় বসে ভাবছি তোমার কথা
সামনের লেকের সিথানে পাশাপাশি দু'টি তালগাছ
দাঁড়িয়ে আছে
তাদের ছায়া জড়িয়ে আছে গোধূলি আলোর জলে
ভাবছি-
কেন যে গাছজন্ম হল না
একবার কাছাকাছি দাঁড়াতে পারলে
আর দূরত্বের ভয় থাকতো না।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28843046 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28843046 2008-09-14 14:41:24
একা(কাব্যগ্রন্থ: পতন ও প্রার্থনা) সুমন প্রবাহন

একাকীত্ব বোধ তৈরির অনেক আগে থেকেই
আমি একা
একা দিঘী একা ঘাট
একা নদী একা পথ।
একা রাতে একা পথে
একা এক একা রথে
পৌঁছে যাই ঈশ্বরের গৃহে
আর কথায় কথায় জেনে যাই
ঈশ্বরের অসীম একাকীত্বও
আমার একাকীত্বের কাছে একা।



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28841757 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28841757 2008-09-11 20:26:34
একা(কাব্যগ্রন্থ: পতন ও প্রার্থনা) সুমন প্রবাহন

একাকীত্ব বোধ তৈরির অনেক আগে থেকেই
আমি একা
একা দিঘী একা ঘাট
একা নদী একা পথ।
একা রাতে একা পথে
একা এক একা রথে
পৌঁছে যাই ঈশ্বরের গৃহে
আর কথায় কথায় জেনে যাই
ঈশ্বরের অসীম একাকীত্বও
আমার একাকীত্বের কাছে একা।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28841708 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28841708 2008-09-11 18:50:33
অলৌকিক বোধে বধির(কাব্যগ্রন্থ: পতন ও প্রার্থনা) সুমন প্রবাহন


স্থবির হয়ে আছি আশ্চর্য জহুরী
অলৌকিক বোধে বধির
স্থির বৃত্তাকার আলো যে বোধবুদ্ধির অগম্য।
কেউ নেই একা একক মহাবিশ্বে
আপন গ্যালাক্সির অখ্যাত পাড়ায়।
এমন ভিখারী অর্থ করে না ধনী
বুদ্ধির বাঁকা হাটে হৃদয়ে ধারালো মন্দা
আর এমন ভাটিতে
শুকিয়ে যায় এমনকি নালা-ডোবা।

কেঁচো খুঁড়তে সাপ-এমন লোকসত্যে
যেন দুমড়ানো ঝোড়ো টিন।
তবু শিশু হাসতে খেলতে মুঠোয় নিতে জানে সাপের ফণা।
কোন মন্ত্র নেই, ওষুধ নেই, নেই কোন যাদু
কয়েক টুকরো আগুন কেমন নাচায় দেখো
গোটা কবরের সবুজ গোলক।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28839870 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28839870 2008-09-07 11:24:43
সময়ের পেণ্ডুলাম সাঈদ জুবেরী(মাঠশালা)

"আমি হাঙ্গরের পাকস্থলী থেকে
ডাকছি তোমাদের।"

ইউনুস নবীর জন্য ছিলো অলৌকিক উদ্ধারের পয়গাম। আর আমাদের সুমন প্রবাহন যখন কালের নিয়তি বুঝে উঠে আমাদের ডাক পাঠায় তখন আমরা আশ্চর্য বধিরতায় নিমগ্ন থেকে হারিয়ে ফেলি সকল প্রতিশ্রুতি।

সৃজন মাতাল মানুষের জন্য। সৃজন ক্ষমতা একাধারে ঐশ্বর্য আর দূর্যোগের। যা তাকে জারিত করে তোলে শ্রেয়তর এক বোধের কূলে। এই শ্রেয়তর বোধের প্রতি অনমনিয় মনোভাব এবং সে অনুযায়ী পরিবর্তনের অভিপ্সা, এর বিপরীতে বর্হিজগতের যে চাপ তার অর্ন্তজগতের উপর পরে তার প্রেক্ষিতে দুটি পরিণতিই কেবল খোলা থাকে। জগতকে মনোরূপ দান করা নতুবা আজীবনের নিঃসঙ্গতা। এই চাপ এমনই দূর্মর হতে পারে যে মুহূর্তের ভুলে অথবা অস্তিত্বের মাঝে জেগে ওঠা আকস্মিক শূণ্যতাবোধে স্ময়ং অস্তিত্বকেই দুমড়ে দিতে পারে। যার মূর্তরূপ মৃত্যু। বিশেষায়িত করলে সৃজনশীল মানুষের মৃত্যু আর বর্হিজগতের ভাষায় বললে আত্মহত্যা। মধ্যপন্থা অবলম্বি সৃজনপ্রয়াসিদের (?) কথা এখানে বিবেচনা করছি না। একজন সুমন প্রবাহনকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি মৃত্যু রশ্মিতে মসৃন গিট তৈরি করে তাকিয়ে আছে সিলিং ফ্যানের দিকে। মৃত্যু মুহূর্তের স্তব্ধতা আমাদের বরাবরই বিমূঢ় করে রাখে। এটা সেই মুহূর্ত যখন কেউ জীবিত থাকা সত্ত্বেও আর সমস্ত জীবিতদের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। যে যোগাযোগহীনতা তাকে ফাঁসের দড়িতে ঝুলিয়ে দিয়েছিলো সময়ের পেণ্ডুলামের মতো। কিন্তু শেষ মুহূর্তের মৃত্যু যন্ত্রণা ধারণা যখন ক্রমে তার শরীর বেদখল করে নিচ্ছিল তখন সে ফিরে আসতে চেয়েছিল কি না যোগাযোগের দুনিয়ায় তা আমরা আর জানতে পারি না। মৃত্যুর সংবাদ পাবার পর তো প্রশ্নই ওঠে না সুমন সুমন বলে চিৎকার করে ওঠার।

নিঃসঙ্গতার মাত্রা সেই কবে মৃত্যুর কাছে এসে থেমে রয়েছে, কিন্তু সুমন তাকে ছাড়িয়ে গিয়ে ঈশ্বরের বরাবর নিয়ে যায়।"ঈশ্বরের অসীম একাকীত্বও/আমার একাকীত্বের কাছে একা"।এই পথে যে পরিক্রমা অর্জন করে তাকে সুমন স্রেফ বলে দেয়-"সে আমার পর্যটন নয়,ধ্যান"। সুমনকে সুধাই মৃত্যুতে কি তোমার ধ্যান ভঙ্গ হলো? উত্তর আসবে না, অপেক্ষাও করি না।

কবি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বরাবরই একাকিত্ব, মৃত্যু, পালিয়ে যাবার হাতছানি, প্রেম-অপ্রেমের দ্বিধা আর এক অদ্ভূত নাগরিক আধ্যাত্মবাদ ইত্যকার বিষয় ঘুরেফিরে এসেছে সুমনের কবিতায়। বাস্তব আর অবাস্তবতার মানদণ্ড সুমনের নিজস্ব। তাই সামাজিক অর্ন্তঘাতের রুলস এন্ড রেগুলেশন সুমনকে করে তুলতো সন্ত্রস্ত। কবিতার পঙক্তিগুলো স্বভাবতই অসংখ্য অভিমুখে চলে যায়। কোন একটি মাত্র পরিপ্রেক্ষিতে সে নিজেকে প্রতিস্থাপিত করেনি মৃত্যু ব্যাতীত। অন্তত তার কবিতা পড়ে এমনটিই মনে হচ্ছে-"প্রশ্নহীন আমি, পকেটে অসংখ্য ছায়াপথ।"

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস তবু চোখে দেখা যায় কিছুটা। কিন্তু সামাজিক অর্ন্তঘাতের ক্রমাগত আক্রমণে দারুণসব স্মার্ট, মুখর, মারদাঙ্গা আর আত্মপ্রচারে সদা সচেষ্ট ভোতা মানুষেরাও অতিষ্ট হয়ে পড়ে। সেখানে পুতুলের কলহ সহ্য করতে না পারা সুমন মানুষের সাথে তার অর্জিত নিজস্ব শ্রেয়তর বোধ নিয়ে বাহাস চালিয়ে নিতে গিয়ে আক্রান্ত বোধ করে। এই অভিজ্ঞতার ভয়াবহতা সুমনকে নিয়ে যায় বোধির দিকে। আমরা খুঁজে পাই চাপা দেয়া মানবীয় ইতিহাসের মিসিংলিঙ্কগুলো, বস্তুসমূহের প্রকৃত অবস্থান আর নষ্ট হয়ে যাওয়া সম্পর্ক। ষড়যন্ত্রময় ইতিহাস আমাদের কাঁধে চাপিয়েছে হাজার বছরের মূল্যবোধের পাহাড়। সুমন প্রতিনিয়ত হাসফাস করে ওঠে। তাই উপমার কাব্যিক পথ এড়িয়ে সে সোজাসুজি ঢুকে পড়ে অভিজ্ঞতায়।"জল ত্যাগে শিশ্নের নালায় যে প্রবাহ /সেটা বিস্ময়কর।"

সুমনের সাথে সাত আটবার দেখা সাক্ষাৎ আর একটি রাতের সহাবস্থানে ঘুমের মশারি সরিয়ে যতটুকু দেখি-সৌম্য, চুপচাপ, অন্তর্ভেদী দৃষ্টি নিয়ে সে একা বসে থাকে সারারাত।

তুবও তার চেতনা শূণ্য শরীর আজ পেণ্ডুলাম হয়ে উঠেছে। আমরা ধারণা পাচ্ছি সময়ে চেতনার। আমাদের এই অর্ন্তজগতে আমাদের এই বর্হিজগতে তা আর কোনভাবেই পেণ্ডুলাম নয় অর্থাৎ সুমন প্রবাহন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28839020 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28839020 2008-09-05 12:54:24
মা (আজ আমার(সুমন প্রবাহন) মায়ের মৃত্যুদিন) মা(সুমন প্রবাহনের কবিতা;কাব্যগ্রন্থ: পতন ও প্রার্থনা)

সাদা বক ওড়ে সাত আকাশের বাঁকে
দুধ-ভাত
হোগলা পাতার মাদুরে
মা যদি ডাকে।

সেদিন ছিল শুক্রবার,২৪শে আগস্ট,২০০১। আপু ছাড়া আমরা সবাই বাসায় ছিলাম;আমি(তসলিম),সুমন,বাবা,মা সবাই।আপু তখন ফরিদপুর থাকত।সকাল থেকেই মা ছিলো স্বাভাবিক মেজাজে হাসিখুসি এবং পুরোপুরি সুস্থ। ১১টার সময়ে আমি পাকঘরে ঢুকে মা'র সাথে গল্প করছিলাম,তখন আমার এক বন্ধু ফোন করে আড্ডা দেয়ার জন্য ধানমন্ডি লেকের ঘাটে যেতে বলল। মা শুনে বলে: দাড়া তাড়াতাড়ি রেধে দেই , খেয়ে যা। আমি যা রাঁধা ছিলো তাই খেয়ে ১২টায় নেমে যাই। একটা অনুস্ঠান ছিলো বলে বাবাও সেখানে চলে যায়।মা সাধারনত এগুলো এড়িয়ে চলত। বিকেলে সুমন ঘাটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে চীৎকার করে শুধু কাদঁতে থাকে কিছুই বলতে পারে না ওর সাথে মিরাজ(কাজিন) ছিলো সে আমাকে জানায় বাসায় চল।আমি সুমনকে জড়িয়ে ধরে মিরাজের দিকে তাকিয়ে থাকি।ও বলে, খালাম্মা নেই।আমার কোনো বোধ ছিল না শুধু সুমনকে ধরে বাসায় ফিরি।
মা জোহরের নামাজ পরে জায়নামাযে বসে ওজীফা পড়ছিলো ,ওটা বুকে নিয়ে জায়নামাযের উপরেই মারা যান।
মা ছিলো আমাদের সমস্ত কিছুর কেন্দ্রবিন্দু । বাবা বাইরে থাকতেন বলে মাকে ঘিরেই ছিলো আমাদের জীবন। মা'র মৃত্যু আমাদের প্রত্যেকের জন্য সত্য হলেও পুরো ব্যাপারটা সুমনের সামনে ঘটেছিলো যা পরবর্তীতে ওকে মানসিকভাবে প্রচন্ড আঘাত করেছিলো।
কষ্টকে আসলে প্রকাশ করা যায়না শুধু বলা যায় হয়তো। মা'র এর আগের প্রতিটা মৃত্যুদিন আমি আর সুমন দুজনে একসাথে পালন করতাম, এবার একা। আমি দীর্ঘ সাত বছর প্রতিমাসেই দু'একবার মাকে স্বপ্নে দেখি।দেখি মা ফিরে এসেছে,আমি জিজ্ঞেস করি আর যাবা নাতো ? মা বলে : না।কিছুদিন যাবৎ এখন দুজনকে দেখি । সেদিন সুমনকে বললাম , দ্যাখ তোর বই ; দেখে কি যে খুশী হলো।ঘুম ভেঙ্গে গেলে আবার একা।
আমি হয়তো দুজনকেই এই পৃথিবীতে যেরকম ছিলো সেরকম দেখতে চাই তাই দুজনই স্বপ্নে আমার কাছে এভাবেই ধরা দেয়। আমার মৃত্যু পর্যন্ত হয়তো এই স্বপ্নই দেখে যাব।
আমার মায়ের জন্য এবং সুমনের জন্য সবাই দোয়া করবেন।

পতন

সুমন প্রবাহনের কবিতা;কাব্যগ্রন্থ: পতন ও প্রার্থনা

ভূতগ্রস্থ মহাশূন্যে ঝাঁপিয়ে মেলেদি দু'হাত
শুনশান পতন নামে অস্তিত্বের চরাচরে
পতন ডানার এ ঝাঁপে হারিয়ে ফেলি সময়
বুকের ভিতর ওৎ পাতে সময়হীন মহাকাল
স্থানিকতা শূন্য এ যাত্রায়,
যা দেখি সেখানে চোখ নয়
যেখানে চোখ সেখানে দৃষ্টি নয়।
সমাধিস্থ আত্মার পর্দা ছিঁড়ে তাকালে,
পৃথিবী নামে
ঘরে কবরের দাগ
ঝোড়ো কাকের মড়ক সংসারে
কোথায় আমি!
জানি না, জানার নেই।

অন্ধকার রাতে নিজস্ব নত্রের পাহারায়
অনেক চেনা কবরের অচেনা অন্ধকারে
কংকালের গলা জড়িয়ে ধরি
মা, আমার গায়ে খুব জ্বর!

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28834503 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28834503 2008-08-24 23:15:20
সুমন প্রবাহনের কবিতা(কবিতার নাম দিয়ে যায়নি) কোন উদ্ভিদ আত্মার শক্তিতে।
যে মরে মরুক, আমি ঠিকই বেঁচে থাকবো
কবিতায়, মানুষের ভালবাসায়,
পৃথিবীর সৎ প্রাণদের সহযোগিতায়
-তৃণকবি]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28831297 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28831297 2008-08-15 22:19:02
আজকের বর্তমানে দেখি ভবিষ্যৎ বিস্মৃতি (সুমন প্রবাহন মারা যান ১৯শে এপ্রিল,২০০৮। ঠিক এক সপ্তাহ পর ২৫শে এপ্রিল তাঁর বন্ধুরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছবির হাটে সুমনের স্মরণে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এবং একইসাথে তারা 'একখন্ড একাকীত্ব' নামে একটি স্মরণিকা প্রকাশ করে যা অনুষ্ঠান শেষে বিনামূল্যে বিলিয়ে দেয়া হয়।তা-ই ধারাবাহিকভাবে এখানে প্রকাশিত হলো)

মুয়ীয মাহফুজ

নেই, আর কোন শোক নেই বিস্ময় নেই জানাবার মতো
তবুও তোমার স্তব্ধ ও স্পষ্ট খোলা চোখ দেখে মনে হলো আজ
তুমি, খুব সাহসী...এই মুক্তির প্রণতি জানাই একবার
তবুও তোমার চেহারার মাঝে আমি দেখেছি শেষ বেলার
এক অস্তমিত অসহায়ত্ব।

আর আমিও দেখি সিলিংফ্যান থেকে মেঝের দূরত্ব মাঝে মাঝে কতই না সুবিশাল হতে পারে।

মৃত্যুর দিন চারেক আগে আমার সাথে ফোনে কথা হয় ওর। সে জানায় তার এই মূহুর্তে সুইসাইড করতে ইচ্ছে করছে। আমি জানতাম সে সত্য কথা বলছে। আমি তার অবরুদ্ধ বাসনার বিরুদ্ধে কিছুই বলতে পারিনি।

জীবনানন্দের আট বছর আগের এক দিন কবিতার সেইসব বিপন্ন বিস্ময় দেখি আজো রয়ে গেছে কবিরক্তের প্রবাহে, খরস্রোতে।
নাকি সুমনের বিস্ময় বিপন্ন হয়েছে পারিপার্শ্বিক চাপে, আমরা তা আর জানতে সক্ষম নই।

একটা মৃত্যুসংবাদ আসলে মৃত্যুতেই থেমে গিয়েছে? আর কি সুমন বিস্তার লাভ করতে পারবে না তার মৃত্যুর পর?

তবে এ কথাও ঠিক, পারিপার্শ্বিকতা তার মৃত্যুতে অবদান রেখেছে। সমাজে আজো একজন কবিকে অবহেলা করা হয়, পাগল বলা হয় তার কল্পনাশক্তির জন্য। একজন সুস্থ মানুষ হঠাৎ করেই কেন ভারসাম্যহীন হয়? কার কাছে সে ভারসাম্যহীন, সেটা কি সমাজ নয়? এই সমাজ আমাদেরও পাগল করে দেবে একদিন। আন্দ্রেই তারকোভস্কির একটা কথা মনে পড়লো, একজন ব্যক্তিমানুষের কাছে সমাজের কোন প্রয়োজন না-ও থাকতে পারে, কিন্তু সমাজের অত্যন্ত প্রয়োজন সেই ব্যক্তি মানুষকেই।

এই সমাজের প্রয়োজনের কাছে সৃজনশীলেরা অবহেলিত রয়ে যায়। কারণ সৃজনশীলদের ভাষা, সংগ্রাম মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠের চিন্তাধারার সাথে না-ও যেতে পারে । সেক্ষেত্রে মুর্খ সমাজ সবাইকে শেখায় অবহেলা করতে, এবং চুড়ান্ত একাকিত্ব দ্বারা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে।

আমরা যারা বিচ্ছিন্নতার এ সমাজে বসবাস করি তাদের কাছে আত্মহত্যার সংবাদ একটা ভ্রকুটি বৃদ্ধি করে মাত্র। আমিও আমরাও এর ব্যতিক্রম নই। কিন্তু একজন কবি বা শিল্পীর মৃত্যুও কি নিছক মৃত্যুসংবাদ? কবির মৃত্যুর পর কি কবির কবিতাগুলোও মৃত্যুবরণ করে? আমার মনে হয় শিল্পীর মৃত্যুর পরও আজীবন বেঁচে থাকে, পাঠকের মনে, পাঠকের ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায়। সুমনের গলায় যে নির্মম নীল দড়ি ক্রমশ এটে বসেছে, তা কি হঠাৎ করেই? না, এ দড়ি আমাদের সকলকে পিছমোড়া করে বেধে রেখে নির্যাতন করে চলেছে আজো। কখনো কখনো সেই দড়িই আমাদের গলায় চেপে বসে... আর তাই দেখে জীবিতরা অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে, মরিবার হলো তার সাধ!

সুমনের একটা কবিতায় পড়েছিলাম "ঈশ্বরের অসীম একাকিত্বও আমার একাকিত্বের কাছে একা"।সুমনের কেন এই একাকিত্ববোধ? আমাদের বুঝি তা আর কোনদিনও জানা হয়ে উঠবেনা। আমরা শোকাহত। সুমনের মতো একজন উচ্ছল ও চমৎকার কবিত্বের অধিকারীকে হারিয়ে বিস্মিত, সত্যিই বিস্মিত।

সুমন তার মায়ের মৃত্যুর রূপ একদম ভেঙে পড়ে। সত্য কথা বলতে এরপর আর দাঁড়াতেই পারেনি। মায়ের মৃত্যুর পরের সাত আট দিন সে তার সকল বন্ধুদেরকে
নুরুন্নাহার শিরিনের একটি কবিতার অনেক ফটোকপি করে সবাইকে দেয়, আমাকেও দিয়েছিল। কবিতাটির শেষ দুটি লাইন ছিলো...

ও আকাশ ও মাটি আগলে রাখো মা-কে
মা যেমন রাখতেন প্রত্নবেদনাকে

সুমনকে মীরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে কবর দেয়ার সময় কোন জায়গা খালি পাওয়া যায় নি, তাই সুমনকে তার মায়ের পুরনো কবরেই কবর দেয়া হয়েছে।

অন্ধকার রাতে নিজস্ব নক্ষত্রের পাহারায়
অনেক চেনা কবরের অচেনা অন্ধকারে
কংকালের গলা জড়িয়ে ধরি
মা, আমার গায়ে খুব জ্বর।”
(পতন-১, কালনেত্র, ৪র্থ সংখ্যায়-মার্চ ২০০৩, প্রকাশিত হয়েছিল)

২০০৩ সালে সুমনের এই লেখায় কি সুমন তখনই জানতো যে আসলেই মায়ের কংকাল জড়িয়ে ধরে বলবে, আমার গায়ের এই মাংসের ভেতরে বয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার ডিগ্রী জ্বর। সুমন কিভাবে জানলো তার ভবিষ্যৎ? অদ্ভূত বিষয়।

সুমন তুই কি এখন খুশি? সুমন তোর দুঃখ কি একটু কমেছে রে এবার? তুই কি আসলেই তোর মায়ের কাছে যেতে পেরেছিস?

সুমন, যদি কখনো পারিস আমাকে স্বপ্নে এসে এইসব কথা একটু জানিয়ে যাস রে পাগল। ভালো থাকিস।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28829697 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28829697 2008-08-11 13:50:23
সুমন প্রবাহনের কবিতা (কাব্যগ্রন্হ : পতন ও প্রার্থনা) রাত একটা পনেরো মিনিট


ফাঁসির কাঠে ঝুঁকে রইলাম এবং নিঃশব্দে দীর্ঘ শ্বাস
প্রশ্বাস আমার পাকস্থলি ঘুরে আসে
মায়ের চুলের গন্ধ মনে আসে
শিশুদের কথা ভাবি কল্পনার
এত সুন্দর আমার শিশুরা
আবারও জীবন পেতে ইচ্ছে হয়
মনে হয়
সুদীর্ঘ আদিম হতে এই যে মানবযাত্রা
এর শেষফল এই শিশু
যতনের হীরামণি !
বর্ষা জানালায় ভিড় করে স্মৃতিচারণে।
এখন কুয়াশায়-
চাদরমুড়ি ভাঁপা পিঠা
জেনারেল আমার মৃত্যুযন্ত্রণা বেশিক্ষণ স্থায়ী না হয়
জেনারেল দ্রুত; দ্রুত করো
আর আত্মায় ভর করে চলে যাবো
নিঃশব্দে অস্পৃশ্যালয়ে
ধ্রবতারা দেখে
কখনও ডানে ভর করি কখনও বামে
আর আমি তো সূক্ষ্ম সুতোয় ভর করে
টলে টলে হাঁটি
ধীরে খুব ধীরে হাত সামলে নেই
উৎপল আমায় জানিয়েছে এমনই হয়
তবু আমি সমুদ্রপাড়ে দীর্ঘ প্রলাপে প্রলাপে ভাবি
শেষ নেই
জেনারেল এসব কথা হয়তো আপনি জানেন
আপনার উপস্থিতিতে আমি বলে উঠি, ইয়েস্ স্যার
এবং হাঁটি, বাম ডান... বাম...
এবং আমি ফাঁসি কাঠে
জেনারেল ফাঁসির কাঠে আমার দীর্ঘশ্বাস
আপনি মনে রাখবেন।
আমার ফায়ারবক্সটা খুঁজে পাচ্ছি না
জেনারেল সিগারেট
জেনারেল ম্যাচটা ধরুন
আমার হাতটা উড়ে গেছে।
জেনারেল মাথায় আমার নিকোটিনের আহ্বান
কে জানে জন্মঘোর পেয়েছে বুঝি
তবু ভালবাসি
হাত থেকে সিগারেট খসে পড়ে
জেনারেল আমি অজানায় কাঁপি
জেনারেল আমি অজানা
জেনারেল প্রধানমন্ত্রী আমার খবর রাখেন
জেনারেল বিরোধী দলীয় নেত্রী
খুব শাসিয়ে গেলেন আমাকে
জেনারেল তবু সিগারেটের অবশিষ্টাংশে
ঠিকই চুমুক দেব
হয়তো খাবো আর এক কাপ চা
হয়তো জোর করে বলবো, মামস্,
বলো না স্কুলে কি হলো ?
লাবিব, আসো আরও কিছুণ বালু-ট্রাক ভরি
জেনারেল আপনার হাতের স্পর্শে
জোনাকি পোকা নিভে গেল
জেনারেল আমি
কখনও চোখের জল
দেখাবো না কাউকে
বাঁশি বাজে খুব
বাঁশি বাজে খুব
আমি সুরের পাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়ি
জেনারেল এমন হয়
আমাদের অর্থ্যাৎ কবিদের
আপনাদের হয় কিনা জানি না
এখনও রাত জাগা কতটুকু স্থির হবে
স্থির করতে পারিনি
এখনও ভোর কতটুকু হবে স্থির করতে পারিনি
প্রায়ই আমি কিছুই স্থির করতে পারি না
বুঝলেন জেনারেল
আমার হয়, আপনার মত জানাবেন
আপনার সাথে
দুপুরের খাবার খেতে খেতে
মাংসের পেশি খুব ধীরে ধীরে
চিবুতে চিবুতে আমরা
রাষ্ট্র-বিপ্লব নিয়ে ভাববো না হয়
ভাববো আফগানিস্থান অতীতে কিংবা
বর্তমানে কতটা স্বচ্ছল আছে
আর পিপাসা
রাত যত গভীর হয়
আমার কণ্ঠনালী বেয়ে নামে পিপাসা
পিপাসার পুত্র আমি
বাবার নাম আকাশ নীল
এসব কথা যদি রাষ্ট্র হয়ে যায়
খুব একটা ভাববো না আমি
বরং ভাববো
এ বছর বোমার আঘাতে কতজন মানুষ পঙ্গু হলো
ভাববো; হয়তো কিছুই ভাববো না
বিবশ হয়ে বসে দেখবো
চড়ুই বাঁধে বাসা
প্রান্তে আমার ঘরের
শালিকেরা উড়ে গেছে কবে বহুদূরে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28828687 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28828687 2008-08-08 12:35:33
তখন আমরা কেউই ভালোমতো পৃথিবীতে ছিলাম না (সুমন প্রবাহন মারা যায় ১৯শে এপ্রিল।তার ঠিক এক সপ্তাহ পর ২৫শে এপ্রিল তাঁর বন্ধুরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছবির হাটে সুমনের স্মরণে একটি অনুষ্ঠানের আেয়াজন করে এবং একইসাথে তারা 'একখন্ড একাকীত্ব' নামে একটি স্মরণিকা প্রকাশ করে যা অনুষ্ঠান শেষে বিনামূল্যে বিলিয়ে দেয়া হয়।তা-ই ধারাবাহিকভাবে এখানে প্রকাশিত হলো )

কফিল আহমেদ

এখন ওকে নিয়ে, ওর জন্য ভালোমতো কিছু করাটা আরো কঠিন হয়ে গেলো। অথচ বেঁচে থাকতে ও আমাদের খুবই খুঁজছিলো। আমাকেও ফোন করেছিলো। আস্তে করে বললো-'আমার কথাটা একটু শুনুন। আমি না একটা মাছি গিলে ফেলেছি। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।'

আমি ওকে খুব কাছে থেকে, আর খুব দূরে থেকেও চিনি। বললাম, আপনাকে অনেক দিন দেখি না। দেখা হলে ভালো লাগবে। অনেক কথা হবে। আজ আমরা সিলেটে যাব চৈত্র সংক্রান্তিতে গান করতে। ফিরে এসেই আপনার সাথে দেখা হবে। আপনি অবশ্যই ফোন দিবেন। কেমন আছেন জানাবেন। ও বললো, ওখানে যেন বেশি দেরি না করি। দু'দিন পর সিলেট থেকে ঢাকায় ফিরি। ভিতরে ভিতরে ওর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু ও ফোন না করলে ওকে পাবো কী ভাবে? আমাদের এমনি বাস্তবতা। সিলেটের দুদিন পর এর মধ্যে আরো দুতিন দিন পার হলে ও ফোন করলো। বললো, সন্ধ্যায় যেন অবশ্যই ছবির হাটে থাকি। কথা আছে। সেদিন ওর জন্য আমি অপেক্ষা করি। কিন্তু ও এলো না। অবশ্য ও আগে বলেছিলো, বাড়ি থেকে ওকে বেরুতে দেয় না। আমি ঘরে ফিরে যাই। সেদিনই রাত এগারোটার দিকে আবারো সুমনের ফোন। বললো, আমি বিশ্বরোডের পথে। বিদ্যুৎছাড়া ঘরোয়া গরম তাড়াতে তাড়াতে ওকে বললাম, আজ শরীরটা ভালো লাগছে না। এখন এতো রাতে বেরুতে ইচ্ছে করছে না। আপনিও বাসায় ফিরে যান। আগামীকাল যখনই ফোন করবেন আমি চলে আসবো, তবে দুপুরের পর হলে আমার জন্য ভালো হয়। ও বললো, ঠিক আছে। কালকেই দেখা হবে।

কথা মতো দুপুর থেকেই ওর ফোনের অপেক্ষায় থাকি। বিকেলে পিছন থেকে অভিজিৎ আমাকে ডাকলো। সঙ্গে প্রবর রিপন। ওরা বললো, সুমন তো...

ভাবি, বড়ো ভুল হয়ে গেছে। বোঝা দরকার ছিলো। ওকে ভালো করে বোঝা দরকার ছিলো। ও কথা বলতে চেয়েছিলো। ওকে আমাদের ভালো করে ভালোবাসা দরকার ছিলো। অনেক কষ্ট করেই ও মাঝে মধ্যে বন্ধুদের খুঁজতো। খুঁজতে আসতো। কান্ত কিন্তু অদ্ভূত রকমের সুন্দর-শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। বহুদিন থেকেই ওকে কোনোরকম অন্তরঙ্গ সঙ্গ দিতে পারছিলাম না। তা না পারার যাতনাটা নিরবেই জ্বলতো-নিভতো। আর ওকে নিয়ে কম কথায় পরিষ্কার কিছু বলবার মতো সময় ও শক্তি এখন আমার নাই। সেজন্য আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। তবে বলি ওকে নিয়ে যে কথাগুলি শুনি, যেমন-মনোরোগ, সিজোফ্রেনিয়া, ...আত্মহনন ... ওকে চিহ্নিতকরণের এইসব তকমার মাঝ থেকে আত্মহননের বড় রকমের ক্ষতিটুকু ছাড়া বাকি শব্দগুলি ওর বেলায় একদম খাটে না। তা অন্যায় এবং মর্মান্তিক। অ্যাডিক্ট কিংবা সিজোফ্রেনিক হলে ওর উৎপাতটা অবশ্যই অন্যের গায়ে পড়তো। ওতো কখনোই কারো উপর চড়াও হয় নাই। আক্রমণ করে নাই। বরং যাবতীয় প্রতিকুলতার বিপরীতে কাঁদতে কাঁদতে, কাঁপতে কাঁপতে একলা শিশুর মতোই ও এক পা দু পা করে আপ্রাণ দাঁড়াতে চেয়েছিলো। দাঁড়িয়ে বাঁচতে চেয়েছিলো। সঙ্গে বা সামনে মনোমতো কাউকে পেলেই, একটু ভর পেলেই জীবনের একান্ত অর্জনটুকুর আসল রূপটা আমাদের চোখে আরো সুন্দরমতো ছড়াতে পারতো।

এখন ওকে সঙ্গে না নিয়ে পৃথিবীতে থাকি কেমনে?


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28827247 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28827247 2008-08-04 11:47:25
আত্মহত্যা শব্দটা কবির সাথে কিছুতেই যায় না
সাইদ র'মান

আত্মহত্যা শব্দটা কবির সাথে কিছুতেই যায় না। যে কিনা এক এবং অদ্বিতীয় ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী। যে কিনা সবসময় জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে আসা যাওয়া করে। আমরা যারা অংক শিখে স্তর করে বহুবচনে চলি; তাদের প্রস্থানে থাকতে পারে হত্যা, আত্মহত্যা হন্তারক শব্দগুলোও...।

কবিরা সমষ্টিকে ধারণ করে একা হয়ে যায়। আলো-অন্ধকারও যেখানে বহুবচনের ভার হয়ে ওঠে। সুমন মূলতঃ আরো বেশি একা হতে আলো-অন্ধকার-এর মধ্যে অভেদ টেনে দিয়েছে আমাদের। ওর যাওয়া যেমন সত্যি, যাওয়ার ধরণটাও হয়। পৃথিবী/সূর্যের ঘূর্ণনের মতোই। এরপর যা হবে...নিশ্বাসের মতোই অনুভব করবো,ছুঁয়ে দেব কিন্তু আলো অন্ধকার দ্বারা কখনোই দৃশ্যমান হবে না এই যা...।

আমাদের নিউরোনে স্টোরেজ হয়ে গছে ও। বিনির্মাণ এর খেলায় আমরা ওকে বহুবার জন্ম দেব,মেরেও ফেলবো। এই যাওয়া আসার পথের ধারে ভাটফুলের গন্ধ হয়ে ঝুলে থাকবে ও বহুদিন।

কবির জীবনে যাই ঘটুক, আত্মহত্যা শব্দটা যেন কখনো যুক্ত না হয় কবির নামের আগে। কারণ,এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। কারণ আমরা এই মৃত মানুষেরা এখনো স্বপ্ন দেখি বাঁচার।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28825269 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28825269 2008-07-29 14:58:35
সুমন প্রবাহনের কবিতা(কাব্যগ্রন্থ্ 'পতন ও প্রার্থনা' ) পতন ও প্রার্থনা

যদি আমার উড়বার পক্ষে একজন
মানুষও না থাকে
যদি অবিশ্বাসের ছায়া দেখতে দেখতে
আমার বিশ্বাসের ভিত কেঁপে ওঠে
তবে আমি কার কাছে করবো অভিযোগ
মন আমার
লোকে লোকে হিংসার থাবা দেখে
আতঙ্কিত আমি
কার কাছে খুঁজবো
আশ্রয়ের প্রেরণা
লক্ষ রাতের প্রেরণা, কবিতা, প্রেয়সী আমার
আমার কাছ থেকে অনেক দূরে নারী
আমার কাছ থেকে অনেক দূরে সুরা
মগজের ঘুণপোকা
কুরে কুরে খায় আমার
মেধার ধার
আশা
ছেড়ো না আমাকে
পৃথিবীর যে ভ্রুণে জন্ম আমার
ফিরেছি তারই দিকে আবার
মানুষ তোমাকে দেবো
বলে রাঙা সন্ধ্যা
স্বপ্ন নির্মাণের
আমি কারিগর।
তারই অতলে লক্ষ যুগের
মুদ্রার শোক
বৃথা বন্ধন
আগুনে পুড়ছি আমি
যুগান্তের নির্মাণে
ভুলে ভুলে শোক ভুলে
আমি গেয়েছি প্রেরণার গান
স্বপ্নের নির্মাণ
বুকে যে ব্যথা
যে কথা
বলিনি কাউকে আমি
আমি শোক কুলের প্রাচীন কবি
যুগ্ম আধ্যাত্মিকতার নিপুণ কারিগর
অন্ধবিশ্বাস থেকে অবিশ্বাসে
ফের নিজেরই তৈরি
বিশ্বাসের দিকে তাকিয়ে
মহাজাগতিক সাফল্য আমি
পেয়েছি সত্যি
কিন্তু সে কথা শোনাবার
মানুষ জোটেনি
এখনও
কিংবা মানুষ আছে
দূরের মানুষ
কি লাভ হয় জানি না
এই অনর্গল আত্মরতিতে
তবু পৃথিবীর দিকে ছুঁড়বার
মতো আর কোন
ভাব আমার নেই
ফলে ক্রমশই সংকুচিত পৃথিবীর
জবুথুবু রাজা
নিকোটিনের দুর্ভিক্ষে
এতটা কাবু
ভিতরের মহাজগত হয়ে ওঠে
আরও আরও কোনঠাসা
ফলে মানুষ কী চাও যার বিনিময়ে
পাই কিছু স্বাচ্ছন্দ্যের স্বাদ
এই নাও কিছু অক্ষর সম্বল আমার
কিছু যাদুকরী ছবি
আর এক খন্ড কিতাব
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28825019 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28825019 2008-07-28 17:48:25
শুয়ে পড়ি কবরের হা-য়ে
গোধূলী দহনে কবির প্রস্থানে
অভিজিৎ দাস

কে?
কেউ নও কারো নই!
নিজের ঘরে নিজেই কবর খুঁড়ি
শুয়ে পড়ি কবরের হা-য়ে

কবি সুমন প্রবাহন আত্মহত্যা করেছেন এ খবরটি যখন নগরের তার বিচরণ ক্ষেত্রে তথা পরিচিত পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, সকলেই হতবাক হয় কিন্তু এটি ততটা অপ্রত্যাশিত কোন সংবাদ হয়ে আসে না। কেননা যেন অনিবার্য ছিল এই-ওর মৃত্যু। কবি সুমন প্রবাহনের মৃত্যুকে অকাল প্রয়াণ বলে অভিহিত করা যাচ্ছে না। কারণ ওর মৃত্যুটি ছিল একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার নিঃশব্দ অবসান। যার স্বেচ্ছা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রেখে গেল সবাইকে। এই মৃত্যুটি সকলের জন্যই হয়ে উঠেছিল আত্মহন্তারকের ভূমিকা। কোন এক মধ্যাহ্নে সিলিং ফ্যান থেকে মেঝের দূরতের মধ্যবর্তী শূণ্যতায় ভর করে কবি সুমন প্রবাহন পাড়ি জমিয়েছে অন্য ছায়াপথে। দিবসের মধ্যভাগের সূর্যকে মাথার ওপরে রেখে ওর মেলে দেয়া ডানার ঝাপট আমরা শুনতে পাই নি, এতটাই বধির হয়ে গেছি। অথচ এর পূর্বাভাস সুমন আগেই দিয়েছিল আমাদের।

পায়ের নিচে পৃথিবী গোলক ঠেলে দিয়ে
মেলে দেবো ডানা দুই ছায়াপথে

যে কবি নীরবে নিজের ঘরে নিজেই খুঁড়েছে কবর। আদৌ কবর কি?

পারিবারিক সূত্রে প্রদত্ত মোঃ মশিউর রহমান সুমন নামের যে শিশুটি সত্তর দশকের মধ্যভাগে ১৯৭৬ সালের ১১ নভেম্বর তার পৈত্রিক ভিটা সমুদ্র উপকুলবর্তী জেলা শহর পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থানার বাজিতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বত্রিশ বছরের ব্যবধানে এসেই কবরের হা-য়ে সে খুঁজে নিয়েছে নিজের বসত। পিতা এম ওয়াজেদ আলী খানের কর্মসূত্রে সুমন প্রবাহনের শৈশব কেটেছে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এয়ার ফোর্স কলোনিতে। ভীষণ দূরন্তস্বভাবের এই শিশুটি পরিণত বয়সে এসে চুপচাপ,শান্ত ও মিতভাষী ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়। অসম্ভব ঘোরগ্রস্থতা আচ্ছন্ন করে রাখত এই আত্মমগ্ন ধ্যানী কবিকে।

ঢাকা বড় মগবাজার, মীরবাগ হোসেন আলী উচ্চবিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির মধ্য দিয়ে ১৯৮২ সালে শুরু হয় স্কুল জীবন। দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত সেখানে পড়াশুনা করে সে। ইতিমধ্যে সুমনের পিতা কর্মসূত্রে দেশের বাইরে পাড়ি জমান। পরিবারে তিন ভাইবোনের মধ্যে সুমনের অবস্থান ছিল মেজো। বড় বোন সায়রা জেসমিন সীমু ও ছোট ভাই তসলিম সহ ১৯৮৪ সালে সুমনের মাতা দিলারা বেগম পারুল ওদের পূর্বপুরুষের ভিটায় ফিরে যান। সেখানে সুমন তার জন্মস্থান বাজিতা গ্রামের বাজিতা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হয়। চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত সেখানে লেখাপড়ার পর পঞ্চম শ্রেণীতে চলে আসে বরিশাল শহরের বগুড়া রোড অক্সফোর্ড মিশন বিদ্যালয়ে। এ সময় সুমন তার মা ও ভাইবোনের সঙ্গে বরিশাল শহরের গোরস্থান রোড ধোপা বাড়ির মোড় সংলগ্ন এলাকায় বাস করতে শুরু করে। ষষ্ঠ শ্রেণীতে স্কুল পরিবর্তন করে তাকে ভর্তি করা হয় বরিশাল ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে (কবি জীবনানন্দ দাশ এই বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন)। সেখানে এক বছর শিক্ষা জীবন অতিবাহিত হবার পর সপ্তম শ্রেণীতে এসে ভর্তি হয় বরিশাল উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। এই বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করে সে। ইতিমধ্যে সুমন প্রবাহনের পিতা দেশে প্রত্যাবর্তন করলে তারা সপরিবারে ঢাকায় ফিরে আসে। ঢাকায় এসে দশম শ্রেণীতে ক্যান্টনমেন্ট শহীদ রমিজ উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হয় এবং সেখান থেকে ১৯৯৪ সালে এসএসসি পাশ করে। বরিশালে থাকাকালীন সুমন যখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র তখন তার কবিতা লেখার শুরু। এ সময়ে তার নিয়মিত ডায়রি লেখার অভ্যাস ছিল। এসএসসি পাশের পর সুমন একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয় আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এ্যান্ড কলেজে। ১৯৯৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গল্প থিয়েটার নামক একটি নাট্য সংগঠনের সাথে যুক্ত হয় সে। সেখানে নিয়মিত নাট্য চর্চায় সম্পৃক্ত থেকে এ বছরেই জানুয়ারি মাসে তার এইচএসসি পরীক্ষার মাত্র চার মাস আগে শাহবাগ মোড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় পায়ে গুরুতর আঘাত পায়। অসুস্থ হয়ে তাকে তিন মাস ধানমণ্ডির একটি কিনিকে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। ফলে সে বছর আর এইচএসসি পরীক্ষা দেয়া হয়ে ওঠে না সুমনের। এর পরে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ছেদ ঘটে। এই পর্বে কাব্য রচনায় তুমুল আগ্রহ নিয়ে মনোনিবেশ করে সে। ১৯৯৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তার এক কাজিনকে সঙ্গে করে কবি সুমন প্রবাহন শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটে আসে, সঙ্গে কবিতার খাতা। সেখানে বেশ কয়েক জন তরুণ কবির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। যাদের সঙ্গে পরবর্তিতে তার নিবিড় সখ্যতা গড়ে ওঠে। এরপর নিয়মিত সে শাহবাগ আসতে শুরু করে। ১৯৯৮ সালে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে ফিল্প এপ্রেসিয়েশন কোর্স ও পাঠ চক্রে সক্রিয় সদস্য হিসেবে অংশ নেয়। পাশাপাশি মাহাকাশ বিজ্ঞান বিষয়ে কৌতুহলি হয়ে ওঠে এসটোনোমিক্যাল এ্যসোসিয়েশনের সাথে সম্পৃক্ত হয়। এরই মধ্যে সুমনের সঙ্গে আজিজ সুপার মার্কেটের দোতলার পুবের বারান্দায় আড্ডারত একদল তরুনের পরিচয় হয়। এ সময় তাদের উদ্যোগে কালনেত্র নামে একটি ছোট কাগজ প্রকাশিত হলে সুমন এই পত্রিকা গোষ্ঠির সঙ্গে সক্রিয় ভাবে সম্পৃক্ত হয়। তার কবিতা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছোট কাগজে প্রকাশিত হতে শুরু করে। ২০০১ সালে সুমন প্রবাহন ও তার দুই কবি বন্ধুর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ছোট কাগজ বুকটান। এ সময় তার কৈশোরের শহর বরিশালের সাথে এক ধরনের যোগযোগ পুনস্থাপিত হয়। এ ছাড়া ফরিদপুরে তার একমাত্র বোনের বাড়িতে বেড়াতে যাবার সুবাদে সেখানে ভূমিজ নামক একটি ছোট কাগজের আড্ডায় অংশ নেয় সে। ভ্রমণ প্রিয় সুমন প্রায়শই বরিশাল ও ফরিদপুরে ঘুরে বেড়াত। ঢাকার নাগরিক জীবনের ক্লান্তি ও অবসাদ থেকে মুক্তি পেতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল চষে বেড়ায় সে। এ বছরেই কবি সুমনের জীবনে ঘটে যায় বড় এক অঘটন। যা তার পরবর্তি জীবনকে ব্যাপক প্রভাবান্বিত করে, পাল্টে দেয় তার চেতনালোক। এ বছর ২৪ আগষ্ট সুমন প্রবাহনের মা দিলারা বেগম পারুল মৃত্যু বরণ করেন। তার মৃত্যুতে সুমন মানসিক ভাবে যার পর নাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। চরম আবেগাপ্লুত এই কবি আর কখনই সহজ স্বাভাবিক উচ্ছলতায় ফিরে আসেনি। সদা হাস্য উজ্জল, প্রণাবন্ত সুমন তার জীবদ্দশায় মাতৃবিয়োগের শোক আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি কোনদিন। এর পর থেকে তার মানসিকতা ও আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। মাতৃ মৃত্যুকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে না পারার দরুন সুমন ক্রমশই অবসাদগ্রস্ত ও বিষন্ন হতে থাকে। মাকে হারিয়ে তার জীবন যাপন তথাচেতনালোকে গভীরতর আলোড়ন তোলে। এ সময়ে তার একাকীত্ববোধ চুড়ান্ত রূপ লাভ করে। মাতৃবিয়োগের শোক সামলে ওঠা প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে সুমনের। ২০০৩ সালে তার বিসন্নতা ও অবসাদ গ্রস্ততা প্রকট আকার ধারণ করে। তবে কাব্য চর্চা তথারীতি অব্যাহত থাকে। সুমন তার একসময়ের সতির্থদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চরম নিঃসঙ্গতায় নির্বাসিত হয় নিজেরই ভুবনে। যেন একাকিত্বের উপাসনায় ব্রতী কোন ঋষি পুরুষ। এ সময় নিজের ঘর থেকে বেড়োনোর সুযোগ খুব একটা হতো না তার। মাঝে মধ্যে হুটহাট বন্ধুদের কাছে ছুটে যেত সে, ঘরে ফিরতে চাইতো না সহসা। সংসারের প্রতি চরম বৈরাগ্য ভাব দেখা দেয়। তথাপি ঘরে ফিরতেই হয় তাকে। এর পর দীর্ঘ কাল অন্তরালে থাকায় সুমন প্রবাহন প্রায় বিস্মৃত একজনে পরিণত হয় তার এক কালের সতীর্থদের কাছে। কালে ভদ্রে শাহবাগ বা চারুকলা অঞ্চলে আসলে কিংবা বিশেষ কোন দিবসকে উপলক্ষ্য করে বাইরে যাবার সুযোগ করে উঠতে পারলে বন্ধুদের কারও কারও সঙ্গে তার সাক্ষাত হয়ে যেত। এ সময়ে সুমনের ব্যাক্তি জীবনের বিবর্তনের পাশাপাশি তার বাহ্যিক অবয়বেও আসে ব্যাপক পরিবর্তন।
২০০৫ সালে পরিবার থেকে তাকে পাঠানো হয় মনমিতা মানসিক হাসপাতালে। সেখানে প্রথম দফায় ২০ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তাকে ফিরিয়ে নেয়া হয় ঘরে। ২০০৬ সালে দ্বিতীয় দফা মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে এক মাস থাকতে হয় তাকে। এ সময় তার মধ্যে সহসাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ার প্রবনতা লক্ষ করা যায়। এ বছরেই পুনরায় তাকে মনমিতা মানসিক হাসপাতালে এক মাসের জন্যে রাখা হয়। হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পর সুমনের শারীরিক অবস্থা কিছুটা পরিবর্তিত হয়। এ সময়ে তার ছবি আকার প্রতি আগ্রহ তৈরী হয়। বেশ কয়েকটি স্কেচ খাতায় কলম পেন্সিল ও পেস্টালের বেশ কিছু ড্রইং ও স্কেচ করে সে। পাশাপাশি সেল ফোনে তার বন্ধু ও পরিচিত জনদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। বেশ কয়েকটি পত্রিকা অফিসে কাজের জন্যে নিজেই গিয়ে হাজির হয়। কাজের আশ্বাসও দেয়া হয় তাকে। পরবর্তিতে যা আর বাস্তবে হয়ে ওঠে না। তার কবি বন্ধুদের সংস্পর্ষে আশার জন্য মাঝে মাঝে শাহবাগে দেখা যেত তাকে। আজিজ মার্কেট, চারুকলা, টিএসসি, মধুর ক্যান্টিন, সোহরাওয়ার্দি উদ্যান প্রভৃতি স্থানে একসময়ে যার ছিল অবাধ বিচরণ শুধুমাত্র অনুপস্থিতির কারণেই তাকে ভুলেও গিয়েছিল পরিচিত জনেরা। অনেক আগ থেকেই সুমন প্রবাহন নির্বসিত হয়েছিল তার পরিচিত পরিমন্ডল দ্বারা। গত ১৯ এপ্রিল দুপুরে নিজ রুমে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে থেকে সেই কবি সুমন প্রবাহন প্রমাণ করলেন যে আদতে আমরা কেউ বেচে নেই। জিন্দা লাশ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি।
পুনঃর্বার মোঃ মশিউর রহমান সুমনের জীবন বৃত্তান্তের বিকল্প এ ধারা বিবরণী হয়তো কবি সুমন প্রবাহনের জীবন নির্দেশ করে না, প্রকৃত অর্থে এ লেখা ইহলৌকিকতার আলোকে আমার দেখা। সুমন প্রবাহনের অনুজ তসলিমের সঙ্গে আলাপের ভিত্তিতে এই লেখাটি তৈরী করা হয়েছে। এতে কোন তথ্য বিভ্রাট থেকে থাকলে নিজ গুনে মার্জনা করবেন পাঠক।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28825011 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28825011 2008-07-28 17:13:29
বের হয়েছে সুমন প্রবাহনের কাব্যগ্রন্হ "পতন ও প্রার্থনা" সুমন প্রবাহন
অকাল প্রয়াত কবি সুমনের ই একটি চিত্রকর্ম(স্কেচ) হতে বইটির প্রচ্ছদ ডিজাইন করেছেন জনি সরকার।

প্রকাশক:"সুমন প্রবাহন স্মরণ প্রয়াস"
মেইল:
বইটির মূল্য:১০০ টাকা,$5।
পাওয়া যাচ্ছে আজিজ মার্কেট,(শাহবাগে) প্রায় সকল বইয়ের দোকানেই।
বইটি সদ্য প্রকাশিত হয়েছে ২৯ শে জুন ২০০৮,তারিখে....।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28818699 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28818699 2008-07-10 00:26:12
কোন খোজ ব্যর্থ নয় যোগাযোগের ঠিকানা:

১৮৭/এ,নাইওরি,২য়তলা-বি২,
জোয়ার সাহারা,জমজ রোড
বাড্ডা,ঢাকা-১২২৯.
মোবাইল: ০১৬৭২৫৫২৬২৭(তসলিম)
ই-মেইল: ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28816749 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoronproyash/28816749 2008-07-04 17:25:35