কম বয়সী বানরেরা নাকি লুকোচুড়ি খেলতে পছন্দ করে। অবিশ্বাস করছিলাম। ছবি দেখে মনে হলো হতে পারে।
আমার পরিচিত একজন খুব ভালো ট্রেকার। দুর্দান্ত হাটতে পারে পাহাড়ে। একবার ঈদের সময় বাসের টিকেট না পেয়ে ধুর ছাই বলে ব্যাগ কাধে ঝুলিয়ে হাটা শুরু করে দিল। হেটে ঢাকা থেকে আরিচায় গিয়ে নদী পেরিয়ে বাড়ি যাবে। গ্রামের পথে লোকজন জিজ্ঞেস করে ভাই কই যাইবেন?
আরিচা।
বাসস্ট্যান্ড তো ঐদিকে, ইদিকে কই যান।
জ্বীনা ভাই আমি হাইট্যা যাব। এইদিকেই সুবিধা।
লোকজন ওকে পাগল ঠাউরেছিল। কিন্তু লং ডিস্টেন্স হাটা একটা বড় এন্ডুরেন্স টেস্ট।
গতকালকে লং ডিসটেন্স হাঁটতে বের হইছিলাম। ঢাকা টু ধামরাই। এডভেঞ্চার ক্লাব গুলো যখন নিয়মিত পাহাড়ে ট্রেকিং এ যেতে পারে না তখন এরকম লং ডিসটেন্স হাটার কাজ রাখে মানুষিক দৃঢ়তা আর শারীরিক ফিটনেস ধরে রাখতে। আমাদের গন্তব্য ঢাকা থেকে হেটে ধামরাই।
থাকিতে চরন মরনে কি ভয়? হেমায়েত পুর থেকে জাহাঙ্গির নগরের পথে।
আগের রাতে ঘুমাই নাই। সামহোয়ারে ব্লগ পড়তে পড়তে রাত কাবার, রাহাত ভাই ফোন করে জিজ্ঞেস করলো যখন বের হইছি কি না তখন টের পেলাম। প্রোগ্রামটা ছিল শুক্রবারে, কিন্তু হঠাত করেই প্রোগ্রামটা এগিয়ে বুধবার করা হয়ছে মঙ্গলবার রাতে। তাই প্রিপারেশন নিতেও পারিনাই। পকেটে কিছু টাকা আর হাত পা এবং স্যান্ডেল পরে গাবতলীতে আসতে আসতে সবারই মোটামুটি লেট হলো। ওয়েদারটা চমতকার ছিল। মেঘ ছিল তাই রোদ কম। আরামেই হাটছি। সাড়ে আটটার মধ্যে আমরা হেমায়েতপুরে প্রথম ব্রেক নিলাম। ওখানেই বাজারে পরোটা মিস্টি আর মুরগীর লটপটি খেয়ে হাটা শুরু করলাম। সাড়ে নয়টার দিকে রওনা হলাম। হেলে দুলে আয়েশ করে হেটেছি। ১১টার মধ্যেই সাভার বাজারে পৌছালাম। সাভারে ওভারব্রীজের নিচে প্রানের জুস (শুধু রাতুল ভাই ফ্রুটিকার গুন কির্তন করছিলেন। উনি ফ্রুটিকা কোম্পানীর তো) খেয়ে ঠান্ডা হয়ে আবার হাটা।
ডাইং ফ্যাক্টরী গুলো নদীর পানির রঙ বিভতস করে ফেলছে, এ কারনেই ছবিতে রঙ পালটে দিছি।
সাভারে একই নদীর উপ্রে আমি।
সাভার থেকে জাহাঙ্গির নগর খুব তাড়াতাড়ি আসলাম। রাস্তাটা সুন্দর। সাড়ে বারোটার মধ্যেই আমরা জাহাঙ্গির নগরের শেষ গেটটায় টি ব্রেক করলাম। জাহাঙ্গির নগরের কয়েকজন বন্ধু ছিল। যাওয়ার জন্যে টানা টানি করলে রাজী হলো না।
সারাদিন ঘাস ফরিং এর সাথে খেলা ধুলা।
এরপরের রাস্তাটায় জঙ্গল জঙ্গল ভাব আছে। হেটে আরাম। ওয়েদারও চমতকার ছিল। রোদ কম। আমরা দেড়টার দিকে সাভার জাতীয় স্মৃতি সৌধে হাজির। ওখানে বাথরুমে ফ্রেস ট্রেস হয়ে আবার হাটা। সাড়ে তিনটার দিকে বংশি নদীর পারে ধামরাই উপজেলায় ঢুকলাম। অফিশিয়ালী এটুকু হাটা আমাদের প্ল্যান ছিল। রাতুল ভাই আহা উহু করছিলেন। কিন্তু বাকীরা জোসের মধ্যেই ছিল তাই টিকলো না। আমাদের কন্টাক্ট এবং সহ হাটক ইফতির (সিপ্পি অভিযানের পরে তাকে সবাই সিপ্পি বলে ডাকে) বাড়ি ধামরাই শহরের ভেতরে। ওদের বাড়ি পর্যন্ত হেটেই যেতে হলো রাতুল ভাইকে।
সাভার স্মৃতি সৌধে।
পথে সাভার বাজারের কাছে মাজারে ঢুকলাম। ব্লগার আলেক্সান্দার দ্যুমা পুরাকির্তীর ছাত্র। আমাকে বুঝাইছিল ঐখানে নাকি একটা পাথরের থাম আছে যেটার নাম অশোক স্তম্ভ। সম্রাট অশোকের সময়কালের যদি হয় তাইলে সেটা মৌর্য সম্রাজ্যের নিদর্শন হবে। গিয়ে নিরাশ হলাম। এলাকার কেউ এটাকে অশোক স্তম্ভ বলে চেনে না। তবে পাথর দুটো অনেক প্রাচীন। কার্বন ডেটিং করে বয়স বের করতে পারলে হয়তো বোঝা যেত।
বংশী নদীতে মাছ শিকারী।
ধামরাই।
বাজারের ভিত্রে ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রার রথ পেলাম। এখানে কাঁশার জিনিসপত্রের অনেক দোকান। সামনের একটা প্রাচীন বাড়িতে বেশ ভীর। শুনলাম মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী নাকি এখানে প্রায় শুটিং করে। মেড ইন বাংলাদেশ সিনেমার শুটিং এখানেই হয়েছে। বাড়িতে আজকেও শূটিং হচ্ছে। নিচ থেকেই দেখলাম এক জোড়া ডেটিং রত নায়ক নায়ীকা। আমি টিভি দেখি না তাই চিনতে পারলাম না। বাকীরা বললো উনারা নাকি অনেক ফেমাস।
অশোক স্তম্ভ (?)
বটগাছ।
মাজারের দেয়ালের কারুকাজ গুলো অনেক উচুমানের শিল্প কর্ম।
ইফতিদের বাড়ির সামনেই একটা জঙ্গলের ভিত্রে প্রাচীন একটা মঠ। পাশেই পাশা পাশি দুটো মন্দির। এই এলাকায় বানরে প্রচন্ড উতপাত। দিনে দুপুরে নাকি রান্নাঘরে হামলা চালায়। বারান্দায় গ্রীলের বাইরে রাখা আমার স্যান্ডেল নিয়ে একটা বানর দৌড় লাগানোর চেষ্টা করছিল। মেহমান আসায় টিনের চালে লাফা লাফি করে ওরা আনন্দ প্রকাশ করলো।
রথযাত্রার রথ। এটা আগে ৬তলা ছিল। ৭১সালে পাক বাহিনী পুড়িয়ে দিলে পরে এটা তৈরি হয়।
বেরুবার সময় দেখলাম ছাদের একটা বিশাল দেহের বানর ট্যাঙ্কির পাশে রাজকীয় ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে আমাদের দেখছে। ইফতির কাছে শুনলাম এটা নাকি এই মহল্লার বানর সর্দার। এবং ওদের ছাঁদ তার রাজধানী। পানির ট্যাঙ্কিটা তার সিংহাসন। অন্যবানরদের সাথে উঠানে বা আশপাশের গাছের ডালে বাঁদরামীতে তার আগ্রহ দেখলাম না। শুধু আমি ছবি তুলার চেষ্টা করলে শুধু একবার ভেংচি কেটে দিল। রাজঅনুগ্রহের মধ্যে দিয়ে আমরা ঢাকার বাসে উঠলাম।
এলাকার বিগ বস
বিলাই
এই জঙ্গলে ঢাকা মঠটা নাকি কৃষনের জন্মের দিন মাটি থেকে আস্তে আস্তে উঠে আসছিলো। স্থানীয় একজন এই দৃশ্য দেখে ফেললে এটার উত্থান থেমে যায়। বিশ্বাসীরা বিশ্বাস করেন মাটির তলাতেও নাকি এটার বড় অংশ আছে। এখন অবশ্য ধ্বংস স্তুপ।
ইফতির মুখে ধামরাইয়ের নামকরন ইতিহাস শুনলাম। এখানে হিন্দু অধ্যুসিত হলেও মুসলমান অভিজাতরাও ছিল। ৫ পীরের একজন সেরকম একজন। তার খুব শখের একটা গরু পালতেন। একদিন সেটা হারিয়ে যায়। ধাম নামের এক হিন্দু লোক এবং তার স্ত্রী রাই গরুটা পেলে অনেক যত্ন করে এবং পীর সাহেবের কাছে ফেরত দেয়। কৃতজ্ঞ পীর সাহেব এলাকার নাম দেন ধামরাই। সত্যি নাকি চাপা জানি না।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ২:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


