শ্রীমঙ্গল ফিনলে টি এস্টেটে সুর্যাস্ত।
প্রথম পর্বের পরে ঃ Click This Link
অনেক সকালে উঠে উল্লুকের মুল্লুকের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আগের রাতে সারারাত শ্রীমঙ্গল শহরে ঘোরা ঘুরি আর বানরের মতো লাফা লাফি করায় সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়ে গেল। সকালে কাছের দোকানে ব্রেকফাস্ট করলাম। যে কোন জায়গার খাবারের মান বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় সেখানকার রসগোল্লা টেস্ট করার। দোকানের সামনে দেখি কড়াইএ গরম গরম ধুমায়িত রসগোল্লা, লোভ সামলাতে না পেরে গলা পর্যন্ত ঠেসে খেলাম। এমন সময় ঢাকা থেকে হাসিবের ফোন। ওর ভাইয়ের ফ্লাইট চেঞ্জ হয়েছে। আগামী কাল যাবার কথা ছিল কিন্তু আজকে রাতেই চলে যাচ্ছে। আমাদের রাত ৯টার মধ্যেই ঢাকায় থাকতে হবে। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সারাদিন জঙ্গলে বাদরের সাথে বাদরামী করার প্ল্যান ছিল, মাঠে মারা গেল সব। হাসিব আর শরীফ গিয়ে রিটার্ন টিকেট কাটলো, তিনটায় কোন বাস নেই, আমাদের ঢাকার ফিরতি পথ ধরতে হবে আড়াইটায়। সময় নই, সেদিক দিয়েই দৌড় শুরু করলাম, হাটার টাইম নেই, দৌড়ে শুরু করলাম লাউয়া ছড়ার পথে।
চা-বাগান যাবার পথে শ্রীমঙ্গল বাজারের কাছে থেকে দেখি এক পিক নিক পার্টি। মাইকে কান ফাটানো গান বাজাচ্ছে, “ওহ হুজুর, দুবাই থেকে আনছি খেজুর...’। চেক রঙ্গা কোট লাগিয়ে ক্লাউনের ভঙ্গিতে একজন লোক পিকনিক পার্টির সবাইকে বকা ঝকা করছে। মহরমের দিন, একটা শোক দিবস, এদের বারাবারিটা খুব বেশি চোখে পড়লো। মাইকে ঐ লোক চিতকার করছে, যাদের বমি করার অভ্যাস আছে, সাথে পলিথিন নিয়া উঠবেন, যারা যারা ছোট এবং বড় বাথরুম করতে চান এখুনি করে নেন, লাউয়াছড়ার আগে বাস থামানো যাবে না। লাউয়াছড়া! সর্বনাশ, এরা কি জঙ্গলে মাইক বাজিয়ে পিকনিক করবে? সুস্থ মানুষই টিকতে পারছেনা, জঙ্গলের সব উল্লুক আর লাজুক বানর তো ঝেরে দৌড় দেবে।
শ্রীমঙ্গল রেল ক্রসিং এ গিয়ে দেখি ওরা আটকা পড়েছে ট্রেন যাবার কারনে, আশে পাশের লোকজন কান চেপে ধরছে এদের মাইকের হিমেশ এর বিভতস হিন্দি গানের অত্যাচারে। ওরা নির্বিকার, বাসে কয়েকজন দেখি ব্রেক ড্যান্স দিচ্ছে। গা জ্বলে যাচ্ছে, শালারা এভাবে জঙ্গলে যাচ্ছে।
যাই হোক ট্রেন চলে গেলে বাসটা চলে গেল, হাফ ছেড়ে দম ফেলতে যাব এসময় দেখি টি গার্ডেনের ভিতরে বাসটা থেমে আছে, ছোট এবং বড় বাথরুম করা যাবে না বলে যেই লোক মাইকে এনাউন্স করছিলো সে এবং আর কয়জন লোক বাস থামিয়ে ঝোপের আড়ালে ঢুকেছে।
টি এস্টেটের পরে পার্বত্য এলাকায় ঢুকলাম। চার পাশে ছোট মাঝারি টিলা। মাটির ঘর। গ্রীনকন্ঠ থেকে পানির বোতল কেনার সময় একটা কুকুরকে আদর করার সর্বনাশ করে ফেলেছি, কুকুরটা কিছুতেই পিছু ছাড়ে না। আমাদের সাথে সাথে হাটা শুরু করেছে। একঘন্টার মধ্যেই আমরা লাউয়া ছড়া বনের ভিতরে ঢুকে গেলাম।
অপরুপ সেই বন। চারপাশে বড় বড় কড়ই, রেন্ট্রি গাছ। শ্যাওলা পড়া প্রাচীন গুড়ি, গাছের মাথা থেকে নেমে আসছে বড় বড় লতা গুল্মের ঝোপ, বনের ফাঁকে ফাঁকে প্রজাপতির দল খেলা করছে নাম না জানা সব ফুলের গাছ আর অর্কিডের মাঝে। বনের বুক চিড়ে পাহাড়ি পথ ধরে উচু নিচু কালো পিচের রাস্তা। বনের ভিতর থেকে নাম না জানা হাজারো পাখির ডাক, মাঝে মাঝে বিভিন্ন গিরগিটি প্রানীটার ঘর ঘর আওয়াজ। যে কোন অরন্যে গেলেই একধরনের শব্দ পাওয়া যায়, পাখির ডাক, বানর কিংবা অন্যপ্রানীর শব্দ আর অরন্যের নিজস্ব রহস্যময় ডাক মিলিয়ে অদ্ভুত রসহ্যময়তা। অনুভুতিতে শক্ত একটা ধাক্কা মারে। আমাদের সময় নেই হাতে, সাড়ে বারোটা বাজে, আড়াইটায় বাস। আমরা জোর কদমে হাটছি।
রহিম নামের স্থানীয় এক ভবঘুরের সাথে পরিচয় হলো। তার বাড়ি হবিগঞ্জে। সাইকেল নিয়ে বের হয়েছে কোথায় জানি যাবে বনের মধ্যে দিয়ে। কোথাও ঘুরতে গেলে এজন্যেই একটু কষ্ট হলেও নিজের পা-ই সবচেয়ে ভালো মাধ্যম। সেখানকার মানুষদের সাথে পরিচয় হয়। এলাকাটা দেখে নেয়া যায় খুটিয়ে খুটিয়ে, গাড়ির গ্লাসের ওপার থেকে সবকিছুই কেমন যেন দূর দূর লাগে।
রহিম জানালো সে প্রায় লাউয়াছড়া বনে আসে উদাসিন ভাবে। জঙ্গলে নিজের মতো করে প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে। আগে জঙ্গলে হনুমান, লাজুক বানর, আসামী বানর, উল্লুক অনেক বেশি ছিল। গত বছর সরকার শেভরন কোম্পানীকে এখানে গ্যাস অনুসন্ধানের পার্মিশান দেয়। শেভরন কোম্পানী জঙ্গলের ভিতরে ইলেক্ট্রিক লাইন বসায়, এছাড়া তারা ডায়নামাইট দিয়ে বিস্ফোরন ঘটিয়ে ভু-কম্পন দিয়ে গ্যাস খুজছিলো অরন্যের ভিতরে। প্রশ্ন জাগলো, উল্লুকের মুল্লুক লাউয়াছড়া ফরেস্টে উল্লুক আসলে কারা, সরকার, বন বিভাগ, শেভরন কোম্পানী নাকি তথাকথিত প্রকৃতিপ্রেমীকেরা। এই ঘটনার পরে থেকে এই জঙ্গলে ওয়াইল্ড লাইফ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। এখন সহজে দেখা মেলে না। উল্লুকের দল খাবারের সন্ধানে বনের গভীরে ঘুরে বেড়ায়, ধৈর্য আর সময় নিয়ে ওদের সন্ধান করলে দেখা পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা আমাদের সময় নেই। তবে একটা ভালো জিনিস দিনে এই রাস্তায় সব ধরনের যান চললেও রাতে যান চলাচল নিষিদ্ধ। তখন নাকি রাস্তার উপরেও উল্লুকের দল নেমে আসে। তখন টুরিস্টদের অত্যাচারও থাকে না। তবে ডাকাতির আশঙ্কা নাকি আছে। রহিম জোর গলায় জানালো এই জঙ্গলে বাঘ আছে। আমি সাথে সাথে লাফিয়ে উঠলাম। একদম অসম্ভব, বাংলাদেশের এমন কোন অরন্য দেখি নাই সেখানে লোকজন দাবী করে না সেখানে বাঘ নেই। সে বললো প্রায় তিনফুট লম্বা বাঘ সে বছর দশেক আগে নিজে দেখেছে ধরা পড়তে। বর্ণনায় বুঝলাম গেছো বাঘ কিংবা বড় ধরনের বন বিড়াল কোন কারনে আসামের ওদিকে থেকে চলে আসতে পারে। সাইনবোর্ড চোখে পড়লো, পিকনিক পার্টিদের এখানে মাইকে গান বাজানো নিষিদ্ধ। ওই ফাজিল পার্টির কি অবস্থা কে জানে। এমন সময় উলটা দিক থেকে আরেকটা পিকনিক পার্টিকে আসতে দেখলাম। ওরা পুরো জঙ্গল কাঁপিয়ে মাইক বাজাতে বাজাতে আসছে। গালি দিতে যাব, এমন সময় ঘটলো ঘটনাটা।
আমাদের বাম দিকে টিলার উপরের জঙ্গলে অনেক উচু উচু কিছু গাছ, প্রায় শখানেক ফুট উপরে থেকে ভেসে আসলো সেই অতি আকাঙ্খিত ডাক, অবিকল মানুষের কন্ঠের কাছা কাছি ধ্বনি, উহ উহ উহু । লাফিয়ে উঠলাম। এটা উল্লুকের ডাক। গত সপ্তাহেই টিভিতে দেখছি। এই ডাক আমি চিনি।
রাস্তার পাশে অরন্য কাটাতার দিয়ে আলাদা করা। পিলারে হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকালাম, গাছের মগডালে একদল উল্লুক। ব্যান্ড পার্টির গানের চোটে ভয় পেয়ে ডাকা ডাকি করছে। উল্লুকেরা দল বেধে ঘোরে, একদলে প্রায় ২০ থেকে ৪০ টা উল্লুক থাকতে পারে। এই দলটা কত বড় জানিনা,আমরা তিনটা উল্লুক স্পট করতে পারলাম। সামনে মাস্তান মাস্তান ভঙ্গির বিশালদেহীটা গ্যারান্টি দলপতি। সেই একমাত্র সদস্য যে গাছের পাতার আড়াল থেকে বের হয়ে ডালের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। সবাই প্রচন্ড উত্তেজিত।
মিনিট পাঁচেক পরে ওরা ব্যান্ড পার্টির আতঙ্ক কাটিয়ে উঠে ঠান্ডা হলো। অনেক উচুতে। আরো দুজনকে স্পট করলাম। লীডার সাহেব, সন্দেহের চোখে আমাদের দিকে তাকালো, বিশেষ করে লম্বা লেন্সের ক্যামেরা তাক করায়। আমরা এমন কিছু করলাম না যাতে ওরা ভয় পায়। আস্তে আস্তে ওরা আমাদেরকে মেনে নিল, গাছের পাতার ক্যামোফ্লেজ থেকে বের হয়ে এল। লম্বা লম্বা শিম্পাঞ্জির মত দু হাত শুন্যে বাড়িয়ে ভয়ঙ্কর লাফ দিয়ে একগাছের মগ ডাল থেকে আরেক গাছে। স্তম্ভিত হয়ে গেল, প্রায় আড়াই ফুট লম্বা একটা উল্লুক, পুরো শাদা রঙের পশমি চামড়া। উইকিপিডিয়াতে পড়েছি, জন্মের ছয় মাস পর্যন্ত উল্লুকের শাদা ফারের চামড়া থাকে। কিন্তু ছয়মাস বয়সী উল্লুক এত বড়? সে আমাদের দেখে মজা পেয়ে লাফ ঝাপ দেয়া শুরু করলো। অনেক উপরে, লতা পাতার জঙ্গল, পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু ক্যামেরা ফোকাস জুম করলেই হারিয়ে ফেলছি, রাস্তার মাথায়, ওপাশ থেকে গাড়ি এসেই আমাদের উল্লুকের মতো আচরনে বিরক্ত হয়ে হর্ন দিচ্ছিলো। হর্ন দিলেই বেচারারা ঘাবরে যাচ্ছে। তাই ওদেরকে আর বিরক্ত না করে হাটা দিলাম। দশ মিনিটের মাঝেই লাউয়াছড়া ফরেস্টের মুল গেটে আসলাম।
(শেষ)
উল্লুক দর্শন সম্পর্কিত নয় কিন্তু লাউয়াছডায় তোলা কিছু মজার ছবি নিয়ে আরেকটি ব্লগঃ Click This Link
দুই ধারে কাশ বন, ফুলে ফুলে শাদা
বনের মধ্যে আলো আধারির খেলা
প্রজাপতি প্রজাপতি, কোথা যাও নাচি নাচি
বাস মিস হবে, দে দৌড়
বন্যপ্রানী বিচরন এলাকা, সাবধানে যাতায়াত করুন
মুল গেট
অরন্যের কিছু নিজের ভাষা থাকে
বিখ্যাত রেল ক্রসিং
একজন অরন্যজীবি
এখানেও র্যাব। জঙ্গলে নিরাপত্তা দিতে পেট্রোলিং
বান্দর আলী
উল্লুক (সুত্রঃ ডেইলী টেলিগ্রাফ)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

