আমার এক কলিগ ভয়ঙ্কর কিপটা। অফিস শুরু করার খুব একটা বেশী দিন হয়নি আমার। কিন্তু পুরান লোকেদের কাছ থেকে তার কিপ্টামীর কিংবদন্তিতুল্য খ্যাতি শুনতে শুনতে কান পচে গেছে। অন্য লোকের কথা গুরুত্ব দিতাম না। ভাবতাম সহজ সরল লোক দেখে সবাই তার সাথে মজা নেয়। হান্নান ভাই চমতকার লোক। দেখা হলেই আরে ভাই কেমন আছেন, লং টাইম নো সিন, হ্যান্ডশেক টেক করে প্রায় কোলাকুলি করতে চায়। আরে আসেন না একদিন মীরপুরে নতুন ফ্ল্যাট কিনছি, মিষ্টি মুখ করে যান।
কিন্তু সবাই বলে হান্নান ভাই নাকি চরম কঞ্জুস। সবাইকে দাওয়াত দেয় মুখে কিন্তু কাউকে বাড়ির ঠিকানা দেয় না। তার পকেট গলে নাকি একটা আধলাও পড়তে চায়না। ভদ্রলোক এখন (আমি জয়েন করার অল্পদিনের মাথায়) অন্য ব্রাঞ্চ অফিসে বসেন। তাই দেখা হয় কম। কিন্তু তাকে নিয়া আলোচনা কম হয় না। বিয়ের কথা তো প্রবাদ তুল্য। হঠাত একদিন ইমার্জেন্সি লীভ নিয়া ৩/৪দিনের জন্যে হাওয়া। কোন খোঁজ নাই। পরে ফেরত এসে বলে বিয়ে করে ফেলছি। কাউরে দাওয়াত করে নাই। সবাইকে খালি ছবি দেখায়। অফিসের কজন ধরেছিলো একদিন দাওয়াত করেন, ভাবীকে দেখে আসি কায়দা করে এড়িয়ে যায়। নতুন ফ্ল্যাট কিনলো, মিলাদ টিলাদ দেন। এই দেব সেই দেব করে খোঁজ নেই।
ক-সপ্তাহ আগে, এক শুক্রবারে আমি আর এক সিনিয়র কলিগ গেছি মীরপুরে আন-অফিশিয়াল একটা কাজে। ঘুরতে ঘুরতে দুপুর হয়ে গেছে। কোন রেস্টুরেন্টে ঢুকবো লাঞ্চের জন্যে, আমার সেই সিনিয়র কয়, রাখেন মিয়া, আজকে যখন আইছি হান্নানের বাড়ির এত কাছে ওর বাড়িতে দুপুরে খায়াই যামু। রেকর্ড হয়ে যাবে, কেউ তার কাছ থেকে আধলাও খশাতে পারে নাই, আমরা লাঞ্চ করে যাব। আমিও এডভেঞ্চারের লোভে রাজী হলাম। ভালোই একটা অর্জন। কিপটা সম্রাটের কাছে জোর করে দাওয়াত খাওয়া।
সমস্যা হলো তার বাড়ি কেউ চিনিনা। সবাইকে নতুন ফ্ল্যাটের কথা বলে কিন্তু ঠিকানা দেয়না। আমি ফোন দিতেছিলাম আমার সিনিয়র বলে দাড়ান, এমনে কইলে ঠিকানা দিবেনা। উনি ফোন দিয়া বললেন, হান্নান সাহেব আমরা মীরপুর ওভারব্রীজের তলে খাড়ায় আছি, একটা সমস্যায় পড়ছি, আপনে একটু আসেন। খুব দরকার।
হান্নান ভাই দৌড়াতে দৌড়াতে এলেন, তার বাসা কাছেই। আমরা তাকে জোর করে ধরে তার বাসায় গেলাম। বাছাধন পালাবি কোথায়। কাছেই বাসা। সুন্দর ছিমছাম এপার্টমেন্ট হাউজ। তিনতলায় ফ্ল্যাটে গিয়ে ঢুকলাম তার সাথে। গিয়ে ওনার বড় ভাই আর ভাবীর সাথেও দেখা হয়ে গেল। নতুন ভাবীকে দেখলাম না। জানলাম কই জানি গেছে। অবশ্য উনার বড় ভাই আর ভাবী আছেন। তারা এর মতো কিপটা না। যত্ন আত্তি করলেন। হান্নান ভাই কথায় কথায় নতুন ফ্ল্যাটের প্রশংসা করলেন। এইখানে বারান্দা, এইখানে লিফট, এইখানে টাট্টিখানা। হান্নান ভাইকে বললাম, আমরা দুপুরে না খেয়ে যাচ্ছি না। উনিও বললেন, লোকে কি কয় না কয় সেইসব আপনেরে শুনেন। আমারে ভাবছেন কি? আপনাদের না খেয়ে যেতে দিবো নাকি? ভাবীরে কইতেছি পোলাও টোলাও করতে।
ভরপেট খেয়ে আমরা হান্নান ভাইয়ের সাথে বের হলাম। আমার সিনিয়র কইলো, হান্নানরে সবাই ভুল বুঝে। সে মানুষ খারাপ না। খামোখাই লোকে কিপটা কয়। সিএনজিতে উঠার সময় হান্নান ভাই কইলো, ঠিক আছে বস। দেখা হবে, আবার আসবেন। আর নেক্সট টাইমে কিন্তু আমার বাড়িতে দাওয়াত না খেয়ে যাইতে পারবেন না।
আমার সিনিয়র মনে হয় ঠিক মতো শুনেনাই। আমি বললাম, আমার বাড়ি মানে? এইটা তাইলে কার ফ্ল্যাট?
ক্যান আমার ভাইরে দেখলেন না? আমরা দুই ভাই দুইটা এপার্টমেন্ট কিনছি। ভাই ৩ তলায়, আমি ৪তলায়। নেক্সট বার আসলে ৪তলায় এসে একটু ডাল ভাত খেয়ে যাবেন কিন্তু।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০১০ রাত ৯:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


