গল্পটা ১৯৩৯ এর মাঝামাঝি। হেনরিখ হারের। অস্ট্রিয়ান এথলেট, মাউন্টেনিয়ার, এক্সপ্লোরার, এডভেঞ্চার রাইটার, অলিম্পিক গোল্ড মেডেলিস্ট অনেকগুলো পরিচয়। সে সময় হিটলারের নাৎসি বাহিনীর প্রতাপ। অনেকের মতো হেনরিখও নাৎসি সদস্য, সার্জেন্ট পদের।
যে সময়ের কথা, তখন জাত্যাভিমান, এডলফ হিটলারের উগ্র দেশ প্রেম বিভিন্ন কারনে ভৌগলিক অভিযানগুলোতে অবারিত সরকারী সাহায্য আসছিলো। জার্মানী, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া অর্থাৎ আল্পসের দেশগুলো মাউন্টেনিয়ারিং জগতে সবচেয়ে এগিয়ে। হেনরিখ সফল মাউন্টেনিয়ার কিংবা এডভেঞ্চারার হলেও দাম্পত্য জীবনে ব্যর্থ। ১৯৩৯সালে জার্মান এক্সপ্লোরার টিমের সাথে যখন ‘নাগা পর্বত’ (পৃথিবীর ৯ম শীর্ষ চুড়া) অভিযানে বেড়ুচ্ছেন তখন তার স্ত্রী সন্তান সম্ভবা। ৪মাস ব্যাপি অভিযানে যখন সে একদম যোগাযোগ বিচ্ছিন্নভাবে থাকবে তখনই তার স্ত্রীর ডেলিভারী, এইসময়টাতে পাহাড় বাইতে যাওয়ায় স্ত্রীর সাথে ব্যাপক মনোমালিন্য হয়।
নাগা পর্বত ব্রিটিশ শাষিত ভারতে (বর্তমানে পাকিস্তান শাষিত আজাদ কাশ্মীর)। পাহাড় ধ্বস, হ্যাভেলাঞ্জ আর মারাত্মক তুষার ঝরের কারনে জার্মানদের অভিযান ব্যর্থ হয় নাগা সামিটের খুব কাছ থেকে। হেনরিখদের অবাক করে দিয়ে পুরো দলটাকে ভারতীয় পুলিশ এরেস্ট করলো। কারন ইতিমধ্যে ২য় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ব্রিটিশ-ভারতে সকল জার্মান কিংবা নাজী সমর্থক ব্রিটিশ এম্পায়ারের শত্রু। বন্দীদের ধরে নিয়ে আসা হলো উত্তর প্রদেশের (বর্তমানে উত্তরখন্ড) রাজধানী দেরাদুনে বন্দি শিবিরে। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত বারবার জেল ভেঙ্গে পালানোর চেষ্টা এবং বার বার ধরা পড়ে বন্দি শিবিরে সবচেয়ে দাগী বন্দিতে পরিনত হন হেনরিখ। এর মধ্যেই দেশ থেকে স্ত্রীর ডিভোর্স লেটার আসে। হেনরিখকে তার স্ত্রী জানায়, ইতিমধ্যে তার ছেলের জন্ম হয়েছে। এবং ছেলেকে সে বলেনি তার বাবা মারা গেছে বরং জানিয়েছে তার বাবা হিমালয়ের অজ্ঞাত কোন রেঞ্জে হারিয়ে গেছে।
হেনরিখ হারের, আল্পাইন গীয়ারে।
১০মে ১৯৪৪সালে সার্থকভাবে জেল ভেঙ্গে পালিয়ে যায় কয়েকজন বিদেশী যুদ্ধ বন্দি। প্ল্যানটা ছিল নাগা পর্বত অভিযানে তার সতির্থ অস্ট্রিয়ান মাউন্টেনিয়ার Peter Aufschnaiter এর সাথে। মাথায় পাগড়ি বেধে ভারতীয় চেহারা নিয়ে তারা দেরাদুন থেকে গোয়াতে যাবার পরিকল্পনা করেছিলেন। গোয়া তখন পুর্তুগীজ উপনিবেশ, বিশ্বযুদ্ধে নিরপেক্ষ শক্তি। মন্দিরের দান বাক্সের টাকা চুরি করে, মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে অনেক চেষ্টাতেও গোয়ার পরিকল্পনা কাজে লাগানো সম্ভব হলো না। ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে হেনরিখ আর পিটার রওনা হলো উত্তরে তিব্বতের দিকে।
পৃথিবীর ছাঁদ তিব্বত, নিষিদ্ধ অঞ্চল। হিমালয় পারি দিয়ে তিব্বত সীমান্তে ঢোকার সাথে সাথেই গ্রাম্য উপজাতীরা তাদেরকে ফেরত পাঠায়। তাদের হাত থেকে পালিয়ে কয়েকবছর অবর্ননীয় পরিশ্রম, খাদ্যাভাব, তুষার ঝর, বৈরি আবহাওয়ায়র সাথে লড়াই করে তারা পৌছে তিব্বতের রাজধানী লাসা’তে। লাসার ফরবিডেন সিটিতে বাস করে বালক শাষক চতুর্দশ দালাই লামা। হেনরিখ এবং পিটার যখন লাসা’তে আসে দালাই লামা’র বয়স তখন ১১। কঠোর সংযম আর ধর্ম-চর্চায় সারাদিন ব্যাস্ত এক বালক। কিন্তু তার অসীম আগ্রহ নতুনকে জানার, জ্ঞান-বিজ্ঞান শেখার। দিনের একটা বিশাল সময় সে গোপনে শিশুসুলভ খেলা-ধুলায় এবং দুরবীন দিয়ে তাঁর ধরা ছোঁয়ার অনেক বাইরে সাধারন তীব্বতে সমাজ দেখায় ব্যয় করে। এই দুরবীন দিয়েই বালক দালাই লামা অজানা পৃথিবীর দুই বহিরাগতকে দেখে। দালাই লামা হেনরিখের সাথে দেখা করেন। বাইরের পৃথিবীর কেউই ফরবিডেন সিটিতে ঢুকতে পারে না। এমনি চিন, মঙ্গোল, ভবঘুরে আরব ভাগ্যান্বেষীদেরও প্রবেশ নিষিদ্ধ লাসা’র এ অঞ্চলে। সেখানে হেনরিখ দালাই লামার স্বাক্ষাত করার সুযোগ পায়।
১৯৪৪ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত সভ্য জগত থেকে হারিয়ে যাওয়া হেনরিখ তিব্বতে কাটান। পরে যখন অস্ট্রিয়াতে ফিরে আসে, বাইরের পৃথিবীতে অনেক বড় পরিবর্তন হয়ে গেছে। মহাযুদ্ধ শেষ, রাজনৈতিক বড় বড় উত্থান পতন শেষ। জেমস হিলটনের ‘লস্ট হরাইজন’ গল্পের যেন বাস্তব সংস্করন।
দেশে ফিরে হেনরিখ তার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিয়ে বেস্ট সেলার বই লিখেন নাম ‘সেভেন ইয়ার্স ইন টিবেট’। এক্সপ্লোরার একজন লেখকের পর্বতারোহন দিয়ে শুরু হলেও বইটা একটি চমতকার মানবিক উপন্যাস। মানুষের শঠতা, বেঈমানী, যুদ্ধের ভয়াবহতা, তিব্বতী গুম্ফাগুলোর বিচিত্র সমাজ ব্যাবস্থা, দালাই লামার জীবনী এবং শৈশব, নেতৃত্ব এবং চিন-তিব্বত কনফ্লিক্টে তিব্বতের সার্বোভৌমত্ব হারিয়ে চিনের অঙ্গভুত হবার করুন কাহিনী বইটিতে আসে।
সেভেন ইয়ার্স ইন টিবেট মুভীতে বালক দালাই লামাকে ভুগোল শেখাচ্ছেন হেইনরিখ (ব্রাড পিট)
বার্ধক্যে এসে হেইনরিখ এবং দালাই লামা।
অনেক বছর পরে ২০০৬ সালে হলিউডে এই বইটিকে নিয়ে বক্সঅফিস হিট মুভী তৈরি হয়। মুল বইয়ের উপরে ভিত্তি করে সিনেমাটার নামও রাখা হয় ‘সেভেন ইয়ার্স ইন টিবেট’। মুল হেইনরিখের চরিত্রে অসাধারন অভিনয় করেন সুপারস্টার ব্রাড পিট।
২০০৮ সালে হেইনরিখ পরলোক গমন করেন। নাজি পার্টির সদস্য হবার কারনে যুদ্ধপরাধের অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু হেইনরিখ প্রমান করেন, সে সময় জনপ্রিয় স্পোর্টসম্যান এবং দেশখ্যাত এক্সপ্লোরার হবার জন্যে বাধ্যতামুলকভাবে তিনি নাজি পার্টির মেম্বার হন, এবং যে কোন সেলিব্রেটির মতো এডলফ হিটলারের সান্নিধ্য পান। চিনের অধিগ্রহনের পরে চতুর্দশ দালাই লামা (আসল নাম তেনজিন গ্যতসো) তার অনুসারীদের নিয়ে কলকাতায় রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহন করেন। ১৯৮৯সালে শান্তিতে নোবেল পুরুষ্কার লাভ করেন। ২০০৮সালের ডিসেম্বরে দালাই লামা তার আংশিক রিটায়রমেন্টের ঘোষনা দেন। হেইনরিখের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দালাই লামা এবং তার বাল্যকালের শিক্ষক হেইনরিখের বন্ধুত্ব অটুট থাকে।
ঐতিহাসিক ছবি, দালাই লামার শৈশবের বিরল ছবি। ফটোগ্রাফার ছিলেন হেইনরিখ হারের। হেনরিখ হারের তার সেভেন ইয়ার্স ইন টিবেট বইতে এই ছবিটা অন্তর্ভুক্ত করেন। ধর্মিয় নেতা দালাই লামাকে তার পবিত্র গুম্ফায় সেই সময় খুব কম লোক চাক্ষুষ দেখেছিলেন। একজন বিদেশী বহিরাগতর ক্যামেরায় হাসিমুখে পোজ দিয়েছিলেন শিশু দালাই লামা।
আগ্রহীরা হেইনরিখ হারের সম্পর্কে জানতে এখানে ক্লিক করুন
১৪তম (বর্তমান) দালাই লামা সম্পর্কে জানতে এখানে ক্লিক করুন।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০১০ রাত ৯:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



