থাইক্ষ্যাং ঝিরি। তামলো পাড়ার ৩ মুখা ঝর্না সম্ভবত এর উৎস। ঘুরে ফিরে এটাই রেমাক্রি হিসাবে আরো অনেক ঝিরিকে নিয়ে বড় মদকে গিয়ে সাঙ্গুতে পড়েছে। নদীর ভিতরে নদী। ছবিঃ আলম ভাই।
আগের পর্বঃ
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চুড়া- মদক মোয়াল/তল্যাং ময়/সাকা হাফং
এডভেঞ্চার পুবের পাহাড় বোর্ডিং পাড়ার পথে
বোর্ডিং হেডম্যান পাড়া। ম্রো-দের গ্রাম। রাতটা খুব একটা সুবিধার কাটেনি। সারারাত লোকজন বদ্ধ মাতাল হয়ে হৈ হল্লা করে ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিলো। প্রচন্ড ধকল গেছে। আর দলে মোটে ২জন। দেরী দেখে তাড়া দেবারও কেউ নেই। ঘুম ভাংলো অনেক দেরীতে। শীতের দিন চারিদিকে কেমন একটা কুয়াশার আমেজ।
সকালে বাথরুমের খোঁজে বের হয়ে দেখি বিশাল বিপত্তি। গ্রামে ঢোকার মুখে একটা টিন ঘেরা স্যানিটারী টয়লেট দেখে রাতের বেলা খুশী হয়েছিলাম। এখন দেখি তালা মারা। ম্রো-দের বাংলা জ্ঞান কম। কিছু বললেই বলে বাংলী ন-জানে। একজন বাঙ্গালী গয়াল ব্যাবসায়ীকে পেয়ে জিজ্ঞেস করতে জানলাম এই বাথরুমটা আসলে শো। একটা এনজিও তৈরি করে গেছে। বছরে নির্দিষ্ট সময়ে ডোনারদের লোকেরা যখন পরিদর্শনে আসে তখন তালা খুলে দেখানো হয় ঝকঝকে তকতকে বাথরুম। অগ্যতা জঙ্গলে যাবার জন্যে পা বাড়াতেই গ্রামের সবগুলো শুকরের পাল পিছু নিল। ওদের তাড়াতে ঝিরি পেরিয়ে জঙ্গলের ভিতরে উচু একটা টিলায় ঢুকতে হলো। বাথরুম করতে এত কষ্ট ভাবতেই মনটা বিষিয়ে উঠলো।
শেরকর পাড়ার এক বৃদ্ধা। শীতের সকালে আকীজ বিড়িতে সুখটান।
ফিরে গিয়ে দেখি আলম ভাই মোটামুটি রেডী। অনেক চেষ্টাতেও গাইড যোগার করা সম্ভব হলো না। জুম্মের ফসল উঠে গেছে। কিছুদিন পরেই ক্রিসমাস। সবার হাতেই টাকা পয়সা। গ্রামে প্রতিরাতেই উৎসব। এতসব ফেলে খামোখা তাজিংডং ডিঙ্গাতে কেউ আগ্রহী হলো না। পাহাড়িরা খুব চা খায়। দুধ-চিনি ছাড়া ভয়ঙ্কর লিকার। ঘর গরম রাখতে চুলা সারাক্ষনই জ্বলে আর তার মাঝে কেতলীতে সবসময় চায়ের লিকার টগবগ করছে। যখন যার ইচ্ছে কাপে ঢেলে দু-ফোটা নুন ঢেলে খেয়ে নেয়। সেটা খেয়েই বেড়িয়ে পড়লাম। ঝিরি পেড়িয়ে টানা উঠা। পিঠের ব্যাক-প্যাকটা মনে হচ্ছে পাথর ঠাশা। আর বেলা করে বেড়িয়েছি। দ্রুতই সুর্য লাফিয়ে একদম মাথার উপরে উঠে গেল।
পাহাড়ের চুড়ায় শেরকর পাড়া। গ্রামের বালিকা বা কিশোরীরা পানি আনতে যায় একদম নিচে। ভরা তইয়া (পানির পাত্র) নিয়ে আবার এই বিশাল পাহাড় বেয়ে গ্রামে ফিরে।
বান্দারবানের থানছির এই অংশটা ভয়ঙ্কর দুর্গম। রাস্তা খালি উঠা নামা। পথে পানি প্রাপ্তিও খুব কম। উচু একটা পাহাড় থেকে নেমে আরেকটাতে উঠার সময় আমরা একদম কাহিল হয়ে গেলাম। পানির শেষ বিন্দুটাও শেষ হয়ে গেছে অনেক আগে। ভয়ঙ্কর তৃষ্ণায় করুন অবস্থায় পরে যখন একটা বড় গাছের ছায়ায় বসে জিরাচ্ছি তখন দূরে একটা জুম ঘর চোখে পড়লো। গাট্টি বোঁচকা রেখে কাটা ঝোঁপের জঙ্গল পেড়িয়ে পাশের পাহাড়ের জুম ঘরে গেলাম। জুম ঘরে কৃষকেরা বড় বড় তইয়াতে পানি রাখে। গিয়ে পানি পেলাম। কিন্তু তাতে একটা বোতলের আদ্ধেকখানির একটু বেশী ভরলো। এর পরে আবার উঠা। শ-খানেক ফুট উঠে খাড়া বিপদজনক নামা। বাংলাদেশের পাহাড়গুলোর একটা সাধারন বৈশিষ্ট্য এরা পশ্চিম থেকে পুবে আস্তে আস্তে উঠেছে কিন্তু পুব থেকে পশ্চিমে খাড়া ঢাল বেয়ে নেমে গেছে। এ জায়গাটা খোলা প্রান্তর কিন্তু পাহাড়ের দেয়ালের মতো মাথা সারাক্ষন সূর্যের আলো থেকে আড়াল করে রেখেছে তাই মধ্য দুপুরেও শিশিরে ভেজা পথ। আরো ঘন্টাখানেক ওঠা নামা করার পরে একটা ঘাস ঝোপে ঢুকে গেলাম। চারিদিকে উচু উচু ঘাসের জঙ্গল। কিছুটা সমতলের মতো পাহাড়ের ধার ঘেসে আঁকা বাঁকা ট্রেইল। অনেকদুর হাঁটার পরে একটা মৃতপ্রায় ঝিরি পেলাম একদম পথের উপরেই। দুর্বল একটা পানির ধারা পিছের ঝর্না থেকে গড়িয়ে আসছে। বোতল পুরোটা ডোবানো যায়না এরকম অগভীর। কোনরকমে সবগুলো পানির পাত্র ভরে নিয়ে ভালো করে মাথায় ঘারে পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিলাম। আরো কিছুক্ষন হাঁটার পরে সূর্যের আলো ম্লান হয়ে এলো। পথে একজন বম মহিলার দেখা পেয়েছিলাম উলটোপথে আসছিলেন। পথের হদিশ জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাষা সমস্যার কারনে কিছুই বুঝতে পারা গেলনা। কিন্তু অল্পক্ষন যেতেই খাড়া একটা ঢালের শেষমাথায় দাড়াতেই সামনে অরন্যের গায়ে সারি বাধা অনেকগুলো কুঁড়ে ঘর চোখে পড়লো। বমদের গ্রাম- শেরকর পাড়া। বিপদজনক খাড়া পথ বেয়ে অনেকখানি নেমে একটা ভয়ঙ্কর সুন্দর ঝিরিতে এসে পৌছালাম। ঝিরির হিম শিতল পানিতে পা রাখতেই গা জুড়িয়ে এল। বাঁশ দিয়ে একটু উচু জায়গায় পানি এনে দেশীয় প্রযুক্তির কোল্ড শাওয়ার। আয়েশ করে গোসল করতে করতে সূর্যের শেষ আলো উঁকি মারা শুরু করে দিল। ঝিরির গা বেয়ে একদম খাড়া উপরে উঠা। উঠতে উঠতে গোসলের বারোটা বেজে গেল দুজনেরই।
ট্রেইলের মাঝে কোথাও আমি। ফার ফ্রম দি ম্যাডিং ক্রাউড। ছবিঃ আলম ভাই।
একটা পাক দিতেই চোখে পড়লো চমতকার একটা ভ্যালির উপরে স্বর্গীয় সুন্দর গ্রাম শেরকর পাড়া। গ্রামের লোকেরা সন্ধ্যা বেলায় সবাই যার যার পরিবার নিয়ে দাওয়ায় বসে গল্প গুজবে মেতেছেন। প্রথম বাড়ীর কর্তার নাম ‘লাল-সিয়াম বম’। আমাদের দেখে দাওয়া থেকে নেমে এসে হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেলেন। বমরা দারুন অতিথীপরায়ন আর বন্ধু বাতসল। রামসিয়াম দাদার বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই। কিন্তু আশ্চর্য সুঠাম স্বাস্থ্য। বাড়িতে পা রাখতেই দূরে পাহাড়ের ওপাশে সূর্যি মামা ডুবে গেলেন। টর্চ লাইট জ্বেলে আমরা তৃতীয় রাতের প্রস্তুতী শুরু করলাম। আগামী কাল কাটবে তাজিনডং এর চুড়াতে।
প্রথম বড় ঢাল। পাহাড়টা পুরোটাই সলিড রকের। বেয়ে নামছি। ছবিঃ আলম ভাই।
শীতের সকালে পরিপাটি বম পল্লী শেরকর পাড়া।
শীতে যে যার পরিবার নিয়ে দাওয়ায় বসে আগুন পোহানো। আমরা সামিল হলাম রামসিয়াম বমের পরিবারের সাথে।
কটু কুটু কুটু
বমদের গৃহস্থালী।
তৃষ্ণায় যখন মরতে বসেছিলাম, এই জুম ঘরের পানি প্রানে বাঁচিয়েছিলো।
আকাশে হেলান দিয়ে তাজিনডং ঘুমায় ওই। তাজিনডং এর প্রমিনেন্ট অংশ, চিঞ্চিরময় পাহাড়।
আলম ভাই ইন একশান।
পাহাড়ের ভাঁজে এই অংশে রৌদ্র ঢোকেনা। তাই রাতের শিশির কখনোই শুকোয়না।
শেরকর পাড়ার ট্রেইল।
পাহাড় আর অরন্যের ঘোমটায় লুকিয়ে থাকা শেরকর পাড়া।
শেরকর পাড়ায় পানির সরবারহ।
শেরকর পাড়ার এক বৃদ্ধা। শীতের সকালে আকীজ বিড়িতে সুখটান।
পাহাড়ের চুড়ায় শেরকর পাড়া। গ্রামের বালিকা বা কিশোরীরা পানি আনতে যায় একদম নিচে। ভরা তইয়া (পানির পাত্র) নিয়ে আবার এই বিশাল পাহাড় বেয়ে গ্রামে ফিরে।
ট্রেইলের মাঝে কোথাও আমি। ফার ফ্রম দি ম্যাডিং ক্রাউড। ছবিঃ আলম ভাই।
প্রথম বড় ঢাল। পাহাড়টা পুরোটাই সলিড রকের। বেয়ে নামছি। ছবিঃ আলম ভাই।
শীতের সকালে পরিপাটি বম পল্লী শেরকর পাড়া।
শীতে যে যার পরিবার নিয়ে দাওয়ায় বসে আগুন পোহানো। আমরা সামিল হলাম রামসিয়াম বমের পরিবারের সাথে।
কটু কুটু কুটু
বমদের গৃহস্থালী।
তৃষ্ণায় যখন মরতে বসেছিলাম, এই জুম ঘরের পানি প্রানে বাঁচিয়েছিলো।
আকাশে হেলান দিয়ে তাজিনডং ঘুমায় ওই। তাজিনডং এর প্রমিনেন্ট অংশ, চিঞ্চিরময় পাহাড়।
আলম ভাই ইন একশান।
পাহাড়ের ভাঁজে এই অংশে রৌদ্র ঢোকেনা। তাই রাতের শিশির কখনোই শুকোয়না।
শেরকর পাড়ার ট্রেইল।
পাহাড় আর অরন্যের ঘোমটায় লুকিয়ে থাকা শেরকর পাড়া।
শেরকর পাড়ায় পানির সরবারহ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

