somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... ট্রাভেল ফটোগ্রাফির একজিবিশান
ঘুরতে আমরা কম বেশী সবাই পছন্দ করি। আর ঘুরতে গেলে তো ছবি তোলাই হয়। ভ্রমণ বাংলাদেশ এডভেঞ্চার ক্লাব এ বছরেই বাউন্ডুলেপনায় এক যুগ পার করে এসেছে। এবারে আসছে পহেলা ফাল্গুন ভ্রমণ বাংলাদেশের তরফ থেকে আয়োজন করা হচ্ছে ট্রাভেল ফটোগ্রাফি এক্সিবিশান- ভ্রমণ বাংলাদেশ ১।
গত ১৪ই জানুয়ারী’তে বান্দারবানের থানছি’তে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় না ফেরার দেশে চলে যাওয়া দুই বন্ধু মুগ্ধ এবং সুজনের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এবারের প্রদর্শনী উৎসর্গ করা হচ্ছে।
ভ্রমণ বাংলাদেশ ১ এর সব ছবিই গত ১২ বছরে ভ্রমণ বাংলাদেশের বিভিন্ন রোমাঞ্চকর ভ্রমণের স্মৃতিচারন। ট্রাভেল ফটোগ্রাফির জগতটা অনেক বড়। তাই নির্দিষ্ট গন্ডিতে তাকে পেতে না রেখে ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস নিয়েছি আমরা সবখানে। বার্ড ফটোগ্রাফি থেকে পোট্রেট, ল্যান্ড স্কেপ থেকে লং এক্সপোজারের ট্রিকি ছবি। তবে সবগুলোই ভ্রমণ বাংলাদেশ এডভেঞ্চার ক্লাব এর বিভিন্ন ট্যুরের সময়ে তোলা।

ভ্রমণ বাংলাদেশ-১ ( মুগ্ধ ও সুজন স্মরণে- ভ্রমণ বিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী ) হবে ১৩, ১৪ এবং ১৫ই ফেব্রুয়ারী শাহবাগের ছবির হাটে (চারুকলার উল্টোদিকে), প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আমরা থাকবো ছবির হাটে।

১৩ই ফেব্রুয়ারী পহেলা ফাল্গুনের দিনে উদ্ধোধন, চলবে সন্ধ্যা পর্যন্ত। পরদিন ভ্যালেন্টাইন্স ডে অর্থাৎ ১৪ই ফেব্রুয়ারী আর তার পরদিন ১৫ ই ফেব্রুয়ারী, ক্যামেরার চোখে বাংলাদেশ দেখানোর সরল প্রয়াস রইবে ভ্রমণ বাংলাদেশের তরফ থেকে।

ফেসবুক ইভেন্টে ক্লিক করতে পারেন বিস্তারিত জানতে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29539352 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29539352 2012-02-12 01:11:19
দুখী মানবের জ্ঞান ফিরেছে। ট্রাভেলার্স অফ বাংলাদেশের আরেক দুই সদস্য ডাক্তার মুগ্ধ আর সুজন আর আমাদের মাঝে নেই। মুগ্ধ এমন একটা ছেলে যে সবসময়ই হাসতো, সব সময়। কিছু দিন আগে একটা ভিডিও দেখলাম বাঞ্জি জাম্পিং করছে, তাও হাসতে হাসতে। সবাই ওদের রুহের জন্যে দোয়া করবেন। ]]> http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29522492 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29522492 2012-01-14 23:21:37 :::হিমালয় ডায়েরী ৪র্থ পার্ট- স্তোক কাংড়ি::::
স্তোক কাংড়ি, হিমালয়ের লাদাখ রেঞ্জের একটা শ্বেত শুভ্র চুড়া। দৈত্যাকার পর্বত চুড়াটার উচ্চতা বিশ হাজার একশ সাইত্রিশ ফুট বা ৬১৩৫ মিটার। প্রচন্ড ঠান্ডা আর পাতলা বাতাসে অক্সিজেন স্বল্পতাই চুড়াটাতে পা রাখতে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু স্তোক উপত্যকার আশ্চর্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ওয়াইল্ড লাইফ আর তিব্বতী সংস্কৃতি ভুলিয়ে দেয় সব। আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করেন ...


রওনা দেবার সময় লেহ'তে করুন আবহাওয়া।
রাতে ডিনার শেষ করে ফেরার সময় গায়ে ক-ফোঁটা বৃষ্টির পানি পড়লে নিজেকে প্রবোধ দিলাম ও কিছু না। ২০ হাজার ফুট উচ্চতায় বৃষ্টি হলে সবকিছু ভেস্তে যাবে। পিটাররা হাতগুটিয়ে বসে আছে বৃষ্টি ফোরকাস্টের জন্যে। ওদের আগের চেষ্টায় বৃষ্টি হলে বেজ ক্যাম্প এলাকা নাকি তুষারে কোমড় পর্যন্ত ডুবে গিয়েছিল। ব্যাগ গুছানোর সময় পাঞ্চো (রেনকোটের মতো,হ্যাভারস্যাক সহ পুরো শরীর ঢাকা যায়)রাখলাম সবার উপরে। তাঁবু,হিমাঙ্কের নিচে থাকার উপযোগী স্লিপিং ব্যাগ,ইনার, আল্পাইন জ্যাকেট, থার্মাল,আল্পাইন গ্লাভস-ইনার,পর্বাতরহনের উপযোগী টুপী, অনেকগুলো গরম গেঞ্জি, পুলওভার,ট্রেকিং বুট, আইসবুট,আইসএক্স, ক্রাম্পন, আগামী কয়েকদিনের খাবার, আর দুনিয়ার টুকিটাকি জিনিস। হ্যাভারস্যাকটা কাঁধে নিয়ে দেখলাম ওজন ভালোই। তবে ট্রেকিং পয়েন্ট থেকে মাল টানার জন্যে ঘোড়া ভাড়া পাওয়া যায়, বেজক্যাম্প পর্যন্ত ঘোড়ায় করে মাল নেয় সবাই।
ইচ্ছে ছিল সকাল সকাল রওনা দেব স্তোক গ্রামের দিকে। ৯টা ১০টার মধ্যে শুরু করলেও আরাম করে ৪টা নাগাদ প্রথম ক্যাম্পের জায়গা মানেকারমো’তে পৌছুবো ।ক্যাম্প বানিয়েও আড়াই তিনঘন্টা সময় পাবো হাইট গেইনের জন্যে। হাইট গেইনের ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা উচিত। আমরা জানি যতোই উপরের দিকে যাওয়া যায় বাতাসের চাপ আর তাতে অক্সিজেনের পরিমান কমতে থাকে। ১০ হাজার ফুটের উপরে গেলে বলে হাই অল্টিচিউড, ১৫ হাজার ফুটের উপরে গেলে ভেরি হাই অল্টিচুড আর ২০ হাজার ফুট থেকে ২৯ হাজার ফুট পর্যন্ত এক্সট্রিম হাই অল্টিচুড। এই উচ্চতা অতিক্রম করলে শরীর অক্সিজেনের অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে,প্রয়োজনীয় ফ্লুইড লিক করতে থাকে। ঘুমানোর সময় মানুষের হার্ট বিট কমে যায়,হৃদপিন্ড সবচেয়ে কম পরিমান কাজ করে সামান্য অক্সিজেন সাপ্লাই দেয়। তাই মাউন্টেনিয়াররা উচু পর্বতে ক্যাম্প করতে চাইলে ঐ জায়গার চেয়েও উচু জায়গায় উঠে শরীরকে মানিয়ে নেয় ক্যাম্পের উচ্চতার জন্যে। এটাই হাইট গেইন করা, যাকে বলে ক্লাইম্ব হাই আর স্লিপ লো। অনেকগুলো ক্যাম্প করতে হলে বা এক্সট্রিম উচ্চতায় বেশীদিন কাটাতে হলে হাই গ্রাউন্ডে কয়েকদিন কাটিয়ে লোয়ার ক্যাম্পে নেমে আসে। এদিকে গাইড থুবস্থানের দেখা নেই।

লেহ’তে বিরল বৃষ্টি নামছে হিমালয়ের বুকে।


স্তোক গ্রামের ট্রেকিং পয়েন্ট। এখান থেকে অভিযানের শুরু


স্তোক গ্রামের বর্ধিতাংশ। হোটেল মাউন্ট এভারেস্ট!
গতকালকেই রিনচেন গাইড থুবস্থান দাওয়ার সাথে আলাপ করিয়ে দিয়েছে। মহা গম্ভীর ফ্যাশন সচেতন তরুন, ভালো ইংরেজী বলতে পারে।রাতে তার সাথে টিম মিটিং করে পুরো প্ল্যান ফাইনাল করে নিয়েছি।
বেশ দেরীতে থুবস্থানকে নিয়ে রিনচেন হাজির। রিনচেন শুভেচ্ছা হিসাবে এক ঝুরি আপেল দিল। আমাদের প্রথম গন্তব্য স্তোক গ্রাম।তিব্বতের রাজা রাজ্য হারিয়ে এখানে নির্বাসিত হয়ে প্রাসাদ গড়েন, এছাড়া কয়েকটা পিক আর কয়েকটা ট্রেকিং রুটও এখানে, তাছাড়া অনেক বড় বসতি। মুড়ীর টিন মার্কা বাস যায়, টাইম টেবলের কোন ঠিক নাই। যাত্রী সেবা আর ডাকাডাকিতে ফার্মগেটের লোকাল বাস কন্ডাক্টরদের সাথেও পাল্লা দিতে পারে। লেহের এদিকে ট্যুরিস্টদের ভীর নেই, একটু পর পর ইন্দো তিবেটিয়ান পুলিশের চেকপোষ্ট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা। বিশাল বিশাল বৌদ্ধমূর্তী, বৈদ্যতিক জায়ান্ট জপযন্ত্র আর লামাদের দেখে বুঝলাম আশে পাশে কোথাও গুম্ফা আছে। তীব্র গর্জন তুলে ছুটে চলা সিন্ধু পার হলাম একটা ঝুলন্ত ব্রীজে করে। দুধারে জনশুন্য মরুপ্রান্তর।দুঃশ্চিন্তার মতো আকাশ জোড়া মেঘ অশুভ আলো ফেলেছে। একটু পরে স্তোক উপত্যকায় রাজপ্রাসাদটা চোখে পড়লো। দারুন সুন্দর, গায়ে ড্রাগন আর নানা মীথিক্যাল প্রাণীর ছবি আঁকা। প্রাসাদের উপরে বৈসাদৃশ্য এন্টিনা দেখিয়ে থুবস্থান জানালো ওটা বর্তমানে ভারত সরকার রেডিও টিভির রিলে স্টেশন হিসাবে ব্যাবহার করে। মরুর বুকে সবুজ গাছের প্রাচুর্য ভরা সুন্দর ছিমছাম স্তোক গ্রামে নামলাম। চারপাশে শান্ত তিব্বতী গ্রাম, মেঠোপথের দুধারে অনেক ইয়াক, জো (চমড়ি গাই আর গরুর শঙ্কর), গাধা, ঘোড়া দেখলাম। ট্রেকারদের টিম এদের কাছ থেকে গাধা/ঘোড়া ভাড়া নেয়। অনেক চেষ্টা করেও কিছু যোগার করতে পারলাম না। আমাদের মালপত্র একটা ঘোড়ায় নেবার সমান, কিন্তু ওরা ৫/৬টা করে ঘোড়া ভাড়া দেয় একবারে, দলের কাছে। সবগুলো ঘোড়া মাল টেনে নেবে বেজ ক্যাম্প পর্যন্ত একটা এক্সট্রা থাকবে যেটা অন্য ঘোড়াগুলোর খাবার বইবে। ২০০৪ সালে রিফাত হাসান আর মুনতাসির ইমরান স্তোক অভিযান চালায়, রিফাত ভাই সামিট করার পরে আরো কয়েকটা বাংলাদেশী দল চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়।মুনতাসির ভাইএর সাথে আসার আগে আলাপ হয়েছিল,তারা বেজক্যাম্প পর্যন্ত দুটো ঘোড়া নিয়েছিল। বারবার বলেছিল ঘোড়া কিংবা শেরপা ছাড়া যেন না উঠি। থুবস্থান ফোনে ব্যাস্ত হয়ে গেল ক্লাইম্বিং শেরপার খোঁজে। আমি কাগজপত্র নিয়ে এগুলাম ট্রেকিং পয়েন্টে। একটা খোলা প্রান্তরে কংক্রিটের ছোট্ট ঘর ট্রেকিং পয়েন্ট,পাশেই উপরের গ্লেসিয়ার গলে নেমে আসা একটা পাথুরে ঝিরি। অন্যদিকে পাহাড়ী একটা বন্য নদীর উপরে একটা লোহার ব্রীজ। এখন আস্ত থাকলেও ফি বছর পাহাড়ী ঢল ভাসিয়ে নেয় বলে এটাকে বলে ওয়াশ আউট ব্রীজ।ট্রেকিং পয়েন্টে এক তিব্বতী মহিলা নুডলস,শুকনো খাবার বিক্রি করে, সেই পারমিটের কাগজ চেক করে।তুমুল বৃষ্টিতে ছাউনির নিচে বসতেই থুবস্থান সাথে করে আনলো ক্লাইম্বিং শেরপাকে। অভিজ্ঞতায় টইটুম্বুর হাসিখুশী একলোক নাম স্তেনজিং নুরবা। যদিও শেরপা একটা উপজাতির নাম। শেরপা,দর্জি,তামাং সবাই পাহাড়ে মালপত্রবহনে কাজ করে, কিন্তু ভুলব্যাবহারের ফলে শেরপা একটা পেশার নামে দাড়িয়েছে।
ইয়াকের রাখাল


হাসি মুখ দেখে পথ চলার শুরু।
৩ দিকে বৃষ্টি থামলে আমরা ঝিরির পাশের পথ বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করলাম। বেরিয়েই স্তোক গ্রামের বর্ধিত অংশ। এখানে থাকার জন্যে কয়েকটা চৌকি বসানো হোটেলও আছে।ঝিরির স্রোতকে কাজে লাগিয়ে ঘোরানো প্রকান্ড জপযন্ত্র চোখে পড়লো। সাধারন জপযন্ত্র ছোট্ট হাতেই ঘুড়ানো যায়।গায়ে ঈশ্বরের নাম লেখা থাকে যতোবার ঘুরে ততোপূণ্য হয়।দানবীয় জপযন্ত্রগুলো ঐশ্বর্যের প্রতীক।পানির টানেই হোক আর ইলেক্ট্রিসিটিতেই ঘুরুক সব পূণ্য জমা হবে যে টাকা দিয়েছে তার একাউন্টে।শেষ কটা শেপার্ড হাউজ পেরিয়ে হিমালয়ের বুকে নির্জনে ঢুকে গেলাম আমরা। আর সাথে সাথে নামলো বৃষ্টি। প্রচন্ড ঠান্ডা পানি যেন চামড়ায় হুল ফোটাচ্ছে।ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে পাথরের আড়ালে ঢুকলাম কোনমতে। বৃষ্টি থামলে দেখি শুষ্ক ন্যাড়া পাহাড়ের উপর থেকে একপাল হরীন নেমে এসেছে ঝিরির পাশে জন্মানো সামান্য কিছু ঘাস খেতে। ছবি নিতে খুব কাছে গেলেও পাত্তাই দিলনা।পথে একটা সাইনবোর্ড চোখে পড়লো- এখানে স্নো-লেপার্ড পাওয়া যায়।১০০ বছর আগেও বিজ্ঞানীরা স্নোলেপার্ডের অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। ছোট বেলায় ডঃআব্দুল্লাহ আল-মূতীর লেখা বইতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির দুর্ধর্ষ ফটোগ্রাফারদের তুষার চিতার ছবি তোলার এডভেঞ্চার গল্প পড়ে রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম।

লোকালয় থেকে বেরুতে না বেরুতেই স্বাগত জানালো হরীনের পাল।


অনেক নিচে স্তোক গ্রাম। মেঘের ছায়া পড়া ঐ পাহাড় গুলোতে খারদুংলা (ওয়ার্ল্ডের হাইয়েস্ট রাস্তা) যাবার রাস্তা।
দুধারে আকাশ ছোঁয়া সব শুষ্ক পাহাড়, তার মাঝ দিয়ে পাথুরে ট্রেক একে বেঁকে একটানা উঠে গেছে ঝিরির পাশ দিয়ে, বেশীর ভাগ জায়গাতেই গ্রেডিয়েন্ট কম তবে কয়েকটা জায়গায় খাড়া পাথুরে দেয়ালে হাত পা খিমছে খিমছে বেয়ে উঠা লাগে। ওপাশ থেকে নেমে আসা ২টা দলের দেখা পেলাম, যাদের একটা স্তোক কাংড়ি ক্লাইম্বে গিয়েছিল।শুনলাম উপরে আবহাওয়া খুব খারাপ। অনেক তুষারপাত হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে ফিরে এসেছে। জিজ্ঞেস করলাম সামিট হয়নি, মন খারাপ নাকি? ওরা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল। ধুর, মাউন্টেনিয়ারিং ইজ অল এবাউট ফান। সামিট হয়নি কিন্তু অনেক এডভেঞ্চার হয়েছে।ওদেরকে জুলে (JULAY) বলে বিদায় নিলাম।
তিব্বতীদের বিশ্বাস দুর্গম রাস্তা দিয়ে চললে ঈশ্বর বন্দনা হয়।রাস্তার পাশে হরহামেশাই পাথর দিয়ে স্তুপের মতো বানিয়ে রাখে, সবাই ওগুলোর ডান পাশ দিয়ে যায় আর বর্ণীল প্রেয়ার ফ্ল্যাগগুলো সাজিয়ে দেয়।রাস্তা যতো খারাপ ততো বেশি পূন্য হয়।আমাদের পূণ্যের পরিমান বাড়াতেই রাস্তা যেন দূর্গমতর হয়ে উঠলো।পূণ্যের ভার আরো বাড়াতেই নামলো ঝুম বৃষ্টি, প্রচন্ড ঠান্ডা পানির ফোঁটা।অবস্থা কেরোসিন করতেই যেন রাত নেমে এল। এরকম হাইঅল্টিচিউড মরুভুমীতে রাত্রে ঠান্ডা কি রকম পড়ে সেটা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। বৃষ্টি অবশ্য একটু পড়েই থামলো, কিন্তু ঠান্ডা জাঁকিয়ে বসলো। মাথার হেডল্যাম্পের আলোয় ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে পথ চললাম। থুবস্থান আর স্তেনজিং জানালো এই আবহাওয়ায় রাতের বেলা হেঁটে মানেকারমো পর্যন্ত যাওয়া বিপদজনক। মানেকারমোর আগে চাঙ্কাসপা বলে একটা ভ্যালিতে স্বল্পব্যাবহৃত একটা ক্যাম্প সাইটে আমরা ক্যাম্প১ করতে পারি।চাঙ্কাসপার পরে একটা নদীর উপর দিয়ে হেঁটে যেতে হয়, বৃষ্টিতে সেটার কি অবস্থা হয়েছে কে জানে, কিন্তু এই ঠান্ডায় রাতের বেলা ঐ পথ না মারানোই উচিত।

হরীনের পাল।


ছবি তুলতে গেলে ভয় তো পেলই না উলটো পোজ দিতে ব্যাস্ত।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে চাঙ্কাসপাতে পৌছালাম।ভ্যালির একপ্রান্তে পাথর পরিষ্কার করে ক্যাম্প সাইট বানানো। এক লোক এই ভুতের এলাকাতেও একা একা থাকে,গরম চা, নুডলস বিক্রি করে।এখানে তাঁবু ফেলতে চাইলে পার টেন্ট ১০০ রুপি ফি দিতে হয়।টর্চের আলোয় তাঁবু খাটাতে লাগলাম। টেন্ট পিচ করার সহজ কাজেও অনেক সময় লাগলো কারন ঠান্ডায় লেদার গ্লাভস আর ইনার গ্লাভস পরা স্বত্তেও আঙ্গুলগুলো অসার। ভেতরে বাদাম, কাজু, পেস্তা,আখরোট, কিশমিশ আর বিভিন্ন শুকনা খাবারের মিশ্রন,বিস্কুট চা আর চকোলেট বার দিয়ে ডিনার শেষে ফেদার স্লিপিং ব্যাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ঘুমিয়ে গেলাম…হৈ হল্লা শুনে বুঝলাম থুবস্থান আর স্তেনজিং ঢুকেছে ক্যাম্প সাইটের টেন্টে…ওখানে স্থানীয় মদ বিক্রি করে দেখেছি।
-------------------------------------------------------------------------------
খুব ভোরে ঘুম ভাংলো। পায়ে ভারি বুট গলিয়ে বাইরে এসে দেখি কোয়েলের মতো দেখতে ছোট্ট মুরগী আকৃতির একদল পাখি খাবার খুঁজতে তাঁবু পর্যন্ত চলে এসেছে। সূর্য উঠেছে খানিক্ষন, কিন্তু ঠান্ডা তখনো প্রবল।নিভে যাওয়া ক্যাম্প ফায়ারে বসে মনে হলো ঢাকা শহর থেকে কতদুরে হিমালয়ের গহীনপ্রান্তরে একা। কয়েকটা পাখি বিচ্ছিরি ঝগড়া বাধিয়েছিলো পাশেই, দলে কয়েকটা সাদা খঞ্জনা দেখে মনটা আরো বিষন্ন হয়ে গেল।খঞ্জনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ খুব রোমান্টিক কবিতা লিখছিলেন-গাঁয়ের নাম অঞ্জনা, নদীর নাম রঞ্জনা, এর পারে খঞ্জনা পাখি নাচা নাচি করে।নায়িকা আর নায়কের বাড়ি কাছাকাছি,নায়িকার পোষা ছাগল নায়কের ক্ষেতে ঢুকে পড়ে এই টাইপ কি জানি।চড়ুই এর মতো পিচ্চি এই পাখিটাই শীতের শুরুতে হিমালয় থেকে উড়ে যায় ঢাকা শহরে।

পথের ভরসা, থুবস্থান দাওয়া।


হরীণের অনেক ছবি দিয়েছি, এটাই শেষ এবারের মতো।


গ্লেসিয়ার গলে নেমে আসা ছোট্ট স্রোত নিচে নেমে বিশাল হয়ে গেছে, আস্ত লোহার ব্রীজ উপরে নিয়ে যায়।

থুবস্থান আর স্তেনজিংএর ঘুম ভাংলে আমি তাঁবু গুটিয়ে বাঁধা ছাদা শুরু করলাম।দ্রুত পথে নামলাম। ওদের তুলনায় আমি এত স্লথ যে ওরা নাস্তা টাস্তা করে সব বাধা ছাদা করে রওনা দিলেও সহজেই আমাকে ধরে ফেলবে।দূর থেকেই দেখেছি পাথুরে ট্রেইলটা দুভাগ হয়ে গেছে।ডানেরটা লাল পাহাড়গুলোর ভেতরে চলে গেছে আর আমাদের পথ বাঁয়ের ট্রেইল নিচে নেমে ঝিরিটাকে ছুয়ে একদম খাড়া উপরে উঠে গেছে। লালচে দানাদার নুড়ির বড় পাহাড়টার উপরে প্রেয়ার ফ্ল্যাগ লাগানো স্তুপে হেলান দিয়ে দম নিচ্ছি এসময় স্তেনজিং আর থুবস্থান এসে ধরে ফেললো। এর পরে ধপ করে অনেকখানি নেমে বড় ঝিরি’তে নামলাম। চারদিকে ফুটবলের সাইজ পাথরে ভর্তি। এর উপরে দিয়ে হাটতে সময় লাগে প্রচুর। এসময় মেঘ এসে চারদিক অন্ধকার করে দিল। কিছুক্ষনের মাঝেই নামলো ঝুম বৃষ্টি। ভিজতে ভিজতেই পথ চলতে লাগলাম। কিছুক্ষন পরে খুব কাছেই কয়েকটা বাজ পড়ায় ভয় পেয়ে ঢুকলাম পাথরের আড়ালে। ওপাশ থেকে নেমে আসা ঘোড়া গাধা সমন্বয়ে বড় বড় কয়েকটা দল নামছিলো। কথা বলে জানলাম উপরে গত ক’দিন ধরে আবহাওয়ার জন্যে কেউই সামিট করতে পারেনি। সময় নষ্ট না করে বৃষ্টি মাথায় করেই পথ চলা শুরু,প্রচন্ড ঠান্ডায় গরম থাকার সহজ উপায় জোরে পা চালানো। ঘন্টাখানেকের মধ্যে মানেকারমো ক্যাম্পে পৌছালাম।

ওয়েলকাম টু মানেকারমো। পাহাড়ী ছাগলের খুলির অর্থ- দুষ্টু প্রেতাত্মারা নট ইনভাইটেড।
বিরাট একটা পাহাড়ী ছাগলের খুলি সাজিয়ে রেখেছে প্রেয়ার ফ্ল্যাগের নিচে। তিব্বতী বিশ্বাস মড়া প্রাণীর খুলি দেখে ভয়ে দুষ্টু আত্মারা দূরে থাকবে। মানেকারমো ক্যাম্প সাইটটা তুলনামুলক অনেক বড়। কিন্তু এখন খালি,আবহাওয়ার জন্যে কয়েকদিনে অনেকেই ফিরে গেছে, নতুন কেউ আসেনি। ক্যাম্পে পা রাখার সাথে সাথেই ম্যাজিকের মতো বৃষ্টি থেমে গিয়ে কড়া রোদ উঠলো। রোদের মধ্যে সব জিনিসপত্র রেখে আমরা মেস টেন্টে ঢুকলাম লাঞ্চ করে নিতে। লাঞ্চ টাঞ্চ শেষ করে আবার পথে নামা। অনেক বেশি উচ্চতায় উঠে এসেছি, বাতাসে অক্সিজেনের পরিমানও কম এদিকে। একটুতেই হাপিয়ে উঠি। অল্প সময় পর পর থেমে থেমে রেস্ট নিতে হয়। দুর্বল পায়ে ধীর গতিতে উপরে ওঠা। পাশের পাহাড়গুলোর মাথায় থোকায় থোকায় স্নো জমে আছে। বিষ্ময়করভাবে এখানেই সবচেয়ে বেশী ওয়াইল্ড লাইফের দেখা মিললো। হরীনের পাল, নীল গাই, পাহাড়ী ছাগল, মারমুট।যদিও এখানে পাথরে ফাঁকে জন্মানো ঘাস লতাপতার পরিমান নাই বললেই চলে। একটু পর পর মেঘে ঢাকা অশুভ সাদা রঙের একটা বড় চুড়া দেখা যায়, যেন দানবীয় একটা আইসক্রিম ধকধক করে জ্বলছে। দুই পাহাড়ের মাঝে সমতল জায়গাটাই বেজ ক্যাম্প। অবশ্য দুর থেকে কিছুই বোঝা যায়না। ক্রমেই সাদা বরফের টুকরাটা বড় হয়ে সুন্দর একটা গোল গাল তুষারে মোড়ানো চুড়ায় পরিনত হলো। এটাই গোলেপ কাংড়ি। লেহ শহর থেকে স্তোক কাংড়ির ছোট ভাই হিসাবে দূর থেকে যেটাকে দেখে এসেছি।

এটাই হলো মানেকারমো ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড! তাবু ফেলার আদর্শ এলাকা।


মানেকারমো ক্যাম্পের অফিসে গরম চায়ের আড্ডায়।
অবশেষে বেজক্যাম্পের টিলাটার নিচে এসে দাড়ালাম। আর শখানেক ফুট। ইতিমধ্যে ১৭ হাজার ফুটের মত উচ্চতায় উঠে এসেছি।বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলেও বোঝা যায়না যে বাতাসে কোন সমস্যা আছে।অক্সিজেনের পরিমান কম জানান দিচ্ছে প্রচন্ড ক্লান্তি।এর মাঝে আকাশ কালো করে মেঘ জমেছে চারপাশে।স্তেনজিং আর থুবস্থান দুজনকেই আগে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম ক্যাম্প করতে। ধুকতে ধুকতে একা একা উঠছিলাম। অক্সিজেনের অভাবে মানুষের সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হয়। তাই হয়তো সহজ রাস্তা ছেড়ে খাড়া শর্টকাট রাস্তা ধরে উঠতে গিয়ে আরো বেশী ক্লান্ত হয়ে গেলাম। একটু পর পর থেমে লম্বা শ্বাস নেই। ইজরায়েলি একটা ছেলে এসেছিল বান্ধবী আর অন্য দুই বন্ধুকে নিয়ে। সে হাইট গেইন শেষে ফেরার পথে আমাকে দেখে উলটো এপথে নেমে আসে। প্রায় জোর করে আমার কাঁধে থাকা ব্যাগটা নিজের কাধে চাপিয়ে বললো চল একসাথে গল্প করতে করতে গেলে কষ্ট কম লাগবে। একসময় বেজক্যম্পে এসে পৌছুলাম। চারদিকে অনেকগুলো তাবু পড়েছে।ঘোড়াগুলোর বাধন খুলে দেয়া হয়েছে যাতে চড়ে ফিরতে পারে। থুবস্থান ততোক্ষনে আমাদের দুটো তাবুই লাগিয়ে ফেলেছে। থুবস্থান, স্তেনজিং আর গ্যাব্রিয়েলের সাথে ঢুকলাম মেসটেন্টে ঢুকতেই নামলো তুমুল বর্ষন, বৃষ্টি নয় মার্বেলের সাইজ বরফের টুকরো।গলে যাচ্ছেনা দেখে বুঝলাম বাইরের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে। কিছুক্ষনের মধ্যেই চারদিক ধবধবে সাদা।গরম বিস্বাদ স্যুপ আর শুকনো খাবারগুলো দিয়ে পেট ভর্তি করে স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে ঢুকলাম ঘুমানোর জন্যে তখন বিকাল পাঁচটা। ঠান্ডাতে গরম স্লিপিং ব্যাগেও দাঁতে দাঁত বাড়ি খাচ্ছিলো। প্রচন্ড ক্লান্তির কারনে ঘুমাতে সময় লাগল না একটুও। ডিনারের সময়ই ঠিক হয়েছে আজ রাত দুটোর দিকে সামিট পুশে বেরুবো। শুনলাম তুলনামুলকভাবে দুপুরের কড়া রোদ ওঠায় আজকেই সবচেয়ে কম ঠান্ডা।রাস্তাও নাকি অনেক পরিষ্কার। যদি সামিট নাও হয় এডভান্স বেজক্যাম্প/গ্লেসিয়ার ফিল্ড পর্যন্ত হাইট গেইন হবে।

----আগামী কল্য সমাপ্য!<img src=" style="border:0;" /> ------

রাস্তার মধ্যেই বসে রেস্ট নেবার সময় কিছু ছবি তোলা হোক।


বেজক্যাম্পের দর্শন মিললো। মেঘে ঢাকা তুষার চুড়াটার (গোলেপ কাংড়ি) নিচে কালো পাথরে অল্প বরফ জমা জায়গাটাই বেজক্যাম্প।

প্রায় ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় বসে তোলা বেজ ক্যাম্পের ছবি।


মেঘ কেটে গিয়ে রোদ উঠলো। পাথরে জিরাচ্ছে থুবস্থান (লাল জ্যাকেট)।


ব্লু শীপের বাংলা নাম নীল-গাই। যদিও দেখতে ছাগলের মত।


ইয়াক বা চমড়ি গাই। হাই অল্টিচিউডের প্রাণী। ২হাজার মিটারের কম উচ্চতায় আনলে ইয়াক অসুস্থ হয়ে পড়ে। দ্রষ্টব্যঃ আমাদের কেওকারাডংএর উচ্চতা ৯০০ মিটার


কৌতুহলী মারমুট। পর্বতের অনেক উচুতে বাস করে, সাইজে সজারুর সমান।


অবশেষে হাজির হলাম বেজ ক্যাম্পে (উচ্চতা ১৭ হাজার ফুট)।


পাখিটাকে কি চিনা চিনা লাগে? ঠিক ধরছেন এট হচ্ছে কাউয়া (হিমালয়ান ক্রো)।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29521979 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29521979 2012-01-14 00:18:52
::::হিমালয়ান ডায়েরী৩, স্তোক কাংড়ির পথে::::
স্তোক কাংড়ি।
স্তোক কাংড়ি, হিমালয়ের লাদাখ রেঞ্জের একটা শ্বেত শুভ্র চুড়া। দৈত্যাকার পর্বত চুড়াটার উচ্চতা বিশ হাজার একশ সাইত্রিশ ফুট বা ৬১৩৫ মিটার। প্রচন্ড ঠান্ডা আর পাতলা বাতাসে অক্সিজেন স্বল্পতাই চুড়াটাতে পা রাখতে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু স্তোক উপত্যকার আশ্চর্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ওয়াইল্ড লাইফ আর তিব্বতী সংস্কৃতি ভুলিয়ে দেয় সব। আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করেন।
লাদাখিরা সকালে ঘুম থেকে উঠে অনেক দেরীতে। আবার সন্ধ্যা হতে না হতেই রাস্তা ঘাট সব খালি। পথে ঘাটে দেখা যায় শুধু ইয়ুরোপিয়ান আর ভারতীয় ট্যুরিস্টের দল। ঢাকায় এমনিতে দশটার আগে ঘুম ভাঙ্গে না। কিন্তু হিমালয়ের পরিবেশে যেন যাদু আছে। ভোর হতে না হতেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। কিচ্ছু করার থাকে না, তাই একা একাই হিম ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে নিচের ভ্যালিতে বসে কারাকোরামের শুভ্র গায়ে সুর্যদয়ের বর্ণচ্ছটা দেখি।হাড়কাঁপানো শীতে পাগল ছাড়া মর্ণিং ওয়াকে কেউ বেরোয় না। হোটেলের একটা বয় সেও সকালে উঠে। তাই সবার আগেই পাউরুটিতে পুরু করে লাগানো ইয়াকের মাখনের টোস্ট খেয়ে দিন শুরু করতে পারি। ছেলেটা দেরাদুনের বাসিন্দা, নাম ভিভেক। আমাকে বার বার শুধরে দেয়,বিবেক নয় বলো ভিভেক।
একটু বেলা হলে রাস্তায় স্কুলগামী বাচ্চাদের ভীর। তিব্বতী কনকনে হাওয়ায় মঙ্গোলয়েড গাল গুলো যেন রুজ মাখানো লাল। হাটতে হাটতে চষে বেড়ালাম ফোর্ট রোড, ওল্ড লেহ স্ট্রিট, জার্মান বেকারী, জামে মসজিদ এলাকার সবগুলো ট্রাভেল এজেন্সি। অফ সীজন তাই কেউই নিয়মিত দল পাঠাচ্ছে না স্তোকে। আমি একা শুনে যেই রকম বাজেট দিল সেটা আমার আয়ত্বের অনেক অনেক বাইরে। দুটো এজেন্সিকে বোঝাতে পারলাম, আমার এত কিছু লাগবে না। শুধু একটা তাবু আর একজন গাইড হলেই চলবে। ঘোড়া কিংবা খাওয়াদাওয়ার ব্যাবস্থা নিজেই করতে পারবো। ওরা আশা দিল খুঁজে দেখবে। জামে মসজিদের পিছনের রাস্তা দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে দেখি হঠাত এক টিপিক্যাল তিব্বতী বস্তিতে হাজির। তিব্বতী প্রাকৃতিক সৌন্দর্যতো অনেক দেখলাম। স্থানীয়দের জীবনযাত্রার সাথে পরিচিত না হতে পারলে অনেক কিছুই যেন বাকী থেকে যায়। তিব্বতী বাড়ি গুলো সবই প্রায় একই রকম। পাহাড়ের গায়ে ভাজে ভাজে থরে থরে খেলনার মতো বাড়ি। নিরেট পাথরের স্ল্যাব দিয়ে বানানো। একটা রোমশ তিব্বতী পুডল টাইপ কুকুর পিছু নিয়েছিল, একটু তুতু করতেই দেখি আদুরে ভঙ্গিতে কু কু করতে করতে পথ দেখিয়ে চলতে শুরু করলো।উপরে তাকিয়ে দেখলাম এই রাস্তাটাই ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে পাহাড়ের উপরে লেহ প্রাসাদের দিকে।


একটা তিব্বতী গুম্ফা থেকে লেহ উপত্যকা।


লাদাখের ঐতিহাসিক লেহ দূর্গ।
শহরের ঠিক মধ্যিখানে লেহ প্রাসাদ।একটা পাহাড়ের চুড়ায়। লাদাখের ইতিহাসে এর ভুমিকা অনেক। সেই সিল্ক রুটের যুগে চিনের সাথে মধ্য এশিয়ার বানিজ্যরুট ছিল। চিনের সিল্ক যেত এই পথে পাকিস্তান হয়ে খাইবার পাড়ি দিয়ে আফগান হয়ে ইরান, তুর্কি, কাশগড়, আজারবাইজান এমনকি রুশদেশে। ভারত বর্ষে আসার জনপ্রিয় রাস্তা ছিল খাইবার পাস। কিন্তু ফ্রন্টিয়ারের পাঠান উপজাতিদের (আফ্রিদি, খুগিয়ানি, শিনওয়ারি)দস্যুতা পেশায় আন্তরিক আগ্রহ থাকায় অনেকেই দুর্গম মধ্যএশিয়ার তিব্বত হয়ে ঢুকতো ভারতে। পর্যটক ফাহিয়েন খাইবার উপত্যকা বাদ দিয়ে আফগানিস্তান থেকে ভারতে আসার সময় পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে খামোখাই তিব্বত দিয়ে ভারতে ঢুকেননি (সুত্র-সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে)। মঙ্গোল ডাকাতদের থেকে সওদাগরদের নিরাপত্তা দেয়া আর সিল্করুটের বণিকদের কাছ থেকে ট্যাক্স আদায়ের জন্যে তিব্বত রাজ লেহ’তে সামরিক দুর্গ তৈরি করেন। তিব্বত রাজার বংশধররাই উত্তরাধিকার সুত্রে লেহ দুর্গের প্রাসাদের থাকতেন।প্রতিবেশী কাশ্মীর, কিংবা শিখ রাজারা নিয়মিত হামলা করলেও প্রাকৃতিক দুর্ভেদ্যতার জন্যে লাদাখ দখল করতে পারেনি। পরে মোঙ্গল ডাকাতরাও সাইজ হয়ে থাকে। কিন্তু দিল্লী সহ সারা ভারত বর্ষেই মোগলরা জেঁকে বসলে লাদাখেও চোখ পড়ে। কিন্তু ব্যাপক পরিশ্রমের কাজ বরফ মোড়া প্রানশুন্য এই উষর মরুভুমি দখলে নেয়া, আর দখল করে লুঠতরাজের জন্যে কিছু ভেরার লোম আর শুকন পাথরের খন্ড ছাড়া কিছুই থাকেনা। লাদাখ রাজ মোগলদের সাথে সন্ধি করে অনিয়মিত ভাবে ট্যাক্স দিতে রাজি হয়। লাদাখে বিশাল অংশ মুসলমান হয়ে যায়। এরপরে ইংরেজরা শিমলা’তে শীতকালীন রাজধানী করে। এসময়ই কাশ্মীর রাজ লাদাখ আক্রমন করে লেহ দুর্গ দখল করে, লাদাখ তিব্বতের থেকে আলাদা হয়ে কাশ্মীরের অংশ হয়ে যায়। তিব্বতী রাজা লেহ দুর্গ ছেড়ে দূরে আরো উপরে দুর্গম স্তোক উপত্যকায় সুরম্য স্তোক প্যালেসে চলে যান।

ইন্ডাস ভ্যালিতে লাদাখ স্কাউটের রেজিমেন্টাল সেন্টার, বিশ্বের হাইয়েস্ট ট্রেনিং গ্রাউন্ড।


গোধুলীর আলোয় সোনা রঙ ধরা স্তোক কাংড়ির তুষার শৃঙ্গ।

লাদাখের ইতিহাস নিয়ে কচকচানি বাদ দেই। মরুভুমির কড়া রোদ, কিন্তু পাহাড় বেয়ে দুর্গে যেতে খারাপ লাগছিলো না। সমস্যা একটাই এখানে আসবো প্ল্যান ছিল না। এক ফোঁটা পানি পর্যন্ত নেই। উপরে উঠে দুর্গের গেটে দেখি সাইনবোর্ড-নির্মান কাজ চলিতেছে। ঢুকে দেখি দুর্গের অবস্থা করুন। কিন্তু ভেতরে থেকে দারুন সব ভিউ পাওয়া যায়। পুরো লেহ উপত্যকা একনজরে পুরোটাই দেখা যায়। চারদিকে উষর প্রাণহীন খা খা ধুসর প্রান্তরে সিন্ধুর পার ঘেসে ছোট্ট একটা সবুজ উপত্যকায় জীবনের চিহ্ন। সেটাই লেহ শহর। দুর্গের ভেতরেই গতকালের সেই মহিলা মার্গারেটের সাথে দেখা হয়ে গেল। পায়ে বুট, মাথায় বিশাল হ্যাট, থার্মাল ফ্লাস্কে পানি। পুরো হাইকিং এর গিয়ারে হাজির। আমি বাটার স্যান্ডাল আর শুধু মাত্র ক্যামেরা হাতে এসেছি খাবার পানি ছাড়া দেখে অবাক। দুর্গের উপরে কয়েকটা স্তুপা আর মন্দির আছে। রাজার পরিত্যাক্ত নিবাসও নাকি ওখানে। দুজনে মিলে হাটা শুরু করলাম। সে একটু পর পরেই পানি খাবার জন্যে জোরাজুরি শুরু করলো। পথে আরেক কমবয়সী ছেলে জুটে গেল দলে,নাম ভিন্স। ভিন্স পুরোদস্তুর বাউন্ডুলে। বাড়ি সিডনী’তে প্রতিবছর একমাসের জন্যে বেড়িয়ে পরে। গতবছর গেছিলো দক্ষিন আমেরিকায়। আমাজনের জংগল, মাচ্চু-পিচ্চু ভিন্সের অভিজ্ঞতা বিনিময়ে যেন হিংসায় জ্বলে পুরে মরি। ভিন্স এবছরে ভারতে এসেছিল ১মাসের ভিসায়। ভালো লাগায় ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছে। কোন নির্দিষ্ট প্ল্যান নাই পরিকল্পনা নেই। গতসপ্তায় ছিল কেদারনাথে। কেউ একজন লাদাখের কথা বলায় চলে এসেছে। আগামী সপ্তাতে কই থাকবে এখনো ঠিক করেনি। উপরের মন্দির গুলো ঘুরে উলটো পথে নামলাম শহরে। জার্মান বেকারী এলাকায় নেমে তিনজনে মিলে রুফটপ রেস্টুর্যারন্টে লাঞ্চ শেষে হোটেলে ফিরলাম তখন চারটা বাজতে ১৫ মিনিট বাকী। হোটেলের রিসেপশান থেকে চাবি নেবার সময় ভিবেক একটা নোট ধরিয়ে দিল।হাতের লেখা পড়তে ধস্তাধস্তি করতে হয়, যা বুঝলাম পিটারের লেখা। সে আমার মেইল পেয়ে হোটেলে এসে ঘণ্টাখানেক বসে চলে গেছে। তার হোটেলের এড্রেস দিয়ে গেছে।আবার ফিরলাম উলটো দিকে। একটু আগে জামে মসজিদ এলাকা দিয়ে বেড়িয়েছি, ওখানেই তস্যগলির ভেতরে একটা হোটেল। পিটারের রুমে গিয়ে দেখি দুনিয়ার মালপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে। পিটারের স্বদেশী বন্ধুর নাম ফিন্ট। সেও স্লোভাকিয়ান। সমস্যা তার ইংরেজী জ্ঞান ইয়েস নো ভেরী গুডের বেশী নয়। যা বুঝলাম তাদের এক্লামাইটেজশান প্ল্যান মাঠে মারা গেছে। ফিন্ট এর দিনের আদ্ধেকটা সময়ই কাটছে বাথরুমে। হাই অল্টিচিউড সিকনেসে প্রথম ধাক্কাতেই সমস্যা হয় বাথরুম ঘটিত। পিটারকে নিয়ে নিচের তিব্বতী রেস্তোরাতে বসলাম। আমি জানালাম ঘুম না হওয়া ছাড়া আমার আর কোন সমস্যা হচ্ছেনা। সে অভিজ্ঞ পর্বতারোহী, একটা স্ট্যাপলারের মতো যন্ত্র নিয়ে আমার আঙ্গুলে ঢুকিয়ে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাপ দেখিয়ে দিল। স্বাভাবিকের চেয়ে ১০% কম,অর্থাৎআমিও এক্লামাটাইজড হইনি। মাউন্টেন সিকনেস দুধরনের। একটাতে বোঝা যায়, অর্থাৎ পেট খারাপ, মাথা ব্যাথা এই লক্ষনগুলো দেখা যায়, আর অন্যটাতে কোন সিমটম না দিয়ে হঠাত করেই কলাপস করে। তবে পিটার আর তার সঙ্গীর অবস্থাও সঙ্গীন। ওরা মিনিমাম আরো এক সপ্তাহ লেহ’তে বসে থাকবে। এত দিন কেন? পিটার একতারা কাগজ বের করলো পকেট থেকে আজকেই সারাদিন সাইবার ক্যাফেতে বসে সে হিসাব করেছে। লাদাখ মরুঅঞ্চল, এখানে বৃষ্টি হয়না বললেই চলে। কিন্তু ওয়েদার ফোরকাস্ট বলছে দু তিনদিনের মাঝেই বৃষ্টি নামবে, আর সেটা আরো তিন চারদিন থাকবে। ও গতবছরেও স্তোক কাংড়ি সামিটের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেবারেও বৃষ্টি নেমেছিল। পুরো রাস্তায় কোমড় পর্যন্ত বরফ জমে কেলেংকারী অবস্থা। বাধ্য হয়ে ফিরে এসেছিল, এবারে সেই সমস্যাতে পড়তে চায়না।


তিব্বতী কুকুর।



মনক্ষুন্ন হয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। আমার এক সপ্তাহ অপেক্ষা করার উপায় নেই। ঢাকায় ফিরে অফিস ধরতে হবে। সিদ্ধান্ত নিলাম যা থাক কপালে ওদের ছাড়াই রওনা দেব। সন্ধ্যায় আবার ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর সাথে কথা বললাম। একজনকে রাজী করালাম আমার শুধু একজন গাইড যোগার করে দাও। আর দরকার হবে আইসবুট, আইসএক্স, ক্রাম্পন (গ্লেসিয়ারে হাঁটার জন্যে বুটের নিচে লাগান একধরনের কাঁটার ফ্রেম)। একটা তাঁবুও লাগবে, আল্পাইন পোষাক আশাক, স্লিপিং ব্যাগ এসব ঢাকা থেকেই এনেছি।এজেন্সির মালিকের নাম রিনচেন ওয়াংচুক গোবা। চেহারা নামের মতো গোবেচারা হলেও বুঝলাম ধুরন্ধুর চালাক।আগে মাউন্টেন গাইড ছিল, এখন ট্রাভেল এজেন্সি খুলে বসেছে। দুনিয়ার দরদাম করে অবশেষে একটা যুক্তিসঙ্গত রেটে রফা হলো।
সকালে ঘুম ভাংলো ফোনের আওয়াজে, ভিভেক জানালো র্যা ফটিং এর টিম এসে হাজির। টাকা এডভান্স করেছিলাম আজকের ইন্ডাস উপত্যকায় হোয়াইট ওয়াটার র্যা ফটিং এর জন্যে। ওরা নির্ধারিত সময়ের আধাঘন্টা আগেই হাজির। এদিকে আমার ঘুম ভেঙ্গেছে স্বাভাবিকের চেয়ে একঘন্টা পড়ে, কোন মতে রেডি হতে না হতেই দরজায় কড়া নারতে শুরু করলো, খুলে দেখি গাট্টা গোট্টা তিব্বতি ছেলে, সেই নাকি র্যা ফটিং টিমের লিডার। দুই লাফে নিচের মাইক্রোবাসে উঠলাম। বাসে যাত্রি বলতে র্যা ফটিং কোম্পানির ড্রাইভার আর লিডার আর একটা মেয়ে। কোনদেশী দেখে বোঝা গেল না, নাম জিজ্ঞেস করাতে জানালো সাবরিনা, এসেছে ইটালি থেকে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, র্যা ফটিং খুব চ্যালেঞ্জিং হবার কথা, আমি আগে কখনো করিনি শুধু টিভিতেই দেখেছি, তুমি করছো?
সে বেকুবের মতো জিজ্ঞেস করলো, ব্যাথা লাগে নাকি?
বাস এয়ারপোর্টের পাশ দিয়ে নিচের ক্যান্টমেন্ট এলাকায় নেমে এল, সিন্ধু উপত্যকা ঘিরে উষর মরুভুমির বুকে রাস্তা। একটু পর পর সেনা চৌকি। মাইক্রোটা নামলো একদম সিন্ধুর গা ঘেষে। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে ছোট্ট পাহাড়ি নদী-সিন্ধু। সাইজে পদ্মা মেঘনা না, সাঙ্গু-রেমাক্রি (শুকনা মৌসুমের) সাথে পাল্লা দিতে পারে, কিন্তু উচ্ছলতা? আস্ত ডাকাতিয়া নদীকে যদি সাঙ্গু আকৃতির ফানেল দিয়ে বের করতে চাইলে যা হবে তেমন। সাবরিনা আর আমি নদির পাড়ে নামলাম। তার সাথে কথা বলা চরম বেকুবি, নির্বোধের মতো প্রশ্ন করে যে মাথা গরম হয়ে যায়। ড্রাইভার আর লিডার র্যা ফটে বাতাস ভরতে লাগলো। এসময় একটা হোটেলের গাড়িতে করে মাঝবয়সি এক চাইনিজ দম্পত্তি এসে হাজির। দুজনেই হাফপ্যান্ট বুশশার্ট আর হ্যাট পড়া, প্রচন্ড গোপ্পি। কথা বলার মানুষ পেয়ে যেন হাফ ছাড়লাম।
র্যা ফট লিডার সবার মাথায় হেলমেট আর হাতে প্যাডেল ধরিয়ে দিয়ে র্যা ফট পানিতে নামালো। আমাদের বলে দিল ভয়ের কিছু নেই, কিন্তু খুব দুঃখের ব্যাপার পানি খুব বেশী উথাল পাথাল তোমরা সহজে ছবি তোলার চান্স পাবানা। র্যা ফটের সাথে সেফটি বেল্ট দিয়ে তোমাদের বাইন্ধা রাখবো, তাই ভয়ের কিছু নেই, যদি তারপরেও ছিটকে পড়, আমরা দড়ি দেব, জাস্ট সেইটা ধরে ঝুইলা থাকবা,কিভাবে র্যা ফট থেকে পড়ে গেলে টেনে উঠাতে হয় সেটা কয়েকবার দেখিয়ে দিয়ে শুরু হলো রোমাঞ্চকর যাত্রা।


রয়াল এনফিল্ডের গর্জন তুলে মরুর বুকে উড়ে চলার নামই রোমাঞ্চ!


মোটর সাইকেলপ্রেমীদের জন্যে স্বপ্নের রুট।
সিন্ধু উপত্যকায় প্রচন্ড রোদ চামড়ায় কামড় ধরায়, অথচ নদীর বরফ গলা পানি হিম শিতল, বেশিক্ষন আঙ্গুল ডুবিয়ে রাখা যায়না, ঢেউ এসে বার বার শরীর ভিজিয়ে দেয়। প্রবল স্রোতের টানে র্যা ফট ভেসে যেতে লাগলো, তারপরে ধপ! লিটারেলি ধপ করে নদীর একটা স্লোপ থেকে আরেক স্লোপে। এখানে পানির রঙ সাদা। উত্তাল ঢেউ, জায়গায় জায়গায় পাথরের ফাঁকে ঘুর্ণি। র্যা ফট যেন পাগল হয়ে গেল।র্যা ফট লিডার খুব ভালো নিয়ন্ত্রনের মাঝে এর ফাঁক দিয়ে নৌকা টানতে লাগলো। আমাদের মাঝে মাঝে নির্দেশ দেয়। সামনে আমি আর ইটালিয়ান মেয়েটা (ওকে সামনে টানতে বললে পিছনে টানে, পুরো নৌকা চককর খেতে থাকে), আর পিছে সেই চাইনিজ দম্পত্তি। একটু পর পর হিমশিতল পানি মাথার উপর দিয়ে চলে যায়, নাক দিয়ে বরফ গলা পানি ঢুকে খাবি খাই, সবাই উত্তেজনায় গলা ফাটিয়ে চিতকার দেই, আর পিছের সেই চাইনিজ মহিলা গলা ফাটিয়ে হাহাহা করে হাসে- কি মজা কি মজা!!! রোলার কোষ্টার রাইডের সাথে এর কোন তফাত নেই, শুধু একটাই রোলার কোষ্টার মিনিট খানেকেই শেষ হয় আর এটা চলবে দুপুর পর্যন্ত। চারদিকে মাথা উচিয়ে দাঁড়ানো বিশাল বিশাল ন্যাড়া পাহাড়,প্রাণের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। প্রায় একঘন্টা চলার পরে একটা খাড়া দেয়ালের মতো পাহাড় পেলাম। একদল রক ক্লাইম্বার হার্নেসে ঝুলে ঝুলে ক্লাইম্বিং করছে। আরো পরে একটা উষর প্রান্তরে কয়েকটা তাঁবুও পেলাম, কজন ক্যাম্পিং এ এসেছে। ধারে কাছে মাইলের পর মাইলে কয়েকটা কাঁটাঝোপ ছাড়া গাছ গাছালিও নেই, এখানে কি করে? মাথার উপরে মরুভুমির সূর্য ঠাঠা রোদ ছড়াচ্ছে, কিন্তু এর মাঝেই কাঁপতে কাঁপতে প্যাডাল মারছি। প্রবল ঠান্ডা পানি একটু পর পরেই মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে শরীরকে ভিজে একসা করে দিয়ে।
ন’টার দিকে শুরু করেছিলাম। একটার দিকে চাডার রিভারে এসে হাজির। সিন্ধুর স্বচ্ছ ঘোলা পানি চাডারের ধুসর পানির সাথে মিশেছে। জায়গাটাকে বলে সাঙ্গাম। দূরে গাছপালা ঢাকা একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছে। লাল লাল বিশাল পাহাড়গুলোর ছায়া পড়েছে চাডারের কাজল কালো পানিতে। লিডার ছেলেটা বললো, কেউ বাজি লাগবা আমার সাথে? এখান থেকে চাডারের পানিতে সাঁতরে পারে যাবে। মাথার উপর কড়া গনগনে রোদে হিমশিতল পানিতে সাতার? কি মনে করে হাত ডুবালাম পানিতে… প্রবল ঠান্ডায় আঙ্গুলের প্রতিটা গাঁট যেন কুকড়ে গেল।
র্যা ফটিং শেষ হলে সবাই মিলে গেলাম লাঞ্চে, নিম্বু গ্রামে। বড় বড় গাছে শোভিত ছোট্ট তিব্বতি গ্রাম নিম্বু। একটা বাড়ির পাথুরে দেয়ালের ভেতরে বিশাল উঠানের ভেতরে লাঞ্চ টেবিল। আমরা কাপড় চোপড় চেঞ্জ করে হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসলাম। চাইনিজ দম্পত্তিটার সাথে আলাপ করে অনেক মজা পেলাম। ওরা হংকং এর লোক। প্রচন্ড ঘুরতে ভালোবাসে। তিব্বত, লাসা, মঙ্গোলিয়া অনেক ঘুরেছে। ওরা জানাল তিব্বতের এক গুম্ফায় নাকি একটা ভেষজ ওষুধ পাওয়া যায়, যেটা খেলে অল্টিচিউড সিকনেস কিচ্ছু করতে পারেনা। ওরা এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পেও গিয়েছিল (তিব্বতের সাইডেরটা)। ওখানে সবাই যখন অল্টিচিউড সিকনেসে কাইত ওরা তখন মজা করে ছবি তুলছিলো সেই ওষূধের কল্যানে। গল্প ঘুরতে ঘুরতে চলে গেল জেমস হিলটনের তিব্বত নিয়া অসামান্য সায়েন্স ফিকশান লস্ট হরাইজনে। শুনলাম তিব্বতে সত্যি সত্যি নাকি শাংড়ি লা নামের একটা উপত্যকা আছে। আগে অন্য নাম ছিল, ট্যুরিস্ট আকর্ষনের জন্যে এখন এই নাম নিয়েছে।

লেহ দূর্গের উঠান থেকে, পাখির চোখে লেহ নগর। পিছের নিচের অংশটা সিন্ধু উপত্যকা, এর পিছে ছোট পাহাড়গুলর পিছে আইসক্যাপ বসানো পর্বতচুড়াগুলোতে রয়েছে স্তোক কাংড়ি, গোলেপ কাংড়ি এবং দুর্ধর্ষ সাসের কাংড়ি।


মোটর সাইকেল রাইড।
দুটোর মধ্যে ফিরে এলাম হোটেলে। শুধু কাপড়টা চেঞ্জ করেই চলে গেলাম রিনচেন গোবা;র দোকানে। ওকে সাথে করে নিয়ে গেলাম ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ার্স ফেডারেশনের অফিসে। ৫০ ডলার দিয়ে পারমিট নিলাম স্তোক ক্লাইম্বিং এর। আরো প্রায় শখানেক রুপি দিতে হলো বিভিন্ন প্রকৃতি রক্ষক ফাউন্ডেশানের চার্জ। ফেরার সময় ভিন্সের সাথে বেরুলাম মার্কেটে। লোভ সামলাতে না পেরে একটা রয়াল এনফিল্ড বুলেট বাইক ভাড়া করে ফেললাম। রাস্তায় গর্জন তুলে বেড়ানো দাপুটে বাইকগুলোর হার্লেডেভিডসন মার্কা রাজকীয় চেহারা, ইঞ্জিনের কানফাটানো হুঙ্কার দেখে আসলেই লোভ সামলানো দায়। রয়াল এনফিল্ড বুলেট বিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন (এখন পর্যন্ত মার্কেটে থাকা) বাইকগুলোর একটা। সেই ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানীর আমল থেকেই ওরা এনফিল্ড বন্দুক, পিস্তল আর কামান বানাতো। গত শতাব্দিতে শুরু করে মোটর সাইকেল বানানো। কিন্তু পরে দেউলিয়া হয়ে কোম্পানীটাই হারিয়ে যায়, কিন্তু ভারতের চেন্নাইতে ওদের শাখাটা ঠিকই এখন বানিয়ে চলছে ক্লাসিক বাইকটা। অজ্ঞাত কারনে দেখলাম ভারতীয়রা এটা বাদ দিয়ে পালসারের পিছনে ছুটছে, ক্লাচ চেপে ধরে ইঞ্জিনে কয়েকটা গর্জন করাতেই শরীরের প্রতিটা রোমকুপ যেন রোমাঞ্চ অনুভব করলো।
শহরের বাইরে মরুপ্রান্তরে নেমে আসলাম। কই যাচ্ছি কিছুই জানিনা। একটু পড়েই অনেকগুল বাইকার গ্যাং পেলাম। হলিউডি সিনেমার হেল এঞ্জেল’রা যেন বাস্তবে… সবাই মাথায় চামড়ার হেলমেট, লেদার জ্যাকেট মুখে স্কাল আগা স্কার্ফ ঝুলিয়েছি, আর পিছে মিনিস্কার্ট পড়া হারজিরজিরে গার্লফেন্ড। আমি আর ভিন্স একলা। অজ্ঞতা ওদের সঙ্গ না নিয়ে নেমে পড়লাম মরুর বুকে, স্পিড নেই কিন্তু বাইকের ক্লাচ চাপতেই যে রকম একটা হুঙ্কার দেয় শক্তিশালী ইঞ্জিন নিজেকে হী-ম্যান মনে হয়।
রাতে একটা জামে মসজিদের নিচে একটা দোকানে বসে কাশ্মীরি কাবাব আর রুটি খেতে খেতে দেখি গায়ে টুক করে ক-ফোঁটা বৃষ্টি পড়লো। বুকটা ছ্যাত করে উঠলো। কাল থেকে থাকবো পর্বতের গভীরে। ঐ উচ্চতায় ওরকম বৈরি পরিস্থিতি বৃষ্টি হলেই গেছি…
(আগামী পর্বে শেষ, আপাতত টুবি কন্টিনিউ)।



মাইলের পর মাইল শুধু জনশুন্য মরুপ্রান্তর।


লাল পাহাড়ির দেশে...


লেহ দূর্গ।


টিপিক্যাল তিব্বতী গ্রামের উপরে লাদাখ দূর্গ।


লেহ উপত্যকা।


লেহ দূর্গ।


চাডার উপত্যকা, একসময় ইয়েতি ল্যান্ড নামে ক্ষ্যাত ছিল, এখন বলে হোম অফ স্নো লেপার্ড।


সিন্দু (ইন্ডাস/ইন্দুজ) নদী।


মরুর বুকে স্বর্গদ্যান নিম্বু গ্রাম (সবুজ গাছ)


টাইম ফর হোয়াইট ওয়াটার র্র্যা ফটিং।


নিম্বু গ্রামের এই জায়গাটার নাম সাংগাম। সাদা পানির চাডার নদী আর বাঁ দিকের সিন্ধুর সংগমস্থল
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29518332 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29518332 2012-01-08 00:21:32
::::মুভী রিভিউঃ বর্ন-ফ্রি::::
এডামসন দম্পত্তি কেনিয়ার নাইরোবি’তে থাকে। জয় এডামসন আফ্রিকার সমৃদ্ধ সাভানার নির্জনতায় বসে ছবি আকেন আর তার স্বামী জর্জ এডামসন নাইরোবিতে গেম ওয়ার্ডেন। একদিন একটা গ্রামে একটা নরখাদক সিংহ ঢুকে পড়লো। বেশ ক’জন মানুষ গেল সিংহের পেটে। ডাক পড়লো দুদেঁ শিকারী জর্জের, সিংহটাকে মেরে দিতে।
বন্দুক বাগিয়ে জর্জ গেলেন সিংহ শিকারে। তার গুলিতে সিংহটা মারাও পড়লো। কিন্তু আচমকা সবাইকে অবাক করে দিয়ে সিংহটার জোড়া প্রকান্ড এক সিংহীও আক্রমন করলো শিকারীদের। বাধ্য হয়েই জর্জ এটাকেও গুলি করে ভুপাতিত করে দিলেন। কিন্তু তখন দেখা গেল এই সিংহ পরিবারে হাজব্যান্ড ওয়াইফ ছাড়াও ৩টে ছোট ছোট বাচ্চা আছে। এদেরকে বনে ফেলে আসা যায়না। জর্জ নিয়ে এল তিনটাকেই তার বাড়িতে। জর্জের স্ত্রী জয় পরম মমতায় লেগে গেল সিংহের বাচ্চা পালনে। কিন্তু ৩টেই ভয়ঙ্কর দুষ্টু। এদের অত্যাচারে বাসার সবার জীবন ঝালাপালা। বাসায় অতিথী আসতেও ভয় পায়। এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটা আবার দুর্দান্ত। সাইজে অন্য বোনদের চেয়ে অনেক ছোট হলেও সাহসে আর স্বভাবে ডানপিটে। জয় এর নাম দিল এলসা।

জর্জ, জয় আর এলসা।

কিন্তু তিন তিনটে সিংহী শাবককে মানুষ করা থুরী সিংহ করা সহজ কথা নয়। যতই পোষা হোক না কেন, এদের দুষ্টুমি’তে সবাই আতঙ্কে অস্থির। জর্জের অফিস থেকে বুদ্ধি দিল এদেরকে চিড়িয়াখানায় দিয়ে দিত। কিন্তু এডামসন দম্পত্তির এদের প্রতি প্রচন্ড মায়া বসে গেছে। তাই এলসা’কে রেখে বাকী দুই বোনকে চিড়িয়াখানায় দিয়ে দেয়া হলো। এলসা দিনে দিনে বড় হয়ে পূর্ণবয়স্ক সিংহীতে পরিণত হয়ে গেছে। কিন্তু বয়স বাড়লেও স্বভাব পাল্টায়নি। সারাদিন কাটে দুষ্টুমিতে। সৌখিন শিকারীরা আসে সাভানায় সিংহ শিকার করে নাম কামাতে, এরকম শিকারীর দল প্রায়ই ভুল করে বসে এলসা’কে দেখে। একদিন এলসা খেলাচ্ছলে হাতির পালকে গরম করে দেয়, হাতির দল গ্রাম ফসল ধ্বংস করে দেয়। জর্জের অফিস থেকে কড়া নোটিশ পাঠালো, এলসাকে আর সাথে রাখতে পারবেনা। ওকে এবারে চিড়িয়াখানায় দিয়ে দিত হবে। কিন্তু এডামসন দম্পত্তি চায়না তাদের প্রিয় এলসা চিড়িয়াখানায় বন্দি জীবন কাটাবে। তারা ঠিক করলো এলসা’কে রিওয়াইল্ড করবে। কিন্তু সেটা মহা বিড়াম্বনা। সারাদিন না খাইয়ে এলসাকে হরীনের পালে ছেড়ে দিলে হরীনের সাথে এলসা খেলায় মত্ত হয়ে যায়। বুনোশুকরএর উলটো ধাওয়া খেয়ে ল্যাজ গুটিয়ে উর্ধশ্বাসে পালাচ্ছে প্রকান্ড এক সিংহী-এলসা।


বর্ণ ফ্রি'র শ্যুটিং। সত্যিকারের এডামসন দম্পত্তির সামনে সিনেমার এডামসন দম্পত্তি


একসময় জয় আর জর্জের অধ্যাবসায়ে এলসা আবার বুনো হয়ে যায়, এবং ফিরে যায় অরণ্যে। কিন্তু এডামসন দম্পত্তি কিংবা এলসা কেউই ভুলতে পারেনা একে অপরকে। এলসাকে কি ওরা আবার দেখতে পারবে?

এই হলো বর্ণ ফ্রি মুভীর প্লট। কলাম্বিয়া পিকচারের ব্যানারে বর্ণ ফ্রি মুক্তি পায় সেই ১৯৬৬ সালে। রঙ্গিন ছবি কিন্তু সেই যুগের টেকনোলজি’তে। তবুও বলতে হয় এই মুভীটা দেখলে ফেভারিটের লিস্টে না রেখে পারা যাবেনা। মুভীটা বেস্ট মিউজিক আর সাউন্ডের ক্যাটাগরীতে সে সময় ২টা অস্কার পাইছিলো। আর গোল্ডেন গ্লোবে বেস্ট মুভী, বেস্ট একট্রেস আর বেস্ট মিউজিক এওয়ার্ড পাইছিলো। ওহ বলতে ভুলে গেছি, মুভীটা সত্যি ঘটনা নিয়ে বানানো।
মুভীটার টেকনিক্যাল এডভাইসর হিসাবে স্বয়ং জর্জ এডামসন কাজ করছিলেন। সিনেমায় জর্জ আর জয়ের ভুমীকায় অভিনয় করেন বিল ট্রেভার্স আর ভার্জিনিয়া ম্যাককেন্না। যারা সত্যিকার জীবনেও স্বামী স্ত্রী ছিল। এই সিনেমাটা করে তারা ওয়াইল্ড লাইফ একটিভিস্ট হিসাবে জীবন যাপন করে। ভার্জিনিয়া মারা যান ২০১০ সালে।
মুভীটার ডাউনলোড লিঙ্কঃ ডাইরেক্ট ডাউনলোড লিঙ্ক (স্টেজভু থেকে), সিঙ্গেল ফাইল .
আইএমবিডি’তে বরাবর ভালো মুভীগুলো পুউর রেটিং পায়। কেন কে জানে। তবে বর্ণফ্রি’র আইএমবিডি রেটিং ৭.১। খারাপ না।

আমার রিভিউ দেখে ভালোলাগবে আর ডাউনলোড শুরু করবেন এমন আশা করি না। তাই সত্যিকারের এলসার কিছু ছবি দিলাম। ছবি গুলো জর্জ কিংবা জয় এডামসনের তোলা।


এলসা আর তার দুই বোনকে কোলে সত্যিকারের জয় এডামসন।


জর্জের সাথে দুষ্টুমিতে মেতেছে এলসা (ছবি জয় এডামসন)


দুষ্টুমিতে রত এলসা।




গাধার পালের সামনে আতঙ্কে অস্থির।


এলসা আবার জীপ গাড়িতে না চেপে জঙ্গলে যেতেই পারেনা।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29511732 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29511732 2011-12-28 20:28:54
::::হিমালয়ান ডায়েরী, স্তোক কাংড়ির পথে -২::::
জাঙ্কসার ভ্যালি, জনশুন্য মরুপ্রান্তর থেকে স্তোকের চুড়া।

স্তোক কাংড়ি, হিমালয়ের লাদাখ রেঞ্জের একটা শ্বেত শুভ্র চুড়া। দৈত্যাকার পর্বত চুড়াটার উচ্চতা বিশ হাজার একশ সাইত্রিশ ফুট বা ৬১৩৫ মিটার। প্রচন্ড ঠান্ডা আর পাতলা বাতাসে অক্সিজেন স্বল্পতাই চুড়াটাতে পা রাখতে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু স্তোক উপত্যকার আশ্চর্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ওয়াইল্ড লাইফ আর তিব্বতী সংস্কৃতি ভুলিয়ে দেয় সব।
আগের পর্ব পড়তে এই লিঙ্কে ক্লিক করেন।

রাতের বেলাতে দিল্লীর জামে মসজিদের সামনে থেকে বিরিয়ানি খেয়ে হোটেলে ফিরেই বিল টিল সব চুকিয়ে নিলাম। কালকে খুব ভোড়ে লাদাখ যাত্রা। সারাদিন প্রচন্ড দৌড়া দৌড়ি গেছে, ক্লান্তিতে শরীর নুয়ে আসছিলো। হ্যাভারস্যাক আবার খুলে নতুন করে বাধতে হলো আজকে কেনা একগাদা জিনিসের জন্যে। সকাল সকাল শুয়েও দেখি কিছুতেই ঘুম আসেনা। লাদাখ নিয়ে টেনশান...
লাদাখ নিয়ে বাংলা ব্লগে বেশ কিছু পোষ্ট পড়েছিলাম, কেউ রেস্ট্রিকশানের কথা কিছু বলেনি। প্রথম শুনেছিলাম টিকেট করার সময় ট্রাভেল এজেন্টের কাছে। সামহোয়ার ইন ব্লগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুনতাসির ইমরান, বাংলাদেশে মাউন্টেনিয়ারিং এর পায়োনিয়ারদের একজন। গতবছরও চাডারের ফ্রোজেন রিভার ট্রেক করেছিলেন। ২০০৪এ রিফাত ভাইএর সাথে যৌথভাবে স্তোক কাংড়িতেই ট্রাই করেছিলেন। সেটা ছিল প্রথম দলগত বাংলাদেশী হিমালয় অভিযান। রিফাত ভাই সামিট করলে সেটা হয় সেসময়ে বাংলাদেশীদের সর্বোচ্চ উচ্চতার নতুন রেকর্ড। ক বছর পরে আরেকটা দলগত অভিযান হয় বাংলাদেশীদের এই স্তোকই, কিন্তু সেটা সফল হয়নি। ঈদের দুদিন আগে ইমরান ভাইএর সাথে দেখা হলো এলিফ্যান্ট রোডে, তার কাছেই শুনলাম বাংলাদেশীদের জন্যে নাকি লাদাখে নিষেধাজ্ঞা আছে, ব্যাপারটা আমল করিনি। সেই জানালো সাধারনত আটকায় না, কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী আটকানোর কথা। অনেক বাংলাদেশীই সিকিম গেছে, কিন্তু সিকিম বাংলাদেশীদের জন্যে নিষিদ্ধ। বাসায় ফিরে নেট সার্চ করে দেখলাম আসলেই যেসব দেশের সাথে ভারতের বর্ডার আছে, অর্থাৎ বাংলাদেশ, চায়না, পাকিস্তান এবং বার্মা তাদের জন্যে লাদাখের অল্প কিছু অংশ বাদে বাকী সবটাই নিষেধ। যা থাক কপালে, যাবই।



ম্যাকপাই (?) পাখি।

রাতে বিভিন্ন চিন্তায় এপাশ ওপাশ করলাম। বিশেষ করে লাদাখে ঢোকার টেনশান আর শেষ মুহুর্তে স্যামের দল থেকে নাম প্রত্যাহারের ফলে সম্ভাব্য সমস্যার কথা জোর করে মাথায় ঢুকতে লাগলো। শেষ রাতে তুমুল বর্ষন শুরু হলো, বৃষ্টির রিমঝিম গানের সাথে কখন যে ঘুমিয়ে গেছি নিজেও টের পাইনি। ঘন্টা দুয়েক ঘুম হতে না হতেই রিসিপশান থেকে ফোন, ট্যাক্সি রেডি। সকাল ৬টা বাজে, চারদিক তখনো অন্ধকার। নাস্তা করার সময় নেই, তারা তারি হ্যাভারস্যাক কাধে নিয়ে হোটেলে ছেড়ে ট্যাক্সি’তে উঠলাম। সারা রাত অঝোর বৃষ্টির ফলে এখানে ওখানে জমে থাকা পানির ফাক দিয়ে ট্যাক্সি প্রায় উড়ে চললো খালি রাস্তায়। এত তারাহুরো করেও দেরী হয়ে গেছে। তারাহুরো করে এয়ারপোর্টে ঢুকে বোর্ডিং পাস নিয়ে প্লেনে উঠে গেলাম। মোবাইল ফোন অফ করার ঠিক আগ মুহুর্তে স্যামের এসএমএস এসে ঢুকলো- ‘হ্যাভ ফান এন্ড এনজয় এ লট ইন হিমালয়ান ওয়াইল্ডারনেস। মাউন্টেনিয়ারিং ইজ নাথিং বাট ফান। আই উইশ আই ফিনিশ মাই জব আর্লি এন্ড মিট ইউ গাইজ ইন লেহ’।
মনটা ভালো হয়ে গেল। পাহাড় নিয়ে আমাদের দেশে নোংড়া প্রতিযোগিতা চলে। কে আগে উঠল কে পরে উঠলো। যে উঠে গেছে কিভাবে তাকে লেঙ্গি মেরে নিচে নামিয়ে দেয়া যায়। সবচেয়ে বড় কথা, হিমালয়ের পর্বত চুড়া গুলো এমন উচ্চতায় যেখানে পাখিও ডানা মেলে না, এখানে কেউ এসে পরখ করার নেই। অথচ পর্বাতোরহন ব্যাপারটাই হচ্ছে অর্জনের, কোন খেতাব নয়। শুধুই আনন্দের। নিজের কাছে নিজেকে প্রমান দেয়ার। ইচ্ছে ছিল এয়ারক্রাফটের জানালা দিয়ে মন ভরে হিমালয়ের ছবি তুলবো। কিন্তু দুর্ভাগ্য জানালার পাশে সীট পরেনি। পাশের সীটে গোমড়া মুখো এক লাদাখি ভদ্রলোক। পরিচয় হতেই জানালো সে একজন ব্যাবসায়ী, নাম ফুংসুক। আমি বললাম, লাদাখ নিয়ে আমির খানের মুভী আছে থ্রি ইডিয়টস। সেখানে তার নাম থাকে ফুংসুক। ভদ্রলোক সহজ হলেন। জানালেন লাদাখে আসলেই একসময় পাড় এডভেঞ্চার প্রিয় ছাড়া অন্য টুরিস্ট আসতো না। কিন্তু থ্রি ইডিয়টস বের হবার পর এক বছরেই গত পাঁচ বছরের সমান ট্যুরিস্ট এসেছে। প্লেন লাদাখের আকাশে আসতেই পাইলটের গলা শোনা গেল- লেডিস এন্ড জেন্টেলম্যান, আমরা এখন ভারতের সবচেয়ে আকর্ষনীয় হলিডে ডেস্টিনেশান লাদাখের উপরে। ওই দেখা যায় প্যাঙ্গন লেক, ঐ দেখা যায় কারাকোরাম পার্বত্য রেঞ্জ... দুর্ভাগ্য ফুংসুকের সাথে সীট চেঞ্জ করা স্বত্তেও কিছুরই ছবি তোলা গেলনা, কারন সব আকর্ষনীয় জিনিসই বিপরীত সারীতে বসাদের দিকে। ফুংসুক (এই নামটা সম্ভবত খুব কমন, রহিম করিম টাইপ। লাদাখিদের মাঝে অল্প কিছু নামই ঘুরে ফিরে আসে) জানালো ওর এক বন্ধুর ট্রেকিং এজেন্সি আছে। গাইড শেরপা যোগারে সে সাহায্য করতে পারে। ফুংসুকের নাম্বার মোবাইলে সেভ করে নিলাম। ঠিক নামার সময় বহুবর্ণা নিষ্প্রান পাথুরে পাহাড়ের মাঝে বয়ে চলা সিন্ধু নদের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিল। এরা বলে ইন্দুজ নদী। আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটের ভারত আক্রমনের সময় ইন্দুজ ঘিরেই রক্ষা ব্যুহ তৈরি হয়। প্লিনি বই লিখে জানান ইন্ডাসের ওপাশে বিশাল দেশ নাম ইন্ডিয়া।

লাদাখের লেহ শহরের কেন্দ্রস্থল ফোর্ট রোডে তিব্বতী রিফুজি মার্কেট।


লেহ দুর্গের এক গুম্ফা, উষর মরুপ্রান্তরে সবুজ ছোয়া লেহ শহর।


লাদাখের কেবিআর এয়ারপোর্ট বিশ্বের সবচেয়ে উচু বিমানবন্দর গুলোর একটি। পুরো নাম কুশক বাকুলা রিমপোচে এয়ারফিল্ড। লেহ শহরের উচ্চতাই প্রায় ১২ হাজার ফুট (জম্মু এন্ড কাশ্মীর ট্যুরিজম বোর্ডের গাইড বই অনুযায়ী)। চারদিকে সামরিক প্লেনের ছড়াছড়ি। দৈত্যাকার ২টা সি১৩০ হারকিউলিস আর অনেকক্ষন ধরে ভটভট রত একটা হালকা হেলিকপ্টারের মাঝে গিয়ে রানওয়ের মাঝেই প্লেন দাঁড়িয়ে গেল। এখানেও গ্যাংওয়ের সিস্টেম নেই। নিচে নামতেই প্রচন্ড রোদের হলকা চোখে মুখে বাড়ি মারলো। লাদাখ তুষার শুভ্র হলেও মরুভুমী কথাটা যেন মনে করিয়ে দিল। পৃথিবীর অন্যতম হাই অল্টিচিউড ডেজার্ট। বাসের জন্যে অপেক্ষা করতে করতেই ফুংসুক আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, ঐ যে সাদা চুড়াটা দেখছো ওটার নাম সাসের কাংড়ি। সাসের কাংড়ি খুবই কঠিন এক্সট্রিম লেভেলের পিক। আর ঐ যে সাদা চুড়াটা দেখছো ওটাই তোমার স্তোক কাংড়ি। আমি মোহিত হয়ে ডুয়াল পিক (স্তোক কাংড়ির পাশে ১৬ হাজার ফুটের আরেকটা যমজ চুড়া আছে নাম গোলেপ কাংড়ি)। দেখছিলাম।
এয়ারপোর্টের টার্মিনাম ভবনের বাইরে এসে দেখলাম দুনিয়ার পুলিশ মিলিটারীতে গিজ গিজ করছে। বড় বড় করে লেখা-ফরেন পাসপোর্ট হোল্ডার্স। সব বিদেশী নাগরিককে লাদাখে ঢোকার আগে আলাদা ভাবে আর্মির কাছে নাম ধাম লিখে আসতে হয়। আমি সবুজ পাসপোর্ট হাতে নিয়ে সেদিকে এগুতেই কম্ব্যাট পড়া আইটিবিপির (ইন্ডিয়া টিবেট বর্ডার পুলিশ- মাউন্টেনিয়ারিং জগতে এদের গৌরবজ্বল ইতিহাস রয়েছে) একজন বললো- এটা শুধু ফরেনার’দের জন্যে। তুমি এদিকে যাও। পরে আটকে দেয় কি না কে জানে। তাই আমি কথা না বাড়িয়ে সোজা বাইরে চলে এলাম। ফুংসুকের কোন চিহ্ন নেই। ফোন দেব ভেবে মোবাইল বের করে দেখি নেটওয়ার্ক নেই। একজন জানালো লাদাখে বাইরের মোবাইল কাজ করে না। শুধু পোষ্টপেইড অথবা লাদাখে রেজিস্টার্ড প্রিপেইড চলে। ইন্টারন্যাশনাল রোমিংও চলে না। গুগল আর্থ কাজ করবে না, কিন্তু অবাক হয়ে দেখি মোবাইলের জিপিএসও কাজ করছেনা।

বাঁয়ের ছোট্ট দেখা যাচ্ছে সাদা মন্দিরটাই শান্তি স্তুপা, ছবির ডান দিকে খারদুংলা যাবার রাস্তা। খারদুংলা পৃথিবীর সবচেয়ে উচু মোটরেবল রাস্তা।


গোধুলী আলোয় শান্তি স্তুপা।


স্যাম জানিয়েছিল আগের বার সে কারজু’তে একটা ট্যরিস্ট লজে ছিল। সোজা প্রিপেইড ট্যাক্সি নিয়ে কারজু’তে এসে দেখি ট্যাক্সি ড্রাইভার বলছে সেই লজের সে নামও শুনেনি। একটা বড় বোর্ডে ঐ এলাকার সব হোটেল-লজ-গেস্ট হাউজের লিস্ট আছে, সেখানেও নেই। ওটা অবশ্য কোন বড় লজ না। ব্যাগপ্যাকার কিংবা মাউন্টেনিয়াররা স্বস্তায় রাতে ঘুমানোর জায়গা। বিছানা আর কমন বাথরুম ছাড়া আর কোন সুবিধা নেই। অনেক ঘুরে ফিরেও হদিশ পেলাম না। এদিকে জানি যে পিটার আর তার সঙ্গীও আসবে আজকে বিকেলে, এসেই তারা এই লজেই আমাকে খুজবে। ঢাকা থেকেই রিনচেন নামের এক হোটেল মালিকের নাম্বার নিয়ে এসেছিলাম। গতকালকে তাকে ফোনও দিয়েছিলাম। তার হোটেলটা ওল্ড লেহ সিটি’তে। বাধ্য হয়ে সেখানেই গেলাম। রিসেপশান জানালো তাদের সব রুমই বিক্রি হয়ে গেছে। এখন কই যাই? খামোখাই চাপা পেটালাম, রিনচেন আমার বন্ধু মানুষ। তার সাথে কথা হয়েছে। ওরা রিনচেনকে ফোন দিয়ে বললো, বাংলাদেশ থেকে একজন এসেছে। আমি রিনচেনের ভাই’এর থ্রু দিয়ে এসেছি। কিন্তু সেও নাই। একটা সুইস টিম নিয়ে ক্লাইম্বিং এ গেছে। রিনচেন জানালো সে এসে একটা ব্যাবস্থা করবে।
রাতে ঘুমিয়েছি ২ঘন্টারও কম, তাছাড়া দিল্লীর ৭০০ফুট উচ্চতা থেকে দুঘন্টায় লেহ এর ১২হাজার ফুটের উচ্চতায় চলে এসেছি; শরীর জানান দিচ্ছিলো। প্রচন্ড ক্লান্তিতে লবিতেই ঝিমাতে লাগলাম। অল্পক্ষনেই রিনচেন এসে হাজির। ব্যায়াম পুষ্ট মাসকুলার একজন। চেহারা হলিউডি নায়কদের মতো। সিনেমা’তে যে আগ্রহ বোঝাই যায়। লবি’তে বিশাল বাধানো ছবি হৃত্বিক রোশানের কাধে হাঁত দিয়ে দাঁড়ানো। রিনচেন জানালো কালকে আমি কিছু কনফার্ম করিনি দেখে শেষ রুমটাও আজকে বিক্রি করে দিয়েছে। তবে আপাতত সে একটা পাবলিক রুমে বিছানা পেতে থাকার ব্যাবস্থা করে দিল। পুরো প্রাইভেসী থাকবে। কিন্তু বাথরুম নেই, যেতে হবে লবির বাথরুমে। আজকের দিনটায় থাকা এবং খাওয়া ফ্রি। কালকে সকালে রুম দিলে চার্জ করা শুরু। রিনচেনের হোটেলটা ছিম ছাম সাজানো গোছানো আর আধুনিকও। ভেতরে এক চিলতে লন আর চারপাশে অনেক লতানো গাছ, মরুভুমির মরুদ্যানের মতোই। জুনিপার গাছ চিনতে পারলাম। হোটেলটার একমাত্র সমস্যা খাবার। অজ্ঞাত কারনে এরা কোন নন ভেজ খাবার রাখেনা। তিনবেলা শাক শবজি চিবুতে কাহাতক ভালো লাগে। ক্ষুধার্ত ছিলাম তাই কোন মতে দুটো খেয়ে শুতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘরটা অনেক চেষ্টা করেও আলো কমলো না। ৩টার মধ্যে আবার জেগে গেলাম। বেরুলাম লাদাখ দর্শনে।
হোটেলের ঠিক সামনেই এক তিব্বতী মহিলা কোলে বাচ্চা নিয়ে একটা সাইবার ক্যাফে কাম ফোন ফ্যাক্সের দোকান চালায়। স্যাম’কে ফোন করে সব জানালাম। স্যাম জানালো কারজুর ঐ গেস্ট হাউজের নাম্বারে সে সারাদিন ফোন করেও কানেকশান পায়নি। এদিকে পিটারদের সাথে যোগাযোগের কোন উপায় নেই। পিটারকে একটা মেইল পাঠিয়ে দিয়ে হেটে বেড়ালাম রাস্তায় রাস্তায়।

আকাশ থেকে শ্বেত শুভ্র সাসের কাংড়ি থ্রি। পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদজনক এক্সট্রিম ক্লাইম্বের একটা।


সারাজীবন বই পত্রে কতই না রোমাঞ্চকর গল্প পড়েছি। আকাশ থেকে দেখা স্বপ্নময় কারাকোরাম রেঞ্জ।


লেহ অনেক ছোট শহর। নিচে সিন্ধু নদী বয়ে চলেছে। এর পাশ ঘিরেই এয়ারপোর্ট আর আর্মির গ্যারিসন। ঠিক মাঝা মাঝি বড় একটা পাহাড়ের উপরে লেহ প্রাসাদ পুরো শহরের সবখান থেকেই দেখা যায়। উত্তরে শান্তিস্তুপা আর কারজু, কম দামী গেস্ট হাউজ আর ব্যাকপ্যাকারদের লজ এখানে, দক্ষিনে প্যালেস রোড, পোলো গ্রাউন্ড এর মাঝা মাঝি জায়গায় স্বস্তায় হ্যান্ডিক্রাফটের জিনিস আর সেকেন্ড হ্যান্ড পশমি জ্যাকেট আর বুটের দোকান, স্থানীয়রাই ক্রেতা। প্যালেসের অপর দিকে স্থানীয়দের বসতি আর কিছু সরকারী কোয়ার্টার। ঠিক নিচেই মেইন বাজার, মুসলিম পট্টি, লাইব্রেরী রোড আর ফোর্ট রোড। অধিকাংশ স্যুভেনির শপ, ট্রাভেল এজেন্সির অফিস এখানটায়। রাস্তাটা দুভাগ হয়ে গেছে, একটা ফোর্ট রোড আর আরেকটা ওল্ড লেহ রোড। দুটোই টুরিস্টদের হোটেল এলাকা। দুটো রাস্তার সংযোগে টিবেটিয়ান রিফুজি মার্কেট। চিনের অধিগ্রহনের পরে উদ্বাস্তু তিব্বতীদের দোকান পাট, দেখার মতো এলাকা। সংযোগের একদিকে তিব্র শব্দ করে নেমে আসা পানির নালা, পাথরের দেয়ালের মাঝে। এখানে জার্মান বেকারী টুরিস্টদের আড্ডা (মুলত ইউরোপিয়ান) জায়গা।
হাটতে হাটতে উপরে উঠে প্রথমেই ঢুকলাম তিব্বতী রিফুজি মার্কেটে। তিব্বতি পোষাক, থাঙ্কা (দেয়ালে ঝোলানো একধরনের ধর্মিয় ছবি+লেখা) আর নানা কারুশিল্প আর অলঙ্কার। প্রচুর জপ যন্ত্র (এগুলো ঘোরালে ভেতরের চাকা লাগানো দাতে ইশ্বরের নাম জপ হয়, আর ঘোরানো ব্যাক্তি পূন্য হাসিল করে) দেখলাম। ঘুরে ঘুরে কারজু হয়ে আবার মুসলমান পট্টির ওদিক দিয়ে পোলো গ্রাউন্ডের দিকে হাটা। তিব্বতী ফেস্টিভ্যাল চলছিল লাদাখে। সিনেমা টিনেমাতে দেখেছি খুব বর্ণিল হয়। আজকের উৎসব পোলো গ্রাউন্ডে। পরে দেখলাম থাঙ্কা প্রদর্শনী আর গেলাম হয়না। একটা প্রকান্ড জপ যন্ত্র দেখলাম, সাইজে দশ ফুটের মতো হবে। যান্ত্রিক উপায়ে চালানো হয়। কিন্তু জপ যন্ত্র ঘুরলে যে পূণ্যটা হয় সেটা মেশিনের না হয়ে মেশিন প্রতিষ্ঠাতার ঘরে জমা হয় বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। যন্ত্রটার ব্যাকগ্রাউন্ডে আকাশ আটকে রাখা তুষার শুভ্র স্তোক চুড়ায় গোধুলীর চুড়া। ছবিটাকে ফ্রেমে আটকানোর চেষ্টা করছিলাম, আমাকে দেখে এক বৃদ্ধা মহিলাও ক্যামেরা খুলে একই কাজে ব্যাস্ত হয়ে গেলেন। মহিলার পকেট ক্যামেরায় বিশেষ সুবিধা হলো না, কিন্তু গল্প জমে গেল। নাম ম্যারিয়েন। ব্রিটিশ মহিলা। স্বামীর সাথে লাদাখ ঘুরতে এসেছেন। স্বামী তাকে রেখে চলে গেছেন স্তোক কাংড়ির জন্যে। তারা অবশ্য বিশাল দল নিয়ে এসেছে। মহিলা আক্ষেপ করে বললেন স্বামীর বয়স ৫৫ বছর কিন্তু এখনো সে মেনে নিতে পারেনি যে তার ৩৫ পার হয়েছে অনেক কাল আগে। মহিলা প্রথমে আমাকে স্থানীয় ভেবে, অনেক জায়গা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিলেন। আমি জানালাম আমি এসেছি বাংলাদেশ থেকে। মহিলা জানালেন উনি ইংল্যান্ডে একটা স্কুলের টিচার ছিলেন। এক সিলেটি পরিবারের কিছু বাচ্চাকে পড়াতেন। সিলেটি কত্রী কিছু হলেই তাকে বাসায় খাবার দাওয়াত দিতেন। এত অমায়িক পরিবার উনি লন্ডনে দেখেন নি। সন্ধ্যা মেলাবার পরে কিছু করার নেই। ফোর্ট রোডে ট্রাভেল এজেন্সি গুলো’তে ঢু মেরে মেরে বেড়ালাম স্তোক কাংড়ির জন্যে কোন প্যাকেজ কিংবা দল যোগার করতে পারি কিনা। কিছুই কপালে জুটলো না।
মসজিদের ওপাশে সব কাশ্মীরিদের দোকান। কাশ্মিরি কাবাবের দোকান দেখে সাগ্রহে বসে গেলাম। পাঠার মাংসের কাবাব। খেতে খারাপ না, মুস্তাকিমের মগজ ভাজা কিংবা বাটি চাপের সাথে তুলনায় গেলাম না। তবে হোটেলে ফিরে বুঝলাম লাদাখের প্রথম দিনটা পুরোপুরি মাঠে মারা গেছে। ৩দিন একলামাটাইজেশান। আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নেয়া। এর মাঝেই সব আয়োজন শেষ করে স্তোকের পথে রওনা হতে হবে।

আকাশ থেকে দেখা আমার গন্তব্য, স্তোক কাংড়ির চুড়া। ২০ হাজার ফুট উচ্চতার চুড়াটা, কমার্শিয়াল জেট লাইনারের উচ্চতায়।


উষর নিষ্প্রান মরুময়... মারখা ভ্যালি। অনেকেই বলে স্নো-লেপার্ডের স্বর্গভুমী।


ইন্ডাস উপত্যকায় চাডার রিভার থেকে আলাদা হয়ে গেল সিন্ধু (ইন্দুজ) নদী। ইন্দুজ বা ইন্ডাস নদীর নাম অনুসারেই আলেকজান্দার দ্যা গ্রেটের সেনাপতি দেশটার নামকরন করেন ইন্ডিয়া।


আকাশ থেকে লেহ শহর, নদীটা সিন্ধু, আর ছোট্ট এয়ারফিল্ডের নাম কেবিআর এয়ারপোর্ট। এখান থেকেই ক্যামেরা বন্ধ কেননা, লাদাখ সামরিক এলাকা হওয়ায় ক্যামেরার ব্যাপারে ভীষন সতর্ক থাকা উচিত।


স্বপ্নময় স্তোক কাংড়ি (তুষারে ঢাকা বড় চুড়াটা, ছোট চুড়াটার নাম গোলেপ কাংড়ি)




লাদাখ। পৃথিবীর সর্বোচ্চ মরুভুমীর একটি।


স্নো ক্যাপ পড়া বড় চুড়াটাই স্তোক কাংড়ি




চলবে.......................................................................................... ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29506190 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29506190 2011-12-20 00:01:49
:::: হিমালয়ান ডায়েরী- স্তোকের পথে :::
লেহ শহরের থেকে স্তোক কাংড়ির সফেদ চুড়া।

স্তোক কাংড়ি, হিমালয়ের লাদাখ রেঞ্জের একটা শ্বেত শুভ্র চুড়া। দৈত্যাকার পর্বত চুড়াটার উচ্চতা বিশ হাজার একশ সাইত্রিশ ফুট বা ৬১৩৫ মিটার। প্রচন্ড ঠান্ডা আর পাতলা বাতাসে অক্সিজেন স্বল্পতাই চুড়াটাতে পা রাখতে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু স্তোক উপত্যকার আশ্চর্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ওয়াইল্ড লাইফ আর তিব্বতী সংস্কৃতি ভুলিয়ে দেয় সব।

লাদাখি’রা বলে চরম শত্রু আর পরম বন্ধু ছাড়া কেউ লাদাখে আসে না। যোগাযোগ ব্যাবস্থার দুর্গমতা আর ভু-পৃষ্ঠ থেকে অনেক বেশী উচ্চতার কারনে একসময় কথাটা সঠিক ছিল। এখনও বাই রোডে লাদাখ যাওয়াটা বেশ কঠিন। মানালী দিয়ে রোটাং পাস দিয়ে ঢুকতে হয় তুষার পাত আর পাহাড় ধ্বসে রাস্তাটা বছরের বেশীর ভাগ সময়ই বন্ধ থাকে। আর বন্ধও হয়ে যায় তেমন কোন আগাম খবর দিয়ে, মানালী থেকে বাসের টিকেট দেবার সময় বলে দেয় রাস্তা ২ দিনের কিন্তু কমপক্ষে ৪ দিন বাসে থাকার মতো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতী নিয়ে রাখতে।
অফিস থেকে ছুটি পেতে সমস্যা হচ্ছিল, তাই এমন বায়বীয় আইটেনিয়ারি নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। যদিও জানি পাহাড়ে উঠতে গেলে প্লেনে যাবার চেয়ে বাই রোডে গেলেই বেশী সুবিধা, তারপরেও আকাশ পথে যেতে হবে।

ঢাকা থেকে লাদাখ যেতে হলে দিল্লী হয়ে মানালী যেতে হয় প্রথমে, সেখান থেকে রোটাং পাস (১৩০৫০ফুট) হয়ে লেহ। আরেকটা রাস্তা হলো কলকাতা থেকে হিমগিরী এক্সপ্রেস ট্রেনে জম্মু, জম্মু থেকে আকাশ পথে বা বাই রোডে লেহ। ঢাকা থেকে সঙ্গীরা শেষ মুহুর্তে সরে গেলে একাই যাচ্ছিলাম, ঈদের ছুটির মাঝে খালি খালি অচেনা ঢাকা ছেড়ে। কিংফিশার এয়ারলাইন্সের কলকাতা গামী যেই প্লেনটা দিল সেটাকে প্লেন না বলে পাখা লাগানো মিনিবাস বলাই ভালো। ঈদের সময়, বাংলাদেশী যাত্রী প্রচুর। প্রায় চল্লিশ মিনিট ডিলে করে প্লেন ছাড়লো, ঢাকার রৌদ্র ঝলমলে আকাশ থেকে খুব অল্প সময় কলকাতায়, আমার জীবনে প্রথম আকাশ পথে কলকাতা। কলকাতায় প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে বুঝলাম চারদিকে প্রচুর পানি জমে আছে দেখে।

কলকাতার নেতাজী সুভাস বোস বিমানবন্দরের ইন্টারন্যাশনাল কর্ণারটা দেখে হতাশই হতে লাগলো। জানি না বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোন আন্তর্জাতিক রুটের প্লেন নামে কি না। ইমিগ্রেশানে লম্বা লাইনে সবার পিছে দাড়ালাম। ইমিগ্রেশন অফিসার ছুচালো চেহারার এক দাদা। জিজ্ঞেস করলো ‘দাদা সাথে কিচু এনেচেন নাকি? ইলিশ মাচ টাচ? আমাদের জন্যে কিচু দেবেন না?” কোন কথা না বলে এক দৃষ্টিতে তাকাতেই নিজেই স্বগোক্তির মতো উত্তর দিল, ঠিক আচে ঠিক আচে পড়ের বার।

ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ভবন

দিল্লীর সরাসরি ফ্লাইট না পাওয়ায় কলকাতায় ৪ ঘন্টার যাত্রা বিরতী। সহযাত্রীরা সবাই ঢুকলো ডিউটি ফ্রি শপে, ঠিক করে বলতে গেলে লালপানির কর্ণারে। দেশের বাইরে এলেই সবার খুব পিপাসা পায় ঘন ঘন। গেট দিয়ে বাইরে বেরুতেই একদল ট্যাক্সি ড্রাইভার বললো চলুন দাদা ডোমেস্টিকে নিয়ে যাই, অল্প খরচে নিয়ে যাব। কথাটার মানে ঠিক মতো বুঝলাম না, ডোমেস্টিক এখান থেকে শ খানেক ফুট দুরত্বও না। এটাতে অল্প খরচে ট্যাক্সি কিভাবে নেবে? আমার চেহারায় মনে হয় বেকুব বেকুব ভাব আছে। ডোমেস্টিকের বাইরে একটা দোকান থেকে ভারতীয় সীম কিনে দিল্লীতে স্যাম আর হোটেল ওয়ালাদের সাথে কথা হলো। স্যাম এই যাত্রায় আয়োজক। ঢাকা থেকে সঙ্গী কাউকে না পেয়ে ইন্টারনেটে মাউন্টেনিয়ার্সদের ফোরামে খোজা খুজি করে স্যাম, পিটার হানুসিক আর তার বন্ধুর সাথে ভীরেছি। স্যামের কাজ সব যোগারযন্তর করা। পিটার আর তার বন্ধু বিশ হাজারী চুড়াটায় ওঠার আগে প্রস্তুতী নিতে একটা ট্রেকে গেছে, যোগাযোগের কোন উপায় নেই। এয়ারপোর্টের সামনে ফুটপাথে দর্শনীয় ভাবে ফুলে থাকা হ্যাভারস্যাক, স্লিপিং ব্যাগ, ম্যাট আর অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে বসে থাকলাম ঘন্টাখানেক, ৪০০ বছরের সিটি অফ জয়ের আকাশে সূর্য ডুবে গেলে ঢুকলাম ভেতরে। ইন্টারন্যাশনালের তুলনায় ডোমেস্টিকের শান শওকত অনেক বেশী, ঝকঝকে আধুনিক। দিল্লীগামী এয়ারবাসটাও অনেক ভালো।

রাজপথ, দূরে ইন্ডিয়া গেট।

চেক ইন ঢাকা থেকেই করে এসেছিলাম, তাই বিশেষ ফর্মালিটিস ছিল না। এই ফ্লাইটটাও ডিলে প্রায় ৪০ মিনিট। পাশের সীটে গেরুয়া পরিহীত এক মাথা কামানো সাধু বসলেন, চেহারা অবিকল ইন্ডিয়ানা জোনসের প্রথম পার্টের অমরেশপুরীর মতো চেহারা এবং বেশভুষা। প্লেন টেক অফের পর পরেই প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হয়েছিল, বাম্প করছিল অনেক বেশি, কিন্তু সহযাত্রী সাধুবাবার ধ্যানে এরপরেও ব্যাঘাত ঘটলো না, প্লেনের ইঞ্জিনের সাথে পাল্লা দিয়ে নাক দিয়ে বজ্র নিনাদ বের করতে থাকলেন।

নয়া দিল্লীর ইন্দিরা গান্ধী এয়ারপোর্টে মুষুল ধারে বৃষ্টির মাঝে নামলাম। লাগেজ খুঁজে নিয়ে বাইরে বেরুতেই হোটেলের ড্রাইভার তিলককে খুঁজে পেলাম। ঘড়ির কাটা ততক্ষনে রাত সাড়ে ১২টা, কিন্তু কপাল খারাপ এয়ার পোর্ট থেকে বেরুতে না বেরুতেই চাকা পাংচার। ঝুম বৃষ্টিতে ছাতা ছাড়াই বেরিয়ে পড়লাম, নিয়নের সোনালী আলোর নিচে ভিজে ভিজে ড্রাইভারকে চাকা পাল্টাতে সাহায্য করলাম ভেজার উদ্দেশ্যেই।

দিল্লীর পাহাড়গঞ্জের হোটেল এলাকা, চারপাশেই খালি হোটেল। অনেক গুলো বাংলা সাইনবোর্ডও চোখে মধুবর্ষন করলো-‘এখানে বাঙ্গালী/ অসমিয়া খাবার পাওয়া যায়’। দ্বীতিয় দিন অনেক কাজ। দিল্লিতেও প্রথমবার। আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম দিল্লি ঘোরার। স্যাম জানিয়েছিল সরকারী ট্যুরিস্ট বাসে টিকেট কেটে বসে পড়লেই হলো। কিন্তু ওদিন রবিবার হওয়ায় টুরিস্ট স্পট অনেকগুলোই বন্ধ। হোটেলের থেকে সারাদিনের জন্যে তিলক ড্রাইভারকে ভাড়া করলাম। সেই বিভিন্ন স্পটে নামিয়ে দেবে, আর আমি নিজের মতো করে আরাম করে ঘুরবো। গাইডেড ট্যুর সবসময়ই মেকী মেকী লাগে।

বিড়লা মন্দিরের বাগানে...

দিল্লী অনেক প্রাচীন শহর, বল্লাল সেনের ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে ঘিরে ঢাকার জন্ম হয়েছে ধারনা করলে ঢাকার বয়স প্রায় হাজার বছর, সে তুলনায় কলকাতা সেদিনের শহর, ৪০০ বছর আগে জন্ম। দিল্লীর কথা নাকি মহাভারতেও ছিল। তবে বর্তমান নয়া দিল্লীর অভিজাত অংশে এপার্টমেন্ট বানাতে গিয়ে নাকি একটা অশোক স্তম্ভ পাওয়া গেছে বয়স প্রায় দু হাজার বছর (তিলকের ভাষ্য)। মোগল আমলে স্থাপত্যকলায় দিল্লি হয়ে যায় অনন্য। ইংরেজরা রাজধানী করে কলকাতায়, কিন্তু দিল্লীর শানশওকত কমাতে মোগল এলাকার বাইরে দালান কোঠা নির্মান করে। বর্তমানের নতুন দিল্লী সেই হিসাবে ওল্ড, আর ওল্ডটা প্রকৃতপক্ষে নতুন। তিলক পাহাড়গঞ্জ থেকে বের হয়ে একটা রাস্তা দিয়ে যাবার সময় সব কিছু বোঝাচ্ছিল, রাস্তাটার একপাশে নতুন আর অন্যপাশে পুরান দিল্লী।

প্রথমেই নিয়ে গেল বিড়লা মন্দির। মন্দির মসজিদ সম্পর্কে আমার আগ্রহ কম। কিন্তু তিলক জানালো এটা নাকি ট্যুরিস্টদের খুবই পছন্দের জায়গা। মন্দির মার্গে এই মন্দিরটার আসল নাম লক্ষী নারায়ন মন্দির। প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত শিল্পগোষ্ঠী বিড়লা ফ্যামিলি। ১৯৩৩ সালে নির্মান শুরু আর ১৯৩৯ সালে শেষ হলে বিড়লারা মহাত্মা গান্ধীকে অনুরোধ করে মন্দির উদ্ধোধন করতে। মহাত্মা গান্ধী শর্ত দেন- যদি এই মন্দিরে শুধু ব্রাহ্মন নয়, সকল ধর্ম এবং হিন্দুদের সব বর্ণের সমান অধিকার ঘোষনা করা হয় তবেই উনি মন্দির উদ্ধোধন করবেন। বিড়লারা এই প্রস্তাব মেনে নেয়।

মন্দিরের সামনে এক গাদা পশ্চিমা ট্যুরিস্টকে দেখলাম, গেরুয়া কাপড় আর গামছা বাধা মাথায়, গলায় নামাবলি। এদের দেখলেই কেন জানি মেজাজ গরম লাগে। মহা উৎসাহে তারা দেব মূর্তী দর্শনে ব্যাস্ত হয়ে গেল। আমি ভেতরে একটা চক্কর দিয়েই মন্দিরের পেছনে বাগানে চলে এলাম। সাড়ে সাত একরের জায়গা জুড়ে বাগান আর ভাষ্কর্য। আদর্শ তপোবনের মতো। ছোট কৃত্রিম লেকের উপরে সুন্দর সুন্দর ঝর্ণা। প্রচুর পাখি আর কাঠবেড়ালী পূণ্যার্থিদের দেয়া খাবার খুটে খায়। অনেকে মনে হয় ডেটিং প্লেস হিসাবেও এটা ব্যাবহার করে। গাছ গাছালির ভেতরে হাটছিলাম, হঠাত অল্পবয়সী এক ছেলে-মেয়ের এক্সরেটেড ডেটিং এর মাঝে এসে উপস্থিত। ওরা বিব্রত হবার আগেই আমি বিব্রত হয়ে বেড়িয়ে এসে গাড়িতে চেপে বসলাম।

লোটাস টেম্পল বা পদ্ম মন্দির।

কিছুক্ষন পরে একটা গুরুদয়ারাতে নেওয়ার জন্যে তিলক জোরাজুরি করলেও রাজী করাতে পারলাম না। দুর থেকে তার স্বর্ণালী চুড়ার ছবি নিলাম। এর পরে সংসদ ভবন এর সামনে দিয়ে বিখ্যাত রাজপথ। রাজপথের দুধারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় আর ডিফেন্স মিনিস্ট্রির দুটো একই চেহারার যময ভবন। ঠিক মাঝ খানে রাষ্ট্রপতি ভবন। নেমে ছবি টবি তুলে আবার রাজপথ ধরে চলে এলাম বিখ্যাত ইন্ডিয়া গেটে। রাজপথ, ইন্ডিয়া গেট, রাষ্ট্রপতি ভবন সহ পুরো এলাকাই ব্রিটিশ আমলে তৈরি। স্থপতি এডউইন লুট্যন আর হার্বার্ট বেকার মিলে আশ্চর্য সুন্দর জ্যামেতিক শেপ দিয়ে বানিয়েছেন পুরো এলাকাটা। ইন্ডিয়া গেটের মাঝে খোলা জায়গাতে নাকি আগে রাজা পঞ্চম জর্জের ভাষ্কর্য ছিল, ৪৭ এ ভারত স্বাধীন হলে এটা সরে যায়। একই ভাবে গভর্ণর জেনারেল ভবন রাষ্ট্রপতি ভবন নামে পরিচিত হয়।
ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল নামের এক মিউজিয়ামে নিয়ে এল তিলক, কিন্তু রোববার দেখে সেটা বন্ধ ছিল, সেটাতে তেমন কোন কষ্ট পেলাম না। কিন্তু কষ্ট লাগলো শুনে লাল-কেল্লাও সাপ্তাহিক ছুটির দিন বন্ধ। দিল্লীতে আর সময় পাচ্ছি না। লাল-কেল্লা, কুতুব মিনার দেখার স্বপ্নটা খুব জোরালো ছিল। লাল-কেল্লা মিস হলেও যাতে কুতুব মিনার মিস না হয়।

কাটুম <img src=" style="border:0;" />


বিড়লা মন্দিরের বাগানে কাঠবেড়ালী।

দিল্লী মুল শহর থেকে কুতুব মিনার বেশ দূরে। হরিয়ানার রাস্তা ধরে বেশ খানিকটা এগিয়ে, মাঝে অবশ্য তিলক প্রায় জোর করে একটা হ্যান্ডিক্রাফটের মলে ঢুকিয়েছিল। জানতে পারলাম ওদের সাথে কোম্পানীর এগ্রিমেন্ট আছে, দোকানে টুরিস্ট নিলে ওরা কমিশন পায়। কিন্তু আমার ১০ মিনিটেই সব দেখা হয়ে যাওয়ায় বেচারা প্রাপ্য কমিশন পায়নি।
কুতুব মিনার থেকে একটু সামনেই পার্কিং লট। পাশেই টিকেট বুথ। তিলক নিজে গিয়ে ভারতীয় টিকেট কিনে আনলো, আমার হিন্দি জ্ঞান সে খুব দ্রুত বুঝে গেছে। মুখ খুললেই ওরা বুঝে যাবে আর আমাকে কয়েকগুন বেশী দামে বিদেশী টিকেট নিতে হবে। কুতুব মিনারে এসে দম আটকে আসলো। মানুষের অমর কীর্তি। প্রায় ২৪০ফুট উচু মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় মিনার। মানুষ হিসাবে নিজেকে গর্বিত ভাবতে নিজের ক্ষমতার উপরে আস্থা ফিরাতে এধরনের স্থাপত্যগুলোর ভুমিকাই অনন্য। ঢুকতেই একটা প্রাচীন মসজিদ আর কয়েকজন ইমামের কবর। এর পাশ দিয়ে ঢুকে সোজা মাঠের উলটো দিকে চলে গেলাম। রাজপুত সম্রাট পৃথ্বীরাজ চৌহানকে পরাজিত করে কুতুব উদ্দিন আইবেকের দিল্লী দখল করার বিজয় স্তম্ভ হিসাবে ১১৯২সালে কুতুব মিনারের জন্ম বলে ধরা হয়। আরেকদল বলে আসলে কুতুব মিনার নির্মানের কাজ শুরু করেছিলেন পৃথ্বিরাজ চৌহানই। তার আদরের কন্যাকে রাজধানী থেকেই যমুনা দর্শনের সুযোগ দিতে এই স্থাপনা শুরু করেছিলেন। ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক আছে। কুতুবউদ্দিন আইবেক ছিলেন মামলুক ডাইনেস্টির প্রতিষ্ঠাতা। ভারতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরে স্থানীয় যুদ্ধবন্দী দাসরা অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করে, এরা লড়াকু যোদ্ধা ছিল। এরাই মামলুক বা দাস রাজবংশ। এদের হাত দিয়েই দিল্লীতে মুসলিম শাসন চালু হয়, যা মোগল পাঠান হয়ে বাহাদুর শাহ এর সময় শেষ হয়েছিল।

বিড়লা মন্দিরের বাগানে কাঠবেড়ালী।

কুতুব কমপ্লেক্সে প্রচুর গাছ পালা, এর মাঝেই একটা অদ্ভুত সুন্দর সাদা কাঠবেড়ালীর ছবি পেলাম। সোজা গেলে আলাই মিনার। এই মিনারটা মাত্র ৮০ ফুট উচু। কিন্তু এটা শুধুই বেজ লাইন। সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজী এর কাজ শুরু করেছিলেন, ইচ্ছে ছিল কুতুব মিনারের চেয়েও অনেক বড় নতুন মিনার তৈরির। কিন্তু কাজটা অসমাপ্ত থেকে যায়। আলাউদ্দিন খিলজীর সমাধী, সম্রাট ইলতুতমিশের সমাধি, আলাই মাদ্রাসা মসজিদ হয়ে পেলাম লোহার স্তম্ভ। মুসলিম দখলের আগে এখানে বিষ্ণু মন্দির ছিল যেটা মুসলিম শাসকরা ধ্বংস করে ফেলে। সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ৪০২খ্রিষ্টাব্দে উদয়গীরির এক মন্দিরে এটা স্থাপন করেছিলেন। সে হিসাবে এটার বয়স প্রায় ১৭শ বছর। পরে আরেক সম্রাট এটাকে এখানে ধ্বংস হওয়া এই জায়গার মন্দিরে নিয়ে আসে ১০ম শতাব্দিতে। এটার ওজন প্রায় ৬হাজার কেজি। কুতুব মিনারে অনেক গুলো ছবি তুলে গেলাম আলাই দরওয়াজা দেখতে। খুবই সুক্ষ আর দুর্দান্ত কারুকাজ করা ছাদ।
কুতুব মিনার থেকে বেরুতেই তিলক আবার চেষ্টা করলো একটা শপিং মলে ঢুকাতে। কিন্তু এবারেও রাজী হলাম না। লোটাস টেম্পল দেখে গেলাম হুমায়ুন’স টম্ব দেখতে। বিশাল জায়গা জুরে বাগান। এর মাঝেই অনেক গুলো সমাধি সৌধ। ইসা খাঁনের কবর (বারো ভুইয়া নন, সম্রাট হুমায়ুনের এক সেনাপতি), সম্রাটের নাপিতের সমাধি সৌধ, বু হালিমা (সম্রাটের ভগ্নী জাতীয় কেউ সম্ভবত ইতিহাস অজ্ঞাত)’র কবর, কিছু অজ্ঞাত আরব সৈনিকের কবর। আর মাঝখানে অসাধারন বিশাল সম্রাট হুমায়ুনের কবর। সৌধের সিড়িতে আসতে না আসতেই ঝুম বৃষ্টি।

আলাই মাদ্রাসার গাছের উপরে সাদা কাঠবেড়ালী।

এত বড় সৌধের তুলনায় কবরটা সাদামাটা। মোগল ইতিহাসের এই পরাক্রমশালী সম্রাটের কবরের পাশে অন্ধকার ঘরে বিষন্ন লাগলো। এদিকে বিকাল ৪টার বেশী বাজে, ক্ষুধায় প্রান যায়। কিন্তু বৃষ্টি থামা থামির নাম নেই। পরে ভিজতে ভিজতেই বেরুলাম
লোটাস টেম্পল হয়ে ফেরার পথে, স্যামের আর্জেন্ট ফোন। কিছু কেনা কাটাও বাকী ছিল। স্যাম সাহায্য করবে কিনতে। সে থাকে দিল্লী ইউনিভার্সিটির সাউথ হোস্টেল এলাকায়। জায়গাটার নাম সত্যনিকেতন। খরচ বাঁচানোর জন্যে হোটেলের গাড়ি ছেড়ে দিয়ে বাস কিংবা সিএনজি নিয়ে যাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঝুম বৃষ্টিতে দিল্লী ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছাত্রীদের সাথে ধাক্কা ধাক্কি করে সুবিধা করতে পারলাম না। সিএনজিওয়ালাদেরও বোধহয় সব দেশেই একই আচার। কেউ যেতে রাজী না। তিলক চলে যায়নি তখনো বাধ্য হয়ে তাকে থামিয়ে আবার চললাম। ডিপ্লোম্যাটিক জোনের মধ্যে দিয়ে চওড়া আধুনিক রাস্তা হয়ে সত্যনগর এসে দেখি অবিকল ফার্মগেট। চারপাশে কোচিং সেণ্টার গুলোর মতো কম্পিউটার স্কুল আর হাবিজাবী। সব ছাত্র ছাত্রিরা দৌরা দৌরা করছে, ফার্মগেট বললাম কারন বৃষ্টিতে এক হাটু পানি জমা। গাড়ি আর যাবে না দেখে নেমে পড়ে স্যামকে আসতে বললাম।
স্যামের বাসা ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ার্স ফোরামের কাছেই।ওর মুল আগ্রহ রক ক্লাইম্বিং এ। কিন্তু আগে একবার স্তোক কাংড়ি যাবার চেষ্টাও করেছিল। গতকালকেই বলেছিলাম আমি সব যোগার যন্তর করতে পারি নি। অনেক কিছুই দিল্লী থেকে কিনতে হবে। এসেই হম্বি তম্বি, দূর মিয়া ঢাকা থেকে যখন ফোন দিয়েছিলে তখন বলতে, আমি থাইল্যান্ড থেকে অনেক ইন্সট্রুমেন্ট আনালাম। তুমি বললে ডাবল করে আনাতাম তাহলে খরচও কম পড়ে যেত।
সত্যনিকেতনে ছাত্রদের লাউঞ্জ, কফিশপ, সাইবার ক্যাফে আর বুকস্টোরের পাশেই অনেকগুলো ভালো এডভেঞ্চার স্পোর্টসএর দোকান। ঢুকেই মাথা ঘুরিয়ে দেয়। কি নেই, আইস বুট, আইস এক্স থেকে শুরু করে বাঞ্জি জাম্পিং এর ইন্সট্রুমেন্টও। ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ডের বিয়ার গ্রেইলের ক্রেজ খুব বেশী দেখলাম। নর্থ ফেস ব্রান্ডের আল্পাইন জ্যাকেটের পাশে বিয়ার গ্রেইলের স্টিকার বসানো কালো তালি মারা বদখদ চেহারার প্যান্ট, সেই ছুরি আর ফায়ার স্টোনও চোখে পড়লো। টাকা থাকলে পুরো দোকানটাই তুলে আনতে মন চায়।
দোকানে বয়স্ক দাড়িওয়ালা এক লোক ঘুরছিলো দুনিয়ার বিভিন্ন রকমের দড়ি টানা টানি করে দেখে দেখে। স্যাম বিনয়ে গদ গদ হয়ে ওনাকে দেখিয়ে জানালো উনি নাকি খুব বিখ্যাত লোক নাম লোলিত স্যার। স্যাম বলে দিল ওনাকে আইএমএফ এর সবাই বলে ফাদার অফ ইন্ডিয়ান রক ক্লাইম্বিং (পরে ঢাকার খ্যাতিমান মাউন্টেনিয়ারদের কাছেও অনেক প্রশংসা শুনেছি)। লোলিত স্যারের কাছে স্যাম নিয়ে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল, স্যার এ এসেছে বাংলাদেশ থেকে, স্তোক কাংড়ি ক্লাইম্বিং এ।

সম্রাট ইলতুতমিশের কবর।


আলাউদ্দিন খিলজীর অসমাপ্ত আলাই মিনার, দূরে কুতুব মিনার। আলাই মিনারের বেজ লাইন দেখেই বোঝা যায় কুতুব মিনারকে টেক্কা দিতে বানানো শুরু করা কি বিশাল কাজই না সম্রাট হাতে নিয়েছিলেন।


মোগল সম্রাট হুমায়ুনের সমাধী সৌধ।


সম্রাট হুমায়ুনের জমকালো সমাধী সৌধের ভেতরে তুলনামুলক সাদামাটা সমাধী।
বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে ভদ্রলোক খুব অমায়িক ব্যাবহার করলেন। নিজেই অনেক কিছু ইন্সট্রুমেন্টের কথা বললেন যেগুলো নেবার কথা কখনই ভাবি নি। ভদ্রলোক প্রায় জোর করেই ওগুলো কিনালেন। বিশেষ করে বুট গেইটারের কথা কেউই বলেনি। কিন্তু জিনিসটা কাকতালীয় ভাবে খুবই কাজে লেগে গিয়েছিল। ভালো দেখে একটা বুট (আমি একজোড়া এনেছিলাম যেটা পরে দেশে সবসময় ট্রেক করতাম, কিন্তু হিমালয়ে এর পার্ফমেন্স নিয়ে সন্দিহান ছিলাম), থার্মাল ভেস্ট-আন্ডারওয়ার, আল্পাইন গ্লাভস। আমার গ্লাভসের ইনারটা দেখে সে এক কথায় বলে দিল এটা দিয়ে কাজ চলবে না। আল্পাইন গ্লাভস পরে টেন্টে তুমি সাধারন কাজ করতে পারবেনা, রান্না বান্না করতে গেলেও গ্লাভস খুলতে হবে আর তাতেই হাতে ফ্রস্ট বাইট হতে পারে, লোহার কিছুতে হাত দিলে সঙ্গে সঙ্গে চামড়া উঠে আসবে। স্যামের এক জোরা ইনার গ্লাভস দিল, সে অনেক গুলো কিনেছিল এটা গিফট। সবশেষে সে দুঃসংবাদ দিল হঠাত কোন জানান না দিয়ে মারাত্মক কিছু জরুরী কাজ আসায় সে তার ট্রিপ ক্যান্সেল করেছে, ও আমাদের সাথে যেতে পারছেনা।
স্যামের সবার আগে লেহ’তে গিয়ে হোটেল টোটেলের ব্যাবস্থা করে রাখার কথা। ওর মাঝেই সে রসদ, গাইড, ঘোড়া-গাধার ব্যাবস্থাও করে রাখবে। কিন্তু বেচারা বার বার ক্ষমা চেয়ে বললো সে যেতে পারছেনা। কিছু বলারও উপায় নেই। এদিকে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। স্লোভাকিয়ান টিমদের সাথে এক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ নেই। স্যাম না গেলে নিজেদেরই সব কাজ করতে হবে, লাদাখে আমার চৌদ্দ গুষ্টিও যায়নি। সব আয়োজন করা খুব কঠিন। স্যাম বলে রাখলো সে প্রানপনে চেষ্টা করবে এই ঝামেলা থেকে বেরুতে। আর বের হলেই প্রথম ফ্লাইট ধরে লেহ’তে এসে আমাদের ধরবে। কিন্তু খুব ভরসা পেলাম না। দুঃশ্চিন্তা নিয়ে তিলকের গাড়িতে ফিরলাম পাহাড়গঞ্জে। কালকে লাদাখ যাত্রা।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29494577 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29494577 2011-12-02 00:05:31
:::: এবং হিমালয়... ::::
স্টোক কাংড়ির এই ছবিটা কার তোলা কে জানি। উইকিপিডিয়া’তে এটাই পেলাম।

স্টোক কাংড়ি পর্বত চুড়াটাকে আসলে কারাকোরাম রেঞ্জের অংশ বলে থাকে একদল। আরেকদল দাবী করে স্টোক নিজেই একটা আলাদা পার্বত্য রেঞ্জ। তাহলে হিমালয়ের কোল ঘেষে লাদাখ এর স্টোক রেঞ্জের সর্বচ্চ চুড়া হয় স্টোক কাংড়ি। উচ্চতা দৈত্যাকার বিশ হাজার একশ সাইত্রিশ ফুট ( ছয় হাজার একশ পয়ত্রিশ মিটার)। শুনেছি স্টোক ক্লাইম্বিং এর সময় কারাকোরাম রেঞ্জের সর্বোচ্চ চুড়া কেটু বা গডউইন অস্টিন (মাউন্ট এভারেস্টের পড়ে কেটুই পৃথিবীর সর্বোচ্চ চুড়া, এভারেস্টের চেয়ে মাত্র ৭৫২ ফুট ছোট হলেও ক্লাইম্বিং এর দিক দিয়ে পৃথিবীর টাফেস্ট মাউন্টেনের একটা এই কে-টু) চুড়াটার খুব চমৎকার সব ছবি তোলা যায়।
স্টোক কাংড়ির অবস্থানঃ 33°59′11″N 77°26′32″E33.98639°N 77.44222°E তে। স্টোক কাংড়ির সামিট রিপোর্ট গুলোতে ক্লাইম্বিং এর পরিবেশ লেখা থাকে খুব মজার করে- মডারেটেড ডিউরিং সামার, অলমোস্ট ইম্পোসিবল ডিউরিং উইন্টার। তাই জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম পর্যন্তই স্টোক কাংড়ি ক্লাইম্বিং এর সময়। যদিও বেস্ট সিজন অগাস্ট। সেপ্টেম্বর থেকেই তুষার পাত শুরু হয়ে যায়। সে হিসাবে আমার সময় বেছে নেয়াটা সামান্য দেরীই হয়ে গেল।
স্টোক কাংড়ি একটা নন টেকনিক্যাল পিক। কিন্তু সমস্যা একটাই এর ২০ হাজারী ফুটের উচ্চতা। শরীর বিজ্ঞানের ভাষায় মানুষের জন্যে এই উচ্চতাটা চরমভাবাপন্ন। ১০ হাজার ফুটের উপরে উচ্চতাকে বলে হাই অল্টিচিউড, ১৫ হাজারের উপরে ভেরি হাই অল্টিচিউড আর ১৮ হাজার ফুটের উপরে গেলে সেটা হয়ে যায় এক্সট্রিম হাই অল্টিচিউড। এক্সট্রিম হাই অল্টিচিউড এমন উচ্চতা যেখানে বাতাসের চাপ খুবই কম, অক্সিজেনের অভাব, তীব্র শীত আর ভয়ঙ্কর ঝরো হাওয়ার সাথে মানুষকে লড়তে হয়। বাতাসের চাপ আর অক্সিজেনের অভাবে মানুষ পর্যাপ্তভাবে একমাটালাইজ (উচু আবহাওয়ার সাথে অভিযোজিত হওয়া) না হলে সহজেই হাই অল্টিচিউড সিকনেসে পড়ে। সাধারনভাবে হাই অল্টিচিউড সিকনেসের লক্ষন, তীব্র মাথা ব্যাথা, খেতে না পারা, না ঘুমানো এসব। আর এক্সট্রিম পর্যায়ে হয়ে যায় লাংসে এবং ব্রেনে পানি চলে আসা, শরীরের থেকে প্রয়োজনীয় লিকুইড লিক করা, হেলুসিনেশান (সম্ভবত একারনেই ইয়েতিদের দেখা মেলে হিমালয়ের উচু জায়গাগুলোতেই) খারাপ পরিস্থিতী মৃত্যু। এছাড়া বৈরি পরিস্থিতি তো থাকেই। এভেলাঞ্চ (তুষার ধ্বস), তুষার ঝর, আর টেম্পারেচার শুন্যের অনেক নিচে।
আগেই বলেছি এই পিকটা নন টেকনিক্যাল। শুধু মাত্র উচ্চতার সাথে লড়াই করতে হয়। একটা গ্লেসিয়ারের নদী পেরুতে হবে, তাও শুধু শেষ দিনে। আর এর পরেই একটা স্ক্রি ফিল্ড (ছোট ছোট আলগা পাথরে ভর্তি ঢালু এলাকা)। চুড়া সামিটের আগে এদুটোকেই কঠিন জায়গা হিসাবে বলা হয়। গ্লেসিয়ারটার সমস্যা হলো এটাকে পেরিয়ে সামিট শেষ করে আবার দিনের শুরুতেই ক্রস করে ফিরতে হয়। একটু বেলা বাড়লেই সেটা গলতে শুরু করে।

অনেক ভারি ভারি আর কঠিন কঠিন নিরস কথা বার্তা দিয়ে পোষ্ট ভর্তি করে দিলাম। এই কথা গুলোর মোদ্দা কথা, দির্ঘদিন ধরে দেখা স্বপ্নটাকে সফল করার চেষ্টায় নামছি। আগামী কাল রওনা হচ্ছি ভারতের উদ্দেশ্যে। কলকাতা হয়ে দিল্লী, সেখানে একদিন কাটিয়ে চলে যাব তিব্বতের কাছা কাছি সেই চুড়াটার কাছে। বাকীটা হবে স্বপ্নপুরনের যাত্রা। এটা মুলত দোয়া চাই টাইপ পোষ্ট। দোয়া করবেন যাতে নিরাপদে ফিরে আসতে পারি প্রিয় ঢাকা শহরে।


ইউটিউবে স্টোক কাংড়ি সামিটের নিয়ে (শেষ দিন অর্থাৎ সামিট পুশের উপরে) এই ভিডিওটা পেলাম। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29442646 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29442646 2011-09-04 00:16:07
:::: সামহোয়ার ইনে ৩ বছর পূর্তী’তে পোষ্ট ::::
সামু ব্লগের সাথে ৩ বছর কাটিয়ে দিলাম। দেখতে দেখতে কোন দিক দিয়ে সময় পেরিয়ে গেল।
৩ বছর আগে সেই দিনটাও রমযানের দিন ছিল। রোযা থেকে ক্লান্ত হয়ে প্রথম পোষ্টটা দিছিলাম, যা প্রথম পাতায় আসে নি। ৩ বছর পেরিয়ে গেলে যে কোন জিনিসের আকর্ষনটাও কমে যায়। সবকিছু রংচটা লাগে।

অফিসে কাজের ব্যাস্ততায় দম ফেলার ফুসরত নেই। ৪তারিখ দুপুরে ফ্লাই করবো। জীবনের প্রথম হিমালয়ান এক্সপিডিশান। দির্ঘদিনের স্বপ্নটাকে বাস্তব করার জন্যে অনেক প্রতিবন্ধকতা হ্যান্ডেল করতে হচ্ছে। ২০১৩৭ফুট (৬১৩৫মিটার) উচু একটা পর্বত চুড়া। ২০১৩৭ফুট যে উচ্চতায় পাখি উড়ে না। আল্পাইন গিয়ার সব নেই। ধার ধুর করে যোগার করেও দেখি সব গুছাতে পারি নি। যাচ্ছি একা একা। ওখানে গিয়ে এক স্লোভাকিয়ান আর এক ভারতীয় মাউন্টেনিয়ারে সঙ্গী হিসাবে পাবার কথা। ওরা কেমন মানুষ কে জানে?
শরীর বিজ্ঞানীদের ভাষার ১০ হাজার ফুটের উপরে জায়গাকে বলে হাই অল্টিচিউড ১৫ হাজার ফুট হলে ভেরি হাই অল্টিচিউড, আর ১৮ হাজার ফুটের উপরে এক্সট্রিম হাই অল্টিচিউড। এক্সট্রিম হাই অল্টিচিউড এমন উচ্চতা যেখানে খুব কম মানুষই যায়, তাই মানুষের শারীরিক পরিবর্তনের ব্যাপারে খুব বেশী কিছু জানা যায়না। নিজের ফিটনেস আর সক্ষমতার উপরে আস্থা রেখে যাচ্ছি। কিন্তু মানসিক একটা সুক্ষ দুঃশ্চিন্তা থেকেই যাচ্ছে। প্রথমবার হিমালয়ে, ২০ হাজার ফুটের তুষার ধবল চুড়াটা যেমন আকর্ষনীয়, তেমনি...
প্রিয় মানুষটা গতকালও হাসপাতালে ছিল। এখনও অসুস্থ। কালকে ঈদের দিন। অফিসে আসার আগে দেখে এলাম আমার মা’ও অসুস্থ। আমেরিকায় ঝর আঘাত হানছিলো তখন বোন ফোন করে জানালো ওদেরকে এভাকুয়েশান করতে বলেছে। নিরাপদ এলাকায় সরে যেতে। সেই ঝরটা থেমে গেছে, ওটা নিয়ে ভাবনা আপাতত নেই।
ঈশ্বর, নিরাপদে ঢাকায় ফিরে আসতে চাই। ফিরে আসতে চাই প্রিয় মানুষগুলোর কাছে, এবং অবশ্যই সফল ভাবে পিক সামিট শেষ করে।


আমার গন্তব্য। (সুত্র- উইকিপিডিয়া)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29441181 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29441181 2011-08-30 21:02:35
:::: বনের নাম রাজকান্দি ::::
হাম হাম (বা হাম্মাম) ঝর্না।


রাজকান্দি বনের কথা যার কাছ থেকেই যতো বারই শুনেছি শুধু প্রশংসাই শুনলাম। প্রথমবার শুনলাম ব্লগার দুখীমানবের কাছ থেকে। শুনেই স্বপ্ন দেখতে থাকলাম যাবার কিন্তু ঠিক হয়ে উঠছিলো না। পরের বার কোমড় বেধে আসলো প্রথম আলো ব্লগের বিমান ধর। ঘুরা ঘুরি নিয়ে অনেক দিন ধরেই আলাপ। সিলেটে থাকেন। ঢাকায় এসে নিজেই অফিসে এসে দেখা করে গেলেন কথা হলো পুরোটাই রাজকান্দি আর হামহাম বা হাম্মাম ঝর্না নিয়ে। ব্যাপারটা পুরোনো হবার জো রইলো না, সকাল হতে না হতেই ফোন আসলো ব্লগে পাশা ভাইএর। উনিও রাজকান্দি যাবার ধান্ধা করছেন। তড়িঘড়ি করে ছুটি নিয়ে ফেললাম। সাপ্তাহিক ডে-অফের দিনের সাথে আরেকটা দিন জুড়ে দিতেই দুদিনের ছুটি। বাংলা’র পথে টিংকু ভাইও সদলবলে ঘোষনা দিলেন সঙ্গে যাবার। হরতাল অমুক তমুকের ঝামেলায় বের হওয়া হচ্ছিলো। হরতালের মাঝে রাত ১১টা পর্যন্ত ঘুরেও আমি আর আশিক ট্রেনের টিকেট করতে পারলাম না। ঠিক হলো কয়েকভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া হবে। ঢাকা থেকে আমরা ৬জন বাসে। টিঙ্কু ভাই’রা ৪ জন তাদের টিভি শো’র বিখ্যাত গাড়িটা নিয়ে আলাদা যাবে। সিলেট থেকে শ্রীমঙ্গলে এসে দলে যোগ দেবে কুয়াশা, এবং ফেসবুক ইভেন্ট দেখে আসা আরেকজন নাসিম ভাই। বিমান দা সদলবলে যোগ দেবেন পরদিন শ্রীমঙ্গলে নয় খোদ চাম্পারাই চা বাগান থেকে।
রওনা দেবার কদিন আগে থেকেই কেন যেন আকাশের মন খারাপ। বর্ষা কাল বৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এ বৃষ্টিটা একটূ অন্যরকম। খবরে শুনলাম সাগরে কোথায় কি যেন নিম্নচাপ হয়েছে ৩/৪দিন প্রবল বর্ষন হবে সারা দেশে। এমনিতেই শ্রীমঙ্গল বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল এলাকা। হামহাম পর্যন্ত যেতে পারবো কি না সন্দেহ হতে লাগলো। কিছুদিন আগে হামহাম ঘুরে এসেছেন এমন একজন জানালো শুকনো মৌসুমেই তারা ঝিরিতে যে পানি আর বীভৎস রকম জোঁক দেখেছেন এই ঘোর বর্ষায় আমাদের না পুরো রাস্তাই সাঁতার কেটে যেতে হয়। জোঁকের কামড় খেতেই হবে, সেটাতে আপত্তি নেই, রেইনকোটের পাশা পাশি দির্ঘদিন পরে থাকা লাইফ জ্যাকেট তিনটে নিবো কি নিবো না সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। কি মনে করে পাহাড়ের ওঠার কেবল আর সেফটি বেল্ট গুলো হ্যাভারস্যাকে ঢুকিয়ে নিলাম।

চাম্পারাই চা বাগানে পথ হারানোর পড়ে চাঁদের ছবি তুলে সময় কাটানো।

ঢাকা থেকে বেরুনোর আগে আগে আকাশ ফুড়ে বৃষ্টি নামলো। সেটা থামার আর নামই নেই। সময় বেশী নেই। তাই কোনমতে ভিজতে ভিজতে একটা সিএনজি নিয়ে বসলাম। বাস সকাল ন’টায়। কিন্তু ভয়ঙ্কর দেরী হয়ে গেছে। আমি যখন কোনমতে বিজয় স্মরনীর মীগগুলোর নিচে তখন আশিক ফোন দিয়ে জানালো ড্রাইভার তাড়া দিচ্ছে বাস ছেড়ে দেবার জন্যে। আশিক আর থার্ড ইয়ার হেলালকে বললাম বাস ওয়ালাকে পাঁচ মিনিট পাঁচ মিনিট করে রিকোয়েস্ট করতে। কোনমতে সিএনজি প্রায় উড়িয়ে নিয়ে সায়দাবাদে যখন দূর থেকে বাস দেখলাম দেখি সেটা আস্তে আস্তে করে চলতে শুরু করে দিয়েছে। লাফিয়ে কুদিয়ে বাসে উঠতেই সেটা ছেড়ে দিল। পথে ঝুম বৃষ্টি থামার কোন লক্ষন নেই। ভৈরব ব্রীজ পার হবার সময় দেখি আকাশ অন্ধকার। উজান-ভাটি’তে পৌছেও মনে হলো আকাশের মনে হয় মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আজকে আর থামাথামি নেই। বারবার মনে পড়লো, অনেকে বলেছিল সাঁতরে হাম হাম যেতে হবে। লাইফ জ্যাকেট গুলোর জন্যে দুঃখ লাগলো। তবে ভরসা এই পাহাড়ি ঝিরি’ পানি ধরে রাখতে পারেনা। বৃষ্টি বেশী হলেই ঢল হয়ে বেড়িয়ে চলে যায় ভাটিতে।

আমরা শ্রীমঙ্গল শহরে নামলাম দুটোর সময়। ৩বছর পড়ে শ্রীমঙ্গল আসলাম। প্রথমে রাস্তাঘাট চিনতে কেমন যেন সমস্যা হচ্ছিল। নতুন একটা রেস্টুরেন্ট দেখলাম কুটুম্ববাড়ি। ঝকঝকে তকতকে দারুন ভাবে ফার্নিশড। ঢুকে বসে অর্ডার দিলাম ঝাল ফ্রাই আর তন্দুরী রুটির। ইতিমধ্যে সিলেট থেকে কুয়াশাও হাজির। আগের বর্ষায় নিঝুম দ্বীপে ক্যাম্পিং এ আলাপ হয়েছিল। এক মিনিটের জন্যেও মাথা থেকে বদখত টুপিটা খুলতে কেউ দেখেনি তাকে। খেয়ে দেয়ে দেখি আগে থেকে বুক করা জীপ চলে এসেছে। ড্রাইভারের নাম গিয়াস। মালপত্র বোঁচকা বুচকি তাতে ভড়ে দিয়ে আমি কুয়াশা আর অরনী বেরুলাম শপিং করতে। কাঁচাবাজারে। দলের বাকিরা যাবে লাউয়াছড়া। ঘন্টাখানেক যেই সময়ই পাওয়া যায় তাতে লাউয়াছড়ার কিছুটা ট্রেক করতে পারে। ভাগ্য থাকলে উল্লুক দেখাও অস্বাভাবিক নয়। এর আগে লাউয়াছড়া ঢোকার আগেই মুল গেটেই প্রায় ১০টার মতো উল্লুকের পালকে একসাথে দেখেছিলাম।


কলিং টিংকু ভাই, ওভার?? ছবি-হেলাল হেজাজী।

মুরগী কিনে কেটে কুটে নিলাম দোকান থেকেই, পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, ওয়ানটাইম গ্লাস প্লেট, মশলা পাতি, চাল ডান কিনে আমরা একটা সিএনজি নিয়ে রওনা হলাম লাউয়াছড়ার দিকে। লাউয়াছড়ার গেটে যখন পৌছালাম ততক্ষনে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। গেটেই পুলিশ আটকে দিল। রাতের বেলা জঙ্গলে ঢোকা যাবে না। কি আর করা বাইরে থেকেই কয়েকটা হনুমান দেখে ফেললাম। জঙ্গলের মধ্যে পুরোপুরি অন্ধকার হতে হতেই টিংকু ভাইরাও হাজির হয়ে গেল। আমাদের এক চোখা জীপটা স্টার্ট দিয়ে রওনা হলাম চাম্পারাইএর দিকে। অন্ধকার রাত, গতপরশুই পূর্ণিমা ছিল। ঘন কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে সাদা কালো যুগের সিনেমার মতো অপার্থিব চাঁদ উঠেছে। লাউয়া ছড়ার ঘন বনের ফাঁকে আমাদের প্রাগৈতিহাসিক ভাঙ্গা জীপের একটামাত্র হেডলাইট জ্বলছিল টিমটিম করে।

রাতে ঘুমের আগে ভুতের গল্পের আসর। চারপাশে ঝিঝির ডাক, দরজা জানালা বিহীন মুন্ডা পাড়ার স্কুল ঘর, দারুন আবহ। ছবি- হেলাল হেজাজী।

আমরা ভানুগঞ্জ বাজারে এসে একটা ব্রেক নিলাম। গ্রামের টিপিক্যাল বাজার। চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে সান্ধ্যঅবসরে গ্রাম্য আড্ডা, টিমটিমে হলুদ মন খারাপ করিয়ে দেয়া ম্লান আলো, বিড়ির বিজ্ঞাপন আর হিন্দিগান শিলা কি জওয়ানি। কিছু কেনা কাটা বাকী ছিল। সবাই ভাগাভাগি করে কিনতে বেরুলাম। হাত পায়ের খিল ছুটিয়ে নিয়ে আবার শুরু হলো যাত্রা। মোবাইলের নেটওয়ার্ক সামনে গিয়ে আর নেই। তাই যতোটা পারি গুগল আর্থ খুলে জিপিএস থেকে ট্রেক রেকর্ড আপলোড করে নিচ্ছিলাম। দুই গাড়িতে দুটো ওয়াকি টকি ছিল। বাকি পথটা রেডিও’তে ফাজলামি করেই কাটিয়ে দিলাম।
একটু পড়েই কুরমা বিটের জঙ্গলে ঢুকে গেলাম। পুরোটাই কাঁচা রাস্তা। জায়গায় জায়গায় ভাঙ্গা চুড়ো। এখানে আমাদের আগে থেকে ঠিক করে রাখা গাইড শুভ্র উঠে পড়লো। অন্ধকার ঘন বনে এক ঘেয়ে ঝিঝির ডাকা ডাকি, জায়গায় জায়গায় জোনাক পোকার উড়াউড়ি। আমাদের ছোট বেলায় জঙ্গল ঝলমল করতো জোনাক পোকায়, ইদানিং গ্রামে ট্রামেও গেলেও দেখা যায় খানকয়েক জোনাক পোকা মনমড়া হয়ে ঘুড়ছে। আধুনিক কেমিক্যাল ফার্টিলাইজার আর শক্তিশালী পেস্ট্রিসাইডিসের কুফল। শুভ্র জানাচ্ছিল রাজকান্দিতে কোথায় কবে ভালুক দেখেছে, ২৫দিন আগে কোথায় চিতা বাঘ হানা দিয়েছে এইসব খালি। চাম্পারাই চা বাগানের ভেতরে এসে ভাঙ্গা রাস্তায় খুব ভালো লাগছিলো। মাথার উপর অবারিত আকাশে জাম্বো সাইজের চাঁদ। ওয়াকি টকি তে শুনলাম টিংকু ভাইদের দলটা পথ হারিয়েছে।

গরম সাদা ভাত, আর লাল লাল মুরগীর ঝোল। গপাগপ। -ছবি হেলাল হেজাজী।

রাত নটা কিংবা দশটা কত বাজে জানিনা। জার্নিতে কখনো ঘড়ি রাখি না হাতে। কিন্তু গ্রামের হিসাবে গভীর রাত। জমির আইলের মতো পাতলা রাস্তা ধরে আমরা কলাবনের মুন্ডা গ্রামে এসে থামলাম। এটা মুলত চাম্পারাই চা বাগানের শ্রমিকদের বস্তি। চা-বাগান থেকে একটূ দুরেই বনের পাশে সার বাধা ঘর। আমাদের থাকার জায়গা হলো একটা স্কুল ঘরে। মাথার উপর চালা আছে তাই তাবু বের করার দরকার হলো না। লম্বা স্লিপিং ম্যাট বিছিয়ে শোয়ার আয়োজন করা হলো। আমি রাঁধতে জানি না, শুধু খেতে পারি। বাকিরা সদলবলে রান্নায় নেমে গেল। অরনী কোথা থেকে জানি একগাদা লিচু এনেছিল। ঘরের ভেতরে অন্ধকার, আমি আর টিংকু ভাই গপাগপ সাবার করে দিলাম চোখের নিমিষে। মুন্ডা’রা উপজাতী নয়, আদিবাসী। সাঁওতাল, ভীল, কোল, মুন্ডা, রাজবংশী এরাই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের আদি বাসিন্দা। চাঁদের আলোয় হাটা হাটি করতে হেলাল আর কৃতি’কে নিয়ে বেরুলাম। খোলা মাঠে বসেই দেখি আগে থেকে ক-জন গ্রামবাসী বসে আছে, পাড় মাতাল। বসতে পারলাম না।
রাত্রে বার-বি-কিউ এর কথা ভাবা হয়েছিল। রান্নার সমস্যা চিন্তা করে সাদা ভাত আর মুরগীর মাংসই রান্না হলো। হাপুশ হুপুশ করে খেয়ে দেয়ে সবাই যখন শুয়ে পড়লাম তখন আন্দাজ দেড়টা বাজে। এর মাঝে টিংকু ভাই শুরু করলো ভুতের গল্প। গ্রামের বাড়িতে পরিত্যাক্ত এক রাজপ্রাসাদে রাত কাটাতে গিয়ে ভুতের সাথে মোলাকাত। গল্পটা এমনি’তে শুনতে পানসে হতে পারে, নির্জন রাতে মুন্ডা গ্রামে দূরে জঙ্গলে নাম না জানা পাখির ডাক। সাসপেন্সটা ভালোই জমলো।

হাম হাম ঝর্ণা।


ঝিরির পথে... (ছবি হেলাল হেজাজী)

বলার অপেক্ষা রাখে না পরদিন সবাই উঠলাম অনেক দেরী করে। শুনলাম সিলেট থেকে আমার সাথে দেখা করতে দুজন এসেছিল, আমাকে জাগাতে না পেরে দুজনেই দুটো দলের সাথে রওনা হয়ে গেছে। বুঝলাম বিমানদা আর নাসিম ভাইএর দল। সেদ্ধ ডিম, গরম কফি আর বিস্কুট টিস্কুট দিয়ে নাস্তা সেরে আমাদের বেরুতেই অনেক সময় লাগলো। গ্রামের সোজা পথ দিয়ে এগিয়ে বনের ভেতরে ঢুকে পড়লাম।
প্রথম অংশটার নাম বেতবন। একটা কর্দমাক্ত ঝিরি পেরিয়ে বেতবনে ঢুকতে হলো। শ্রাবন মাসে প্রচুর পানি আর কাদায় তথৈবচ। কাদার জন্যে খালি পায়ে হাটলেই ভালো, কিন্তু বেতবনের কাটার কারনে সম্ভব হলো না। জঙ্গলটা পেরিয়েই বেশ ছড়ানো জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম। সামনে একটা সাইনবোর্ড চোখে পড়লো। কুরমা ফরেস্ট বীট। এটাও বন, কিন্তু বেশ ছড়ানো একটা ফুটবল মাঠের মতো জায়গা চোখে পড়লো। সামনে একটা ঝিরি তাতে ২/৩টা বাঁশ দিয়ে সাঁকো পেরুনোর ব্যাবস্থা। ওপাশে কলাবন। জঙ্গলে বেশ বড় বড় বুনো কলা। এই কলা গুলো মানুষ খেতে পারেনা। শুধু বাদর আর বাদুরের খাদ্য। জঙ্গলটা আনটাচড। প্রচুর পাখি চোখে পড়ছিল। সেই সাথে বানর। দূর থেকে অনেকবার উল্লুকের হু হু হু ডাক কানে আসলো।
কলাবন অংশটাই অনেক বড়। বড় দল, তাই আমরা হাটছিলামও খুব দ্রুত। ঘন্টা খানেক পড়ে মুল জঙ্গল রাজকান্দিতে ঢুকে গেলাম। অসাধারন তার রুপ। বড় বড় বৃষ্টিবহুল অরন্যের গাছ, গাছের গায়ে জায়গায় জায়গায় শ্যাওলা। সেই সাথে অনেক ধরনের ফার্নের ঝোপ। বনের গভীর থেকে পাখি আর নানাধরনের পতঙ্গের একটানা ডাক। জঙ্গলে ইদানিং প্রচুর ট্যুরিস্ট আসছে। গ্রামবাসিরা খুব বেশী ঢোকেনা। মুল কারন ভাল্লুক আর বন্যশুকরের আধিক্য। আমাদের গাইড শুভ্র জানালো সে নাকি চিতাবাঘও দেখেছে। এছাড়া ভারতীয় সীমান্ত ফাঁড়ি খুব কাছেই। নাগা আর কুকি আদিবাসীরাও নাকি প্রায়ই এদিকে ঘোরাঘুরি করে শামুক গুগলী খুঁজতে। নাগা-কুকি’দের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানি না। বই পত্রে পড়েছি নগ্ন থাকার কারনেই নাকি নাগা নাম। কুকী’দের মাঝে একটা ঐতিহ্য ছিল (সম্ভবত হাজার বছর আগে) শত্রু গোত্রদের লোকজন ধরে মাথা কেটে নিয়ে আসা, পড়ে সেটা বাড়ীর সদর দরজায় ঝুলিয়ে রাখা ডেকরেশান আইটেম হিসাবে। লোকজন নাগা-কুকীদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানেনা, কিন্তু দেখলাম তাদের সম্পর্কে একটা ভীতির ভাব।

রাজকান্দির জঙ্গলে (ছবি ডাক্তার এইচ এন আশেকুর রহমান, সবাই কাকতাড়ুয়া অথবা wall-e নামেই চেনে <img src=" style="border:0;" /> )

অনেকক্ষন হাটার পড়ে একটা পাথুরে অংশে আসলাম। বড় একটা পাথরে কয়েকটা গাছের পাতা। শুভ্র জানালো মুন্ডারা জঙ্গলে কাজে ঢুকলে এই পাথরের উপরে কয়েকটা পাতা ফেলে যায়। কি কারনে সে কিছু জানেনা। আমাদের দলের পক্ষ থেকে কুয়াশা কয়েকটা পাতা ফেলে দিল। এর পরেই একটা বড় পাথুরে বেসিন। বর্ষায় অনেক পানি। বাংলার পথে অনুষ্ঠানের পর্দার আড়ালের কুশীলব ক্যামেরা ম্যান রাহাত নেমে যেতেই দেখলো পানি কোমড় পেড়িয়ে বুকের কাছা কাছি চলে আসে। কোনমতে দেয়াল ধরে ধরে পার হয়ে সোজা একটা পাথরের ঢালে নামলাম। উপর থেকে প্রবল প্রতাপে পানি নেমে আসছে। অনেকটা বান্দারবানের শৈলপ্রপাতের মতো। কিন্তু বর্ষায় নতুন যৌবন পেয়ে গেছে। চারপাশে প্রচন্ড পিচ্ছিল। আছাড় খেল আশিক। আশিক খুব ভালো ফটোগ্রাফার। একসময় কাকতাড়ুয়া নামে ফটোগ্রাফি করতো, এখন নিক ওয়াল-ই। ব্যাথা কতোটা পেল জানি না। কিন্তু একটা লেন্স ভাঙ্গলো হাতের ডিএসলআরের।

সুন্দরী রাজকান্দি'তে। ছবি -আশিক (কাকতাড়ুয়া/ ওয়াল-ই)



বৃষ্টিস্নাত রাজকান্দির জঙ্গল। ছবি -হেলাল হেজাজী।

পিছের জায়গাটা’কে একটা বড় সড় পুকুর বলা যায়। উপর থেকে শৈলপ্রপাতের পানি এসে জমা হচ্ছে, ঝিরির চেহাড়া নিয়ে বেড়িয়ে যায়। শৈলপ্রপাতের উপরে আরেকটা বড় পুকুর। সেখানে অনেক পানি। অনেকেই নেমে গেল সাঁতার দিতে। এখান থেকে উপরে উঠতে হবে। ততোক্ষনে বেলা বেড়ে একটার মতো। আমরা সাথে আনা বিস্কুটের সদব্যাবহার করলাম। কয়েকটা জোঁকও টেনে উঠাতে হলো শরীর থেকে। সামান্য জিড়িয়ে পাহাড়ে দড়ি টাঙ্গানো হলো। মাউন্টেনিয়ার বাবু ভাইএর কাছ থেকে ধার করে আনা ক্লাইম্বিং রোপ, একেকটা দেড়হাজার পাউন্ড পরযন্ত টানতে পারে। দড়ি বেয়ে সবাই উঠে গেল উপরে। পাহাড়ের চুড়ায় বিশাল বাঁশ বন। বাঁশের জঙ্গলের ভেতরে জোঁকের আড্ডা। খাড়া অংশ পেড়িয়ে মোটামুটি সমতল ধরে হেটে হেটে নামার পালা। ফের ঝিরি’তে। এদিককার ঝিরি বেশ পাথুরে। পানির স্রোতও বেশ। সোজা উজান ঠেলে হাটতে হয়। জায়গায় জায়গায় কোথাও প্রচুর কাদা। কয়েকটা জায়গায় পা দিতেই হাটু নয় উড়ু পরযন্ত দেবে গেল।
ঘুরতে ঘুরতে যখন ক্লান্তির শেষ সীমায় তখন হঠাত দূর থেকে কানে আসলো পানির গর্জন। বুঝতে পারলাম হামহাম ঝর্না নব যৌবনে এসেছে। কিন্তু ঝিরির পথ পেড়িয়ে যখন দৈত্যাকার ঝর্নাটা চোখে পড়লো, তখন মনের অজান্তেই বিষ্ময় ধ্বনি বের হয়ে আসলো। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে প্রবল পানির ধারা। নিচে পুকুরের মতো একটা জায়গা তৈরি হয়েছে পানির আঘাতে। পারে হ্যাভারস্যাক রাখতেই যা সময় লাগলো। কাপড় খুলে তিন লাফেই পানিতে। জায়গায় জায়গায় পাথর, সাতার দিয়ে একদম ঝর্নার নিচে। প্রবল ঠান্ডায় জমে যাবার অবস্থা। প্রায় দুশো ফিট থেকে নেমে আসা প্রবল পানির পিটুনি’তে দাড়ানোই মুশকিল। শুরু হলো সবার জলকেলী। প্রচন্ড পরিশ্রমের পরে রাজকান্দির জঙ্গল পেরিয়ে হামহামে আসাটা মনে হয় স্বার্থক হলো।


ঝিরির পানির স্পিড দেখার মতো। (ছবি টিংকু চৌধুরী বা টিংকু ট্রাভেলার)


গহীন অরণ্যের মাঝে লুকানো ঐশর্য হাম হাম ঝর্ণা। ছবি- হেলাল হেজাজী।




বিঃদ্রঃ ঝর্নার নামটা জানতাম হামহাম। এলাকা বাসী কেউ কেউ বলছিলো হামহাম, আবার কেউ হাম্মাম। আরেকটা নাম পেলাম, চিতা ঝর্না। আর ভিডিও ব্লগ বানানোর ধান্ধায় সারা রাস্তাটাই হ্যান্ডি ক্যাম নিয়ে ব্যাস্ত থাকায় ছবি বলতে গেলে তোলাই হয়নি। কিন্তু ছবি ছাড়া ট্রাভেলগ পানসে লাগে। তাই আশিক, টিঙ্কু ভাই আর হেলাল হেজাজী (থার্ড ইয়ারের) তোলা কয়েকটা ছবি ব্যাবহার করতে হলো। ছবির প্রশংসা শতভাগ তাদের।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29405756 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29405756 2011-07-02 01:10:34
::::মাউন্ট এভারেস্টঃ ম্যালোরি- আরভিন অন্তর্ধান রহস্য! ::::
বাঁএর জন আরভিন (এখনো নিখোঁজ) আর ডানের জন ম্যালোরি (৭৫ বছর পর ফিরে আসা)

প্রথম এভারেস্টে পা রাখার জুটির নাম কি? সবাই এক কথায় বলবে তেনজিং-হিলারী? কিন্তু মজার ব্যাপার বিশাল একটা অংশের ধারনা জুটির নাম আরভিন-ম্যালোরি জুটি? ২৯শে মে ১৯৫৩সালে তেনজিং-হিলারী এভারেস্ট পদানত করে। তেনজিং নিজের জন্মদিন জানতেননা, তাই ২৯শে মে’কে এর পর থেকে নিজের জন্মদিন হিসাবে পালন করতেন। প্রতিবছর এই জুটির সম্মানে সারা পৃথিবীর অগুনিত এডভেঞ্চার পাগল মানুষ ২৯শে মে’কে এভারেস্ট ডে হিসাবে পালন করে। ১৯৫৩সালে জন হান্টের নেতৃত্বের অভিযানটা ছিল তেনজিং এর ৭ম চেষ্টা (৬ষ্ঠ চেষ্টায় সুইস’দের সাথে চুড়ার মাত্র ৮০০ফিট দূর থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হন), ব্রিটিশদের ছিল নবম জায়ান্ট অভিযান (প্রায় ৪০০ মাউন্টেনিয়ার অংশ নেন)। আর বিতর্কিত মতবাদটা বলে সফল অভিযানের ২৯ বছর আগেই ব্রিটিশদের ৩য় অভিযানে ১৯২৪ সালে আরভিন-ম্যালোরি প্রথম এভারেস্ট জয় করেন। কিন্তু সেই সাফল্য দাবী করার জন্যে জীবিত ফিরতে পারেননি দুজনের কেউই।

এন্ড্রু আরভিনঃ (১৯০২-১৯২৪)

স্যান্ডি আরভিন মাত্র ২২ বছর বয়সে এভারেস্টে হারিয়ে যাওয়া অভিযাত্রি
এন্ড্রু আরভিনের ডাক নাম ছিল স্যান্ডি। স্কটিশ মাউন্টেনিয়ার। খুব উচু মাপের শারীরিক সামর্থের সাথে সাথে উচু মাপের প্রাকৃতিক জ্ঞান। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জনের সাথে সাথে অক্সফোর্ডের নাম করা এথলিট ছিলেন। সে সময়ে অক্সফোর্ড-কেম্ব্রিজ এ ধরনের জায়গা গুলোতে ছাত্রদের মাঝে রোয়িং খুব জনপ্রিয় খেলা ছিল। এন্ড্রু আরভিন ছিলেন রোয়িং এ ডাকসাইটে চ্যাম্পিয়ান। বলা হয়ে থাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় স্কুল বয় থাকাকালীন অবস্থাতেই নাকি আরভিন মেশীন গানের ব্যাতিক্রমী ডিজাইন বানান। আরভিনের জীবনে খুবই ইন্টারেস্টিং একটা ঘটনা ঘটলো ১৯১৯ সালে, আজীবন এডভেঞ্চার প্রেমী ১৭ বছরের তরুন এন্ড্রু আরভিন তার মোটর সাইকেল নিয়ে ব্রিটেনের ৩০০০ ফুট (কেওকারাডং এর উচ্চতা ৩১৭২ফুট) উচু একটা চুড়ায় উঠে দেখেন সেখানে একটা জুটি তার আগেই উঠে বসে আছে। এরা ছিল সুন্দরী তরুনী মোনা (পরবর্তিতে আরভীনের প্রেমিকা এবং স্ত্রী) এবং নোয়েল ওডেল (আরভিন-ম্যালোরিকে শেষবার জীবিত দেখা ব্যাক্তি, ১৯২৪এ ব্রিটিশ অভিযানে অংশ নেয়া অভিযাত্রী)। মানুষ শুধু এডভেঞ্চারের কারনে পায়ে হেটে পাহাড়ে উঠে জানতে পারেন এদের কাছ থেকে। আর এন্ড্রু আরভিন পরিনত হন মাউন্টেনিয়ারে।

জর্জ ম্যালোরি (১৮৮৬-১৯২৪)ঃ

ব্রিটিশ আর্টিলারীর সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট অবস্থার ম্যালোরি
ম্যালোরির বাবা ছিলেন ধর্ম নেতা। ২ বোন আর ১ ভাই (ছোট ভাই এয়ার চিফ মার্শাল স্যার ট্রাফোর্ড ম্যালোরি ২য় বিশ্বযুদ্ধে রয়াল ব্রিটিশ এয়ারফোর্সের কমান্ডার ছিলেন)। জর্জ ম্যালোরি ভয়ঙ্কর মেধাবী ছাত্র ছিলেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে অঙ্কে স্কলারশিপ নিয়ে উইনচেষ্টার কলেজে ভর্তি হন। টিনেজার ম্যালোরি সেখানেই প্রথম রক ক্লাইম্বিং আর মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাবের সদস্য হন। পরে ম্যালোরি কেম্ব্রিজের ছাত্র হন। আর সেখানে জনপ্রিয় রোয়িং এর খ্যাতি পান। কেম্ব্রিজে পড়াশূনা শেষ করে ম্যালোরি পেশা হিসাবে স্কুল শিক্ষকতাকে বেছে নেন। টিচার হিসাবে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন তার ছাত্রদের মাঝে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝে প্রেমিকা রুথ টার্নার’কে বিয়ে করেন। তাদের ২ মেয়ে আর ১ ছেলে। ১৯১৫ সালে ম্যালোরি ব্রিটিশ আর্মি’তে আর্টিলারী ইউনিটে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসাবে কমিশন্ড হন। বিশ্বযুদ্ধ শেষে জর্জ ম্যালোরি আর্মি থেকে রিজাইন করেন, ১৯২১ সালে ১ম এভারেস্ট অভিযানে অংশ নেন। সেটা ছিল ক্ষয়িষ্ণু ব্রিটিশ সম্রাজের জাতীয় গৌরবের বিষয়। প্রথম মিশনটা’তে এভারেস্ট জয়ের জোরালো চেষ্টা হয়নি, বরং সেটা ছিল মুলত রেকি মিশন। ১৯২২ সালে ২য় এভারেস্ট মিশনেও অংশ নেন আরভিন। ১৯২৪ সালে ৩য় এভারেস্ট অভিযানে সর্বশেষ অংশ নেন। এর মাঝে কেম্ব্রিজে অস্থায়ী লেকচারারের পোষ্টে কাজ করেন, যাতে চাইলেই এভারেস্টের জন্যে চাকরী ছেড়ে দিতে পারেন।

এভারেস্ট রহস্যঃ

১৮৪০ সালে দেরাদুনে কর্মরত বাঙ্গালী সার্ভেয়ার রাধানাথ শিকদার (বিখ্যাত হিন্দু কলেজে, উনি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ক্লাসমেট ছিলেন) সর্বপ্রথম আবিষ্কার করলেন নামহীন পিক নাম্বার ১৫ পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ। তার বস জর্জ এভারেস্টের নামে উনি এর নাম প্রস্তাব করলেন মাউন্ট এভারেস্ট। যদিও উনি জানতেন না তাদের খাতায় নামহীন ১৫ নাম্বার পিকের একটা স্থানীয় নাম আছে ‘সাগরমাথা” (এখনো এভারেস্ট রেঞ্জ না বলে আমরা বলি সাগর মাথা রেঞ্জ, যেমন কারাকোরাম, লোতসে, কাঞ্চন জঙ্ঘা, ধবলগীরি রেঞ্জ)। ব্রিটিশরা সিপাহী বিদ্রোহের পর পর থেকেই শুরু করে গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্ভে। হিমালয় রেঞ্জে বিস্তর কাজ করে তারা। লক্ষ ছিল মুলত চীনকে ব্রিটিশ কলোনি বানানোর সহজ ধান্ধা অথবা রুশ’রা আক্রমন করলে পালটা জবাব দেয়া। ভারত থেকে হিমালয় দিয়ে চীনে যাওয়া যায় সেটা অনেক আগেই বিক্রমপুরের মনীষী অতীশ দিপঙ্কর প্রমান করেন পায়ে হেটে হিমালয় পাড়ি দিয়ে তিব্বতে ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে। ব্রিটিশরা বার বার এভারেস্টের দুর্গমতার কাছে হার মানে। ব্রিটিশ সম্রাজ্য অস্তগামী হতে শুরু করেছে। পরদেশ হরন ছাড়া সভ্য মানুষের মতো কোন বড় ভৌগলিক আবিষ্কারে ব্রিটশ’রা নেই এই দুর্নাম ঘুচাতেই হবে। সমুদ্র পথে ভারত আবিষ্কার করলেন পর্তুগীজ ভাস্কো দা গামা, আমেরিকা করলেন স্প্যানীশ কলোম্বাস, নর্থ পোল অ্যামেরিকান ফ্রেডিরিখ কুক, সাউথ পোল নওরোজিয়ান রোয়াল্ড এম্বুডসন। বাকী রইলো খালি মাউন্ট এভারেস্ট। ব্রিটিশরা কোমড় বেধে নামলো তাদের সম্রাজ্যের ভেতরেই থাকা এভারেস্ট জয়ে।
১৯২১ সালের প্রথম অভিযানঃ ১৯২১ সালে রয়েল জিওগ্রাফিক সোসাইটির টাকায় গঠিত হলো এভারেস্ট কমিটি। কর্নেল চার্লস হাওয়ার্ড বারির নেতৃত্বে প্রথম এভারেস্ট অভিযান। মাউন্টেনিয়ার্স দলের নেতা ছিল হ্যারল্ড রেবার্ন। মাউন্টেনিয়ার দলে ছিলেন জর্জ ম্যালোরি এবং অন্যান্যরা। মুলত এটা ছিল এভারেস্টের ম্যাপিং আর রেকি অভিযান। দির্ঘ ৫ মাস ধরে এভারেস্টে ওঠার সম্ভাব্য পথ খুজতে থাকেন তারা। ম্যালোরি সঙ্গি ২ মাউন্টেনিয়ারকে নিয়ে নর্থ কোল পর্যন্ত (২৩হাজার ফুট) পর্যন্ত উঠে পরেন।
১৯২২ সালের অভিযানঃ ১৯২২ সালের অভিযানে দলনায়ক ছিলেন জেনারেল ব্রুস। এ দলেও মাউন্টেনিয়ার হিসাবে ছিলেন ম্যালোরি। এভারেস্টের ইতিহাসে এটাই প্রথম ফুল স্কেল অভিযান, এভারেস্ট জয়ের জন্যে। আগেরবারের ঠিক করা পথে ম্যালোরির দল ২৬৮০০ ফুট পর্যন্ত উঠে যান। অন্য মাউন্টেনিয়ার জেফ্রি ব্রুস আর জর্জ ফিঞ্চ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অক্সিজেন্ট টিউব ইউজ করেন, তারা ২৭৩০০ ফুট পর্যন্ত উঠেন এবং ইতিহাসের সর্বোচ্চ হাই ক্যাম্প স্থাপন করেন। সবাই এভারেস্ট অভিযানে কৃত্রিম অক্সিজেনের গুরুত্ব টের পায়। ম্যালোরির দল চুড়া বিজয়ে তৃতীয় চেষ্টায় হ্যাভেলাঞ্চের (তুষার ধ্বস) কবলে পড়েন। ৭ জন শেরপা মারা যায় (এটাই এভারেস্ট ইতিহাসে প্রথম মৃত্যু)। বাধ্য হয়ে ব্রিটিশদের দল ব্যার্থতার মধ্য দিয়ে অভিযান শেষ করে।

১৯২৪ সালের রহস্যময় অভিযানঃ

অভিযান শুরুর আগে ১৯২৪ এর টিম।

এ অভিযানের নেতা হিসাবে আমরা সবাই কর্নেল নর্টনকে চিনি। যদিও প্রথমে নেতা ছিলেন ব্রিগেডিয়ার ব্রুস বলে আরেকজন। কিন্তু দার্জিলিং পর্যন্ত যেতে না যেতেই দলে ম্যালারিয়া ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বয়ং দলনেতা ব্রিগেডিয়ার সাহেবই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দল থেকে বাদ পড়েন। এবারে মাউন্টেনিয়ার্সদের দলের নেতা করা হয় ম্যালোরিকে। দলে ছিলেন আগেরবার অক্সিজেন ব্যাবহারের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত দেয়া জেফ্রি ব্রুস, হাওয়ার্ড সামারভেল, জর্জ নোয়েল। নতুন মুখ আলোচিত আরভিন এবং আরভিনের বন্ধু মাউন্টেনিয়ার নোয়েল ও’ডেল (ম্যালোরি আরভিনকে সর্বশেষ চাক্ষুষ করা ব্যাক্তি)।
- ২জুন নর্থ কোল দিয়ে অভিযানে ম্যালোরি-ব্রুস দল ক্যাম্প ৪ থেকে রওনা হয় ভয়ঙ্কর ঝরো বাতাস, তুষার ঝর, আর শেরপা’দের পিছিয়ে আসার কারনে ম্যালোরি ব্রুস ব্যর্থ হয়ে নর্থ কোল ক্যাম্পে ফেরে।
- ৪ জুন সামারভেল-নর্টন জুটি পার্ফেক্ট ওয়েদার পেয়ে সামিটের জন্যে বের হয়। সামারভেল ২৮০০ফুট গিয়ে ফেরত আসে কিন্তু নর্টন আরো এগুতে থাকে, শেষ পর্যন্ত নর্টন এভারেস্ট চুড়া থেকে মাত্র ৯০০ ফুট দূর থেকে ফেরত আসতে বাধ্য হয়।
- ৮ জুন। সর্বোচ্চ হাই ক্যাম্প ৬ (২৬৯০০ফুট) থেকে ম্যালোরি আর আরভিন রওনা হয় এভারেস্ট সামিটের জন্যে। তাদের সাথে অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়াও ক্যামেরা ছিল। নোয়েল ও’ডেল (আরভিনের বন্ধু) ক্যাম্প থেকে সাপোর্ট দল হিসাবে থেকে যায়। ২৬৯০০ফুট উচ্চতার ক্যাম্প ৬এ বসে ও’ডেল তার ডায়েরি’তে লেখেন আমি দেখলাম ম্যালোরি আরভিন জুটি এভারেস্টের ফাইনাল পিরামিডে। সেকেন্ড স্টেপ থেকে চুড়ার দিকে রওনা হয়। তখন ঘড়িতে দুপুর ১২টা এর পরে আর তাদের দেখা যায়নি। এর পরে তারা আর কখনো ফেরত আসেনি। যদি তারা সেকেন্ড স্টেপে থাকেন তাহলে এভারেস্টের চুড়ান্ত লক্ষ মাত্র ৩ ঘন্টার রাস্তা। তাদের কাছে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ছিল। দুজনেই সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী সুস্থ ছিলেন। সামিটে ব্যার্থ হবার সম্ভবনা খুব কম ছিল। আরভিন-ম্যালোরির রহস্যময় অন্তর্ধানের মধ্য দিয়ে ৩য় এভারেস্ট অভিযান ব্যর্থ হয়।

দেশে ফেরত আসার পরে সর্বশেষ চাক্ষুষ ও’ডেলের মন্তব্য খুব বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ও’ডেলও পরে কনফিউজ হন আসলেই তাদেরকে সেকেন্ড স্টেপে নাকি ফার্স্ট স্টেপে দেখেন। ৪র্থ অভিযান হয় প্রায় ১ দশক পরে। ১৯৩৩, ১৯৩৪, ১৯৩৫, ১৯৩৬, ১৯৩৮, এর পরে ২য় বিশ্বযুদ্ধের বিরতী। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতে প্রথম অভিযান চালায় কানাডিয় টিম। ১৯৫০সালে ব্রিটিশ-আমেরিকা যৌথ অভিযান। ১৯৫১ সালে আবার ব্রিটিশ’রা যেখানে হিলারী প্রথম অংশ নেন। ভারত-নেপাল তখন স্বাধীন ব্রিটিশদের খবরদারী শেষ। ১৯৫২ সালের অভিযানের দায়িত্ব পান সুইস টিম। সুইস’রা তেনজিং এর সহায়তায় আধুনিক গিয়ার নিয়ে মাত্র ৯০০ ফুট দুরত্ব বাকী থাকতে ব্যর্থ হয়। রুশ মিডিয়া দাবী করে চীন-তিব্বত বেজ ক্যাম্প দিয়ে রুশ’রাও নাকি এসময় অভিযান চালায় কিন্তু তার কোন প্রমান পাওয়া যায়নি। সম্ভবত স্নায়ুযুদ্ধের একটা মিডিয়া স্টান্ট বাজী ছিল।
এর পরে ১৯৫২ সালে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া, নেপাল-নিউজিল্যান্ডের যৌথ অভিযানে ভারতীয় নাগরিক তেনজিং নোরগে তার সপ্তম প্রচেষ্টায় এবং নিউজিল্যান্ডের নাগরিক এডমন্ড হিলারী তার ২য় প্রচেষ্টায় ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এভারেস্ট জয় করে ফিরে আসে।

ম্যালোরি-এবং আরভিন।
ম্যালোরি-আরভিনের প্রত্যাবর্তনঃ ১৯২৪ সালে ম্যালোরি-আরভিনের হারিয়ে যাবার অনেক অনেক বছর কেটে গেছে। রহস্যের সমাধান হয়নি। ১৯৩৩ সালে প্রায় ২৬০০০ফুট উপরে আরভিনের আইস এক্স পাওয়া গেলে বিতর্ক আরো উসকে ওঠে। ১৯৭৫ সালে ওয়াং নামের একজন চায়নিজ মাউন্টেনিয়ারের নেতৃত্বে একটি জাপানি টিম এভারেস্ট অভিযান চালায়। অভিযানে ওয়াং জানায় তাদের ক্যাম্পের কাছে তারা এক শেতাঙ্গ মাউন্টেনিয়ারের মৃতদেহ দেখতে পায় যার পোষাক আশাক ১৯২৪ সালের স্টাইলে। কিন্তু ওয়াং বেশী প্রমান দিতে পারেননি, কারন পরদিন তুষার ধ্বসে ওয়াং এর পরিনতিও আরভিন-ম্যালোরির মত হয়। ১৯৯৯ সালে বিতর্কের অবসান করতে ম্যালোরি-আরভিন রিসার্চ টিম অভিযানে নামে। ওয়াং এর কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জায়গার কাছে তারা ম্যালোরির মৃত দেহ আবিষ্কার করেন। ম্যালোরি মারা যাবার ৭৫ বছর পরে ম্যালোরি আবার সভ্য জগতে প্রত্যাবর্তন করে। ম্যালোরির কোমড়ে ইনজুরি থেকে ধারনা করা হয় তিনি সম্ভবত আরভিনের সাথে নিজেকে দড়ি দিয়ে বেধে উপরে ওঠার বা ওঠানোর কিংবা নামা বা নামানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আহত হন এবং সেকেন্ড স্টেপ বা ফার্স্ট স্টেপ থেকে পরে নিহত হন। কিন্তু আরভিন কই? মৃত্যুর ৭৫ বছর পরে ম্যালোরি ফিরলেও এভারেস্ট থেকে আরভিন এখনো ফেরেননি। সাম্প্রতিক সময়ে শোনা যাচ্ছে, আরভিন সার্চ কমিটি স্যাটালাইট ইমেজ থেকে আরভিনের দেহ খুজে পেয়েছে। আরভিনকে ফিরিয়ে আনতে ২০১০ সালে একটা অভিযান চালানো হয় কিন্তু সেটার কোন সাফল্য আসেনি। এবছর ২য় অভিযান হবার কথা। আরভিনকে ফিরিয়ে আনতে।


ম্যালোরি আরভিনের রহস্য ভেদ নিশ্চিত ভাবে হবে যেদিন ম্যালোরির ক্যামেরাটা পাওয়া যাবে। কারন এভারেস্ট সামিট করলে অবশ্যই ম্যালোরি ছবি তুলতেন। ম্যালোরি-আরভিনের আসল ঘটনা যাই হোক না কেন, প্রতি বছরের মতো আগামী কালকেও ২৯শে মে আসবে, সারা পৃথিবীতে এভারেস্ট ডে পালন হবে আর ম্যালরির অমর উক্তি বার বার ফিরে আসে- I want to climb mount Everest because it is in there. ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29387768 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29387768 2011-05-29 01:49:04
::::একজন রবীন্দ্রভক্তের গল্প::::
গতবছর কাজের সুত্রে এক ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী তরুনের সাথে পরিচয় হয়েছিল। হিপহপ কালচারের আদর্শ অনুরাগী। মাথায় বিচিত্র চুলের ফ্যাশন, বেসবল ক্যাপ পড়ে একটু তেরছা করে, গলায় অনেকগুলো মালা, চেইন, আরো কি কি জানি। ঢোলা প্যান্ট কোমড়ের নিচে কিভাবে জানি ঝুলে আছে, কখন কোথায় খুলে পড়ে কেলেঙ্কারী ঘটাবে, সেটা আগে থেকে আন্দাজ করা মুশকিল। দু কানে চারটা ইয়ারিং, চোখের ভুরুতেও একটা রিং ঝোলানো। দুহাতের কবজিতে চিত্র-বিচিত্র ট্যাটু করা। জন্ম থেকেই ইংল্যান্ডে সেটেল্ড। আলা-জিহবা থেকে গার্গল করার ভঙ্গিতে কঠিন ব্রিটিশ উচ্চারনে ইংলিশ বলে কিচ্ছু বুঝি না। ইংলিশ ছাড়া দ্বিতীয় যেই ভাষাটা বলে সেটা উর্দু বা পশতু জাতীয় কিছু, যার একবর্ন আমার চৌদ্দগুষ্টির কারো পক্ষে জানার সম্ভবনা নেই। ভেবেছিলাম পাকিস্তানী বা ভারতীয় কিছু হবে, চমকে গেলাম যখন শুনি জন্মসুত্রে সে বাংলাদেশের নাগরিক।
সেকেন্ড জেনারেশন অনেক বাংগালীই আছে যারা বাংলা বলতে পারেনা। আমার এক ভাগিনার এই অবস্থা। মা’কে বলে মামা (আমারে কি ডাকবে তাইলে?)। এই জিনিসগুলো আমার দুচোখের বিষ। একেও তেমনই ভাবছিলাম। সে জানালো সে আসলে জাতিতে বালুচ। তার দাদা বাংলাদেশে সেটেলড হয়েছিল, তার বাবার জন্ম ঢাকা শহরে, এমনকি তারও। বালুচরা যে নিজেদের পাকিস্তানী বলতে পছন্দ করেনা, সেটা ওর কাছ থেকেই শুনেছিলাম। সে অবশ্য কারন টারন বলতে পারে না। কারন জানলাম তার দাদার কাছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সামরিক বিশ্লেষনের পাতায় পাতায় রয়েছে পশ্চিমের জল্লাদ বালুচ রেজিমেন্ট আর ৬৫এর হিরো বেঙ্গল রেজিমেন্টের যুদ্ধের গল্প। কিন্তু বালুচরা পাঞ্জাবীদের হাতে বছরের পর বছর নির্যাতন ভোগ করে আসছে। সেই লোকের দাদা’র ধারনা আগামী ২০বছরের মধ্যে বেলুচিস্তান হয়তো পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যেতে পারবে। তাদের ভাষা বালুচ, ওরা পাঞ্জাবী বা উর্দু কিছুই পারেনা।
তার দাদা চমতকার লোক। রবীন্দ্রনাথের কাবুলীওয়ালার সাথে চেহারা খাপে খাপে মিলে যায়। অনেক লম্বা, সেই হিসাবে চওড়া, আর গায়ের চামড়াও পাকিস্তানীদের চেয়ে উজ্বল। ভদ্রলোক অনেক আলাপী। অনেক বয়স, কিন্তু এখনো তাগড়া শরীর। কথায় কথায় জানালেন ব্রিটিশরা চলে যাবার আগেই উনি ব্যাবসা করতে অবিভক্ত বাংলায় আসেন। ঢাকা শহরে আসেন ষাটের দশকে, আর ফিরে যাননি। এতবছর ধরে বাংলায়, কিন্তু বাংলায় কেমন জানি বিদেশী টান। তাকে সেই প্রসঙ্গে বলতেই রেগে গেলেন। ইয়াংম্যান, তুমি হামার বাংলা নিয়া সন্দেহ কর? বুঝলাম সে নিজেই আমার আর হামার এর মধ্যে পার্থক্য শুনতে পারে না। কথাটা চাপা দেবার জন্যে বললাম, তোমার প্রিয় সাহিত্যিক কে?
তাতক্ষনিক জবাব, রবীন্দ্রনাথ।
কেন? সেটার জবাবে দুনিয়ার রবীন্দ্রনাথের কবিতার উদাহরন, লাইন আর হাজারটা গল্পের কাহিনী নিয়ে বিশাল এক আলোচনা। যার প্রায় কিছুই আমি বুঝলাম না। গল্পগুচ্ছের সব গল্প পড়া হয়নি। সোনার তরী, বা আমাদের ছোট নদী টাইপের যেই সব কবিতা পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি, সেগুলোই সম্বল। তাই ভদ্রলোকের উত্তরটা মাথার উপরে দিয়ে গেল। সে ব্যাপারটা ধরতে পারলো। হোক ৫০বছর ধরে ঢাকায় থাকে, তবুও একজন অবাঙ্গালীর কাছে রবিঠাকুর নিয়ে এত ভারি ভারি কথা শুনতে কেমন জানি অস্বস্তি লাগে।
ভদ্রলোকের সাথে দ্বিতীয়দিন দেখা হবার সময় খুব আয়োজন করে একটা কাগজ দেখতে দিলেন। হলুদ জীর্ন একটা কাগজ। অনেক পুরাতন সন্দেহ নেই, কবিতা না গান না। একটা বিজ্ঞাপন জাতীয় কিছুর ফটোকপি। আমি না বুঝে তার দিকে তাকাতেই রেগে গেলেন। ইয়াং ম্যান ভালো করে দেখ। দেখলাম, কাগজে অনেক কিছুই লেখা, নিচে লেখকের স্বহস্তে নাম সাক্ষর, “শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”। আহামরী কিছু না। রবীন্দ্রনাথের লেখা একটা পাতার ফটোকপি।
ভদ্রলোক জানালেন এটার মুলকপি তার কাছে ছিল। একাত্তুর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় হারিয়ে গেছে।
ভদ্রলোক প্রতিবছর একুশে বইমেলায় যান, বাসায় সিডি প্লেয়ারে রবীন্দ্রনাথের গান শোনেন, গরগর করে রবীন্দ্রনাথের কবিতা মুখস্থ বলে যান। বাংলা বলতে শিখেছেন ব্যাবসার খাতিরে, আর বাংলা পড়তে শিখেছেন রবীন্দ্রনাথকে ভালোবেসে।
ভদ্রলোক তার কথা বললেন। আমাদের কয়েকপুরুষের ব্যাবসা। বালুচদের সাথে পাঞ্জাবীদের সম্পর্ক খুব খারাপ। ১৯৪১সালে ১৬/১৭বছর বয়সেই বাবার ব্যাবসাতে ঢুকে পড়ি। ব্যাবসার খাতিরেই গেলাম কলকাতা শহর। ১৯৪১সালে, কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী আর ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় শহর। বয়স অল্প, কলকাতার চাকচিক্যে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। সারাদিন কাটে সিনেমা হল আর বিদেশী রেস্টুরেন্টগুলোয়। পকেটে টাকা আছে, চিন্তা কিসের? একদিন এক সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাত দেখি বিশাল মিছিল। হাজার হাজার লোক অশ্রুভেজা চোখে মিছিল করে যাচ্ছে। জীবনে অতবড় মিছিল ঐ প্রথম দেখলাম। ঘটনা কি জানতে মিছিলে ভিড়ে গেলাম। কিসের মিছিল জিজ্ঞেস করাটা হয়তো অবান্তর ছিল, কিন্তু কলকাতা শহরে তখন মাত্র ক-দিনের নাগরিক। জানলাম বাংলা মুলুকের সবচেয়ে বড় কবি শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভিষন অসুস্থ ছিলেন। মারা গেছেন, আর তার শবযাত্রাতে হাজার হাজার মানুষের সাথে আমিও শরীক হয়েছি, রবীন্দ্রনাথের নাম না জেনেই।
রবীন্দ্রনাথের নাম শুনলাম জীবনের প্রথমবার তাঁর শবযাত্রায় গিয়ে। শবযাত্রা শেষে বুঝতে পারলাম আমি ভিষন সৌভাগ্যবান, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের শবযাত্রায় উপস্থিত থাকা মানুষ। খুব কৌতুহল হলো, রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে খোঁজখবর শুরু করলাম। তার জীবনদর্শন, চিন্তাভাবনা আমাকে জাদু করলো, কাজের সুত্রে বাংলা শিখলাম, রবীন্দ্রনাথ পড়া শুরু করে সেই মুগ্ধতা দিন দিন বাড়তে থাকলো। ব্রিটিশরা চলে গেল, পাঞ্জাবীদের সাথে না থেকে চলে এলাম পুর্বপাকিস্তানে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, ছেলে মেয়েরা সবাই পাড়ি জমালো দেশ বিদেশে। কিন্তু আমার যাওয়া হলো না। থেকে গেলাম ঢাকা শহরেই।




**** লেখাটার নাম একজন রবীন্দ্রভক্তের গল্প। কিন্তু এটা মোটেই গল্প না। ভদ্রলোককে বলেছিলাম তোমার কথা কি আমি অন্যদের কাছে শেয়ার করতে পারি? উনি বলেছিলেন, অবশ্যই পারো, কিন্তু আমার নাম উল্লেখ না করে।তাই চেষ্টা করেছি গল্পে কোথাও তার নাম বা পরিচয় উল্লেখ না করতে। লেখাটা গত বছর প্রথম আলো ব্লগে পূর্ব প্রকাশিত। এ বছরে রবীঠাকুরের ১৫০ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সামহোয়ার ইন ব্লগে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ। উপরের ফটোশপে বানানো রবী-ঠাকুরের সাথে মহেশখালী চ্যানেলে নৌবিহারের ছবিটাকে কেউ দয়া করে ফাজলামী মনে করবেন না। ****

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29376636 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29376636 2011-05-07 01:17:35
::::আলীর সুরং ::::

আমার মায়ের সোনার নোলক
হারিয়ে গেল শেষে
হেথায় খুঁজি,হোথায় খুঁজি
সারা বাংলাদেশে

সারা বাংলাদেশ অনেক বড়, বিশাল অংশ অদেখা । ১২ই এপ্রিল । মনমেজাজ খুব খারাপ । অফিসে প্রচন্ড চাপ , ছুটি-ছাটা পাইনি বহুদিন । দু'দিন পরে পহেলা বৈশাখ , সেদিনও অফিস করা লাগবে । কোন কাজই ঠিক মতো করতে পারছি না । অডিট করতে একখানে ১০০ডলার লেখার কথা, দেখি ১হাজার ডলার লিখে বিশাল ভজঘট বাঁধিয়ে বসে আছি । বসের কাছে গিয়ে বললাম, কোন কাজে মন বসাতে পারছিনা । ক’দিনের ছুটি দেন, জঙ্গল থেকে ঘুরে আসি । আমাকে হতভম্ব করে ছুটি পাশ হয়ে গেল টুঁ-শব্দ ছাড়া । ১৫ তারিখ থেকে ৪দিনের ছুটি । হাতে একদমই সময় নাই । কই যাই কি করি ? ফোন দিলাম বাবু ভাই-কে । আলী-কদমে আলীর সুরং দেখতে যাব । মীর শামসুল আলম বাবু ভাই বাংলাদেশের সেরা মাউন্টেনিয়ার । হিমালয় নিয়ে উনার কারবার, আলী-কদম যাবার ব্যাপারে উৎসাহ দেখাবেন কি না সন্দেহে ছিলাম । এক কথায় উনিও রাজী । রাতে ফেসবুকে আলাপের সময় 'বাংলার পথে' টিংকু ভাইএর সাথে আলাপ হলো । উনি জানালেন উনিও যাবেন, তার শ্যুটিং টিম নিয়ে ।
ফেসবুকে একটা ইভেন্ট দিলাম ক্যাম্পিং আর রক ক্লাইম্বিং এর দাওয়াত দিয়ে । লিঙ্ক দিলাম সামহোয়ার ইন ব্লগ চ্যাট আর সামহোয়ার ইন ফটোগ্রাফি (এখন এমেচার ফটোগ্রাফি) গ্রুপে । ওমা, দুমিনিটের মধ্যেই দেখি দুই গ্রুপ থেকেই কে জানি আপত্তিকর মনে করে ইভেন্টটা ডিলিট মেরে দিল । ভীষণ রাগ উঠলো, পরে ভাবলাম না গেলে নাই । ট্রেকিং বাংলাদেশে পপুলার হয়েছে, ক্যাম্পিং বা রক ক্লাইম্বিং পপুলার হতে সময় লাগবে।





সে যাইহোক, ৪৮ ঘন্টার নোটিশে যাত্রা । কোন যোগাড়যন্ত্র হয়নি । যোগাড়যন্ত্র করার সুযোগও পাচ্ছিনা, অফিসের অত্যাচারে। তারপরেও কেমন করে জানি দেখলাম রওনা হবার আগে ১৫ মিনিটের মধ্যে ঢাউস ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে ফেললাম । ঢাকা থেকে নাইট কোচে আরামেই বের হলাম । পথে বাবু ভাইএর কাছ থেকে বোনাস হিসাবে ফটোগ্রাফি আর ভিডিওগ্রাফির ফ্রি কোচিং । (বাবু ভাই বিক্রি করার জন্যে ছবি তোলা শুরু করেন যখন তখনও আমি হাফপ্যান্ট পড়া ধরিনি, ডায়াপারেই ছিলাম) ।

সকাল ৭টার মধ্যেই আমরা চকোরিয়ায় নামলাম । ছোট্ট মফস্বলি ছিমছাম বাস স্ট্যান্ড । ককসোবাজার রুটের বাস বেশী, থেমে থেমে চান্দের গাড়ী আর মুড়ীর টিন-মার্কা বাসের কন্ডাক্টর ওয়েলকাম জানাচ্ছে-লামালীকদম, লামালীকদম (লামা এবং আলীকদম) । বাবু ভাই, আমি আর রাসেল ৩জনে পরোটা আর ডালভাজা শেষ করে চা’য়ে চুমুক দিচ্ছি এমন সময়ে এসে হাজির হলো আরেক সদস্য (সামহোয়ার ইন থেকে), হেলাল হেযাযী । নাম শুনে মানুষের চেহারা টাইপ কিছু একটা সবসময় চোখে ভাসে । হেলাল হেযাযী নাম শুনে গাট্টা গোট্টা, জব্বারের বলী খেলোয়াড় টাইপ কারো কথা মনে হয়, কিন্তু হালকা পাতলা, ক্লাস সিক্স সেভেন চেহারার হাসিখুশী হেলাল হেযাযী’র চেহারা আশা করিনি । ভ্রুকুটি দেখেই হয়তো সে বেশ গরম হয়েই জানালো সে ঢাকা ইউনিভার্সিটি’তে থার্ড ইয়ারে পড়ে। বাকী ক’দিনের জন্যে তার নাম ‘থার্ড ইয়ার’ বানানো ঠেকানো গেলনা । টিঙ্কু ভাই’দের সাথে ফোনে যোগাযোগ হলো। তারা প্রাইভেট-কারে শ্যুটিং এর ক্যামেরা নাকি বন্দুক ফন্দুক নিয়ে আসছে। তারাও পথে আছে ঠিক আমাদের পেছনটায় ।

চুনতি রিজার্ভ ফরেস্টের শ্যামলিমা ভরা পরিচিত কক্সবাজার হাইওয়ে ছেড়ে লামার পাহাড়ি রাস্তায় বাস ঢুকতেই মনটা ভালো হয়ে গেল । বড় বড় গাছের গায়ে ছোট ছোট সতর্কবানী-‘এখানে বুনো হাতি পাওয়া যায়’। এপ্রিল মাস, জুম লাগানোর সময় । পাহাড়ের গায়ে জঙ্গল সাফ করে থরে থরে জুম লাগানোর কাজ চলছে । এর মাঝেই বিসদৃশ ভাবে জায়গায় জায়গায় BAT এর অর্থায়নে তামাক চাষ চলছে । লিমিট ছাড়া ফাজলামীর চুড়ান্ত- লেখা ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো’র অর্থায়নে পাহাড়ে বনায়ন কর্মসুচী।





লামা’তে সম্ভবত ম্রো (মুরং) আর ত্রিপুরা’দের সংখ্যা বেশী। ত্রিপুরা মেয়েরা আর ম্রো ছেলেরা যেন রূপচর্চার কম্পিটিশানে নেমেছে । ত্রিপুরা মেয়েদের দেখলেই চেনা যায়, গলায় হাজারখানেক সুতোর মালা, আর কানে বাহারি ইয়ারিং (সিলেটের ত্রিপুরা বা টিপরা-দের সাথে বান্দারবানের ত্রিপুরা-দের মিল না খোঁজাই শ্রেয়) । থানছি, রুমা, মদক -এর চেয়ে এদিকে ত্রিপুরা মেয়েরা বোধহয় উজ্জ্বল রঙ এর কাপড় বেশী পছন্দ করে, কিংবা বিজু উৎসবের সময় বলেই হয়তো চারদিকে রঙের ঢল নেমেছে । ম্রো মেয়েরা পোশাক আশাকে এত শৌখিন না হলেও তাদের দুর্নাম ঘোচাতে ম্রো পুরুষ বিশেষ করে ব্যাচেলর-রা বদ্ধপরিকর । মাথায় সাদা রঙ এর বাহারি পাগড়ি । লাতিন ফুটবলারদের স্টাইলে লম্বা চুলে খোঁপায় চিরুনী, মুখে রঙ আর ঠোটে হাসির কমতি নেই ।

পরপর দু-রাত ঘুম হয়নি, ঝিমুনিটা জমে ওঠার আগেই শুনি বাস লামা শেষ করে আলীকদম বাস-স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে ভোঁ দিয়ে দিল । আমরা সবাই গাট্টি-বোঁচকা বেঁধে নেমে পড়লাম। টিঙ্কু ভাই এন্ড গং এর তখনও দেখা নেই, ফোনেও পাচ্ছি না, পালিয়ে যাচ্ছি বন্ধু নেটওয়ার্কের বাহিরে টাইপ । আমার ব্যাকপ্যাকটা দর্শনীয় । ৩জন থাকার মতো বড় তাঁবু, ট্রাইপড, স্লিপিং ব্যাগ, স্লিপিং ম্যাট আর বাকী জায়গা’তে ঠাসাঠাসি করে জায়গা করে নেয়া অদরকারি কিছু কাপড় চোপড় । এসব নিয়ে রোদের মধ্যে ঘোরাঘুরি না করে, ছায়া ঢাকা একটা চিপায় তলপেটের চাপ কমিয়ে চা’য়ের দোকান খুঁজে বসে পড়লাম । ২কাপ শেষ করার আগেই টিঙ্কু ভাই এন্ড গং হাজির । ব্যাকপ্যাকটা তার গাড়ি’তে তুলে দিয়ে আমরা ছিমছাম উপজেলা শহর আলীকদমের রাস্তায় হাঁটা শুরু করলাম। শহরের আদ্ধেকটা জুড়েই আর্মি গ্যারিসন । আমার হবু শ্বশুর সাহেব তার এক হাবিলদার’কে ধরিয়ে দিয়েছেন, আলীকদম পোষ্টিং । আমরা প্রেস ক্লাবে গিয়ে বসলাম । প্রেসক্লাবে টিংকু ভাই’এর এক সাংবাদিক বন্ধু আছেন । উনি আলী-কদমের ইতিহাস আর নামকরন নিয়ে চমৎকার একটা বই লিখেছেন । সবাই মিলে সৌজন্য সংখ্যা নেবার নাম করে সেটার ফ্রি কপি পকেটস্থ করলাম । ক’জন গেল বাজার করতে, আর আমি, বাবু ভাই আর থার্ড ইয়ার চললাম হাবিলদার সাহেবের সাথে ক্যাম্পিং এর প্রস্তুতি নিতে ।

হালকা উঁচু নিচু রাস্তা, ঠিক পাহাড়ী এখনো শুরু হয়নি । দু'ধারে মাথা উঁচু করে থাকা গম্ভীর পাহাড়ের মাঝে বিশাল সমতল ভূমিকে ভূগোলের ভাষায় ভ্যালি বলে । ঢুকতেই একটা মন্দির, চারপাশে কয়েকটি মারমা, বাঙালী মিক্সড গ্রাম । মন্দিরে বোধহয় কোন উৎসব হচ্ছে। রঙ বেরঙের পোষাকে মারমা মেয়ে’রা ভীড় করেছে । সামনে অস্থায়ী দোকানে তরমুজ, কাঁচা আম, টাম (একধরনের পাহাড়ী ফল । গাড়ী করে কেওকারাডং যাবার পথে মুংলাই পাড়ায় বিশাল এক টাম বাগান আছে, বাগানের মালিক খেতে দিয়ে জানিয়েছিলেন এটার নাম আমের ভাই টাম), আর আছে ডাবের দোকান ।



আমরা ঘাড়ে-পিঠে-মাথায় করে সব বোঁচকা বুঁচকি নিয়ে এলাম গ্রামের এক বাড়ী’তে । গৃহকর্তা ভোলার লোক । পাহাড়ে সেটলার হিসাবে আছেন ২০ বছর ধরে। তার বাসায় গোয়াল ঘরে আমাদের নাকি তাঁবু খাটানোর জায়গা । গোয়াল ঘরে বড় বড় গরু’র সাথে রাত কাটানোর প্রশ্নই উঠেনা । আমরা বেরুলাম ক্যাম্প সাইট ঠিক করতে। সামনে একটু নিচ দিয়ে গেছে ছোট্ট একটা নদী যা পুরো গ্রামের পানির উৎস । গুহার পথে একটা অংশ ঘোড়া’র ন্যাজের মতো বাঁক নিয়েছে । একধারে পাহাড়, কাছে গ্রাম, আর একদম গা ঘেঁষে নদী । ক্যাম্প করার জন্যে অতিরিক্ত রকমের ভালো জায়গা । শুধু একটাই সমস্যা খোলা জায়গা দিয়ে সোজা পাহাড়ের উপরে আর্মি ক্যাম্পের বিশাল সাইজের এলএমজি বাংকার । ঠিক মাথার উপরে কেউ এলএমজি ধরে বসে আছে, ব্যাপারটা অস্বস্তিকর। আমরা গায়ে মাখলাম না। শুনলাম নদীর নাম টিং নদী । একে বেঁকে আর্মি ক্যাম্পের ওধারে মিশেছে মাতামুহুরীর সাথে ।

দুপুরে ঝাল ঝাল মুরগীর মাংসের সাথে লালচালের ভাত অসাধারণ লাগলো । ভয়াবহ ক্ষুধার্ত থাকার কারনে শুধু নয় , রান্নাটাও ছিল সেই রকমের কঠিন । বাকী কাউকে আড্ডা ছেড়ে উঠতে উৎসাহী না দেখে আমি আর থার্ড ইয়ার নেমে পড়লাম ক্যাম্পের দিকে । তাঁবু খাটানোর সময় দেখি বিশালাকার এক লালচে গিরিগিটি গলার রগ ফুলিয়ে রাগ রাগ ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে । ক্যামেরার অভাবে ছবি নিতে পারলাম না ।
বিকেলে বিজু উৎসবে অনুষ্ঠান শুরু হলো । বিশাল উজ্বল রঙ্গিন শোভাযাত্রা। শুরুর দিকে বালিকারা, এর পরে বাই সিরিয়াল কিশোরী, তরুনী’রা সবাই রঙ চঙে পোষাক পড়ে সেজেগুজে, সবার হাতে টাকার গাছ, অর্থাৎ কি না ডাবের মধ্যে বাঁশের কঞ্চি লাগিয়ে গাছের মতো বানানো, তাতে পাতার বদলে, ৫টাকা ১০টাকার নোট । শোভাযাত্রার একদম সামনে একজন পেতলের ঘন্টা বাদক, আর তার পিছে কারবারী। সবার পিছে ঢোল, বাঁশি আর নানারকম বাদ্যকরেরা । তাদের সামনে উৎসাহ নাচতে ব্যাস্ত । অদ্ভুত রহস্যময় গানের তালে বিশাল শোভাযাত্রাটা ঘুরে ঘুরে মন্দিরের ভেতরে অনেক গুলো চক্কর দিল । ভেতরে মেলা বসেছে ।

আস্তে আস্তে সবাই তাঁবু খাটিয়ে নিল । দূরে পাহাড়ের আড়ালে সূর্যি মামা ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়ার পালা শুরু করলো । আর আমরা শুরু করলাম জম্পেশ ক্যাম্প ফায়ার আর আড্ডার আয়োজন ।










]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29371461 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29371461 2011-04-29 00:26:58
:::: ছবি ব্লগঃ পাহাড়িকা। ::::
অনেক দিন পরে ব্লগে পোষ্ট। আবারও শর্টকার্ট ছবি ব্লগ। লেখা লেখির ঝামেলা নেই। শুধুই ছবি। ছবি গুলান সবই পাহাড়ি জীবন ধারার। এই জানুয়ারী’তে বোমাং রাজপূন্যাহ’র সময় আগ্রহ নিয়ে বান্দারবান গিয়েছিলাম। রাজপূন্যাহ’র ছবি পাই নি, তাই এই ছবি নিয়েই আপাতত তুষ্ট। রাজপূন্যাহ নিয়ে বড় আকারের ট্রাভেলগ ফাঁদার ধারে কাছে গেলাম না। ছবি ব্লগ দিয়েই কাজ সারা।


মোরা ঝর্নার মতো উদ্দাম!



শুধুই পবিত্রতা


বম পল্লীতে।


বালিকারা...







যেদিন যাচ্ছিলাম বাসে পেপারে দেখলাম, পাহাড়ে ফের রক্তপাত, শান্তিবাহিনী-ইউপিডিএফ সংঘর্ষ।


এইটা পুরান ছবি, মুরং দের গ্রামটার নাম সম্ভবত মুঙ্গোহা পাড়া নইলে কৈকনিয়া পাড়া। থানছি’র বলিবাজার দিয়ে বিপরীত পথ দিয়ে কেওকারাডং এর বিকল্প ট্রেক খুঁজতে গিয়ে এই গ্রামটায় অল্প সময়ের বিশ্রাম নিয়েছিলাম। হঠাতই খেয়াল করলাম, এটাই ফ্লিকারে আমার সব বেশী ভিজিটেট ছবি।


এটার নাম বাঁশ-পাতি পাখি। ইংরেজী নাম গ্রীন বী ইটার। সামু’তে রাজা মশাই একটা পোষ্ট দিছিলেন এই পাখিটা নিয়া।


গান গাইতে ব্যাস্ত বাঁশ পাতি পাখি বা গ্রীন বী ইটার।


এই পাখির নাম পরিচয় বাইর করতে পারি নাই। টিয়া’র সাইজ। এক্সপার্ট কেউ ধরায়া দিলে খুশি হবো।


এই পাখিটা’র নাম জানি না। সাদা , সাইজে চড়ই এর সমান। খুবই ছটফটে। আগে অনেকবার দেখছি। খোদ ঢাকা শহরেও। কেউ নাম জানলে জানায়া দিয়েন।


এই পাখিটা’র নাম জানি না। সাদা , সাইজে চড়ই এর সমান। খুবই ছটফটে। আগে অনেকবার দেখছি। খোদ ঢাকা শহরেও। কেউ নাম জানলে জানায়া দিয়েন।


ইনি মহামান্য ‘গোখরা’। ফনা না তোলায় কেমন বোকা সোকা লাগছে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29328317 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29328317 2011-02-17 08:21:00
::::সামহোয়ার ইন ফটো-ওয়াক::::

অতি শর্ট নোটিশের আয়োজন। গতকাল বিকেলে খেয়াল চাপলো। শুক্রবার ফটোওয়াকে যাব। ফুন লাগাইলাম প্রথম ফ্লিকারে সামহোয়ার ইন ফটোগ্রাফার গ্রুপের ক্যামেরাম্যান ভাইকে। এর পরে কালপুরুষদা’কে। কিন্তু রাতে ঘুমুতে যাবার সময়েও বুঝতে পারি নাই ইভেন্টটা হবে কি না। সকাল ৭টার সময়ে কালপুরুষ’দা ফোন করে উঠিয়ে দিলেন। শুক্রবার ১১টার আগে উঠার অভ্যাস নেই। শুনি উনারা নাকি রওনা হয়ে যাচ্ছেন। তারা তারি ব্যাগ গুছাতে গিয়ে দেখি ক্যামেরা’তে চার্জ নেই একফোঁটা। চার্জার লাগিয়ে কফির কেটলি চাপালাম। সাথে সাথে ভোর বেলাতেই কারেন্ট বললো খোদা হাফেজ। অজ্ঞতা চার্জ ছাড়া ক্যামেরা নিয়েই বেরুলাম।
গিয়ে বসে থাকতে থাকতে যখন খিল ধরলো পায়ে হাঁটা হাঁটি করছি। হঠাত দেখি কখন যেন সবাই এসে হাজির। প্রথমবার আলাপ হলো রাষ্ট্রপ্রধান, হানি, বালকের সাথে। সাথে আরো ছিল মুলধারার ফটোগ্রাফার (অল্পদিন সামহোয়ারে ব্লগার) রুদ্র নীল। যাই হোক ছবি মোটামুটি একই সবার, শুধু ২০ আর ২১। রাষ্ট্রপ্রধান ইতিমধ্যেই সব দিয়ে দিয়েছে। তাও চর্বিত চর্বন।


গুন্ডা গয়ালের পাসপোর্ট সাইজ ছবি (গয়ালঃ গাউর, বন গরু, পাহাড়ী গরু বা ইন্ডিয়ান বাইসন)


গয়াল ইন একশান।


পোজিং সেসনঃ সামনে ক্যামেরাম্যান আর পিছে বালকের ছবি তুলতেছে রাষ্ট্রপ্রধান।


এইগুলানরে কয় ফ্লেমিংগো।


মোরা আর জনমে, হংস মিথুন ছিলেম। এইগুলান পেলিক্যান।


দেখসোস, আমার কত্ত বড় ডানা আছে!

ফলোয়ার!


কিশোর, মুসা আর রবিন।




ইসমার্ট পাখি। কুল হেয়ার কাট!


রাষ্ট্রপ্রধান ইন একশান!


ছাগুদের আসতে মানা করা হয়েছিল, নিষিদ্ধ ছিল ভাদা, পেলাম গিয়ে নিঃস্বঙ্গ এক গাধা।


কেউ যদি আগ্রহ নিয়া পড়েন, তাইলে তেনার জন্যে একটা ধাঁধা। কন তো এইটা কোন প্রানী?




















কুকুর?




শিয়াল?

জ্বী না এইটা কলা বাদুর।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29316353 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29316353 2011-01-29 00:23:47
:::: রহস্য দ্বীপ ::::
ছেড়া দ্বীপ।


শীতের শুরু (নভেম্বর) পূর্নীমা রাতের হিসেব করে গেলাম সেন্ট মার্টিনে। প্রায় ৫ বছর পড়ে এলাম দারুচিনি’র দ্বীপে। ঈদের পর পর। লোকে লোকারন্য। যেন নিঝুম প্রবাল দ্বীপ নয়, ওয়ার্লকাপের ম্যাচ হচ্ছে। ভাগ্যিস আগে থেকে বুকিং দিয়ে রেখেছিলাম, নইলে গাছ তলায় রাত কাটাতে হতো। দ্বীপের অবস্থাও এই ৫ বছরে সর্বশান্ত। তবুও পূর্নীমা রাতে জোয়ারের গর্জন শুনতে শুনতে বীচের এ মাথা ও পাথা দৌড়া দৌড়ি করে বেড়ানর আলাদা মজা।

ছেড়া দ্বীপে দেখলাম স্থায়ী দোকান হয়েছে। প্রবাল বেচা কেনাও বেড়েছে কয়েকগুন। তার পরেও ভাটার সময়ে ক্যামেরা কাঁধে ঝুলিয়ে হেঁটে হেঁটে মুল দ্বীপে ফেরার আনন্দটা কমলো না একটুও।





Sun is shining, the weather is sweet
Make you want to move your dancing feet
To the rescue, here i am
Want you to know, y'all, where i stand



মেঠো চাঁদ বলেঃ 'আকাশের তলে ক্ষেতে-ক্ষেতে লাঙ্গলের ধার মুছে গেছে-ফসল-কাটার সময় আসিয়া গেছে, চ'লে গেছে কবে ! শস্য ফলিয়া গেছে-তুমি কেন তবে রয়েছো দাঁড়ায়ে একা-একা! ডাইনে আর বাঁইয়ে নড়-নাড়া-পোড়া জমি-মাঠের ফাটল, শিশিরের জল !...


রহস্যের দ্বীপ। (টেকনাফ)


দ্বীপ বালকেরা।


কলঙ্কে ভরা পূর্ণীমা’র চাঁদ।


নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাত দেখি কাল ডাবের মতো চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা গোল গাল। ছিটকিনি’টা আস্তে খুলে পেড়িয়ে গেলেম ঘর ঘুম ভাঙ্গা এই মস্ত শহর কাঁপছিলো থর থর।...... আল-মাহমুদ।


প্রবাল দ্বীপে...


স্মরনীয় সুর্যাস্ত।


বেলা শেষে বেলাভুমি।


লোন রেঞ্জার।



আগ্রহী'রা জলছাপ বিহীন এবং হাই রেজ্যুলেশানে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করতে পারেন। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29311208 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29311208 2011-01-20 23:30:55
সোমেশ্বরীর কোলে...

খুবই ছোট পোষ্ট লেখলাম। বড় লেখতে ইচ্ছে করেনা। আগ্রহীরা বিরিশিরি নিয়ে আগের পোষ্টটি পড়ে দেখবেন। ৫ বছর আগের লেখা, তখন ব্যাক্তিগত ব্লগে লিখেছিলাম। পরে সামহোয়ার ইন ব্লগে রেজিস্ট্রেষন করার পরে প্রথম ট্রাভেলগ ওটাই।



কিছু ব্যাক্তিগত কাজে অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিলাম। সরকারী অফিসে দৌড়া দৌড়ি করতে হবে। কিছুক্ষনের মাঝেই প্রচন্ড বিরক্তি ধরে গেল। লোকজন যেন পণ করেছে তারা কাজ করবেই না। ঘুষ দেয়া বাংলাদেশে একটা দস্তুর। পিয়ন থেকে বড়-কর্তা সবাই হা করে বসে আছে... কিন্তু খেয়ে দেয়ে বেমালুম ভুলে যাচ্ছে। এক কর্তার সাথে দেখা করতে হবে, ভদ্রলোকের দেখা নেই, লাঞ্চে গেছেন, লাঞ্চ শেষে গেছেন নামাযে, নামায শেষ করে হয়তো দিবানিদ্রাতেও গেছেন। পিয়ন ব্যাটা বললো সারাদিন লাঞ্চ করেনি, তাকে লাঞ্চ খাবার শ খানেক টাকা খাওয়ালেই সে ব্যাবস্থা করবে, খাওয়ালাম। খাওয়ালাম, টাকা নিয়ে সে সেই যে গেল আর হদিশ পাইনা, পরদিন গিয়ে শুনি সেই পিয়ন সপ্তাহখানেকের জন্যে ছুটিতে গেছে আজকে নতুন পিয়ন, অদ্ভুত ব্যাপার এও নাকি সারাদিন ব্যাস্ততায় খাওয়া দাওয়ার সুযোগ পায়নি।

বিরক্ত হয়ে ভাবলাম কাজ কর্মের গুল্লি মারি। পরদিন সেই সরকারী অফিসে যাবার কথা ভাবতেই মনটা বিষিয়ে উঠলো। হ্যাভারস্যাকে ক্যামেরা আর মানিব্যাগে হাজার খানেক টাকা ভরে চলে এলাম মহাখালি। বিরিশিরি যাব। বিরিশিরি শেষবার গিয়েছিলাম ৫ বছর আগে। কিভাবে যায় কই থাকে কিছুই জানতাম না। শুধু জানতাম বিরিশিরি নেত্রকোনায়। কিছু রাস্তা বাসে, কিছু রাস্তা বালু ভর্তি ট্রাকের পিছে, কিছু রাস্তা হেটে, কিছু রাস্তা নৌকায়, কিছু রাস্তা রিক্সায় এর পরে কিছু রাস্তা মোটর সাইকেলে। ঝুম বর্ষায় সোমেশ্বরী আশপাশের সবকিছু প্লাবিত করে রুদ্র মুর্তি নিয়েছিল। আর এবারে দেখলাম সোমেশ্বরীর ঢল হীন শান্ত নিরুদ্রুপ সৌন্দর্য।


বিরিশিরিতে নেমে দেখলাম এবারে ওয়াই ডাব্লু এম সিএ দারুন একটা গেষ্ট হাউজ করেছে। আগের বার ছিলাম ওয়াইএমসিএ’তে। সেটাও মন্দ নয়। কিন্তু এটা তুলনামুলক ভাবে অনেক ভালো। এবারে অবশ্য ঘুরোঘুরি তেমন কিছুই করিনি। সারাদিন পরে পরে ঘুমিয়ে রাতের দিকে হেঁটে হেঁটে হাজং পল্লীর গভীরে। খোলা মাঠে শীত কুয়াশার চাদরে শুয়ে শুয়ে আকাশের তারা খসা দেখা, কালপুরুষ, সপ্তর্ষী মন্ডল, মিল্কি ওয়ে আর নাম না জানা তারাদের বিশালত্ব দেখা ঘোর অমাবশ্যার রাতে।




গারো পাহাড়ের কোলে, সোমেশ্বরীর বুকে...


সোমেশ্বরীর ব্রীজে...


ব্যাঙ্গাচি


সাদা পাহাড় (চিনা মাটির পাহাড়)


দস্যিপনা...


রানীক্ষং



সাদা পাহাড়ে...





সোমেশ্বরী.....


ইন এন্ড আউট ফোকাস।


ওয়াই ডাব্লু এম সি এ








]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29291585 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29291585 2010-12-17 23:33:35
::: ক্যাম্পিং: উয়ারী-বটেশ্বর:::
দ্রষ্টব্যঃ প্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা গাঙ্গারিডাই বা গঙ্গাঋদ্ধি বা উয়ারী-বটেশ্বর নিয়ে গত বছর একটা বড় পোষ্ট দিয়েছিলাম। মোটামুটি ভাবে ব্লগের ঐ পোষ্টটাই ঈষৎ পরিবর্তন করে দৈনিক সমকালে ফিচার হিসাবে ছেপে দিয়েছিলাম। তাই কেউ ইচ্ছে করলেএই লিঙ্কে (গাঙ্গারিডাই বা গঙ্গাঋদ্ধির পথে) এবং
এই লিঙ্কে (গ্রামের নাম উয়ারী বটেশ্বর) ক্লিক করে দেখতে পারবেন। সেখানে অনেক বিস্তারিত ছিল।

প্ল্যান ছিল বান্দারবানের গহীনে একটা পুরোদস্তুর এক্সপিডাশান করা। কিন্তু দুঃখজনক কিছু পরিস্থিতিতে প্ল্যান ভেস্তে গেল। ১২দিন ঘরে বসে আন্ডা পাড়তে হবে। মন ভীষন খারাপ ছিল। ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে নিজেকে আলাদা করে রেখেছিলাম। কি মনে করে শেষ মুহুর্তে ঢুকে পড়লাম ভ্রমন বাংলাদেশের ক্যাম্পিং ইভেন্ট ওরফে বার-বি-কিউ দাওয়াতে। উয়ারী বটেশ্বরে।

টাইম দেয়া ছিল সন্ধ্যা ৬টায়। এক গরু টাইপ সিএনজি করে রওনা হলাম। ব্যাটা আহাম্মকের মতো পান্থপথে ঢুকিয়ে দিয়ে বসে রইলো ঝারা এক ঘন্টা। জিজ্ঞেস করতেই উলটো বলে সন্ধ্যার সময় নাকি পান্থপথই সবচেয়ে খালি থাকে। গ্রীনরোড থেকে সোনার গাঁ মোড় পর্যন্ত ৬বার লালবাত্তি ধরে কোনরকমে বের হলাম, মাঝ রাস্তায় হঠাত করেই বলে ভাইজান একটু বসেন, আমার দ্যাশের বাড়ির লোক একটু কথা কয়ে আসি, ইগনিশানে চাবি লাগিয়ে রেখে আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হাওয়া, ইঞ্জিন তখনো রানিং। অবশেষে যখন পৌছালাম সায়দাবাদে কিছুতেই কাঙ্খিত বাসস্টপ খুঁজে পাইনা। বাসে উঠতেই ৯টা বেজে গেল।

আধ ফালি চাঁদ আকাশে, আধ ফাঁকা হাইওয়ে, আর তার মাঝে আধা ভাঙ্গা বাসের ইঞ্জিন। গিয়ার ধরে না। বাস ড্রাইভার টিপে টিপে বাস চালাচ্ছে, অজ্ঞাত কোন কারনে দু মাইল পর পর পুলিশ চেকপোষ্ট। পুলিশের দল বাসে উঠে চেক করছে। মনা ভাইএর বিচিত্র উইন্ড চিটারটাতে মনে হয় শ-খানেক পকেট। সেটা ঘেটে ঘুটে তারা একটা সুইস নাইফ পেয়ে আঁতকে উঠলো। সাংঘাতিক মরনাস্ত্র পাওয়া গেছে। পুলিশের দলে একটা উৎসব পড়ে গেল। সাংঘাতিক অস্ত্রধারীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এই ছুরি নিয়া কই যাবেন? যতই বলি, এটা সুইস নাইফ-ক্যাম্পিং এ লাগে। ততোই বলে কেন নিয়া যাবেন। খুলে দেখানো হলো এতে ছুরি ছাড়াও, কাঁচি, কর্ক ওপেনার, রেতী, স্ক্রু ড্রাইভার সহ ১৬ রকমের আলাদা ফলা ওরা বিশ্বাস করেনা। ক্যাম্পিং এর ব্যাপারটাই বুঝে না। মনা ভাই ফুটবল ফেডারেশনের প্রথম সারীর রেফারী, শাহরীয়ার ভাই সাংবাদিক, শরীফ ব্যাংকে চাকরী করে, সুমন অনার্সের ছাত্র, আপনারা সবাই আলাদা আলাদা প্রফেশনের লোক এক হইলেন কেন কি উদ্দেশ্যে? পুলিশের ব্রেন বরাবরই ঘুরে ফিরে আগের জায়গায় চলে আসে, বোঝাতে গিয়ে কালঘাম ছুটে গেল।
যাই হোক অনেক ধস্তাধস্তি করে পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পেলাম, নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে বেলাবো’র মরজাল বাজারে বাস থেকে নামলাম। বটেশ্বরে আমাদের গন্তব্যে যেতে আগে থেকে ঠিক করে রাখা বাহন নছিমন (কোন কোন জায়গায় হেলিকপ্টার বলে) এসে থামলো তখন বাজে রাত ১২টা।
শীতের রাত, প্রায় জনশুন্য গ্রামের বাজার। চারপাশে ফিনফিনে কুয়াশার চাদর পেঁচিয়ে আসছে। এর মাঝে বিচ্ছিরি ভটভট শব্দে শ্যালো ইঞ্জিন লাগানো নছিমনে আমরা ১২জন চড়তে গিয়ে মহাবিপত্তি। ড্রাইভারের পাশে দুজন, ভেতরে ন জন (পার সীটে ৩জন, যদিও ড্রাইভার দাবী করলো এখানে পাঁচজন বসে-শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ জোক মনে হলো) আর বাইরে পাদানীতে একজন দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু শ্যালো ইঞ্জিনটা যথেষ্ঠ শক্তিশালী মনে হলো না যে সবাইকে নিয়ে সে চলবে। অজ্ঞতা তাকে ঠেলে কিছুদুর যেতে ধুঁকতে ধুঁকতে আট মাইল দুরের আড়াই হাজার বছরের পুরোনো উয়ারী-বটেশ্বরের দিকে রওনা হলো, কচ্ছপের গতিতে। কচ্ছপের গতি বলা হয়তো ঠিক না, কারন গল্পে কচ্ছপ একবারও না থেমে টানা পথ চলেছিল, নছিমন বিবি প্রতি ১০ মিনিট পর পর খক খক করে কাশতে কাশতে থেমে যায়, তাকে ঠেলে ঠেলে আবার জিন্দা করা লাগে। রেগে মেগে দুবার তার ইঞ্জিনের বেল্ট ছিড়ে গেল, আর দুবার পুড়ে গেল।
উয়ারী বটেশ্বরে দেড় বছর আগে যেবার এসেছিলাম তখন প্রথম আলো ব্লগের মডারেটর শুভ্র এখানে প্রত্নত্বাত্তিক খননে ব্যাস্ত ছিল। এবারে প্রত্নত্বাত্তিক কাউকে চোখে পড়লো না, জীবনানন্দ দাশের নিকোনো মাঠের মাঝখানে ভুই ফোঁড় একটা গেস্ট হাউজ চোখে পড়লো। কয়েকজন আগে থেকেই উপস্থিত হয়েছে এখানে আর কয়েকজন এসেছে সপরিবারে, তাই গেস্ট হাউজে বুকিং দেয়া ছিল। আমরা বাকীরা উঠোনো টেন্ট পিচ করলাম। চুলোয় গরম গরম মুরগীর বার বি কিউ বসে গেল।
ক্যাম্পিংটা ছিল মুলত গেট টুগেদারের মতো। অনেকেই প্রথমবার ভ্রমণ বাংলাদেশের সাথে, আবার অনেকেই দীর্ঘ বিরতীর পরে ভ্রমন বাংলাদেশের সাথে তাই গরম গরম মুরগীর বার বি কিউ আর পরোটা ভাজার সাথে আড্ডা চললো দীর্ঘক্ষন।
শীতেরর রাত। উয়ারী বটেশ্বর গ্রাম দুটোতে গাছপালার সংখ্যাও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশী। প্রচন্ড শিশির আর কুয়াশার ফলে রাত ৩টার বেশী আড্ডা দেয়া হলো না। তাঁবুতে ঢুকতে গিয়ে দেখি খকখকে কাশী। সকালে সুর্যদয়ের সময় ওঠার কথা। উঠতে পারলাম না। অনিকেত কথা কম বলে, সেই কাজ পুষিয়ে দেয় দক্ষ হাতে ক্যামেরা দিয়ে। পাশা ভাই, সুমন, অনেক দিন হলো কমিউনিটি ব্লগ ছেড়ে দেয়া প্রিয় ব্লগার নিরব আরো কজন দল বেধে সুর্যদয়ের সময় বেড়িয়ে পড়লো ছবি তুলতে। আমি উঠলাম ৭টার পড়ে। সকালের নরম সূর্যের আলো পরে দুব্বা ঘাসে ভেজা শিশিরে কিছুক্ষন হাটাহাটি করলাম প্রথম সূর্য কিরনে মিষ্টি আলোয়।
আর বেশী কিছু লিখতে ধৈর্যে কুলাচ্ছে না আমার নিজেরই। কেউ যদি এই পোষ্ট পড়ে তাদের কি পরিমান ধৈর্যচ্যুতি ঘটাবে ভাবতেই ভয় লাগতেছে। তাই আর কিছু লিখলাম না। ছবি গুলান দেখেন। লেখাটা না পড়লেও চলবে।

টা টা। --------------
ছবিঃ

কিশোরী।



ঢাকা-সিলেট মহা সড়কের মধ্যখানে নৃত্য শুরু করার প্রস্তুতী নিচ্ছেন একজন স্টাইলিশ পাগল।


কমন কিংফিশার (আমি পাখি চিনিনা। মাছরাঙ্গা সচরাচর চিনি নীল রঙের। এইটা কমলা আর সবুজ, এইটাকে কমন কিংফিশার হিসাবে চিহ্নিত করে দিছেন বিশিষ্ট প্রকৃতিবীদ এবং ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার রোনাল্ড হালদার)।


শীতের সকাল এবং হাট বার।


ব্লগার কামাল ভাই এর (সাদা মনের মানুষ) বাড়িতে।


বাই সাইকেল কন্যা।


এটার নাম চোখ গেলো গো।


ফিঙ্গে




শীত এসে গেছে।


দস্যি ছেলে।


শীতের সকালে গ্রামের বাজারে চিতই পিঠার ওম।


ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ে নিশির শিশির।


আধ ফালি চাঁদ, আধ ফাঁকা হাইওয়ের সাথে তাল মিলিয়ে বাসের আধভাঙ্গা ইঞ্জিন।

বার বি কিউ



পুনশ্চঃ হাই রেজ্যুলেশানে ছবি দেখতে চাইলে ফ্লিকারের এই লিঙ্কটায় ক্লিক মারতে পারেন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29280435 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29280435 2010-11-29 23:48:02
:::ঝুম বৃষ্টিতে নিঝুম দ্বীপে (শেষ খন্ড):::

আগের খন্ড দেখতে ক্লিক মারেন।

নিঝুম দ্বীপে আমাদের ২য় রাতে ভয়ঙ্কর ঝর হলো, তাঁবু উড়ে যায় আরকি, ভেজার ভয় ভুলে তাবুর সব দরজা জানালা খুলে দিলাম, যাতে প্রচন্ড বাতাসে ঘুড়ির মতো উড়ে না যায়, ঝরো বাতাস দরজা দিয়ে ঢুকে জানালা এবং ছাঁদ দিয়ে বের হয়ে যায়।
প্রচন্ড ঝরের পরে ৭টার মধ্যেই সব ম্যাজিকের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। কোন রকমে তাবু-টাবু সাইজ করে সব সাইক্লোন সেন্টারে রেখে আমরা বেরুলাম জঙ্গল ঘুরতে। দলটা দু ভাগে ভাগ হয়ে গেল শুরুতেই। আমাদের দলে দশ-বারোজন।
দ্বীপের আদ্ধেকটা ঘুরে একটা জলার কাছে এসে দেখি দলের সঙ্খ্যা কমে গেছে। জঙ্গলে ঢোকার আগেই একদল হরীনকে দেখলাম লেজ উচিয়ে দৌড় মারতে। প্যাচ প্যাচে কাদায় প্রায় আধাঘন্টা হাটার পরে বিরক্ত হয়ে লোক কমতে থাকে। প্রতিবারই হরীনের পাল দেখা দিয়েই দৌড়ায়। বন্য-প্রানী দেখতে হলে নিরবে পথ চলতে হবে, বাতাসের উলটো দিকে হাঁটতে হবে, বড় দলে এত নিয়ম মানা সম্ভব না। শেষে দেখি শুধু আমি আর কামরুল। একটু পর পরেই হরীনের দল। নিঃশব্দে কাছে যেতেই কিভাবে যেন টের পেয়ে বার বার ছুট লাগায়া। আমরা দুজন বেশ প্রায় কোয়ার্টার মেইল দুরত্ব রেখে দুটো গাছে উঠে বসে রইলাম। খালের কাছে। হরীনের দল এবারে ওগুলোর ধারে কাছেও আসেনা। বসে বসে কাঠ পিপড়ার কামড় খাওয়াই সারা।
পিপড়ের কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে গাছ থেকে নেমে হাটু কাদা ভেঙ্গে উদ্দ্যেশহীন ভাবে ঘুরছি। তিলা ঘুঘু, কুড়া, তিলা বাজ।
কামরুল এক্সপার্ট ফটোগ্রাফার। তার দেখা দেখি আমিও ভাব নিলাম, হরীনের ছবি তুলতে আসছি, না পেলে আর কিছু তুলবো না, মনে মনে আহা উহু করছি। খিদেয় পেট চো চো করছে তখন বেরুলাম জঙ্গল থেকে। একটা বড় রাস্তা পেয়ে সেটা ধরে সোজা হাটতেই একটা দোকান পাওয়া গেল। কিন্তু সমস্যা হলো দুজনের পকেট থেকে বেরুলো মাত্র ১২টাকা। এটা দিয়ে দুজনের লাঞ্চ করা সম্ভব না। তাই দু কাপ চা, আর কয়েকটা বিস্কিট মুখে দিয়ে পেটে কিল মেরে বসে থাকতে হলো। দলের বাকীরা ক্যাম্পে ফিরে ভুরীভোজন করছে ভাবতেই খিদেটা যেন লাফিয়ে বাড়লো।
আধাঘন্টা রেস্ট নিতে নিতে বিকেল হয়ে যায়। এক কাপ চা আর দুটো বিস্কুট খেয়ে সারাদিনের জন্যে টেবিল আটকে রাখা যায়না। তাই আবার ঢুকলাম জঙ্গলে। ঢুকতে না ঢুকতেই খালের পাশ থেকে একটা হরীণের পাল দৌড় লাগালো কষে। প্রথমে ভাবলাম আমরাই একমাত্র ভয়ের কারন। কিন্তু দেখলাম বনের শিকারী কুকুর গুলো বের হয়েছে।
নিঝুম দ্বীপে যখন মানুষ বসতী করলো, সাথে করে আনলো মানুষের আদিবন্ধু কুকুর। কিন্তু গ্রামের মানুষেরা তখন নিষ্ঠুর প্রকৃতির সাথে লড়াই করে জেতার চেষ্টা করছে। পুরো দ্বীপ ভর্তি জঙ্গল। জঙ্গলে অজগর এবং বনমোষের দল, দুটোই বন বিভাগের ছাড়া। এছাড়া দ্বীপে পানির উৎস নেই। কুপ খুড়লেও ওঠে নোনা পানি। আর প্রমত্ত মেঘনার একদম মোহনায় হওয়ায় রুদ্রবঙ্গোপসাগরের উত্তাল আক্রমন লেগেই আছে। খাবারের অভাব দেখে কুকুরের দল বনে ঢুকে মহাখুশি।
গ্রামের কৃষক নিজেই খেতে পারেনা, আর কুকুরকে কি খাওয়াবে। আর বনের ভেতরে ছড়িয়ে আছে বড় বড় লোভনীয় নধর চিত্রা হরীনের পাল। একটু বুদ্ধি খাটিয়ে শিকার করলেই হলো। কুকুরের মাঝে সহজাত শিকার প্রবনতা আছে, হাজার বছরের প্রভুভক্তিতে সেটাতে মরচে পড়লেও ডিএনএ’তে সুপ্ত দল বেধে শিকার করার সহজাত কৌশলটা রপ্ত করতে এক প্রজন্মের বেশী লাগলো না। এখন এই কুকুরগুলোই নিঝুম দ্বীপের একমাত্র হিংস্র প্রানী। মানুষকে আক্রমনের কোন ঘটনা হয়নি, সম্ভবত দ্বীপটা অনেক ছোট বলেই মানুষের উপস্থিতি এড়ানোর সুযোগ নেই, আর কুকুরগুলোও পুরোপুরি বন্য হয়নি। কিন্তু জঙ্গলী কুকুরের মতো দল বেধে শিকার করাটাও চলছে। শুনেছি ক্যাপ্টেন কুকের সদ্য আবিষ্কৃত অস্ট্রেলিয়া মহাদেশী ব্রিটিশরা যখন কলোনী করতে আসে সেখানে কোন হিংস্র স্থলচর ছিলনা। কিন্তু সেটলারদের সঙ্গি পোষা কুকুরগুলো বনে পালিয়ে বিবর্তিত হয়ে ভয়ঙ্কর হিংস্র ডিংগো’তে পরিনত হয়েছে।

বিকেল বেলা আবার ঢুকলাম অরন্যের গভীরে। ঢোকার মধ্যেই দেখি আরেকদল টুরিস্ট গ্রুপ এসেছে। সাথে এলাকার গাইড নিয়ে। গাইড’রা গাছ কেটে পাতা ছড়িয়ে রাখবে আর পাতার লোভে হরীন আসবে। কিন্তু এদের উপরে ভরসা করতে পারি না। দলের সবাই হৈ চৈ করে গল্প গুজব করছে, শব্দ করে জঙ্গল ভেঙ্গে হাঁটা-চলা করছে, ভুস ভুস করে সিগারেট টানছে, গন্ধে হরীনতো হরীন বোকা পাঁঠাও দৌড় লাগাবে।

ওরা অবশ্য বেশী ভেতরে গেল না। আমরা সাবধানে খাল গুলো পেরিয়ে গভীরে ঢুকে গেলাম। জঙ্গলে ইতিমধ্যে কুকুরের দল বেড়িয়ে এসেছে। খালের ওপার দিয়েই ৩টে কুকুর সারী বেধে দুলকি চালে চলছিলো, খুব সাধারন দেশী কুকুর, ভালো খাওয়ার জন্যে হয়তো স্বাস্থ্যটা ভালো, ছোট বেলায় আমার পোষা কুকুর ‘বাঘেরা’র সাথে চেহারায় কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু চোখের দৃষ্টিটাই কেমন যেন ক্রুর। একটু পর পর জঙ্গলের ভেতর থেকে পৈশাচিক কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। সাধারনত মানুষ দেখলে কুকুর হয় ঘেউ ঘেউ করে, অথবা আদুরে কুঁ কুঁ জাতীয় আহ্লাদি দেখায়। এর বাইরে এই ভয়ঙ্কর শিকারী গর্জন সত্যি কেমন করে। কি মনে করে হাতে মোটা দেখে একটা লাঠি নিলাম। আমার কান্ড দেখে কামরুল হাসে, শেষমেষ কুকুরের ভয়ে হাতে লাঠি!

চুপচাপ জঙ্গল ভেঙ্গে গভীরের দিকে যাচ্ছি। গ্রাম এখান থেকে এখনো বেশ কাছে... তাই কামরুল যখন হাত চেপে খালের ওপারে ইঙ্গিত করলো প্রথমটায় বুঝতে পারলাম না। পাতার ফাঁক দিয়ে হরীনের দল। চোখে অপার বিস্ময়। হা করে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। ১০/১২টার ছোট পাল। সবাই যেন স্থবির হয়ে তাকিয়ে রয়েছে, ঠিক এদিকেই। ভালো ছবি পাওয়ার জন্যে দুরত্ব এখনো অনেক। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যেও প্রায় খোলা অংশে দাঁড়ানো হরীনের পাল দেখে মনে হচ্ছে যেন পাসপোর্ট সাইজ ছবি তোলার জন্যে পোজ দিচ্ছে।

আরেকটু গভীরে যাওয়ার সময় খালের ওপারে কুকুরের প্রচন্ড হুঙ্কার, আর পরিচিত একটা মানুষের দেহাবয়ব দেখা গেল। ভালো করে তাকিয়ে দেখি সেটা আমাদের মনা ভাই। ৩/৪টে কুকুর বিপদজনক দুরত্বে দাঁড়িয়ে হুঙ্কার দিচ্ছে তাকে উদ্দ্যেশ্য করে। যদিও দেশী পোষাকুকুর, কিন্তু জঙ্গলে যেন তারাই বাঘ। কুকুর তাড়ানোর জন্যে যেই মোটা লাঠিটা নিয়েছিলাম, সেটা বাড়িয়ে দিতেই গভীর খালটা হাইজাম্পের রেকর্ড ভেঙ্গে এক লাফে মনা ভাই এদিকে। কিন্তু অবাক কান্ড, সে বেড়িয়েছিল ১০/১২ জনের দল নিয়ে এখন মোটে ১জন, আর কুকুরগুলো নধর নধর হরীন ফেলে তাকেই বা তাড়া দিল কেন? জানলাম, দুপুরের দিকে সবাই লাঞ্চের জন্যে ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে কেউ আর বেড়ুতে চায়নি। একা একা জঙ্গলে নিঃশব্দে ঘুরলে ভালো ছবি পাওয়া যাবে ভেবে মনা ভাই একাই ঢুকে পড়ে জঙ্গলে। ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় দেখে সদ্য শিকার করা এক প্রকান্ড শিঙ্গি হরীনের দেহখন্ড একপাল কুকুর ছিড়ে খুড়ে খাচ্ছে, কি মনে করে পৈশাচিক সেই দৃশ্যের ছবি তুলতে গেলে কুকুরের পাল তাদের ফিস্টে অনাহুত অতিথীকে ধাওয়া লাগায়... কি করতো বা করতে পারতো জানিনা, কিন্তু কুকুরগুলোর বডি ল্যাঙ্গুয়েজই কেমন জানি বন্য।

আমরা এবার ৩জনে বেরুলাম। আগের প্ল্যান মতো জঙ্গলের বেশ গভীরে, একটা ছোট মাচা, গাছ লতা পাতার ন্যাচারাল ক্যামোফ্লেজে প্রায় অদৃশ্য। পাশেই দুট খালের সঙ্গম, প্রচুর হরীনের খুড়ের দাগ, আর লাদা পড়ে আছে। জোয়ারের সময় মিষ্টি পানির লোভে হরীনের দল এখানে আসতে বাধ্য। ব্যাপারটাকে আরো জোড়ালো করতে পকেটের সুইস নাইফ দিয়েই কেওড়ার রসালো পাতা আর ডাল কাটতে লেগে গেলাম। হরীনের জন্যে সুবিধাজনক জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়ে ৩ জনে সেই মাচার ভেতরে ঘাপটি মেরে রইলাম।

বাতাসের উলটো দিকে, শুধু মনা ভাইয়ের দৈত্যাকার নিকর ৩০০মিমি লেন্স ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। বসে বসে ম্যাদা মেরে গেলাম, কিন্তু হরীনের দেখা নেই। আলোও কমে আসছে দ্রুত। চুপচাপ কোন কথা না বলে, নড়াচড়া না করে বসে থাকা যে কি বিচ্ছিরি ব্যাপার, জিম করবেট বা পচাব্দিগাজীর গল্প পড়তেই ভালো লাগে, কিন্তু জঙ্গলে লতাপাতায় লুকিয়ে অপেক্ষা করা যে কত নিরস হতে পারে... বসে বসে মাছি মারতেও পারি না, পাছে হরীনের দল শুনে ফেলে। একটা দুটো হরীন যে আসে নাই, তা না, দেখা যায় ঠিকই। কিন্তু সন্ধ্যার ম্লান আলোতে ওরা এত বেশী দুরত্ব বজায় রাখলো যে ঝাপসা ছবি তোলাও অসম্ভব। মনা ভাই অবশ্য তার শক্তিশালী লেন্সের পুরো সুবিধাই নিলো। উচু উচু গাছের মগডালে পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা পাখিগুলোও বাদ রইলো না, ধমাধম শ্যুট। না গুলি না, বন্দুকের মত লেন্স লাগিয়ে ফ্রেম বন্দি করে আর প্রিভিউ গুলো আমাদের দেখিয়ে হিংসায় জ্বালিয়ে মারে। দুর্দান্ত রাজকীয় ভঙ্গিমায় কুড়া, ধবধবে বুনো সৌন্দর্যের স্পটেড বাজ পাখি, পানির কাছে ডালে ঝিমাতে থাকা সাবলিল পানকৌড়ি। আমি অনেক চেষ্টা তদবির করে নিভু নিভু আলোতে কয়েকটা তিলা ঘুঘু (যতোটা জানি বাংলাদেশ ৪ কি ৫প্রজাতির ঘুঘু পাওয়া যায়। মাংস সুস্বাদু হওয়ায় এবং আচরনে প্রজাতির অন্য তালাতো মামাতো ভাইবোনদের চেয়ে বোকা হওয়ায় অসম্ভব সুন্দর তিলা ঘুঘু শিকার করা সহজ আর এরাও নির্বংশ হতে চলেছে।)
রাতের আধার ঘনিয়ে আসতেই কুকুর গুলো যেন পাল্লা দিয়ে হিংস্র হতে থাকলো। নিস্তরঙ্গ ঝি ঝি ডাকে একটু পর পরেই ছেদ পড়ে তাদের গগন বিদারী হুঙ্কার আর শিকার পাওয়ার পৈশাচিক উল্লাসে। মাঝে মাঝে কানে আসে দুর্ভাগা হরীনের আর্তনাদ।
দলের কাউকে না বললেও মনে মনে প্রস্তুতী নিয়েছিলাম জঙ্গলে ঢুকলে সহজে বের হবো না। যথেষ্ট পানি, সুইস নাইফ, আর টর্চ ছিল। তাই জঙ্গল থেকে বের হতে সমস্যা হলো না। আগামী কাল সকালে ঢাকার উদ্দ্যেশে রওনা হবো খুব ভোড়ে, ভাটা শুরুর আগেই। ক্যাম্পে একবারও ফিরি নাই। শুধু আমরা দুজনই লাঞ্চ করতেও যাইনি। টুটু ভাই মনে হয় ছিলা ফেলবে। কিন্তু সারাদিন বনে সত্যিকারের ট্রেকারদের মতো করে কাটানোর সুন্দর অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা আকাশ ভরা তারার আলোয় পথ চলতে লাগলাম। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই দূরে আমাদের তাঁবু গুলোর আলো দেখা যেতে লাগলো।

(শেষ!)-----------------------------------------------
















দি লোনলী ছাগু। : P
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29268476 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29268476 2010-11-08 00:47:10
:::: ঝুম বৃষ্টিতে নিঝুম দ্বীপে... :::::

ঈদের পরদিন যাত্রা। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল খাঁ খাঁ করবে ভেবেছিলাম। গিয়ে দেখি এ কি? তিল ঠাই আর নাহি রে। লোকের ভীড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। ধাক্কাধাক্কি করে ঘাড়ে বিশাল ব্যাকপ্যাক, তাঁবু, স্লিপিং ব্যাগ আর দু'হাতে দুটো লাইফ জ্যাকেট নিয়ে কিভাবে জানি লঞ্চে উঠে গেলাম। টোটাল ৩২ জন। ভ্রমন বাংলাদেশের নিয়মিত এবং আমার মতো অনিয়মিত সদস্য। লঞ্চে তো উঠলাম, কিন্তু লঞ্চ ছাড়ে না। লোক উঠতে উঠতে যখন প্রায় ডুবু ডুবু তখন ইঞ্জিনে স্টার্ট দিল। এবারে দেখি বেরুতে পারে না। আমাদের লঞ্চের পিছে আরেকটা লঞ্চ, তার পিছে একটা জেটি থেকে বেরুবে ওটার পিছে আরেকটা জেটিতে ঢুকবে, তার দুপাশে আরো দুটো ঢুকবে না বেরুবে মনে হয় ডিসিশান নিতে পারছেনা। আমাদের সারেং বেশী বুদ্ধিমান প্রমান করে ইঞ্জিনের জোর ধাক্কা দিয়ে সবগুলোকে হটিয়ে দিতে চেষ্টা নিল, কিন্তু কিছুই হলো না, আমাদের প্রায় ডুবু ডুবু লঞ্চটা প্রায় ৪৫ডিগ্রি কাত হয়ে উলটো দিকে ডুবে যাবার ভঙ্গি করলো।
লঞ্চ ডুবতাছে, বাঁচাও, বাঁচাও হাবিজাবি চিৎকার দিতে দিতে একদল লোক লাফিয়ে পাশের লঞ্চে আর সামনের জেটিতে পালিয়ে গেল, আরেকদল যে দিকটা প্রায় ডুবু ডুবু সেদিকে ওজন বাড়াতে উৎসাহে ঝুঁকে পড়লো, লঞ্চের কয়েকজন লোক ভীষন মোটা মোটা লাঠি নিয়ে তেড়ে আসলো, ঐ কোন ব্যাটায় চিল্লায়, কেউ জায়গা থিকা নড়লে মাইরা হাঁটুর গেটি খুইল্লালামু। মহা শোরগোলের সাথে লঞ্চটা অবশেষে খোলা বুড়িগঙ্গায় সাঁতার দিতে পারলো, বিস্ময়করভাবে ডুবলো না।

নিঝুম দ্বীপ


মনপুরা (সিনেমার নাম হলেও শুটিং কিন্তু এই দ্বীপে হয়নি)


ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে।

পথে আড্ডাবাজি করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, বাসা থেকে ফোনে জানলাম সাগরের অবস্থা খারাপ, কই জানি একটা নিম্ন বা উচ্চচাপ তৈরি হইছে, সেটা যখন তখন ঘূর্ণীঝড়ে পরিবর্তিত হতে পারে। ৩নাম্বার সঙ্কেত দিছে। বরিশালের পর থেকেই টুপটাপ বৃষ্টি, মাঝে মাঝে দূর আকাশে কালোমেঘের ফাঁকে আকাশে বজ্রপাতের আভা। মনপুরায় গিয়ে দেখি তুমুল বৃষ্টি। অনেকক্ষন এখানে লঞ্চ আটকে থাকে। খারাপ আবহাওয়ায় নাকি মাছ বেশী ধরা পড়ে, তাই জেলেদের বিকার নেই, লাল-নীল, সবুজ-হলুদ, বহুবর্ণা নৌকার পাল মেঘনার বুকে। লঞ্চের শেষ স্টপেজের নাম তমিরুদ্দিন (আরেকটা বড় ঘাট আছে তমিজুদ্দিন, এটা সেটা না)। এখানে নেমে আমরা ঝুম বৃষ্টিতেই নেমে গেলাম ব্রেকফাস্টে। ঘাট থেকে বাজার বেশ খানিকটা দূরে। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে গ্রামের বাজারে একটু বেড়িয়েও নেয়া হলো। নাস্তা শেষ হতেই আগে থেকে ঠিক করা ট্রলারটা এসে হাজির। পাটাতনে ইলিশ রাখার স্টোরেজে ব্যাকপ্যাকগুলো তুলে দেয়া হলো। আর সবাই উপরে বসে পড়লাম। কয়েকটা লম্বা পলিথিনের ভেতরে সবাই গুটিশুটি মেরে রইলো বৃষ্টির জন্যে।
বিশাল মেঘনা দু'পাড়ে কুলহারা জল। আর বৃষ্টির তো থামাথামি নেই। ভাটার পক্ষে ভেসে ভেসে আমরা নিঝুম দ্বীপে নামলাম দুপুরের দিকে। ভাটার জন্যে নৌকা ঘাটে যাচ্ছিলোনা। আমরা সবাই নৌকা থেকে নেমে গেলে খালি নৌকা মাল নিয়ে ঘাটে ভিড়তে পারলো। নামতে না নামতেই আছাড় খেয়ে উলটে পড়লাম, আর তা দেখে মনা ভাই হাসতে শুরু করলো গলা ফাটিয়ে, হাসি অবশ্য শেষ হলো না তার আগে সে নিজেও চিৎপটাং। এরপরেই শুরু হলো ভয়ঙ্কর যাত্রা।

ক্যাম্পিংএর প্রস্তুতি।



অতিথী।

পুরো রাস্তাতেই হাঁটু কাদা। সেই কাদা ভেঙ্গে ঘাড়ে বিশাল সব বস্তা নিয়ে হাটছিতো হাটছি। দূরত্ব মোটে মাইল তিনেক, কিন্তু থিকথিকে কাদায় আছাড় খেয়ে ভূত বনে যাওয়ায় সময় লাগলো কয়েকগুন। ধু ধু প্রান্তরভরা চষাক্ষেতের মাঝে একটা সাইক্লোন সেন্টার আমাদের ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড। টেন্ট পিচ না করেই সব জিনিসপত্র রেখে লাফ দিলাম পুকুরের মাঝে, ঝুপ ঝাপ সাঁতার কেটে তবেই স্বস্তি।
আমরা পানি থেকে উঠতে উঠতে দেখি অনেকেই তাঁবু খাটিয়ে ফেলেছে। চিপা চুপা বাইর করে কোনমতে তাঁবু খাটিয়ে নিলাম, গোছগাছ করতে করতেই দুপুরের খাবার ডাক এলো। ভাজা ইলিশ আর ভুনা খিচুরী। খেয়ে দেয়ে সবাই যার যার মতো ব্যাস্ত। আমি নেমে গেলাম সামনের চষা ক্ষেত ধরে। দূরে দিগন্তের কাছে নিঃসঙ্গ একটা কুড়ে ঘর, চারপাশে কচি ধানের কার্পেট অসীমে মিশে গেছে, তারো অনেক দূরে আবছা ভাবে মেঘনা চ্যানেল... আর কিছু দেখা যায়না। কিন্তু কাদার কারনে খুব বেশী দূর যেতে পারলাম না। তার আগেই আলো মলিন হতে থাকলো, অন্ধকারে এই কাদা পথে ফিরতে সমস্যা।
রাতে প্রচন্ড ঝড় শুরু হলো। মনে হচ্ছে তাঁবু উড়িয়েই নেবে। ফাঁপা তাবু ঝোড়ো হাওয়ায় নাটাই-ছেড়া ঘুড়ির মতো উড়াল দিতে চায়। ভেতরে আমরা আছি এত ওজনের জিনিসপত্র আছে সে ব্যাপারে যেন কুছ পরোয়া নাই। বাধ্য হয়ে তাঁবুর সদর দরজা আর ছাঁদ হা করে খুলে দিলাম। সামনে দিয়ে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া আমাদের ভিজিয়ে দিয়ে ছাঁদ দিয়ে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষন পরেই দেখলাম অনেকে তাঁবু গুটিয়ে সাইক্লোন সেন্টারের ভেতরে চলে যাচ্ছে। কয়েকজন নাছোড়বান্দার মতো পড়ে রইলাম। প্রচন্ড আকাশের গর্জন আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে পাশের তাঁবুতে কার যেন নাক ডাকার সিংহ নিনাদ। সে এক ভীষন কালরাত্রি।
সকাল বেলা দেখলাম রাতের বেলার হালকা ঝড়ের ভয়ঙ্কর ঝাপটা। কিন্তু বৃষ্টিতো আর ধরেনা। ভয়ঙ্কর বৃষ্টির কারনে সেদিনের সব প্ল্যান ভেস্তে গেল। দুপুর নাগাদ বৃষ্টি ধরে এল, রোদ উঠে গেল, কিন্তু আমাদের দিনটা নষ্ট হলো।


আমাদের ছোট নদী... (এটা একটা খাল, এর পাশেই আমাদের ক্যাম্প)


(ছোটবেলায় একটা পাউডার মিল্কের এ্যাডে এমন ছবি দেখছিলাম, সম্ভবত নিউজিল্যান্ডের।)

দুপুরের খাওয়া দাওয়াটা হলো অনেক কঠিন।
সকাল বেলা আলো ফোটার পরে বৃষ্টি আর থামে না। একটানা চললো দুপুর পর্যন্ত। কিন্তু আমাদের সব পরিকল্পনা মাঠে মারা গেল। প্ল্যান ছিল নৌকা নিয়ে দ্বীপের আশেপাশে ঘুরবো। টিপটিপ বৃষ্টিতেই পুকুর ঘাটে নেমে গেলাম। নামতেই শুরু হলো আবার ঝুম বৃষ্টি। তুমুল বৃষ্টির ঝুপঝাপ শব্দের মাঝে পানিতে কান ডুবিয়ে সাঁতার দেবার অন্যধরনের মজা আছে। একটু পরে দেখি দলের সবাই পানিতে। সাঁতার প্রতিযোগীতা হলো, যারা সাঁতার জানেনা তাদের কয়েকজনকে সাঁতার শেখাতে ব্যাস্ত হলেন মনা ভাই (নিজেই সাঁতার জানেননা, লাইফ জ্যাকেট পড়ে নেমেছেন)।
দুপুরে খিচুড়ী আর চিংড়ি ভাজা দিয়ে গলা পর্যন্ত ঠেসে খেয়ে হেলে দুলে বিকেলে সবাই বেরুলাম জঙ্গলের দিকে। বর্ষায় রাস্তাঘাটের কোন বালাই নেই। দ্বীপের অবকাঠামোর অবস্থাও তথৈবচ। আগেই বলেছি কোন পাকা রাস্তা নেই। ব্রীজগুলোও শুধু নিচে একটা বাঁশ আর উপরে একটা বাঁশ। গরমের দিনে কি অবস্থা হয় জানি না, মেঘলা আকাশে সূর্যের আলোর লুকোচুরি আর ওপাশের বেলাভূমি থেকে আসা উত্তাল হাওয়া। অসাধারণ।
বিকেল বেলায় আমরা বেরুলাম। কর্দমাক্ত রাস্তা। ব্রীজ-ট্রিজের কোন বালাই নেই। গ্রামের মধ্য দিয়ে রাস্তা, একটু পর পরই খাল পড়ছে, আর তার উপরে পায়ের জন্যে একটা বাঁশ আর হাতে ধরার জন্যে একটা বাঁশ এমন সব ব্রীজ। আশেপাশে দিগন্ত জোড়া খোলা মাঠ। দূরে বেলাভূমি থেকে উত্তাল হাওয়া বারবার সবকিছু এলোমেলো করে দেয়।
পথের শেষ মাথা থেকে জঙ্গল শুরু হয়েছে। ছবি তুলতে তুলতে পিছিয়ে পড়েছিলাম। প্রথমদলকে বাইপাস করে আমরা আরেকদিক দিয়ে জঙ্গলে ঢুকলাম। হাঁটু পর্যন্ত কাদা। খুব কায়দা করে পা ফেলতে হয়। তার উপরে ম্যানগ্রোভের বিরক্তিকর শ্বাসমূল। খালের পাশে প্রায়ই দেখা যায় উভচর চিড়িং মাছ (ইংরেজীতে এটাকে বলে মাডস্কিপার, অল্প কাদাপানিতে থাকে, কিন্তু বাতাস থেকে নিঃশ্বাস নেয়, বিবর্তনের ধারায় একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সত্তা )। খালের প্রতিটা সংযোগ বিন্দুতে জাল বসিয়ে জেলেরা ইঁচামাছ (চিংড়ি ধরে)। রাতে থাকার জন্যে তাঁবু আকৃতির ছোট ছোট ছাউনি মাচার উপরে। ভেতরে খাবার পানি, শুকনো খাবার, কুপি বাতি। স্বপ্নের ট্রি হাউজের মতো।



মেঘনা পাড়ের বাড়ী। আমাদের ক্যাম্প থেকে দেখা সবচে' পরিচিত দৃশ্য।

জঙ্গলের ভেতরে ঘন্টাখানেক ঘোরা হলো। সূর্যের আলো নিভতে শুরু করায় ফিরতে শুরু করলাম। তাছাড়া বদমাশ কুকুরগুলোও বের হয়ে গেছে। কেমন করে যেন তাকায়। আমার দূর্ভাগ্য, দলের মোটামুটি সবাই হরিণ দেখলেও আমার ভাগ্যে জুটলো লবডঙ্কা। কয়েকবার দূরে সোনালি ঝিলিক মেরে হরিণের দল লাফিয়ে পালিয়ে যেতে দেখলাম। ফেরার পথে অনেকক্ষন সবাই বেলাভূমিতে ঘোরাঘুরি করলাম। বাংলাদেশের সেরা বীচ নিঃসন্দেহে সেন্টমার্টিন, এরপরে দুবলার চর, কুয়াকাটা, এর পরেই নিঝুম দ্বীপ।
রাতে আড্ডাবাজি করতে করতে দেরী হয়ে গেল। সবাই মিলে সকাল বেলা জঙ্গল ট্রেক হবে। আর গোপনে কজন মিলে ঠিক হলো সূর্যের আলো ফোটার আগেই জঙ্গলে ঢুকবো। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। রাতে আবারো তুমুল ঝড় শুরু হলো। আজকের ঝড় আরো মারাত্মক। কিছুক্ষন পরে প্রথমে মাসুদ ভাই তার তাঁবু গুটিয়ে উঠে গেল সাইক্লোন সেন্টারে, তার পরে পিছু পিছু কামরুলও গেল। আমার তাঁবু পার্টনার রানা আমাকে ঘুম থেকে ধাক্কা দিয়ে উঠিয়ে বলে, সবাই ভাগতেছে, চলেন ভাগি। আমি আলসেমীর চোটে উঠতে চাইলাম না। কি আর হবে। সুবহে সাদিকের দিকে আর শুয়ে থাকার জো রইলো না, উঠে দেখি সব কিছু লন্ডভন্ড। প্রচন্ড ঝড়, শক্তিশালী ধাক্কা দিয়ে গেছে। ভোরের দিকে যখন টেন্টের ফ্রেম বাতাসের চাপ সহ্য করতে না পেরে মটমট করছে, তখন বাধ্য হয়েই তাঁবু গুটিয়ে ফেললাম, তেমন সুযোগ পেলাম না, ব্যাকপ্যাক আর যাবতীয় জিনিসপত্র নিয়ে লন্ডভন্ড তাবুর সাথে নিজেরাও ভিজতে লাগলাম।

(আগামী পর্বে সমাপ্য)...




'মেঘনার ঢল' নামে একটা কবিতা স্কুলে পাঠ্য ছিল, প্রথম লাইনটা মনে হয় এমন - শোন মা আমিনা, তরা করে মেঘনার জল নিয়ে আয়।


অবশেষে হরিণের দেখা মিললো। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29264185 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29264185 2010-10-30 23:38:50
:::: নিঝুম দ্বীপ দর্পন ::::
প্রতিবছর সিজন শুরুর আগেই জেলেরা মাছ এডভান্সড বিক্রি করে দেয় মহাজনদের কাছে, অর্থাৎ দাদন নেয়। এর পরে কোনভাবেই একটা মাছও মহাজন ছাড়া অন্য কাউকে বিক্রি করতে পারেনা। বরফ মুড়ে সব ইলিশ চলে যায় সদরঘাট, সওয়ারীঘাট, কাওরান বাজার।



আগেরদিনে বাংলা সাহিত্যে চরিত্রপ্রধান বইগুলোর নামে “দর্পন” শব্দটার ব্যাবহার খুব বেশী হতো। জমিদার দর্পন, নীল দর্পন। অর্থাৎ দর্পন দিয়ে আমরা আমাদের জগতটাকে দেখি। ব্লগে সাহিত্য করতে আসি নাই। দর্পন বানানটা নিয়েও খুব টেনশিত আছি। দর্পন বানান দন্তন্য ন নাকি মূর্ধন্য ণ বুঝতেছিনা। কিন্তু এই পোষ্টের জন্যে এই নামটাই বেছে নিলাম। সবগুলো পোট্রেইট ছবি। আরেকটা কথা ছবিগুলার ক্যাপশন দেবার চেষ্টা করছি, যেগুলো আমার নিজের কাছেই খাপছাড়া মনে হইতেছে।



সিন্ড্রারেলা স্মাইল।




আমার একটা ছবি তুলেন দ্যান না।






পলাতক শৈশব।

এইটা আমার প্রিয়। আমরা ক্যাম্প করেছিলাম রেডক্রিসেন্টের একটা সেন্টারে। লাল নিল বহুবর্না টেন্ট সকালের ঝরে লন্ডভন্ড। ঝুম বৃষ্টিতে হাটুকাদা ভেঙ্গে বস্ত্রহীন শিশুরা এসেছিল টেন্ট দেখতে। ধ্বংসস্তুপ দেখে ফিরে যাচ্ছে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29242655 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29242655 2010-09-21 01:31:28
::::ফটোব্লগঃ এখানে সেখানে::::

সতর্ক। মীরপুর।


লিটল হর্সম্যান। পিচ্চি রায়হান আর তার পিচ্চি ঘোড়া রাজা। হকশোবাজার, কলাতলী।


লাল নীল দীপাবলী। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল (আশে পাশে সব অন্ধকার কারন লোডশেডিং)।


ঝড় এলো এলো ঝড়। চাঁদপুরে ডাকাতিয়া -পদ্মার মোহনায়।


পদ্মা নদীর মাঝি। -ইব্রাহিম পুর, শরীয়তপুর।


ডাকাতিয়া। ছবিটাতে ফটোশপ দিয়া ফেক এইচডিআর (হাই ডাইন্যামিক রেঞ্জ) করার চেষ্টা করায় এরকম জ্বলে গেছে।




নিঃস্বঙ্গতা। ইনানী, উখিয়া।


চাঁদমামা। সদরঘাট।


রাতের চাঁদপুর লঞ্চ টার্মিনাল। চাঁদপুর।


লাল পতাকা।


স্টেয়ার টু হ্যাভেন।


নৌবহর।


বন্ধু। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29236792 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29236792 2010-09-08 00:52:26
::::হন্টন ব্লগ ::::
শুক্রবার ছুটির দিন আমরা ৫জন বেরিয়েছিলাম হাঁটা হাঁটি করতে। মজার ব্যাপার এই ৫জনেই ব্লগার। প্রথম আলো ব্লগের নাজলা আপা, রিটন ভাই, নোমান ভাই, সামহোয়ার ইনের অগ্নির আর আমি। রুটটা ছিল এরম- ধানমন্ডি-রায়েরবাজার বধ্যভুমী-বছিলা, বুড়িগঙ্গা সেতু- আটিবাজারের আগের বাঁদিকের কাঁচা রাস্তাটা ধরে ঢুকলে অনেক গ্রাম। নদীর পার ঘেসে সোজা ঘুরে ফিরে সাভারে। সিঙ্গাইর যাবার রাস্তার ওদিক দিয়ে হেমায়েতপুরে বের হতে হয়। আন্দাজের হিসাবে ২০-২২ কিলোমিটারের পথ।


হৈ-চৈ


হৈ-চৈ এর মধ্যখানে। ছবি তুলছে ব্লগার অগ্নির।


লাফা লাফি-ঝাপা ঝাপি।


এই পাখিটার নাম আইরাগুত্তি বা কানাকুয়ো (আগের একটা পোষ্টে ম্যাভারিক দা কইছিলেন, আরেকজন বলছিলেন আইরাগুত্তি, নাম ভুল হইলে আমার দোষ না)



হাতে এবং চুলে শখ করে অনেক আয়োজন করে দেয়া মেহেদী, লালটুকটুকে মেহেদী কন্যা।


জলকিশোরী


ওয়াশপুরের ঠিক পাশেই একটা জলা। জায়গাটাতে ইতিমধ্যেই ডেভলপারদের সাইনবোর্ড বসে গেছে।


পাটের জাগ দেয়া।


বছিলার কাছে, নতুন বুড়িগঙ্গা সেতু।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29217385 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29217385 2010-08-08 00:53:05
এডভেঞ্চার পুবের পাহাড় ৭-বাংলাদেশের ছাঁদে।
এটাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দৃশ্য। সামনের ঘাসগুলোর পরেই শুরু হয়েছে বার্মার সীমান্ত। বার্মার সবচাইতে বিদ্রোহ আর সংঘাত পূর্ন এলাকার একটা। পিছে বাংলাদেশের অংশে জঙ্গল অতিরিক্ত ঘন হওয়ায় কিছুই দেখা যায়না।

বাংলাদেশের নতুন আবিষ্কৃত সর্বোচ্চ চুড়ার নাম তল্যাং ময় বা সাকা হাফং। তল্যাং ময় বম শব্দ অর্থ সুন্দর পাহাড়। আর সাকা হাফং ত্রিপুরা বা টিপরা। অর্থ পুবের পাহাড়। এডভেঞ্চার পুবের পাহাড়ের আগের পর্ব নদীর নাম রেমাক্রিঃ Click This Link

সারাদিন রুপসী রেমাক্রি ধরে ট্রেক করে মদক মোয়াল (মদক মোয়াল কোন আলাদা পাহাড় নয়, মোয়াল শব্দের অর্থ পার্বত্য রেঞ্জ, মদক পাহাড়ের রেঞ্জকে মদক মুয়াল বলে) এর গায়ে আকাশের কাছা কাছি ছবির মতো ত্রিপুরা গ্রাম শালুকীয়া পাড়ায় আমরা পৌছালাম। সন্ধ্যা বেলায় নলীরাম ত্রিপুরা আমাদের নাস্তার দাওয়াত দিলেন। নলীরাম গ্রামের শিক্ষক এবং ব্যাবসায়ী। সবচাইতে অবস্থাপন্ন লোক। এ অঞ্চলে দোকানের চল নেই, তাই সফল ব্যাবসায়ী নলীরাম দা, পাশের গ্রামের জঙ্গলে তার অনেক গুলো গয়াল আছে। সবচে কাছে মোবাইল নেটওয়ার্ক ৩/৪দিনের রাস্তা। কিন্তু নলীদার একটা নোকিয়া মোবাইল আছে যাতে এমপিথ্রি বাজানো যায়, ভিডিও দেখা যায়। নলীদা আদিবাসী কিছু গান বাজাচ্ছিলেন। অত্যন্তু সুরেলা গলার এক মেয়ে মারমা ভাষায় গান গাইছে। থানছি শহরে মোবাইলের দোকানে নাকি হরহামেশাই তার গান পাওয়া যায়। বান্দারবান শহরের শিল্পী। কিন্তু সীমান্তের এপারে ওপারে দু-দিকেই দারুন জনপ্রিয়।
পাহাড়ী আলু সেদ্ধ আর গরম চা দিয়ে খেতে খেতে নলীদা আগামী কালের প্ল্যান সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আমরা জানালাম ইতিমধ্যেই আমরা যোগার যন্ত করে রেখেছি। মরা, ন্যাচার এডভেঞ্চার ক্লাবের সাথে প্রথম সাকা হাফং অভিযানে সঙ্গী হয়েছিল কাটার হিসাবে। যেহেতু আমাদের ছোট দল আমাদের বেশী কেউ লাগবে না। আমরাই জঙ্গল সাফ করবো, আর মরা থাকবে পথ দেখিয়ে দেবার জন্যে। কিন্তু নলীদার ব্যাপারটা মনপুত হলো না। বার বার করে বললেন এত ছোট দল নিয়ে যাওয়া যাবে না। পথ ভয়ঙ্কর। আমরা মোটে দুজনের দল, তাই কাটার আর গাইড বাবদ মজুরীর বাজেটও খুব কম। নলীদা গ্রামের বুড়ো কারবারী আর অন্যান্যদের সাথে নিজেদের ভাষায় কি কি জানি আলাপ করলেন। আমাদের বললেন, আমি নিজ দায়িত্বে আপনাদের যাবার ব্যাবস্থা করছি। আমরা প্রচুর ওষুধ এনেছিলাম। এই অঞ্চলে সামান্য প্যারাসিটামল কিনতে হলেও ৪দিনের রাস্তা পাহড়ী পথ ডিঙ্গাতে হয়। গ্রামের কারবারীর কাছে ওষুধ পত্র গুলো বিতরন করলাম নলীদা একটু পড়ে বললেন, মরার বাসায় থাকার সমস্যা আর তার ছেলের ম্যালারিয়া, আপনারা আমার বাসায় থাকেন। আমরা একটু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলাম কিন্তু তা ধোপে টিকলো না। একটু পড়ে দেখি লোকজন মরার বাসা থেকে আমাদের জিনিসপত্র গাট্টি বোঁচকা মেরে এখানে নিয়ে এসেছে। অজ্ঞাত কোন কারনে মরা ভ্যানিশ। সন্ধ্যা থেকেই চোখের আড়ালে।

রাতে বাঘ পালানো শীত পড়লো। ঘরে দাউ দাউ করে চুলা জ্বালিয়ে রাখে পাহাড়ীরা শীতের দিনে। মোটা মোটা কাপড় পড়ে স্লিপিং ব্যাগে থর থর করে কাঁপছিলাম। সারা রাত ছাড়া ছাড়া ভাবে ঘুম হলো প্রচন্ড ঠান্ডার কারনে। সুবহে সাদিকের দিকে একবার ঘুম ভাঙ্গলে দেখি নলীদা ঘরের যীশু খ্রিষ্টের ছবির সামনে সুর করে প্রার্থনা সঙ্গিত গাইছেন। গান শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোড়ে উঠে নলীদা’কে কোথাও পাই না। নলীদা’র স্ত্রী বাংলা জানেননা। ইশারা ইঙ্গিত আর টুকটাক ভাষায় যা বললেন তা হলো নলীদা খুব ভোড়ে উঠে খুব জরুরী কাজে বাইরে গেছেন। আজকে আর ফিরবেন না। পুরো ব্যাপারটাই গোলমেলে লাগলো। কিন্তু চেপে গেলাম। সকাল ৭টা নাগাদ মরার আসার কথা। কিন্তু তার আর দেখা নেই। আমরা হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চুড়ায় যাবার প্রস্তুতী নিলাম। ৮টা বেজে গেল, কিন্তু তবুও মরার দেখা নেই। শেষে বাধ্য হয়ে মড়াকে খুঁজতে বেরুলাম। সকাল ৯টার দিকে মড়াকে পেলাম গ্রামের অন্য মাথায়। চুপচাপ বসে আগুন পোহাচ্ছে। মড়ার কথাতে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। সে একা আমাদের নিয়ে যাবে না। তাকে কমপক্ষে আরো একজন লোক নিতে হবে এবং গতকাল আমাদের সাথে যেই রেটএ কথা ঠিক হয়েছে সেটা এখন তার বড্ড কম মনে হচ্ছে। তাকে এর পাঁচগুন টাকা দিতে হবে।
মরার কথার ভঙ্গিতেই পরিষ্কার হলো গ্রামের কেউ তাকে বুঝিয়েছে এরা ৭দিনের রাস্তা পার হয়ে এতদুর এসেছে তল্যাং ময়ে উঠতে। এখন না গিয়ে ফিরবে না। তাই সুযোগ বুঝে আচ্ছা মতো টাকা আদায় করা যাবে। কে মড়াকে কান পড়া দিলো বুঝতে দেরী হলো না। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। পাহাড়ে অনেক দিন ধরেই ঘুরছি। টাকা পয়সা নিয়ে এধরনের নোংরামীতে আর পড়তে হয়নি। মড়া শাইলক স্টাইলে আমাদের কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বলে সামনে উৎসব, আমার অনেক কাজ, গেলে যেই টাকা বললাম তাতে রাজী হন, নইলে থাকেন, গ্রাম ঘুরেন।
গতকাল মড়ার সাথে দেখা হয়েছিল শালুকীয়া ঝর্নায়, মরার ছেলে অসুস্থ তাই সে চারদিনের পাহাড় ডিঙ্গিয়ে থানছি যাচ্ছিলো ওষুধ আনতে। আমাদের সাথে ওষুধ গুলো ছিল তাই সে ফিরে আসে গ্রামে। তখনই কথা বার্তা ঠিক করে রেখেছিলাম। এদিকে বেলা বাড়ছে। প্রথম সাকা হাফং অভিযানে ওরা সকাল আটটায় রওনা হয়ে বিকালের দিকে ফিরে আসছিলো। আর আমাদের এখানেই ১১টার মতো বাজে। ফিরতে রাত হবে। এই ভয়ঙ্কর পথে কোন অবস্থাতেই রাতে যাতায়াত সম্ভব না। তাই মড়ার কথায় রাজী হয়ে গেলাম। আমরা রাজী হতেই মড়া আরো দাবী তুললো। তার সঙ্গী ছেলেটাকেও সমপরিমান অর্থাৎ আসল রেটের পাঁচগুন টাকা দিতে হবে। স্বাভাবিক রেটের ১০গুন বেশী রেটে যে দুজনকে পেলাম তাদের অন্যজনের নাম অজারাম ত্রিপুরা। আমাদের নলী’দার শালা। ২০এর মতো বয়স। দুটো বাচ্চা আছে। কোন কাজকর্ম করেনা, কিছুদিন থানছিতে বাংলায় পড়াশুনা করেছে তাই বাংলা ভালোই জানে। সে তল্যাং ময়ের পথে কোনদিনও যায়নি।
মড়া পরে কথায় কথায় ফাঁস করে দিয়েছিলো কার স্বার্থে আমাদের এরকম প্যাচে ফেলে। এবং এও জানলাম এইটা করে মড়ার যেমন লাভ তেমনি অন্যজনেরও লাভ কেননা মড়া আর অজারামের আজকের ইনকাম তার বুদ্ধিতে হওয়ায় তাদের মজুরীর ২৫% তাকে দিতে হবে। মগের মুল্লুকে শুধু মং (মারমা বা মগ) রাই থাকে না ত্রিপুরারাও থাকে। মনে পড়লো চ্যামাখাল ট্রেকে সুভাষ ত্রিপুরার বন্ধুত্ব কিংবা আগের গ্রামের দোনারাং ত্রিপুরার কথা। গতরাতে নলীরাম ত্রিপুরা আগ বাড়িয়ে জানালো যে ন্যাচার ক্লাব তাকে হাজার খানেক টাকা দিয়েছিল তল্যাং ময়ের পথে একটা সাইনবোর্ড লাগাতে যে এটাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চুড়া। সে খামোখাই সে প্রসঙ্গ তুলে জানালো সে ঐটাকা দিয়ে সাইনবোর্ড লাগিয়েছিলো কিন্তু মুরংরা সেটা ভেঙ্গে ফেলেছে।শোনার সময়ই ঠাকুর ঘরে কে’রে ভাব হচ্ছিলো।
আমরা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চুড়ায় ওঠার জন্যে রওনা হলাম সকাল সাড়ে দশটারও পরে। আলমভাই হতে যাচ্ছেন প্রথমজন যিনি দ্বিতীয়বার তল্যাংময়ে পা রেখেছেন। আলমভাই জানালেন সাকাহাফং এ প্রথম যাবার সময় তারা সকাল ৭টায় রওনা দিয়ে দুপুরে চুড়ায় পৌছেছিলেন। আর ফিরতে গিয়ে বিকেল গড়িয়ে গেছে। সেই হিসাবে আমাদের ফিরতে হয়তো রাত হবে। আর রাস্তার অবস্থা দেখে বুঝতে পারছি তাহলে কি সর্বনাশ হবে।
বাংলা গ্রামার বইতে ব্যাকারনগত ভুলের উদাহরন হিসাবে ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ শব্দটা থাকে। যারা গ্রামার বই লিখে তাদেরকে রাস্তাটা দেখাতে পারলে হতো। খাড়া উচু থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে ঝিরি নামছে। বেশীর ভাগ যায়গাতেই এতোই খাড়া যে প্রায় ঝর্না হয়ে গেছে। দিনমানে অন্ধকার হয়ে আছে। না মেঘলা দিন না। এদিকে অরন্যের রাজত্ব। মানুষের হামলা নেই বলে ঘন সবুজ বনের হাতে সূর্যের আলো হেরে গেছে নিদারুন ভাবে। দৈত্যাকার সব বিশালকায় পাথর শ্যাওলা পড়ে সবুজ। আকাশ ছোঁয়া প্রকান্ড গাছগুলোর মোটা মোটা কান্ডে শ্যাতলা জমে আছে। গাছগুলো থেকে ঝুলে পড়া সবুজ সবুজ লতানো গাছগুলো কি যেন কি রহস্যে ভরপুর। বড় বড় ফার্ন আর লতানো অর্কিড। দুর্ভেদ্য ঘন বনে পাখি, বানর (বান্দরবানে বানর খুবই কম দেখা যায়, বিশেষ করে রুমা, মদক এই দিকে) আর অচেনা পশুর ডাক। বিষ্ময়ের ব্যাপার, এই দুপুর বেলায় ঘুঘুর ডাকের সাথে তাল মিলিয়ে ডাকছে লাল হরীন। এই তল্যাং ময় ট্যুরে লাল-হরীনের সাথে কয়েকবার দেখা হয়েছে। লাল রঙের ছোট ছাগলের মতো। সম্ভবত ইংরেজীতে বলে বার্কিং ডিয়ার। নিঃস্বং টিঁয়াও টিঁওয়াও আওয়াজ। মাঝে মাঝেই প্রকান্ড বেধের বিশাল সব গাছ আড়া আড়ি পড়ে আছে। কোথাও কোথাও তলা দিয়ে হামাগুড়ি দিতে হয় আবার কোথাও কোথাও হাচড়ে পাচড়ে দাওয়াল টপকানোর চেষ্টা। ঝিরির পানি ভয়ঙ্কর হিম ঠান্ডা। আমরা উজানে যাচ্ছি। হিম শিতল পানির ভয়ঙ্কর স্রোতের মুখে থাকা শ্যাওলা জমা বিশালদেহী পাথরগুলো যে কি রকমের পিচ্ছিল হতে পারে তার জানান দিতেই আমরা ক্রমাগত আছাড় খেতে থাকলাম।
একজায়গায় ঝিরিটা দুই দিক থেকে দেয়ালের মতো একটা পাহাড়কে চক্র কেটে নেমে এসেছে, মরা জানালো এই পথে ওঠা লাগবে। হাত পা খিমছে খিমছে স্পাইডার ম্যানের মতো করে পাহাড় বাওয়া শুরু করলাম। উচুতে ভয়ঙ্কর ঘন জঙ্গল। আর লতাপাতায় বিছুটি জাতীয় কিছু। বাঁশ ঝারের গায়ে হাত দিলেই হাত চুলকায়। না দিয়ে উপায় নেই। পায়ের নিচে এক চিলতে মাটি। দুপাশে গভীর খাদ। বাঁশ ধরে ঝুলে ঝুলে যেতে হয়। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার অনেক জায়গাতেই বাঁশ গুলো মরা, ধরে ভর দিলেই মরাত করে ভেঙ্গে পড়ে। অজ্ঞাত কারনে জায়গাটায় মাকড়শার জালে ভর্তি। এগুলো কি প্রজাতীর মাকড়শা জানিনা, জালগুলো বেশ শক্ত আর আঠালো। চোখে মুখে বসে গেলে টেনে টেনে তুলতে হয়। টিভিতে, বইপত্রে টরেন্টুলার ছবি দেখেছি।আজকে এই বাঁশবনে আঠালো জালের আট-পেয়ে মালিকেরে চেহাড়া দেখে টরেন্ট্যুলা বাস্তবে দেখার উৎসাহ উবে গেল। সাধারন মাকড়শারই হয়তো কোন প্রজাতী। সাইজে আমার হাতের তালুর সমান, সবুজ আর কালো মেশানো বিকট দেহ। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে।
বিপদজনক রাস্তাটা পেড়িয়ে এসে মোটামুটি একটা রাস্তায় উঠলাম। ন্যাড়া পাহাড়ে জুম লাগিয়েছে। শিশির জমে জুমের আলগা জমি।একে বেঁকে বিশাল পাহাড়টার একদম চুড়ায় উঠতে হলো। আকাশ স্বচ্ছ গাড় নীল হয়ে এসেছে।রোমান্টিকেরা একে হাই অল্টিচিউড ব্লু বলতে পছন্দ করে। এই দুর্ভেদ্য জুমের পাহাড়টা মুরংদের গ্রাম চিকনকালা মৌজার। বাংলাদেশের অন্যতম উচু আর সবচাইতে দুর্গম গ্রামগুলোর একটা। মুরং বা ম্রো-রা চমতকার উপভোগ্য মানুষ। কিন্তু কিছু উগ্র কাজকারবারের কারনে (মুরং গ্রাম বোর্ডিং হেডম্যান পাড়ায় রাত্রিবাসের ঘটনা দ্রষ্টব্য) মুরংরা অনেকটাই একঘরে। শালুকীয়া পাড়া নিজেই প্রাকৃতিক বর্মে ঢাকা। শালুকীয়া পাড়ার ত্রিপুরারা বা অন্যগ্রামের লোকেরা চিকনকালা পাড়ায় আসতে হলে রেমাক্রির পথে আসে। এ অঞ্চলটা একদমই যেন পৃথিবীর বাইরে। চিকনকালা পাড়ার জুমঘরে এসে আমরা একটা বিরতী নিলাম।আমাদের জিপিএস জানাচ্ছে আমরা ২৭০০ফুট উপরে। মানে তাজিনডং মুল চুড়ারও উচুতে।সবার গা থেকেই অনেক গুলো করে জোঁক বেরুলো। তাছাড়া ঝিরির পরের বিপদজনক ঢালটার বাঁশবনে জায়গায় জায়গায় ছিলে গিয়েছিলো।কিছুক্ষন জিরিয়ে নিলাম। অজারাম অনেকক্ষন থেকে খন খন করছিল, খুব বাজে জায়গা বলে। কোন দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত রেখা চিহ্নিত করা হয় বড় কোন পর্বতের রীজ বা নদী বরাবর।মদকের এই অঞ্চলে বাংলাদেশ-বার্মার সীমান্ত চিহ্নিত করা হয়েছে তল্যাং ময়ের (ব্রিটিশদের ম্যাপে মদক তোয়াং) বরাবর। তল্যাং ময় বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে কোনাকুনি উঠেছে আর বার্মার দিকে প্রায় দেয়ালের মতো খাড়া ৯০ডিগ্রি করে নেমে গেছে।প্রাকৃতিক দেয়াল অর্থাৎ চুড়ার ঠিক নিচেই সীমান্ত পিলার। গুগল আর্থে তল্যাং ময়কে বার্মা সীমান্তের ওপারে দেখিয়েছে। তল্যাং ময়ের অস্তিত্ব প্রকাশ পেলে এডভেঞ্চার কম্যুনিটির অনেকেই একে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চুড়া বলতে অস্বীকার করেছিলেন বার্মার ভেতরে সন্দেহ করে। কিন্তু চুড়ায় উঠলে নিশ্চিত ভাবে বলা যায় এটা স্বার্বভৌম বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরেই।
সীমান্তের ঠিক ওপারেই বার্মার প্রথম গ্রামটার নাম পীক্ষ্যং পাড়া। বমদের গ্রাম। অজারাম জানালো বার্মিজ আর্মি নাকি পিক্ষং পাড়ায় সমাবেশ করছে। র‌্যাম্বো বা এধরনের মুভীগুলোতে বার্মিজ আর্মির অত্যাচারের দৃশ্য থাকে। ব্যাপারটা মিথ্যে নয়। ১৯৪৮সালে স্বাধীনতার পর থেকেই বার্মার রাষ্ট্রযন্ত্র অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে বার্মিজ আর্মি। গ্রামের আদিবাসীদের মানুষ বলে মনে করে না। কিছু হলেই গুলি। অজারাম জানালো সে নাকি গতরাতে স্বপ্ন দেখেছে তল্যাং ময়ের নিচে বার্মিজ আর্মি জমায়েত হয়েছে আর আমাদের দেখেই ঠা ঠা করে গুলি করা শুরু করছে। আর আমরা সবাই ধপাধপ মারা গেছি। সেটা দেখে নাকি সে আতঙ্কে অস্থির। মেজাজ এত বেশী খারাপ হলো যে কি বলবো?
১ঘন্টার মধ্যেই আমরা অতি সুন্দর একটা উপত্যকায় এসে নামলাম। চারপাশে বিশালদেহী সব গাছের রেইন ফরেস্ট। অগুনিত পাখি সারাক্ষনই কিচির মিচির করছে। এর মধ্যে আঁকা বাঁকা একচিলতে মেঠোপথ। সমতল রাস্তা। দির্ঘ পথ খুব দ্রুতই চলে এলাম। পথের শেষে একটা ছোট্ট ঝিরি। এই ঝিরিটার জন্ম বার্মায়। কিন্তু একে বেঁকে সেই ভয়ঙ্কর জঙ্গুলে বাঁশের বন (আগের দুটো এক্সপিডিশান এবং জীন ফুলেনের প্রথম এক্সপিডাশানে ওরা যে পথ দিয়ে এসেছে আমাদেরকে অন্য পথে এনেছে মড়া) পেড়িয়ে শালুকীয়া ঝিরিতে পড়েছে। এর পরে প্রায় ঝর্নার মতো করে একদম খাড়া নেমে মিশেছে রেমাক্রি’তে। ঝিরির অন্যমাথায় এক নেংটি পড়া লোক কাঠ কাটছিলো। এটা মুরং পাড়া। চিকনকালা। আগেই শুনেছিলাম এটা বাংলাদেশের সবচাইতে স্যাভেজ গ্রামের একটা। ধাপে ধাপে খাড়া উঠে গেছে ঝিরির পাশা পাশি চিকনকালা রেইনফরেস্টের দিকে।
মুরং মেয়েদের টপলেস থাকার দৃশ্য অনেক। সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের আত্মজীবনী বলপয়েন্ট বা কাঠপেন্সিল কোনটাতে বান্দারবান শহরে এমন দৃশ্যের কথা লিখেছিলেন। মুরং মেয়েরা ঘরে বাইরে প্রায় সব কাজই করে। তাই কাজের সুবিধার জন্যে উর্ধাঙ্গে কিছু রাখে না। তাই তাদের দেখে বিব্রত না হলেও বিব্রত না হয়ে পারলাম না প্রায় দিগম্বর কিছু পুরুষকে গেরোস্থালীর কাজ করতে। যে কয়জন পুরুষকে দেখলাম কেউ কাঠ কাটছে না হয় অন্য কাজ করছে। আমাদের দেখে গ্রামের কারবারী এগিয়ে এলেন।মাথায় বিশাল লাল পাগড়ী আর পরনে বড় রুমালের সাইজের একখন্ড কাপড়ের ন্যাংটি পড়া। গ্রামে সময়ক্ষেপনের মানে নেই। আমাদের তাড়াছিল। কিন্তু চোখ আটকে গেল একটা খোলা জায়গার লাল মরিচ শুকোতে দিয়েছে চাতালের মতো করে। লাল মরিচের মধ্যে এক কোনায় রোদে শুকোতে দেয়া একটা চিতা বেড়ালের চামড়া।অতীতে একবার থানছিতেই এক মুরং গ্রামে খাবারের খোঁজ করাতে ওরা জানায় দু-দিন আগে আসলে ভাল্লুকের মাংস খাওয়াতে পারতাম। তাই চিতাটাকে মেরে তার মাংসগুলো কি করেছে সেটা খামোখা জিজ্ঞেস করলাম না। মাথাটা আস্তই আছে। প্রকান্ড শ্ব-দন্ত মেলে ভয়ঙ্কর মুখব্যাদন করা মৃত জন্তুটার অসহায় ভরা করুন চেহারাটা দাগ কেটে যায়।
চিকনকালা গ্রাম থেকে পথটা ধিরে ধিরে উঠে যাচ্ছিলো। মাথার উপরে ঘন অশুভ কালো এক রেইন ফরেস্ট। অনেকটা লাউয়াছড়া ঘরানার। বিশাল বিশাল প্রকান্ড মোটা কান্ডের গাছ।আকাশ থেকে সূর্যের আলো আটকে দেয়। অনেক দিনের জমা পাতার উপরে গাছের পাতা খসে পড়ে, আর তার উপরে নতুন পাতা পড়ে। চারপাশে ফার্ন, লতা গুল্ম আর পরগাছার দল গাছগুলোকে আরো রহস্যময় করে তোলে।
চিকনকালা বনের একটা রহস্যময় মীথ আছে। কু-সংস্কারের ঢেঁকী অজারাম সবিস্তারে জানালো। চিকনকালা গ্রামের লোকেরা বেঁচে থাকার জন্যে এই বনটার উপর নির্ভরশীল। ওরা আলাদা থাকতে পছন্দ করে। দৈবাত বাইরের গ্রামগুলোতে যায়। বাইরের লোকেরা আসে খুবই কম।রাস্তা দুর্গম বলে। আর আসলেও আসে শুধুই শিকারের লোভে। অসংখ্য শিকারের মাঝে আছে হরীন,বুনো শুকর, বন মোরগ আর বন্য ময়ুর। চিকনকালা গ্রামের লোকেদের ধারনা এই জঙ্গলে অতৃপ্ত অপদেবতার বাস। প্রতিবছরেই হঠাতই একদিন কোন জানান না দিয়ে বনের ভেতরে বিচিত্র একটা ধুপধাপ আওয়াজ আসে। এই আওয়াজ শুনলে গ্রামের শিশু বৃদ্ধ সবাই আতঙ্কে জমে যায়। পিশাচের ঘুম ভেঙ্গেছে। বনের ভেতরে থাকা কাঠুরে বা শিকারীরদল উর্ধশ্বাসে জান হাতে নিয়ে ছুটে বন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রতিবছরেই এক দুজন পিছনে রয়ে যায়। তারা আর কোনদিন গ্রামে ফিরে আসে না। ক-দিন পরে হয়তো জঙ্গলে তাদের মৃতদেহ আবিষ্কার হয়। সারা শরীরে কোন আঘাতে চিহ্ন নেই। কিন্তু লাশের চেহারা দেখে মনে হয় সাংঘাতিক ক্লান্ত আর ভয়ঙ্কর কোন কিছু দেখে দারুন আতঙ্কে অস্থির। কি দেখে ভয় পেয়েছে আর কিভাবে কোন ক্ষতচিহ্ন ছাড়া মারা গেছে সেই রহস্য এখনো চিকনকালার লোকেরা ভেদ করতে পারে নি।
চিকনকালার অরন্যের ভেতরে ঢূকে উত্তর দিকে একটা বাঁক নিয়ে আমরা আবার ঝিরির পাশে আসলাম। এটা শিকারীদের রাস্তা। একদম খাড়া। উঠতে উঠতে দম ফুরিয়ে যায়। ঝিরি থাকায় রক্ষা। একটু পড়েই রাস্তা শেষ হয়ে গেল। এর পরে আর লোক যায়না।
সিপ্পি অভিযানের কথা মনে পড়লো।এই জঙ্গলটাও ভয়ঙ্কর ঘন। এত বেশী ঘনত্ব যে ২ হাত দূরে গাইডকে দেখতে পারছি না। ক্রমাগত কথা বলছি নিজেদের সাথে। যাতে একজন আরেকজনকে দেখা যায়। মড়ার উপরে শ্রদ্ধা আসলো। এর মধ্যেও কিভাবে যে পথ চিনে চলছে। প্রথমে মনে হলো আমরা উলটো দিকে যাচ্ছি। ঘন জঙ্গলের জন্যে সামনের লোককেই দেখা যায়না, তল্যাং-ময় চুড়া আরো দুরের ব্যাপার। মড়া ব্যাপারটা খোলাসা করলো।‘আমি পাহাড়ী শিকারী’। শিকারের ধান্ধায় দুনিয়ার সব ভয়ঙ্কর জায়গাতে ফাঁদ পাতি।এই পথে আসিনি তো কি হয়েছে, আমাকে একটা জায়গা দেখায়া দিবেন, আমি ঠিক ঠাক পৌছে যাব। অচেনা জঙ্গলে পথ চলা একটা বিদ্যা। এটা এক দুই দিনে শেখা যায়না। মড়ার মতো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের শিক্ষা আর অভিজ্ঞতা পারে এটা শেখাতে। মড়া একটু পড় পড় কোন গাছের ডাল ভেঙ্গে দিচ্ছে বা গাছের মধ্যে কাস্তে দিয়ে ক্রস আকঁছে ফেরার সময় দিক চেনার জন্যে।
নিরেট পাথুরে মাটি, কিন্তু বছরের পর বছর পাতা জমে জমে মাটির চিহ্ন পর্যন্ত নেই।একটা খোলা জায়গায় এসে আমরা বনমোরগ পেলাম। ঝপ করে উড়ে গেল (আসলে লাফালো)। তাদের রাজ্যে সহজে মানুষের দেখা মেলেনা। আমরা নিশ্চিত ভাবে চমকে দিয়েছি তাদের। জঙ্গলের ভেতর থেকে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে পশুপাখির ডাক আসছিলো। এর মাঝে বানর আর লাল হরীণের ডাক চিনতে পারলাম। অনেক গুলোর আওয়াজ অদ্ভুত লাগলো। এই ভর দুপুরে হরীণের ডাক সত্যি বিষ্মিত করে। এই পথটা ভয়ঙ্কর খাড়া। প্রায় পুরো রাস্তাটাই চারহাত পায়ে যেতে হলো।
এর পরে একটু কম খাড়া রাস্তা। কিন্তু চলাচল আরো বেশী কষ্টের। কারন ভয়ঙ্কর জঙ্গল। কাঁটাঝোপ,বাঁশবন আর বড় কিছু গুল্ম জাতীয় গাছ। মরা বাঁশের ভাঙ্গা অংশে হাত পা ছড়ে শেষ, কিন্তু সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার নিজেকে ছাড়া আর কিছুই দেখতে পারিনা জঙ্গলের ঘনত্বের জন্যে। ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের মতো শুধু অন্যদের কন্ঠ শুনে শুনে জঙ্গল কেটে চল্লাম। প্রায় সমতল একটা রাস্তা। বুঝতে পারলাম তল্যাং ময় প্রাচীরের উপরের। আমাদের ফুট খানেক দুরেই বার্মার সীমান্ত।হাচড়ে পাচড়ে একটা গোল জায়গায় আসলাম। নিচে একটা গভির গর্ত। জঙ্গলটার মাঝে ৫/৭ফুট এলাকা পরিষ্কার করে কাটা। বছর খানেক আগে পরিষ্কার করা। আমাদের জিপিএস আর মড়া দুজনেই জানালো আমরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সবচেয়ে উচু জায়গাতে দাঁড়িয়ে আছি। সামনে লতা ঘাসের জঙ্গলের ওপাশে বার্মা। বাংলাদেশ অংশের কিছুই দেখার উপায় নেই ঘন জঙ্গলের জন্যে। কিন্তু মনে মনে বললাম বাংলাদেশের ছাঁদে পা রাখার দির্ঘ স্বপ্নটা সফল হলো আজ।। আমি সাথে করে আনা লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা তুলে দিলাম।
ঘড়িতে বাজে আড়াইটা। আমি খাবার দাবারের প্যাকেট খুললাম। আলম ভাই তার দুইটা ভিন্ন মডেলের জিপিএস নিয়ে ব্যাস্ত হলেন।ব্যাপারটা অনেক বড় কিছু। কিন্তু আজকে আলম ভাই হয়ে গেলেন প্রথম ট্রেকার যে কিনা একাধিকবার তল্যাং ময় বা সাকা-হাফং এ পা রেখেছেন। উইকিপিডিয়াতে তল্যাং-ময়ের উচ্চতা ৩৪৮৮ফুট বলে লেখা আছে যেটা আলম ভাইয়েরই মাপা। কিন্তু উনি নিজেই নিশ্চিত নন। আমরা সর্বোচ্চ উচ্চতা রেকর্ড করেছি ৩৫০০ফুটের একটু বেশী আর সর্বনিম্ন ৩৪৬০ফুট (কেওকারাডং ৩১৭৬ফুট সরকারীভাবে, আর তাজিংডং ২৭৪০ফুট। আলম ভাই জিপিএস এক্সপার্ট। পুরো সময়টাতে ছবি তোলা এমনি খাবার খেতেও আগ্রহ দেখালেন না। পুরো সময়টাতেই অঙ্ক টঙ্ক করে শেষে জানালেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চুড়ার স্ট্যান্ডার্ড উচ্চতা ৩৪৭৫ফুট সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য (যদিও ব্রিটিশ এক্সপ্লোরার জীন ফুলেন লিখেছিলেন ৩৪৯০ফুট, কিন্তু জীন ফুলেনের সাথে আমি মেসেঞ্জারে কথা বলেছিলাম, সে নিজেই এ ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত নন।) আলম ভাই জানালেন গতবারে তার জিপিএসে সর্বোচ্চ উচ্চতা ছিল ৩৪৮৮।এবারে অনেক গুলো রিডিং নিয়ে তার পরে সেগুলোর গড় করে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উচ্চতা ৩৪৭৫ফুট পেয়েছেন।
আমরা ছবি নিলাম। একটা চিঠি লিখলাম। এটা একটা ট্রাডিশান। প্রথম অভিযানে জীন ফুলেন পরবর্তি অভিযাত্রীদের জন্যে চিঠি রেখে এসেছিলেন একটা বোতলে, যেটা বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাবের কাছে (সুত্রঃ চিত্রপরিচালক আর অন্নপূর্না বিজয়ী মাউন্টেনিয়ার সজল খালেদ) আছে। আর আলম ভাই ন্যাচার ক্লাবের সাথে গিয়ে আরেকটি চিঠি রেখেছিলেন।এর মাঝে আকাশ ভাই দের দলটাও সাকা হাফং জয় করে।আমরাও প্লাস্টিকের বোতলে পরের অভিযাত্রীদের জন্যে চিঠি লিখে রাখলাম। আমাদের দু মাস পড়ে আরেকটি দল চিঠি পেয়েছিল। চিঠিতে রাখা ই-মেইল আর ফোন নম্বর দেখে যোগাযোগ করে, পরে ফেসবুকের মাধ্যমে আমার লেখা চিঠির কপি পেয়েছিলাম।
ফেরার পথটা বেশী কঠিন হলো। পাহাড়ে উঠার চেয়ে নামাই বেশী কষ্ট। সময় কম লাগে ঠিকই কিন্তু বড় এক্সিডেন্টগুলো পাহাড়ে ওঠার চেয়ে নামার সময়ই বেশী হয়। আমরা নিরাপদেই চিকন কালা পর্যন্ত আসলাম। মড়া আর আমি, আলমভাই আর অজারাম দু-গ্রুপ করে আসছিলাম।কাটা ঝোপের জঙ্গলে পথ হারিয়ে দু গ্রুপ আলাদা হয়ে গিয়েছিলোএকবার।মড়ার কল্যানে বড় কোন বিপদ হয়নি।আর ঘন মরা পাতার জঙ্গলটায় এসে একবার মড়াই পিছলে প্রায় ১০/১২ফুট নিচে গড়িয়ে পড়ে। ভাগ্যিস মরা পাতার পুরো আস্তর ছিল। তাই কিছু কেটে ছিড়ে যাওয়া ছাড়া আর বড় কিছু হয়নি। এখানেই আমি জীবনে প্রথমবার বন্য ময়ুর দেখলাম।চিড়িয়াখানায় দেখা ময়ুরের মতো না। বরং অনেক ছোট আর কম আকর্ষনীয়। তবুও ময়ুর বলে কথা।
চিকনকালার ভৌতিক অরন্যে একা একটা বন্য দাঁতালো শুকর চোখে পড়লো। এটা খুবই বিপদ জনক প্রানী। একটু আওয়াজেই ভাবে তাকে আক্রমন করা হচ্ছে। ধারালো দাঁত নিয়ে আক্রমনে আসে। রোয়াংছড়িতে একবার দেখেছিলাম একজন বম শিকারী তিন ঠেঙ্গে কুকুর নিয়ে।কুকুরের চতুর্থ পা টা শুকরে কেটে দিয়েছিল। আকৃতিতে ভয়াবহ। সাধারন শুকরের চেয়ে তিন চারগুন। আর সারা শরীর মাংসে থল থল করছে। মড়া আর অজারাম জানালো একটা বন্য শুকর শিকার করলে নাকি প্রায় গরুর সমান মাংস পাওয়া যায়। বন্য শুকরের বিশ্বাস নেই। হঠাত যদি ধারনা করে আমরা তাকে আক্রমন করতে আসছি তাহলেই দাঁত বাগিয় ছুটে আসতে পারে। আমরা সাবধানে সম্মানজনক দুরত্ব বজায় রেখে তাকে সম্পুর্ন উপেক্ষা করে চলে আসলাম। একসাথে চারজন সেও আমাদের দিকে খুব একটা আগ্রহ দেখালো না। শুধু গম্ভীর সাবধানী চোখে কয়েকবার মাথা তুলে দেখলো। চিকনকালা গ্রামের সীমান্তের ঝিরিটা লাফিয়ে পার হলাম দ্রুত। অর্ধনগ্ন এক লোক দু বাচ্চা নিয়ে আগুন জ্বালিয়েছে। একটা কুকুর জবাই করেছে। কুকুরটার পেট চিড়ে নাড়ি-ভুড়ি পরিষ্কার করছে। সম্ভবত আগুনে ঝলসে কুকুরের রোষ্ট করবে। তল্যনং ময়ে প্রথম বিএমটিসির জনৈক সদস্য সেবারে কুকুরের রোষ্ট খেয়ে ভুয়সী প্রসংসা করেছিলো আমার কাছে। খাদ্যরীতি একেকদলের একেক রকম, আমার কাছে গ্রহনযোগ্য নয়, তাই দ্রুত এলাকাটা পার হলাম।
চিকনকালা গ্রামে আসতে আসতেই আমার ক্যামেরা চার্জ শেষে ইন্তিকাল করলো। শালুকীয়া পাড়ায় ব্যাকপ্যাকে ইনভার্টার রেখেছিলাম।১২ভোল্টের ব্যাটারীটা জিপিএস্ চালতে গিয়ে বসে গেছে পুরোপুরি।সোলার ইলেক্ট্রিসিটি পেলেও চার্জ দিতে পারবো, কিন্তু ধারে কাছে সোলার পাওয়ার নেই।
চিকনকালার জুমক্ষেতে আসতে আসতেই সূর্য ডুবে গেলো। উচু জায়গা অনেক প্রায় আধাঘন্টা আলো থাকবে। প্রায় ছুটে ছুটে নামলাম। মাকড়শার এলাকাতে আমি আর আলম ভাই দুজনেই গড়িয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেছি।শালুকীয়া ঝিরি আসতে আসতেই পুরো জমাট অন্ধকার।সাথে টর্চ নেই। কিন্তু গ্রামের আলো খুব কাছেই দেখা যাচ্ছে। সারা শরীর ক্লান্তিতে অবসন্ন। জামা কাপড় খুলে ঝিরিতে লাফিয়ে নামলাম। বরফ শিতল জলের কামড়ে শরীর অবশ হবার দশা। কিন্তু গোসল সারতেই আশ্চর্য ফ্রেশ। আয়েশ করে সফল ভাবে সামিট শেষে গ্রামে ফিরে এলাম।
আগামী কাল ১৬ই ডিসেম্বর। বিজয় দিবস।আমরা প্ল্যান করেছিলাম এক ভাবে, তখনও জানিনা এবারেও হিসাব পালটে যাবে। বিপদজনক পাহাড়ী রাস্তায় কৃষ্ণপক্ষের রাতে টানা ১৪ঘন্টা পাহাড় বাইতে হবে,এধরনের আশঙ্কা মনে আসেনা এমনিতে।

তল্যাং ময় বা সাকা হাফং এর অবস্থানঃ 21°47'18.68"N, 92°36'33.31"E

ছবিঃ

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দৃশ্য।


গুগল আর্থে তল্যাং ময় বা সাকা হাফং এর অবস্থান। মাঝখানে হলুদ রেখাটা আন্তর্জাতিক সীমান্ত রেখা। দ্রষ্টব্য গুগল আর্থে চুড়াটাকে বার্মার ভেতরে দেখাচ্ছে। বাস্তবে রেমাক্রি নদীর ওপারে মদকের দিকে গেলেই দেখা যায় কোন ম্যাপই বাস্তবের সাথে মেলে না। গুগল আর্থে সবসময় একটু বার্মার দিকে সরে আসে।


পড়ের অভিযাত্রীদের জন্যে লেখা চিঠি বোতল বন্দী করছি আলম ভাই এবং আমি।


শালুকীয়া পাড়ায় প্রবেশ পথ। দুর্দান্ত সুন্দর ভ্যালিটা। ছবিঃ সামসুল আলম ভাই।


এই ছবিটাকে আমি ডাকি দি এঞ্জেল অফ রেমাক্রি নামে।


রেমাক্রিকে ফ্রেম বন্দীর চেষ্টায় আমি, ছবি আলম ভাইএর।


রেমাক্রিকে ফ্রেম বন্দী করলাম।


এ অঞ্চলে পোচার বা চোরা শিকারী নেই। কিন্তু বাংলার শ্বাপদ বংশ ধ্বংস হবার আরেকটা কারন মুরং দের বৈচিত্রময় খাদ্যরীতি।


চিকনকালা পাড়া। ছবিঃ আলম ভাই।


রহস্যময় চিকনকালা অরণ্য। গ্রামবাসীর ধারনা এই জঙ্গলে দানো থাকে। বছরে একদিন সে বেরোয় মানুষ শিকারে।


বাংলাদেশের ছাঁদে জাতীয় পতাকার সাথে। ডান দিক থেকে, মড়া এর পরে অজারাম।


এখানে রিডিং দেখাচ্ছে ৩৪৬৫ফুট। আমরা সর্বোচ্চ পেয়েছি ৩৪৯০ আর সর্বনিম্ন ৩৪৪০। আমার ধারনা আসলে হবে ৩৪৭৫ফুটের মতো। ন্যাচার এডভেঞ্চার ক্লাব (মেপেছিলেন একই ব্যাক্তি আলম ভাই) রিডিং দিয়েছিল ৩৪৮৮ফুট যেটাকে সবাই গ্রহন করেছে। আর ব্রিটিশ এক্সপ্লোরার জীন ফুলেন দিয়েছিলেন ৩৪৯০ফুট (উনি নিজেই মেসেঞ্জারে আমাকে বলেছিলেন এটা কনফার্ম না)। কেওকারাডং এর চুড়ায় উচ্চতা ৩১৭৬ফুট। যেটাই হোক সন্দেহ নাই এটাই বাংলাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ রিডিং।


বুনো শুকর। ওয়াইল্ড হগের দাঁত দেখে ভুল বুঝবেননা। আমি নিজে রোয়াংছড়িতে একটা তিন ঠেঙ্গে কুকুর পেয়েছিলাম। তার মনিব জানিয়েছিল অপর পা টা শিকারের সময় আহত বুনো শুকর কামড়ে ছিড়ে ফেলেছিল।


সেই কুচ্ছিত বিছুটি আর পচা বাঁশের জঙ্গলে দৈত্যাকার মাকড়শা।


চুড়োয় বসে শেষ কাজ। পড়ের অভিযাত্রীদের জন্যে শুভেচ্ছা বার্তা লেখা। কাগজটা এখনো একটা ড্রিংক্সের বোতলে আছে। পড়ের অভিযাত্রীরা একটু খুঁজলেই পাবেন। ছবিঃ আলম ভাই।


শিকারের অপেক্ষায় মাকড়শা।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29213160 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29213160 2010-08-02 00:45:13
:::: সাতছড়ির জঙ্গলে ::::

হঠাত সুযোগ পাওয়াতেই লুফে নিলাম সাতছড়ি জঙ্গল ট্যুর। ছোটবেলায় টিপু কিবরিয়ার লেখা পড়তাম কিশোর পত্রিকা বা রহস্য পত্রিকায়। আজগুবে ভুতের গল্প। শুনেছি তিনগোয়েন্দাও নাকি লিখতেন, যদিও টিপু কিবরিয়ার লেখা তিনগোয়েন্দা পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। এখন টিপু ভাই দুর্দান্ত ফটোগ্রাফি করেন। শুধুই বাংলা ফটোগ্রাফি গ্রুপের সাথে সাতছড়ি ভ্রমন নিয়ে অল্প বিস্তর হেজিটেশানে ছিলাম। সবাই দুর্দান্ত ফটোগ্রাফার, সেখানে আমি নভিশ। কিন্তু শুধুই বাংলার সবার আন্তরিক আর বন্ধুত্বপুর্ন সহজ ব্যাবহারে নিমিষেই সব কিছু দূর হয়ে গেল। আমি নিজে দারুন উপভোগ করেছিলাম ভ্রমনটা। দলের অংশবিশেষ ট্রেক ভুল করে বনের মাঝে হারিয়ে গিয়েছিল। একটা ট্রেকে (ফসিল হয়ে যাওয়া কিছু গাছপালা ছিল সেই অংশে) ভাল্লুকের তাজা পায়ের ছাপ এমনকি ভাল্লুকের গায়ের বদ গন্ধ (আমার কি দুর্ভাগ্য নাকি সর্বশেষ মদক অভিযানেও ভাল্লুকের কাছা কাছি চলে গিয়েছিলাম ভুল করে) পেয়েছিলাম। সবাইকে আতঙ্কিত করলেও ভারত সীমান্ত, অনেকগুলো ট্রেক, কাছের চা বাগান ঘুরে তারা ঠিক ঠাক ফিরেও এসেছিল। বার বার হিংসা হচ্ছিল, ইস আমি যদি হারিয়ে যেতে পারতাম।


পাশের টিপরা পল্লীতে খুব মিশুক এক বৃদ্ধা।


হেভেন আ প্লেস ইন আর্থ। সুরমা টি স্টেট। টিলার নিচে খুব সুন্দর মেঠোপথ। গোধুলীর লাল আলোয় ধুলো উড়িয়ে কৃষ্ণাঙ্গি চা শ্রমিকের দল ঘর ফেরে।


পোকা!


সেই পোকাটাই, সাথে আরেক প্রতিবেশী।


ট্রেইলের মাঝা মাঝি। মুল পথটা সোজা সুজি ভারত সীমান্তে হাজির। আর বামেরটা দিয়ে ফিরতে হয়। একটা দল ভুল করে পথ হারিয়ে সীমান্ত, চা বাগান, পুরো জঙ্গল ঘুরেছে। ইস, কেন যে পথ হারালাম না।


শিকারের প্রতিক্ষায়।


শিকার শিকারীর মরন-পণ যুদ্ধ।


একজন দুঃখি বানর।


টিপরা গ্রামে।


আয় আয় চাঁদ মামা।


একা একা।


জাল




মুখপোড়া হনুমান। এত্ত বড় ভুড়ি, নাকি প্রেগনেন্ট?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29207491 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29207491 2010-07-26 00:16:14
সংখ্যাত্বত্তের হিসাবে কে জিতবে বিশ্বকাপ ২০১০?

বিশ্বকাপ ফুটবলে কিছু মজার সংখ্যাত্বত্তের হিসাব পাওয়া যায়। যেমনঃ

১। ব্রাজিল ১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপ জিতছিলো। এর আগে ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপটাও তাদের ঘরে উঠছিলো। ১৯৭০+১৯৯৪= ৩৯৬৪

২। আর্জেন্টিনা তাদের শেষ কাপ জিতছিলো ১৯৮৬ সালে। এর আগে ১৯৭৮সালের ওয়ার্ল্ডকাপটাও তাদের ঘরে গেছিলো। এখন দেখি, ১৯৭৮+ ১৯৮৬= ৩৯৬৪

৩। জার্মানী সর্বশেষ কাপ নিছিলো ১৯৯০সালে। এর আগে আরেকবার ১৯৭৪ সালেও একবার ওয়ার্ল্ড কাপ জিতছিলো। ১৯৭৪+১৯৯০=৩৯৬৪

৪। ২০০২ সালের বিশ্বকাপটা আবার জিতলো ব্রাজিল। এর আগে আরেকবার ১৯৬২ সালে তারা কাপ পাইছিলো। ১৯৬২+২০০২=৩৯৬৪


উপরের সুত্র যদি আমরা এই বছরের হিসাবে ধরি তাইলে কি আসে? ৩৯৬৪-২০১০= ১৯৫৪।

১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ী দল কোনটা কেউ বলতে পারেন? হাহা হা হা হা। জার্মানী !!!!!!


মাঝে মাঝে জাঙ্ক মেইলে কিছু মজার মজার জিনিস পাওয়া যায়। এইটাও জাঙ্ক মেইলে পাইছি। অন্যেরাও হয়তো অনেকেই পাইছেন। ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং লাগছে শেয়ারের লোভ সামলাইতে পারলাম না।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29194696 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29194696 2010-07-07 23:16:35
::::এডভেঞ্চার পুবের পাহাড় ৭ম পর্বঃ বাংলাদেশের ছাঁদে।::: http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29185141 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29185141 2010-06-26 00:21:07 ::::ফটো ব্লগঃ সঙ্গি সাথী, পশু পাখি ::::

গত সপ্তাহে গেছিলাম দুলাহাজরা সাফারী পার্কে। মন ভরে ঘুরেছি। দুলাহাজরা সাফারী পার্কের নাম পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্ক করে ফেলেছে। এছাড়া আর কোন পরিবর্তন চোখে পড়লো না। ছবিগুলো দুলাহাজরা সাফারী পার্কের।


ক্লাউডেড লেপার্ড বা লাম চিতা। বিলুপ্তীর সীমায় চলে যাওয়া এই প্রানীটার আবাসস্থল ভারতের আসাম, বাংলাদেশ এবং বার্মা। হিমালয়ের স্নো লেপার্ডের মতো মোটা লেজ আর ছাই রঙ্গা চামড়া। বছরখানেক আগে আদিবাসীদের গ্রামে এই মাদী চিতাটা শাবক বয়সে ধরা পড়ে। পরে একে দুলাহাজরা সাফারী পার্কে রাখা হয়। বিলুপ্তীর হাত থেকে রক্ষার জন্যে প্রাণীবিজ্ঞানীরা এর জন্যে এক পুরুষ সঙ্গীর খোঁজ করছেন, কিন্তু এই অতি দুর্লভ প্রানীর কোন সঙ্গী পাওয়া যাচ্ছে না।


লক্ষী প্যাঁচা, রক আউল বা ইন্ডিয়ান ঈগল আউলের ল্যাটিন নাম Bubo bengalensis

IUCNএর হিসাবে লাল চিহ্নিত অর্থাৎ আশঙ্কাজনক অস্তিত্ব সঙ্কটে আছে।


ইস্মাইল পিলিজ। এইটা কি জিনিস জানি না। সাইজে বড় সড় হনুমানের সমান, উল্লুকের সাইজ।


স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়। মুখ পোড়া হনুমান বা Gray langur




মিঠা পানির কুমির। এই প্রজাতীর কুমীর বিলুপ্তির পথে। তবে সম্প্রতী এখানে মাদী কুমীর ২৩টা ডিম দিয়েছে।



চিতা বিড়াল। অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অস্তীত্ব সঙ্কটে থাকা। অফটপিক, গত ডিসেম্বরে মদক মোয়ালের একটা মুরং গ্রামে একটা চিতা বেড়াল দেখেছি। মুরংরা মেরে কেটে কুটে খেয়ে ফেলেছিলো।


এশিয়াটিক ব্ল্যাক বিয়ার বা মুন বিয়ার। বাংলাদেশে বান্দারবানে বেশ ক বার পায়ের ছাপ আর হুঙ্কার শোনার দুর্ভাগ্য হয়েছিল। এদের বুকে একটা অর্ধচন্দ্রাকার দাগ থাকে এজন্যে মুন বিয়ার বলে।


তারকা কচ্ছপ, ২০০৫ সালে আইউসিএন রেড লিস্টেড ঘোষনা করেছে ।


রাজধনেশ।


সোনালী অজগর। প্রানীবীদরা এটাকেও প্রায় বিলুপ্ত হিসাবে ধরেন।


তিলা ঘুঘু। বাংলাদেশের ঘুঘুদের মাঝে তিলা ঘুঘুর অবস্থাই সবচেয়ে খারাপ। নির্বিচারে শিকার মুল কারন। এদের মাংস সুস্বাদু আর শিকার করা সোজা এটাই এদের কাল।

উল্লুক। পৃথিবীতে ৫ প্রকার প্রাইমেট অর্থাৎ লেজছাড়া বানর আছে। গরীলা, শিম্পাঞ্জি, ওরাং ওটান, উল্লুক আর মানুষ। লাউয়াছড়া বা সাতছড়িতে গেলে বন্য উল্লুক দেখা যায়, কিন্তু গাছের এত উপরে থাকে যে ছবি তোলা খুবই কঠিন। বাচ্চা উল্লুক ধবধবে সাদা বড় বড় লোমে ভর্তি। দেখতে দারুন লাগে।


মায়া হরীন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, এমনকি চট্টগ্রামের হাটহাজারী, ভাটিয়ারী, সিতাকুন্ডেও মাঝে মাঝে দেখা যায়।


বান্দর ফ্যামিলি।


লাম চিতা বা ক্লাউডেড লেপার্ড।


স্লিপিং বিউটি।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29173199 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29173199 2010-06-08 23:44:59
~!~!~ট্রাভেলগ+ ছবি ব্লগঃ ঘুমন্তপুরীর রুপকথা ~!~!~


গত হপ্তায় বেড়াতে গিয়েছিলাম বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে। বেশ ক-বছর ধরেই যাবার ইচ্ছে ছিলো, সুযোগ করে উঠতে পারি নি। ব্লগে, ফেসবুকে, ফ্লিকারে অনেককেই দুর্দান্ত সব ছবি শেয়ার করতে দেখে হিংসায় জ্বলে পুরে মরতাম। একদিন বাসা থেকে ক্যামেরা হাতে মাঞ্জা মেরে বেরও হয়েছিলাম, কিন্তু হঠাত তুমুল ঝর বৃষ্টিতে ভিজে এক দৌড়ে বাড়ি ফিরে আসতে হয়েছিল। গত সপ্তাহে একদিন সুযোগ পাওয়াতে রওনা হলাম। যাবার কথা ছিলো আরেকজায়গায়, ৬০০ বছরের এক গীর্জার খোঁজে, যথেষ্ট তথ্য না পাওয়ায় ভাবলাম বালিয়াটি থেকে ঘুরে আসা যাক।

মেঘলা দিন। হঠাত চাঁদি ফাটানো রৌদ্র পড়ে, পড় মুহুর্তেই বৃষ্টি। জায়গাটা ঢাকার খুব কাছে, মানিকগঞ্জ জেলায় এটুকুই জানতাম। তাই জনৈক বড় ভাইকে ফোন দিয়েছিলাম। উনি কি বললেন আর আমি কি শুনলাম জানিনা। ভুল করে কালামপুর নামের এক জায়গায় নেমে গেছি। নামার পড়ে শুনলাম এখান থেকে অনেক অনেক দূরে। রিক্সা নেবার চেষ্টা করলাম, প্রথম রিক্সাওয়ালা জানালো রিক্সায় যেতে পারেন কিন্তু যেতে যেতে ৪/৫ ঘন্টা লাগবে রিক্সায়। যাই হোক একটা সিএনজি পাওয়াতে রক্ষা। চমতকার গ্রামের রাস্তা দিয়ে ক্ষেত খামারের ভিতর দিয়ে আঁকা বাঁকা রাস্তা। বাসে গেলে এই মজাটা হতো না। ভাগ্যিস ভুল করে উলটা পালটা জায়গায় নেমে গিয়েছিলাম।

বাইল্যা বলে এক জায়গায় এসে দেখি ব্রিজ ভাঙ্গা কিংবা বানানোর কাজ চলছে। বিকল্প রাস্তাটা একটা বাসার ঘরের ভিতর দিয়ে চলে গেছে। যাই হোক, পথটা আমার কাছে অনেক মজার হলেও বিস্তারিত বর্ননা দিয়ে আর বোর করবো না। বালিয়াটি জমিদার বাড়িকে স্থানীয়রা বলে সাহেব বাড়ী। আমার সঙ্গিনী জানালো সে ছোট বেলায় এখানে এসেছিল, মেলায়, এখন বড় হয়ে ভুলে গেছে। কোথায় মেলা, শুন্য পুরী খাঁ খাঁ করছে। বিশাল রাজপ্রাসাদ। গেটে ভয়ঙ্কর দর্শন কয়েকটা সিংহমুর্তি। সিংহ দরজা আর কি। ভিতরে জীর্ন অনেক পুরাতন কয়েকটা দালান। প্রত্নত্বত্তের ত্বাত্তিক অতি বুদ্ধিমান কর্মকর্তারা মাঝের একটা দালানকে মেরামতের নাম করে সাদা রঙ করে মুখে চুনকালি লেপে দিয়েছে। লাল বাকী দালানগুলোর মাঝে এটাকে লাগছে ক্লাউনের মতো। বাংলাদেশের সরকারী প্রত্নত্বাত্তিকরা সবসময়ই বেশী বুদ্ধিমান হন, প্রত্নত্বাত্তক দালানগুলো মেরামতের কাজ আসলে প্রথমেই তারা লাল রঙ মুছে সাদা ডিস্টেম্পার করে দিতে বিশেষ পছন্দ করেন। উদাহরন স্বরুপ বলে রাখি মোহাম্মদপুরে মোগল আমলের খুব চমতকার একটা মসজিদ ছিলো। (ধানমন্ডির সাতগম্বুজ মসজিদের মতো অনেকটা একই ডিজাইনের)। একটা মাদ্রাসা মসজিদের সাথে লাগোয়া। মুসুল্লীদের নামায পড়তে খুব সমস্যা হয় দেখে মসজিদ মেরামতে হাত দেয়া হলো, স্বভাবতই প্রথমেই দেয়ালের মোগল স্থাপত্যকলার লাল ইটের ১২টা বাজিয়ে সাদা রঙ করে দেয়া হলো, আর মোগলদের লাল ইট গুলো ভেঙ্গে গুড়ো গুড়ো করে খোয়া বানিয়ে রাস্তা ঢালাইয়ের কাজে লাগানো হলো।
কালামপুরে এক দোকানদার বলছিলো, একটু সাবধানে থাকবেন। জায়গাটা বেশ নির্জন, ভিতরে মাঝে মাঝে হিরুইঞ্চিরা আড্ডা মারে। সাথে সাথে পাশে আরেকজন বললো, মোটেই না। খুব ভালো জায়গা। সেই দোকানদার নিজেকে শুধরে নিয়ে বলেছিলো, না না হিরুইঞ্চিরা মাঝে মাঝে আড্ডা মারে, তবে সাবধান থাকতে সমস্যা কই। ব্যাপারটা খুব গোলমেলে লাগলো। ভিতরে ঢুকে দেখি একদম শুন্য পুরী। কাক পক্ষী নেই। বিশাল শুন্য প্রাসাদে একা একা অতৃপ্ত আত্মার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি। হঠাত প্রায় ধ্বসে পড়া এক দালানের ভেতরে দেখি শ্যুটিং হচ্ছে। ট্রাভেল শো এর একটা প্রোগ্রামের সুন্দরী উপস্থাপিকা একটা ইটের স্তুপের উপরে উঠে কি জানি বলার চেষ্টা করছে আর বার বার ভুল করছে। পরিচালক তাকে দিচ্ছে রাম ধমক আর সেই মেয়ে কাঁদো কাঁদো চেহারায় এদিক ওদিক তাকায়। রেডী বলতেই আবার কান্না গিলে ফেলে হাসি হাসি মুখে কি জানি বলার চেষ্টা করছে।
শুটিং পার্টিকে বিরক্ত না করার জন্যে পিছের পুকুর ঘাটে চলে এলাম। বিশাল বিশাল সব ক্ষয়ে যাওয়া দালান। প্রতিটি দালান থেকেই সিড়ি নেমে এসেছে ঘাটের দিকে। দিঘির চারদিকে নারকেল বিথী। যখন জমিদারী শানশওকত ছিলো তখন দিঘীর জলে নিশ্চয় প্রাসাদের প্রতিফলন পড়ে অসাধারন আবহ তৈরি হতো। এখন সেটা মজে একদম লাল। পুকুর ঘাটে অনেকক্ষন চুপচাপ বসে থাকলাম। প্রায় ধ্বসে পড়া একটা দালানের জানালায় বসে থাকা এক জোড়া ঘুঘুকে ক্যামেরায় ধরার চেষ্টা করছিলাম এমন সময় লাল জামা পড়া এক মেয়ের ছায়া দেখলাম বলে মনে হলো। আঁতকে উঠলাম, এই দুপুর বেলায় অতৃপ্ত আত্মা বেরুলো নাকি? একটু পড়ে ভুল বুঝতে পারলাম। এটা ভুত টুত নয়। আসলেই একটা মেয়ে ঘুরতে এসে দালানের ভেতর থেকে পুকুর ঘাট দেখার চেষ্টা করছিলো। রবীন্দ্রনাথের ক্ষুধিত পাষানের গল্পটা তখন মাথার ভেতরে একটা গোত্তা দিয়ে গেল।
অনেক অবান্তর কথা বার্তা বললাম। এখন একটু কাজের কথা বলি। ঢাকার গাবতলী থেকে সরাসরি বালিয়াটির বাস ছাড়ে। বাসের গায়ে গেইট লক বা সিটিং সার্ভিস অনেক গালভারী কথা লেখা থাকলেও আসলে সবগুলোই খাঁটি অকৃত্রিম চিটিং সার্ভিস। খাবারের দোকান বলতে কিছু ছালাদিয়া রেস্টুরেন্টে সিঙ্গারা -সমুসা পাওয়া যায়। যারা যত্র তত্র খেতে পারেননা, তারা সাথে খাওয়া নিয়ে যেতে পারেন। অনেক দিন পর ব্লগে নতুন পোস্ট দিলাম। তাই আর খামোখা কথা বাড়াই না। হ্যাপি ট্রাভেলিং।


ঘুমন্ত পুরীর রাজকন্যা। সোনার কাঠি, রুপার কাঠি, ডালিম কুমার, কংকাবতী আর ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমীর গল্প।


ঘুমন্ত প্রাসাদ।


আকাশ ভরা মেঘ। প্রাসাদটা আন্ডার এক্সপোজ হয়ে যাওয়ায় পুরো ছবিটাই মাঠে মারা গেছে।


শান বাধানো পুকুর ঘাটে।


বাবুই ডাকিয়া কহে, ওহে ভাই চড়াই, করো শিল্পের বড়াই। (কবিতাটা ভুলে গেছি)


এক শালিকে ঝগরা।


দুই শালিকে দোস্তি।












এই ছবিটা নিজের কাছে কেন জানি ভাল্লাগছে। ক্যান লাগলো বুঝি নাই। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29153903 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29153903 2010-05-13 00:02:14
ঃঃঃ এডভেঞ্চার পুবের পাহাড়৬ : নদীর নাম রেমাক্রিঃঃঃঃ

বাংলাদশের সদ্য আবিষ্কৃত (২০০৮) সর্বোচ্চ চুড়ার নাম তল্যাং ময় বা সাকা হাফং। সাকা হাফং শব্দের বাংলা অর্থ পুবের পাহাড়। এডভেঞ্চার পুবের পাহাড়ের আগের পর্ব।

১৩ডিসেম্বর রাত শেষে ১৪ইডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস। বমদের যেই গ্রামটাতে আমরা আছি নাম থাইদুং পাড়া। গ্রামের কারবারীর নাম শিপটন বম। বাংলা জানেন না জানার মতোই। গ্রামের বাকীদের বাংলা জ্ঞান আরো খারাপ। এর কারন গ্রামটার অবস্থান এত দুর্গম জায়গাতে যে বাংলাভাষী কারো এই গ্রামে আসার দরকার বা ইচ্ছা হয়না। শিপটন দা’ জানালেন আমরাই প্রথম বহিরাগত অ-পাহাড়ী যারা এই গ্রামে রাত কাটালো। এর আগে অবশ্য এক সাদা চামড়ার বিদেশী লোক আসছিলো, এই গ্রামে কিছুক্ষন যাত্রা বিরতী করেছিলো এবং অনেক ছবি তুলেছিলো। বুঝলাম কিংবদন্তি ব্রিটিশ এডভেঞ্চার জীন ফুলেনের কথা বলছে। এছাড়া আরেকটা দল (বিএমটিসি) শিম্পলাম্পতি পাড়ায় রাত্রী বাসের পরে সকাল বেলা এই গ্রামের সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলো।
রাতটা ভয়ঙ্কর গেছে। কৃষ্ণপক্ষের রাত, তাজিনডং ভেঙ্গে বিশাল দুর্গম রাস্তা এসে পথ হারিয়েছিলাম। জিপিএসে থাইদুং পাড়ার নাম গন্ধও ছিলো না। শুধু শিম্পলাম্পতির কারবারী আর শেরকর পাড়ার লালসিয়াম বমের কথায় ভরসা করে অন্ধকারে হাতরে হাতরে এমন জায়গায় এসেছি বাইরের জগতের কাছে যার অস্তিত্ব নাই। দিনের বেলাতেই হরীনের ডাক শুনছিলাম, ট্রেকের প্রথম রাতে জঙ্গলে পথ হারিয়ে এমন জায়গায় চলে গিয়েছিলাম যার চারিদিকে ভাল্লুকের তাজা পায়েরছাপ, একটু পর পরেই স্বগর্জনে নিজেদের রাজসিক অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিলো। রাতে আমার অনেক জ্বর এসেছিল। ম্যালেরিয়ার এলাকা, ভয় পেয়েছিলাম বেশ। কিছুই খেতে পারিনি।
সকালে শরীর বেশ ফ্রেস লাগছিলো। শিপটন দা দৌরা দৌরি করে কোত্থেকে যেন এক গাদা পাকা পেঁপে, পাহাড়ী বুনো কমলা, মারফা (একধরনের পাহড়ী ফল, কাঁচা অবস্থায় শষার মতো, পাকা অবস্থায় কুমড়োর মতো) নিয়ে এলেন। নিমিষেই দ্রুত সেগুলো সাবাড় করেদিলাম, বাধা দেবার আগেই আবার ছুটলেন। বমদের অসাধারন আতিথ্য নতুন নয়। কিন্তু শিপটন দা’র কথা ভুলে যাওয়া অসম্ভব।
সকালে আমাদের প্রস্তুতী নিতে বেশ দেরী হয়ে গেল। আজকে আমরা মদকে ঢুকবো। মদক মোয়ালের অনেক উচুতে মেঘের সাথে মিতালী করা ত্রিপুরাদের গ্রাম শালুকিয়া পাড়া। বর্মা সীমান্তের একদম গা ঘেষে। যেতে হবে রেমাক্রি নদী ধরে। সীমান্তের এ অংশে আরাকান লিবারেশ আর্মির উৎপাত। র‌্যাবের মতো কালো পোষাক পড়ে হাতে কারবাইন আর হিংস্র শিকারী কুকুর নিয়ে রেমাক্রি দিয়ে বড় মদক, ইয়াংরাই পর্যন্ত প্রায় এদের যাতায়াত করতে দেখা যায়। পোশাকের কারনেই কালা বাহিনী নামে সবাই ডাকে। বার্মার একটা অংশের স্বাধীনতা ঘোষনা করে বার্মিজ আর্মির সাথে দির্ঘদিন ধরে লড়াই করছে, অস্ত্র আর রসদের কারনে কিডন্যাপিং, স্মাগলিং, ড্রাগ ডিলিংস (কুখ্যাত গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের সবচেয়ে অবাধ এলাকা) এদের খুব প্রিয় কাজ।স্থানীয়দের স্বগোত্রীয় হওয়ায় ঘাটায় না সহজে, কিন্তু বাঙ্গালীদের জন্যে এরা আতঙ্ক। উপস্থিতি বাড়লে বাংলাদেশ আর্মি ধাওয়া দেয়, ওদিকে বার্মিজ আর্মির সাথে নিত্য লড়াই, এদিকে মিজো বা অন্যান্য বার্মিজ বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপদের সাথেও গোলাগুলি হয়। রেমাক্রি থেকে বড় মদক ওদের কাছে বেশ আস্থার একটা এস্কেপ রুট।

বিদায় থাইদুং পাড়া। শিপটন দা'র বাচ্চা কাচ্চারা।


থাইদুং পাড়া'কে বাই বাই জানালাম।


পুরো এলাকা ভর্তি হরীনের ফাঁদ। বনের মাঝে আলম ভাই আর লালভান।

শিপটন দা তার এক ভাতিজাকে সাথে দিলেন পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে। ১৮থেকে ২০এর মধ্যে বয়স, চটপটে সুগঠিত কিশোর ললভান বম। সে এই গ্রামের না। থানছিতে মিশনারী স্কুলে বাংলায় পড়াশুনা করেছে। খুবই মিশুক। লালভানের সাথে আমরা ফের পথে নামলাম।
বিশাল অবারিত বনের ভেতরে খুবই ছোট থাইদুং পাড়া গ্রামটাকে খুবই ভালো লেগে গিয়েছিলো। বেরুবার সময় শিপটন দা’র পরিবার বিদায় দিল। গ্রামের বদমাশ কুকুর গুলো (এগুলো প্রায় সবই শিকারের কাজে লাগে, তাই এদের ধাওয়া খাওয়া মোটেই আনন্দের ব্যাপার না) লেজ নেড়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে দিল। গতরাতের উৎপাতের অপরাধ ক্ষমা করে দিলাম। গ্রামে প্রচুর সাদা শুকর চোখে পড়লো।এগুলো আমাদের দেশে হয়না। শুনলাম বাংলাদেশের কাছের হাটের চেয়ে বার্মার হাট কাছে হওয়ায় ওরা ওখান থেকেই গবাদী পশু কিনে।
কিছুটা পথ আকা বাঁকা হেটে আমরা হঠাত ধপ করে নেমে গেলাম একটা ঝিরিতে। চারপাশে প্রচুর পাথর আর তার মাঝে একচিলতে ঠান্ডা পানি টলটল করে বয়ে যাচ্ছে। আসে পাশে জঙ্গল এত ঘন যে দিনমানেই অন্ধকার। ভেজা স্যাত স্যাতে পরিবেশ। জোঁকের আদর্শ পরিবেশ। ডিসেম্বরে জোঁক আর সাপ থাকেনা, অথচ ঝিরিতে ঢুকতে না ঢুকতেই অনেকগুলো জোঁক ছ্যাকা দিয়ে ফেলতে হলো গা থেকে। প্রচুর বুনো জন্তুর পানি খাবার জায়গা এটা বুঝতে দেরী হলো না। তাছাড়া আসে পাশে প্রচুর হরীনের ফাঁদ গ্রামের লোকেরা ফিট করেছে।
ঝিরির নুড়ি পাথর ভর্তি হিম শিতল পানিতে পা ডুবিয়ে আমরা হাটা শুরু করলাম লালভানের পিছু পিছু। ঝিরির পথ বরাবরই আকর্ষনীয়। কিন্তু উল্লেখ করার মতোই কিছুই হয়নি। বড় বড় পাথরে ফাঁক দিয়ে অলস সাপের মতো এঁকে বেঁকে হঠাত এসে নামলাম রেমাক্রি নদীর পাড়ে।
দুই ধারে সাদা চকচকে বালু, তার পরে একটু পরে পরে আদা বা এধরনের ক্ষেত, তার পরে আকাশ ছোঁয়া সব পাহাড় ভর্তি ঘন কালচে সবুজ বন, আর সেই বনের ফাঁক দিয়ে শীতের সুর্যের আলোকচ্ছটা এসে পরছে রেমাক্রির পাথুরে বুকে লাফিয়ে চলা সাদা পানিতে। ডিসেম্বর মাস। নদীতে পানি সবচেয়ে কম থাকার কথা। সাঙ্গুতেই নৌকা চলতে কষ্ট হয়। কিন্তু এখানে পানি যেন যৌবনদীপ্ত উচ্ছল। বিশাল বিশাল সব পাথরের মধ্যে দিয়ে লাফিয়ে কুদিয়ে নামছে। প্রচন্ড স্রোতের তোড়ে পানি সবসময় সাদা। খুব সহজেই চমতকার হোয়াইট ওয়াটার রেফটিং করা যাবে।
আমরা নদীতে নেমে গেলাম। পাহাড়ী নদী। কোন ঠিক ঠিকানা নাই। কোথাও হাটু পানি, পরক্ষনই গলা পানি। খুজে পেতে যেই জায়গা দিয়ে আমরা পার হলাম তাতে পেট আর বুকের মাঝা মাঝি পর্যন্ত ডুবলো। ব্যাকপেকের আদ্ধেকই পানির নিচে।
রেমাক্রি’কে নদী বলা যায় কি না সন্দেহ আছে অনেকেরই। লম্বায় খুবই ছোট। তামলো পাড়ার কাছে ৩ঝর্নার উৎস থেকে শুরু। রেমাক্রি (ইউনিয়নের নাম) আর মদকের অনেক গুলো ঝিরি, যার কিছু কিছু আবার এসেছে বার্মা সীমান্তের ওপার থেকে মিশে, ফুলে ফেপে বিশাল আকার নিয়েছে। আসার সময় সাঙ্গুতে দেখলাম পায়ের পাতা ভেজানো পানি, আর এখানে জায়গায় জায়গায় গলা পানি। পাথরের ফাঁক গলে গলে আছড়ে পড়েছে মদকবাজারের কাছে সাঙ্গুতে।
মুরং দের একটা মেয়ে বাহিনী নেমেছে হাটু পানিতে পোলো জাল বিছিয়ে। সবচেয়ে ছোট জেলেনীর বয়স টেনেটুনে ৪আর সবচেয়ে সিনিয়র জন ৭০এর কোটা পেড়িয়ে গেছেন। পিচ্চি অবাক চোখে দেখছিলো আমাদের, তার অবাক চোখের ছবি তুললাম দূর থেকে। এই এলাকাটা বুঝি প্রজাপতীর স্বর্গ। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ হেন রঙ নেই প্রজাপতীদের, সংখ্যায় অসংখ্য। একটা নীল অদ্ভুত প্রজাপতীর ম্যাক্রো তুলতে গিয়ে টাশকি খেলাম, পাখা গুলো প্রজাপতীর মতো কিন্তু শরীরটা একদম গঙ্গা ফরিং এর। এমন আজব পতঙ্গ এই প্রথম দেখলাম।
লালভান বেশ জাত্যাভিমানী ছেলে। তখন থেকে তার কথার বক্তব্য বম’রা পরিচ্ছন্ন, বমরা পরিশ্রমী আর সাহসী বম’রাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতী। রাস্তা খুব খারাপ দেখে কিছুক্ষন বকা দিলো, এগুলো ত্রিপুরাদের কাজ। এগুলো বম গ্রাম হলে দেখতেন রাস্তা কতো পরিচ্ছন্ন হতো। এরা নাকী রেমাক্রিতে পানি বাড়লে গ্রামে বসে থাকে ক’মাস। জঙ্গল কেটে যে বিকল্প রাস্তা বানাবে তাতেও আগ্রহ নেই।
একটু পড়ে আমরা আরেকটা গ্রাম পেলাম। ত্রিপুরা’দের একটা গ্রাম তাকরাই পাড়া। গ্রামে ঢোকার ইচ্ছে ছিলো না। নদী থেকে বেশ উচুতে গ্রামটা। কিন্তু নদীর পাড়েই এক বয়স্ক লোক কালো কোট আর সাদা নেংটি পড়ে বাঁশের পাইপে তামাক টানছিলো। বহিরাগত দেখেই অতিথী সৎকারে টানা টানি শুরু করলেন। তাকরাই পাড়ার কারবারীর নাম দোনারাং ত্রিপুরা। কারবারীর নামে গ্রামটা দোনারাং পাড়া নামেও পরিচিত। নদীর পাড় থেকে বেশ উচুতে। আমাদের গ্রামে ঢোকার বিশেষ ইচ্ছে ছিলোনা। কিন্তু পাড়েই এক লোক গায়ে কালো কোট আর কোমড়ে সাদা নেংটি পড়ে হুক্কা টানছিলো। আমাদের হাত ধরে প্রায় হিরহির করে গ্রামে নিয়ে গেল। আতিথিয়তার জোর উপেক্ষা করা কঠিন। দোনারাং কারবারী নিজেই বেড়িয়ে এলেন অতিথি সতকারে। বেচারা এই দুপুরেও বদ্ধ মাতাল। সোজা হয়ে দাড়াতেই পাড়ছেননা



রেমাক্রিতে যেন প্রজাপতীর মেলা।


রেমাক্রির বুকে।


রুপসী কন্যা রেমাক্রি।


মুরং (ম্রো) মেয়েরা মাছ ধরছে রেমাক্রি'তে



জুমের সিজন শেষ। গ্রামবাসীর হাতে অফুরন্ত সময়। গ্রামের প্রথম বাড়িটাতে দিনের বেলায় সবাই তইয়া ভর্তি দো-চোয়ানী নিয়ে বসেছি। আর গ্রামের ছেলে বুড়ো, পুরুষ মহিলা সবাই আয়েশ করে খেয়ে বদ্ধ মাতাল হয়ে বসে আছে। আমাদের খাবার জন্যে আবার জোড়াজুড়ি শুরু করে দিল।
তাকরাই পাড়ার কারবারী দোনারাং ত্রিপুরা খুবই রিকোয়েস্ট করলেন তাদের গ্রামে থেকে যাবার। দুই পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে পুব আকাশে বুক চিতিয়ে থাকা সাকা হাফংকে চিনিয়ে বললেন, কাল সকালে আপনাদের ওখানে ওঠার জন্যে যা করা লাগে সব করবো। কিন্তু আমরা বেশ জোরালো ভাবেই জানালাম আমাদের প্ল্যান চুড়াটার যতো কাছে যাওয়া সম্ভব এগিয়ে যেতে। আমরা শালুকীয়া পাড়াতেই থাকবো। দোনারাং দা জানালেন, ঠিক আছে, কিন্তু যখন কোন দরকার হবে অবশ্যই যেন তাকে জানাই। দোনারাং দা শর্ট কাট পথে জোর করে নিয়ে যাবেন। তার শর্ট-কাট রাস্তাটা শর্ট হলেও বিস্তর ওঠা নামার, আমাদের কোন ইচ্ছাই ছিলো না। কিন্তু তিনি বদ্ধ মাতাল কোন কথাই শুনবেন না। পরে ট্রেকে উঠে দেখি অদ্ভুত সুন্দর চুম্বকই ফলস পিছে ফেলে এসেছি। অনেক দূর থেকে পানির গর্জন শোনা যাচ্ছে, কিন্তু পিছে গিয়ে দেখা হলো না। আসার সময় চুম্বকই মিস হয়নি। কিন্তু ক্যামেরার চার্জ শেষ।
নদীর ওপারে যেতে হলো আরেকবার। এদিকে ভয়ঙ্কর জঙ্গল। মানুষ চলাচল কম হওয়ায় হাটাই মুশকিল। আরেকবার নদী পার হতেই একটা চমতকার ৩ধাপি ঝর্না পেলাম। জিপিএসএ মার্ক করার সময় খেয়াল করলাম ঝর্নার সামনে বাঁশের ফ্রেমে কিছু ফিতে জড়ানো। লালভান জানালো এটা নাকি পবিত্র। এদিকে এখনো কিছু পাহাড়ী গ্রাম আছে যারা ধর্মান্তরিত হয়নি, প্রাচী ধর্ম পালন করে। তাদের কাছে এটা নাকি অনেক পবিত্র। পিছে খুব সুন্দর নাকি একটা গল্প আছে, যা সে ভুলে গেছে।
আর সামান্য এগুতেই বামে একটা গিরিপথ পেলাম। বিশাল বিশাল সব শ্যাওলা ধরা পিচ্ছিল পাথরের আড্ডা, অনেক উচু দুই পাহাড়ের মাঝে তাই সূর্যের আলো না ঢুকে সব সময় পিচ্ছিল। তার উপরে তিব্র গতীতে ঝিরির পানি নামছে। লালভান বললো ঝিরিটা নাকি বার্মার পিক্ষং পাড়া গ্রামের কাছ থেকে এসেছে। এদিকে উপরে কোথাও চাকমাদের একটা গ্রাম আছে। বান্দারবানে চাকমা’রা একদম নেই বললেই চলে। এদিকে চাকমা গ্রাম খুবই বিরল ব্যাপার। আর শান্তিবাহিনীর বিদ্রোহের সময় এদিকে ওদের উতপাত খুবই বেশী ছিল। এত গভীরে আর এত ভয়ঙ্কর দুর্গম যে সরকারী বাহিনীর আক্রমন হতোনা বললেই চলে। আশে পাশে কোথাও একটা পরিত্যাক্ত হেলিপ্যাডও নাকি আছে। শান্তিবাহিনীর গেরীলারা নাকি সেটা ব্যাবহার করতো। ঝিরি’তে গল্পের মাঝেই হঠাত খালি গায়ে এক হাড় জিড়ে লোক পাহাড় থেকে নেমে আসলো। আলম ভাই সাথে সাথে চিনে ফেললেন। এর নাম মরা ত্রিপুরা। মরা ন্যাচার ক্লাবের সাথে প্রথম সাকা হাফং অভিযানে কাটার হিসাবে ছিল। মরাও আলম ভাইকে চিনে খুব খুশী। জানালো মরার ছেলের ভয়ঙ্কর ম্যালারিয়া। সে ৪দিনের রাস্তা ভেঙ্গে এখন যাবে থানছি বাজারে, প্যারাসিটামল কিনতে। আমরা সাথে ম্যালারিয়ার ওষুধ এনেছিলাম গ্রামের লোকেদের জন্যে। ওকে কষ্ট করে এতটা পথ যেতে হবেনা যেনে খুশী হলো। মড়ার সাথে পাহাড় বাওয়া শুরু হলো। প্রায় হাজারখানেক ফুট উপরে ওদের গ্রাম শালুকীয়া পাড়া। যেতে যেতেই মড়ার সাথে আমরা কথা পাকা করে রাখলাম। আগামীকাল ১৫ই ডিসেম্বর আমরা যাব সাকা হাফং (তল্যাং ময়/মদক তোয়াং) সামিট করতে। যেহেতু আমরা ছোট দল, কাটার আর গাইডের বিশাল দলের প্রয়োজন নেই। শুধু ট্রেইল চেনাতে একজন গাইড হিসাবে মরা একাই যথেষ্ট। গতবার মরা যেই টাকা পেয়েছে, সে টাকার চেয়ে কিছু বেশী অফার করলাম। মরা সানন্দে রাজী হলো।
উঠছি তো উঠছি উঠা শেষ হয়না। এটাতে কোন উচু নিচু নেই। নিরবিচ্ছিন্ন উঠা। জিপিএসে হিসাব করা ছিল, রেমাক্রি ধরে টানা ১০০০ফুট উঠতে হবে অর্থাৎ ঢাকা চিটাগাং হাইওয়ে থেকে চন্দ্রনাথে চুড়া পর্যন্ত হাইটে। উঠতে উঠতে যখন বিরক্ত ধরে গেল তখন চুড়ায় একখন্ড সমতলে চোখে পড়লো বড় একটা মাঠ আর মাঠের ওপাশে ছিমছাম সুন্দর গ্রাম শালুকিয়া পাড়া। সিগারেটের সংগ্রহ শেষ। আমার ইমার্জেন্সি একটা স্টক আছে। তার পরেও এক প্যাকেট বার্মিজ বিড়ি কিনলাম। জ্বালাতেই পুরো মুখ তিতা হয়ে গেল।
মরার বাসায় ব্যাক প্যাক খুলে চিত হয়ে পড়তেই সারা গ্রাম ভেঙ্গে পড়লো আমাদের দেখতে। খুবই কিউট একটা বাচ্চা দেখলাম। নলীরাম ত্রিপুরার মেয়ে। নলীরাম গ্রামের স্কুল টিচার, এবং ব্যাবসায়ী। সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যাক্তি। বাচ্চার অলঙ্কারেই বোঝা যায়। বাবা-মায়ের মতো অসম্ভব রুপ নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে।
মরার ছেলের গায়ে হাত দিয়ে দেখি অসম্ভব জ্বর। গা পুরে যাচ্ছে। তাকে ওষুধ পত্র দিলাম আমরা। সে একটু বেটার হলে কাদা মাখা কাপড় চোপড় ছেড়ে বেরুলাম ঝর্নায় গোসল সাড়তে। তখনো বুঝতে পারি নি, কি বিরাট ভিলেজ পলিটিক্সএর শিকার হতে যাচ্ছি।


মাছ ধরতে শিশু কিবা বৃদ্ধা সবাই সমান ব্যাস্ত। বাচ্চাটার ফেশিয়াল এক্সপ্রেশানটা দারুন লাগছে, সম্ভবত তার ছোট্ট জীবনের অভিজ্ঞতায় প্রথম সমতলবাসী দেখা।


মুরং কিশোরের দল। তাদের মতই নির্মল রেমাক্রির পাশে।


ঘন অরন্য ভেদ করে রেমাক্রি। এই বন কেটে কেটে পাহাড় চড়া খুবই বিরক্তিকর কাজ গুলোর একটা।


ইচ্ছে হলো একরকমের গঙ্গা ফরিং, অনিচ্ছেতেও লাফায় শুধু তিরিং বিরিং।


এই ঝর্নাটা নিয়ে নাকি আদি ধর্মানুসারীদের ইন্টারেস্টিং কিছু ধর্মাচরন আছে। কিন্তু ইতিহাসটা জানা হলো না। গুগল ম্যাপে আমরা নামকরন করলাম ৩ ধাপি ঝর্না বলে।






তাকরাই পাড়া থেকে মদং মোয়ালের ভিউ।


তাকরাই পাড়ার দোনারাং কারবারীর মা।


তাকরাই পাড়ায় দো-চোয়ানীর আড্ডা।


তাকরাই পাড়ার বালিকা। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29132617 http://www.somewhereinblog.net/blog/shoummo71/29132617 2010-04-11 02:05:29