somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাস্তায় যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ প্রাইভেট কার

০৬ ই জানুয়ারি, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাস্তায় যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ প্রাইভেট কার।

এই লেখাটি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক জনাব ড. মাহবুব-উন-নবীর ।


রাস্তার শত্রু প্রাইভেট কার । এখানে আমি প্রাইভেট কার বলতে বুঝাচ্ছি ব্যাক্তিগতভাবে ব্যবহৃত car, jeep, micro, pick-up, station wagen ইত্যাদি সবকিছুকে- চাই সেটা ক্রয়সূত্রে হোক বা ব্যবহারের অধিকার সূত্রে হোক, যেমন সরকারী যানবাহন কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য ।

পৃথিবীব্যপী গবেষনা ও অভিজ্ঞতার দ্বারা গেছে রাসত্দায় যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ প্রাইভেট কার ।

সকল প্রকার যানবাহনের মধ্যে প্রাইভেটকার রাস্তার সবচেয়ে বড় অপব্যবহারকারী ।

প্রাইভেট কারের জন্য যত সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়, ততই প্রাইভেট কারের সংখ্যা ও চলাচল বৃদ্ধি পাইতে থাকে । কাজেই, প্রাইভেট কারের কারনে যে যানজটের সৃষ্টি হয়, সুবিধা বৃদ্ধি করে সেই যানজট কখনও নিরসন করা যায় না । Los Angels, Houston, Bangkok ইত্যাদি শহর এই সত্যতা প্রমান করে ।

প্রাইভেট কারের চলাচল নিয়ন্ত্রন করা ব্যতীত কোন বড় শহরের রাস্তার যানজট নিরসন করা সম্ভব নয় । যানজট নিরসনের জন্য পৃথিবীর প্রায় সকল বড় শহরেই প্রাইভেট কার চলাচল অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রন করা হয় ।

প্রাইভেট কার রাস্তার উপর বহু সংখ্যক useless trip, generate করে ।যেমন, কোন পরিবারে একটি প্রাইভেট কার সকাল আটটায় বাচ্চাকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে আবার বাসায় ফিরে আসল ।এই ফিরে আসাটা একটি useless trip. এরপর সকাল নয়টায় সাহেবকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে আবার বাসায় ফিরে আসল । এই ফিরে আসাটা আর একটি useless trip. এরপর দশটার সময় মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নামিয়ে দিয়ে বাসায় ফিরে আসল । এই ফিরে আসাটা আর একটি useless trip হল ।

কাজেই দেখা যাচ্ছে যে তিনটি কাজ করার জন্য একটি প্রাইভেট কারকে ছয়টি ট্রিপ দিতে হয়েছে, অর্থাৎ ছয়বার রাস্তা ব্যবহার করতে হয়েছে । রিক্সা বা অন্য কোন transport হলে মাত্র তিনটি ট্রিপের প্রয়োজন হত অর্থাৎ তিনবার রাস্তা ব্যবহৃত হত ।

ঢাকার রাস্তায় সার্ভে করে দেখা গেছে প্রাইভেট কার যে সমস্ত ট্রিপ generate করে তার অন্তন ৪০ পার্সেন্ট useless trip.
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রাইভেট কার ব্যবহারকারী কোন গন্তব্যে পৌছার পর , তার কাজ সমাধা না হওয়া পর্যন্ত প্রাইভেট কারটিকে কোন নির্দিষ্ট জায়গায় পার্ক করে রাখা হয় । মনে করি কেহ প্রাইভেট কার নিয়ে নিউমার্কেটে বাজার করতে গিয়েছে এবং তার বাজার করতে একঘন্টা সময় লাগবে । এই একঘন্টা যাবৎ তার গাড়িটি রাস্তার উপর পার্কিং অবস্থায় থাকবে । এই জায়গায় অনত্দত দুটো রিক্সা দাড়াতে পারে । রিক্সা কোন ব্যস্ত এলাকায় পাঁচ মিনিটের বেশি দাড়িয়ে থাকে না । রিক্সা একজনকে বহন করে এনে নামিয়ে দিয়ে আর একজনকে উঠিয়ে নিয়ে চলে যায় । কাজেই দেখা যায় যে, একটি কার পার্কিং এর জায়াগায় প্রতি পাঁচমিনিটে দুটো রিক্সা চারজন লোককে সার্ভিস দিতে পারে এবং এক ঘন্টায় ৪৮ জন লোককে সার্ভিস দিতে পারে । অথচ প্রাইভেট কার এক ঘন্টা দাড়িয়ে থেকে মাত্র একজন লোককে সার্ভিস দিয়ে থাকে । কাজেই পার্কিং Space বিবেচনা করলে রিক্সা প্রাইভেট কারের চেয়ে অনত্দত: ৪৮গুন বেশী উপকার করে থাকে ।


প্রাইভেট কারের পার্কিং এর জন্য প্রায় ১৬০ বর্গফুট জায়গার দরকার হয় । হিসাব করে দেখা গেছে মতিঝিলে এই পরিমান (১৬০ বর্গফুট) জায়গার দাম অনত্দত: ২২ লক্ষ টাকা এবং নিউমার্কেটে অনত্দত: ১৫ লক্ষ টাকা । ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য জনগনের সম্পদ বিনামূল্যে ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া কোন যুক্তিতেই ন্যয়সঙ্গত হতে পারে না । এই সমস্ত এলাকায় প্রাইভেট কার পার্কিং এর জন্য অবশ্যই ন্যয়সঙ্গত হারে পার্কিং চার্জ আদায় করা উচিত ।

কতগুলো ট্রিপ আছে যে গুলোর জন্য বাস সার্ভিস উপযোগী নয় । যেমন , লাগেজ বা বোঝা নিয়ে লঞ্চঘাট, রেল ষ্টেশান বা বাস টার্মিনালে যাওয়া, অথবা তথা হইতে আসা , বাজার করে সওদা নিয়ে বাসায় ফিরা, রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া, বাচ্চাদের স্কুলে নেওয়া পরিবারসহ কোন অনুষ্ঠানে যোগদান করা, তাছাড়া বৃদ্ধ, বিকলাঙ্গ, শিশু ও রক্ষণশীল পরিবারের মহিলাদের যাতায়াত, ইত্যাদি । এই সমস্ত ট্রিপের জন্য প্রাইভেট কারের বিকল্প হল রিক্সা । রিক্সা যখন তখন যেখানে সেখানে পাওয়া যায় । কিন্তু ব্যপকভাবে প্রধান সড়কগুলোতে রিক্সা চলাচল বন্ধ করে দেওয়াতে জনসাধারনের যাতায়াত দু:সাধ্য হয়ে পড়েছে । ফলে, অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকেরাও এখন প্রাইভেট কার কিনতে বাধ্য হচ্ছে ।আগে উচ্চবিত্ত পরিবারে একটা প্রাইভেট কার হলেই চলত । কারন তাদেরও অনেক ট্রিপ রিক্সায়ই সমাধা হত । কিন্তু রিক্সা বন্ধ হওয়ার পর উচ্চবিত্ত পরিবার তিন/ চারটা প্রাইভেট কার রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
ফলে প্রাইভেট কারের সংখ্যা অতি দ্রুতগতিতে বাড়তেছে। প্রাইভেট কারের সংখ্যা যত বাড়বে, ঢাকার রাস্তা তত অচল হয়ে পড়বে ।

পুরান ঢাকা এলাকা ও ঢাকার অপরিকল্পিত এলাকার সরু রাস্তা সমূহ কার চলাচলের জন্য উপযোগী নয় । তাই পুরান ঢাকার ধনীব্যবসায়ীরা কখনও কার ক্রয় করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল না । কিন্তু রিক্সা বন্ধ করার কারনে তাদের যাতায়াত দু:সাধ্য হয়ে পড়েছে । ফলে, অনেক ধনী ব্যবসায়ী কার কিনে নিয়েছে । পুরান ঢাকার রাস্তায় যখন শুধু রিক্সা চলাচল করত, তখন বিশেষ কোন যানজট দেখা যেত না । কিন্তু এখন পুরান ঢাকার রাস্তায় প্রায়ই প্রাইভেট কার ঢুকে পড়ে, আর সাথে সাথে যানজট শুরু হয়ে যায় ।

পুরান ঢাকার যানজট বর্তমানে নিত্তনৈমিত্তিক ব্যপার হয়ে গিয়েছে ।
রিক্সার কারণে যানজট হলে, সেটা সহজেই নিরসন করা যায়, কারণ রিক্সা সহজেই খেদায়ে দেওয়া যায় । প্রাইভেট কারের কারণে যানজট হলে সেটা সহজে নিরসন করা যায় না । বিশেষ করে পার্কিং করা প্রাইভেট কার সহজে খেদান যায় না । প্রাইভেট কার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থান ত্যাগ করে না। প্রাইভেট কার খেদাতে হলে মন্ত্রীদেরকে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করতে হবে। তবে আশা করা যায় জনসাধারণ যদি প্রাইভেট কারের ব্যাপারে সচেতন হয়, তবে মন্ত্রীরাও তাঁদের দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন হবেন ।

প্রাইভেট কারের চলাচল নিয়ন্ত্রন করা ব্যতীত কোন বড় শহরের যানজট নিরসন করা সম্ভব নয় । যানজট নিরসনের জন্য পৃথিবীর প্রায় সকল বড় শহরেই প্রাইভেট কার চলাচল অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রন করা হয় ।
প্রাইভেট কার চলাচল নিয়ন্ত্রন করার প্রধান উপায় হল প্রাইভেট কারের পার্কিং নিয়ন্ত্রন করা। যেমন-

Arterial road এর উপর দিয়ে প্রাইভেট কার শুধু চলতে পারবে, কিন্তু সিগনাল ব্যতীত Arterial রোডের উপর কোন প্রাইভেট কার থামতে পারবেনা । যদি থামতে হয় তবে Arteria রোড হতে বের হয়ে যেতে হবে ।


Arterial রোডের পাশে ও ফুটপথে প্রাইভেট কার পার্কিং সমপূর্ণ নিষিদ্ধ করা।

শহরের ভিতরে শপিং সেন্টার ও কাঁচাবাজারের আশেপাশে প্রাইভেট কার পার্কিং সমপূর্ণ নিষিদ্ধ করা।

শহরের ভিতরে যে কোন public এলাকায় প্রাইভেট কার পার্কিং এর জন্য উপযুক্ত হারে পার্কিং চার্জ আদায় করতে হবে ।

সাধারনের সকল প্রকার public transport যথা বাস, ট্রাক, টেক্সি-ক্যাব, অটোরিক্সা, রিক্সা ইত্যাদি নির্দিষ্ট public space এ ফ্রি- পার্কিং এর সুযোগ পাবে ।

পার্কিং সংক্রান্ত নিয়মনীতি অনেক ব্যপক । এই অল্প পরিসরে পার্কিং সংক্রান্ত সকল নিয়মনীতি ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। এখানে কয়েকটি শুধুমাত্র উদাহরন হিসাবে উল্লেখ করা হল ।


ড. মাহবুব-উন-নবী
অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×