somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পশ্চিমা গণমাধ্যমের চতুরতা এবং আমাদের আহাম্মকিতা

৩০ শে এপ্রিল, ২০০৮ রাত ৯:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(তৌফিক আহমেদ-র ‘রান্দ-পল’ নামক পোস্টটি (Click This Link)এ লেখার অনুপ্রেরণা। পশ্চিমা গণমাধ্যমের চতুরতা সম্পর্কে আমরা সবাই কম-বেশি জানি। এ লেখাটি এ চতুরতাকে আরো ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে বলে আশা করি।)

১৯৯০ সালের ঘটনা। ইরাক কর্তৃক কুয়েত দখলের পর-পরই দুনিয়া-ঠকানো এক মিডিয়া নাটক মঞ্চায়ন করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র-প্রবাসী কিছু কুয়েতি ধনকুবের। হিল এন্ড নলটন নামে একটি বিজ্ঞাপনি সংস্থাকে কয়েক মিলিয়ন ডলার দিয়ে ভাড়া করেছিলেন তারা একটি বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য। কী? সারা পৃথিবীকে জানাতে হবে, সাদ্দাম ও তার ইরাকি সেনারা মানুষরূপী শয়তান। আর সেই সঙ্গে বিশ্ব জনমত একতরফাভাবে কুয়েতের অনুকুলে নিয়ে আসতে হবে। এ কাজ সফল করতে পৃথিবী জুড়ে ১২ টি দপ্তর খুলেছিল রবার্ট গ্রের হিল এন্ড নলটন। উল্লেখ্য, গ্রের সঙ্গে কুয়েতি ধনকুবেরদের এই গোপন চুক্তিটি ছিল সে যাবত কালের সবচেয়ে বড় অঙ্কের প্রচার চুক্তি। এবার দেখা যাক, কীভাবে সেই উদ্দেশ্য হাসিল হল। একই বছর নভেম্বর মাসে মার্কিন কংগ্রেসের সামনে ৬ জন প্রত্যদর্শীসহ এক পনেরো বছরের তরুনীকে হাজির করেছিল হিল এন্ড নলটন;- এক মর্মান্তিক ঘটনার বিবরণ শোনানোর জন্য। নিভিরাহ আল সাভা নামের সেই কুয়েতি বালিকা নিজেকে কুয়েতের আল আদান হাসপাতালের স্বেচ্ছাসেবিকা দাবি করে ইরাকি সৈন্যদের সংঘটিত এক পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের কাহিনী বর্ণনা করেছিল সেদিন। মেয়েটি বলেছিল, যে-রাতে ইরাকি সৈন্যরা কুয়েত দখল করে নেয়, সে রাতেই ঐ পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটতে দেখেছে সে তার হাসপাতালে। কী সেই ঘটনা?- ইনকিউবেটর থেকে কচি কচি শিশুদের ঠ্যাং ধরে তুলে মেঝেতে আছাড় দিয়ে মেরেছে সাদ্দাম হোসেনের সৈন্যরা। নিভিরাহ যখন এই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে, পৃথিবীর মানুষ তখন রাগে-ক্ষোভে ঘৃণায় ফুঁসছে। আর সেই অবসরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের বাবা সাবেক বুশ কংগ্রেসের অনুমতি নিয়ে ইরাক আক্রমনের সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে ফেলেছেন।
কিন্তু আসল ঘটনা কি তা-ই, যা হিল এন্ড নলটন নিভিরাহ আল সাবাহকে দিয়ে বলিয়ে নিয়েছিল? কিংবা মার্কিন কংগ্রেসের সেনেটররা যা শুনে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের রায় দিয়েছিলেন? এবার দেখা যাক, সিএনএন যখন এই সংবাদ সম্প্রচার করছে, আল সাদান হাসপাতালে তখন কী হচ্ছে। ফিলিপিনো নার্স ম্যাগি ওকেন সিএনএন সম্প্রচারিত সংবাদে বিস্মিত! কারণ, ইরাকি সেনাবাহিনী কর্তৃক কুয়েত দখলের দিন আল আদান হাসপাতালেই ডিউটিরত ছিলেন তিনি। নিভিরাহ আল সাবাহ নামে কোন স্বোচ্ছাসেবিকাকে দেখা দূরে থাক, তার নামও কোনদিনও শোনেননি ম্যাগি। এবং ঐদিন সেরকম কোন ঘটনাই তার হাসপাতালে ঘটেনি। তাই চিৎকার করে হাসপাতালের অন্যান্য সহকর্মীকে টিভির সামনে জড়ো করেছিলেন ম্যাগি ওকেন। তারাও সমান বিস্মিত! কিন্তু ততণে মার্কিন কংগ্রেস বাবা বুশকে ইরাকের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর অনুমতি দিতে এক পায়ে খাড়া। গোটা বিশ্বও তখন জানছে, সাদ্দাম হোসেন একজন মানুষরুপী শয়তান।
গার্ডিয়ান পত্রিকা ম্যাগি ওকেনের সাক্ষৎকার প্রকাশ করে প্রকৃত ঘটনা উন্মোচিত করলে পুরু ষড়যন্ত্রই ফাঁস হয়ে যায়। নিভিরাহ নামের যে মেয়েটি পৈশাচিক ঘটনার মিথ্যা স্বাী দিয়েছিল, তার পরিচয়ও উদঘাটন করে গার্ডিয়ান । মেয়েটি আর কেউ নয়, যুক্তরাস্ট্রে নিযুক্ত কুয়েতি রাস্ট্রদূতের কন্যা। গার্ডিয়ান সূত্রে আমরা আরো জেনেছি, নিভিরাহরার পাশাপাশি বাবা বুশের যে বিমর্ষ মুখটি সেদিন দেখা গিয়েছিল সিএনএন- এর অনুষ্ঠানে, তাও ছিল একজন পাকা অভিনেতার মুখ।
গ্রিক পুরাণে মিডিয়া হচ্ছে কলটিজের রাজা ঈটিজের কন্যা। কূটস্বভাবী মিডিয়া জাদুবিদ্যা জানত এবং হত্যা ও ষড়যন্ত্রে সেই বিদ্যা প্রয়োগ করত। নিজের দুই পুত্রকেও সে হত্যা করতে দ্বিধা করেনি। পুরাণের মিডিয়া সঙ্গে সিএনএন- এর মতো ‘গণমাধ্যম’গুলোর কোনও পার্থক্য নেই।
পুরো লেখাটি আবু হাসান শাহরিয়ার-র সমাত্মজীবনী বইয়ের ১২-১৩ পৃষ্টা থেকে নেয়া হয়েছে।
ইরাক আক্রমনের সময়ও আমরা পশ্চিমা গনমাধ্যমের এ চতুরতার প্রমাণ পেয়েছি। মানববিধ্বংসী অস্ত্রের ধুয়া তুলে তারা সাদ্দাম হোসেনকে মানব জাতির একমাত্র শত্র“ বলে দাঁড় করিয়েছিল। পরে তাদের এ চতুরতাও ধরা পড়ে। কিন্তু চাতুর্যের গুণে বিশ্বের অনেকেই তখন তাদের কথা বিশ্বাস করেছিল। শুধু বিশ্বাস নয়, একইসাথে ইরাক আক্রমণকেও তারা সমর্থন দিতে বাধ্য হয়েছিল। এখনো চলছে মিডিয়ার এ চতুরতা। মার্কিন বাহিনী এখন ইরাক ছেড়ে যেতে চাচ্ছে না। এজন্য আক্রমন হালাল করার মতো তাদের অবস্থানটাও হালাল করার প্রয়োজন পড়েছে। আর তাই গণমাধ্যমের মাধ্যমে একের পর এক নাটক মঞ্চায়ন করে চলেছে তারা। আর আগের মতো আমরাও তা বিশ্বাস করছি আহাম্মকের মতো।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মে, ২০০৮ সকাল ১১:৩২
১৫টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×