ব্লগারদের সফল এই ট্যুরটার জন্য প্রথমেই ধন্যবাদ এই পোস্টে শ।মসীর, আমড়া কাঠের ঢেকি, নীল ভোমরা, সায়েম মুন আর ডলুপূত্রের মূল্যবান কমেন্টের জন্য। "ব্লগারদের ট্যুর" বলছি এই কারনে আমাদের ৭ জনের মধ্যে ৪ জনই সামহোয়ারইনে ২ বছরের বেশি সময় ধরে নিয়মিত লিখে!!
ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ রাত ১০টার ট্রেনে চড়ে আমরা ৭ জন সিলেট পৌছাই সকাল ৭টায়। মাঝে ঢাকায় ১ ঘন্টার ট্রেন ডিলে ছিলো। আর শীতকালে রাতে ট্রেন জার্নি বড়ই খারাপ। ঠান্ডায় ঘুমাতে পারবেন না, আর রেলের লোকেরা সারারাত বগির সবগুলা বাতি জ্বালিয়ে রাখে।
মাঝরাতে যখন দূরের কামরায় চা খেতে গেলাম, দেখলাম এর মাঝেই মেঝেতে অনেক মানুষ কুকড়িয়ে শুয়ে আছে। গায়ে সাধারন জামা ছাড়া কিছু নেই। কিছু বৃদ্ধকে দেখলাম আটসাট হয়ে বসে শুন্য দৃষ্টিতে আমাকে দেখতেছিলো। শীত লাগাটা তখন অনেকটাই কমে গেছিলো।
সিলেট স্টেশন নেমেই হাটতে হাটতে মাজারের দিকে চলছিলাম। অনেকদূর, ২০ টাকা রিকশা ভাড়া। কিন্তু পথের মাঝে যে কিন ব্রিজ পড়বে, সেটা দেখার জন্য হেটে যাওয়াটাই মনে ধরলো।ভোরের গাঢ় কুয়াশায় ব্রিজের উপর দিয়ে হেটে আসলাম। কুয়াশার জন্য ব্রিজ থেকে আসেপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। এ এক "লর্ড অফ দ্যা রিংস" টাইপো অনূভতি।


এটা নেট থেকে নেয়া।ব্রিজের নিচে দুই পাশে অনেকটা পিচের রাস্তাও আছে।

এরপর হেটে এসে শাহজালাল মাজার এলাকায় নাস্তা করে, শাহজালাল ভার্সিটি এর ঐদিকে হোটেল বুক করলাম।শুক্রবার থাকায় মাজার এলাকায় ফাকা রূম পাই নাই।অবশ্য শহর থেকে দূরে হোটেলের রূম ভাড়া কম। ২ বেড, একদিন, ৯০টাকা! এরপর শুরু হলো আমাদের সফর -
ডে ওয়ান
ডে-ওয়ানে আমাদের টার্গেট ছিলো কিন্স ব্রিজ, শাহজালাল মাজার, শাহজালাল ইউনিভার্সিটি, সিলেট এয়ারপোর্ট, মালনিছড়া চা বাগান। মালনিছড়া চা বাগানে ঢুকতে প্রতি গ্রুপ ২০টাকা লাগে। এক গ্রুপে যত জনই হোক না কেন। এইখানে চা বাগানের পাশাপাশি পাবেন আনারস ও কমলার বাগান। সময় কম থাকলে আপনি এয়ারপোর্ট বাদ দিতে পারেন। এসব ঘুরার জন্য আমরা ৪০০ টাকায় একটা টেম্পু ভাড়া করছিলাম। টেম্পু আমাদের সব ঘুরিয়ে শাহজালাল ভার্সিটিতে নামায় দেয়। ঐখানে পাহাড়ের উপর একটা শহীদ মিনার আছে। ব্লগার শামসীর ভাইয়ের আইডিয়া মত ঐখানে বসে বসে আমরা সন্ধ্যা হওয়া দেখি।
ডে টু
ডে টু তে আমাদের টার্গেট ছিলো হাকালুকি হাওর, সিলেট ক্যান্টনমেন্ট, সারিঘাট(লালাখাল), জয়িন্তা রিসোর্ট, তামাবিল ও জাফলং। গতকালের টেম্পুওয়ালাটাকে ধরে আমরা ৮০০ টাকায় এই সব কিছু দেখানোর জন্য রাজি করে ফেলি। সকালে বেশি করে নাস্তা খেয়ে নেই কারন এসব এলাকায় খাবারের প্রচন্ড দাম। পরিচিত লোক না থাকলে আপনাকে ক্যান্টনমেন্ট ঢুকতে দিবে না।
লালাখাল বিশাল একটা খাল আর এর পানি কেনো জানি নীল। ব্লগে এটার ফটু দেখে ভাবছিলাম ব্লগার ব্যাটা মনে হয় ফটোশপ মারছে, পরে নিজের চোখে দেখে বিশ্বাস হলো। অসম্ভব নীল/সবুজাভ পানি। মনে হবে কেউ রং ঢেলে দিছে।দেখার মত জিনিস।

এরকম একেবেকে চলা পাহাড়ী রাস্তা দিয়েই জাফলং যেতে হয়। টেম্পু দিয়ে যাওয়ার কারনে উচা ঢালগুলায় আমাদের প্রায়ই নেমে যাওয়া লাগতো আর ড্রাইভার যাত্রীহীন টেম্পু ঢাল বেয়ে উঠাতো। মাইক্রোবাস হলে হয়তো নেমে আশেপাশের সৌন্দর্য দেখা হত না। সত্যি বলতে কি, জাফলং যাওয়ার পুরোটা রাস্তার আশপাশ দেখার মত।

এরপর সোজা তামাবিল গেলাম। সেখানে বাংলাদেশি বর্ডারে দাড়াইয়া ভারত দেখলাম। মাইক্রোবাস/প্রাইভেট কার দিয়া অনেক লোক আইসা ফটু তুলতাছিলো। আমরাও তুল্লাম। কিন্তু আফসুস, ভারতের কোনো লোক তাদের বর্ডারে আইসা আমাদের মত ফটো তুলতেছিলো না। খুব খেয়াল করে দেখলাম ভারতের পাহাড়ের উপর একটা মাটির ঘরে জিন্স পড়া ফর্সা এক মেয়ে গোছলের পর কাপড় শুকাতে দিচ্ছিলো। :!>

জাফলং নেমে সোজা নদীর ওপারে চলে গেলাম। ওপারে আছে খাসিয়া পল্লী ও রাজবাড়ী। শুরুতে ট্রাক্টর-ইন্জিনচালিত রিকশাভ্যান নিয়ে একবারে ভিতরে চলে গেলাম যেখানে আছে এক বিশাল সমতল চা বাগান। এখানে কোনো পাহাড় নাই। সমতল উচা ভূমিতেই চা বাগান করছে।বাংলাদেশ এক ভারতীয়ের কাছে এটা ইজারা দিছে আর মালিক থাকে ভারতে। একটু পাশেই মালিকের বাংলাদেশী দোতালা বাড়ি দেখলাম। খুবই চুপচাপ এই জায়গাটায়, বাগানের আইল বরাবর অনায়াসে কয়েকঘন্টা হেটে পার করে দেয়া যায়। আসা-যাওয়ার সময় উপভোগ করলাম বিভিন্ন উপজাতীদের জীবনধারা।বলতে গেলে তাদের বারান্দা, উঠান, ড্রইংরুমের সামনে দিয়েই আসা হইছে। ১৯৫৭ সালের একটা স্কুলও চোখে পড়লো।

এরপর আসল জাফলং এ গেলাম। যেখানে স্বচ্ছ ঠান্ডা পানি আর দূরে ইন্ডিয়ার বর্ডার দেখা যায়। পানিতে পা দিয়েই ঢান্ডায় হাত পা শিরশির করতেছিলো। শীতকাল বলেই অনেক মানুষের ঢল ছিলো। ছিলো বিডিআরদের তৎপরতা। কিছু ছেলেকে দেখলাম গায়ের জামা খুলে কালারফুল আন্ডারওয়ার পরে মাঝ নদীতে জলকেলী করতেছে। প্রকৃতির মাঝে এটাও দেখতে মন্দ লাগছিলো না।

২০ টাকায় ১০ মিনিট হিসাবে বাইনোকুলার দিয়ে আসেপাশের ইন্ডিয়া দেখলাম। এখানে ট্রলার ভাড়া খুবই বেশি। ৩৫০ এর নিচে কথাই বলবে না। কিন্তু আমরা একটা ছেলেকে পটিয়ে তার নৌকায় ১২০ টাকায় যাওয়া আসা সম্পন্ন করেছি। ৯০ টাকা ভাড়া, ৩০ টাকা বখশিস।
এরপর গেলাম চমৎকার ডিজাইন করা জয়িন্তা রিসোর্টে। কাজ কমপ্লিট হলেও তখনও সেটা চালু করে নাই। তবে রিসোর্টটা সেরকম। এটার শেষ মাথায় রেলিং এর সামনে দাড়ালে বুঝা যায় আমরা পাহাড়ের কত উপরে। অনেক নিচে অনেকটুকু ফাকা জমি এরপর ইন্ডিয়ার পাহাড়। পাহাড় থেকে পাশাপাশি ২টা ঝরনা দিয়ে পানি পড়ছিলো। ওদের দাবী এটা সর্বোচ্চ জলপ্রপাত। আমরা আফসোস করতেছিলাম ভারত সব ভালো জিনিস নিয়ে গেছে। নাহলে আমাদের জলপ্রপাত দেখতে মাধবকুন্ড যাওয়া লাগতো না। শীতকালে অবশ্য ঝরনার পানি কম ছিলো। রেলিং এর উপর বসেই পাহাড় ঘেষা সূর্যাস্ত দেখলাম।

উপরের ছবিতে বামে রিসোর্টের শেষ মাথার রেলিং এবং ডানে রিসোর্টের একাংশ। আরো বামে ভারত এবং আরো ডানে জাফলং হাইওয়ে।

উপরের ছবিতে পিংকিশ কালারের একটা সিড়িযুক্ত রূম দেখা যাচ্ছে।
রাতে কিন্স ব্রিজের নিচে সিলেটের শেষ রাত কাটালাম। রাতের বেলায় এই ব্রিজ অন্যরকম ভাব নেয়। যানজট মুক্ত পরিষ্কার একটা শহর ছেড়ে পরদিন ৩ তারিখ সকাল ৮টায় শ্রীমঙ্গলের উদ্যেশে রওনা দিলাম...
(পরের পর্বে সমাপ্য। পরের পর্বে থাকবে ২ দিনের শ্রীমঙ্গল ট্যুর যেখানে আছে লাউয়াছড়া ফরেস্ট, মাধবপুর, মাধবকুন্ড, নীলকন্ঠের চা, ফিনলে টি-গার্ডেন)
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



