মুসলমানদের উৎসব কোরবানি নিয়ে সাম্প্রতিক একটি আলোচনায় অংশ নিয়েছিলাম ভালো-মানুষের একটি পুরোনো পোষ্টে। পোষ্টটি অনেকদিন পর চোখে পড়লেও অনেক আগ্রহ নিয়ে কথাবার্তা শুরু করতে চেয়েছিলাম। সেজন্য কৌশলে লেখকের সামনে কিছু প্রশ্নও তুলেছিলাম। আমি চাইছিলাম লেখক আর আমার মধ্যে আলোচনা হলে আমার না জানা বিষয়গুলো জেনে নিতাম এবং এরপর আমার আলোচনাটা তুলে ধরতাম। কিন্তু পোষ্টে অন্যান্য ব্লগারদের জোর উপস্থিতি আমার আলোচনা দানা বাধতে দেয়নি।
আসলে কোরবানির ইতিহাস কিংবা এর তাৎপর্য সম্পর্কে আমার জানা বোঝা তেমন একটা নেই। বা এর নিয়ম কানুনও জানি না। কিংবা সময়কাল এবং সেই সময়কার আরবের সামাজিক ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও ধারণা নেই। ফলে এই উৎসব সম্পর্কিত আলোচনার আরো একটা উদ্দশ্য বিষয়টি জানতে ব্লগারদের সহযোগীতা। এই ইতিহাস এবং তাৎপর্যটুকু জানলে আমি ভাবনাগতভাবে ঋদ্ধ হতে পারতাম। রোজার ঈদ যেভাবে সেই সময়কার আরব প্রতিবেশ সম্পর্কে ধারণা দেয় কোরবানি সেরকম কোন ধারণা আমার মধ্যে তৈরি করতে পারেনি। বা অন্যান্য যেসব উৎসব মুসলমানরা পালন করে সেগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কিংবা সমাজবাস্তবতা অথবা সামজিক দ্বন্দ কিংবা শৃঙ্খলাহীনতা তৎকালীন আরবের প্রেক্ষাপটে যুতসই মনে হয়। কোরবানির বিষয়টি সেই অর্থে পরিষ্কার হতে পারছিনা বলেই এই পোষ্টের আয়োজন। এখানে যে বিষয়টি পরিষ্কার করা জরুরি তা হলো স্রেফ বিতর্ক বা বিরোধীতা নয়-সাম্প্রতিক কিছু অধ্যয়ন থেকে এবং ব্লগের আলোচনা দেখে এই পোষ্ট, যার উদ্দেশ্য আলোচনা এবং জানতে চাওয়া।
ওই পোষ্টটিতে আমি প্রশ্ন তুলেছিলাম যে, অন্যান্য কিছু ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠিও পশু হত্যা করে। বা বলি দেয়ার বিধানও আছে, মজার একটি তথ্য পেলাম যে ভারতবর্ষে স্ত্রী পশু বলি দেয়ার বিধান নেই। যাইহোক, কিন্তু বলি বা উৎসর্গ এতো ব্যাপকহারে হয় না-কোরবানি যেমনটা হয়। সারা বিশ্ব মিলিয়ে অজস্র-অসংখ্য গরু কিংবা উট কোথাও ছাগল বা ভেড়া, দুম্বা কোরবানি দেয়া হয়। এরপর সেই পশুর মাংস নিয়মমত বিলি-বন্টন বা নিজেরা মিলে খাওয়ার মধ্য দিয়ে
উৎসবের দিনটি পালিত হয় আরো কিছু ব্রত পালনের মাধ্যমে। কিন্তু যে বিষয়টি আমার খটকার কারণ-শুধু ইসলাম কেন অন্যান্য যে কোন ধর্মেই উৎসব পালনের যে সামাজিকতা থাকে তাতে সকলের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা থাকে-মুল বিষয়ে না হোক অন্তত চৌহদ্দিতে বা ছোটখাটো পরিসরে হলেও নিম্নবিত্তের মানুষেরা তা পালনে সমর্থ্য হয়। যেমন রোজার ঈদে অন্তত সেমাই-চিনি অনেকেই কিনতে পারেন বা ফুটপাথ থেকে জামাকাপড়। ফলে এই ঈদ যে উৎসব বা স্বস্থ্য একটা পরিবেশ তৈরি করে কোরবানি তা পারে না। কারণ ফুটপাথের জামার দরে গরু কিনতে পাওয়া যায় না। অনেকেই যারা নিজেরা কোরবানি দিতে পারে না তারা অন্যের মুখাপেক্ষি হয়ে থাকে-ফলে তার জন্যে এটা উৎসব হয়ে দেখা দেয় না। কারণ তার শুন্য হাতের কাঙ্ক্ষা সবসময়েরই, এর জন্যে ঈদ বা উৎসব উপলক্ষ্য হিসেবে প্রয়োজন হয় না। অথবা রোজার ঈদের পূর্বে রমযান যে গাম্ভীর্য্য এবং সংযমের পরিবেশ তৈরি করে কোরবানিতে তেমন পরিবেশতো দেখি না। রোজার ঈদ বা নামাজ পড়া কিংবা নামাজ পড়ার পূর্বে পবিত্রতার বোধ থেকে অজু করা অথবা অন্যান্য ধর্মীয় উৎসব যেগুলো আছে সবগুলোতেই সৃষ্টিকর্তার প্রতি বন্দনা বা আরাধনা-একাগ্রতা-ধ্যানমগ্নতা আছে, এটা বোঝাই যায়। কোরবানিতে কেন যেন সেই আমেজটা দেখিনি। যে কেউ নামাজ পড়লে বা অজু করলে যে পবিত্রতা বোধ করে, গরু জাবইয়ের পর সেই পবিত্রতার বোধ কখনোই তার মধ্যে তৈরি হতে শুনিনি। অনেক শিশু বা বয়েস সন্ধিকালের কিশোরদের এই সংক্রান্ত মনস্তাত্ত্বিক বোধটাও আমাকে অনেক সময় সংশয়ে ফেলেছে। এটা যদি তার মধ্যে খুনে মানসিকতা তৈরি নাও করে তথাপি গরুকে সে জবাইয়ের পশু বৈ অন্য কিছু হিসেবে ভাবতে পারে না।
তাছাড়া বেশিরভাগ মানুষকে নিয়ে যে উৎসব তাই অনেক বেশি উৎসব বা পালনীয় হয়ে উঠে। যেমন নামাজ, যে কোন পরিষ্কার জায়গাতেই তা পড়া যায়। এবং এর অনেক মনোদৈহিক তাৎপর্য অবশ্যই আছে-অজুও তাই। শব-ই-বরাত কিংবা এই সমস্ত ধর্মীয় আচারিরা সারারাত এবাদত করার মাধ্যমে মানসিক স্থৈত্য অর্জন করে। [এগুলো সম্তই আমার নিজস্ব ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ-বিরোধীদের মতকে গুরুত্ব দিবো।] কোরাবানি অনেকটাই তাড়াহুড়োর মাধ্যমে পালন করা হয়। কেউ ঠিক ঈদের আগের দিন বা তার আগের দিন অনেকেই ঈদের দিনও পশু কিনে তা জবাই করে। এটা কেবলই আনুষ্ঠানিকতার মতো করে পালন করা হয়। তাছাড়া এখানে সাম্য থাকে না। কারণ অনেকেরই সামর্থ্য থাকে না কোরবানি দেয়ার। আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষই বঞ্চিত হয় এই উৎসব পালন থেকে। অন্য কোন ধর্মীয় রীতিতে এমনটা দেখা যায় না। এবং অন্যান্য ঈদ বা উৎসবে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা অংশগ্রহণ করলেও এই উৎসবে তারা দূরেই থাকে।
সেই পোষ্টে আমি আরো যা বলেছি যে, তাইলে কি বিষয়টা এমন হলে ভালো হয়-কোন এলাকায় বা গ্রামে-পাড়ায়-মহল্লায় যতো মানুষ থাকে সবাই মিলে সমান ভাগের অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক গরু কোরবানি দিবে। যাদের সামর্থ্য নেই পাড়ার লোকেরা মিলে তাদেরও যুক্ত করবে সেই কোরাবানিতে। এটা একটা পন্থা কি হতে পারে। কোরবানির পশুর চামড়া নিয়েও এক দক্ষযজ্ঞ বেধে যায়-এবং যারা কোরবানির পশু কেনে তারা চামড়া বিক্রির দরদামে বেশ উৎসাহী থাকেন। সাধারণত এতিমখানার লোকেরাই এইসব চামড়া কিনে নিয়ে যায়। এতিমখানাগুলোর জন্য এটা একটা বড়ো অর্থ আয়ের উৎস। কিন্তু মৃত পশুর চামড়া বিক্রি করে এতিমখানার বাচ্চারা ভাত কিনে খাবে বিষয়টা কেমন যেন-অন্তত একটা ধর্মীয় উৎসবের দিনে। তাদের যখন দেখি চামড়ার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকতে, তখন কেবলই মনে হয় কোরবানি তবে সবার জন্যে আসে না। এই এতিমখানার লোকেরা সবার সাথে মিলে একদিন গরুর মাংস খাবে-সেই দিনটি কি কোরবানির ঈদ হতে পারে। জানতে চাইছি।
অনেকেই প্রাত্যহিক মাছ-মাংস খাওয়ার সাথে কোরবানির তুলনা করেছেন সেই পোষ্টে। আমি মনে করি দুটো সম্পূর্ণই ভিন্ন বিষয়।
আসলে প্রশ্নগুলো মাথায় কেমন ছুটোছুটি করছে। তাই এই পোষ্ট। আশা করছি আলোচনায় আপনারা উৎসাহ পাবেন।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মে, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


