বর্তমান সরকার আওয়ামি লীগের নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসার বেশ কয়েক মাস পর মনে হলো দেশের রাজনীতিতে এখন একটা ভাটার কাল। সাধারণত বড় দলগুলোর মধ্যকার প্রকাশ্য দ্বন্দই আমাদের রাজনীতিতে জোয়ার আনে। তারপরও মাঝে মাঝে ভাটার জলগুলিয়ে দুএকটা আন্দোলন যে জনগণ করে না তা নয়। কিন্তু সেই জলের ঘূর্ণি তুফান হয়ে ওঠেনা কারণ এদেশে জনগণের পক্ষের দল অদৃশ্য। আর অদৃশ্য থেকে যে দল জনগণমুখি হওয়ার আকাংক্ষায় সে দল তার বক্তব্যেই জনগণ থেকে অদৃশ্য। ফলে স্বস্তির বাতাস কোথায় বয়। আমাদের সমাজের দৃশ্যপট বলে জনতার কাছে সেই স্থান অজানা।
এখনও যেমন টিপাইমুখী বাঁধ বা আরো যে সমস্ত বিষয় আলোচ্য তার একটা দিক আছে, বৈদেশিক প্রভাব। বিদেশ দেশের প্রতিপক্ষ হচ্ছেএবং তা-ই আমাদের রাজনীতি হয়ে উঠছে। এমনটা যদি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় তাহলে এ দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক চর্চা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। এই ভাবনা জরুরি। রাজনীতির সংস্কৃতি আমাদের দেশে নেই, এটা সবাই জানে। কিন্তু এই সংক্রান্ত আলোচনাটাই যে নাই হয়ে যেতে বসেছে। এখনকার ইরানকে পাঠ করা খুবই জরুরি-জরুরি নেপালকে-শ্রীলঙ্কাকে বিচার করা। ভারত কেন বারবার আমাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ সে চায় নিজস্ব রাজনীতি বলতে কিছু যেন না দাঁড়ায়। আমাদের দলগুলো একে অপরের শত্রু-সাংস্কৃতিকভাবেই তা এখন প্রতিষ্ঠিত, ভারত সেটা জানে। কিন্তু এই দলগুলোও হঠাৎ কখনো ভেবে বসতে পারে নিজের দেশের কথা। নেপাল যেমন ভাবছে। বাংলাদেশ ও যদি ভাবে তাহলেতো সমস্যা। ফলে ভারত চাইবে এদেশে তার উপস্থিতির জোর প্রকাশ ঘটানোর। এটাই পুঁজিবাদের চরিত্র-সাম্রাজ্যবাদী হয়ে ওঠার পথে। আর সাম্রাজ্যবাদকে যদি যে ডালে বসেছে সেই ডালই কাটছে এমন বোকালোক মনে হয়, তাহলে বলার কিছু নেই। সাম্রাজ্যবাদই আমাদের প্রধাণ প্রতিপক্ষ নাকি নিজ দেশের পুঁজিবাদ এবং সেই জাত সংস্কৃতি। এটা পরিষ্কার করতে হবে। পরিষ্কার করতে হবে আন্দোলনেই-কথায় আসলেই চিড়ে ভেজে না ।
দুবছরের অন্য রকম শাসন রাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিলো রাজনৈতকিভাবে এবং পরিষ্কারভাবেই সাংস্কৃতিকভাবে। মানসিকভাবে ভীত করে দিয়ে গেলো একটা জাতিকে। পুরোপুরি পারেনি, এটা তারাও জানে। আলামত দিয়ে গেলো হয়তো-কোন ভয়াবহ মানবিক সিডরের। এটা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের অর্থেই বলছি। এদেশে মোবাইল এসেছে কতোদিন পর, তার আগে কতোগুলো ছাত্র আন্দোলন হয়েছে, এখন তার পরিমাণ ও গুণগত মানের ঘাটতি কেন। এটা বিচার করতে হবে-অবশ্যই। জরুরি অবস্থার পরপরই প্রয়োজন ছিল একটা বড়োসড়ো সাংস্কৃতিক আন্দোলনের। কিন্তু সেটারও দখল নিল রাষ্ট্র-যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোশ ঝুলিয়ে। এই আন্দোলনকেও সাংস্কৃতিক আয়োজনের অংশ করা যেতো। এটা হয়নি। কারণ এদেশের বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো কর্মে এবং ভাবনায় এর প্রকাশ ঘটাত পারেনি, ঠিকই নির্বাচনী আয়োজনে হাজির ছিলো।
এই আলোচনাটি দলগুলোর সামাজিক উপস্থিতিই বিবেচ্য। অন্য কিছূ নয়। কারণ সংগঠন এবং দর্শন বিচারে দলগুলোকে নিয়ে আলোচনা করা যায়। কিন্তু সমাজের পরিবর্তনে এদের প্রভাব নিয়ে আলোচনার বিষয় এখন নেই-আগে ছিলো-এখন ক্রমশ ক্ষীয়মান। কিন্তু এই আলেচনাটাও হয়তো জরুরি। হয়তো এটাই জট খুলবার সূত্রসুতা।
টিপাই নিয়ে আন্দোলন বাম করুক বা নাই করুক-এর ফলাফল নির্ধারক হিসেবে হাজির হওয়ার সাংগঠনিক শক্তি বামের নেই। তেলগ্যাস নিয়ে যে আন্দোলন ছিলো-তাও অনুপস্থিত টিপাই প্রশ্নে-এখন পর্যন্ত। ফলে টিপাই বাঁধ বিরোধীতার প্রশ্নে বাম এখন পর্যন্ত কাগুজেই-এটা অশ্রদ্ধা না করেই বলছি। আবার টিপাইয়ের পরে সাম্প্রতিক বিষয় হিসেবে বাজেট-ঘড়ির কাঁটা এগুলোই প্রধাণ। সারা দেশের চিত্রই কি তাই। না তা নয়-কারুর ভাতের অভাব-কারুর কাপড়ের। কেউ মাথা গোঁজর ঠাঁই পায় না। শরীর বিক্রি করে চলে কতো নারী। পঙ্গু হয়ে যাওয়া সন্তানকে পুঁজি করে কতো মা। ভাত, কেবল ভাত খেতে পারলেই বেঁচে থাকা হয় এমন বোধ নিয়ে জীবন পার করে দেয় কতোজন। কেবল ওই চরের রুক্ষ ঘাস আর সীমাহিন নদীর পারে কতো মানুষ মরে যায়। শহরের আলো তাদের কখনোই চোখে পড়ে না-যারা শহরকেই আলো দেয়। এই নিয়ম স্বাভাবিক হয়ে আসছে-এর পরিবর্তন ঘটাবে কে। কিভাবে। এবং পরিবর্তন যে সমাজের কোথাও হচ্ছে না-এটা সত্যি। ধ্বংসের পরিবর্তনই প্রধাণ হয়ে উঠছে। সৃষ্টির পরিবর্তন যারা করছেন-তারা রাষ্ট্রকে প্রতিপক্ষ-সাম্রাজ্যবাদকে শত্রু জ্ঞানের তত্ত্ব নিয়েই বোধহয় বেশি ব্যস্ত আছেন।
কেবল সমালেচানাই করছি-যারা এর সমালোচনা করবেন তারা আশার কথাটুকু বলে যাবেন। অন্তত ভাবনার সাম্য শান্তি দিতে পারে। কিন্তু মানসিক শান্তিতে থাকা শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বাইরে গিয়ে চিন্তা করলে ওই শান্তিটুকুও নাই হয়ে যায়। কারণ হচ্ছে এদেশে শিক্ষা বিস্তারের অনিহা রাষ্ট্রের, আবার যদি কেউ দায়িত্ব নেয় তাহলেও কিন্তু সে রাষ্ট্রই। শিক্ষা কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিকতা নয় এর দর্শনেরও বিষয় আছে। আবার প্রতিষ্ঠানের বাইরেও শিক্ষা আছে-রাষ্ট্র যাকে উপেক্ষা করে, আর দাপুটে দর্শন তাকে হত্যা করে। যেমন আমাদের গ্রামগুলোতে এখনও অনেক আচারিক সংস্কার চালু আছে। এবং দেখা যাচ্ছে যে পণ্য যেখানে প্রবেশ করছে-পুঁজি যেখানে আবহ তৈরি করছে- সেখানেই গ্রাম ক্রমশ বাজার হয়ে উঠছে। শারীরিকভাবে যারা পারছে না, মাসিকভাবেই তারাও শহুরে হয়ে উঠছে-শিক্ষা যারা গ্রহণ করছে তারাও যেমন এবং যারা অআকখ পড়েনি তারাও একই জীবনযাপন করছে। ভয়াবহ হলো বেশিরভাগই নতুন প্রজন্ম। আর যারা একেবারেই আসহায়-অবস্থানগতভাবে প্রত্যন্ত। তাদের কোন খবরই নাই। বামেরাও তাদের জীবন বোধ অনুভূতি সংস্কৃতিকে চেনে বা জানে বলে বোধহয় না।
আমাদের সংস্কৃতিতে লুঙ্গির উপস্থিতি আছেই। এই ঢাকা শহরে প্যান্ট পরেই চলাফেরা করা যাদের জন্য দুঃসাধ্য তাদেরই চোখের সামনে দিব্যি অসংখ্য মানুষ লুঙ্গি পড়ে দৌড়ুচ্ছে। এদের সংখ্যা প্রচুর। এদেরও বেশি দেখা যায় পণ্যবাহী বা পণ্যের ক্রেতা হিসেবে। তাহলে বামের সামাজিক প্রভাবটা কোথায়।
লিখা বড়ো করলাম না। যারা আলোচনায় আগ্রহী তাদের জন্য মন্তব্য আকারে আলোচনা চালানোর ইচ্ছা আছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুন, ২০০৯ দুপুর ১:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


