নদীরও পথ থাকে। চেনা পথের চেনা মাঝি। যে মাঝি পথ চেনে না তাকে নদীর নানামুখী স্রোতের ঘুর্ণাবর্তে পড়তে হয়। সেই পতনে অক্ষমের হাহাকার আছে-সেই হাহাকার বাতাসে ভেসে বেড়ায় কি-না তার খবর কেউ রাখে না, ইতিহাসও নয়। ইতিহাস শুধু ঘটনার শিকারদেরই মনে রাখে। এটা নির্মম হলেও বাস্তব। মাঝিকে তাই নদীর বুকেও পথ আঁকতে হয়। সীমানাবিহীন বলেই নদীর সব পথই তার পথ নয়।
আমাদের রাজনীতিতেও সব পথ সবার পথ নয়। সব পরিস্থিতি সবার অনুকূল নয়। নব্বই পরবর্তি এদেশের সমস্ত কিছুতে একটা পরিবর্তন আছে। শহুরে সংস্কৃতি চর্চা থেকে শুরু করে রাজনীতি-সবকিছুতেই পরিবর্তনটা আছে। আগে যেমন এক হয়ে কাজ করার একটা মানসিকতা ছিলো এখন সেটা নেই। নব্বইয়ের আগে মোবাইল, মিনি প্যাক বাজারে ছিলো না। এখন আছে, এখন তাই মত আর পথের নানা পার্থক্যও আছে। বুর্জোয়া রাজনীতি যারা করেন তারা যত কিছুই হোক জোটবদ্ধ থাকেন। চারজোট-মহাজোট। কিন্তু জনগণের পক্ষে জোট কোথায়। নব্বইয়ের পর থেকে নাই। টিপাই ইস্যুতেও নাই। ব্লগে অন্তত এই বিষয়গুলো পরিষ্কার। এবং নিম্নবিত্ত ক্রমশ নাই হয়ে যাচ্ছে শিক্ষিতের রাজনৈতিক আলোচনা থেকে। এটা অস্বীকার করার কৃতিত্ব কে নিবে।
টিপাই বাঁধ বিরোধী আন্দোলন কারা করবে। কিভাবে করবে-কেন করবে। এসব নিয়ে আলোচনা আছে। নানা মুখে নানা মতের আলোচনা। ব্লগার থেকে রিক্সাওয়ালা সবাই আলোচনা করছেন-প্রায় সবাই বাঁধ নির্মাণের বিরোধী। এখন প্রশ্ন হলো কারা এর প্রচার দিয়েছে। এক্ষেত্রেও উত্তর হচ্ছে নানা পক্ষ। কিন্তু কোনটা জনগণের পক্ষ। বাঁধ নির্মাণ হতে সময় লাগবে। টিপাই বাঁধ সম্পর্কিত রিপোর্টগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। ভারতের বাঁধ নির্মাণের আয়োজনও চলছে। মনমোহনের আশ্বাসে বিশ্বাস করতে পারছে না এদেশের জনগণ। তাহলে আন্দোলন করতে হবে-কে করবে সেই আন্দোলন। এদেশের লাশ রক্তের দাম ভারতের কাছে নাই। তাহলে আন্দোলনের কৌশল কি। এগুলো ঠিক করার পক্ষ কারা।
ল্যাম্পপোস্ট যা করেছে সেটা তাদের সাংগঠনিক কর্মসূচি। কাউকে তারা জিজ্ঞেস করেনি। প্রয়োজন বোধ করেনি। একটা সংগঠন তাদের কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পুলিশের মার খেয়েছে-এর রাজনৈতিক শিক্ষা কি। রাষ্ট্রের নৃশংসতা। আর কতোবার রক্ত ঝরিয়ে তা প্রমাণ করতে হবে। আর যে সংগঠন এতোবড় একটা মার খাওয়ার পর একটা মিছিলের কর্মসূচিও রাখতে পারে না তাদের নিয়ে যারা হৈ চৈ করছেন কেন করছেন। এদেশে অনেক বড় বড় দল আছে-তারা আগে থেকেই টিপাই নিয়ে আন্দোলন করছেন-ল্যাম্পপোস্ট কি করেছেন। কাউকে সাথে না নিয়ে এমন কর্মসূচি নেয়ার উদ্দেশ্য কি। আন্দোলনকেই তা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যারা আগে থেকে আন্দোলন করছিলেন জনগণের সামনে থেকে তাদের সরিয়ে দেয়া হল এতে করে। ল্যাম্পপোস্ট আর যাই হোক জনগণের পক্ষের প্রমাণিত শক্তি নন। হতে পারে তাদের দাবি ঠিক কিন্তু কর্মসুচি ঠিক না হলে সেই দাবি আত্মঘাতি হতে পারে। তারা বিচ্ছিন্ন সংগঠন-মাওবাদি হোক আর না হোক। কয়েকজন শিক্ষিত লোক পুলিশের মার খেয়েছে এটা নিয়ে যতো কথা হয়েছে, একই সময়ে আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়া শ্রমিকদের নিয়ে তত কথা কই হল। একটা ঝড় গেলো-ক্ষেতের ফসল নষ্ট হল। কে এগিয়ে এল ঝড় বিধ্বস্ত কৃষকের পাশে। দেশের নদীগুলো শুকিয়ে ক্রমশ ধুলোবালি, তখন কোথায় ছিলো আন্দোলন। টিপাইবাঁধ কেবল রাজনৈতিক আন্দোলনই নয়। পরিবেশবাদিতার বিষয়ও আছে। আমাদের দেশে কোন দলই পরিবেশ নিয়ে আন্দোলন করে না। টিপাই প্রশ্নে এটা জরুরি। এর পরিবেশগত দিকই প্রধাণ-পরিবেশ এর প্রশ্নকেই রাজনৈতিক করে তুলতে হবে।
ল্যাম্পপোস্ট নিয়ে যারা পক্ষ বিপক্ষ তৈরি করলেন তারা কোন রাজনীতি তৈরি করতে পারেন নি। বরংচ ল্যাম্পপোস্ট নিজে এবং হয়তো রাজনৈতিকভাবে তার প্রতিপক্ষ ঠিকই রাজনীতি করে নিলেন। কি হল আন্দোলনের-কতদূর এগুলো টিপাই বাঁধ বিরোধী কর্মসূচী। যারা পূর্ব মুহূর্তেও কর্মসূচির খবর জানতেন না তারা ঘটনা শুনেই ল্যাম্পপোস্টের পক্ষে অবস্থান নিলেন। ওই ঘটনার পর ল্যাম্পপোস্টকে সহানুভূতি জানানো যায়-সাহনুভুতি জানালেই রাজনীতি হয় না। তাকে নাকচ করে দেয়ার মধ্যে রাজনীতি হয় অথবা তার কর্মসূচির পক্ষে কর্মসূচি নিলে রাজনীতি হয়। বাকি সব অক্ষমের আক্ষেপ-মধ্যবিত্তীয় বাগাড়ম্বর। গ্রামীণ সমাজ বলে কিছুই নাই আমাদের রাজনৈতিক চর্চায়। আলোচনাতেও নাই। ল্যাম্পপোস্ট ঠিকই আলোচ্য হয়ে ওঠে।
এবার আমাদের বর্তমান সরকারের দিকে তাকান। ভয়াবহ রকমের অসংগঠিত এবং নড়বড়ে অবস্থান। একেরপর এক ঘটনা আসছে। ফাঁকতালে মরিচের দাম বাড়ছে-শ্রমিক গুলি খেয়ে মরছে। শিক্ষানীতি আসছে-যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মারামারির আখড়ায় পরিণত হয়েছে, কৃষকদের তালিকা তৈরি করছে। তলে তলে পুঁজিবাদ তার কাজ ঠিকই করছে। সংসদ অকার্যকর থাকাটাই এখন নিয়ম। সেটাকে কার্যকর করার আন্দোলন কেউ করে না। তাহলে টিপাইবাঁধ হতে রক্ষা পাওয়ার উপায় কি। বাজারের কোন ক্ষতি নাই মানুষ মরুক আর যাই হোক। এগুলো পুঁজিবাদের কৌশল-নিজের ক্ষত কে আড়াল করার জন্য সে অনেক আগডুম বাগডুম করে। এটা বোঝার ক্ষমতা যাদের তারা সেটাকে অপব্যবহার করলে তার পক্ষ নেয়াটা বোকামি। টিপাই প্রশ্নের আন্দোলন কোন পথের তা ঠিক করতে হবে আগে। তারপর অন্য বিষয়। পুঁজিবাদের তাওয়ায় খই ফোটার মতো লাফানোতে নিজের কৃতিত্ব কিছু নেই।
রাজনীতি এমন অসংখ্য চেনা অচেনা স্রোতের ঘূর্নাবর্তনে পড়ে আছে। পথ হারা মাঝি হয়ে আছে। টিপাই ইস্যুকে কেন্দ্র করেই হাল ধরতে হবে-পাল তুলতে হবে। দাঁড়ি লাগবে-কন্ঠে গান লাগবে। সেই যে পাগল, মাঝে মাঝেই নৌকাকে দুলিয়ে দেয়। তার দুলুনিকে বিপ্লব বলে ভাবাটা নিষ্ক্রিয়ের সান্ত্বনা হলেও তাতে সমূহ বিপদ এড়ানো যায় না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

