প্রাচ্য থেকে-
#"দাদী এসে বলে। - ও সয়ফর। ও নাতী। নোলক গেছে আল্লায় নিয়ে। তুই বাঁইচা থাক না।।
- আমাগো আবার বাঁচন কিয়ের রে দাদী। আমাগো বাঁচন কালনাগিনের ডংশন। শ্যাষ জমি বন্দক দিয়া যে বিয়া করে তা কিনে আইজল মিয়া। শ্যাষ জমি বন্ধক দিয়া যে বউ ঘরে আনে তারে মারে সাপে। যে সুড়ঙ্গ খুঁড়ি এই ইন্দুরের নাগাল তাতে হাপ ঢুইকা পড়ে। এইভাবে ছুবল মারে।।"
#"সোমেজ বলে - বিবাহ যাত্রা আর শ্যাষ যাত্রায় আকাশ পাতাল মিল।
- আকাশ-পাতাল মিল হয় নাকি। - সাইদল বলে।
- এমনে হয় না ভাবো অন্তরে নয়ন মেইলা। হয়নি না হয় দেহ।।"
অহরক মন্ডল থেকে-
#বুঝতে পারা যায়, বাংলা নাটক চলনে-বলনে আর উপনিবেশকালের শাসন অগ্রাহ্য করছে সচেতন শিল্পরীতির মাধ্যমে, যে রীতিটা উঠে এসেছে আবহমানকালের ধারায়-প্রাচীন ও মধ্যকালের বাংলা থেকে। তবে তাতে পাশ্চাত্য শিল্পরীতির ন্যায্য অংশটুকুই গৃহীত হয়েছে-বিশ্বসংস্কৃতির আধুনিক প্রবাহের ধারায়।
বর্ণনাত্মক বাঙলা নাটক যে বিশ্বনাটকের শিল্পযাত্রায় এক নতুনতর সংযোজন সে বিষয়ে আর সন্দেহ থাকে না, যখন দেখি আমাদের একদিনের ক্ষীণ-ভীরু চেষ্টাটা আজ বৃহত্তর শিল্পমণ্ডলবর্তী। একদিন নিজের রচনার ভিতরে নিঃসঙ্গের মতো নির্জনে বসবাস করতাম। আজ দেখি সেই চেষ্টা কতই না বিচিত্রতর ভিন্নধারায় বাহিত হচ্ছে।
ধাবমান থেকে-
#কেন তবে পশুগণের স্বর্গ নর্ক নাই। নাই যদি তবে এই যে দুধ বেচে-তার টাকায় আমার প্রার্থনার শরীর গড়ে উঠলো সে কেন যাবে না স্বর্গে। তারপর তারা হালটানে-শস্য বহন করে। মখোমুখি যুদ্ধে হাজার মানুষের মন উতলা কইরা দেয়। সেই তো শরীর কুরবানীতে মানুষেরে আপন টাটকা রক্তে গোশত বিলায়া পুণ্য দিয়া যায় যদি তার কি কুন কষ্ট হয় না। চাইর ছওজনে সেই প্রাণীটারে জোর কইরা চাইপা ধইরা জবাই করে যহন-হায় কি কষ্ট। তয় সেই খুন হওয়া জানের মূল্যে বেহেশত নাই ক্যান-নাই ক্যান হে খোদা।
দিনপঞ্জি থেকে-
#১০.১২.২০০২
আমাদের গাঁয়ে আমার পরিচয়টা অদ্ভুত রকমের ভিন্ন। সেলিম আল দীন নামে কেউ একজন এসেছে, একটানা সাতদিন থেকে গেছে তার পিতৃভূমিতে এ খবরটা সবাই খুব ঘরোয়া কৌতূহলে বলে। বলে ঠিক খানিকটা এ রকমের ভাষায়- সেলিম মিয়া আইছে বা বড় মিয়া আইছে। কিংবা ‘কিরে বা কনখ্তে আইলেন, থাইকবে কদিন’ ইত্যাদি। আমি যে একটা হোমরা-চোমরা গোছের লেখক সে কথা দু-একজন ব্যতীত অন্য কেউ মনেই করে না। আর যারা জানে- বলে- ‘কিরে বা, টেলিভিশনে তোঁয়ার/আম্নের নাটক-টাটক দেখিনা কা।’
আমার বেশ ভাল লাগে। নিজের গ্রামে বিশেষ পরিচয়ে পরিচিত হওয়া অস্বস্তিকরও বটে। এর মধ্যে ঈদের দিন বিকালে কাজিরহাট গিয়েছিলাম- ঈদের দিন বলে জনশূন্য। একটা সাদামাটা জামা আর প্যান্ট পরে পটুর সঙ্গে হেঁটে হেঁটে চলে যাওয়া। তন্মধ্যে দুজন নাকি আমাকে দেখিয়ে বলছিল- ঐ যে সেই সেই। আর একজন কেবলি জিজ্ঞাসা করে ইস সামনাসামনি দেখা হত যদি। আমার সম্পর্কে এইসব ছিঁটেফোঁটা কৌতূহল বেশ আমোদজনক ঠেকে। এই ঘন অপরিচয়ের মধ্যে গ্রামীণ সম্পর্কগুলো- চল্লিশ বছর আগের মতই থেকে গেছে। আমাকে কেউ আলাদা চোখে দেখে না- সেটাই আনন্দ।
একটি সাক্ষাৎকার থেকে-
#‘আমার মনে হয় যে, আমাদের জেনারেশনেও প্রচুর অনড়তা আছে, ভ্রান্তি আছে। অজ্ঞতা প্রচুর আছে। আবার বৃহৎ একটা গণযুদ্ধে আমরা অংশগ্রহণ করেছিলাম বলে পৃথিবীকে দেখার, বোঝার এবং স্বদেশের মাটিকে অন্বেষণ করার স্পৃহা আমাদের ছিল। পৃথিবীর সেই রুদ্র মূর্তিটা আমরা দেখেছি, যখন আমাদের মায়েরা, বোনেরা ধর্ষিত হচ্ছিল, কন্যারা ধর্ষিত হচ্ছিল তখন পুজিবাদী দেশগুলো নির্বিকার। আমরা দেখেছি হাসতে হাসতে একটা বাচ্চা ছেলেকে পাথরের ওপর আছড়ে মারা হচ্ছে। কি করে একটা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমি আনসাকসেসফুল স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারের কথা বলবো, সেখানে ফ্রাঙ্কোর সেনাবাহিনী ব্যাপক গণহত্যা করলো, সে সময়ে স্পানিশ লিটারেচারে, ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যে একটা তীব্র আলোড়ন এলো, যেমন নেরুদার একটি কাব্যগ্রন্থ বেরুলো মার্চেন্ট সোলজারদের জন্য কাগজের কারখানায় জুতা কাপড় যা ফেললো তা দিয়ে মণ্ড তৈরি হলো, কাগজে ছাপা হলো। মিগুয়েলের কথা বলতে পারি, সিভিল ওয়ারে সরাসরি অংশগ্রহণ করা আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কথা বলতে পারি, কল্ডওয়েলের কথা বলতে পারি। একটা নতুন জেনারেশন কিন্তু রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা বহু বছর পর আবার নতুন করে চর্চিত হলো নতুন পথ খুজে পেল। কিন্তু আমাদেরটা সাকসেসফুল যুদ্ধ, প্রচুর রক্তক্ষয় এবং প্রচুর মূল্য দিয়ে আমরা স্বাধীন ভূমি অর্জন করেছি। আমাদের ভেতরে বোধটা একটু আলাদা। আমার তো মনে হয় না যে, আমাদের এ কাজ দেখে তোমাদের মনে করা উচিত যে তোমাদের দায়িত্ব নেই। ভেবে দেখা দরকার যে, আত্মতৃপ্তির অবকাশ আছে কিনা। কবিতার ক্ষেত্রেও তো ভয়ানক একটা নৈরাজ্য চলছে আমি কলকাতার কথা বলবো না, কেননা সেখানে উত্থান-পতন পরিবর্তনের সম্ভাবনা আরো কম। আমাদের এখানে প্রতি মুহূর্তেই আমাদের রাজনৈতিক মেঘ যেমন রঙ বদলাচ্ছে, আমাদের সমুদ্র যে রকম নতুন করে ফুসে উঠছে আমাদের ভেবে দেখা দরকার যে, কোন পর্যায়ে লিটারেচারকে নতুন করে রিনোভেট করতে হয়। নতুন করে নির্মিতি কিভাবে হবে এবং তোমাদের কাজ হবে রিলে রেসের মতো। আমরা এতোদূর এগুলোম তোমরা এতোদূর। তোমাদের কবিতার দিকে তাকালে আমি হতোদ্যম হয়ে পড়ি- প্রথমত বোধ এবং বিষয়ের একটা আইকোনোকাস্টিক অবস্থা দেখতে পাই। এখনকার কবিতা পড়ে আমি ঠিক কনভিন্সড হই না। জীবনানন্দ, বিষ্ণুদের কবিতা পড়ে যে প্রচণ্ড মোহ এবং আবর্তের তৈরি হয় এখনকার কবিতা পড়ে ক্বচিৎ আমার সেটা হয়। মনে হচ্ছে যেন ওদের ভেতরে বলার একটা প্রচণ্ড তাগিদ আছে। কিন্তু ভেতরে সেই পরিমাণ আর্জ নাই, কবিতাকে একটা শিল্পরূপ দেয়ার যে শ্রম সেই জায়গাটায় তারা খাটতে রাজি নয়। অবশ্য সেটা নির্বিশেষ মন্তব্য নয়। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে অনেক সম্ভাবনাময় কবি-লেখক আছেন বিশেষ করে ছোট কাগজগুলোতে, অফ দি ওয়ে ম্যাগাজিনগুলোতে, এ পত্রিকাগুলোকে কেন্দ্র করে অনেক কবি-গদ্যকার উঠে আসার চেষ্টা করছেন। আমি এ কথা মনে করি না যে, একজন তরুণ কবি বা তোমাদের জেনারেশন খারাপ লিখলেই আমাদের সম্ভাবনা বেড়ে যায় বড় হওয়ার এ রকম কোনো নেগেশন কিন্তু শিল্পে নেই। বরং তোমরা ইয়াংরা যতো প্রচণ্ড বড় হবে আমাদের মূল্যায়নের ক্ষেত্র ততোটা স্পষ্ট হবে, আমাদের সঠিক মূল্যায়ন ইতিহাসে হবে। অন্ধকার যতো ঘনাবে ততোই অতীত আরো বেশি অন্ধকার হয়ে যাবে। আমরা এখন চলমান কিন্তু আমাদের জীবনের অধিকাংশ কাজ এখন অতীতের মধ্যে। বর্তমানে যেটুকু আছে সেটুকু আয়ুর জোরে; কলমের জোরে, কিন্তু তোমাদের ঘুরে দাড়াতে হবে একটা জায়গায়। সেটা হলো সৎভাবে খাটনি যেটা সেই খাটনিটা করতে হবে। আমি নিজের ক্ষেত্রে বলতে পারি, ‘কেরামত মঙ্গলের’র রাফ কপি দাড়িয়ে ছিল মোট পৌনে তিন হাজার পৃষ্ঠায়। অথচ নাটকটি ছিল দেড়শ পৃষ্ঠার। শকুন্তলা আমি লিখেছি আঠারবার। সব লেখকেরই তিন-চারটা যুগ থাকে লেখার প্রত্নপ্রস্তর যুগ, প্রস্তর যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ তারপরে লৌহ যুগের লেখকের কবির ভাষাটা দাড়ায়। ইস্পাতের যুগে যে ঢুকতে পারবে সে অমর। মনে হয় আমি শকুন্তলায় ব্রোঞ্জ যুগে নিশ্চয়ই ছিলাম।’
সেলিম আল দীনকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



