somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা বুদ্ধ আর শস্যপোড়া ছাই হতে উত্থিত হোক বিদ্রোহী মধুপূর্ণিমা।

২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৪:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আগুনে সব পুড়ে ছাই। ঘরদোর, শস্য, হাড়িপাতিল, সংসারের যাবতীয় জিনিস, সব পুড়ে ছাই। এখনো ধোঁয়া ওঠে পুড়ে যাওয়া শস্য থেকে। তিনদিনের অভুক্ত ঘরপোড়া মানুষ জঙ্গলের আড়াল থেকে নিজের ছাই হওয়া ভিটেমাটি দেখে। উন্মূল মানুষের কষ্ট সইবার ভার থাকে কেবল দেবতাদের। সেই দেবতার ঘরও পোড়া। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে পোড়া বুদ্ধ। নগর পুড়লে দেবালয় যে অরক্ষিত থাকে না। বাঘাইছড়ির সর্বভূক আগুন তাই মৈত্রীপুর বনানী বন বিহারটিকেও রেহাই দেয়নি। বৌদ্ধ মূর্তি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে সেখানে। মধ্যে থাইল্যান্ড সরকারের উপহার হিসেবে দেওয়া কয়েকটি বৌদ্ধ মূর্তিও রয়েছে। পার্বত্য বৌদ্ধ মিশনের সভাপতি ও পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের প্রধান সুমনালংকর মহাথেরো বলেন, 'কী বলে এর বর্ণনা করব, তা বুঝতে পারছি না। পৃথিবীতে যত ভাষা আছে, তা দিয়েও এর নিন্দা জানানো যাবে না।' ভূমি আর ভিটামাটির দখলের জের টানতে টানতে কোনঠাসা পাহাড়িদের ওপর সর্বাত্মক আগ্রাসন নতুন কোন ঘটনা নয়। এর আগেও বহুবার এমন আগ্রাসনের শিকার হয়ে তারা উচ্ছেদ হয়েছে। জীবন দিয়েছে। তাদের জুমের ফসল পুড়েছে দখলদারদের আগুনে বার বার। দখলদাররা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেও রেহাই দেয়নি। ইতিহাস ঘাঁটলে এই নির্লজ্জতা বের হয়ে আসে।

দিঘীনালার বাঘাইছড়িতে ১৯৮৮ সালের আগষ্ট মাসে এবং ১৯৮৯ সালে দখলদাররা ঘরবাড়ী ও মুখ মন্দির ধ্বংস করে দেয় । সেখানে প্রথমদিকে ছিল ১৭৫টি পরিবারের বসবাস এবং ১৩৫টি পরিবার ত্রিপুরায় পালিয়ে যায়। ৩০টি পরিবারকে নিকটবর্তী একটি গুচ্ছগ্রামে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। সেনাবাহিনী সমগ্র এলাকা থেকে সব গাছপালা কেটে ফেলে এবং তা বিক্রি করে দেয়।

১৯৮৬ সালে বোয়ালখালী গ্রামে অবস্থিত পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম ধ্বংস হয়। এই অনাথ একটি মন্দির এবং হাইস্কুল ছিল। ১৯৮৬ সালের ১৩ জুন বেআইনীভাবে প্রবেশকারী দখলদাররা বেশ কিছু ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দেয়। ১৪ জুন সকালে অসংখ্য অনুপ্রবেশকারী এসে আশ্রমের নিকটস্থ বাড়ীগুলো পুড়িয়ে দেয় এবং আশ্রমের গুদামঘর পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। আশেপাশের সমস্ত গ্রাম পুড়ে ছাই হয়ে যায় ভয় পেয়ে ঐ দিনই আশ্রমের একজন ভিক্ষু অনাথ শিশুদের সঙ্গে নিয়ে আশ্রম ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। সেদিন ১৭ জন ভিক্ষু ৮০টি অনাথ শিশুকে নিয়ে পলিয়ে যান

১৯৯০ এর ৩১শে অক্টোবর খাগড়াছড়ির বেতছড়ি খৃষ্টান পাড়ায় কানাডীয় ব্যাপটিষ্টদের আথির্ক সাহায্যে তৈরী একটি গীর্জা ছিল যা ধ্বংস করা হয়েছে। ঐদিন বেতছড়ি এলাকায় উক্ত খৃষ্টান গীর্জাটিসহ অনেকগুলো পাড়া ধ্বংস করে দেয়া হয়। বেতছড়ির ধ্বংসযজ্ঞ চালায় ইউনিফরম পরিহিত সেনাবাহিনী ও বাঙালী বসতিস্থাপনকারীরা। তারা দা দিয়ে এবং পুড়িয়ে ফেলে বাড়ীঘর ধ্বংস করে দেয়।

১৯৮৬ সালে ধ্বংস হওয়া দালাইলামা বৌদ্ধ মন্দির ছিল ঠিক দিঘীনালা বাজারের পরেই যেখানে পরবতীর্কালে একটি সামরিক চেকপোষ্ট বসানো হয়। এক সময় যেখানে মন্দির ছিল এখন সেখানে খালি জায়গায় মেশিনগান দিয়ে নিশানা চর্চা করা হয়। মন্দির বলতে এখন শুধুমাত্র কিছু ইট এবং সিমেন্টের ভিত পড়ে আছে। সৈন্য বাহিনীর সহায়তায় বসতিস্থাপনকারীরা ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়। আশ্রমের কাছাকাছি অন্যান্য বৌদ্ধ মন্দির ছিল সেগুলো পুড়িয়ে দেয়া হয়।

১৯৮৯ সালের ৪ঠা মে এই মন্দিরটি লংগদুর তিনতিল্যা মন্দির পোড়ানো হয়। লংগদুর সোনেই এলাকায় দখলদাররা এই গ্রামে আসে এবং সব ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দেয়। সেটেলাররাও তাদের সাথে ছিল। সেখানে তিনতলায় বনভান্তের মন্দির ছিল। ঐ দিনই দখলদাররা থাইল্যান্ড থেকে আনা বুদ্ধ মূতির্টিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। লংগদুর তিনতিল্যা মন্দিরটির কংক্রিটের কাঠামো এবং সুউচ্চ মন্দিরটি অত থাকলেও ভেতরটা আগুনে ভালোমত পুড়ে যায়। মন্দিরের কোন আসবাবপত্র আর অবশিষ্ট ছিল না। বুদ্ধমূর্তির গায়ে দা দিয়ে আঘাত করার চিহ্ন পাওয়া যায়। মূর্তির একটি কান ভেঙ্গে হয়। আর একটি ছোট বুদ্ধ মূর্তিকে সম্পূর্ণভাবে পুড়ে ফেলা হয়।

পানছড়ির পুজগাং মন্দির মন্দিরটি আক্রমণ করা হয় প্রথমবার ১৯৮৬ সালে এবং আবার ১৯৮৯ সালের ২৮ জুন। মন্দিরের সামনের অংশ সম্পূর্ণরুপে ধ্বংস করা হয় এবং ভেতরে একটি বেদীর উপর অবস্থিত তিনটি বৌদ্ধ মূর্তির মাথা ভেঙ্গে ফেলা হয়।

খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি ইউনিয়নের বৌদ্ধ বন ভিক্ষু কুঠির বুধবার ১৪ জুন ২০০৬ সকালে সন্ত্রাসীরা পুড়িয়ে দিয়েছে। পাহাড়ীদের বৌদ্ধবিহারে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভ বিরাজ করছে। ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ), খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা নাগরিক কমিটি পৃথক বিবৃতিতে অভিযোগ করে সকাল ৭ টায় নুনছড়ি সেটেলার বাঙালীরা দলবদ্ধ হয়ে মাইসছড়ি মৌজার বৌদ্ধ বন ভিক্ষু কুঠিরে(বৌদ্ধ বিহার) এ অগ্নিসংযোগ করে। (যুগান্তর ১৫ জুন,২০০৬)

এই সমস্ত ঘটনা প্রমাণ করে সাম্প্রতিক সময়ের বাঘাইছড়ির সংঘর্ষও আসলে সকল অমানবিকতাকে ছাড়িয়ে যায় এবং তার উদ্দেশ্য কোন জাতি গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করবার দূরভিসন্ধির পথে পরিচালিত। ভাষা-ধর্ম-আচার সংস্কৃতির ওপর আঘাত বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। দখল এবং আগ্রাসনকে জায়েজ করবার সকল হীনতাকে আঘাত করতে হবে। সরকারকে পালন করতে হবে কঠোর ভুমিকা এবং অবশ্যই তা ন্যায়ের পথে। কোন গোষ্ঠির বা বাহিনীর চক্রান্তের কাছে নতজানু হয়ে থাকার পরিণতি এমন অনেক খুন আর হত্যাকেই বারে বারে ফিরিয়ে আনবে। দখলদারদের কোন জাত নেই।
৩১টি মন্তব্য ২৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×