অগ্রজ বল্লেন, ‘এ আবার কেমন কথা? ‘বৌ’ এর বানান ‘বৌ’ হতে ‘বউ’ হলো কবে থেকে?’ অনুজেরা উত্তর দিলেন, ‘গুরু তোমার ‘বৌ’ একটু সেকেলেতো তাই মাথায় ঘোমটা (ৌ) দিয়ে চলে, আর আমাদের ‘বউ’ একটু আধুনিকতো তাই সঙ্গে সাথী (উ) নিয়ে চলে’।অনুজদের উত্তরে শ্মশ্রুমন্ডিত সুদর্শন বয়:বৃদ্ধ গুরু বুঝলেন আজকালকার ছোকরা গুলোর অকাট্য যুক্তির সাথে তর্ক করে লাভ নেই, তাই দাঁড়িতে হালকা হাত বুলিয়ে উপবিষ্ট অনুজদের প্রতি প্রশ্রয়ের যে হালকা হাসিটি দিয়েছিলেন সে হাসি আমি যেনো আজও দেখতে পাই।বলাই বাহুল্য অগ্রজটি আর কেউ নন, আমাদের রবীন্দ্রনাথ, আর অনুজদের গ্রুপটি সে সময়কার কল্লোল যুগের (১৯২৩-১৯৩৫)বাংলা সাহিত্যের কান্ডারী বুদ্ধদেব বসু, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, অমিয় চক্রবর্তী সহ আরো অনেকে।ঘটনাটি পড়েছিলাম বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত চিঠিপত্র সংকলন সন্ক্রান্ত কোন একটি বইয়ে যার নাম এই মূহুর্তে মনে পড়ছেনা। সাহিত্যে ভাষার ও শব্দের ব্যবহার নিয়ে যতরকম কাঁটাছেড়া করা যায়, রবীন্দ্রনাথের মতো আর কেউ বোধ হয় তা করেননি এবং ভদ্রলোক যে এটাকে একরকম একক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছিলেন এতে কোন সন্দেহ নেই।বাংলা ভাষায় তার সৃষ্ট অনেক শব্দ তাই প্রতীয়মান করে।তাই অনুজদের শব্দ নিয়ে বাড়াবাড়ি তার ভালো না লাগলেও হাসিমুখে মেনে নিতেন তা বোধ হয় কালের দাবীকে উপেক্ষা করতে না পেরেই।হয়তো তার মনে পড়ে যেতো, এক সময় বঙ্কিমচন্দ্রকেও তার মতো সময় পার করতে হয়েছিলো।
এরপর সাহিত্যের ধারায় অনেক পানি গড়িয়েছে।আখতারুজ্জামান ইলিয়াসেরা ভাষার নান্দনিক উপস্থাপনের চেয়ে জীবনের রুঢ় বাস্তবতার আক্ষরিক উপস্থাপনকে বেশী প্রয়োজনীয় বলে অনুভব করেছেন এবং কথ্যভাষাকে সাহিত্যে জায়গা করে দিয়েছেন।চলচিত্র, নাটক ইত্যাদি মাধ্যমেও এর ব্যাপক ব্যবহার ইদানীং লক্ষ্য করা যায়।এক্ষেত্রে শিল্পের নান্দনিক উপস্থাপনার বিতর্কে যেতে চাচ্ছিনা কারন এ বিতর্ক চিরন্তন আবহমান এবং অমীমাংসিত।একদল একদিকে তো আর এক দল আরেক দিকে।
এখন ইন্টারনেটের যুগ, শিল্প সাহিত্য আর কাগজের ছাপা অক্ষরের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই।এর ব্যপ্তি ছড়িয়েছে এখন ইলেক্ট্রনিক ভিজুয়্যাল ইলিউশনে।ব্লগ সাহিত্য বোধ হয় এর একটি রুপ।অনেকের লেখা পড়েছি এই ব্লগে।অনেকের লেখাই ভীষণ ভলো লাগে।কেউ সাহিত্যের ভাষা ব্যবহার করেন, কেউ পুরামাত্রায় কথ্যভাষা আবার কেউ দুটোর সংমিশ্রণে লেখেন।এর মাঝে যোগ হয়েছে আঞ্চলিক ভাষা/শব্দ/টোন।সবগুলি ফর্মেরই একেকরকম গ্রহণযোগ্যতা আছে (অন্তত আমার কাছে)।আমার মনে আছে, আমি প্রথম যেদিন এই ব্লগে পড়লাম ‘মুঞ্চায়’ অথবা ‘কস্ কি মুমিন’, আমার হাসতে হাসতে বিছানা থেকে পড়ে যাবার উপক্রম, চোখের পানি এবং পেটে ব্যথার কথা না হয় উহ্যই থাক।সাহিত্যের বিজ্ঞ জনেরা হয়তো সাহিত্যে এসবের ব্যবহার এর সাহিত্যিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন, কিন্তু আমার মনে হয় গ্রহণযোগ্যতা যদি সাহিত্যের মূল্যমানের অনেকগুলো মাপকাঠির একটি হয় (সবসময় নয়, কমল কুমারের একটি বই সর্বসাকুল্যে ২৫ কপি বিক্রি হয়েছিলো, কিন্তু তাতে তার সাহিত্য মান একটুও কমেনি) এবং সবাই যদি তা গ্রহণ করে তবে সাহিত্যেরতো লাভ বই ক্ষতি দেখিনা।কেউ যখন কোন একটি পোষ্টের প্রতিউত্তরে বলে ‘লন্ডন যাইবার মুঞ্চায়’, আমি অবাক হয়ে দেখি কী অদ্ভুতভাবে সরলতার প্রস্ফুটন ঘটে ভাষার মাধ্যমে। মূহুর্তের জন্য ভুলে যাই ভিডগেন্ষ্টাইনের ভাষার দূর্বলতার যুক্তি গুলি (যদিও আমি তার সংগে একমত)।
সাহিত্যের বিজ্ঞজনদেরও বোধ হয় কালের দাবী মানার সময় হয়ে গিয়েছে।যেভাবে বঙ্কিম বা রবীন্দ্রনাথেরা মেনে এসেছেন।নতুন শিশুদের জায়গা দিতে হবেতো।জয় হোক আকাশ ব্লগারদের, ব্লগ সাহিত্যের।শুধু রবীন্দ্রনাথ এই ব্লগের সদস্য হলে কী করতেন দেখতে বড় ‘মুঞ্চায়’।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



