পূর্ব প্রকাশের পর.
Click This Link তৃতীর পর্বের লিংক
ক্লাশ নাইনে সময় অদ্ভুত দ্রুত কাটতে লাগল।সময়টাকে আমার এখনও মনে হয় বড়ই মধুর।আমি দেখতে থাকি আমার বন্ধুদের চিঠি চালাচালি।এখন ই মেইলের যুগে হারিয়ে যাওয়া চিঠি তখন ছিল অদ্ভুত শিহরণ সঞ্চারী।যখনই কারো চিঠি আসত আমরা ছুটে যেতাম কোথা থেকে এল দেখতে।গার্লস ক্যাডেট কলেজ থেকে আসা চিঠিগুলো অবশ্যি দেখলেই বুঝা যেত।কেননা ওদের হাতের লেখা গুলো যেন একই রকম ছিলো।তা আলমের কাছে যে চিঠি আসত তা দেখার সুযোগ হতো আমার।শাহরুখ নামধারী কোন মেয়ের কাছ থেকে আসত চিঠিগুলো।আর আলমের চিঠি গার্লস কলেজে যেত রুশি নামের মেয়ের পক্ষ থেকে।ক্যাডেট কলেজের স্যারদের সন্দেহের হাত থেকে বাচার এই পদ্ধতি বোধ করি অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছিলো।তাই স্যাররা বুঝে না বুঝার সুনিপুন অভিনয় করত যা পত্রপ্রেরক এবং প্রাপক দুই পক্ষকেই উৎসাহিত করত।রুশি-শাহরুক কিংবা রুশো-শাখরুনার এই অভিনয় চলতে থাকে পুরো ক্লাশ নাইন জুড়ে।প্রেম ভালোবাসা নামক সূক্ষ্ম মানবিক আবেগগুলোকে আমি চিনতে শুরু করি প্রিয় বন্ধু আলমকে দেখেই।পরের বন্ধে ম্যাবসে পড়তে যাওয়ার আগ্রহও বাড়তে থাকে এভাবেই।
আলমকে নতুনভাবে দেখতে থাকি ।তার মধ্যকার পরিবর্তন গুলো ধরা পরে আমার চোখে।সে মাঝে মাঝে একা একা বসে কী যেন ভাবে?একদিন আমি জিজ্ঞেস করতে সে বলল,আচ্ছা আমি এখন যেভাবে বসে একজনকে ভাবছি আরেকজনও কি আমাকে ভাবছে সেই ভাবে?আমি কিছু বলি না,কিন্তু জানি ।হ্যা আলম,তোমার মত আরেকজনও তোমাকেই ভাবছে আর তার পাশে এখন আমার মত হয়তো কেউ জানতে চাইছে তার উদাসীনতার কারণ।পরেও অনেক বারই পরিচয় পেয়েছি ওদের ভালোবাসার গভীরতা।যেদিন আলমের সাথে শেষ দেখা হলো সেদিনও আমার পাশে রিকশায় বসে সে কথা বলছিল ওর সাথে ফোনে।না আমার কিছু হবে না ,আমি ঠিক পৌছে যাবো বাসায়-তাকে নিয়ে সদাউৎকন্ঠিত শাখরুনাকে এভাবেই শান্ত করেছিলো আলম।
ক্যাডেট কলেজের ফুর্তি থেমে ছিলো না অবশ্য।আমি ধীরে ধীরে উচু শ্রেনীর চাপাবাজে পরিণত হলাম।চাপাবাজি মানে যে কোন বিষয় নিয়ে একটা চাপা মেরে দেওয়া ছিল আমার স্বভাব।শুধু আমি ই না এরকম আরো অনেকেই ছিলো।বিশেষত খেলার স্কোর নিয়ে চাপাবাজিটা জমত বেশি।ক্রিকেটের জোয়ারের কারণে যা মনে চায় একটা কিছু বলে রেফারেন্স দিতাম সিনিয়র এক ভাইয়ের যার রেডিও আছে।আলম এক্ষেত্রে ছিলো আমার বিপরীত-অচাপাবাজ।এই অদ্ভুত শব্দটা আমদানি করলাম ওকে বোঝাতেই।সে একটা সত্যি স্কোরকে বলত চাপাবাজির ভঙ্গিতে।এতে সবাই ওটা চাপা মনে করত।সে সোজা বাজি লেগে যেত।এবং বাজিতে তার জয় হত।বাজি জিতের এ কৌশল অবলম্বনে সে যে অভিনয়(চাপা মারার) করত তা না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল।
আলমের একটা বিখ্যাত নিকনাম ছিলো কাহিনীবাজ।কারন সে সব ঘটনা কে কাহিনী করে বলত।আর মজার ব্যাপার হলো ক্লাশে স্যারদের সব কাহিনী সব জোকসই তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো।সে বিষয়টা এনজয় করত।যদিও আমরা বললে সে কপট রাগের ভান করত।মনে পড়ে আমরা যখন টুয়েলভে আলম কাহিনী বলা শুরু করলে আমার এক বন্ধু রিফাত কাগজ কলম নিয়ে গোনা শুরু করত।ব্যাপারটা আলম প্রথমে বুঝে নি।সে আমাকে একদিন জিজ্ঞেস করল ব্যাপারটা।তখন আমরা সব কিছুই রেটিং করতাম।যেমন জোকস রেটিং মোটা রেটিং ন্যাস্টি রেটিং ইত্যাদি।আলম ভেবেছিলো সে রকম হয়তো কিছু।কিন্তু আমি পুরো ব্যাপারটা বলতেই সে আমার দিকে কপট রাগের ভান করে তেড়ে এল।
তা এ কাহিনীবাজ আলমের বহু কাহিনীর সাক্ষী আমি।সেই কাহিনী গুলো কেবলই স্মৃতির দুয়ারে হানা দেয়।কিছুক্ষনের জন্য আমাকে থামিয়ে দেয়।
বহুদিনের সাথী বহু যুদ্ধের সহযোদ্ধা আলম এসে পড়ে আমার স্মৃতি পটে।তার সহজ সরল কিছুটা বোকামি পুর্ন কিছুটা কৌতুক ময় আচরন আমাকে হারিয়ে নিয়ে যায় সেই দিন গুলোর মাঝে। একদিনকার কথা।আফটারনুন প্রেপ থেকে ফিরছি। চুরালিয়া খ্যাত মোহিব ভাই আমাদের সামনে।তার প্রিয় ডায়লগ ছিল,সিনিয়র মনে হয় না।লাথথি মাইরা হাউস থেকে বাইর কইরা দিমু।তা তাকে দেখে আলম বলে বসল।ফুটবলার মনে হয় না।গোল দিয়া জাল ছিড়া ফালামু।সাথে সাথেই চুরালিয়া মোহিব আমাদের দুইজনকে ডেকে বসলেন।তখন যে কী অবস্থা হয়েছিলো তা নিশ্চয় সবাই বুঝতে পারছেন।
আরেকদিনের কাহিনী।নতুন জুনিয়র প্রিফেক্ট সাজিদ ভাই।তিনি যেমন একদিকে রাগী অপরদিকে মজার।তা আমরা রুম ক্রিকেট খেলে ধরা খেলাম।সাজিদ ভাই ডাকলেন।বললেন,হুম আমি কে?উত্তরটা কি হতে পারে আমরা ভেবে বসার আগে আলম বলে বসল,জ্বী,আপনি সাজিদ ভাই।
সাজিদ ভাই ক্ষেপে গেলেন।যাও গেমস ড্রেস পরে আসো।তো এলাম।এইবার বলো আমি কে?আমরা ততক্ষনে বুঝে গেছি কী বলতে হবে।কিন্তু হাসান নামে আমাদের একজন শয়তানি করে আবার বলল।আপনি সাজিদ ভাই।হ্যান্ডস ডাউন হও সবাই।বল আমি কে?আমরা একত্রে বলে উঠলাম আপনি জুনিয়র প্রিফেক্ট।সাজিদ ভাই হাসলেন।
সবাই যাও শুধু হাসান থাকো।তার পর হাসানের ভাগ্যে কিছু প্যাদানি জুটল।আসলে সাজিদ ভাই সবসময় তক্কে তক্কে থাকতেন হাসানকে সাইজ দিতে।আর হাসানও লেগে থাকত সাজিদ ভাইকে বিরক্ত করার নিত্য নতুন কৌশল বের করতে।
নাইন টেনের সেই দিন গুলো আজও আমার স্মৃতিতে অম্লান।বড়ই স্মৃতি কাতর করে তুলে দিন গুলি।আড্ডা দুষ্টামি ঝগড়া জুনিয়র সাইজ দেয়া কিংবা সিনিয়রের পিছে লাগা এসব নিয়ে দিন গুলো ছিল বৈচিত্র ময়।আর সে দিন গুলোর সবচেয়ে বর্নাঢ্য চরিত্র আমার হারিয়ে যাওয়া বন্ধু আলম।
চলবে.....
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুলাই, ২০০৮ দুপুর ১২:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


