somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ক্যাডেট নম্বর ১৮৬২-অসময়ে হারিয়ে যাওয়া অতি আপনজন (পর্ব ৬)

১৯ শে আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৪:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পূর্ব প্রকাশের পর
Click This Link পঞ্চম পর্বের লিংক (এখানে আগের গুলোর লিংক ও পাওয়া যাবে)

কখনও কখনও সেই দিন গুলিকে মনে হয় স্বপ্ন কিংবা বলা চলে ঘোর। ঘোর লাগা আমাদের সময়- সেই ক্লাশ ইলেভেন।যে সময়ের প্রতীক্ষা সকল ক্যাডেট করে থাকে তার ক্যাডেট জীবনের প্রথম দিন থেকে।সেই সময়টার দিকে যখন ফিরে তাকাই তখন আমার কাছে মনে হয় যেন কোন সোনালি সুখ স্মৃতি।সেই সোনালি দিন গুলিকে রবি ঠাকুরের সেই নানা রঙের দিন গুলির চেয়েও বেশি রঙিন মনে হয়।ক্লাশ ইলেভেনে আসতেই আমার বন্ধুগুলো বদলে যায়।বাল্যকাল পেরিয়ে কৈশোরের দুয়ারে ঢোকার জন্যই যেন এই পরিবর্তন।আগের সেই সময় আমাদের সাথে থাকে।কিন্তু আমরা যেন একটু একটু করে পরিপক্ক হতে শুরু করি।তাই এসময়কার দুষ্টামি গুলোতে যেন আরো বেশি মুন্সিয়ানার ছাপ।

পরিবর্তনের হাওয়া টের পাই নিজের মাঝেও।এখন আমরা আগের মত তুচ্ছ বিষয়গুলো নিয়ে ঝগড়ায় মেতে উঠি না ।সিনিয়র হয়েছি এই বোধ কাজ করে সবসময়।এই বোধ থেকেই হোক কিংবা অজানা কোন ঝোকেই হোক আমাদের ক্লাশমেটদের ব্যাক্তিগত ক্ল্যাশগুলো মিটে যেতে থাকল অতি দ্রুত।এমনি কোন ভাবেই আমাদের কয়েকজনের সাথে আলমের দ্বন্দ্বের অবসান হলো।এরপর মনে হলো আমাদের মধ্যকার সেই দ্বন্দ্ব সেই ঝগড়া আমাদের মাঝের অদৃশ্য সুতাটাকে অনেক শক্ত করে ফেলেছে।আর আলম আমার কাছে আগের চেয়ে অনেক অনেক কাছের মানুষ বলে মনে হতে লাগলো।

ইলেভেন টুয়েলভের সেইদিন গুলো আমার কাছে খুবই মোহময় মনে হয়।তার যেন কোন শুরু নেই কিংবা শেষ নেই কিংবা আছে যা আমরা বুঝি শেষ হওয়ার পর।সেই দিন গুলি মনের ফ্রেমে সদা উজ্জল। আর সেই দিন গুলিকে আমার কাছে মনে হয় কেমন যেন অখন্ডতায় মোড়ানো।সেই দিন গুলোকে আমি শুধু ছুতে পারি আমার অনুভবে কিন্তু ভাষায় আসে না কিংবা আসে কিন্তু প্রকাশিত হবার আগেই হারিয়ে যায় ক্ষনজীবি শিশিরের মত।সেই দিন সেই ক্ষন ভাসে -ভাসে আমার সমস্ত অনুভুতিতে,ছুয়ে আমার সম্পূর্ন সত্তাকে।সেই দিন এসেছে চলেও গিয়েছে কিংবা যায়নি।সে রয়ে গেছে আমাদের সব কয়তি হৃদয়ে এক নিবিড় আনন্দাধার হিসাবে।

বিশেষভাবে মনে পড়ে সেই সাতদিনের শিক্ষাসফর।সেই স্বপ্ন যাত্রা সেই ছুটে চলা-একটি ক্ষুদ্র বাস ধারণ করে নিয়ে গেছে ৩৮ জন তুচ্ছ মানব সন্তানের অসীম স্বপ্ন গুলোকে।সেই স্বপ্ন দিন স্বপ্ন যাত্রায় আমার সাথে আলমও ছিল।ছিল না বলে বলি,ঐ সময় ঘুরা নিয়ে বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি হয়েছিল আর আলম আমার সাথে সেই গ্রুপে ছিল।মনে পড়ে সেই ফৌজদারহাটের রেস্ট হাউস কিংবা সেই মোটেল লাবনীকে।মনে পড়ে সেই সাতটি দিনে ৩৮ টি প্রানের উচ্ছল দুরন্ত ছোটাছুটি।অতি আপাত তুচ্ছ বিষয়গুলোও যেন শুভ্র আনন্দ হয়ে রূপালি উচ্ছাসের ঢেউ তুলছিল।মনে পড়ে হিমছড়িতে যেতে না পেরে আমি আর আলম প্ল্যান করলাম নতুন কিছু করার।সী বিচে সিগারেট খোজ করে ভালো কোন সিগারেট না পেয়ে অতি নিম্ন সানমুন একসাথে খাওয়ার স্মৃতিও মনে পড়ে।আরও মনে পড়ে হিমছড়িতে না গিয়ে কক্সবাজার সার্কিট হাউস আর বৌদ্ধ মন্দির ঘুরে আমরা এসে ধরা খেলাম এডজুট্যান্ট এর কাছে।সেই সময় কার স্মৃতি গুলোকে এতটা কাছে মনে হয় যেন ধরতে চাইলে সে এসে ধরা দেবে আমার কাছে।

মনে পড়ে সেই ইলেভেনের দিনটির কথা।সেই দিনটি আমি কখনও ভুলিনি।সেদিন আমাদের সেকেন্ড টার্ন জুনিয়র প্রিফেক্ট দেয়ার কথা।তো আমাদের হাউসে সম্ভাব্যদের মধ্যে যে দুজনের নাম ছিল তাদের মধ্যে আলমও ছিল।আমরা অপেক্ষা করছিলাম মোটা আলম কখন তার গগন বিদারী চিৎকারে হাউসের জুনিয়রদের তটস্থ করব।কিন্তু বিধিবাম। সেদিন নোটিশ এল।আলম জুনিয়র প্রিফেক্ট হয়নি।হয়েছে আরেকজন। এর বিরুদ্ধে জোর কিছু বলতে যাব তার আগেই লক্ষ্য করলাম সেই আরেকজনটি হচ্ছি আমি।অসম্ভব মন খারাপ হলো আমার।কিন্তু সেই মন খারাপ কেটে গেল যখন আমি প্রথম অভিনন্দন বার্তাটি পেলাম আমার প্রিয় বন্ধু আলমের কাছ থেকে।

সেই সোন ঝরা দিন আজো আমার মনে ঝড় তোলে ।আমার মধ্যে বয়ে যায় তোলপাড়।আলমের আরেকটি গল্প মনে এল।কোন এক প্র‌্যাকটিকাল পরীক্ষায় আলম সেভ ছাড়া গিয়েছিল।তা দেখে আমাদের এক স্যার বললেন,তোমাকে কেমন লাগছে জান?আলম সবিনয়ে জানতে চাইল কেমন?স্যার উত্তর দিলেন বাংলা সিনেমার বিরহী নায়ক জসীমের মত।সেই থেকে ওর নাম হলো জসীম।এই নামটিও যথেষ্টই জনপ্রিয় ছইল।এর বদৌলতে আমরা প্রতি শুক্রবার অলস দুপুর কাটাতে লাগলাম জসীমের বস্তাপচা বাংলা সিনেমা দেখে।আর তার ডায়লগে আলমের কান যে ঝালাপালা হত তা বলাই বাহুল্য।

এভাবে সময় গড়ায়।পেরিয়ে যেতে থাকে একেকটি সোনালি দিন।সেই প্রেপ ফাকি দিয়ে টয়লেটের কোনে আড্ডা, সেই স্যারদের সাথে খুনসুটি।কখনও নিজেরা আন্ত ফর্ম চক ছুড়াছুড়ি বিবাদে জড়ানো -সবই ভাসে আমার অন্তর্নয়নে।হাউসের সামনে দাড়িয়ে চিয়ার্স দেয়া কিংবা খেলায় ঝিতে ট্রফি নিয়ে উল্লাস এসবও অতীত হয়ে যেতে থাকে ধীরে ধীরে।স্যারের হাতে ধরা খাওয়া কোন হতবুদ্ধি সময় কিংবা প্যারেডে বেল্ট লুজে ইডি খাওয়া এসবও ভীড় জমায় স্মৃতি পটে।কোন অলস দুপুরের অনর্থক আড্ডা কিংবা স্নিগ্ধ সন্ধ্যার রোমান্টিক আলোচনা, গেমস শেষে ক্যান্টিনে খাবার নিয়ে কাপঝাপ করা,শুক্রবার সকালে ক্রিকেট খেলার আশায় গেমস স্টোরে ভিড় জমানো কিংবা ক্লাশে ঘুমিয়ে স্যারের হাতে ধরা খেয়ে সলজ্জ নয়নে হাসা-এমনি আরো অনেক অনেক মধুময় স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ।

ক্যাডেট কলেজ আমার ভালো লাগে কারণ সে ধারণ করে আছে আমার মধুময় কিছু সময়কে।সেই সময়টা সময়ের আবর্তে আরো মধুময় হয়ে উঠেছে আমার হৃদয় পটে।এমনিভাবে একসময় শেষ হয়ে যায় আমাদের ক্যাডেট জীবন।অনেক ভালো লাগা অনেক ভালো লাগার এম সি সি কে আমরা বিদায় জানাই।বিদায় জানাই ক্যাডেট হিসাবে চিরতরে।

ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হবার সময় আলম আমাকে বলেছিলো, ক্যাডেট কলেজে আমরা থাকব না কিন্টু আমাদের নাম্বার গুলো রয়ে যাবে আর এ জনমে আমরা সমসময়ই থাকব একে অন্যের মাঝে।সেই কথা তার হ্য়তো বৃথা হয়নি কিংবা কে জানে হয়েছে ?সেই ক্যাডেট কলেজ হতে আমরা বেরিয়েছিলাম ২০০২ সালে কিন্তু আজও সেই দিন গুলোকে খুব কাছে ধরা দূরত্বে মনে হয়।এত কাছে তবুও এত দূরে......আমার ক্যাডেট কলেজের সোনার দিন গুলি।

(ক্যাডেট কলেজের কথা এখানেই শেষ কিন্তু ক্যাডেট নম্বর ১৮৬২ এর আরো কিছু গল্প রয়ে যায়।সেই গল্প টুকুর জন্য এই লেখা চলবে)
৮টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×