সূচনা Click This Link
১ম পর্ব Click This Link
২য় পর্ব Click This Link
৩য় পর্ব Click This Link
৪র্থ পর্ব Click This Link
৫ম পর্ব Click This Link
৬ষ্ঠ পর্ব Click This Link
৭ম পর্ব Click This Link
পূর্ব প্রকাশের পর.......
আমার লেখাটা বড্ড এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে আজ।আলমের সাথে সেই রিইউনিয়নে কাটানো সময়টাই ওকে শেষবারের মত অনেক কাছে থেকে পাওয়া। সে সময় অনেক কথাই হলো।কথা হলো তাকে নিয়ে তার ভবিষ্যত নিয়ে।সে বলে গেল অকপটে যেভাবে সে বলে এসেছে এতদিন ধরে।সে বলে গেল তার ভালোবাসার মানুষটির কথা।তার শীঘ্র আগত বিয়ের কথাও বলল।সেই বিয়েতে কী হবে এই জাতীয় মজাও হলো।সেই রিইউনিয়নে আমরা আলমের ভুড়ি উচিয়ে ঘুমানোর ছবি তুললাম।তুললাম আরো অনেক বেফাস ছবি।সেই সময়টাই যেন ফিরে ফিরে আসে।আর সেই ভুড়ি উচিয়ে শোয়ার আলমীয় দৃশ্য চোখের সামনে আসে বারে বার।
****
সেই দিনটা ১৭ই মার্চ ২০০৭।পরদিন বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলা।
সেদিন আলমের বাসায় গেলাম।সেদিন কল্পনাতেও বুঝিনি পরের যাওয়া কত ভয়াবহ কষ্টের হবে।সেদিন আলমের সাথে বিশ্বকাপ নিয়ে অনেক কথা হলো।সে কোথায় চাকরির ভাইভা দিয়েছিল তার কথা বলল। বরাবরের মতই কাহিনী করে।তার পর আমাকে বলল,চল তোমাদের হলে যাই।সেখানকার হালিমটা আমার খুব ভালো লাগে।ওর গাড়িতে ওঠলাম আমরা ।ও ওর ছোট ভাইটিকে নামিয়ে দিল কোথায় যেন।তারপর আমরা তিন বন্ধু মিলে বুয়েটে এলাম।বুয়েটের ক্যান্টিনে ওকে হালিম খাওয়ালাম।শহীদ মিনারে বসে আড্ডা হলো।তারপর আমরা শর্মা হাউসে গেলাম পিজা খেতে।যাওয়ার পথে ক্রিকেটার মানজারুল রানার মৃত্যু সংবাদ শুনলাম।আমরা সবাই খুব দুঃখ করলাম।আলম বলল,"রানার জন্যই কাল জিতবে বাংলাদেশ।আহারে।এত অকালে চলে গেল সে।"তখন কী জানত সেই রানার চেয়েও অকালে তাকে চলে যেতে হবে।
*****
শর্মা হাউসে থাকা অবস্থায় তার ফোন এল শাখরুনা র থেকে।আমার পাশে বসে তাকে বলতে শুনেছিলাম আমার কিছু হবে না তো।চিন্তা করো না জান।আমি ঠিক পৌছে যাব।এখন খেয়েছো তুমি........।শর্মা হাউস থেকে বের হয়ে একত্রে সিগারেট ধরালাম তিনজন।সেটাই ওর সাথে শেষ সাক্ষাত।কথায় কথায় নানা কথা হলো।ফুটবল নিয়ে কথা হলো।তার প্রিয় এসি মিলান ম্যানইউর একটা চ্যাম্পিয়ন হবে এসব আজেবাজে আলোচনায় রাত হলো।সে গাড়ি নিয়ে আমাদের থেকে বিদায় নিল খোদা হাফেজ বলে।
*******
দিনটি ছিল ২৪শে মে।আগের রাতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল দেখে ঘুম থেকে উঠেছি একটু বেলা করেই।সিসিএনএ এর আজেইরা ভর্তি পরীক্ষা দুইটা থেকে।আমি লাঞ্চ করে রওয়ানা হয়ে ঢুকেছি পরীক্ষার হলে। মোবাইলটা বন্ধ করতে যাব এমন সময় আমার বন্ধু সুমিতের ফোন এল।
আ..........(আমার আসল নাম) তুমি কোথায়?আমি পরীক্ষার হলে।সে চিৎকার করে উঠল এখনই বাংলাদেশ মেডিকেলে চলে এস আর আসার আগে আমাদের কলেজের যাকে পার নিয়ে আসো।সেই কথায় এমন কিছু ছিলো যা আমাকে বের করে নিয়ে গেল পরীক্ষার হল থেকে।কলেজের কোন বন্ধুর কি কিছু হয়েছে?আমি কালবিলম্ব না করে আলমকে ফোন দিলাম।আলমের ফোন বন্ধ।বুকের ভিতরটা ছ্যাৎ করে উঠল।তাহলে কী ওর কিছু হলো?বন্ধু তোফিককে ফোন দিলাম।কোথায় জানতে চাইলে শুধু কান্নার গোঙানি শুনতে পেলাম।আশিককে ফোন দিতে ও জানাল ও আসছে কিন্তু কী হয়েছে আমি জানলাম না।জানতে পারলাম না।এনসিসি ব্যাংকের সামনে কেমন যেন পুলিশ প্রহরা দেখলাম।তার পর বাংলাদেশ মেডিকেলে আমার বন্ধুদের দাড়িয়ে থাকতে দেখলাম।মাশরুরকে বললাম,কী হয়েছে?সে শান্তকন্ঠে জবাব দিল আলম মারা গেছে। আমার সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল সব।
আমরা অনেক সময় ই মানুষকে বোকা বানাতে এইসব চাপা মারতাম। চোখ বন্ধ করলাম যেন মনে হলো এখন ই আলম এসে হাসতে হাসতে বলবে ভয় পেয়েছিলে?
চোখ খুললাম না কেউ এল না।দুষ্টামির লেশ নেই কারো চোখে মুখে আসলেই হারিয়ে গেছে আমাদের আলম।ব্যাংকের সামনে টাকা ছিনতাইকারীদের সাথে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে ওদের গুলিতে সে চলে গেছে অনেক দূরে।
******
মেডিকেলের মর্গের সামনে আমরা সবাই দাড়িয়ে।ক্যাডেট কলেজ আমাদের শিখিয়েছিলো চোখের অশ্রু দুর্বলতার চিহ্ন।সেই অশ্রু সংবরণের কোন চেষ্টা কারো মাঝে নেই।আমাদের মনের মধ্যে যে ঝড় বইছে তাকে প্রকাশ করার কোন মানবীয় মুদ্রা নেই।অদ্ভুত ফাকা ফাকা লাগছে চারদিক।শাখরুণার অবস্থাও ভালো নয় ।চোখের সামনে আলমের মৃত্যুতে সে ফেইট হয়ে আছে।সে দিকে ভাববার মতো মনের অবস্থা আমার নেই।আমাদের কাহিনীবাজ আলম এভাবে নিজেই এত বড় কাহিনী হয়ে হারিয়ে যাবে তা বোধ করি অনুমানেরও বাইরে।পোস্টমর্টেম শেষে তার লাশ মাইক্রোতে তোলা হলো।সেই সময় তাকে দেখবার একটু সুযোগ হলো।না ক্ষত বিক্ষত কোনলাশ নয় একেবারে সেই আলম রিইউনিয়নের মত ভুড়ি উচিয়ে শুয়ে আছে।কোন ক্লেশের ছাপ নেই তার চেহারায়।শুধু গালের কাছে কিছুটা জায়গা ছরে গেছে।যেখান দিয়ে তার শরীরে প্রবেশ করেছে সেই প্রানঘাতী গুলি।
******
মেডিকেল থেকে বেরিয়ে বুয়েটের দিকে হাটতে শুরু করি।চিরচেনা এই পথকে অচেনা মনে হতে থাকে।আকাশে মেঘ করেছে।এত গুলো প্রানের চাপা আর্তনাদের সাথে সে যেন একাত্ম ঘোষনা করেছে।আমার মনটা অদ্ভূত বিষন্নতায় ভরে আছে।কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না।সেই হাসি খুশি সদা উৎফুল্ল বোকাসোকা ভালো লাগার প্রিয় সেই মানুষটি বারবারই আসছে আমার দৃষ্টিসীমায়।আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না।কিছু ভাবতে পাচ্ছি না।সব এলোমেলো হয়ে আছে।একসাথে।সেই আলম সেই সেলিম সেই জসীম সেই সদরুল যাই বলি তার এই অকা প্রয়ান আমাকে আঘাত করে চলে প্রতিনিয়ত।আমাদের সকল ব্যাচ গেট টুগেদারে আমরা অনুভব করি তার বিদেহী আত্মার সরব উপস্থিতি।
*****
ক্যাডেট নম্বর ৫৯৫ নামে মোস্তফা মামুন ভাইয়ের একটা বই পড়ে ছিলাম।অদ্ভুত ভাবে সেকানে এক ক্যাডেট মারা যায় ।সেই ফিলিংস গুলো বুঝতে পারিনি তখন।আদিখ্যেতা মনে হয়েছিল সেদিন।সেদিন কী জানতাম আমাকেও একদিন আরেক মৃত ক্যাডেটের গল্প লিখতে হবে।ভুল বললাম মনে হয় আলম মরে গিয়েও মিশে আছে আমাদের সবার মাঝে।আমি তার উপস্থিতি অনুভব করি যখনই ক্যাডেট কলেজের গল্প আসে।খোদা তার বিদেহী আত্মার মঙ্গল করুন।আলম তুমি যেখানেই থাকো ভালো থেকো তোমার সকল বন্ধুদের পক্ষ থেকে আমার শুভকামনা রইল।অনেক কথাই মনে আসছিল।কিন্তু চোখ ধরে আসছে আঙ্গুলগুলো যেন বিদ্রোহ করতে চাইছে।মাথায় শুধু ঘুরছে একটি কথা একটি কথাই।সেটা হলো ক্যাডেট নম্বর ১৮৬২।
(সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১২:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


