রিক্সায় ওঠা মাত্রই টায়ার পাংচার।ফুসসসস্.. করে সব বাতাস বেড় হয়ে যাচ্ছে।অনেক দৌড়াদৌড়ি করে যোগার করা রিক্সাটাও গেলো।দীপ্তর মনে হলো সে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভাগ্যবান প্রেমিক।যে কিনা তার প্রেমিকাকে দেয়া একটা কথাও রাখতে পারে না।কোনদিন সময় মতো ডেটিং এ পৌঁছতে পারে না,তার প্রেমিকা সীমাকে তার পছন্দমতো গিফট টা দিতে পারে না,রাতে মোবাইলে কথা বলার সময় চাঁদের দিকে তাকিয়ে ইনসট্যান্ট কবিতা বানাতে পারে না এমন কি মওকা মতো দু’একটা মুখস্থ কবিতার লাইনও আওড়াতে পারে না। হয়তো খুব রোমান্টিক মুহুর্ত, বিকেলে দু’জন রিক্সায় করে যাচ্ছে, আকাশে মেঘ, তখন একজন আদর্শ প্রেমিকের উচিত খুব রোমান্টিক একটা কবিতা থেকে দু’এক লাইন বলে পুরো পরিবেশটাকে আরো রোমান্টিক করে তোলা, অথচ তখন দীপ্তর মাথায় হয়তো তা না এসে আসবে ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে এলো বান..’ টাইপের শিশুতোষ ছড়া।অথচ সীমা না থাকলে কিন্তু তা হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে দীপ্ত খুব ভালো আবৃত্তি করতো।দু’বার ইন্টার ভার্সিটি চ্যাম্পিয়নও হয়েছে।রবীন্দ্র,জীবনানন্দের অনেক কবিতাই তার পুরো মুখস্ত।কিন্তু এই মেয়েটার সামনে আসলে সব কিছু যেন কেমন হয়ে যায়।কবিতা টবিতা যেন কোথায় পালায়।
দীপ্ত রিক্সা থেকে নেমে গেলো। যে কোন ভাবে অন্য কিছু একটার ব্যাবস্থা করতে হবে।শালার আজ কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না।না একটা রিক্সা না সি এন জি।সবারই মনে হয় একসাথে ভ্যালেন্টাইন লেগেছে।প্রতিটা রিক্সায় একটা করে জুটি। আর কিছুক্ষন পর অবশ্য দীপ্তও সীমাকে নিয়ে এমনি করেই উদযাপন করবে তাদের সম্পর্কের প্রথম ভ্যালেন্টাইনস ডে। আদৌ পালন হবে কি না কে জানে।আজকে সিওর সীমা তার সাথে সম্পর্কই ভেঙ্গে দিবে।কারন প্রতিটা দিনই সে দেরী করে। অন্যদিন না হয় দেরী করা মানা যায়, তাই বলে আজ।নাহ, যেভাবেই হোক একটা কিছু জোগার করতেই হবে। হাতে আছে মোটে ত্রিশ মিনিট।বেশী সাজগোজ করতে গিয়ে দেরী করে ফেলেছে।সীমার দেয়া পাঞ্জাবীটা পড়েছে আজ দীপ্ত।সকালে সেলুন থেকে হেয়ার ট্রিটমেন্ট নিয়ে এসছে।অনেক দামী ডিওডোরেন্ট টারও উদ্ভোধন করেছে।কিন্তু রিক্সা খোঁজার দৌড়াদৌড়িতে ঘেমে সেই ঘামের গন্ধের সাথে ডিওডোরেন্টের গন্ধ মিলে একটা বোটকা গন্ধ বের হচ্ছে।দীপ্ত বগলের কাছে নাকটা নিয়ে নিজেই নাক কুঁচকালো গন্ধে।
সামনে একটা সি এন জি দেখা যাচ্ছে।এটাকে ধরতেই হবে।
-‘মামা বেইলী রোড, প্লিজ মামা’
-‘না ওদিকে আজ যামু না, কঠিন জ্যাম লাগছে।‘
-‘মামা প্লিজ মামা, আপনি যা চাইবেন তাই দিবো।‘
-‘হে হে আমি যা চাই তা আফনে কেমতে দিবেন।‘
সি এন জির ড্রাইভার খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠলো।
উপায় না দেখে দীপ্ত জিজ্ঞস করলো,’কি চান বলেন’?
-‘একটা বিয়া করবাম চাই, বউ খুজতাছি।‘
বত্রিশপাটি দাঁত বেড় করে হাসলো ড্রাইভার।
-'মামা আপনারে মিটারের চাইতে পঞ্চাশ টাকা বেশী দিবো, চলেন মামা, চলেন'।
ড্রাইভারের দয়া হলো না লোভ হলো কে জানে, রাজী হয়ে গেলো।দীপ্ত এমনিতে তেমন ধার্মিক না, কিন্তু এই সময় সি এন জি টা পেয়ে গিয়ে তার মনে হলো আসলেই আল্লাহ আছেন, আর তার পক্ষেই আছেন।
কিছু দূর যাবার পড় সি এন জি টা একটা পেট্রোল পাম্পে ঢুকলো। তার নাকি গ্যাস শেষ হয়ে গেছে।সেখানে বিশাল লাইন।কমপক্ষে আধঘন্টার ধাক্কা।পৃথিবীর নিষ্ঠুরতায় দীপ্ত আবার অসহায় বোধ করলো।সব মড়া এসে তার কপালে পড়ে কেন?গ্যাস শেষ হওয়ার আর সময় পেলো না। ড্রাইভার ব্যাটাকে মনে মনে গালাগালি শুরু করলো দীপ্ত।শালা তুমি আর তোমার চৌদ্দগুস্টি জাহান্নামে যাও।আজ আমার সীমা যদি আমাকে ছেড়ে যায়, দেখবা তোমার জীবনেও বিয়ে হবে না।হলেও তোমার বৌ তোমাকে সারাদিন ঝাটাপেটা করবে।
দশ মিনিট বসে থেকেও যখন গ্যাস নেয়ার লাইন একটুকু এগুলো না দীপ্ত তখন ড্রাইভারকে কিছু টাকা হাতে গুজে দিয়ে দৌড় লাগালো বাস স্ট্যান্ডের দিকে।বিপদ যখন আসে তখন মনে হয় একদম দলবল নিয়েই আসে। তাই রাস্তার পাশের কোন একটা কুকুর তাকে দৌড়াতে দেখে কি ভাবলো কে জানে প্রবল জোড়ে ঘেউ ঘেউ জুড়ে দিলো আর তার পেছনে দৌড়ুতে লাগলো।তার সাথে এদিক ওদিক থেকে আরো কিছু কুকুর বেড় হয়ে এলো।কুকুরের তাড়া খেয়ে আর সীমার রাগে লাল হওয়া চেহারার কথা মনে করে কিভাবে যে দীপ্ত চলন্ত বাসের হাতলটা ধরে ফেললো তা মনে হয় সে নিজেও বলতে পারে না।ততক্ষনে তার ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি পুরো দুমড়ে মুচড়ে গেছে।দরদর করে ঘাম পড়ছে আর ডিওডোরান্টের গন্ধ যে কোথায় হাওয়া হয়ে গেছে কে জানে।
মগবাজারের কাছে এসে বাসটা থেমে গেল।কারন সামনে রেল ক্রসিং। ট্রেন আসছে।রিং রিং করে
সিগনাল বাজছে আর দীপ্তর কাছে মনে হচ্ছে কেউ তার মাথাটাকে স্কুলের ঘন্টা ভেবে হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি মারছে।এর মাঝে কোথ্থেকে এক লোক বাসে উঠে নানা প্রকার খুজলি পাচরার ওষুধ বিক্রি করার বয়ান শুরু করলো। শরীরের কোন কোন চিপায় কি কি চুলকানি হতে পারে তার বিস্তৃত বর্ননা।মানুষের শরীরের নানা প্রকার চিপা চাপার নাম শুনতে শুনতে দীপ্ত মনে মনে দোয়া দরুদ পড়া শুরু করলো।কেন তার কপালে আজ আল্লাহ এমনটা বিপদ রাখলো।বিপদটাতো অন্যদিনও রাখতে পারতো।
আপ ট্রেনটা চলে যাওয়ার পরও যখন রেল ক্রসিংএর সিগনালটা উঠলো না আর সেটা একটা ডাউন ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো, দীপ্ত তখন মুটামুটি নিশ্চিত যে আজ আর সীমাকে কিছুতেই সামলানো যাবে না।বেচারী নিশ্চিত এতোক্ষনে মহিলা সমিতির সামনে এসে দাড়িয়ে আছে।বিয়ের আগেই ডিভোর্স হয়ে যাবে আজ।মোবাইলটা দিকে তাকালো দীপ্ত। একটা কি ফোন দিবে? ফোন দিলে নিশ্চিত এখন তাকে তার পুরোনো নানা রকম অপরাধের কথা শুনতে হবে।কবে কোথায় কতক্ষন সীমা তার জন্য দাড়িয়েছিলো ইত্যাদি ইত্যাদি।তার চেয়ে একবারে গিয়ে একদম সীমার পা ধরে ফেলবে।সবাই দেখলে দেখুক, মান ইজ্জত গেলে যাক।
অবশেষে বাসটা ছাড়লো।এরমধ্যে আধ ঘন্টা বেশী দেরি হয়ে গেছে।সীমা নিশ্চয়ই দাড়িয়ে থেকে থেকে তাকে গালাগালি করছে।গিয়ে একদম সোজা সীমার পা ধরে শুয়ে পড়বে এই ভাবতে ভাবতে দীপ্ত বাস থেকে নামলো।
দীপ্ত যখন মহিলা সমিতির সামনে এসে পৌছলো তখন প্রায় পয়তাল্লিশ মিনিট দেরী হয়ে গেছে।চারিদিকে অনেক জুটি।যেন রঙের মেলা বসেছে আজ।শত শত মেয়ের মাঝে দীপ্ত খুজতে থাকে তার খুব পরিচিত একটা মুখ।পেলেই সোজা পা ধরে শুয়ে পড়বে।পনেরো মিনিট খুজেও দীপ্ত সীমাকে খুজে পেলো না।তবে কি সীমা চলে গেছে? যা রাগ মেয়েটার। দীপ্তর বুক জুড়ে হাহাকার নামে।নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার।চারপাশের কোলাহল সব যেন কোথায় হারিয়ে যায়।চারদিকে যেন নিঃশব্দ নেমে আসে তার।পুরো পৃথিবীটা মনে হয় ভেঙ্গে পড়ে।
তখনই পেছন খেকে খুব পরিচিত একটা স্পর্শ পেলো দীপ্ত। পেছন ফিরে দেখে সীমা। সীমা অপরাধীর মতো মুখ করে বললো, ‘ সরি দীপ্ত, একটাও রিক্সা পাচ্ছিলাম না।একটু দেরী হয়ে গেলো, তুমি রাগ করো নি তো?’
বি.দ্র. গল্পটা সব ভ্যালেন্টাইনদের জন্য। দেখবেন দেরী করে ফেলবেন না যেন পৌঁছুতে। যারা এতক্ষন ধৈর্য ধরে গল্পটা পড়লেন, তাদের জন্য একটা ফাউ গিফট। এই গানটা ।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১১:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



