এক.
প্রত্যেকদিন একই জ্বালাতন। ব্যাটা সাত সকালে উঠে রাজপুত্তুর সেজে ডেটিং করতে যায়। তুই ডেটিং করবি কর, আমার সকাল বেলার সুন্দর ঘুমটার বারোটা বাজাবি কেন? আমার রুম মেটের কথা বলছিলাম। তিনি হচ্ছেন ক্যাম্পাসের রোমিও। রোজ সকালে অফিসের চাকুরেদের মতো তিনি টি.এস.সি তে যান হাজিরা দিতে। তেনার সুদীর্ঘ তিন বছরের ক্যাম্পাস জীবনে তিনি চারটি প্রেম করেছেন। এখন চলছে সয়েল সায়েন্সর তিন্নির সাথে। সকালে তিন্নির সাথে নাস্তা না খেলে নাকি আমার রুম মেট শাহেদের দিন শুরু হয় না। তিনি যান প্রেমিকার সাথে নাস্তা করতে আর আমার সাধের ঘুমের বারোটা বাজে। এমনিতেই কাল রাত দুইটা পর্যন্ত পাশের রুমের অনিকদের সাথে টুয়েন্টি নাইন খেলেছি। কোথায় বেলা বারোটা পর্যন্ত ঘুমোবো, তা না রোমিও সাহেব ঘুম থেকে উঠেই রুমের ভেতর ঘুটুর ঘাটুর শুরু করেছেন। মেজাজ খারাপ করে রোজ সকালের মতোই বলি,' শাহেদ, শব্দ না করলে কি হয় না? রুমে আরও একজন ঘুমুচ্ছে এটা তোর বোঝা উচিৎ'
আমার কথায় পাত্তা না দিয়ে আরো জোরে শব্দ করতে করতে করতে বললো 'এই হিমেল, আমার টেবিলের উপর আমার বডি স্প্রে টা ছিলো, কই গেলো বল তো?'
-তোর বডি স্প্রে নিয়ে কি আমি বিছানায় গেছি?
শালার প্রত্যেকদিন হাজারবার শরীরে বডি স্প্রে মাখে। কি বিদঘুটে গন্ধ সেটার। হারিয়েছে ভালো হয়েছে। শাহেদের কান্ড কারখানায় আমি যারপরনাই বিরক্ত। সুযোগ পেলেই রুমটা চেঞ্জ করবো। ভাগ্যিস আমি রাত করে ঘুমাই, না হলে মনে হয় রাতে ঘুমাতেও পারতাম না। হোস্টেলে আমাদের রুমের কোনা য় একটা জায়গা আছে, যেটা হলো " শাহেদ'স কর্ণার "। সে খানে দাড়িয়ে সে সন্ধ্যা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত মোবাইলে প্রেমালাপ চালায়। তারপর আবার ঘুমোনোর আগে বিছানায় শুয়ে গুজগুজ, ফিসফিস করে আরো ঘন্টা দু'য়েক। কি এতো কথা বলে আল্লাহই যানেন। আমি তো কোন মেয়ের সাথে কথা বলার বিষয়ই খুঁজে পাই না। ছেলেদের সাথে না হয় খেলা নিয়ে, দেশের অবস্থা নিয়ে কিংবা মেয়েদের নিয়ে গল্প করে সময় কাটানো যায়। কিন্তু মেয়েদের সাথে কি নিয়ে কথা বলতে হয়? হলুদ,মরিচ,থালা,বাসন এই সব নিয়ে? নাকি মাছের কোপ্তা রান্নার প্রণালী নিয়ে? মেয়েরা না বোঝে ক্রিকেট, না বুঝে রাজনীতি। সেদিনতো আমাদের ক্লাশের সর্মির সাথে আমার ঝগরাই বেজে গেলো। ভারতের ধোনি নাকি তার প্রিয় খেলোয়ার! আরে বাপ আগে খেলা বুঝ, খেলা দেখ, তার পর প্রিয় খেলোয়ার বল। টিভি চ্যানেলগুরো কাকে হিরো বানালো তাই না দেখে নিজে দেখে বল। মেয়েগুলো সব চলে হুজুকের বসে। তবে মেয়েদের মধ্যে এই সর্মি মেয়েটাকেই আমার একটু অন্য রকম লাগে। কেমন ছেলে মানুষী, ছেলে মানুষী চেহারা, কাজ কর্মেও তাই। দারুন লাগে যখন রেগে যায়। কি করবে বুঝতে পারে না। তোতলাতে থাকে। বিছানায় শুয়ে আধো ঘুমে সর্মির কথা ভাবতে আমার বেশ লাগে।
শাহেদ মনে হয় তার বডি স্প্রেটা খুঁজে পেয়েছে। কারন তার ঘুটুর ঘাটুর বন্ধ হয়েছে। এখন তিনি চুলের স্টাইল করছে। আমি সর্মির কথা ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমিয়ে পড়ি।
বিকেল বেলা টিউশনিতে যাবার সময় বাংলা একাডেমির সামনে সর্মির সাথে দেখা হয়ে গেলো। আমাকে দেখে দৌড়ে আসলো।
-এই হিমেল, আজ বিকেলটা আমাকে দিতে পারবি?
এক সেকেন্ডের মধ্যে ভেবে ফেললাম আজ টিউশনিতে না গেলে কি কি ক্ষতি হতে পারে। কি আর হবে। ছাত্রর পরীক্ষা দেরী আছে। আর এ মাসে তেমন ফাকি দেই নি। সর্মির সাথে ঘুরার সুযোগটা কিছুতেই মিস করা যাবে না।
-কেন বল? কোন কাজ?
আগ্রহ নেই এমন ভাব দেখিয়ে বললাম।
-চল তোকে নিয়ে আজ মুভি দেখতে যাবো। সিনেপ্লেক্সে।
বাহ, মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। অন্ধকার সিনেমা হলে আমি আর সর্মি পাশাপাশি বসে আছি। ভাবতেই মনে হয় আজ কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছিলাম? মনে পড়লো শাহেদের মুখ। এই হতচ্ছাড়ার মুখ দেখে উঠেছি। প্রতিদিনই উঠি। তবে হঠাৎ করে শাহেদকে খুব আপন মনে হয়।
-বেশ চল। কিন্তু টিকিটের খরচ তোর।
বেশ ব্যাবসায়ী ভঙ্গিতে বললাম।
-না, ছবি টা তুই দেখাবি। আর তারপর আছে তোর জন্য বিশেষ সারপ্রাইজ।
-কি সারপ্রাইজ?
আমার হৃদপিন্ড ধ্বক করে উঠে। ভালো কোন সম্ভাবনাই মাথায় আসে না। কি হতে পারে? সর্মির কি বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে? কয়েকদিন আগে বলছিলো বয়স অনেক হয়েছে, এখন সে বিয়ে করতে চায়। বাসায় নাকি ছেলে দেখছে। আজ কি আমাকে সেই সংবাদটা দিবে? নাকি অন্য কিছু? হঠাৎ করে মুভিই বা দেখতে চাচ্ছে কেন? এই মেয়ের কিছুই আমি বুঝি না। যখন যেটা ভাবি, করে ঠিক তার উল্টো। সারাক্ষন কোথায় কোথায় থাকে। হঠাৎ করে উদয় হয়। আর বন্ধুদের আড্ডায় আমাকে নাস্তানাবুদ করে মহা মজা পায়। সবার কথার উত্তর দিতে পারলেও কেন জানি এই মেয়েটার কথার পিঠে কথা আমি বলতে পারি না।
আল্লাহর নাম জপতে জপতে চললাম মুভি দেখতে। মুভি কি দেখলাম আমি নিজেও বলতে পারবো না। গান আর নাচ ছিলো এটা বুঝেছি। কিন্ত আমার মাথার মধ্যে তখন 'সারপ্রাইজ' আর সর্মি।
মুভিটা মনে হয় খুব হাসির ছিলো। সর্মি দেখলাম প্রবল হাসছে। এতো হাসি কেন? বিয়ে ঠিক হয়েছে এই জন্য?
মুভি দেখে বের হলাম গোমরা মুখ নিয়ে। আটতলার ফুডকোর্টে খাবার সময় সর্মি আমাকে একটা প্যাকেট দিলো। এতোক্ষন যে সে একটা প্যাকেট সাথে নিয়ে ঘুরছিলো তা সে খেয়ালই করিনি। প্যাকেটটা নিয়ে খুলতে গেলাম, সর্মি হায় হায় করে উঠলো।
-এখানে না , রুমে গিয়ে খুলবি।
দুই.
রুমে পৌছেই তাড়াহুড়া করে প্যাকেট টা খুললাম। একটা মোবাইল সেট। আমার তো একটা সেট আছে। আবার মোবাইল সেট দিলো কেন? মোবাইল সেট টা বের করতেই একটা কাগজ বেড়িয়ে পড়লো। তাতে লেখা -
'তোর মতো গাধা আমি আমার জীবনে দ্বিতীয়টি দেখি নি। আমি চেয়েছিলাম খুব বুদ্ধিমান, সুপুরুষ, রাজপুত্রের মতো একটা ছেলেকে আমি ভালোবাসবো। কিন্ত আমার কপাল খারাপ। তাই স্রষ্টা আমার কপালে একটা গাধা দিয়ে রেখেছেন। এই যে, গাধু মহাশয়, এই মোবাইল সেট টি দিয়ে কেবল আমাকে ফোন করবেন, বুঝছেন? আজ রাতে, ঠিক বারোটায় - একজন গাধার প্রেমিকা'
রাত প্রায় বারোটা বাজে। রুমের কোনায় 'শাহেদ'স কর্ণার'-এ শাহেদ মোবাইলে ফিসফিস করে কথা বলছে।ব্যাটা আবার মিচকি মিচকি হাসে ওপাশের কথা শুনে। বারান্দার কোনার দিকে দেখলাম ফিজিক্সের রোহান মোবাইল নিয়ে কার সাথে তীব্র ঝগড়া করছে। কথা শুনেই বুঝিলাম তার প্রেমিকা। সিড়ির পাশে দেখলাম ইংরেজী ডিপার্টমেন্টের সুমন গুটিসুটি মেড়ে মোবাইলে কথা বলছে। নিশ্চয়ই ওর প্রেমিকা রিমির সাথে। আমি কথা বলার মতো একটাও জায়গা না পেয়ে হলের নীচে ডাইনিং এর কোনায় দাড়িয়ে গেলাম।
তিন.
সকালে আবারো ঘুম ভাঙ্গলো শাহেদের ঘুটুর ঘাটুর শব্দে। ঘুম ভেঙ্গেই মনে পড়লো হায় হায়, সর্মি তো বলেছিলো আজ একসাথে নাস্তা করতে। টি.এস.সি তে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১১:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



