তীক্ষ্ণ স্বরে কলিং বেল বাঁজছে। এই মাঝরাতে কে আবার এলো জ্বালাতে।গজগজ করতে করতে আবির বিছানা থেকে উঠলো দরজা খুলে দিতে। দরজার সামনে সাড়ে চার কি পাঁচ ফুট বেঁটে একটা লোক দাড়িয়ে আছে। আবির একটু মনে করার চেষ্টা করলো সে কোন ভাবে এই লোকটাকে চিনে কিনা। এই লোককে সে জীবনে দেখেছে বলে মনে হলো না। তাহলে এই মাঝরাতে এই লোক তার কাছে কি চায়। আবির দরজা খুলে দিলো।
-আপনি বিজ্ঞানী আবির আহমেদ?
বিজ্ঞানী উপাধীটা নিজের নামের সাথে ব্যাবহার করতে আবির কোনদিনই স্বস্তি বোধ করে না। পি.এইচ.ডি করার সময় আমেরিকায় কিছু গবেষনার সাথে সে যুক্ত ছিলো। আবিষ্কার বলতে ওই টুকুই। এখন দেশে ফিরে সে পুরোদস্তর অধ্যাপক।
-জ্বী আমি আবির আহমেদ।
-আপনিই তো বছর চারেক আগে মিসিগান সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান গবেষক ছিলেন। তাই না?
আবিরের সাধারন গোবেচারা টাইপ চেহারা দেখে মনে হয় লোকটা ঠিক আস্থা পেলো না। তাই আবার শিওর হয়ে নিলো। পি.এইচ.ডি শেষে সে কিছুদিন মিসিগানে একটা গবেষনাগারের প্রধান গবেষক ছিলো। সেটার সাথে এই বেঁটে লোকটার সম্পর্ক সে ঠিক বুঝে উঠলো না।
-ড. আবির আপনাকে আমার খুবই দরকার। খুবই।
-তাই বলে এই মাঝরাতে?
বিরক্তিটা চেপে রাখতে পারলো না আবির।
-আমি অত্যন্ত দুঃখিত আপনাকে এই মাঝরাতে বিরক্ত করার জন্য। কিন্ত বিষয়টা খুবই জরুরী।
-ঠিক আছে আপনার প্রয়োজনটা বলুন।
-আপনিই তো চার বছর আগে ট্রাভেল অন টাইম ডাইমেনশন বিষয়টার উপর গবেষণা করেন তাই না?
লোকটা মনে হয় এখনো ঠিক বিশ্বাস করতে চাইছে না সে ড. আবির আহমেদের সামনে বসে আছে।
-জ্বী বছর চারেক আগে আমি এই বিষয়ের উপর কিছু কাজ করেছি। কিন্তু সেটা এখন তো তেমন গুরুত্বপূর্ণ হবার কথা না।
-ড. আবির, আপনার সেই গবেষনাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আপনি কি জানেন আপনার সেই সময়ের সহকারী ড. কেভিন খুন হয়েছেন?
-কেভিন খুন হয়েছে? কেন? এতো দারুন একটা ছেলে। তারতো কোন শত্রু থাকার কথা নয়।
-সে জন্যই আমি আপনার কাছে এসেছি। আপনার গবেষণা পত্রটি আমি দেখেছি। সেখানে আপনি প্রমাণ করেছেন যে টাইম ট্রাভেল কেবলমাত্র সায়েন্স ফিকশনের বিষয় নয়। টাইম ট্রাভেল সত্যিকারেই সম্ভব। আপনি এর উপর একটা পরীক্ষাও করেছেন। তাই না।
-ব্যাপারটা অনেক আগের। আর থিওরীটা এতোটাই সরল যে আমি নিজেই বিশ্বাস করিনি যে সেটা সম্ভব হবে। তারপর যখন পরীক্ষাটা করলাম, তখন নিশ্চিত হলাম।
-আপনি কি ভবিষ্যতে কিছু পাঠাতে পেরেছিলেন?
-না ভবিষ্যতে যাওয়া বা কোন কিছু পাঠানো সম্ভব নয়। কেবল মাত্র সময়ের উল্টোদিকে , মানে অতীতে যাওয়া বা কোন কিছু পাঠানো সম্ভব। আমি একটি কলম, দুটো বই অতীতে পাঠিয়েছিলাম। আপনি নিশ্চয় জানেন অতীতে কোন কিছু পাঠাতে হলে কাজটা করতে হয় খুব সাবধানে। যাতে অতীতের কোন কিছুকে তা প্রভাব না ফেলে। এই কাজটায় কেভিন আমাকে সাহায্য করেছিলো।
-হ্যাঁ, কিছু দিন আগে কেভিন আপনারই করা পরীক্ষাটি আবার করে।
-তাই নাকি। আসলে থিওরীটা এতোটাই সহজ ছিলো যে, যে কেউ তা বুঝতে পারে। একটা ছেলেমানুষী টাইপ দ্বীমাত্রিক সমীকরনের সমাধান করতে পারলেই যে কেউ পরীক্ষাটা করতে পারবে। তাই আমি সেটা কোথাও প্রকাশও করিনি। কেবল নিজের শখের গবেষনা হিসেবেই রেখে দেই।
-জ্বী না ড. আবির। যে কেউ তা পারে না। তাহলে আমরা অন্তত হাজার খানেক মানুষ পেতাম যারা ট্রাইম ট্রাভেল করে অতীতে যাওয়া আসা করছে। তা আমরা পাই না।
-ব্যাপারটা ঠিক বলতে পারবো না আসলেই কেউ কেন এই সহজ জিনিসটা আবিষ্কার করে নি। থিওরীটা কিন্তু খুবই সহজ।
-হ্যাঁ কেউ এই ব্যাপারটার সমাধান করতে পারে নি। হতে পারে তাদের পারতে দেয়া হয় নি।
-মানে? আপনি কি বলতে চাচ্ছেন।
-খুব সহজ। একটু আগেই আপনি বলেছেন ভবিষ্যতে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু অতীতে যাওয়া সম্ভব। আর অতীতে যেতে হলে বা কোন কিছু পাঠাতে হলে তা করতে হয় খুব সাবধানে।যেন তা অতীতে কোন প্রভাব ফেলতে না পারে। ব্যাপারটা আপনিও জানেন। এখন যদি আপনি একশ বছর অতীতে বর্তমানের কোন বিজ্ঞানের বই পাঠিয়ে দেন তাহলে সেটা তখনই সেই একশ বছর আগেই আবিষ্কার হয়ে যাবে যেটা আবিষ্কার হবার কথা আরো হয়তো নব্বই বছর পরে। যা বর্তমানকে পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। তাই হয়তো কেউ চায় না অতীতের কেউ যেনে যাক কিভাবে আরো অতীতে যেতে হয়। কেননা অতীত পরিবর্তিত হলে ভবিষ্যতও পরিবর্তিত হবে। আর ঘন ঘন সবাই অতীতে গিয়ে অতীতকে পরিবর্তন করলে ভবিষ্যত কখনোই স্থায়ী হবে না। তাই হয়তো অতীতে যাবার জ্ঞানটা মানুষ অর্জন করুক তা কেউ চায় না। ভবিষ্যতের স্বার্থে।
আবির অবাক হলো লোকটার কথায়।
-কি আজব কথা। এটা কেউ চাইবে না কেন? ভবিষ্যত পরিবর্তিত হবে বলে কি মানুষ আবিষ্কার করবে না? জ্ঞান অর্জন করবে না। কে করবে এই কাজ। কে চাইবে না মানুষ অতীতে যাক?
-চাইবে। ভবিষ্যতের মানুষ। ভবিষ্যতের মানুষ যদি দেখে তাদের সময় বার বার পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে, তাদের কোন কিছুই স্থির থাকছে না অতীতের মানুষ তারও চেয়ে অতীতে যাবার কারনে, তাহলে তারা চাইবে না অতীতের কেউ আর অতীতে যাক। কারন তারা চাইবে তাদের সময়টা স্থির থাকুক। সেই স্বার্থেই তারা যেকোন ভাবে এটা রোধ করবে।
- কিন্তু কিভাবে তারা তা বন্ধ করবে?
-খুব সহজ অতীতে এসে।
-মানে?
-মানে হলো অতীতে এসে যারা যারা টাইম ট্রাভেলের জ্ঞান অর্জন করেছে বা টাইম ট্রাভেল আবিষ্কার করেছে, তাদেরকে ধ্বংস করে। তাই আমরা এখনো কাউকে পাই নি যে টাইম ট্রাভেল আবিষ্কার করেছে। কেননা তাদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
- সরিয়ে দেয়া হয়েছে?
লোকটাকে নিতান্তই বদ্ধ উন্মাদ মনে হচ্ছে এখন আবিরের কাছে। এতো রাতে এই উন্মাদকে ঘরে ঢুকতে দেয়া ঠিক হয় নি।
-হ্যাঁ, ভবিষ্যত থেকে একটা রোবট পাঠানো হয়েছে। দেখতে হুবহু মানুষের মতো। সে খুব নিঁখুত ভাবে তাদের সরিয়ে দিয়েছে। যেমনটা সরানো হয়েছে আপনার সহকারী কেভিনকে।
-আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আপনি এসব আলতু ফালতু কথা কোত্থেকে পেয়েছেন? আপনি এখনি চলে যাবেন আমার বাসা থেকে। আমার সময় নষ্ট করার আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।
-আমি অবশ্যই যাবো। কেবল আমার কাজটা শেষ করে।
-কাজ? মানে কি কাজ?
আবিরের গলা কেঁপে উঠলো।
বেঁটে লোকটার ঠোঁটে একটা রহস্যময় হাসি খেলে গেলো।
আবির আতঙ্কিত হয়ে তাকিয়ে থাকে সেই হাসির দিকে। এটা কিছুতেই মানুষের হাসি হতে পারে না।
*******************************************************************
পরদিন দেশের বড় বড় রাজনৈতিক খবরের মাঝে সংবাদ পত্রের একটা ছোট্ট খবর সবার চোখ এরিয়ে গেলো। “বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক আবির আহমেদকে তার বাসায় মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। ডাক্তাররা বলেছেন স্ট্রোক জনিত কারনে তার মৃত্যু হয়”
হাজারটা অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবরের মাঝে এই সাধারন মৃত্যু সংবাদটা কারো ভেতরেই তেমন আগ্রহ তৈরী করলো না।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১০:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



