ক্ষুধা লাগলে ঝিনুক খাবারের পেছনে দৌড়ায় না। কেবল তার খোলসটি হা করে ফেলে। সেভাবেই বসে থাকে পানির ভেতর। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্রোতের টানে কোনো না কোনো পোকা এসে পড়ে তার খোলসে, আর সেটি পরিণত হয় ঝিনুকের খাদ্যে।
এ কথাটির প্রায় কাছাকাছি একটি বাক্য পেয়েছিলাম মারিয়ো পুজোর লেখা গডফাদার উপন্যাসে। ডন ভিটো কর্লিওনি বলছেন, কেউ যদি তোমার ক্ষতি করে, যদি অপমান করে, কিচ্ছুটি বলো না। চুপচাপ থাকো। বেশি দিন লাগবে না, দেখবে প্রতিশোধ এসে হাজির হয়েছে তোমার হাতের মুঠোয়।
আরো পরে জেনেছিলাম মরুঝড়ে আরবের বেদুইনরা কি করতো। তারা স্রেফ বালিতে মুখ গুজে বসে থাকতো, কখন ঝড় থামবে।
অনেক আগে, আমার নিজের ইতিহাসের শুরু যখন, সেই হাফপ্যান্ট পরা শৈশব থেকে নানা ভাবে জেনেছি একই শিক্ষা, ধৈর্য ধরতে হয়। এ কথাটি একটু অন্যভাবে বলে গেছেন নেপলিয়ন- যখন তোমার মনে হবে সর্বনাশ আর ঠেকানো গেল না, জেনে রাখো, তখনো উদ্ধার পাবার উপায় থাকে।
দুই.
ক্লাস নাইন-টেনে পড়ার সময় থেকেই বড় ভাইয়ের কালেকশনের সুবাদে পশ্চিমি যে দুজন শিল্পীর গান শোনা হয়েছে সবচেয়ে বেশি, তারা হলেন জন ডেনভার আর ব্রুস স্প্রিংসটিন। ব্যান্ড হিসেব করলে সবচেয়ে আগে আসে ডায়ার স্ট্রেইটস।
ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে অডিও ক্যাসেট রেকর্ড করিয়েছি এলিফ্যান্ট রোড থেকে। সিডির যুগ শুরু হয়নি তখনো। সে সময় ইংরেজি গানের স্বর্গ ছিল ছোট্ট একটি দোকান, নাম রেইনবো। আমার জীবনে এতো এলপি রেকর্ডের কালেকশন আর কোথাও দেখিনি। কাউন্টারে বসতেন লম্বা চুল ওয়ালা একজন ভ্দ্রলোক, গানের পোকা। চেহারা পুরো জন লেননের মতো। সবার প্রিয় কবীর ভাই। অনেক সময় এমন হয়েছে কোথায় একটা গান অল্প খানিকটা শুনেছি, ছুটে গিয়ে কবীর ভাইকে বলেছি, ওই গানটা লাগবে। কোন গান- সেটি আর বোঝাতে পারি না, কারণ গানের টাইটেল বা শিল্পীর নাম কোনোটাই জানা নেই। উনি বললেন, গানটির সুর খানিকটা গুনগুন করে গেয়ে শোনাও, দেখি বুঝি কি না। দশ থেকে পনের সেকেন্ড শুনলেন, তারপর বললেন, ১৭ নম্বর তাকে দেখো পল ইয়ং নামে এক শিল্পীর এলপি আছে লাভ অফ দি কমন পিপল নামে, ওটা নিয়ে আসো। নিয়ে তাকে দিলাম, উনি বাজিয়ে শোনালেন, হুবহু যে গানটা শুনে পাগল হয়ে গেসিলাম সেই গানটাই। আহা, আনন্দ আর দেখে কে?
সে সময় (৯১-৯৩ সাল) রেইনবোতে গান রেকর্ড করতে দিলে দুই-তিন মাস পর ডেলিভারি পাওয়া যেতো। এতো ছিল অর্ডারের চাপ। সব রেকর্ড কবীর ভাই নিজে করতেন। মনে আছে একটি ৯০ মিনিটের মিক্সড ক্যাসেট রেকর্ড করতে দিয়েছিলাম এসএসসির শেষ পরীক্ষার দিন, আর ডেলিভারি পেয়েছিলাম রেজাল্ট আউট হবার পর।
গানের সঙ্গে লিরিক জানার শখ মাথা চাড়া দিল যখন দেখলাম প্রায় এলপির কভারেই প্রতিটি গানের লিরিক লেখা থাকে। প্রতি শনিবার কবীর ভাইকে বলে এলপির কভার ফটোস্ট্যাট করে নিতাম। তার সফট কর্নার পাওয়ার জন্য রেইনবোর অর্ডারি ক্যাসেটে গানের লিস্ট লিখতাম।
সে সময়ই আমার কোনো একটি গানের কাসেটের শেষ দিকে হয়তো মিনিট পাঁচেক ফিতা খালি ছিল, সেখানে উনি দিয়ে দিলেন একটি ফিলার মিউজিক। গিটারের জাদু কাকে বলে মিউজিকটি যেন ঝাকি দিয়ে জানিয়ে গেল। লিস্টে চোখ বুলালাম। লেখা রয়েছে ইনস্ট্রুমেন্টাল গোয়িং হোমঃ থিম ফ্রম লোকাল হিরো। জানা গেল ১৯৮৩ সালে তৈরি হওয়া লোকাল হিরো নামের একটি সিনেমার মিউজিক এটি। ডায়ার স্ট্রেইটসের ভোকালিস্ট ও অসাধারন গিটারিস্ট মার্ক নফলারের (Mark Knopfler) তৈরি করা সুর।
পরের মাসেই টাকা জমিয়ে গেলাম, লোকাল হিরো সিনেমার ইনস্ট্রুমেন্টাল চাই। সে রেকর্ড শুনে পাগল হয়ে যাবার দশা। আহা, অমন মিউজিক মনে হয় একবারই তৈরি হয়।
এর পর যখন অনার্সে পড়ি, সে সময় (৯৫-৯৬ সাল হবে) ভোরের কাগজের বিখ্যাত ফিচার পাতা মেলায় টুকটাক লিখি মিউজিক নিয়ে। মানে পশ্চিমা অ্যালবাম কোনটা বেরোলো, কোন ব্যান্ড ভেঙ্গে গেল (ব্যান্ড ভেঙ্গে যাওয়া তখন বিশাল ব্যাপার), এইসব নিউজ। সে সময় বৃটিশ বাংলা ফিল্ম ফেস্টিভাল হলো ঢাকার বৃটিশ কাউন্সিলে। অ্যাসাইনমেনট করতে গিয়ে দেখলাম সেই লোকাল হিরো সিনেমাটি দেখানো হবে। মনে হলো হার্টবিট মিস করবো, যে মিউজিক এতোদিন কেবল শুনে এসেছি, সেই মিউজিক ওয়ালা মূল সিনেমাটাই দেখা যাবে।
এক আমেরিকান তেল ব্যবসায়ী ইংল্যান্ডের উপকূলে তেলকুপ বসাবে। সেখানকার সবার কাছ থেকে জমি কেনা সারা, কেবল এক গরীব মাঝি তার জমি বেচবে না, আর সেই জমি না পেলে তেলকুপ বসানো সম্ভব হয় না- এই হলো সিনেমার কাহিনী। অনেকেই ঠোঁট ওল্টাবেন, কিন্তু আমার কাছে অন্যতম প্রিয় সিনেমার নাম লোকাল হিরো।
তিন.
লোকাল হিরো সিনেমা একবার দেখে আর মন ভরে না। কিন্তু এ সিনেমা কই পাই? ঢাকার এমন কোনো সিডি/ডিভিডির দোকান খুঁজতে বাকী রাখিনি, কিন্তু কারো কাছে এই সিনেমাটি নেই।
অনেকদিন পর এই লোকাল হিরো আবার দেখার সুযোগ হলো সিনেমা প্রেমী শফিক রেহমানের কারণে। তার নিজের কালেকশনে প্রায় ১৮ হাজার সিনেমা আছে। সেখানে লোকাল হিরোও আছে। অ্যাকাডেমি ফিল্ম সোসাইটি বলে একটি সংগঠন উনি দাড় করিয়েছিলেন, সেখানে দেখা গেল সিনেমাটি। তাকে অনুরোধ করলাম, লোকাল হিরো কপি করে নেয়া যাবে কি না। উনি বললেন, আমাদের লাইব্রেরিয়ানের সঙ্গে কথা বল। ওমা, সূর্যের চেয়ে বালি গরম বলে একটা কথা শুনেছিলাম, এই লাইব্রেরিয়ান ব্যটা দেখি তার চেয়েও বড় হাইকোর্ট। লোকাল হিরো পাওয়া হলো না।
চার.
৯৩ থেকে ২০০৮। একটি সিনেমার জন্য ১৫ বছর অপেক্ষার গল্প বললাম।
আজকেই এই গল্প শেয়ার করতে মন চাইল। কারণ ঝিনুকের খোলসে আজ আপনা আপনি খাবার এসেছে। গতকাল অনলাইনে হঠাৎ করেই সিনেমাটির ডাউনলোড লিঙ্ক পেলাম। তৎক্ষণাত ডাউনলোড শুরু করে দিয়েছিলাম। এখন আমার পিসিতে বলছে ডাউনলোড হয়েছে ৯৬%। আর কিছুক্ষণ পরেই আমি দেখতে পাবো লোকাল হিরো। সেই সাথে আমার কালেকশনে যোগ হবে বার্ট ল্যাঙ্কাস্টার অভিনীত সিনেমাটি।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ৩:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


