০১
যারা পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা অস্ত যাবার জন্য কেবল মীর জাফরকে দায়ী করেন, তারা সম্ভবত আমাদের ইতিহাসের অন্যতম বড় ভুলটি করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এর আগে অন্তত অর্ধ শতক ধরে চেষ্টা করে আসছিল এ অঞ্চলের দখল নেয়ার জন্য। তাদের দরকার ছিল কয়েকটি উপাদান। সে উপাদানগুলোর সবকটি আইটেম একসঙ্গে পাওয়া যায়নি বলে তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে। এসব উপাদানের মধ্যে ছিল-
ক. একজন অপরিপক্ক শাসক
খ. কোনো উপায়ে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পনির সঙ্গে বাংলার নবাবের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং
গ. একজন বিশ্বাস ঘাতক।
যদি ১৭৫৭ সালে মীর জাফর নামে কোনো চরিত্র পলাশীর ময়দানে না থাকতো, তবে সম্ভবত বৃটিশদের আরো অপেক্ষা করতে হতো। হয়তো তার নাম অন্য কিছু হতো, কিন্তু ক্ষমতার লোভ এবং তার জন্য বিশ্বাসঘাতকতা করতে পিছ পা হবে না এমন একটি চরিত্র দরকার ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির।
সে জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে আলীবর্দী খার নাতি, বাংলার অস্টম নবাব পর্যন্ত।
০২
যারা দখলদার, তারা অন্যায়ভাবে দখল করা কোনো কিছু নিজের কুক্ষিগত রাখতে না পরলে সবার আগে যা চিন্তা করে, তা হলো এটা আর কাউকে পেতে দেয়া হবে না। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানীরা যখন নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাকে আর আটকে রাখা যাচ্ছে না, তারা ঠিক এই কাজটিই করে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে। বাংলার স্বাধীনতা যখন আর ঠেকানো গেল না, তখন সোজা হিসাব করা হয়। এ দেশটি যেন আর মাথা তুলে দাড়াতে না পারে, স্বধীনতা যেন দেশটি প্রকৃত অর্থে ভোগ করতে না পারে সে জন্য যাদের পক্ষে এ দেশটিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব ছিল, মানচিত্র থেকে তাদের সরিয়ে দেয়া হল। সে রাতটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর। সে ক্জটিও করা হয়েছিল একদল অমানুষ দিয়ে, যারা একইসঙ্গে বিশ্বাসঘাতক ও মানব ঘাতক। (আমার বিশ্বাস মানুষ কখনো মানুষকে খুন করতে পারে না। হয় অমানুষ খুন করে মানুষকে, অথবা মানুষ বাধ্য হয় কোনো অমানুষকে হত্যা করতে।)
০৩
যতো দিন যায়, ততো ব্যকরণ বদলায়। খেলা চলে পুরোনো ছক দিয়েই, কেবল বদলে যায় খেলার সরঞ্জাম। সে জন্যই আফগানিস্তানে আজ আর সামরিক দখল বলবৎ রাখা সম্ভব নয় বলেই সেখানে ২০০৪ সালে দরকার হয় একজন হমিদ কারজাইকে। (শুনতে পাই কারজাই সরকারের রূপরেখা কেমন হবে, সেটি জাতিসংঘের যে কমিটি ২০০২ সালে ঠিক করে দিয়েছিল তার অন্যতম সদস্য ছিলেন বাংলাদেশের এক ডক্টরেট আইনজীবি।)
দিন বদলায় বলেই একুশ শতকে এসে বাংলাদেশকে "সাইজ" করার জন্য সামরিক আগ্রাসনের বদলে নেয়া হয় স্লো পয়জনিং ট্রিটমেন্ট। বছরের পর বছর ধরে আমাদের শোনানো হয় বাংলাদেশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র। বছরের পর বছর আমাদের পত্রিকা মারফত জানানো হয় বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দুর্ণীতি হয় বাংলাদেশে। (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল নামের সংগঠনটির খবর কি একজন ইনডিয়ান, একজন শ্রী লংকান বা একজন বার্মিজ জানেন? আমি নিশ্চিত যে তিনটি দেশের নাম উল্লেখ করলাম তারা রেড ক্রস, সেভ দি চিলড্রেন বা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নাম শুনেছেন। প্রবাসী কোনো ব্লাগার কি খোঁজ নিয়ে দেখবেন, আপনি যে দেশে আছেন সে দেশে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল সাধারণ লোকের কাছে পরিচিত নাম কিনা?) বছরের পর বছর আমাদের কানে হাজার মুখে গোয়েবলস এসে জানিয়ে যান, তোমাদের দেশে কিস্যু হবে না। তোমরা চোরের জাত। আমরা সেগুলো ক্রমশ মেনে নেই। আমাদের মনে দিনের পর দিন বিশ্বাস জন্মে অভাগা একটি দেশের সন্তান আমরা। আমাদের মেরুদণ্ড ক্রমশ ভেঙ্গে দেয়া হতে থাকে। এক ড. জাফর ইকবাল ছাড়া আর কেউ এ দেশে বলে না যে বাংলাদেশ সম্ভাবনাময়।
০৪
যে কারনেই ১/১১ তারিখে জরুরী অবস্থা জারীতে যখন ছোট অর্থে বিএনপি পরাজিত হয় আর বড় অর্থে দেশটি যখন গণতন্ত্র থেকে ছিটকে পড়ে, তখন বঙ্গবন্ধু কণ্যা খুশি হন এবং আমরাও সেটি মেনে নেই।
এর কয়েক মাস পর যখন জলপাই রঙের ধোয়া তুলসী পাতা সরকার চরম অসভ্যের মতো দুই নারীকে দেশের বাইরে গায়ের জোরে পাঠিয়ে দিতে চায়, পত্রিকায় হেডলাইন হয়, কালকেই সৌদি আরব যাচ্ছেন খালেদা, আমরা তখনো মেনে নেই।
চরম দুর্ণীতিবাজ বলে যারা দুই নেত্রীকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তারা এখন আর কোনো সাফল্যের কথা বলেন না। একজন ফখরুদ্দিন বক্তৃতায় বলেন, তাদের সাফল্য-ব্যর্থতার মূল্যায়ন করবে ভবিষ্যত। তিনি এখন আর বর্তমানকে ফেস করতে চাচ্ছেন না।
দুই বছর পর তুলে নেয়া হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আজম জে চৌধুরীর মামলা। একজন আমিন আহমেদ ভূইয়া জানান তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে তিনি কোন মামলা করেন নি। আমরা বিশ্বাস করি হাসিনা-খালেদা-তারেক অনেক অন্যায় করেছেন হয়তো, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে মামলাগুলোও যখন প্রমাণ হয় এক একটি অন্যায়ের ফল ও জোর করে করানো, তখনো সেগুলো কে করালো, কারা কলকাঠি নাড়লো, আমরা সেটি আজ জানতে চাই না।
০৫
আমার কেবল মনে হয় স্রেফ ভাগ্য গুনে আমরা বেঁচে এসেছি গর্তের কিনার থেকে। বাংলাদেশে আরো একটি রাজনৈতিক পলাশীর যুদ্ধ প্রায় চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। সব প্লট ঠিক ছিল। কয়েক বছরের প্রোপাগান্ডার ফলে দাবার ছক ঠিকঠাক সাজানোও হয়ে গিয়েছিল। কেবল কয়েকটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্য এবারের পলাশী হলো না।
এক. একজন এইট পাশ নারী ঘাড় ত্যারামি করে বসেন, তিনি বিদেশ যাবে না। সেটিও সামাল দেয়া যেত, কিন্তু এর পরপরই ঘটে দ্বিতীয় অপ্রত্যাশিত ঘটনা।
দুই. টাঙ্গাইলে এক মাঝারি নেতা সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে দেন খালেদাকে জোর করে বিদেশ পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। সুশীলদের এই সরকার ক্ষমতার খেমটা নচতে গিয়ে আবার আইনের ঘোমটা পড়তে গিয়েছিল। ফলে কোর্টের রায়ে খালেদার ওপর জোর আর খাটানো সম্ভব হয় না।
তিন. সাত নভেম্বর ২০০৭ তারিখে কোন এক অখ্যাত কর্মী বিজয় সরণীতে এক সাবেক জলপাই নেতাকে স্যান্ডেলপেটা করে। এর পরপরই দুই দলেরই সংস্কারবাদীরা (মীরজাফর বিশেষণটির নতুন ভার্সনটাও খারাপ না) প্রাকাশ্যে বের হওয়া বন্ধ করে দেয়। ঝিমিয়ে যায় উত্তর পাড়া থেকে নাজিল হওয়া সংস্কার।
চার.
পুরো শহরে যতো যে উকিল ছিল, তাদের বেশ কয়েকটিকে ধরে ভর্তি করা হয় দুদকের লাঠিয়াল বাহিনীর নায়েব সুবেদার হিসেবে, আর যাদের পেছনে উটকো-টু পাইস কামানোর আলামত বিদ্যমান তাদের স্রেফ জলপাই রঙের চোখ রাঙানিতেই পেছনের বেঞ্চিতে বসিয়ে দেয়া সম্ভব হয়।
অথচ, ক্যান্সার আক্রান্ত এক বৃদ্ধ, যিনি জীবনের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছেন, হয়তো জীবনের কাছে আর কিছু চাওয়া নেই তার, সেই বৃদ্ধ লোকটি অমিত তেজে দাড়িয়ে যান জেলবন্দী দুই নারীর পক্ষে আইনী যুদ্ধে। যে দুই নারীকে করে তোলা হয়েছিল পরষ্পরের শত্রু, অথবা পরিস্থিতির কারণেই তারা তেমন হয়ে উঠেছিলেন, তারা সে বৃদ্ধের কাছেই হাত জমা রাখেন নিজেদের আদালতি ভবিষ্যত।
০৬
ওপরে যে কথাগুলো এতোক্ষণ বললাম, সেটি হয়তো ঠিক, হয়তোবা স্রেফ আমার মনে তৈরি হওয়া কনস্পিরেসি থিওরি। তবুও ভয় করে, গত দুই বছরের ঘটনা যদি সত্যিই আরেকটা পলাশীর নীল নক্শা হয়ে থাকে, তহলে মনে হয়, দেশটিকে ডুবিয়ে দেয়ার পরের চক্রান্তটি অনেক বেশি প্ল্যান করে তৈরি করা হবে। সেটি হবে অনেক বেশি নিখুঁত। হয়তো সেটি বোঝার আগেই দেখতে পাবো দেশটি হয়ে গেছে আরেকটি ইরাক, আরেকটি আফগানিস্তান বা তার চেয়েও খারাপ কিছু।
সর্বশক্তিমান বলে যদি কেউ থাকেন, তার কাছে একটিই জিজ্ঞাসা, এই মাটি আর এই মাটির লোকজনতো বৃটিশদের মতো কোনো দেশ দখল করে নি, আমেরিকার মতো কখনো কোনো ইরাকে কাল্পনিক অস্ত্র খুঁজে নি, এমনকি ইনডিয়ার মতো পানি বন্ধ বা বর্ডারে পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারে নি। তাহলে আপাত গরীব শান্তিপ্রিয় দেশটিকে কেন বারবার এমন বিপদে ফেলা হচ্ছে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

