যারা ভাবেন ফটোগ্রাফারের জীবন একসাইটিং, থ্রিলিং এবং অ্যাডভেঞ্চারপূর্ণ, তারা সম্ভবত পুরোটা জানেন না। ফটোগ্রাফারের জীবন ক্রমশ কষ্টকর হতে থাকে, বিশেষ করে যদি আপনি পোরট্রেইট ফটোগ্রাফার হন। আপনি ছবি তুলে রাখবেন এবং একই সঙ্গে আপনার ছবির লোকজন একের পর এক অতীতে হারিয়ে যেতে থাকবেন। যতোবার আপনার ছবির আর্কাইভে আপনি হাত দেবেন ততোবার বুক থেকে বেরিয়ে আসবে দীর্ঘশ্বাস। যতো দিন যাবে, সে বুক চাপা শ্বাস ক্রমশঃ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকবে। কারণ ততোদিনে আরো বেশ কিছু ব্যক্তি নাম লিখিয়েছেন অতীত নামের খাতায়।
আমি যতোবার আমার বাবাকে দেখি, হয়তো সকালের রোদে পেপার পড়ছেন, হয়তো তার নাতনিটাকে কোলে নিয়ে দুষ্টুমি করছেন, কখনো বাসার পাশে চৌরাস্তায় আড্ডা দেয়া মহল্লার ছেলেদের সঙ্গে কথা বলছেন, আমি ছবি তুলে রাখি। বাবার বয়স এখন ৮০। আর কয়েক দিন পরেই তিনি চলে যাবেন আমেরিকায় বড় ছেলের কাছে। প্রাণপন চেষ্টা করি বাবার যতোটুকু সম্ভব আমার কাছে রেখে দিতে।
ঠিক একই রকম অনুভূতি হয়েছে যখন ছবি তুলেছি বহুমাত্রিক শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের, ৭১ সালে আকাশবাণীর বিখ্যাত সংবাদ পাঠক দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়ের, নোবেল জয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের, ম্যাগনামের বষীঁয়ান ফটোগ্রাফার আব্বাস কিংবা ইনডিয়ান কিংবদন্তীতুল্য ফটোগ্রাফার রঘু রাইয়ের। সে তালিকায় আরো যোগ হয়, আবদুল গাফফার চৌধুরী, ফাদার গাস্তোঁ রবের্জ কিংবা কবি আল মাহমুদের নাম।
যাদের নাম বললাম, তাদের প্রত্যেকের বেলাতেই শাটার টেপার সময় আমি অনুভব করেছি একটি দায়িত্ব। এ মানুষদের যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে ধরে রাখার দায়িত্ব। আমি চাই বা না চাই, তারা বেশিদিন থাকবেন না এবং এটাই বাস্তবতা। শাটার টেপার সময় আমার মন কেন্দ্রিভূত থাকে কেবল একটি বিষয়ে, মুহুর্তের সঙ্গে মানুষটিকেও ধরে রাখতে হবে। আমি চাই বা না চাই, তখন আমার শ্বাস অল্প সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
আজ যখন এই লেখাটি লিখছি, খুব সচেতন হয়ে যখন ভাবছি তখন মনে পড়ছে কর্নেল গুলজারের ছবি তোলার সময় উল্লিখিত অনুভূতি আমার হয়নি। আমার মনেই হয়নি এ লোকটির আয়ু আছে আর মাত্র বছর তিনেক। ছবিটি যখন তুলি, র্যাবের গোয়েন্দা শাখার কর্নেল গুলজার তখন সারা বাংলাদেশে হিরো। আগেরদিনই তিনি বাংলাভাই এবং শায়খ আবদুর রহমানকে ধরেছেন সিলেট এলাকা থেকে। পরদিন তিনি এলেন বিটিভিতে লাল গোলাপ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।
হায়, কখনো আন্দাজ করিনি সেই কর্নেল গুলজারের ছবি এভাবে কখনো পোস্ট করতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

