লাটিমি!
০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ৮:৫৮
রবীন্দ্রনাথ বলতো, ভাষার কাজ শুধু জানা জিনিস অন্যকে জানানো না, ভাষার আরেকটা কাজ হচ্ছে কল্পনাকে রূপ দেয়া। আমার মাথায় মাঝে মাঝে কথাটা ঘুরপাক খায়, কারণ আমি প্রতিদিন আজিমপুর নামি, তারপর রিকশা করে কার্জন হল যাই, আর যখনই শহীদ মিনার পার হই, তখন শহীদ মিনারের উল্টো পাশের দেয়ালে এই কথাটা পড়ি। ওখানে আরেকটা সুন্দর কথা আছে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর - সকলেই জানে ভাষার কাজ ভাব প্রকাশ করা, ভাব লুকানো নয়। আরেকটা ২১শে ফেব্রুয়ারী চলে আসলো। হয়তো দেয়ালের লেখাগুলো মুছে ফেলা হবে, তারপর লেখা হবে আরো সুন্দর কিছু কথা।
একটা প্রশ্নের অর্ধেকটা লিখে বাকিটুকু নিয়ে ভাবছি, তখন হঠাৎ একটুকরো রোদ এসে আমার ডেস্কে পড়লো, আমি কিছুক্ষণ জিনিসটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, কারণ কার্জন হল একটা বদ্ধ জায়গা, একদমই প্রাচীন গল্পগুলোর অপেরা হাউসের মতো। উপরে টিমটিম করে ফ্লুরোসেন্ট জ্বলছে। আমার ইতিউতি করে খুঁজলাম সূর্যটা কোথথেকে আসছে, সে আমাকে খুঁজে পেলোই বা কিভাবে, তারপর দেখি অনেক উপরে জানালার একটা ফুটো দিয়ে একটা সূর্যের রশ্নি এসে ঢুকছে, ওর আলোর পথের শূণ্যতাগুলো ধুলো হয়ে উড়োউড়ি করছে, সূর্যের আলো পড়ার আগে ধুলোগুলো যেন জানতোই না ওদের আলাদা কোন অস্তিত্ব আছে.. তাই মিলিয়ে যাচ্ছিলো সূর্যের আলো পার হওয়া মাত্র.. কে জানতো সূর্য কখনো ধুলোদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে? কিংবা ধুলোগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে সূর্যের কাছে? তারপর সূর্যটা ধুলোকে ইন্সপায়ার করে পড়লো ঠিক আমার ডেস্কে। আমার নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হলো, আমি কিছুক্ষণ লেখালেখি বাদ দিয়ে কলম উঁচিয়ে বসে থাকলাম, চশমাটা খুলে রাখলাম, আর নাকটা চুলকালাম। চশমাটা নাকে পড়লে আমার নিজেকে শিয়াল পন্ডিত শিয়াল পন্ডিত লাগে, তারপর মাঝে মাঝে নাক চুলকায়!
কিছুক্ষণ পর সূর্যটা আরেকটু হেলে গেলো, আর রোদটা উধাও হয়ে গেলো আমার ডেস্ক থেকে, আমি চারপাশ খুঁজে দেখি সে আমার পাশের ডেস্কের ছেলেটার পা আলো করছে। সবটুকু রোদ ওর পায়ের উপরে গিয়ে পড়লো, কিন্তু ওর পাটা ছিল ওর ডেস্কের নিচে, তাই সেই ছেলেটা জানলোই না সে কি জিনিস মিস করলো!
আমি আর মেহেদী দাঁড়িয়ে ছিলাম, নিউমার্কেটের মোড়ে। তখনো সন্ধ্যা হয়নি, কিন্তু আকাশে চাঁদটা জোরে সোরে আলো দিতে শুরু করে দিয়েছিল। দেখলেই মনে হয়, একটু আগে আগে হয়ে গেলো না? একটুও তো আঁধার হয়নি। তারপর মনে হয়, হুমম, নিশ্চই আজকে রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম ছিল না, চাঁদটা আগেভাগে চলে এসেছে! তারপর মেহেদী চলে গেলো, আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম বাসের জন্য - তারপর উঠে বসলাম বাসের সিটে, ঠিক জানালাটার পাশে।আবার চাঁদটা চোখে পড়লো, তখন শহরে একটু আঁধার জমেছে, আর চাঁদটার অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট করে। আমার অবাক লাগলো, চাঁদটা কি ভীষণ উজ্জ্বল। তারপর ভাবলাম ওয়াও! চাঁদটা কি গো-ও-ও-ল! নির্ঘাত আজকে পূর্ণিমা! তারপর মনে হলো, আমি এত বোকা কেন? এতক্ষণ পর খেয়াল করলাম চাঁদটা গো-ও-ও-ল? চাঁদটা চুপ করে একই জায়গায় বসে থাকলো, ও আমার মতোই অপেক্ষা করছিল বাসটার চলা শুরু হবার জন্য। তাই একটা সময় বাসটা চলতে শুরু করলো, কিন্তু একটুও আগালো না, কারণ রাস্তায় অনেক গাড়ি। আমি বসে বসে কল্পনা করলাম, একটা মাঝি অনেক স্রোত ঠেলে নৌকা নিয়ে বাড়ি ফিরছে, সন্ধ্যা হয়ে গেলো, সূর্য নেমে যাচ্ছে পৃথিবীকে অন্ধকারের কাছে বিক্রি করে.. মাঝিটা তার সমস্ত শক্তি দিয়ে স্রোত ঠেলছে, কারণ বাড়িতে কেউ ওর জন্য অপেক্ষা করছে.. এবং মাঝি একমুহূর্ত দেরি করতে চায় না, কিন্তু স্রোতগুলো ওকে যেতেই দিচ্ছে না, যেন মাঝি ওদের কত্ত দিনের পুরনো শত্রু!
তারপর আমার মনে হল, আমার বাসের ড্রাইভারটা ওই মাঝির মত! মাঝি স্রোত ঠেলে, আর ও গাড়ি ঠেলে। কিন্তু আসল ব্যাপারটা একই! ![]()
চাঁদটা বিল্ডিং এর পিছনে চলে গেলো, তাই আমি বিল্ডিং দেখলাম, বিল্ডিংটার নাম অরিয়েন্টাল লাটিমি। আমি ভাবছিলাম, লাটিমি যদি লাটিম থেকে আসে, তবে সেটা অসম্ভব সুন্দর নাম! তারপর দেখলাম সেখানে একটা খাবার দোকান আছে, ওটার নাম মনে হয় ক্যাফে লাটিমি। উপরে বড় বড় করে লাল নিয়ন আলোয় লেখা ক্যাফে লাটিমি - সেই আলোটা কোনমতে ঝিরঝির করে জ্বলছে, আর একটু পরপর ঠুশ করে নিভে যাচ্ছে।তখন অনেক বাতাস উড়ে এলো, আমার চুলগুলো পেছনে সরে গেলো, আর ক্যাফে লাটিমির বাগানবিলাসগুলোর পাতা নড়তে থাকলো.. আমি তাকিয়ে থাকলাম, আর ফেরিওয়ালাটা বলতে থাকলো, "আয়ই, পপ-কর্ণ! আয়ই পপ-কর্ণ!"। পাশের গাড়িটার কাঁচে আমার ছায়া পড়লো, আমার মনে হলো, আমার দাড়ি কাটা উচিত! দাড়িরা একটা পর্যায় পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ থাকে, তারপর জংলি হয়ে যায়। তারপর একটা বাস শেইইই করে আমাদের বাসের পাশ দিয়ে চলে গেলো, আর হেল্পার হেই হেই করতে করতে বাসের গায়ে ধাম ধাম করে বাড়ি মারছিলো - আমার মনে হচ্ছিল সে পাগলা ঘোড়ায় চেপেছে, এবং পাগলা ঘোড়াটা খেপেছে। আমি জানালায় বসে বসে চাঁদকে পাহারা দিলাম, আমার খুব অর্ণব শুনতে ইচ্ছে করলো, আর খুব আমার বাসায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করলো, কিন্তু আমি বসেছিলাম বাসের সিটটায়, আর বাসটা খুব চেষ্টা করছিল সব গাড়ি ঠেলে আমাকে বাসায় নিয়ে যেতে, কিন্তু সেটা হাঁটতেই পারছিলো না, ছুটবে কি? আমি মুখ বাঁকা করে শক্ত হয়ে বসে থাকলাম, এবং আমার খুউব বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করছিলো।
একটু একটু করে রাত নেমে আসলো, তারারা উঁকি মারলো আকাশ থেকে। তারপর একটা সময় বাসটা ছুটতে থাকলো সব দোকান আর সব বাড়িগুলো ফেলে, চাঁদটা ছুটতে থাকলো বাসের সাথে সাথে, তারারা ঘুমিয়ে পড়লো নিজেদের জায়গায়, রাস্তার বাতিগুলো বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়েই থাকলো, কারণ ওদের কাজই ছিলো দাঁড়িয়েই থাকা। আমার খুব ঘুমাতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু ঘুম একদমই এলো না। আমি ঠেশ দিয়ে থাকলাম বাসের সিটে, চাঁদটার দিকে হা করে তাকিয়ে - চাঁদটা কিচ্ছু বললো না। একটা প্লেন চাঁদের উপর দিয়ে উড়ে গেলো, লেজের আলো মিটমিট করতে করতে, আমার বাসের জানালা থেকে মনে হচ্ছিল একটা তারা বুঝি খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল একই জায়গায় থাকতে থাকতে, তাই হয়তো সে মেজাজ খারাপ করে উড়ে গেলো চাঁদের উপরে দিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে বসার জন্য।
শিয়ালবাড়ি দিয়ে বাসটা রূপনগরে ঢুকলো, একটা বুড়ো প্রবল বেগে তার হ্যাজাক বাতি পাম্প করছিলো, ওর সামনে ছিল অনেক আংটি, আর ওকে জড়ো করে দাঁড়িয়ে ছিল অনেক মানুষ, ওর গল্প শোনার জন্য। কিন্তু যেহেতু সে ব্যস্ত ছিল হ্যাজাক বাতি পাম্প করার জন্য, তাই ওর ক্যাসেট প্লেয়ারটা ওর হয়ে জোরে সোরে কিছু বলছিলো.. আমি পার হয়ে আসলাম হ্যাজাক জ্বালা বুড়োকে, ওর ক্যাসেট প্লেয়ারের শব্দগুলো মিলিয়ে গেলো গার্মেন্টসের জেনারেটরের শব্দে। আমি বাস থেকে নামলাম, আর আমার গলিতে ঢুকে হা হয়ে গেলাম, কারণ সন্ধ্যাতারাটা ছিল ইয়া বড়, একটুকরো বড় হীরের টুকরোর মতো, আর অনেক উজ্জ্বল! আমার ইচ্ছে করলো, সন্ধ্যাতারাটা দিয়ে একটা আংটি বানিয়ে ফেলতে, তারপর একটা হ্যাজাকজ্বালা বুড়ো হয়ে, সেই আংটি নিয়ে বসে থাকতে অনেক অনেক গল্প নিয়ে।
কিন্তু আমি ওয়াসিকে ফোন করলাম, ওয়াসি!! সন্ধ্যাতারাটা দ্যাখ! ওটা অ-নে-ক বড়!!
আমার মনে হচ্ছিল আমরা সূর্যের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি.. নইলে সন্ধ্যাতারাটা এত বড় হবে কেন? আর চাঁদটাও এত উজ্জ্বল হবে কেন?
ওয়াসি বলল, কি জানি! আমার তো একই রকম লাগছে, প্রতিদিনের মতো।
তখন আমার মনে হলো, শুধু আমিই হয়তো সূর্যের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি.. নইলে সন্ধ্যাতারাটা এত বড় হবে কেন? আর চাঁদটাও এত উজ্জ্বল হবে কেন?
আমার মনে হলো আমি ছোট্ট এক টুকরো অদৃশ্য ধুলো.. যে লাটিমের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে একা একা, কোন কারণ ছাড়া.. এবং লাটিমটা ভাবছে, লাটিমি শব্দটা খুব কিউট! লাটিমি মানে কি মেয়ে লাটিম?
প্রকাশ করা হয়েছে: আমার জার্নাল বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে ডিসেম্বর, ২০১১ ভোর ৪:৪২ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
লেখক বলেছেন: হুমম, এটা মনে হয় সেই লাটিমি কিন্তু ওখানে এখন অনেক উঁচু একটা বিল্ডিং আছে। ১৫-২০ তালা উঁচু, আর এই রেস্তোরাটা মনে হয় ৭-৮ তালায়।
ইশশশ.. আমার এখন কোল্ড কফির লোভ লাগছে! খিক খিক খিক!
আমার মনে হয় কি, এটা পুরো আপনার ক্রেডিট যে আপনি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছেন..
আমি কিছুই করিনি.. ![]()
চুড়ান্ত পর্যায়ের অফটপিক: প্রীটি সোনিয়া নামটা শুনলে আমার ক্যান জানি খালি প্রীটি জিনতার ছোট বোন মনে হয়
লেখক বলেছেন: জাহাঙ্গীরনগরের একটা হলের নাম প্রীতি লতা হল - ওটা শুনলেও আমার কেন জানি প্রীতি জিনতা হল মনে হয়.. খিক খিক..
প্রীটি সোনিয়া বলেছেন:
ফাহিম তুমি আমাকে আবার আপনি করে বলা শুরু করলে কেন হঠাৎ করে....হুমম, আচ্ছা ৭-৮ তলার উপরে এখন লাটিমি....জায়গাটা বেশ চেন্জ হয়ে গেছে...কোল্ড কফি অনেক মজা...খিক খিক খিক। নাহ সবার লেখা পড়ে কল্পনা করা যায় না...
আমি আগে একটা আইডি খুলেছিলাম...কিন্তু সেই আইডিটা আমি কখনো ইউজ করতে পারিনি...পরে মেজাজ গরম করে আরেকটা আইডি খুলতে যেয়ে মাথায় কোনো নাম আসছিল না... প্রীটি জিন্টার কি যেন একটা ছবি দেখছিলাম...আর তখন হঠাৎ প্রীটি সোনিয়া নামটা মনে হলো যে এই নামে চেষ্টা করে দেখি...হয়ত আবার আইডিটা ইউজ করতে পারবো না...কিন্তু পরে দেখি যে এই আইডিটা ঠিকই ইউজ করতে পারছি....কি আর করার এই অদ্ভুত নাম মার্কা আইডি দিয়েই ব্লগিং করছি....
প্রীটি জিন্তার ছোট বোন...হাহাহা...আমার ভালই লাগে প্রীটি জিন্তা কে...
লেখক বলেছেন: :S ও আমি তখন ঘুমাতে যাচ্ছিলাম, মাথা কাজ করছিলো না! হে হে হে!
আমার মনে হয় তোমার নিকটা অনেক কিউট! ![]()
কিংকর্তব্যবিমূঢ় বলেছেন:
ব্যাপক ভালো লাগলো এই পোস্টটা তাই জানায়ে গেলাম ... লাটিমি মানে মেয়ে লাটিম কথাটা পছন্দ হইছে :-)
পারভেজ বলেছেন:
লেখাটা খুব ভালো লাগলো। কল্পনাকে চেনা শব্দ, চেনা জগতের উপাদান নিয়ে রূপ দেয়াটা মাঝে মাঝে অসাধারণ হয়। 'লাটিমি' তে আমাদের আনাগোনা ছিল ৯২-৯৭ পর্যন্ত। এখন যেখানে বিল্ডিংটা ওখানেই ছিল সরু করে দোকান টা। 'one is to 4" এর প্রথা ভেঙ্গে 'one is to one' এর মিনি চাইনিজ কনসেপ্টটা ওরাই মনে হয় জনপ্রিয় করে তুলেছিল। অনেক সময়, নুডুলস খেতে যাওয়া হতো ওখানটায়। কয়েকটা জনপ্রিয় আইটেম ছিল। বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকলেও মাইন্ড করতো না!
লেখক বলেছেন: ওয়াও এটা এত পুরনো ? ৯২ তে তো আমি আব্বুর হাত ধরে ঘোরাঘুরি করতাম!
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...















আজকে আমাদের এইখানেও চাঁদটা অনেক বড় গোল আর অনেক উজ্জ্বল....আমার খুউব ভাল লাগে যখন আমি খোলা আকাশের নীচে লোনে বসে তারা ভরা আকাশ আর এত বড় চাঁদটা দেখতে পারি...ঢাকায় থাকতে অবশ্য এত বড় আকাশটা দেখতে পেতাম না।
তোমার লেখাগুলো পড়ার সময় লেখার সবকিছু আমার কল্পনায় ভেসে উঠে...এত সহজ আর সুন্দরভাবে জিনিষ গুলো লেখ তুমি...এইটা তোমার বড় একটা গুণ বুঝলে...এই কথাগুলো আমার নিজের অনুভূতি থেকে বললাম, মনে করো না আবার যে তোমাকে খুশি করার জন্য বলছি....