ধুম ধাম ধুম।

জল টলমল

২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৫:৩৬

শেয়ারঃ
0 2 0

রাইশার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে থাকলো। আমি তাকিয়ে থাকলাম। স্ক্রিন থেকে অল্প একটু নীল আলোর ছটা ওর কান্নার জলে এসে পড়ছে। তারপর সেটা লাল হয়ে যাচ্ছে স্ক্রিনের রঙ পাল্টানোর সাথে সাথে। আমার মনে হচ্ছিল মেঘে ঢাকা একটা আষাঢ় বিকেলে একটা মসৃণ সবুজ কচু পাতার উপর টপটপ করে বৃষ্টির পানি পড়ছে। আমি কিছুতেই সেটাকে মাথা থেকে সরাতে পারলাম না। আমার আর মুভিটা দেখা হলো না, আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম মূর্তির মতো।

রাইশা অনেক পরে খেয়াল করলো আমাকে। ও তখন নাক টানছিল। একটা ছোট্ট সাদা রুমালে নাকটা মুছলো, নাকের উপর থেকে চুলটা সরালো, তারপর লাল চোখগুলো নিয়ে আমাকে বলল, "আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে থেকো না, আমার নিজেকে একটা বাচ্চা মেয়ে মনে হয়!" বলে শব্দ করে নাক ঝাড়লো সাদা রুমালটায়..

আমার হাসি পেলো, কিন্তু আমি সেটা দেখানোর ঝুকি নিলাম না। "যে মেয়েটা সবসময় মুভি দেখে কান্নাকাটি করে, সে কি বাচ্চা মেয়ে নয়?"। রাইশা আমার চেপে রাখা হাসিটা বুঝে ফেললো, বালিশটা নিয়ে ধাম করে আমাকে একটা বাড়ি মারলো। খুব জোরেও না, খুব আস্তেও না। এধরণের বাড়ি খেলে বোঝা যায় মানুষটা কি বলতে চাচ্ছে। বোঝা যায়, মানুষটা আমার উপর রেগে আছে, কিন্তু সে আমাকে তবু আঘাত করছে না, কারণ সে আমাকে ভীষণ ভালোবাসে।

"তুমি সবসময় এভাবে কাঁদো কেন? মুভিগুলো বানানো জিনিস, সবকিছু কল্পনা।"
"কিন্তু অনুভূতিগুলো তো সত্যি। পৃথিবীতে কোন না কোন মানুষ তো এই কষ্টটা পাচ্ছে তাই না?"
"উমম.. হয়তো বা.."

এভাবে একেকটা বছর পার হয়, আমরা একটু একটু করে বড় হই, আর একটু একটু করে বুড়ো হই। রাইশা কাঁদতে থাকে যখন টিভির চরিত্রগুলো দু:খ পায়, আমি টিভির দিকে তাকালে কিছু প্রফেশনাল অভিনয় দেখতে পাই, কিছু গল্পের স্ট্রাকচার দেখতে পাই, কিছু সুন্দর ক্রিয়েটিভিটি দেখতে পাই। আমি ঠিক অনুভব করতে পারি না, অভিনয় করা মানুষগুলোর দু:খগুলোকে। কিন্তু রাইশা যখন কাঁদতে থাকে, আমি আর টিভির দিকে তাকাতে পারি না.. ওর ফিচফিচ থামলে আমি আমার খসখসে হাতটা দিয়ে ওর নরম গালের জল গুলো মুছে দেই, ও জল টলমল চোখে আমার দিকে তাকায়, আমাকে বলে.. "মানুষের কত কষ্ট না?", আমি চশমাটা খুলে রাখি চোখ থেকে, বলি, "মানুষের অনেক সুখও আছে..", রাইশা বলে, "তুমি বলো, তুমি কিভাবে সুখী থাকতে পারো, যখন তোমার পাশের মানুষটা কষ্ট পায়?", আমি আমার জমে থাকা নাকটাকে আটকাতে পারি না, হালকা শব্দ হয়, রাইশা দেখতে পায় টিভির আলোগুলো প্রতিফলিত হচ্ছে আমার চোখে, আমি তবু হাসার চেষ্টা করি, আর বলি, "তোমাকে কে বলল, আমি সুখী থাকি, যখন তুমি খুব কষ্ট পাও.."

আমরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে থাকলাম, টিভিটা তখন খামোখা শব্দ করছিল। আলোগুলো পড়ছিলো দেয়ালের উপর.. একা একা.. কেউ তাদের দেখছিলো না.. আমি ওকে আগলে ধরে থাকি.. ওর ছেলেমানুষি অনুভূতিগুলোকেও..

আমি জানি না ভালোবাসার সংজ্ঞা কি.. আমি জানি না.. কোন কিছু.. আমি শুধু জানি, আমি ওর ছেলেমানুষি অনুভূতিগুলো সবসময় আগলে ধরে রাখবো, আমি কখনো পৃথিবীর কাউকে দেবো না ওকে কষ্ট দিতে.. ওর কোন কিছুর গায়ে আঁচড় কাটতে.. আমি কখনো কাউকে সুযোগ দেবো না, ওকে এসে বলতে, যে সে একটা ছেলেমানুষ, ওর বড় হওয়া লাগবে.. আমি সবসময় ওর সবকিছু আগলে ধরে রাখবো, কারণ ওর অনুভূতিগুলো আমার কাছে ভীষণ দামি.. ভীষণ ভীষণ দামি.. পুরো পৃথিবীর সব অভিনয়গুলো অনেক সস্তা সেই তুলনায়.. সব ভানগুলো, সব বিভ্রমগুলো, সব অর্জনগুলো, সব খ্যাতি, সব শব্দ, সব আলো, সব রং, সব সব কিছু অনেক অনেক সস্তা..

আমি জানি না ভালোবাসার সংজ্ঞা কি.. কিন্তু যখন মুভিগুলো শেষ হয়ে যায়, রাইশা আমার বুকে মাথা ঢুকিয়ে কাঁদতে থাকে, আমার মনে হয় আমি ওকে শক্ত করে আগলে ধরে আছি.. আর আমার মনে হয় আমি ওকে ভালোবাসি..

 

প্রকাশ করা হয়েছে: ফালতু গল্প  বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে অক্টোবর, ২০১১ দুপুর ২:১৭ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৫৬
সোহায়লা রিদওয়ান বলেছেন: কিভাবে লিখসো ?
আহারে...আমার একটা বোন থাকতো ,আর ও এমন ই করতো !!যেমন আমার ছোট্ট ভাইটা সেভিং প্রাইভেট রায়ান দেখে অনেক কষ্ট পাইসিল ,ওর মুখ থমথমে হয়ে যেতো। পারসুইট অফ হ্যাপিনেস দেখেও চুপচাপ বসে থাকসে আমার পাশে। আর কালার অফ প্যারাডাইস দেখে আমাকে বুঝতে দেয়নাই ওর চোখের পানি।কষ্ট করে আটকে রাখসে।
গ্ল্যাডিয়েটর দেখে যে বার বার প্রশ্ন করসে যে , আপ্পু এটা সত্যি ?? সত্যি ??সত্যি সত্যি এভাবে মারতো ?? অনেক বার হ্যা হ্যা জবাব দিইয়ে শেষে ধমক দিয়ে থামায় দিসি।
বাচ্চাটা বড় হয়ে গেসে। জানে সব বানায়। সত্যি হলেও হতে পারে নাও হতে পারে! এজন্য পিয়ানিস্ট দেখে আর বিভ্রান্ত হয়না। মনের সুখে স দেখে !
কিন্তু আমি একেক্টা মুভি দেখার সময় বিশ্বাস করতে থাকি সেটা ঘোটতেসে! লাইফ ইস বিউটিফুল দেখে বিশ্বাস করি এই বাচ্চাটা আসলেই মা কে ঘুজে পাইসিল। তখন বাবা হারানোর শোক টা কমে আসে আমার। আর চিল্ড্রেন অফ প্যারাডাইস দেখে নিশ্চিন্ত হই যে, নাহ ... নতুন জুতা তো পাইসেই !!! ওইযে বাবার সাইকেলের পেছনে ... ... তারপর অসম্ভব ভালো লাগতে থাকে আমার।
বাইসাইকেল থিফ দেখি বারবার এই জন্য যে আমার মনে হয় সিনেমাটা আমি শেষটা দেখিনাই।মিস করসি। তাই আবার দেখি শেষ টা দেখার জন্য। প্রতিবার ই মুভিটা আর শেষ হয়না আমার কাছে ! নিশ্চই শেষে এমন হইসে যে ছেলেটা বুঝছে সবটা কত্ত বড় ভুল বুঝাবুঝি। সব লোক এসে তার বাবার কাছে মাফ চাইতেসে। তার বাবা হেসে হেসে মাফ করে দিতেসে। সাইকেলটা ফেরত পাওয়া গেল। আর বাবাটা অনেক ভাল একটা কাজ পেল। মাকে আর কষ্ট করে বাইরে যেতে হয়না কাজ করতে। সে সারাদিন তার ছোট্ট ছেলেটার সাথে খেলে। এত্ত আনন্দময় জীবন হয় বাবুটার যে সে তার বাবার সেই ঘটনাটা আর মনেই করতে পারেনা...
এই শেষ টা আমি দেখিনা, আমার ডিভিডি টা মনে হয় স্ক্র্যাচ পড়ে নষ্ট হইসে।
শেষ কিছু অংশ দেখতে পারিনা আমি !! প্রতিবার ই মিস হয়ে যায় ...
৩. ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ১০:৩৯
পারভেজ বলেছেন: মাঝে মাঝে অবাক হই তোমার লেখা পড়ে।
৪. ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ১২:৪৮
সোহায়লা রিদওয়ান বলেছেন: ওই দেইখো। বুঝলানাতো তাইলে আমার কথা বার্তা !সবগুলাই মাস্ট টু ওয়াচ মুভি, বুঝলে। দেখবা ।পরে জানাইয়ো।
@পারভেজ ভাইয়া , আমিও অবাক হই। পড়তে আসি তাই প্রতিদিন,নিরাশ ও হইনা। আমার ক্যাম্পাসেরি একটা ছেলে, এত্ত জিনিয়াস ক্যামনে হইলো!!??
২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ১০:৩৩

লেখক বলেছেন: আমি মোটেও ওগুলা না!
আমি বাচ্চা একটা ছেলে, যে মাঝে মাঝে বড়দের মতো করে কথা বলে.. :(

৫. ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ৮:৩৪
পথিক!!!!!!! বলেছেন: কি সুন্দর অনুভূতির উদগীরণ ...
ভালো লাগল
৬. ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১:৪৩
জিহাদ বলেছেন: ফাহিম ভালোবাসা নিয়ে খুব ভাবছে ইদানীং। সেটা আমি খুব উপভোগ করছি। :)
৭. ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ১১:২৬
সোহায়লা রিদওয়ান বলেছেন: আজকে তোমাকেইতো মনে হয় দেখলাম ? এপি আর এক্সাম হলের মাঝখানের রাস্তায় ... ... ওনেকটা উদ্ভ্রান্তের মত হাটো দেখি তুমি!!! :-D
২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ১:১৩

লেখক বলেছেন: :S

৮. ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ১:২৯
আনিকা বলেছেন: আমি তো ছোটবেলা থেকেই কষ্টের অংশ দাঁতে দাঁত চেপে কান্না আটকানো'র চেষ্টা করতাম... তবু মাঝে মাঝেই ভ্যা... আর এখন আমি আর ইথু দুইজনেই মুভি'র মাঝখানে কাঁদি আর তারপরে দুইজনে দুইজনের দিকে তাকাইয়া লজ্জাসূচক হাসি দিয়ে বলি.. 'দেখসো.. আমরা কি ব্যাক্কল!'... @ জিহাদ... আমাদের ফাহিম বড়ো হচ্ছে না!
৯. ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ২:২৭
লুনা রুশদী বলেছেন: বাহ! অনেক সুন্দর করে বললা।

এই কাজ তো আমার একটা বন্ধু করতো। মানে আমি সবসময় মুভি দেখে প্রচুর কান্নাকাটি করি আর আমার ফ্রেন্ডটা টিভি দেখা বাদ দিয়ে আমাকে ক্ষেপাতো।
১০. ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ২:৫৩
প্রীটি সোনিয়া বলেছেন: কিছু কিছু ছবি দেখলে কান্না এমনিতেই চলে আসে....আমি জোর করে না কাঁদতে চেষ্টা করি...কিন্তু আমার চোখ কিছুতেই সেই বাধা মানে না....জল টলমল করতে থাকে চোখে, একটা সময় পরে সেটা এত বেশী টলমল করতে থাকে যে গড়িয়ে পরে যায়...আমি আবার তাড়াতাড়ি মুছে ফেলি কেউ যাতে না দেখে ফেলে সেজন্য...কিন্তু তারপরে আমার গলা আর মাথা ব্যথা করে...কান্না চেপে রাখার জন্য...:|

গল্পটা অনেক সুন্দর হয়েছে...ভালবাসার গল্প...:)
১১. ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ ভোর ৪:০৮
সোহায়লা রিদওয়ান বলেছেন: চিলড্রেন অফ হ্যাভেন হবে অইটা !
২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১১:০২

লেখক বলেছেন: ভুলেও ক্যাম্পাসে আমাকে দেখলে জিজ্ঞেস কইরো না, "তুমি কি অনাহুত আগন্তুক?", আমি তাহলে সাথে সাথে জিজ্ঞেস করবো, "মুভিগুলা কি ব্যাগে?" :D

১২. ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ২:৩৭
সোহায়লা রিদওয়ান বলেছেন: ওক্ককে! সাবধান হয়ে গেলাম! আমার অনার্স লাইফতো শেষের দিকে, ভয় নেই !
:)
১৪. ২০ শে মার্চ, ২০০৯ দুপুর ২:৩৮
মেহবুবা বলেছেন: অসাধারন ! পড়ে পরে বরকে ডেকে পড়ালাম ।
বলল, ও লিখলে নাকি আরো ভাল হত । বললাম তাহলে মন্তব্য হিসেবে কিছু বল ,আমি লিখে দেই । সেটাতেও অপারগ , সে নাকি এর থেকে ভাল পোষ্ট দিতে পারতো !

তবে জানি , ও এই লেখাটায় নিজেকে দেখতে পাচ্ছিল সে ;
প্রিয়তে নিয়ে গেলাম ।
১৫. ২৭ শে মার্চ, ২০০৯ সকাল ৭:০৬
কঁাকন বলেছেন: অসাধারন বর্ননা

ভালো থাকুন
১৬. ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৩:৩০
মাহমুদ ফয়সাল বলেছেন: লেখাটা খুব সুন্দর হইছে... আমার প্রিয়তে গেলো...

 

মোট সময় লেগেছে ১.০৯৫১ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
..
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ