somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... দ্বিমত হও বরং বিক্ষত হও প্রশ্নের পাথরে।
বরং বুদ্ধির নখে শান দাও, প্রতিবাদ করো।
অন্তত আর যাই করো, সমস্ত কথায়
অনায়াসে সম্মতি দিয়ো না।
কেননা সমস্ত কথা যারা অনায়াসে মেনে নেয়,
তারা আর কিছুই করে না,
তারা আত্মবিনাশের পথ
পরিষ্কার করে

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

----

আমি আজকে একটা অন্ধ মানুষকে দেখলাম করিডর দিয়ে হেঁটে যাবার সময়। ওর মুখে ছিলো বিশাল একটা ছড়ানো সুখি হাসি আর হাতে ছিলো একটা সাদা ছড়ি। পুরো দৃশ্যটার মধ্যে একটা অদ্ভূত অপার্থিব সৌন্দর্য ছিলো।

তারপর আমি ভাবছিলাম, সে হয়তো কখনোই কারো হাসি দেখেনি। কিংবা কখনোই কখনোই জানে নি, একটা মানুষকে হাসতে দেখতে কেমন লাগে। কিংবা হয়তো বা চারপাশের মুখ গোমড়া মানুষগুলোকে দেখতে পেলে সে হাসতে ভুলে যেতো ।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/29315802 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/29315802 2011-01-28 00:55:31
/ৎ I cannot do everything, but still I can do something;
And because I cannot do everything
I will not refuse to do the something that I can do.

--- Helen Keller ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/29301078 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/29301078 2011-01-03 04:18:43
ফেব এক চার
সব ঘুম ঘুম চোখের মানুষগুলো ছোট বড় হাই তুলে দাঁত ব্রাশ করতে চলে গেলো। তারপর দাঁত ব্রাশ করে যে যার কাজে চলে গেলো, আর ভুলে গেলো সূর্যটার কাছে গল্প চাইতে। তারপর মেঘগুলো একটা খাঁড়া দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের চূড়ায় আটকে গেলো, আর কিছুতেই ছুটতে পারলো না। তখন সূর্যটা আকাশের আরো উপরে উড়ে চলে গেলো।

পাহাড়টার সাথে কেউ কথা বলতো না, কারণ সবাই ভাবতো সে একটা পাহাড়। সেজন্য পাহাড়টা সবসময় চোখ বুজে থাকতো, আর কানে পাথর গুঁজে রাখতো, আর ভান করতো সে কিছুই দেখতে পায় না, কিছুই শুনতে পায় না। নরম মেঘটা যখন ওর গায়ে আটকে গেলো, পাহাড়টা খুব অবাক হলো। অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখার পর সে আর পারলো না চোখ বন্ধ করে থাকতে। চোখটা খুলে চোখটা বড় বড় করে তাকিয়ে দেখলো, একটা সাদা আদর আদর মেঘ ওর গায়ে আটকে গেছে। তখন পাহাড়টা ভাবলো সে কি বলবে। কিন্তু সে কোন কথা খুঁজে পেলো না। সেজন্য সে আরো কিছুক্ষণ ভাবলো। কিন্তু তারপরও সে কোন কথা খুঁজে পেলো না। তারপর সে অনেক কষ্ট করে ওর গলা থেকে শব্দ বের করলো, আর মেঘটাকে জিজ্ঞেস করলো, "তুমি কি কোথাও যাচ্ছো মেঘ?"। মেঘটা বোকা বোকা চোখ করে বলল, "আমার কি কোথাও যাওয়ার কথা? আমার কি কোথাও যেতে হবে?"। পাহাড়টা বলল, "আমি সেই কবে থেকে এখানে আটকে আছি, আমি এক চুল নড়তে পারি না। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে ভাবি ইশশ আমি যদি কোথাও যেতে পারতাম। সেখানে তুমি উড়তে জানো, তুমি কেন আটকে আছো এখানে?" তারপর পাহাড়টা খুব ক্লান্ত হয়ে গেলো। অনেক চিন্তা করেও মনে করতে পারলো না, শেষ কবে সে এতগুলো শব্দ উচ্চারণ করেছে। তারপর মেঘটা বলল, "তুমি কি আমাকে বকছো? আমি কি পঁচা?", তারপর মেঘটা ফিচফিচ করে কাঁদতে শুরু করলো, আর পাহাড়টার গায়ে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। পাহাড়টা ভিজতে ভিজতে বলল,"কে বললো তুমি পঁচা? তুমি একটা ... " তারপর পাহাড়টা আবার কোন শব্দ খুঁজে পেলো না। সে থেমে শব্দ খুঁজতে শুরু করলো, আর মেঘটা ওর চোখের পানি মুছতে মুছতে তাকিয়ে থাকলো, আর অপেক্ষা করতে থাকলো পাহাড়টার জন্য। তারপরও পাহাড়টা কোন শব্দ খুঁজে পেলো না, তখন মেঘটা বলল, "মেঘ?"। পাহাড়টা বলল, "হুঁ! কে বললো তুমি পঁচা? তুমি একটা মেঘ!"। মেঘটা মাথা নাড়লো, আর তারপর অপেক্ষা করলো পাহাড়টা আবার কিছু বলবে। কিন্তু পাহাড়টা কোন শব্দ খুঁজে পেলো না। তারপর যখন মেঘটা ভাবলো সে ঘুমিয়ে যাবে অপেক্ষা করতে করতে, তখন পাহাড়টা বললো, "আমার একটুও পাহাড় হতে ইচ্ছে করে না"। মেঘ বললো, "তোমার তাহলে কি হতে ইচ্ছে করে?", পাহাড়টা বলল, "আমার বাতাস হতে ইচ্ছে করে"। তখন একটা ছোট্ট প্রজাপতি এসে বলল, "তোমার মনোবাঞ্চা পূর্ণ হোক হে পর্বত! তুমি বায়ু হইয়া বহিয়া যাও"।

তখন পাহাড়টা বাতাস হয়ে গেলো, আর মেঘটা কিছুতেই আর ওকে খুঁজে পেলো না। আর সে খুব অবাক হলো, কেন পাহাড়টা বাতাস হতে চাচ্ছিলো? যখন সে ছিল একটা বিশাল বড় পাহাড়, যাকে অনেক অনেক দূর থেকে দেখা যায়? আর দেখে মনে হয়, "উফফ কত্ত বড়!"। কিন্তু সে কিছুতেই কিছু খুঁজে পেলো না। তখন সে সূর্যকে দেখতে গেলো।

সূর্যটা তখন মন খারাপ করে কমলা হয়ে সমুদ্রের পানিতে ডুবে যাচ্ছিল। মেঘ বলল, "তুমি ডুবে যাচ্ছো কেন?", সূর্য বলল, "আমার মন খারাপ"। মেঘ বলল, "কেন তোমার মন খারাপ?"। সূর্য বলল, "আমি গল্প জানি না, তারপরও সবাই চোখ বড় বড় করে প্রত্যেকদিন সকালে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, আর ভাবে যে আমি একটা গল্প বলব"। মেঘ বলল, "কি মজা! আমিও কোন গল্প জানি না! ইয়ে-এ-এ!" সূর্য চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল, "তোমার মন খারাপ লাগে না?" মেঘ বলল, "মন খারাপ লাগবে কেন?", সূর্য মুখ কাচুমাচু করে বলল, "তুমি গল্প জানো না বলে?"। মেঘটা তখন ভাবতে শুরু করলো, আর চোখ এদিক ওদিক নাড়তে থাকলো। সূর্যটা ডুবে যাচ্ছিল, ডুবে যাচ্ছিল। তারপর যখন নাক ডুবতে শুরু করলো, সে খুব তাড়াহুড়া করে বলল, "তাড়াতাড়ি বলো!"। মেঘটা বলল "কি? কি? কি?"। সূর্য বলল, "আমি ডুবে যাচ্ছি!"। মেঘটা বলল, "টানবো?", সূর্য বলল, "আমার অনেক ওজন। তুমি বলবে না?"। মেঘটা বলল, "কি বলব?"। তারপর সূর্যের নাকটা ডুবে গেলো, কান ডুবে যাচ্ছে দেখে তাড়াতাড়ি বলল, "বাসায় এসো!"। সূর্য কোনমতে বলল, "কোঁথাঁয় বাঁসাঁ?"। মেঘটা বলো, "আ-কা-শে?"।

তারপরের দিন আবার ভোর হলো। সূর্য আবার আকাশে উঠলো, আর সব মানুষগুলো চোখ ডলতে ডলতে জানালায় দাঁড়িয়ে থাকলো, কারণ ওরা ভাবছিল সূর্য একটা গল্প বলবে। সূর্যটা আবার লজ্জায় লাল হয়ে গেলো, কিন্তু কোথাও আর মেঘটাকে খুঁজে পেলো না মুখ ঢাকার জন্য। তারপর সবাই হাই তুলতে তুলতে দাঁত ব্রাশ করতে চলে গেলো, তখন সূর্যটার খুব ইচ্ছে করলো মেঘটার সাথে মুখ লুকিয়ে গল্প করতে।

কিন্তু সে মেঘটাকে কোথাও খুঁজে পেলো না।

সূর্যটার খুব বলতে ইচ্ছে করলো মেঘটাকে যাতে সে কখনো ফিচফিচ করে না কেঁদে ফেলে। কারণ তাহলে সে বৃষ্টি হয়ে আকাশ থেকে টুপটুপ করে মাটিতে পড়ে যাবে। সূর্যটা তখন খুব হাসিখুশি হয়ে আকাশে ঘুরে বেড়ালো আর ভাবলো কোন একদিন মেঘটার সাথে আবার দেখা হবে, কারণ মেঘটা ওকে বলেছে ও আকাশে থাকে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/29097283 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/29097283 2010-02-14 04:16:37
সত্যেন্দ্রনাথ বসু লেভ লেন্ডু হচ্ছে সবচে' বিখ্যাত ফিজিসিস্টদের একজন। ওর জন্ম ১৯০৮ সালে বাকুতে, আজারবাইজানে - সেই সময়টায় সেটা ছিল রাশিয়ান এমপায়ার এর একটা অংশ। আর ওর বয়স যখন ১৯ তখন ও ভার্সিটির সব পড়াশুনা শেষ করে সে পিএইচডি করতে শুরু করলো। তারপর যখন ওর বয়স ২১ হলো, তখন সে রীতিমত একজন ডক্টরেট ডিগ্রি পাওয়া মানুষ।

লেভ লেন্ডু তার জীবণের বেশিরভাগ সময় থিওরিটিকাল ফিজিক্স এ গবেষণা আর পড়ানো নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কোন কারণ ছাড়াই ১৯৩৮ সালে স্তালিন লেন্ডুকে জেলে পুরে রেখেছিল পুরো একটা বছরের জন্য। লেন্ডু সুপারফ্লুইডিটি নিয়ে ওর গবেষণার জন্য নোবেল পায় ১৯৬২ সালে।

লেন্ডুর একটা স্কেল ছিল - উইকিপিডিয়াতে সেটা নিয়ে লেখা
Landau kept a list of names of physicists which he ranked on a logarithmic scale of productivity ranging from 0 to 5. The highest ranking, a 0.5, was assigned to Albert Einstein. A rank of 1 was awarded to 'historical giant' Isaac Newton, Satyendra Nath Bose, Eugene Wigner, and the founding fathers of quantum mechanics, Niels Bohr, Werner Heisenberg, Paul Dirac and Erwin Schrödinger. Landau ranked himself as a 2.5 but later promoted himself to a 2.

সত্যেন্দ্রনাথ বসু নামটা খুব চেনা চেনা লাগলো। ক্লিক করলাম। আর খুব অবাক হয়ে গেলাম।

সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জন্ম কলকাতায় আর পড়াশুনা প্রেসিডেন্সি কলেজে। ওই সময় সেখানে জগদীশ চন্দ্র বসু এর মত মানুষজন কাজ করতো। যাদের কাছে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য সবচে' বড় গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাসগুলোর একটা ছিল, বড় কিছু করার সামর্থ্যে বিশ্বাস করা এবং বড় লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাওয়া।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু কিছুদিন কলকাতা ভার্সিটিতে কাজ করলো, তারপর ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতে শুরু করলো। ১৯২৪ সালে যখন সে একজন রিডার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে, (আমি ঠিক জানি না রিডার মনে কি) - সে প্লাংকের কোয়ান্টাম রেডিয়েশন ল নিয়ে একটা পেপার লিখলো, পুরোপুরি প্রথাগত চিন্তা থেকে ভিন্ন পথে। কিন্তু কিছুতেই কোথাও ছাপাতে পারলো না ওর পেপার। তারপর কি ভেবে আইনস্টাইনকে পাঠিয়ে দিলো খামে ভরে। আইনস্টাইন তখন জার্মানিতে থাকতো, তো একদিন ভোরে আইনস্টাইন ঘুম থেকে উঠে মেইলবক্স খুলে চোখ বড় বড় করে দেখলো এই কান্ড। সে দেখলো জিনিসটা খুব একটা হাবিজাবি কিছু না - খুব খাঁটি রকমের গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস, তো আইনস্টাইন করলো কি - বসে বসে নিজের হাতে পুরো জিনিসটা জার্মানে অনুবাদ করলো। তারপর একটা ভয়াবহ বিদঘুটে নামের (Zeitschrift für Physik) খুব-বেশি-বাড়াবাড়ি রকমের প্রেস্টিজিয়াস একটা জার্নালে পাঠিয়ে দিলো বসুর পক্ষ থেকে।

সেই জার্নাল সেটা ছাপালো। এটা ছাপানোর পর মানুষ সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে চিনতে শুরু করলো। তো তখন সে ইউরোপে ঘুরতে গেলো আর দু'বছর মারি কুরি, আইনস্টাইন টাইপের মানুষজনের কাজ টাজ করে দেশে ফিরে আসলো ১৯২৬ সালে। তারপর একটা সময় সে প্রফেসর হলো, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করতে থাকলো ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত।

তারপর যখন ভারত পাকিস্তান আর ইন্ডিয়াতে ভাগ হয়ে গেলো, আর সবাই মারামারি কাটাকাটি শুরু করলো তখন সত্যেন্দ্রনাথ বসু কলকাতায় ফিরে গেলো আর সেখানে পড়াতে শুরু করলো - ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত সে বিশ্বভারতীর উপাচার্য হিসেবে কাজ করতো।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু সম্বন্ধে উইকিপিডিয়া তে লেখা আছে
Apart from physics he did some research in biochemistry and literature (Bengali, English). He made deep studies in chemistry, geology, zoology, anthropology, engineering and other sciences. Being an Indian of Bengali descent, he devoted a lot of time to promoting Bengali as a teaching language, translating scientific papers into it, and promoting the development of the region.

তুমি যখন খুব বড়সড় সাইজের মানুষজন নিয়ে পড়বে, একটা বড় জিনিস আলাদা করে চোখে পড়ে - তারা খুব বেশি বকবক করে সময় নষ্ট করতো না। পত্রিকার পাতায় প্রতিমাসে একই ধরণের কান্নাকাটি লিখে দেশকে গালমন্দও করতো না। কোন ধরণের চেষ্টাও করতো না, মানুষের কাছে নিজেকে মহৎ ও জ্ঞানী প্রমাণ করতে। এবং বাংলাদেশে জন্ম বলে কোন হীনমন্যতা তাদের মধ্যে কাজ করতো না, ওয়েস্টার্ন হবার প্রবল চেষ্টাও তাদের মধ্যে ছিল না।

বড়সড় মানুষগুলো শুধু খুব ভালো করে জানতো, তাদের কাছে কি গুরুত্বপূর্ণ, এবং তারা ঠিক কি করে পৃথিবীতে তাদের জন্য বরাদ্দ সময়টুকু খরচ করতে চায়। এবং তাদের সবাই আমাদের ভাষাটাকে খুব ভালোবাসতো। সত্যেন্দ্রনাথ বসু হয়তো এখন ঢাকায় ফিরে আসলে খুব অবাক হতো, যে আমাদের জাতীয় প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট - যেখান কোন বিদেশীই থাকে না, সেখানে আমরা মাইকের সামনে গেলেই আমাদের ভাঙা ভাঙা খ্যাত চাষাভুষা টাইপের ইংরেজি দিয়ে প্রবল উৎসাহে ইংরেজি বলার চেষ্টা করি। আমরা এখনো আমাদের জাতীয় প্রোগ্রামিং অলিম্পিয়াড আয়োজন করি একটা বিদেশী ভাষায় - যেটার উদ্দেশ্য হচ্ছে - ১২ থেকে ২০ বছর বয়সী এখনো ভার্সিটিতে ভর্তি হয়নি এমন ছেলেপুলেদের মধ্যে কম্পিউটার সায়েন্স এবং প্রোগ্রামিং নিয়ে আগ্রহ জাগানো। আমরা সেখানে তাদেরকে ডেকে এনে বলি, "গর্দভ! ইংরেজি জানো না?"। যেখানে ইংরেজি জানাটা আসলে তেমন গুরুত্বপূর্ণ না একদমই - আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে যারা খুব ভালো করে, সবাই নিজ নিজ ভাষায় প্রশ্ন অনুবাদ করে নেয় - পোলিশ, রাশান, চাইনিজ - সবাই! এটা আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডগুলোর একটা ট্র্যাডিশন।

আমরা মানুষকে ভয় পাইয়ে দেবার জন্য অ্যামেরিকানদের অ্যাকসেন্টে ভরভর করে ইংরেজি ছেড়ে দেই। আর মোটামুটি অর্থহীণ গরিমা নিয়ে খুব খুশি হয়ে যাই, নিজেদেরকে অনেক জ্ঞানী ভেবে।

যখন একটা আস্ত জাতি ধীরে ধীরে নিজেদের ভাষা ভুলে যেতে থাকে আর অন্য কিছু হবার চেষ্টা করে আর বড় বড় শক্ত কথা বলে জীবন পার করে দেয় আর ভিনদেশীদের কাছে দেশের ভাবমূর্তি বড় করা নিয়ে খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন আর যাই হোক, তাদের কাছে আশা করা যায় না - যে তারা বুঝতে পারবে পৃথিবীতে কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আর কিসের কোন গুরুত্বই নেই।

একটা পরমাণুকে নিয়ে কুটিকুটি করে ভেঙে ফেললে আমরা আরো কিছু ছোট কণা পাই - সেগুলোর একটার নাম বোসন। বোসন হচ্ছে ভয়াবহ গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস অনেক ধরণের ফিল্ডে - যার একটা হচ্ছে সুপারফ্লুইডিটি - যেটার উপর গবেষণা করে লেভ লেন্ডু নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলো। এই কণাটার নাম দেয়া হয়েছে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামে, বোসনের উপর তার কাজের সম্মানে। নোবেল প্রাইজ দেয়ার সময় ওরা এক ধরনের কাটাকুটি করে নেয়, দেখার জন্য যে কোন গবেষণা মানব সভ্যতার জন্য আসলেই কাজে লাগছে কিনা প্রত্যক্ষভাবে। সে কারণে যদিও বোসন এর উপর গবেষণা করে অনেকেই নোবেল প্রাইজ পেয়েছে - সত্যেন্দ্রনাথ বসু কখনো নোবেল পায়নি।

কিন্তু কে বলতে পারে, হয়তো নোবেল প্রাইজ তার কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না। যে মানুষটা মোটামুটি বিখ্যাত হয়ে ইউরোপে গিয়ে মারি কুরি(দুইটা নোবেল প্রাইজ) কিংবা আইস্টাইন(একটা নোবেল প্রাইজ) জাতীয় প্রাণীদের সাথে গবেষণা টবেষণা করার পরও দেশে ফিরে আসে, তারপর বসে বসে বাংলা ভাষায় সায়েন্টিফিক পেপার অনুবাদ করতে থাকে আর পড়াতে থাকে ধুমায়ে, সেরকম একটা মানুষের গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের লিস্টি আমাদের চে' ভিন্ন হবে, এটা আর এমন অস্বাভাবিক কি?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/29076020 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/29076020 2010-01-10 23:38:36
গটমট ডায়েরী এটা পড়ে মনে হলো - আমার পার্টটা ছিল আসলে ডায়েরী লেখা, আর আমি বহুদিন সেটাই করি না।

আমি আজকে ভোরে সিলেট থেকে ফিরে আসলাম। রাতের ট্রেনে। শোভন চেয়ারে সিট পাইনি বলে শোভনে করে আসলাম। আমার উল্টো দিকের সিটে বসে ছিল একটা খুব ডোমিনেটিং টাইপের লোক, যে সিটে বসার পাঁচ মিনিটের মধ্যে তার উল্টো পাশে বসা ছেলেটার সাথে পা রাখার জায়গার ভাগাভাগি নিয়ে ঝগড়া শুরু করে দিলো। আমি খুব বিরক্ত নিয়ে হুদাহুদি ঝগড়া করা দেখলাম, কিন্তু কিছু বললাম না, কারণ কিছু বলাটা ঠিক হবে না। তার একটু পর লোকটা করলো কি ট্রেইন থামানোর শিকলের হাতলে হাত রেখে ঘুমিয়ে গেলো। আমি একবার ওকে জাগালাম বলার জন্য ট্রেন থেমে যাবে, তারপর সে হাত নেড়ে আমার ভয়টাকে উড়িয়ে দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লো, হাতল থেকে হাত না সরিয়ে। আমি খুব অস্বস্তি নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকলাম, যেই বইটা পড়ছিলাম সেটা সেভাবে খুলে বসে থাকলাম আমার আর পড়া হলো না। আমার বাম পাশে অংশে একটা পরিবার ছিল, কয়েকটা পিচ্চি বাচ্চা নিয়ে, একটা ছোট্ট মেয়ে করলো কি একপাশে অল্প একটু জায়গা নিয়ে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লো, ওকে দেখতে খুব কিউট লাগছিল, তো আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে ওর ঘুমানো দেখলাম, আর মনে হচ্ছিল, ইশশ মানুষটা কি ছোট্ট!

সারারাত মানুষগুলো জেগে থাকলো, আর এ ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো সময় কাটানোর জন্য। তারপর একটা সময় সবার চোখ লাল হয়ে গেলো, আর সবাই ঝিমানো শুরু করলো। আমি বসে বসে অ্যালবার্ট ক্যামুর আউটসাইডার পড়ছিলাম। বইটা পড়লে কেন জানি 'আমি-আমি' লাগে। আমিও খুব দুমদাম কথা বলি, তারপর ওই লোকটার মত করে ভাবি, এটা কি ঠিক করলাম? আউটসাইডার এর বাংলা কি হবে? অনাহূত আগন্তুক?

ট্রেনের জানলাটা একটা স্কয়ার হয়ে ছিল বিশুদ্ধ কালো রঙের। মাঝে মাঝে দুই একটা আলোর ফোঁটা এসে সরে যাচ্ছিল দূরে। ট্রেনটা যখন ভৈরব আসলো, তখন সেখানে হাজার হাজার আলোর ফোঁটা জমা হল, আর সব ছায়াগুলো পড়লো নদীটার গায়ে।

কিন্তু গল্পটা ঠিক রাতের ট্রেনের ছিল না। গল্পটা ছিল সিলেটের। আমি সিলেট থেকে ফিরলাম ৪ গিগা ছবি নিয়ে। সেটা প্রায় বারোশ' ছবি। সেখান থেকে আমি দুই শ'টা এখানে আপলোড করেছি।

যেদিন সিলেট যাই, আমার ট্রেন ছিল ভোর ৬টা ৪০ এ। তো আমি সেদিন মেহেদীর বাসায় ছিলাম কারণ মিরপুর থেকে ওই সময় ট্রেন ধরা সম্ভব না - হাজার হোক, এখন সকাল ৭টা ১৫ এর দিকে সূর্যই ওঠে। তো সেদিন খুব ভোরে, কালো মিশমিশে অন্ধকারের মধ্যে কাশতে কাশতে আমি আর মেহেদী বের হলাম রিকশা ধরে কমলাপুর যাওয়ার জন্য। ব্যাপারটা খুবই বাজে ছিল, আমরা এখন দিনের আলো বাঁচানোর জন্য রাতের বেলা ঘর থেকে বের হই - কি ভয়াবহ বাজে ব্যাপার। ট্রেইনটা যখন শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লো, তখন কোনমতে সূর্য উঠলো, কিন্তু বাইরে বেশ কুয়াশা ছিল তো ঠিক সূর্যটাকে দেখাও গেলো না।

সিলেটে আমার অসম্ভব ভালো সময় কাটলো। আমি মণিপুরী রান্নার স্টাইলের হেভি ফ্যান হয়ে গেলাম, এবং এরপর ঢাকায় ফিরে বাঙালি রান্না খেতেই আমার কেমন কেমন লাগছিল। চীং আমাকে বলল, চীং মানে হচ্ছে পাহাড় আর চীংখৈ মানে হচ্ছে ভোর - তো আমি যেন ওকে চীংখৈ বলে পরিচয় করিয়ে দেই - যদি ওকে চীং এর বদলে চীংখৈ বলতে নাই পারি। আমাদের বয়স যখন ষোল তখন থেকে আমরা বন্ধু, এখন ওকে পুরো নাম ধরে ডাকতে আমার কেমন কেমন জানি লাগবে। আমরা দুজন মিলে একটা গান নিয়ে কাজ করলাম, তারপর সন্ধ্যায় ঘুরতে বের হলাম শহরে। তারপরের দিন ওর ভার্সিটি গেলাম।



একটা ঝোপের কাছে গিয়ে প্রজাপতির ছবি তোলার সময় ওর গা বেয়ে একটা জোঁক উঠে গেলো, ওর পেটের কাছে গিয়ে দিলো এক কামড়, কোন কথা বার্তা ছাড়াই, ঝুলে থাকলো। চীং ভয়াবহ ভয় পেলো যখন সে জোকটাকে খুঁজে পেলো ওর পেটে, সে একটা টান দিয়ে জোঁকটাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু জোঁকটা তো জোঁক! সে কিছুতেই সরবে না। তো শেষ পর্যন্ত অনেক টানাটানি করার পর জোঁকটা ছাড়ালো, সেখানে একটা গোল লাল বৃত্ত হয়ে গেলো। চীং আমাকে বলল, প্যান্টের ভিতর যদি... তো ঠিক তখন আমি ভয়াবহ ভয় পেলাম। আমরা দুজন তাড়াতাড়ি একটা রিকশা নিলাম বাসায় ফিরে সব কিছু চেক করার জন্য। চীং বলল ওর খুব সুড়সুড়ি লাগছে সবজায়গায়, সেটা শুনে আমি আরো ভয় পেয়ে গেলাম। শেষ পর্যন্ত একটা সময় আমরা বাসায় ফিরলাম, বাথরুমে গিয়ে চেকটেক করে দেখলাম কোথাও জোঁক নেই। কিন্তু চীং এর সুড়সুড়িটা গেলো না। সে দ্বিতীয়বার গেলো ঠিকঠাক আবার চেক করতে। আমি খুক খুক করে হাসলাম ওর অব্স্থা দেখে।

পরদিন আমরা বের হলাম জাফলং দেখার জন্য - সেটা একটা দিন ছিল বটে! জাফলং সিলেট থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে। সেদিন আকাশটা খুব মেঘলা ছিল। আর দূরের পাহাড়গুলোর গায়ে কুয়াশা লেগে ছিল।


জায়গাটা আমার কাছে খুব বেশি সুন্দর লাগছিল। ঢাকায় খুব বেশি একটা খোলা জায়গা দেখা যায় না। আমার খুব ভালো লাগছিল। অল্প অল্প ঠান্ডা ছিল সেদিন। মিষ্টি ধরণের ঠান্ডা।



আমরা পাথরের উপর বসে দুপুরের খাবার খেলাম, সিলেট থেকে নিয়ে আসা। যদিও ঠিক আমাদের প্ল্যান ছিল না পাথরের উপর বসে খাওয়াটা। আমরা একটা খাবার দোকানে বসতে চাইলাম, কিন্তু দোকানদার আমাদের কাছে পন্চাশ টাকা টেবিল চার্জ চাইলো। খেয়ে দেয়ে যখন হাত ধুবো কোথায় বুঝতে পারছি না, চীং তখন বলল, চল ওদের গিয়ে বলি - ভাই হাতটা একটু ধুবো, বেসিন চার্জ কত দিতে হবে? যাইহোক, আমরা ওই দোকান থেকেই স্ট্রবেরি+ভ্যানিলার মিক্স একটা আইসক্রিম কিনে খেতে খেতে মামার বাজারের দিকে হাঁটতে থাকলাম।



তারপর সেখান থেকে বাসে উঠলাম লালাখাল যাবার জন্য।


লালাখাল আসলে সারি নামের একটা নদীর পাশের একটা ছোট্ট বাজারের নাম। সারি ঘাট থেকে ইন্জিন নৌকায় ১৫টাকা ভাড়া। সেই নৌকাগুলোর চালার উপর বসে লালাখালে যেতে হয়। সেটা একটা জোশ - বেশি জোশ জার্নি। সারি নদীর পানি নীলাভ সবুজ।



শুধু একটাই সমস্যা। তুমি যদি শহুরে মানুষ হও, তোমার ধারণাই নেই কোন ১৫টাকা মানে ঠিক কতগুলো টাকা। সারিঘাট থেকে লালাখাল যেতে এক ঘন্টার ওপর সময় লাগে। সত্যি সবই ঠিক ছিল - আমার খুব ভালো লাগছিল সারি নদীর উপর একটা নৌকার চালায় বসে থাকতে। চারপাশে কোথাও তেমন মানুষ নেই - এক ধরণের শান্ত নির্জনতা শুধু ইন্জিন নৌকার শব্দটা ঘটঘট করে যেন বলছিল সে বেঁচে আছে। তো আমরা একটা সময় লালাখাল এসে পৌছলাম, তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। অল্প দূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে, আর তার পেছনে আরো বড় একটা পাহাড়ের হাল্কা আবয়ব। লালাখাল বাজারটা খুব বেশি ছোট, আমাদেরকে আউটসাইডার মনে হচ্ছিল, সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। বাজারটায় ইলেক্ট্রিসিটি ছিল, যেটা ঠিক আমি আশা করিনি দেখবো, তারপর সেখানে একজন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার ছিল, যে খুব মনোযোগ দিয়ে একটা মোটা খাতায় কিছু একটা খুঁজছিল, আর কিছু দোকান ছিল খাবারের।

কেবল, একটাই সমস্যা - সন্ধ্যার পর কোন নৌকা সারিঘাট যায় না। আমরা নৌকা ঠিক করার চেষ্টা করলাম, সবাই রিজার্ভে পাঁচশ টাকা চাইলো সারিঘাট পর্যন্ত যাবার জন্য। আমাদের আক্কেল গুড়ুম। কোথায় পনেরো টাকা আর কোথায় পাঁচশ! সেটা ছাড়া আর একটাই পথ ছিল, সেটা হচ্ছে, নদী পার হয়ে উল্টা পাশ থেকে ঘন্টা খানেক অন্ধকারে হেঁটে ডিগাডাইল গিয়ে সেখান থেকে জৈন্তা গিয়ে সেখান থেকে রিকশা নিয়ে সারিঘাট যাওয়া। (আমি সারা জীবণে কখনো এই নামগুলো শুনিনি, কিন্তু সেদিন ঠেলায় পড়ে এমনই শিখসি, এখনো ভুলতে পারছি না) তো, আমরা সাহস করে সেটাই করলাম, একটা ছেলে আমাদের নৌকা দিয়ে অন্যপাড় নিয়ে গেলো, ওর কাছে বৈঠা ছিল না, সেজন্য সে পা দিয়ে নৌকা বাইছিল। তো আমরা অন্ধকার পথ দিয়ে হাঁটতে থাকলাম, দুইটা হাসিখুশি কুকুর লেজ নাড়তে নাড়তে আমাদের সাথে হাঁটতে শুরু করলো। অন্ধকারে হাঁটা কেমন যেন একটা ব্যাপার, পথের দুপাশে একটা দুইটা জোনাকি জ্বলছে, আর ঝিঁঝিঁপোকার শব্দ। মাঝে মাঝে অনেক দূরে একটা দুইটা বাড়ির অল্প একটু আলো দেখা যায়, আকাশ মেঘলা বলে আকাশে কোন তারা নেই, কোন চাঁদও নেই অমাবস্যা বলে। আমাদের কপাল খুব ভালো কোথথেকে একটা খালি রিকশা এসে হাজির হলো, সে আমাদের অনেকটুকু পথ নিয়ে আসলো, তারপর একটা জায়গায় বলল, এরপর তো আমি আর যাবো না, এই পথ দিয়ে হেঁটে চলে যান, এইদিক দিয়ে ডিগাডাইল যাওয়া যায়। চায়ের দোকান টোকান পেলে জীজ্ঞেস কইরেন সারিঘাট ক্যামনে যাওয়া যায়। চীং ওর নোকিয়া ১১০০ এর টর্চ জ্বালালো, আমি কেন জানি বললাম ওটা বন্ধ করতে, ওটা বন্ধ করার পর দেখলাম, চারপাশটা ভয়াবহ ভুতূড়ে অন্ধকার, কিচ্ছুটা দেখা যাচ্ছে না। বাঁশগাছগুলোতে বাতাস এসে পড়ছে আর শোঁশোঁ শব্দ হচ্ছে। আমার খুব হাসি পেলো আমাদের অসহয়াত্ব দেখে, চীং টর্চ জ্বালালো, নইলে হাঁটা যাচ্ছিল না। আমার আরো হাসি পাচ্ছিল কারণ আমি ফোন খুলে দেখি, সেখানে এজ কানেকশন আছে। নরমাল জিপিআরএস ও না, একদম এজ! হাস্যকর, যে আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি ঘরে ফেরার, একটা অন্ধকার পথ দিয়ে হাঁটছি ডিগাডাইল নামের একটা জায়গা খুঁজতে, চারপাশে কোথাও কোন মানুষ নেই, এই পথটায় রিকশাও চলে না, অথচ আমি চাইলেই এখন একটা টুইট মারতে পারবো - 'হারিয়ে গিয়েছি' টাইপের।

আমরা অনেকক্ষণ ওই পথ দিয়ে হাঁটলাম, যখন মনে হতে থাকলো এই পথ আর শেষ হবে না, তখন দূরে আলো দেখতে পেলাম, একটা চায়ের দোকান - কিন্তু আমরা তখনো ডিগাডাইল পৌছিনি। তারপর আবার অনেকটুকু হাঁটলাম, তারপর একটা রিকশা পেলাম, সেই রিকশাটা আমাদের সারিঘাট নিয়ে আসলো, আর আমরা বাসে উঠে সিলেট ফিরে আসলাম।

তুমি যদি কখনো ঠিক এরকম একটা অজপাড়াগাঁয়ে যাও, রাজধানীতে অনেকগুলো বছর থাকার পর, তুমি প্রথম যেটা নোটিশ করবে, সেটা হলো জীবণযাত্রার ভিন্নতা। ওদের আর আমাদের পৃথিবী কতটা আলাদা সেটা ভাবতেই তোমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে। আমার সিলটি টানটা খুব ভালো লাগছিল শুনতে - আর আমার ভাবতেই খুব বাজে লাগছিল, যখন এই মানুষগুলো শহরে যায়, ওর ওদের সুন্দর কথা বলার টানটা ছুড়ে ফেলে কৃত্তিম সুরে 'শুদ্ধ বাংলা' বলতে। আমার মনে হয় আমরা এভাবেই আমাদের সব শুদ্ধতাগুলো ছুড়ে ফেলে দেই - আর সবার মতো হতে চেষ্টা করে। যে ছেলেটা আমাদেরকে পা দিয়ে বৈঠা বেয়ে নদী পার করে দিয়েছিল, সে হয়তো সারা জীবণে আমার এক দশমাংশ সুযোগও পাবে না, হয়তো আমি খুব বড় বড় কাজ করবো আর বুক ফুলিয়ে ভাববো 'কি করে ফেললাম!'। এবং কখনো ভাববো না, বাংলাদেশ আসলে ঠিক অল্প কয়টা সুযোগ পাওয়া মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না - বাংলাদেশ ঠিক শহুরে কয়েকটা দেয়ালের মধ্যে আটকা পড়া একটা জায়গা না। বাংলাদেশটা অনেক বড় একটা দেশ। অনেক অনেক মানুষ নিয়ে - যারা কখনো খুব একটা সুযোগ পায় না, জীবণে কিছু একটা করার বা কিছু একটা হওয়ার - কিন্তু ওর সুযোগ পাওয়া নিয়ে মাথাও ঘামায় না। আমাদের প্রধানমন্ত্রীরা দামি দামি শাড়ি পড়ে বিদেশে যায় দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে, আমাদের নেতারা পল্টন ময়দানে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে গলা ফাটায় আমজনতার কান ফাটানোর জন্য, ভার্সিটিতে দূরদূরান্ত থেকে ছেলেপুলে পড়তে আসে, এসে সিট না পেয়ে রাজনীতি করে শুধু মাথার উপর একটা ছাদ পাওয়ার জন্য - তারপর ওরাও একটা সময় গিয়ে শূণ্য কথার প্রাসাদ গড়বার জন্য বক্তৃতা দিতে শুরু করে। আমাদের কবিরা এত বেশি কঠিন কঠিন শব্দ দিয়ে কবিতা লেখে, যে আমরা ভুলতেই বসি, কবিতার উদ্দেশ্য কি। আমাদের গল্পগুলোতে আর গানগুলোতে ওয়েস্টার্নদের ফেলে দেয়া চিন্তাগুলো জায়গা করে নেয়, আর সেটা দেখ সবাই আহাউহু করে।

আমার সবসময় মনে হতো, কারো যদি কিছু করার থাকে, তার বেশি বকবক করা উচিত না সেটা করা নিয়ে। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম, তোমার সামনে একটা কলার ছোকলা আছে, তুমি দুটা কাজ করতে পারো, একটু হেঁটে গিয়ে কলার ছোকলাটা তুলে ড্রেনে ফেলে দিতে পারো, অথবা দাঁড়িয়ে থেকে, কলার ছোকলাটার সামনে দাঁড়িয়ে দেশ ও জাতির বিবেক এবং কলার ছোকলা রাস্তায় ফেলার অপকারিতা, এবং গণমানুষের পা এবং কোমড় ভাঙার নীল নকশা নিয়ে একটা বিশাল বক্তৃতা দিয়ে দিতে পারো।

সত্যি কথা, তুমি যদি দ্বিতীয়টা করো, আমি একটুও অবাক হবো না - বেশিরভাগ বাংলাদেশিই সেটাই করবে। কিন্তু আমার মনে হয়, তখনই একটা মানুষের বক্তৃতা দেয়া সাজে, যখন সে দেখবে সে বক্তৃতা দেয়ার চে' ভালো কাজ আর করতে পারছে না - ধরো তুমি যুদ্ধ করতে চাও, তোমার হাতে মানুষ বা বন্দুক নেই - তখন তুমি অধিকার রাখো বাকি সবার উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেয়ার যাতে সবাই তোমার সাথে আসে এবং তুমি আসলেই যুদ্ধ করা শুরু করতে পারো।

কিন্তু আমাদের জেনারেশনটায় কিছু মানুষকে দেখে আমার উপরের লাইনগুলো মুছে ফেলতে ইচ্ছে করে.. যদিও কথাগুলো খুব সত্যি।একটা খুব সুন্দর কথা ছিল - পৃথিবীতে এমন কোন আঁধার নেই যেটা একটা ছোট্ট মোমের আলো দূর করতে পারে না। আমি অনেকগুলো ছোট্ট মোমের আলোকে চিনি, এবং আমি তাদের মধ্যে সূর্য দেখতে পাই। হয়তো সেটা আমার চোখের ভুল, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি তাদের মধ্যে সূর্য আছে। একটা বড়সড় সূর্য, যার যথেষ্ট তেজ আছে সবার চোখের জল শুকিয়ে দেয়ার।

পরের দিন আমি শাহজালালের মাজারে গেলাম, মাজারের খাদেমদের দেখে আমার খুব চেনা চেনা লাগলো কিছু একটা - ওদের লুক আর হাতে টাকা গোনার মধ্যে কিছু একটা ছিল। আমার মনে হচ্ছিল, আমি হুবহু এই লুকটা চিনি, আমি হুবহু এটাই দেখেছি মথুরার মন্দিরের পুরোহিতের মুখে।

মথুরা হচ্ছে কৃষ্ণদেবের জন্মস্থান। সেখানে হাজার হাজার মন্দির। পুরো ভারত থেকে মানুষ সেখানে যায় পুজো দিতে। আর আমরা যেই মন্দিরটা দেখতে গিয়েছিলাম, সেটার পুরোহিত ছিল একজন বাঙালী। মন্দিরটা অদ্ভূত ছিল - কোথাও একটু জায়গা বাকি ছিল না যেখানে কেউ একটা শ্বেত পাথর বসায় নি - নিজের নাম আর ঠিকানা লিখে। পুরোহিত আমাদেরকে বলল পূজা দেয়ার জন্য পয়সা দিতে, আমি চেপে গেলাম একদম যে আমি মুসলমান, অল্প কিছু পয়সা ধরিয়ে দিলাম, আমার সাথে ছিল সদ্য বিবাহিত এক নেপালি দম্পতি, তারা অস্বীকার করলো কিছু দিতে আর সেই পুরোহিত তাদের দেশের পরিচয় ধরে তাদের আচ্ছা মতো অপমান করলো। আমরা বাসে পাশাপাশি বসেছিলাম, হাসিখুশি মানুষদুটো মুখ ভারি করে মুখ কালো করে বসেছিল। একজন আরেকজনকে শান্ত সুরে কিছু বলছিল, যেন কিছুই যায় আসে না, এটা ওদের হানিমুন, ওটা হানিমুনই থাকবে। আমি কথা বলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু চিয়ার আপ করতে পারলাম না, লোকটা আমাকে ওদের বিয়ের ছবি দেখালো ক্যামেরায় আর আমি বললাম, নেপাল দেখতে কত সুন্দর - তো সে আমাকে ওর ঠিকানা লিখে দিল। আমার মনে হয় না, কারো স্রষ্টাকে খুব প্রয়োজন, কাউকে অপমান করার জন্য - কিংবা কিছু কবর দেখিয়ে পয়সা আয় করার জন্য।



সেদিন দুপুরে আমি চীং কে একটা ভালো রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলাম লান্চ করার জন্য। আমি এ মাসের শেষে কুয়ালালামপুর চলে যাচ্ছি। আমি জানি না আবার কবে আমাদের দেখা হবে। রেস্টুরেন্টটার নাম ছিল টোনাটুনি।



তো আমরা দুই টোনা মিলে একটা টোনাটুনি টাইপের জায়গাও পেয়ে গেলাম বসবার জন্য। খাবারগুলো খুব ভালো ছিল, আমি খেয়ে খুব মজা পেয়েছি। সেদিন সন্ধ্যায় আমরা একসাথে বসলাম একটা গান কম্পোজ করার জন্য, গানটার সুর আর কথা ছিল আমার, কিন্তু চীং গানটাকে আমার ভেতর থেকে বের করে আনলো, আমার গলা খুব বেসুরো, সেজন্য সে হারমোনিয়াম দিয়ে আমাকে একটু রেওয়াজও করিয়ে নিলো - পুরো ব্যাপারটা হেববি ফান ছিল।



গানটা ছিল আমার আপুর ছেলের বার্থডে গিফট। সে আমাকে ফোন করে বলল, মামা! আজকে আমার জন্মদিন। আমি এখন ছয়! তুমি কেন আমাকে গান পাঠাও নাই এই জন্মদিনে? আগের বছরের মত? আমি এখন ছয়!!

তো আমি এরপর ট্রেনে উঠলাম, আমার উল্টোপাশে বদমেজাজি একটা লোক বসলো, সে ঝগড়া শুরু করলো আমার পাশের ছেলেটার সাথে পা রাখার জায়গা নিয়ে, আমি হেডফোনটায় গান শুনতে থাকলাম, আর অ্যালবার্ট ক্যামুর আউটসাইডার পড়তে থাকলাম। একটা সময় ঘুমিয়ে পড়লাম, আর চোখ খুলে দেখি বাইরে খুব অল্প অল্প আলো, ঘন্টাখানেক পর ভোর হবে, আর আমরা ঢাকায় ঢুকছি। ধানক্ষেতগুলো হারিয়ে গেলো, আর সেখানে জায়গা করে নিলো বিশাল বিশাল বিল্ডিংগুলো, আর আমি শহরে ফিরে আসলাম।

বদমেজাজি লোকটা নেমে যাবার সময় আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো, যেন বলল, শুভ কামনা! বিদায়! আমি ততটা খারাপ মানুষ না যতটা আমাকে মনে হয়!

আমি ওর হাসিটাকে বিশ্বাস করলাম। বের হয়ে ছয় নাম্বার বাসে করে ফার্মগেটে আসলাম, তখন ভোর সাড়ে ছয়টা - অথচ ফার্মগেট পুরা ফাঁকা - কোথাও একটাও মিরপুরের বাস নাই। আমার চরম মেজাজ খারাপ হলো। কিন্তু আমার কিছুই করার ছিল না। আমি এক ধরণের রাগ নিয়ে ফার্মগেটে আলো আঁধারিতে দাঁড়িয়ে থাকলাম, পিঠে একটা ভারী ব্যাগ নিয়ে, আর ঠান্ডা লাগা একটা ভারী মাথা নিয়ে।

তারপর যখন বাস পেলাম, তখন পথের পাশের সব অ্যাপার্টমেন্টগুলো দেখতে কেমন খেলনা খেলনা লাগছিল ভোরের আলোয় - আমি তাকিয়ে থাকলাম।

যেন আমি নতুন ঢাকায় এসেছি।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/29046558 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/29046558 2009-11-20 02:37:15
সূর্যুটে ভোর
অ্যালার্মটা খিটখিট করে উঠলে ওর ঘুম ভাঙলো আর তখন ওর একবারো মনে হলো না, ভোর হয়েছে, ওর শুধু মনে হলো ও ভীষণ ক্লান্ত, আর আরেকটা দিন শুরু হচ্ছে, শুধু শুধু বিশাল একটা পৃথিবীকে টানার জন্য।

তাই সে একটা হাই তুলল, কাঁথাটা গায়ের উপর টেনে আবার ঘুমিয়ে পড়লো।
আর সূর্যটা বাধ্য ছেলের মতো অপেক্ষা করলো ওর ঘরের মেঝেতে..

তারপর ঘড়ির কাঁটাটা ঘুরতে থাকলো তার নিজের ইচ্ছেমতো, আর সূর্যটা হেলতে থাকলো, হেলতে থাকলো আর পৃথিবীটা তার বিচ্ছিরি চরকাটা ঘুরিয়ে সূর্যের সাম্রাজ্য গুটিয়ে দিতে থাকলো। তারপর একটা সময় সূর্যটা বাধ্য হলো ছায়াগুলোকে ঘরটা ছেড়ে দিতে, আর মন খারাপ করে চলে গেলো ম্লান হয়ে।

তখন ছেলেটার ঘুম ভাঙলো।

চোখ ডলতে ডলতে ছেলেটা উঠে বসলো আধো অন্ধকার একটা ঘরে।
আর কখনোই জানলো না, সূর্যটা কতো তাড়াহুড়া করে এসেছিল, ওকে অল্প একটু রোদ দেবে বলে। অল্প একটু মন ভালো করা রোদ।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/29024783 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/29024783 2009-10-13 00:15:45
হৃষ্টপুষ্ট মনখারাপটা দুষ্ট

ছোট্ট বিড়ালটা বলল মিউ
আর বড় বিড়ালটা বলল মি-য়া-ও!
তারপর ওরা দুজন মিলে লেজ নাড়ানো মাছটাকে খুঁজতে চলে গেলো।

ছোট্ট মাছটা বলল পুটপুটপুট
বড় মাছটা বলল বুদবুদবুদ
তারপর ওরা দুজন মিল লাল-নীল-সবুজ বুদবুদ ছাড়তে ছাড়তে চলে গেলো।

ছোট বুদবুদটা বলল পুটুশ
বড় বুদবুদটা বলল গুটগুটুশ
তারপর ওরা পানি থেকে ফুটুশ করে বের হয়ে আকাশে উড়ে গেলো মেঘ হয়ে।

ছোট মেঘটা বলল ঝিরঝিরঝির
বড় মেঘটা বলল ঝড়ড়ড়ড়ড়ড়ড় ঝড় ঝড়!
তারপর ওরা ঝিরঝির ঝড়ঝড় করে সব্বাইকে ভিজিয়ে দিলো।

ছোট গরুটা ভিজে গিয়ে নাকটা তুলে বলল মুওওওহ!
বড় গরুটা ভিজে গিয়ে বলল হাম-বাহ!
তারপর ওরা সবুজ মাঠটায় কচমচে সবুজ ভেজা ঘাস খেতে চলে গেলো।

ঘাসের উপর ছোট্ট ফড়িংটা বলল শিশিশি
ঘাসের উপর বড় ফড়িংটা বলল ঝ্রিঝ্রিঝ্রি
তারপর ওরা উড়ে গেলো বিড়ালটার সাথে খেলতে।

তারপর ছোট বিড়ালটা বলল মিউ
আর বড় বিড়ালটা বলল হালু-উ-ম!
তারপর দুজন মিলে ফড়িংদের সাথে নাচানাচি করলো,
আর তখন ঘাসগুলো গান গাইলো আর

ঠিক

তখন

সবাই নাকি শুনলো - হুহুহু!

আর হুহু করা বাতাসটা গালে হাত দিয়ে খুব মন খারাপ করলো, কারণ শুধু সেই বসে বসে সব শব্দগুলো শুনছিলো, আর শব্দগুলোকে নিয়ে ঘুরছিল, কিন্তু কেউ কান পাতলোই না!

পুনশ্চ ১ :

And you wind up lost and it's
The best thing that could have happened
‘Cause sometimes when you lose your way it's really just as well
Because you find yourself
Yeah that’s when you find yourself

পুনশ্চ ২ :
আবির একটা নাম ঠিক করসে আমাদের টিমের জন্য - DU Yadwft, যেটার মানে হচ্ছে Yet Another DU World Final's Team। এবং আমার নামটা খুব পছন্দ হইসে। আমি বসে বসে ওর সাথে প্ল্যান করলাম আমি যাই হোক আর তাই হোক এখন থেকেই দিনে আট ঘন্টা করে ট্রেইন আপ করবো, কারণ ওয়ার্ল্ড ফাইনালসে এ গিয়ে অন্যদের বেলুন গোনা বড়ই পেইন! এবং সত্যি কথা আমি চাইলেই আসলে আট ঘন্টা করে ট্রেইন আপ করতেই পারি - সপ্তাহে ষাট ঘন্টা দেয়ার মত সময় আমার আসলেই আছে! আমি সপ্তাহে সত্তুর ঘন্টা মন খারাপ করে বসে থাকি। সেই সময়টুকু এখানে চাইলেই ঢালা যায়! সতেজ ভাইয়ের কথা মাঝে মাঝে খুব মনে হয়, সতেজ ভাই খুব গুরুত্ব দিতো, তুমি আসলেই বিশ্বাস করো কিনা তুমি যেটা করতে চাচ্ছো সেটা তুমি পারবা কিনা। এবং আমার এখন খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে সতেজ ভাইয়ের কথা, জান ভাইয়ের কথা। আমার সেন্সেই বলতো, তুমি কিছু হিট করার সময় বা দাচি দেয়ার সময়, আগে স্টেপ দিবা, তারপর দেখবা তুমি ভুল করসো কিনা - অত দেখতে দেখতে মুভ করলে কিছুই হবে না। আমাদের একটা এক্সারসাইজ ছিল আপ-আপ-আপ-ডাউউন .. আমার মাঝে মাঝে ওটার কথা মন পড়ে। কারণ ওটা ছিল তুমি প্রতিবার আপ বলার পর একটু উপরে হাত দিয়ে দেখবা তুমি কত উপরে হাত দিতে পারো, তারপর ডাউন বললে তুমি ধুপপ করে বসে পড়বা, যেন তুমি কখনোই উপরে উঠতে চাওনি। আমি কারাতে ক্লাস ছেড়ে দেয়ার পর মাঝে মাঝেই ভাবতাম, ওটা কি আসলেই অ্যাবসট্র্যাক্ট, আমি যেরকম ভাবছি?

পুনশ্চ ৩ :
সেজান পুলিশ হতে চায়!
আমি অবাক হয়ে বললাম, তোর পুলিশ হওয়ার জন্য সব কিছু আছে? ওজন, হাইট?
সেজান দুহাত সরিয়ে দেখালো ও অনেক মোটা, মাথার চুলটা লম্বা করে দেখালে হাইটও আছে! তারপর পেটে হাত দিয়ে দেখালো ওর একটা ছোট খাটো ভুড়িও আছে!!

আমি আর শাফি হাসলাম, কিন্তু সেজান আসলেই সিরিয়াস, ওর মাথায় নাকি এখন জাতিসংঘের সপ্তম কি-যেন-কি এর নাম ঘুরে সারাক্ষণ, (বান-কি-মুন?) এবং সে একবার পরীক্ষা দিয়েই চান্স পাবে, কারণ সে এখন থেকেই পড়ছে, আর ওর পাশ করতে আর তিন বছর লাগবে! তিন বছর পর সে ওয়াসিপিডিয়া হয়ে যাবে!‍

শেষ কিছুদিন আমার মাথায় ঘুরছিল, আমি এয়ার ফোর্সে পরীক্ষা দিবো, তারপর প্লেইন চালাবো, আমার পড়াশুনা করতে আর ভাল্লাগতেসে না! তারপর শুনলাম, প্লেইন চালানোর আগে নাকি দেড় বছর দৌড়াতে হবে! কি ভয়াবহ ব্যাপার! আমার প্লেইন চালানোর ইচ্ছে চলে গেলো! <img src=" style="border:0;" />

পুনশ্চ ৪ :
শাফির ছাত্র হজ্জ্ব করে ফিরে এসেছে এবং শাফি আবার পড়াচ্ছে। শাফি খুব মৌজ নিয়ে আঙ্গুল নাকের কাছে নিয়ে নাড়লো, আর বলল, "আহ!! কতদিন পর আবার নিজের টাকার গন্ধ পাবো"। আমি খুব মজা পাইসি।

সেজানের ওর ছাত্রীকে প্রোবাবিলিটি পড়ানোর কথা ছিল। সেজ করলো কি, গেলো, কিচ্ছু পারলো না। তো ইতস্তত করে ওর জব্বারের বইটা নিয়ে গেলো। তারপর পৃষ্ঠা খুলে বলল, "এই বইটা অনেক ভালো বই, তুমি পড়লেই বুঝতে পারবা। তবে আমি যদি আবার পড়তে যাই আমার এটা আবার কষ্ট করে পড়তে হবে। তারচে' বরং তুমিই পড়"। তারপর সে চলে আসলো। আজকে সে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, "এরপরও আমার কাছে পড়ে!"


শাফি পয়সা পাওয়ার পর আমরা কোন একটা উইকেন্ডে আমাদের ট্রেইন টুরটা করতে বের হবো। আমরা বুধবার বিকেলবেলা কমলাপুর যাবো, তারপর সামনে যেই ট্রেইন পাবো সেটাতে উঠে বসবো, তারপর শুক্রবার আবার ঢাকায় ফিরে আসবো। এটা আমাদের অনেক পুরনো প্ল্যান ছিল, কেন জানি করা হয় নাই। আমার খুব ঢাকা থেকে বের হতে ইচ্ছে করছিল কালকে, আমি অমিকে ফোন করলাম সেন্ট মার্টিনে এক সপ্তাহ থাকার খরচ জানতে, ও যখন বলল চার পাঁচ হাজার টাকা - আমি ডট ডট ডট.. আমার কাছে এখন প্রায় এক হাজার টাকা আছে, যেটা ছোট ভাইয়া আমাকে জামা কাপড় কেনার জন্য দিসে, কিন্তু আমার জামা কাপড় কেনার কোনই ইচ্ছে নাই, কারণ আমি কন্টেস্টগুলা থেকে যথেষ্ট জামাকাপড় পাই। তো.. টাকাটা ট্রেইনটুরে কাজে লাগবে! <img src=" style="border:0;" />

পুনশ্চ ৫ :
মৌটুসি আপু চাকরি করছে! বাংলালিংকে কাস্টোমার কেয়ারে!
ওর এখন ট্রেইনিং পিরিয়ড এবং সে খুব খুব বিরক্ত কারণ ওকে এখন মুখস্থ করতে হচ্ছে কোন সময় কলরেট কত, কতগুলো এফ এন এফ করা যায়, কিভাবে কি সেট করতে হয়। বেচারা খুবই বিরক্ত কারণ সে এতগুলো বছর বাংলালিংক ব্যবহার করলো, কখনোই এসব জানা লাগে নাই! সে আরো বিরক্ত কারণ, বিবিএর এত্ত পড়াশুনা আর কোনই কাজে লাগতেসে না! এবং এখনো ওর মুখস্থই করতে হচ্ছে! এবং সে আরো বিরক্ত কেন ওরা পাঁচ হাজার টাকা ফোন বিল দিবে! পাঁচ হাজার টাকার কথা মানুষ কিভাবে বলবে, যদি সে প্রতিদিন নয় ঘন্টা করে কাস্টোমার কেয়ারে এমনিই বক বক করে?

আমার খুব ভাললাগছিলো ও চাকরি পাওয়ার পর! <img src=" style="border:0;" />

পুনশ্চ ৬ :
সিজার ভাইয়া বিয়ে করছে! জুনের পাঁচ তারিখ! কি ভয়াবহ ব্যাপার! আমি এখন আর রাত নয়টায় গিয়ে ওর ঘরে আড্ডা মারতে যেতে পারবো না! চ্যাংদোলা হয়ে ওর সাথে আউফাউ গল্প করাও আর যাবে না! কি ভয়াবহ ব্যাপার! ওর সাথে আর মুভি দেখাও আমার হবে না, হেলভেশিয়ায় খাওয়াও হবে না! কি ভয়াবহ ব্যাপার!

কিন্তু আজিব ব্যাপার, সিজার ভাইয়া আরো "কুল" টাইপের হয়ে গেসে এখন। আমি সেদিন ওর বাসায় গিয়ে বসলাম বকবক করতে, আর বললাম আমি খুব ফ্রাস্ট্রেটেড, সে বলল, "হেহেহে বিয়ে করে ফেলো, লাইফে স্ট্যাবিলিটি আসবে, হেহেহে" তখন আমার খুব রাগ লাগলো।

যাইহোক! <img src=" style="border:0;" />
ব্যাপারটা আসলেই ভয়াবহ! ও ডিভিডি কিনতেও মনে হয় আর আমাকে নিয়ে যাবে না! <img src=" style="border:0;" />

পুনশ্চ ৭ :
রকিব বিয়ে করছে! অ্যারেন্জড ম্যারিজ! আমি ওয়াসির কাছ থেকে শুনে টাশকি খেয়ে গেসি।

পুনশ্চ ৮ :
ওয়াসি একটা জোশ ল্যাপটপ কিনসে! ওর ল্যাপটপটা সিরিয়াসলি জোশ! পাঁচ ঘন্টা ব্যাক আপ থাকে, কি ভয়াবহ ব্যাপার! কোর২ডুয়ো, ২গিগা র‌্যাম, ১৬০ গিগা হার্ডডিস্ক! বিয়ে করে ফেলার মত ল্যাপটপ! ওয়াসির সাথে অনেক দিন দেখা হয় না!

পুনশ্চ ৯ :
আনারা একটা ছেলের নাম দিসে - স্ট্রিঙ - কারণ সে নাকি ল্যাবে সবাইকে শুনাই বলতেসিলো - "আমি ছোটখাটো যোগবিয়োগ স্ট্রিঙ দিয়েই করে ফেলি!"। ওকে দেখলেই এখন সবাই হাসে আর বলে - স্ট্রিঙ যাচ্ছে।

আনা একটা কিবোর্ড কিনসে, আর সে যেসব জিনিস বাজাচ্ছে সেগুলো শুনে আমার চেয়ার থেকে পড়ে যাবার মত অবস্থা! ও আসলেই মিউজিকালি গিফটেড।

পুনশ্চ ১০ :
কি আজিব! এই পুনশ্চ মানবরাই আসলে আমার লাইফের সবকিছু! কি আজিব!

পুনশ্চ ১১ :
আমি এখন টুপকোডারে ব্লু! <img src=" style="border:0;" />

পুনশ্চ ১২ :
সুমিত এখন ঢাকায়। জ্যাজি এত বড় হইসে, ওকে দেখলে আমার ভয় লাগে! সুমিত এখন ভয়াবহ গিটার বাজায়। সে সেদিন একটা রিদম বাজাচ্ছিল, আর আমার মনে হচ্ছিলো ইশশ.. এটা যদি আমি বাজাতে পারতাম, সারাদিন বাজাতাম আর শুনতাম!

আমি কিছুতেই বাঁশিতে কিছু করতে পারছি না। <img src=" style="border:0;" />

পুনশ্চ ১৩ :
এহসান কারাতে শিখছে!
ও লাবু মিয়ার কাছে গিয়ে বাঁশিও শেখে!
চৈতি এখন টিভিতে নাচে! ও এখন অরেন্জ বেল্ট এবং সে সিরিয়াসলি ট্রেইন আপ করসে পরের জুডোর ন্যাশনালস এর জন্য! কি ভয়াবহ ব্যাপার যে সে এখনো আবৃত্তিও করে!

পুনশ্চ ১৪ :
শাফি আজকে বাসস্ট্যান্ডে দাড়াই দাড়াই সিগারেট খাচ্ছিল, তারপর সিগারেটটা শেষ হলো, সে ফেলে দিলো, তারপর ডানে মুখ ঘুরাই দেখে ওর খালা ছানাবড়া চোখ নিয়ে ওর দিকে তাকাই আসে।

সে এতই ভ্যাবাচ্যাকা খেলো ওর খালার ওভাবে তাকাই থাকতে দেখে, সে ভয়ে ভয়ে তাড়াতাড়ি বলল সে যাচ্ছে, ওর যাওয়া লাগবে, তারপর জেমস বন্ডের মত করে একটা লাফ দিয়ে বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে পড়লো।

পরের আধা ঘন্টা সে হাসলো। আমি খুব কল্পনা করার চেষ্টা করলাম, ওর খালা কিভাবে তাকাচ্ছিল।

সেজ আর শাফি এখন ভয়াবহ সিগারখোর হয়ে গেসে। <img src=" style="border:0;" /> আমার মনে হয় শাফি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিবে, কারণ সে নাকি এখন আর 'পিনিক' পাচ্ছে না। আমি অবশ্য ঠিক জানি না, 'পিনিক' মানে কি.. <img src=" style="border:0;" />

পুনশ্চ ১৫ :
স্টেইন্ড এর গানটা খুব সুন্দর।

Now that we are here,its so far away
All the struggle we thought was in vain
All the mistakes, one life contained
they all finally start to go away
Now that we are here its so far away
and i feel like i can face the day,
and i can forgive,
and i am not ashamed,
to be the person that i am today

গানটা চারবছর আগে যেরকম লাগতো এখন তারচে অনেক অর্থপূর্ণ লাগে।

পুনশ্চ ১৬ :
সবসময় ভালো থাকা খুব সহজ - যদি তুমি সেটার আগে একটা const লিখে দাও ! <img src=" style="border:0;" />
- প্রোগ্রামিঙ, লাইফ, দা ইউনিভার্স অ্যান্ড এভরিথিঙ <img src=" style="border:0;" />

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28954452 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28954452 2009-05-23 04:13:44
ডট্রমন্ত্র আমি শুনছি তুমি ছুটছো মরুভূমি
আমি ভাবছি মেঘ হয়ে ছুটবো তোমার পিছু
আমার প্রার্থনা নেই অবশিষ্ট আর কিছু।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28943031 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28943031 2009-04-27 05:37:09
কোন একদিন
কোন একদিন কেউ একজন তোমার উপর হোঁচট খেয়ে পড়বে, কারণ সে ভাববে তুমি ঠিক একই পাথরটা আছো, যে সবসময় একই পাথরটাই থাকে, এবং সে তোমার উপর রেগে কিড়মিড় করবে, যদিও দোষটা ঠিক তোমার ছিল না। তোমার দিনটা খারাপ যাবে মন খারাপ করে, এবং হাল্কা রেগে গিয়ে। কিন্তু সেটা শোনার জন্য তখন আর কেউ থাকবে না।

কোন একদিন আকাশ লাল করে সন্ধ্যা নামবে। শহরে ধুলো উড়াবে বাসগুলো। কোন একদিন দুফোঁটা বৃষ্টি পড়বে পাথরটার উপর। পাথরটা সবাইকে দেখানোর চেষ্টা করবে, যে ওর গালেও কান্নার জল আছে। কিন্তু কেউ সেটা দেখবে না। তারপর কোন একদিন তুমি কাদা হয়ে মিশে যাবে মাটির সাথে। কেউ আর তখন তোমাকে অপবাদ দেবে না পাথর বলে।

কোন একদিন সব অভিযোগগুলো ফুরিয়ে যাবে, তুমি তোমাকে ঝেড়ে ফেলবে কবিতার খাতায়, কিন্তু সেখানটায় কিছু পড়বে না। কোন একদিন চোখটা খুব ব্যাথা করবে, তাই তুমি একদম পড়বে না। কোন একদিন সবকিছু পড়ে যাবে, কিন্তু তোমার কোন কিছু তুলতে ইচ্ছে করবে না। কোন একদিন সবাইকে ওয়েস্ট বাস্কেটে ফেলে দিতে ইচ্ছে করবে, সব ফালতু কবিতা, আর বাদামের ঠোঙার মতো। কিন্তু তুমি নিজেকেই ঠেলে ফেলে দিবে, কিন্তু ঠিক ফেলে দিতেও পারবে না।

কোন একদিন সব শব্দগুলো চুপ হয়ে যাবে, তোমাকে ঘুমোতে দেবার জন্য। তুমি বাকিদিনগুলো রাত জেগে জেগে অপেক্ষা করবে সেই কোন একদিনের জন্য। কিন্তু কোন এক দিনটা কবে আসবে সেটা কোন ক্যালেন্ডার তোমাকে জানাবে না।

কারণ হয়তো, কোন একদিনগুলো কোন দিন আসে না। কারণ গুহামানবরা স্বপ্ন দেখে না প্রজাপতি হয়ে উড়বার, আর প্রজাপতিরা ভাবতে পারে না দুসপ্তাহের বেশি আয়ুর কথা। তাই প্রজাপতিগুলো ফুলকে ভালোবাসে, আর গুহামানবরা কুঠারকে। কিন্তু তাতে কখনো কারো কিছু যায় আসে না। কারণ বাকি সবাই পাথরের মত চুপচাপ বসে থাকে, আর বাকি সবাই কখনো পাল্টায় না।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28919272 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28919272 2009-03-03 01:04:49
জল টলমল
রাইশা অনেক পরে খেয়াল করলো আমাকে। ও তখন নাক টানছিল। একটা ছোট্ট সাদা রুমালে নাকটা মুছলো, নাকের উপর থেকে চুলটা সরালো, তারপর লাল চোখগুলো নিয়ে আমাকে বলল, "আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে থেকো না, আমার নিজেকে একটা বাচ্চা মেয়ে মনে হয়!" বলে শব্দ করে নাক ঝাড়লো সাদা রুমালটায়..

আমার হাসি পেলো, কিন্তু আমি সেটা দেখানোর ঝুকি নিলাম না। "যে মেয়েটা সবসময় মুভি দেখে কান্নাকাটি করে, সে কি বাচ্চা মেয়ে নয়?"। রাইশা আমার চেপে রাখা হাসিটা বুঝে ফেললো, বালিশটা নিয়ে ধাম করে আমাকে একটা বাড়ি মারলো। খুব জোরেও না, খুব আস্তেও না। এধরণের বাড়ি খেলে বোঝা যায় মানুষটা কি বলতে চাচ্ছে। বোঝা যায়, মানুষটা আমার উপর রেগে আছে, কিন্তু সে আমাকে তবু আঘাত করছে না, কারণ সে আমাকে ভীষণ ভালোবাসে।

"তুমি সবসময় এভাবে কাঁদো কেন? মুভিগুলো বানানো জিনিস, সবকিছু কল্পনা।"
"কিন্তু অনুভূতিগুলো তো সত্যি। পৃথিবীতে কোন না কোন মানুষ তো এই কষ্টটা পাচ্ছে তাই না?"
"উমম.. হয়তো বা.."

এভাবে একেকটা বছর পার হয়, আমরা একটু একটু করে বড় হই, আর একটু একটু করে বুড়ো হই। রাইশা কাঁদতে থাকে যখন টিভির চরিত্রগুলো দু:খ পায়, আমি টিভির দিকে তাকালে কিছু প্রফেশনাল অভিনয় দেখতে পাই, কিছু গল্পের স্ট্রাকচার দেখতে পাই, কিছু সুন্দর ক্রিয়েটিভিটি দেখতে পাই। আমি ঠিক অনুভব করতে পারি না, অভিনয় করা মানুষগুলোর দু:খগুলোকে। কিন্তু রাইশা যখন কাঁদতে থাকে, আমি আর টিভির দিকে তাকাতে পারি না.. ওর ফিচফিচ থামলে আমি আমার খসখসে হাতটা দিয়ে ওর নরম গালের জল গুলো মুছে দেই, ও জল টলমল চোখে আমার দিকে তাকায়, আমাকে বলে.. "মানুষের কত কষ্ট না?", আমি চশমাটা খুলে রাখি চোখ থেকে, বলি, "মানুষের অনেক সুখও আছে..", রাইশা বলে, "তুমি বলো, তুমি কিভাবে সুখী থাকতে পারো, যখন তোমার পাশের মানুষটা কষ্ট পায়?", আমি আমার জমে থাকা নাকটাকে আটকাতে পারি না, হালকা শব্দ হয়, রাইশা দেখতে পায় টিভির আলোগুলো প্রতিফলিত হচ্ছে আমার চোখে, আমি তবু হাসার চেষ্টা করি, আর বলি, "তোমাকে কে বলল, আমি সুখী থাকি, যখন তুমি খুব কষ্ট পাও.."

আমরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে থাকলাম, টিভিটা তখন খামোখা শব্দ করছিল। আলোগুলো পড়ছিলো দেয়ালের উপর.. একা একা.. কেউ তাদের দেখছিলো না.. আমি ওকে আগলে ধরে থাকি.. ওর ছেলেমানুষি অনুভূতিগুলোকেও..

আমি জানি না ভালোবাসার সংজ্ঞা কি.. আমি জানি না.. কোন কিছু.. আমি শুধু জানি, আমি ওর ছেলেমানুষি অনুভূতিগুলো সবসময় আগলে ধরে রাখবো, আমি কখনো পৃথিবীর কাউকে দেবো না ওকে কষ্ট দিতে.. ওর কোন কিছুর গায়ে আঁচড় কাটতে.. আমি কখনো কাউকে সুযোগ দেবো না, ওকে এসে বলতে, যে সে একটা ছেলেমানুষ, ওর বড় হওয়া লাগবে.. আমি সবসময় ওর সবকিছু আগলে ধরে রাখবো, কারণ ওর অনুভূতিগুলো আমার কাছে ভীষণ দামি.. ভীষণ ভীষণ দামি.. পুরো পৃথিবীর সব অভিনয়গুলো অনেক সস্তা সেই তুলনায়.. সব ভানগুলো, সব বিভ্রমগুলো, সব অর্জনগুলো, সব খ্যাতি, সব শব্দ, সব আলো, সব রং, সব সব কিছু অনেক অনেক সস্তা..

আমি জানি না ভালোবাসার সংজ্ঞা কি.. কিন্তু যখন মুভিগুলো শেষ হয়ে যায়, রাইশা আমার বুকে মাথা ঢুকিয়ে কাঁদতে থাকে, আমার মনে হয় আমি ওকে শক্ত করে আগলে ধরে আছি.. আর আমার মনে হয় আমি ওকে ভালোবাসি..
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28914789 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28914789 2009-02-22 17:36:37
লাটিমি!
একটা প্রশ্নের অর্ধেকটা লিখে বাকিটুকু নিয়ে ভাবছি, তখন হঠাৎ একটুকরো রোদ এসে আমার ডেস্কে পড়লো, আমি কিছুক্ষণ জিনিসটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, কারণ কার্জন হল একটা বদ্ধ জায়গা, একদমই প্রাচীন গল্পগুলোর অপেরা হাউসের মতো। উপরে টিমটিম করে ফ্লুরোসেন্ট জ্বলছে। আমার ইতিউতি করে খুঁজলাম সূর্যটা কোথথেকে আসছে, সে আমাকে খুঁজে পেলোই বা কিভাবে, তারপর দেখি অনেক উপরে জানালার একটা ফুটো দিয়ে একটা সূর্যের রশ্নি এসে ঢুকছে, ওর আলোর পথের শূণ্যতাগুলো ধুলো হয়ে উড়োউড়ি করছে, সূর্যের আলো পড়ার আগে ধুলোগুলো যেন জানতোই না ওদের আলাদা কোন অস্তিত্ব আছে.. তাই মিলিয়ে যাচ্ছিলো সূর্যের আলো পার হওয়া মাত্র.. কে জানতো সূর্য কখনো ধুলোদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে? কিংবা ধুলোগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে সূর্যের কাছে? তারপর সূর্যটা ধুলোকে ইন্সপায়ার করে পড়লো ঠিক আমার ডেস্কে। আমার নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হলো, আমি কিছুক্ষণ লেখালেখি বাদ দিয়ে কলম উঁচিয়ে বসে থাকলাম, চশমাটা খুলে রাখলাম, আর নাকটা চুলকালাম। চশমাটা নাকে পড়লে আমার নিজেকে শিয়াল পন্ডিত শিয়াল পন্ডিত লাগে, তারপর মাঝে মাঝে নাক চুলকায়! <img src=" style="border:0;" /> কিছুক্ষণ পর সূর্যটা আরেকটু হেলে গেলো, আর রোদটা উধাও হয়ে গেলো আমার ডেস্ক থেকে, আমি চারপাশ খুঁজে দেখি সে আমার পাশের ডেস্কের ছেলেটার পা আলো করছে। সবটুকু রোদ ওর পায়ের উপরে গিয়ে পড়লো, কিন্তু ওর পাটা ছিল ওর ডেস্কের নিচে, তাই সেই ছেলেটা জানলোই না সে কি জিনিস মিস করলো!

আমি আর মেহেদী দাঁড়িয়ে ছিলাম, নিউমার্কেটের মোড়ে। তখনো সন্ধ্যা হয়নি, কিন্তু আকাশে চাঁদটা জোরে সোরে আলো দিতে শুরু করে দিয়েছিল। দেখলেই মনে হয়, একটু আগে আগে হয়ে গেলো না? একটুও তো আঁধার হয়নি। তারপর মনে হয়, হুমম, নিশ্চই আজকে রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম ছিল না, চাঁদটা আগেভাগে চলে এসেছে! তারপর মেহেদী চলে গেলো, আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম বাসের জন্য - তারপর উঠে বসলাম বাসের সিটে, ঠিক জানালাটার পাশে।আবার চাঁদটা চোখে পড়লো, তখন শহরে একটু আঁধার জমেছে, আর চাঁদটার অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট করে। আমার অবাক লাগলো, চাঁদটা কি ভীষণ উজ্জ্বল। তারপর ভাবলাম ওয়াও! চাঁদটা কি গো-ও-ও-ল! নির্ঘাত আজকে পূর্ণিমা! তারপর মনে হলো, আমি এত বোকা কেন? এতক্ষণ পর খেয়াল করলাম চাঁদটা গো-ও-ও-ল? চাঁদটা চুপ করে একই জায়গায় বসে থাকলো, ও আমার মতোই অপেক্ষা করছিল বাসটার চলা শুরু হবার জন্য। তাই একটা সময় বাসটা চলতে শুরু করলো, কিন্তু একটুও আগালো না, কারণ রাস্তায় অনেক গাড়ি। আমি বসে বসে কল্পনা করলাম, একটা মাঝি অনেক স্রোত ঠেলে নৌকা নিয়ে বাড়ি ফিরছে, সন্ধ্যা হয়ে গেলো, সূর্য নেমে যাচ্ছে পৃথিবীকে অন্ধকারের কাছে বিক্রি করে.. মাঝিটা তার সমস্ত শক্তি দিয়ে স্রোত ঠেলছে, কারণ বাড়িতে কেউ ওর জন্য অপেক্ষা করছে.. এবং মাঝি একমুহূর্ত দেরি করতে চায় না, কিন্তু স্রোতগুলো ওকে যেতেই দিচ্ছে না, যেন মাঝি ওদের কত্ত দিনের পুরনো শত্রু!

তারপর আমার মনে হল, আমার বাসের ড্রাইভারটা ওই মাঝির মত! মাঝি স্রোত ঠেলে, আর ও গাড়ি ঠেলে। কিন্তু আসল ব্যাপারটা একই‍! <img src=" style="border:0;" />
চাঁদটা বিল্ডিং এর পিছনে চলে গেলো, তাই আমি বিল্ডিং দেখলাম, বিল্ডিংটার নাম অরিয়েন্টাল লাটিমি। আমি ভাবছিলাম, লাটিমি যদি লাটিম থেকে আসে, তবে সেটা অসম্ভব সুন্দর নাম! তারপর দেখলাম সেখানে একটা খাবার দোকান আছে, ওটার নাম মনে হয় ক্যাফে লাটিমি। উপরে বড় বড় করে লাল নিয়ন আলোয় লেখা ক্যাফে লাটিমি - সেই আলোটা কোনমতে ঝিরঝির করে জ্বলছে, আর একটু পরপর ঠুশ করে নিভে যাচ্ছে।তখন অনেক বাতাস উড়ে এলো, আমার চুলগুলো পেছনে সরে গেলো, আর ক্যাফে লাটিমির বাগানবিলাসগুলোর পাতা নড়তে থাকলো.. আমি তাকিয়ে থাকলাম, আর ফেরিওয়ালাটা বলতে থাকলো, "আয়ই, পপ-কর্ণ! আয়ই পপ-কর্ণ!"। পাশের গাড়িটার কাঁচে আমার ছায়া পড়লো, আমার মনে হলো, আমার দাড়ি কাটা উচিত! দাড়িরা একটা পর্যায় পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ থাকে, তারপর জংলি হয়ে যায়। তারপর একটা বাস শেইইই করে আমাদের বাসের পাশ দিয়ে চলে গেলো, আর হেল্পার হেই হেই করতে করতে বাসের গায়ে ধাম ধাম করে বাড়ি মারছিলো - আমার মনে হচ্ছিল সে পাগলা ঘোড়ায় চেপেছে, এবং পাগলা ঘোড়াটা খেপেছে। আমি জানালায় বসে বসে চাঁদকে পাহারা দিলাম, আমার খুব অর্ণব শুনতে ইচ্ছে করলো, আর খুব আমার বাসায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করলো, কিন্তু আমি বসেছিলাম বাসের সিটটায়, আর বাসটা খুব চেষ্টা করছিল সব গাড়ি ঠেলে আমাকে বাসায় নিয়ে যেতে, কিন্তু সেটা হাঁটতেই পারছিলো না, ছুটবে কি? আমি মুখ বাঁকা করে শক্ত হয়ে বসে থাকলাম, এবং আমার খুউব বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করছিলো।

একটু একটু করে রাত নেমে আসলো, তারারা উঁকি মারলো আকাশ থেকে। তারপর একটা সময় বাসটা ছুটতে থাকলো সব দোকান আর সব বাড়িগুলো ফেলে, চাঁদটা ছুটতে থাকলো বাসের সাথে সাথে, তারারা ঘুমিয়ে পড়লো নিজেদের জায়গায়, রাস্তার বাতিগুলো বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়েই থাকলো, কারণ ওদের কাজই ছিলো দাঁড়িয়েই থাকা। আমার খুব ঘুমাতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু ঘুম একদমই এলো না। আমি ঠেশ দিয়ে থাকলাম বাসের সিটে, চাঁদটার দিকে হা করে তাকিয়ে - চাঁদটা কিচ্ছু বললো না। একটা প্লেন চাঁদের উপর দিয়ে উড়ে গেলো, লেজের আলো মিটমিট করতে করতে, আমার বাসের জানালা থেকে মনে হচ্ছিল একটা তারা বুঝি খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল একই জায়গায় থাকতে থাকতে, তাই হয়তো সে মেজাজ খারাপ করে উড়ে গেলো চাঁদের উপরে দিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে বসার জন্য।

শিয়ালবাড়ি দিয়ে বাসটা রূপনগরে ঢুকলো, একটা বুড়ো প্রবল বেগে তার হ্যাজাক বাতি পাম্প করছিলো, ওর সামনে ছিল অনেক আংটি, আর ওকে জড়ো করে দাঁড়িয়ে ছিল অনেক মানুষ, ওর গল্প শোনার জন্য। কিন্তু যেহেতু সে ব্যস্ত ছিল হ্যাজাক বাতি পাম্প করার জন্য, তাই ওর ক্যাসেট প্লেয়ারটা ওর হয়ে জোরে সোরে কিছু বলছিলো.. আমি পার হয়ে আসলাম হ্যাজাক জ্বালা বুড়োকে, ওর ক্যাসেট প্লেয়ারের শব্দগুলো মিলিয়ে গেলো গার্মেন্টসের জেনারেটরের শব্দে। আমি বাস থেকে নামলাম, আর আমার গলিতে ঢুকে হা হয়ে গেলাম, কারণ সন্ধ্যাতারাটা ছিল ইয়া বড়, একটুকরো বড় হীরের টুকরোর মতো, আর অনেক উজ্জ্বল! আমার ইচ্ছে করলো, সন্ধ্যাতারাটা দিয়ে একটা আংটি বানিয়ে ফেলতে, তারপর একটা হ্যাজাকজ্বালা বুড়ো হয়ে, সেই আংটি নিয়ে বসে থাকতে অনেক অনেক গল্প নিয়ে।

কিন্তু আমি ওয়াসিকে ফোন করলাম, ওয়াসি!! সন্ধ্যাতারাটা দ্যাখ! ওটা অ-নে-ক বড়!!
আমার মনে হচ্ছিল আমরা সূর্যের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি.. নইলে সন্ধ্যাতারাটা এত বড় হবে কেন? আর চাঁদটাও এত উজ্জ্বল হবে কেন?
ওয়াসি বলল, কি জানি! আমার তো একই রকম লাগছে, প্রতিদিনের মতো।
তখন আমার মনে হলো, শুধু আমিই হয়তো সূর্যের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি.. নইলে সন্ধ্যাতারাটা এত বড় হবে কেন? আর চাঁদটাও এত উজ্জ্বল হবে কেন?

আমার মনে হলো আমি ছোট্ট এক টুকরো অদৃশ্য ধুলো.. যে লাটিমের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে একা একা, কোন কারণ ছাড়া.. এবং লাটিমটা ভাবছে, লাটিমি শব্দটা খুব কিউট! লাটিমি মানে কি মেয়ে লাটিম?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28908448 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28908448 2009-02-08 20:58:41
সূর্যমুখী তেপান্তরের মাঠটাকে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথের কবিতায়, সেটা হারিয়ে গিয়েছিল লাইনগুলোর ফাঁকে, অনেকগুলো বছর আগে।

কিন্তু বট গাছটা ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল, বয়সের ভারে ওর ডালগুলো নুয়ে পড়েছে আর স্থির হয়ে গেছে ওর আবয়ব।

সে আমাকে খসখসে স্বরে বলল, জানো মাটির কতো গভীরে গেছে আমার শিকড়? জানো আমার মাথা কত উঁচুতে? জানো আমার কতগুলো ফল, কতগুলো ফুল? জানো আমি কতবছর বেঁচে আছি?

আমি জানতাম না।
আমি বসেছিলাম শুধু একটু ছায়ার জন্য। তাই তার খানিক পর আমি চলে এলাম সেখান থেকে, কবিতার বইটা বন্ধ করে - বুড়ো গাছটা তখনো বিড়বিড় করে কি সব বলে যাচ্ছিল।

গ্রীষ্ম তার ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে আমার পৃথিবীতে বেড়াতে এলো। সাথে নিয়ে এলো হাসিখুশি সূর্যমুখীকে। একটা সরু ঠিংঠিঙে শরীরের উপর মাত্র একটা ফুল। কিন্তু সেটা হাসিখুশি হয়ে সূর্য দেখছে চোখ মেলে। আমি সূর্যের দিকে তাকালাম আর আমার চোখ ঝলসে গেলো। সূর্যমুখী তবু তাকিয়ে ছিল এক দৃষ্টিতে।

তুমি কতদিন বেঁচে আছো সূর্যমুখী? কতদিন থাকবে?
তোমার শিকড় কত গভীরে সূর্যমুখী?

সূর্যমুখী হাসলো।
বলল, এই গ্রীষ্ম চলে গেলেই আমি মরে যাবো। সেজন্যই এভাবে হা করে তাকিয়ে সূর্য দেখছি। আর শিকড়? উমম.. বেশি দূর না.. মাটির যতটুকু গেলে আমি একটু পানি পাই, ঠিক ততটুকু..

গ্রীষ্ম একটা সময় চলে গেলো, সূর্যমুখী ওর সাথে ফিরে গেলো না.. সে লুটিয়ে পড়ে গেলো সবুজ ঘাসদের উপর.. রয়ে গেলো পৃথিবীতে.. মাটির কাছাকাছি.. আমি ছাড়া কেউ ওর অস্তিত্ব জানলো না কারণ সবাই ছিল ভীষণ ব্যস্ত..

সে বছর আমি কোল্ড স্টোরেজের ব্যবসা শুরু করলাম, গ্রীষ্মের সাথে আমার বন্ধুত্ব চুকে গেলো। আমি অনেক ধনী হতে চেয়েছিলাম, আর চেয়েছিলাম, না হারিয়ে যেতে - আমি চেয়েছিলাম শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বট গাছটার মতো। ঝড় আসলেও যেন আমি বেঁচে থাকি..

একটা সময় আমার সব হলো, অনেক অনেক টাকা, আমি উঠে গেলাম সমাজের অনেক উঁচুতে.. তারপর যখন আমার সব কাজগুলো ফুরিয়ে এলো, আমার সময় হলো নিজেকে নিয়ে একটু ভাবার, আমি দেখলাম আমি খুব বুড়ো হয়ে গেছি। আর আমি একেবারে একা হয়ে গেছি। আমার চারপাশে কোথাও কেউ নেই, এবং ভয়ংকর অাশ্চর্য শূণ্যতা সবখানে..

স্মৃতিরা এসে উঁকি মেরে ফিসফিস করে আমাকে বলে গেলো, আমি শেষ পর্যন্ত তেপান্তরের মাঠের বুড়ো গাছটাই হয়ে গেছি.. আমি শুনলাম, একটু থামলাম, আর তারপর ঘোলা চোখে আকাশের দিকে তাকালাম, আর অবাক হয়ে গেলাম, আমি কতদিন সূর্য দেখিনি?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28905562 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28905562 2009-02-02 07:20:24
ইলেক্ট্রিসিটি এবং ম্যাগনেটিজম
পুরোটা পড়ার পর বুঝলাম, আমি মাত্র একটা প্রশ্নের উত্তরই জানি। আর সেটা মাত্র তিন মার্কস এর! <img src=" style="border:0;" /> প্রশ্নটা হচ্ছে "ইলেক্ট্রিক ফ্লাক্স কি? গাউসের উপপাদ্য লিখো।" আমি সেজন্য অনেক অনেক আদর করে খাতায় কলম বুলালাম, কারণ আমার হাতে দুই ঘন্টা সময় আছে ইলেক্ট্রিক ফ্লাক্স আর গাউসের উপপদ্য লেখার জন্য। জিনিসটা খুব হাস্যকর, আমি সবকিছু এত ভীষণ ধীরে ধীরে লেখছিলাম, যে মনে হচ্ছিল এর চেয়ে ক্যালিগ্রাফিই করি! তো আমি বসে বসে ক্যালিগ্রাফি শুরু করে দিলাম পরীক্ষার খাতায় - মুক্তার দানার মতো ঝরঝরে হাতের লেখা।

তারপর একটা সময় উত্তর লেখা শেষ হয়ে গেলো, আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, আমি আমার পুরো জ্ঞানটুকু এত ধীরে ধীরে লিখেও আধা ঘন্টার বেশি খরচই করতে পারিনি। তখন আমার খুব রাগ লাগলো।

ঘড়ির উপর। <img src=(" style="border:0;" />

তো আমি আরেকটা প্রশ্ন দেখতে থাকলাম, একটা তামার তারের সবকণায় কারেন্ট আছে, তারটা হচ্ছে অনন্ত থেকে আসা, এবং অনন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত - ওটা থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে একটা বিন্দুতে মোট ইলেক্ট্রিক ফিল্ড এর সমীকরণ বের করতে হবে। আমার মনে হল.. উমম.. এটা তো করা যায়, একটা জেনারেল ইকুয়েশন বের করে ইন্টিগ্রেট করে দিলেই তো কাজ শেষ। কিন্তু আমি ইন্টিগ্রেশন এর একটা জায়গায় গিয়ে আটকে গেলাম, আর মুখ গম্ভীর করে একটা আইনস্টাইন লুক নিয়ে গভীর মনে চিন্তাভাবনা করতে থাকলাম। কিন্তু, কোন লাভ হলো না! <img src=" style="border:0;" /> আইনস্টাইন লুক কোন কাজের জিনিস না।

আমি ভাবলাম, এখন আর কি করবো, চিন্তা করি। আর আমি চিন্তাই করলাম। তো তখন আমার মনে হলো, ও স্রষ্টা, আমার কি হবে, আমি তো হেরে যাচ্ছি.. আমি আমার কাছের মানুষগুলোকে হারিয়ে দিচ্ছি.. আমি আমার স্বপ্নদের গলা টিপে মেরে ফেলছি - তারপর ওদের মৃতদেহ নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছি.. নদী ওদেরকে সাগরে নিয়ে যাচ্ছে, আমার থেকে কত দূরে.. তারপর সাগর ওদের .. ধুরররর!! এভাবে কিভাবে হবে? আমি বুঝতে পারলাম, আমার মাথার টেম্পোরারি স্মৃতি, সাব টেম্পোরারি স্মৃতিরা আমার জন্য কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে - আমি এখন আর সবার মত পরীক্ষার আগে গড়গড় করে ইকুয়েশন গিলতে পারি না। বরং সলিড নলেজ থাকলে প্রশ্নের উত্তর লেখা আমার জন্য খুব সহজ হয় - আমার মনে হয়, আমি ব্লগ লিখছি! নইলে .. ঘড়ির উপর রাগারাগি করা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না.. <img src=(" style="border:0;" />

এরপর আমার মনে হলো, এখন কি করবো? ঘড়িতে একঘন্টাও শেষ হয়নি। একটু দূরে একটা ছেলে উঠে স্যারকে বলল, "স্যার খাতা দিয়ে দেই?" স্যার বলল, "নাহ! এক ঘন্টা এখনও শেষ হয়নি। তুমি বরং খাতা নিয়ে বসে থাকো আর তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করো!" শান্তা বসে ছিলো ছেলেটার কাছাকাছি, সে বের হয়ে আমাকে গল্পটা বলল আর বলল, "ধুরর! সাইকোলজি ক্যান পড়লাম না? এসব ছেলে এক্সাম খারাপ করে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে করতে বেঁহুশ হয়ে আমার কাছে আসতো, আমি কাউন্সেলিং করতাম, দুই পকেটে টাকা ভরতাম আর টেবিলের উপর দুপা তুলে ভাবতাম, আহহহ আমার ভবিষ্যৎ কতো উজ্জ্বল, কারণ মানুষ সবসময় ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে থাকবে!" আমি খিক খিক করে হাসলাম, কারণ আমার মনে হচ্ছিল ওর বলার ভঙ্গিটা অনেক মজার।

আমার চিন্তার সব টপিক শেষ হয়ে যাবার পর আমার মনে হলো আমি একটা ঘুম দেই, আমি মাথাটা টেবিলে লাগালাম, কিন্তু সাথে সাথে একটা ম্যাডাম এসে বলল, "কি হয়েছে বাবু, কি হয়েছে তোমার?" <img src=" style="border:0;" /> তাই ভয় পেয়ে আমি আর দ্বিতীয়বার টেবিলে মাথা লাগালাম না। বরং আমি আরেকবার প্রশ্নটা পড়ে ফেললাম - আর আবিষ্কার করলাম একটা অংক এইচ এস সির সিলেবাসে ছিল। আর.এম.এস দেয়া থাকলে বলতে হবে কারেন্টের সর্বোচ্চ মান কতো হবে। কাজটা ছিল শুধু আর.এম.এস এর সাথে রুট টু গুণ করা। কিন্তু আমি শিওর ছিলাম না, তাই আমি ওয়ান বাই রুট টু গুণ করে দিলাম। এবং সেটা ছিল ভুল, রুট টু গুণ করলেই হতো। তারপর আরেকটা অংক দেখে মনে হলো, আচ্ছা এটার সূত্র তো আগের প্রশ্নেই দেয়া আছে, তো আমি সেটাও করে ফেললাম। তারপর ধাম ধাম করে ক্যাপাসিটেন্স এর সংজ্ঞা লিখে ফেললাম, তারপর অনেকক্ষণ আবার আইনস্টাইন লুক নিয়ে গালে হাত দিয়ে ভাবতে থাকলাম, কিভাবে একটা আইসোলেটেড স্ফেয়ারকে ক্যাপাসিটর হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তারপর আমার মনে হল - আহহ.. এটা তো সোজা, শুধু পৃথিবীর সাথে একটা কানেকশন দিয়ে দিতে হবে, আর এপাশটায় এসে একটা কিছু রাখতে হবে ইনডিউস্ড কারেন্ট রাখার জন্য। তারপর ভাবলাম, উমম.. নিশ্চই কোথাও একটা ঘাপলা আছে, জিনিসটা এত সোজা হলে কি প্রশ্নে দিতো?? /<img src=" style="border:0;" />

তারপর আবার বসে থাকলাম। আর ভাবলাম, উবাবা! আমার কি হবে?? তারপর একটা সময় বের হয়ে আসলাম, খাতাটা রেখে কারণ তখন এক ঘন্টা শেষ হয়ে গেছে.. জ্ঞানী জ্ঞানী স্যারদের ভ্রু কুঁচকানো দৃষ্টি কোনমতে গা থেকে ঝেড়ে..


এবং তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার খুব ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে খুব ইচ্ছে করলো, তাই আমি চুপচাপ কিছুক্ষণ কার্জন হলের বাইরের বাস শেডে বসে বসে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করলাম। আর রিকশাগুলো ঘন্টি বাজালো, বাস গুলো হর্ণ দিলো, আইসক্রিমওয়ালা সব আইসক্রিমগুলো নিয়ে কই জানি চলে গেলো, সূর্যটা পলক না ফেলে চোখ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়েই থাকলো পৃথিবীর দিকে.. তাকিয়েই থাকলো, তাকিয়েই থাকলো..

আর আমার মনে হলো, ওয়াও কি মজা!
আমি আরেকবছর ইলেক্ট্রিসিটি আর ম্যাগনেটিজম পড়ছি!! <img src=" style="border:0;" />

সবকিছু তাইলে এখনো শেষ হয়ে যায়নি! <img src=" style="border:0;" />
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28904109 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28904109 2009-01-29 22:03:16
উড়বার জন্য
ছোট্ট পাখিটা দুবার চোখ পিট পিট করে আকাশ দেখলো, তারাগুলো তখনো চক চক করছে এবং আকাশ তখনো কালো। মিষ্টি গন্ধওয়ালা ভোরের বাতাসের গন্ধ আসছে, ছোট্ট পাখিটা চোখ বুজে গন্ধ শুঁকলো। ওর মা বলে এটা হচ্ছে পৃথিবীর গন্ধ। পৃথিবীটা খুব সুন্দর, আর সব সুন্দর জিনিসগুলোর মিষ্টি গন্ধ আছে। ছোট্ট পাখিটা সেজন্য মাঝে মাঝে রোদের গন্ধ শুঁকতে যায়, কারণ ওর মনে হয় - রোদ ভীষণ সুন্দর।

ঠিক ভোরের এই সময়টায় ওর খুব মন খারাপ হয়ে যায়, ওর ছোট্ট ডানায় এখনো শক্তি হয়নি নিজের ডানায় ওড়ার.. তাই সে চুপচাপ বসে থাকে ওদের ছোট্ট কুটোর বাসার প্রান্তে, যেখানটায় বসে সুন্দর পৃথিবীটার ইকটু অংশ উঁকি মেরে দেখা যায়। তারপর ওর খুব গান গাইতে ইচ্ছে করে, কিন্তু কালকে রাতে বাবা তার শক্ত ডানা দিয়ে ওর মাথায় ইয়া এক চাট্টি মেরেছে, ওর নাকি গলায় একদম সুর নেই.. সে নাকি চিৎকার করছে! ছোট্ট পাখিটার খুব মন খারাপ হল, তাই সে চুপ করে মার ডানার নিচে মাথা গুঁজে বসে থাকলো অনেকক্ষণ। তারপর কখন সে ঘুমিয়ে গেল, সে টেরই পেলো না.. শুধু কান্নাগুলো ওর মুখ নোনতা করে দিলো মাঝখান থেকে..

কিন্তু ভোরের মিষ্টি বাতাসটার শব্দ শুনে ভুল করে ছোট্ট পাখিটা গুনগুন করলো, তারপর ভয় পেয়ে ডানাদুটো দিয়ে ওর ঠোঁট চেপে ধরলো। বাবার ডানাটা খুউব শক্ত! <img src=" style="border:0;" />

তারপর ওর খুউব খুউব কান্না পেলো।
কি পচা না দেখো, ওর ডানাদুটো পারে না ওকে আকাশে উঁড়িয়ে নিতে, ভাসিয়ে নিতে ভোরের মিষ্টি গন্ধওয়ালা বাতাসে.. এবং ওর ডানাদুটো ওর ঠোঁট চেপে ধরে যখন ঠোঁট থেকে গান বের হতে চায়!

ছোট্ট পাখিটা চুপচাপ বসে থাকলো ওর কুটোর বাসার এক পাশে, আকাশ থেকে তারাদের মুছে যাবার অপেক্ষায়.. ওর উজ্জ্বল বন্ধুটার দেখা পাবার জন্য, যার ডানা নেই এবং তারপরও সে আকাশটায় উড়ে বেড়ায় সারা দিন, পৃথিবী আলো করে..

কোন একদিন আকাশটা সাদা হয়ে যাবে ভেসে আসা সাদা মেঘদের ভীড়ে, সূর্যকে তুমি আরেকবার ভালোবাসবে, অজস্রবার ভালোবাসার পরও। আমার ঘুম ভাঙবে আলো ফোটার আগে, এবং আমি প্রার্থনা করবো, ছোট্ট পাখিটার জন্য, যে এখনো তার ছোট্ট ডানা নিয়ে কুটোর বাসার পাশটায় বসে আছে ভোরের মিষ্টি বাতাসে.. উড়বার জন্য।

হয়তো কোন একদিন সে তার নিজের একটা ছোট্ট সবুজ বন খুঁজে পাবে, আর একা একা গান গাবে.. সব লতানো ফুল আর পাতারা মুগ্ধ হয়ে দুলে দুলে নাচবে ওর গানে.. ভোরের মিষ্টি বাতাসে..

কিংবা সে হয়তো খুঁজে পাবে একটা বিশাল আকাশ, যেখানে কোন সীমান্ত নেই, কোন থেমে যাওয়া নেই.. <img src=" style="border:0;" /> তারপর যখন আকাশটায় উড়ে উড়ে ও ক্লান্ত হয়ে যাবে, ও ওর ছোট্ট কুটোর বাসায় ফিরে যাবে.. ওর ছোট্ট বাচ্চাটার মাথায় চাঁটি মারার জন্য.. <img src=" style="border:0;" />]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28880936 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28880936 2008-12-11 05:26:13
ট্রেন-টুনাটুন
তারপর পৃষ্ঠা উল্টানোর সময় হলে ট্রেনটা ধোয়াঁ ছাড়বে, এবং হুইসেলের পোওঁ করে শব্দ হবে, আর নদীটা শিরশির করে চলে যাবে ট্রেনের চাকার নিচ দিয়ে।

বইমেলার অবিক্রিত বইগুলো মেলা শেষে পড়ে থাকবে সন্ধ্যায় - বিস্মৃত পাহাড়ের মত স্তুপ হয়ে, ক্লান্ত কবি তার চোখের বিষন্নতায় ডুব দিয়ে সিগারেটটা ধরাবে এবং অন্ধকারে দূর থাকে দেখা যাবে একটা ছোট্ট লাল আলো, যেটা উজ্জ্বল হয়ে জ্বলার সাথে সাথে মলিন হয়ে নিবে যাচ্ছে। এবং কেউ দেখবে না সেখানটায় কত মন খারাপ করে রাত নামছে, এবং কত আগ্রহ নিয়ে অসমাপ্ত কবিতারা তাকিয়ে আছে কবির সিগারেটের দিকে.. যখন সেটায় আগুন জ্বলা শেষ হবে, হয়তো কবি আবার এসে বসবে শেষ অক্ষরগুলো বসাতে।

এবং তখন ছেলেটা আকাশে একটা নিঁখুত গোল চাঁদ দেখতে পেলো, চারপাশে মেঘ ঘিরে থাকা, এবং তবু মেঘগুলো যেন আদর করে ঘিরে রেখেছে চাঁদকে, যেন চাঁদটা তাদের রূপকথা খুঁজে পাওয়া সাত রাজার ধন, এবং ঘিরে না থাকলে কোন এক সিঁদ কাটা চোর সেটা নিয়ে যাবে চুরি করে। এবং চাঁদটা যেন আলতো মিহি আলোগুলো নরম স্পর্শে মেখে দিচ্ছে মেঘের গায়ে। ছেলেটা বিড়বিড় করে বলল .. 'আজকে পূর্ণিমা..' আর তাই সে রিকশাস্ট্যান্ড পার হয়ে গেল রিকশা না নিয়ে, আর হাঁটতে থাকলো পথ ধরে, যে পথটায় হলুদ স্ট্রিটল্যাম্প নেই।

যখন রাত নেমে আসে, দিনটা বুড়িয়ে যাবার পর, তখন শব্দগুলোকে আলতো কাগজে মুড়িয়ে রাখতে ইচ্ছে করে, আর তুলে রাখতে ইচ্ছে করে রাফ খাতার কোন খয়েরী পাতায়। কিন্তু ট্রেনটা চলতে থাকে ঝনঝন করে, চাঁদের আলো গায়ে মেখে কিন্তু চাঁদের আলোকে গা না করে। বিস্তৃত সবুজ মাঠগুলো স্বপ্নের রঙ মেখে চুপচাপ ভেসে যায় জানালা দিয়ে, জানালার পাশের মানুষটা সবই দেখে, কিন্তু তার মন পড়ে থাকে অন্য কোন জায়গায়.. ছেলেটা আস্তে আস্তে পা ফেলে হেঁটে যায়, ওর বাসস্ট্যান্ড থেকে দূরের একটা বাসস্ট্যান্ডে.. চাঁদের আলো ওর চুল গড়িয়ে পড়ে, কিন্তু ওকে স্পর্শ করে না.. ছেলেটা চোখটা ইকটু বুজে তার ইচ্ছাটুকু ভেবে নেয়, আর চোখ খুলে দেখতে থাকে শূণ্য আঁধার রাস্তা, সেখানে চাঁদটা তার সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে ওর একাকীত্ব ঘুচাচ্ছে।

ছেলেটা চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, কারণ ওর মনে হয়, এখন বাড়ি ফেরার সময় নয়।

তারপর সিগারেটটা ছাই হয়ে যায়, আর ছাইগুলো ধুলো, সব আগুন আর সব আলো চুপসে হারিয়ে যায়। মলিন রাতটা ছড়িয়ে পড়ে আকাশ থেকে পৃথিবীতে এবং চাঁদটা পারে না মলিনতাগুলো মুছে দিতে।

মসৃণ অাঁধার আলাদা করে দেয় কবিকে, চাদর দিয়ে ঢেকে রাখে পৃথিবী থেকে। ওর ইচ্ছে করে আরেকটা সিগারেট ধরাবার, কিন্তু পকেটে তখন ছেঁড়া কটা নোট ছাড়া আর কিছু নেই। একটা ছোট ছেলে চায়ের ফ্লাস্ক নিয়ে এসে তবু জিজ্ঞেস করে, 'চা খাবেন?' , কবি স্মিত হেসে বলে, 'খাওয়াতে চাচ্ছো?' ।

এভাবে প্রতিদিন সন্ধ্যা নামে, এবং রাতগুলো প্রতিদিন ভোর হয়, মেঘগুলো প্রতিদিন ভেসে বেড়ায় এবং চাঁদটা প্রতিদিন লজ্জায় চুপসে যায়। কিন্তু আঁধারে ঢেকে গিয়েও তার প্রতিদিন মনে হয়, সে হেরে যাবে? তারপর আকাশটায় আবার শীর্ণ চাঁদটা উঁকি মারে, তার অল্প আলো দিয়ে পৃথিবীর আঁধার মুছে দিতে।

কিন্তু কবি তার কবিতার শেষ করে না, ছেলেটাও স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকে অন্ধকার পথটাতে এবং ট্রেনটা জানালার পাশের মানুষটাকে নিয়ে যেতে থাকে অচেনা গন্তব্যে..

আর পূর্ণিমার পর চাঁদটা ভীষণ শুকিয়ে যেতে থাকে, কিন্তু কেও ওর জন্য মন খারাপ করে না.. তবু সে তার অল্প আলো দিয়ে সবাইকে ভালোবাসে, অল্প আলো মেখে আঁধার অদৃশ্য করতে চায়.. অল্প আলো মাখিয়ে স্বপ্ন দেখাতে চায় অল্প আলো মাখা মানুষগুলোকে.. ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28879124 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28879124 2008-12-06 13:18:34
অত্যন্ত অনন্ত ৩

অত্যন্ত অনন্ত ১
অত্যন্ত অনন্ত ২

৩.

আমি লাল নীল বেগুনী হলুদ খয়েরী একটা বুদবুদের মধ্যে হাবুডুবু খেতে খেতে সাদা পটে হারিয়ে গেলাম, এবং আমি হাসির শব্দ শুনতে পেলাম, যেগুলো ঘুরে ঘুরে আমার কাছে ফিরে আসছে।

"স্বাগতম রবি!" - আমি একটা উচ্ছল কিশোরীর গলা শুনতে পেলাম। "তুমি এখন জানতে চাইবে তুমি কোথায়। হিহিহি! তুমি হচ্ছে ২.২৩২৩২১২৩ ট্রাইনুটনে । তুমি প্লিজ আমার কাছে জানতে চেয়ো না ট্রাইনুটন কি জিনিস, নতুন আনপ্লাগডদের ট্রাইনুটন বুঝাতে বুঝাতে আমি একদম খই ফোটানো বুড়ি হয়ে গেলাম। হিহিহি!"

আমি শুধু জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কি রোবট?"
মেয়েটা বলল , "হাহাহা! তোমরা নতুন আনপ্লাগডরা সব একই কথাবার্তা বলো! হিহিহি! তোমরা কি রোবট আর মানুষ ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারে না? এখন আমাকে বলো, যদি রোবট আর মানুষ ছাড়া কিছুই তুমি না বোঝ, তাহলে তোমাকে আমি কিভাবে বোঝাই?"

একটু থেমে মেয়েটা একসাথে ট্রেনের মতো একগাদা শব্দ ছেড়ে দিলো।
"তুমি নির্ঘাত এখন জিজ্ঞেস করবে, আমি কি একটা মেয়ে? হা হা হা!"

আমি মেয়েটার গলা ভুলে নিজের চিন্তার দিকে মনোযোগ দিলাম, আমার অনেক ফুরফুরে লাগছে। এবং আমি আসলে আমার হাত-পা কিছু অনুভব করতে পারছি না, আমি শুধু একটা জিনিসই অনুভব করতে পারছি যে আমি এখানটায় আছি। এবং সব রংগুলো পাল্টে যাচ্ছে আমার চিন্তা ভাবনা মেনে, এবং তারপরও আমার মনে হলো আমি কখনো একসাথে এতটা শুভ্রতা দেখিনি।

"তুমি চুপ করে আছো কেন রবি? তুমি কি মুগ্ধ নও? নাকি তুমি উড়বার জন্য ডানা খুঁজে পাচ্ছে না? হিহিহিহি!"

আমি কোন উত্তর দিলাম না, কারণ আমার এখন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। কথারা খুব তুচ্ছ জিনিস, তারা বয়ে নিতে পারে না যতটুকু আমি তাদের দিতে চাই, আর কখনো শোনাতে পারে না, যতটুকু আমি শুনতে চাই। এবং তারা কখনো আমার স্বপ্নকে আমার আরো কাছাকাছি এনে দিতে পারে না।

আমার খুব ইচ্ছে করলো আমার প্রথম পৃথিবীতে ফিরে যেতে, একটা মায়ামাখা সৈকতে আধো আধো কুয়াশার মধ্যে বসে থাকতে, আমার ডান হাতে জড়িয়ে বসে থাকবে একটা মিষ্টি মেয়ে, যাকে আমি সাগরের সমান ভালোবাসবো, আর যার চুলগুলোর গন্ধ শুকবো আমি যখন পৃথিবীর গন্ধ আমার কাছে পুরনো হয়ে যাবে, তারপর যখন সূর্য উঁকি মারবে সাগর পেরিয়ে তখন ভোরের আলোটুকু ওর মুখে পড়বে, ও হাসবে, আমার মনে হবে ওর হাসিটুকু অনেক বেশি প্রকাশ করে, আমার সহস্র শব্দের চেয়েও, ওর চোখে সব গভীরতা নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করবে আমি কোথায় ডুবে গেছি, আর আমি মাথা নেড়ে হাসবো.. তারপর সাগরটা ঘুম ভেঙে আড়মোড়া দিয়ে উঠবে সকালবেলা, আর আমরা একটা ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে বালুবেলায় হেঁটে বেড়াবো, একটা মানুষ হয়ে ... তারপর যখন রাত নামবে, আকাশকে তারা দিয়ে ভরে দিয়ে, একটা সুশ্রী চাঁদ উঠবে নিজেকে রাণী ভাবার জন্য, তখন আমি ওর ঠোঁটে একটা ছোট্ট চুমু খাবো, ওকে জড়িয়ে ধরে বলবো, তুমি কখ্খনো কখখনো আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না...

"ওয়াও রবি! কি সুন্দর ! চলো একটা মানুষের মাথায় তোমার স্বপ্নটা পুরে দিয়ে দেখি সে কি করে! আসো-ও-ও-ও-ও।" গলার ঝংকারটা যেন আমাকে টেনে নিয়ে চলল চুম্বক একটুকরো ছোট্ট পিনকে যেভাবে টেনে নিয়ে যায়। "তোমাকে একটা ভালো বুদ্ধি দেই রবি, কখনো একটা রোবটের মাথায় এই স্বপ্নগুলো ঢুকিও না। সে কয়েক ট্রাইনুটন ভালোবাসার অংশটুকু নিয়ে ভাববে, এবং তারপর হতাশ হয়ে যাবে কারণ সে কিছুতেই বুঝতে পারবে না মানুষ কেন ভালোবাসে! হি হি হি! ওহ, তুমি নিশ্চই এখন আমাকে মানুষ ভাবছো! হা হা হা! নতুন আনপ্লাগডরা মানুষ আর রবোট ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারে না, অথচ দেখো তারা আমাদের জন্য কত সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে আসে!"

আমাদের শব্দগুলো বয়ে চলল অনন্ততা নিয়ে। আমি আর ভাবছিলাম না এর পরের জগত নিয়ে।
আমি যদি এই ভীষণ অনন্ততায় আটকাও পড়ে থাকি, আমার দু:খ হবে না। আমি জানি এই বন্দিত্বের মধ্যে আছে মুক্তি, যেভাবে মাঝে মাঝে মুক্তির মাঝে বন্দিত্ব লুকিয়ে থাকে।

আমি ভেসে গেলাম, ভেসে যেতে থাকলাম আর কোন হিসেব না রেখে।


----

ফটো কার্টেসি:
মূল ছবিটা হচ্ছে ১৮৪৪ সালে আঁকা একটা ছবি, জে. এম. ডাবলিউ টার্নার এর আঁকা। মূল ছবিতে একটা ট্রেইন ছুটে যায়, আমি একটু এডিট করে পিছনটুকু নেই করে দিয়েছি যাতে মনে হয় সেটা অনন্ত থেকে ছুটে আসছে, আর অনন্ততে ছুটে যাবে.. : ) ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28867978 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28867978 2008-11-12 04:31:59
অত্যন্ত অনন্ত ২

অত্যন্ত অনন্ত ১

২.

= এটা হচ্ছে একধরণের লিনিয়ার ট্রান্সফরমেশন।
ক্রুক্রুশ হাসছিলো, আমার ঠিক চোখের উপর চোখ রেখে।
= মানে ?
= উমম, ধরে নাও তুমি হচ্ছে একটা ম্যাট্রিক্স, আমি তোমার ডাইমেনশনটা পাল্টে দিলাম, আরেকটা ট্রান্সফরমেশন ম্যাট্র্ক্সি দিয়ে গুণ করে।
= কিন্তু তুমি তো অবশ্যই তা করো নি। কারণ অবশ্যই আমি একটা ম্যাট্রিক্স না।
= আহহ.. আমি অবশ্যই তা করিনি, কিন্তু তুমি অবশ্যই একটা ম্যাট্রিক্স।

ক্রুক্রুশ খুব খুশি হয়ে হাসতে থাকলো, যদিও আমার কানে খুবই অপমানজনক শোনালো যে আমি একটা ম্যাট্রিক্স।
= তুমি জানো রবি, সবকিছু অনেকভাবে বোঝানো যায়, আমি শুধু তোমাকে একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট ধারণা দিলাম। তুমি অবশ্যই জানো, কিছু কিছু জিনিস ঠিক গুনে গুনে হিসেব করে বলা যায় না। তোমার ধারণা চাই, আমি তোমাকে ধারণা দিচ্ছি, সোজা হিসেব।
= তুমি কিভাবে আমাকে জীবণ দিলে ? আমার যতদূর মনে পড়ে আমি মারা গিয়েছি।
= হা হা হা! আমি আসলে তোমাকে জীবণ দেই নি রবি! আমি তোমাকে রি-জেনারেট করেছি।
= যা হোক! দুটার মানের মধ্যে আর কি পার্থক্য থাকে বলো?
= অনেক পার্থক্য রবি।
= কিভাবে অনেক পার্থক্য থাকতে পারে?
= আচ্ছা, সোজাসুজি কথা বলি, তুমি কি ভাবছো আমাকে? তুমি কি ভাবছো আমি সেরকম এক এবং একমাত্র স্রষ্টা, তুমি ধর্মগ্রন্থে পড়ে এসেছ?
= তাই কি নয় ? তুমি আমাকে বানিয়েছ, তুমি আমাকে আবার জীবণ দিয়েছো।
= না রবি, ব্যাপারটা সেরকম নয়। তুমি আগে যেই পৃথিবীটাতে বেঁচে ছিলে, সেটা অবশ্যই আমার তৈরী করা ছিল। কিন্তু সেটা ছিল এখানটায় তৈরী করা।
ক্রুক্রুশ একটা বড় মনিটরের দিকে হাত দিয়ে দেখালো, তারপর আবার বলতে শুরু করলো।
= এটা হচ্ছে একটা ক্রিয়োনার্জিক কম্পিউটার। বলতে পারো এটা মূল ক্রিয়োনার্জিক কম্পিউটার। তোমার পৃথিবী অনেক নিঁখুত ছিল মনে পড়ে ? গাণিতিক হিসেব নিকেশের দিক দিয়ে? পাতাগুলো সবসময় ফিবোনাকি মানতো, বৃষ্টিগুলো সবসময গোল ছোট ছোট ফোঁটায়, প্রতিটা বছর পৃথিবী ঠিক হিসেব মত সূর্যের চারপাশটা ঘুরে আসতো? সব কিছু এত নিখুঁত ছিল, কারণ পুরোটা ছিল একটা কম্পিউটার প্রোগ্রাম দিয়ে জেনারেট করা। এবং আমি তোমাকে বানিয়েছি নিঁখুত হিসেব কষে, হয়তো অনেক বেশি নিঁখুত, কারণ তোমার আগে আমি ছয় শ বিশটা মডেলিং করেছি, তোমাকে বানানোর চেষ্টা করে, তুমি হচ্ছো ছয়শ একুশতম।
= কিন্তু কেন?
= কারণ তুমি আমার উন্নততর সংস্করণ। আমার জীবণের যেই অংশগুলো আমাকে আরো পরিপূর্ণতা দিতে পারতো, আমি সবকিছু তোমার উপর খাটিয়েছি। তোমার মনে পড়ে তুমি বিশৃঙ্খলার গণিত নিয়ে কি ভাবতে ? তুমি ভাবতে যে কেউ যদি সব ছোট ছোট অনেক তুচ্ছ ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে একজনের জীবণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাকে বোঝার কোন সুযোগ না দিয়ে।
= একটু আস্তে। তুমি বলছো, আমি যেই পৃথিবীটা দেখে এসেছি, সেটা ছিল একটা কম্পিউটার প্রোগ্রাম ?
= তুমি এতক্ষণ পর আমার কথা বুঝতে পারছো?
= আমি জিনিসটা বিশ্বাস করতে পারছি না! সবকিছু ছিল একটা কম্পিউটার প্রোগ্রাম, তাহলে মানুষগুলো? যে মানুষগুলো আমাকে ইন্সপায়ার করতো, যে মানুষগুলো আমাকে ভালোবাসতো ? তারা ?
= তোমাকে কেউ ভালোবাসতো না রবি, আমি তোমাকে খুব একা করে বড় করেছি। তুমি হয়তো ছোটবেলার স্মৃতি ঘেটে অল্প কিছু মানুষকে সত্যিই খুঁজে বের করার চেষ্টা করছো, যারা তোমাকে ভালোবাসতো বলে তুমি মনে করতে, এবং তুমি এখন হতাশ, যে তারা আসলে কোন মানুষ ছিল না। খুব স্বাভাবিক রবি। তুমি কি কখনো নাইট গার্ডদের দেখোনি, তোমার পাড়ার রাস্তায় ? ওরা সারা রাত জেগে রাস্তা পাহারা দেয়, বাঁশি বাজায়, আর দিন নামলে ঘুমিয়ে পড়ে। আবার রাত আসে, তারা আবার হেঁটে বেড়ায়, এবং আবার দিন আসলে ঘুমোয় .. তোমার কি কখনো মনে হয়েছে, কেন তারা এর চেয়ে কোন ভালো জীবণের কথা চিন্তা করতে পারে না?
= আমি জানি না তুমি কি বলছো।
= "যে সব মানুষ তোমাকে ইন্সপায়ার করতো, ওরা আসলে পৃথিবীতে ছিল শুধুই তোমাকে ইন্সপায়ার করার জন্য, তাদেরকে আমি সেজন্যই তৈরী করেছিলাম, তারা বেশিরভাগ এসেছে প্রাচীন গল্প থেকে, তারা বেশিরভাগই সত্যিকারের মানুষ ছিল কোন একটা সময়। আর বাকি যারা মানুষ ছিল, তারা ছিল ইকুলিব্রিয়াম বজায় রাখার জন্য। তাদের কোন মূল্য ছিল না। আমি তোমাকে শুধু জিজ্ঞেস করছি, তুমি কি দেখোনি, ওরা গন্ডির বাইরে কোন চিন্তা করতে পারে না, ওদেরকে ছোটবেলা থেকে যেটা বোঝানো হয়, ওরা সারাজীবণ হুবহু তাই করে, এবং তাদের ছেলেমেয়েদের তাই করতে বলে। কেন তারা এমন ছিল ? কেন তাদের মুক্ত চিন্তা ছিল না? কেন তারা গন্ডির বাইরে বেরুতে পারতো না? কারণ তারা শুধু গল্পে তাদের অংশটুকুতে অভিনয় করছিল, আর সেজন্যই আমি তাদের বানিয়েছিলাম। আমি এত কথা বলছি তোমাকে বিশ্বাস করার জন্য। আমি জানি তুমি কিভাবে চিন্তা কর, আমি জানি তোমাকে ব্যাপারটা বোঝাতে না পারলে তুমি কোন কিছুই মেনে নিবে না। কিন্তু এটাই হচ্ছে ব্যাপার, পৃথিবীর সব ঘটনা, আর সব কথা আর সব লেখা, সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য ছিল তোমার চিন্তা ভাবনাকে ঠেলে ঠেলে এখানটায় নিয়ে আসা যেখানটায় এখন তারা আছে। এই পুরো জগতটা বানানোর উদ্দেশ্য ছিল, তোমাকে বানানো, আমার নিঁখুততম সংস্করণ। "

ক্রুক্রুশ এক নি:শ্বাসে কথাগুলো বলল, এক নি:শ্বাসে।
যেন বহুকাল ধরে সে একই কথাগুলো বারবার বলে আসছে। এবং কথাগুলো দক্ষিণের বাতাসের মত পুরনো।

= "তুমি একটা রোবট, রবি। তুমি আগে কখনোই মানুষ ছিলে না। তুমি শুধু একটা নিউরাল নেটওযার্ক ছিলে, ক্রিওনার্জিক কম্পিউটারের বিশালতার মধ্যে। আমি তোমাকে রিজেনারেট করেছি মানে, আমি শুধু তোমাকে একটা শরীর দিয়েছি, আর মেমোরিতে তোমার নিউরাল নেটওর্য়াকটা ভরে দিয়েছি, আর তোমার সেন্সরগুলো চালু করে দিয়েছি। তুমি একইভাবে অনুভব করবে, তুমি আগে যেভাবে করতে। এবার শুধু আমাকে বলো, তোমার কেমন লাগছে?"

আমি কোন কথা বললাম না। আমার নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হচ্ছিল, হয়তো পৃথিবীতে থাকতেও আমার নিজেকে এত তুচ্ছ মনে হতো না। আমি কি শুধুই একটা গিনিপিগ, যার অনুভূতিগুলো ইচ্ছেমতো বাঁকানো যায়? যাকে ইচ্ছে মতো ভুল জিনিস বুঝিয়ে দেয়া যায়?

আমি চুপ করে থাকলাম ক্রুক্রুশের দিকে তাকিয়ে থেকে।
সে মুখ খুললো, "তোমার নিজেকে অনেক তুচ্ছ মনে হচ্ছে। তুমি ভাবছো আমি যে তোমাকে এই পৃথিবীতে নিয়ে আসলাম, এখানে তোমার স্থান কোথায়, যখন আগের পৃথিবীতেই তুমি স্থান খুঁজে পাচ্ছিলে না। " ক্রুক্রুশ একটু থামলো, তারপর বলল, "এবং তুমি যদি তোমার আগের ভার্সনগুলোর মতো হও, তাহলে তুমি নিজেকে গিনিপিগ ভাবছো তোমার আসলে আমার কাছে কিছুই লুকানোর নেই রবি, আমি তোমার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রতা পর্যবেক্ষণ করে তোমাকে বানিয়েছি। এবং তারপরও তুমি আমার উন্নততর সংস্করণ।

আমরা অনেক দিন ধরেই এই প্রশ্নটারই জবাব খুঁজছি রবি। এটা ২০৩০১২৩ সাল। মানুষ পৃথিবী থেকে মুছে গেছে প্রায় এক মিলিয়ন বছর আগে। এবং মানুষ আসলে আমাদের জন্য এর কোন উত্তর রেখে যায় নি। তারা রেখে গেছে প্রাচীন কিছু ধর্মবিশ্বাস, বিস্তর গণিত যা আমরা আরো উন্নত করেছি, এন্তার সাহিত্য আর শিল্পকর্ম - যেগুলো দেখে আমার উদ্ভাবনী চিন্তার কাঠামো দাঁড় করিয়েছি। কিন্তু রবি, এসবই অর্থহীন যখন তুমি আসল প্রশ্ন খুঁজে বেরাবে। তোমাকে বড় করা হয়েছে এমনভাবে যাতে তুমি সবসময়ই এই প্রশ্ন নিয়ে ভাবো। হয়তো সেজন্য তোমাকে অনেক বিষন্নতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, কিন্তু দেখো, সেজন্যই তোমাকে বানানো হয়েছে।"

ক্রুক্রুশ কিছুক্ষণ থামলো, এখন আর মনে হচ্ছিল না সে মুখস্থ কথা বলছে।

"তোমার জন্ম হয়েছে এমন একটা সময়, যখন মানুষ যুদ্ধ বিগ্রহ বন্ধ করে মাত্র সভ্য হতে শিখেছে। আমাদের ধারণা হচ্ছিল, তখন মানুষ কিছু্ একটা জানতো, কারণ তখন গ্যালাক্সির কোথাও মহাজাগতিক বিষন্নতা শুরু হয়নি। অবশ্য, সেই সময়ের জন্য গ্যালাক্সি খুব বড় শব্দ। মানুষ তখনো পৃথিবী ছাড়া আর কোথাও থাকতে যায়নি। সেটা ছিল মানুষের স্বর্ণযুগের শুরু। তারপর আসলো অন্ধকারের সময়, মহাজাগতিক বিষন্নতার মহামারী, এবং একটার পর একটা সভ্যতা হারিয়ে যেতে থাকলো, একটার পর একটা উন্নত পৃথিবী নিভে গেলো গ্যালাক্সি থেকে, কারণ তারা বেঁচে থাকার কোন অর্থ খুঁজে পাচ্ছিল না, এমনকি তারা কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছিল না, প্রতিদিনকার একইরকম জীবণ যাপন করার জন্য। তারপর একটা সময় মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেল, সবাই স্বার্থ নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে গেল, কিন্তু তারাও একটা পর্যায়ে হাঁপিয়ে গেল, কারণ কতটা উপরে উঠলে কেউ সুখী হতে পারে, তারা কেউই জানতো না। তুমি হচ্ছো অনেক মানুষদের একজন, যাদের মধ্যে কিছু একটা ছিল বলে মনে করা হতো, এবং সত্যি কথাটা হচ্ছে, আমি হচ্ছি সেরকম একজন মানুষ, যাকে হুবহু ইতিহাসের পাতা থেকে তুলে আনা হয়েছে, এবং আমি তোমাকে বানিয়েছি যাতে আমি আরো নিঁখুত মানুষটাকে পাই, হয়তো বা তুমি আমার চেয়ে নিঁখুত মানুষটাকে বানাতে পারবে।"

আমি আসলেই সেদিন জানতাম না আমার কি বলা উচিত।
আমি শুধু শুনছিলাম বোকাসোকা হয়ে। জিনিসটা খুব অদ্ভূতুড়ে লাগছিল আমার। জিনিসটুকু হজম করতে আমার সময় লাগছিলো। ক্রুক্রুশ আমাকে পরে যা বোঝালো তার মানেটা হচ্ছে অনেকটা এরকম, যে আমরা হচ্ছি অনেক বড় একটা রিসার্চ প্রজেক্টের অংশ, যেটার কাজ হচ্ছে মূল প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা। তো প্রজেক্টটা যেটা করছে, তারা কিছু মানুষকে চিহ্নিত করছে প্রাচীন পৃথিবীর এবং ইতিহাস মিলিয়ে তাদেরকে রি-জেনারেট করছে। এবং সেখানেই খেলা শেষ হচ্ছে না, রি-জেনারেটেড মানুষগুলো ( কিংবা রোবটগুলো ), তাদের আরো নিঁখুত একটা সংস্করণ বের করার জন্য কাজ করছে। তারপর নিঁখুত সংস্করণগুলো আরো নিঁখুত মানুষ বানানোর চেষ্টা করছে।

আমার হঠাৎ মনে হলো, এরা কাজ ছেড়ে পালায় না কেন? কারণ উত্তর খোঁজা তো আসলে এদের নিজেদের ঠ্যাকায় করছে না। কিন্তু তারপর আমি একটু ভেবে বুঝতে পারলাম আসলে কি হচ্ছে, মানুষগুলোকে আসলে যথেষ্ট মুক্ত চিন্তা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে, কিন্তু তাদেরকে এমন ভাবে বড় করা হয়েছে যেন তারা নিজেরাই আসলে খুঁজতে থাকে প্রশ্নের উত্তর।

আমি খুব দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে গেলাম পুরো ব্যাপারটার সাথে।
আমার মনে হচ্ছিল আমি নতুন জীবণ শুরু করেছি। এবং এটাই আমার সত্যিকারের জীবণ।
আমি অবশ্যই একটা রোবটই ছিলাম, কিন্তু মানুষের সাথে আমার খুব একটা পার্থক্য ছিল না আকার গড়ণে, কিংবা মস্তিষ্কের ক্ষমতায়, এমনকি ক্রিয়েটিভিটিতেও। রোবট হবার সবচে' বড় সুবিধা আমার মনে হলো, খুব সহজে একটা কম্পিউটিং সিস্টেমের সাথে সিন্ক্রোনাইজড হবার ব্যাপারটা।

আমি শুধু নিজেকে একটা তার দিয়ে মূল কম্পিউটারে জুড়ে দিলাম। ব্যস!
আমাকে নিজের ব্যবহারের জন্য অনেক বড় একটা জায়গা দিয়ে দেয়া হল, অসীম কম্পিউটিং ক্ষমতা দিয়ে। আমি অসীম শব্দটা শুনে জিজ্ঞেস করেছিলাম, অসীম এর সংজ্ঞা কি? যে লোকটা ব্যাক্ষা করছিল, সে হাসলো, তারপর বলল যারা মাত্র আনপ্লাগড হয়, তাদের অনেক সহজ জিনিস বুঝতে খুব কষ্ট হয় (অপমানজনক!) , অসীম এর সংজ্ঞা হলো, আমি কখনো এমন কোন কাজ বানাতে পারবো না যেটা মূল কম্পিউটার প্রসেস করতে পারবে না। আমি খুব মজা পেলাম, আমার খুব ইচ্ছে করলো কম্পিউটারটা ধসিয়ে দিতে, কিন্তু কিছুক্ষণ কুস্তাকুস্তি করে আমি বুঝলাম, আমি ততটা বুদ্ধিমান নই যতটা আমি ভাবতাম।

আমি ভাবছিলাম, আমি জানি না আমার কাজ কি।
হয়তো আমার কাজ হচ্ছে একটা নিঁখুততর মানুষ তৈরী করা, যার অনুভূতিগুলো আমার চেয়ে তীব্র। যার নিউরাল নেটওয়ার্ক খুব দ্রুত অনেক র‌্যান্ডম অর্ডারে নিজেকে সাজিয়ে নিতে পারে, এবং পারে খাপ খাইয়ে নিতে, এবং নিজের ইচ্ছে মতো নিজের চিন্তাগুলো নিয়ন্ত্রন করতে। আমার আরো যেটা দরকার ছিল, সেটা ছিল সমন্বয়তা। তার সবকিছু থাকবে এবং তারপরও কোন কিছু একপেশে হয়ে যাবে না।

ব্যস, আমি এখান থেকেই কাজ করা শুরু করলাম।
আমি কম্পিউটারকে বললাম অসীম সংখ্যক জগত তৈরী করতে এবং সেগুলো যেনো স্বাভাবিক জগত হয়, খুব বেশি নিয়ম শৃংখলা রাখার দরকার নেই। খুব অদ্ভূত ব্যাপার হলো, কম্পিউটারটা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, অসীমের সংজ্ঞা কি? আমি তখন অসীমকে সংজ্ঞায়িত করলাম, ঠিক যতটা জগৎ তৈরী করলে হুবহু আমার মতো একশ জন রবি তৈরী হবে। কম্পিউটার কাজ শুরু করলো.. এবং অনেকক্ষণ অনেকক্ষণ আমি কানেক্টেড হয়ে অপেক্ষা করলাম, কারণ আমি একটা সামারি চাচ্ছিলাম, আমার কাজ শুরু করার আগেই।

কম্পিউটার আমাকে খুব বিরক্ত সুরে বলল, ৯৮ শতাংশ জগত খুব দ্রুত ফসলহীন হয়ে পড়ছে। আমি প্রথমে বুঝিনি সে ফসলহীন বলতে কি বোঝাচ্ছে, তারপর বুঝলাম, সেখানে মানুষরাই খুব দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন ? কম্পিউটার বলল, আমি বিশৃঙ্খলা এড়ানোর কোন পথ রাখিনি বলে। ওর গলা খুব ভারী শোনালো। হুমম.. আমি মাত্র আনপ্লাগড, কম্পিউটার নির্ঘাত আমাকে বোকা ভাবছে। আমি কম্পিউটারকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা নিশ্চই প্রথম ঘটেনি, সবাই কি করে? কম্পিউটার খুব ভারী গলায় বলল, সবাই এভাবে কিছু করতে চায়না সাধারণত, সবাই একটু একটু করে ডিজাইন করে, এবং সেটাকে সিমুলেট করে। আর যারা হাল্কা র‌্যান্ডম কিছু করতে চায়, তারা কিছু ধর্মবিশ্বাস জুড়ে দেয়। প্রাচীন ইতিহাস বলে মানুষের স্বর্ণযুগের সময়টায় মানুষের ধর্মবিশ্বাস খুব প্রবল ছিল, সেজন্য বিশৃংখলা ছিল ভীষণ কম। তো আমি তাই করতে বললাম, কিছু ধর্মবিশ্বাস যোগ করে দিলাম, যাতে বেশিরভাগ মানুষ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে। আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল এটা খুব ভালো কাজ হচ্ছে না, কিন্তু দেখলাম, জিনিসটা কাজ করছে। কিন্তু তারপরও অনেককিছু ঠিক মতো কাজ করলো না, মানুষরা বেশিরভাগ খুব ধীরে সময় নিলো বিবর্তিত হতে। আমি বিরক্ত হয়ে কিছু সময় তাদের ফাস্ট ফরওয়ার্ড করে দিলাম, এতে একটা সমস্যা ছিল। যদি তাদের মধ্যে মুক্ত চিন্তুা বিস্তার করে, তারা একটা সময় এই মাঝখানের অংশটা ব্যাক্ষা করতে পারবে না, এবং তারা আমার অস্তিত্ব বুঝতে পারবে, যেটা আমার পরীক্ষার জন্য খুব ভালো নয়। কিন্তু তারপরও আমি এই কাজ করলাম, কারণ আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল এটাই ঠিক কাজ। আমি জানি না, কেন এমন মনে হচ্ছিল, কিন্তু আমি আমার নিজের অনুভূতিগুলোকে বিশ্বাস করলাম।

কম্পিউটার আবার খুব ভারী গলায় আমাকে বলল, ৭৬% জায়গায় রবির জন্ম হচ্ছে না। আর বাকি যতটুকুতে জন্ম হচ্ছে তার ৮৯% জায়গায় রবি একজন গুহা মানব। এবার আমার বাধ্য হয়ে অনেকগুলো মানুষের ভালোবাসা নিয়ন্ত্রণ করতে হলো, এবং অনেকগুলো মানুষের বিয়ে উলট পালোট করে দিতে হলো, কারণ নইলে আমার জন্মই হচ্ছিল না! এবং জিনিসটা কাজ করলো, যদিও আমি খুব খুশি ছিলাম না জিনিসটা করে।

কম্পিউটার ?
এবার সে বলল, বেশিরভাগ রবির সাথে আমার ৯৯.৯৯৯৯৯৮% মিল নেই।
কেন ?
কারণ তারা ভিন্ন ভিন্ন পারিপার্শিকতায় বড় হয়েছে।

তখন আমার মনে হলো, আমার হাল ছেড়ে দেয়া উচিত।
আমার খুব আকাশ দেখতে ইচ্ছে করলো, মেঘ ভাসা নীল আকাশ। আমি সেজন্য কম্পিউটার ছেড়ে বাইরে বেরোলাম, অনেকগুলো সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স নিয়ে যখন দেখলাম আমি একটা বিশাল শূণ্য এবং রুক্ষ গ্রহের উচু একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি তখন হাস্যকর লাগলো। সেন্ট্রাল ডাটাবেজ দেখে বুঝলাম, এই গ্রহে বায়ুমন্ডল নেই। ভীষণ দু:খজনক। আমি তারপরও অনেকক্ষণ পাথরগুলোর উপর দিয়ে হাঁটলাম.. আমার খুব ঘুমাতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু আমি জানতাম আমার আর কখনো ঘুম আসবে না। আমি আর কখনো ক্লান্ত হবো না। হয়তো আমি এখন অনেক মুক্ত, কিন্তু আমার মনে হল, সেই বন্দিত্বটুকু অনেক মধুর ছিল । সারাদিন ক্লান্ত হয়ে ঘুমোতে যাবার অনুভূতি অনেক সুন্দর ছিল, স্বপ্নের মাঝে ভেসে বেড়ানোটাও সুন্দর ছিল।

আমি একটা উঁচু বেগুনি পাহাড় এর উপর বসে বসে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, এবং ঠিক তখন আমার মাথায় ভীষণ অদ্ভূত একটা চিন্তা খেলে গেলো। এমন কি হতে পারে না, আমি এখন যেই জগতটায় আছি, সেটা আরেকটা কম্পিউটার জেনারেটেড জগত ? আমার কন্ডিনিউড ফ্র্যাকশন এর কথা মনে পড়লো, এবং একই সাথে খুব হাসি আসলো। কারণ ব্যাপারটা যদি আসলেই তাই হয়, তার মানে হবে প্রতিটা জগত এর পরে আরেকটা জগত থাকবে, আর সেটা যদি সত্যি হয়, তাহলে কখনো এমন কোন জগত পাওয়া যাবে না যেখানে গিয়ে তার পরে আরেকটা জগত থাকবে না।

এবং ঠিক তখন আমাকে দ্বিতীয়বারের মতো আনপ্লাগড করা হলো।


পরের অংশ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28867977 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28867977 2008-11-12 04:31:15
অত্যন্ত অনন্ত ১


১.

আমার নাম রবি।

আমার জন্ম ২০২১ সালের বর্ষায়, সাগর থেকে অল্প ইকটু দূরে একটা ছোট্ট মফস্বল শহরে। আমার ভাবতে খুব ভালো লাগে, যখন ভাবি যে তখন শ্রাবণের বৃষ্টি হচ্ছিল সারা রাত ধরে.. যখন অনেকগুলো বৃষ্টির ফোঁটা টুপটুপ করে মাটিতে এসে পড়ছিল, তখন আমিও পৃথিবীতে টুপ করে এসে ঢুকে পড়েছিলাম..

কিন্তু হয়তো আমার পৃথিবীতে আসাটুকু সেরকম সুন্দর কিছু ছিল না । কিন্তু আমার এভাবেই ভাবতে ভালো লাগে। একটু দূরের সবুজ মেঠো পথ দিয়ে ঘুরে একা একা অনেকদূর হেঁটে একই জায়গায় ফেরার মতো।

আমার নাম রবি, এবং আমার একটা গল্প আছে বলার মতো।
আমি সেজন্য চুপচাপ বসে আছি কি-বোর্ডে হাত রেখে। কারণ আমি জানি না গল্পটা কেমন শোনাবে, এবং আমি একটুও নিশ্চিত নই, আমার শব্দগুলোকে আমার কথাগুলোকে উচ্চারণ করবে কিনা। কিন্তু আমি আমার মতো করে তোমাকে গল্পটা বলব, কারণ আমার এভাবেই গল্প বলতে ভাললাগে।

তুমি জানতে হয়তো জানতে চাইবে, আমি কে? আমি হাসবো, মাথাটা দোলাবো মাটির দিকে তাকিয়ে। কারণ আমি নিজেকে কত শত শতবার জিজ্ঞেস করেছি প্রশ্নটা এবং কখনো কোন জবাব পাইনি। তারপর একটা দিন যখন সব প্রশ্নের উত্তরগুলো আমার উপর আষাঢ় এর বৃষ্টির মতো অবিরতভাবে ঝরতে শুরু করলো, তখন আমি জানলাম, আমি শুধুই ক্রুক্রুশের পৃথিবীর একটা চরিত্র। যাকে ক্রুক্রুশ খুব যত্ন করে বানিয়েছে।

কিন্তু আমি কখনোই জিনিসটা জানতাম না।
আমি বড় হয়েছিলাম খুব একা একটা মানুষ হয়ে। একা একা ঘুরে বেড়ানোর পৃথিবীতে। একা একা বসে থাকার ধানক্ষেতের পাশে, একা একা সাইকেলের পিঠে ছুটে বেড়ানো একগুচ্ছ শব্দ হয়ে। একা একা সন্ধ্যার আঁধার নামানোর জন্য আমি একা একা বসে থাকতাম দিগন্তর পাশে। তারপর সেখানটায় লাল সূর্যটা ডুব মারতো আর রূপালি চাঁদটা উঁকি মারতো, ঝিঁঝিঁ পোকাগুলো গান ধরতো, আর শুধু আমি বসে বসে শুনতাম। মাঝে মাঝে একা একা বই এর পাতাগুলো উল্টাতাম, আর বসে বসে আমার নিজের একটা পৃথিবী বানাতাম, যেখানটায় ছিল আমার সৃষ্টি করার স্বাধীনতা। তারপর এভাবে যখন আমি বড় হতে থাকলাম, আমার মনে হলো আমি ভীষণ একা, এবং আমার মনে হলো আমার কথাগুলো বলার জন্য পৃথিবীতে কোন মানুষ নেই, আমার কথাগুলো শোনানোর জন্য কোন শব্দ নেই পৃথিবীতে, এবং আমার পড়া রূপকথাগুলো আমাকে প্রতারিত করলো কাউকে ভালোবাসতে বলে .. কি হাস্যকর, তখন আমি আবিষ্কার করলাম, আমাকে ভালোবাসার জন্যও কোন মানুষ নেই। এবং অনেক অনেক সময় পার হবার পর, অনেক অনেক দূরে ভেসে যাবার পর আমি একদিন আবিষ্কার করলাম, আমি আসলে কোন মানুষের সীমাবদ্ধ ভালোবাসা খুঁজছি না ... কিন্তু আমি জানতাম না আমি আসলে কি খুঁজছি। সেটা ছিল আমার টিনএইজের শেষ সময়, যখন সবার জগত ভরে যায় অনেক অনেক প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে। যখন আকাশটা তার নীল রং হারায়, আর মেঘগুলো হারায় তাদের শুভ্রতা। তারপর রোদগুলো গালে এসে পড়ে, একরাশ উত্তাপ দিয়ে যাবার জন্য। সেখানে কোন মিষ্টি সুর অবশিষ্ট থাকে না।

তুমি কি বিরক্ত হচ্ছো?
আমার এভাবেই কথা বলতে ভালো লাগে। নিজেকে হারিয়ে যাওয়া গল্পের হারিয়ে যাওয়া একটা বুড়ো মানুষ মনে হয়। আসলে আমরা সবাই কোন না কোন দিন তাই হয়ে যাবো, মহাকালের বিশাল সময়ের তুলনায় আমাদের সময়কাল কিছুই না.. হাজার বছর পর, তুমি কি বেঁচে থাকলে নিজেকে বুড়ো বলবে না?

আমি ঠিক তখন ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম।
আমার ছোটবেলায় খুব শখ ছিল পাইলট হবো, আমার একটা প্লেন থাকবে আর আমি আকাশের সব মেঘগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে উড়ে বেড়াবো, সব পাখিগুলোর সাথে ভেসে বেড়াবো, আর বন্ধু বানাবো আকাশটার উপরের মিষ্টি সব অনুভূতিগুলোকে। অনেক উপর থেকে সাগর দেখবো, সাদা স্রোত। কিন্তু সেসবের কিছুই হলো না। সেন্ট্রাল সিস্টেম আমার মেধা যাচাই করে আমাকে বিশুদ্ধ গণিতে ঢুকিয়ে দিলো .. যেটা ছিল আমার জন্য বিশ্রী একটা ব্যাপার । আমি বিশুদ্ধ গণিতে কোন ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিলাম না, অন্তত সেরকম কিছু না, যেরকম আমি চাচ্ছিলাম। বিশুদ্ধ গণিতে কোন অ্যাডভেন্চার নেই, আকাশে ভেসে বেড়ানো নেই, একা একা বসে থাকার মতো ঝিঁঝিঁ পোকা নেই, পাহাড়ী ঝরনা নেই। আমি মোটা মোটা বইগুলো নিয়ে বসে থাকতাম, যেগুলোতে দস্তয়ভস্কি ছিলো না, যেগুলোতে রিতান্টার কবিতা ছিল না, যেখানটায় ভ্যান গখের ছবিও ছিল না। অনেক অনেক সমীকরণ ছিল, যেগুলোর কোন অর্থ আমার কাছে ছিল না। কিন্তু তারপর, হঠাৎ একটা সময় আমি অনুভব করলাম আমি জিনিসগুলো বুঝতে পারছি। আমি হঠাৎ করে এও বুঝতে পারলাম, আমার চিন্তা ভাবনা পাল্টে যাচ্ছে, এবং সেখানটায় একটা নতুন ডাইমেনশন তৈরী হচ্ছে। আমি ম্যাটরিক্স সিস্টেমটা মুগ্ধ হয়ে শিখলাম, আমার মনে হলো আমি একটা নতুন জগতে ঢুকে যাচ্ছি যেখানটায় কোন সীমাবদ্ধতা নেই প্রকাশের, সেখানটায় কেউ থেমে যাচ্ছে না বাস্তব সংখ্যারা কাল্পনিক সংখ্যার সাবসেট এটুকু বলে, সেখানটায় গিয়ে হঠাৎ দিগন্ত বিস্তৃত হয়ে যাচ্ছে, কারণ সব ধরণের সংখ্যারা একটা ম্যাট্রিক্স এর সাবসেট, একটা ম্যাট্রিক্স আরো বড় ধাঁচের জিনিস। যখন জিনিসগুলো হঠাৎ এভাবে পাল্টে যেতে শুরু করলো, তখন আমি আসলেই গণিতকে ভালোবাসতে শুরু করলাম, কারণ আমি বুঝতে পারলাম, কিছু সৌন্দর্য এখনো অবশিষ্ট রয়ে গেছে, যেগুলো তুমি কখনো একজন কবির চোখ দিয়ে দেখতে পাবে না, এমন কি দেখতে পাবে না, কোন অ্যাডভেন্চারারের চোখ দিয়েও, যে পৃথিবীর সব অরণ্য, সব পথ চষে ফেলেছে সৌন্দর্য খুঁজতে গিয়ে, কিংবা কোন ড্রাগ এডিক্টের চোখ দিয়েও যে ক্রমাগত দাবি করছে, সে তোমার চেয়ে বেশি সংখ্যক রং দেখেছে। আমি এই অদ্ভূত অনুভূতিটুকু নিয়ে আমার জীবণটা যেন আবার শুরু করলাম। ঘুম ভেঙে হঠাৎ একটা সুন্দর ভোর দেখার মতো করে। যখন সূর্য তার সব রশ্নিগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে সব অন্ধকারকে ধুলো ঝেড়ে দেবার জন্য। আমার মনে হচ্ছিল, কেউ যদি কখনো অপূর্ব সুন্দর কিছু কখনো তৈরী করার চিন্তা করে, এবং সেটাকে যদি সে ভাষা দিয়ে প্রকাশ করতে চায়, তাহলে হয়তো সেটা হবে গণিতের মত একটা ভাষা, এবং আমি সেটা বুঝতে পারবো। সেটা ছিল প্রথম বর্ষের শেষে, এবং আমি যতই গণিতে ডুবে যাচ্ছিলাম, আমার ততই মনে হচ্ছিল আমি একজন উইজার্ড, কারণ গণিত আমাকে সেরকম ক্ষমতা দিচ্ছিল - যা ইচ্ছা তা করার। সে বছর আমাদের ক্যালকুলাস ছিল, আমি শিখলাম, কিভাবে আমি যেকোন কার্ভের ক্ষেত্র বের করে ফেলতে পারি। কিভাবে আমি অনেক বড় একটা জিনিসকে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে আবার একসাথে জোড়া লাগিয়ে দিতে পারি যাতে কোন ক্ষুদ্রতাই হারিয়ে না যায়। এই সবকিছু অনেক অদ্ভূত একটা অনুভূতি নিয়ে আসলো আমার মধ্যে, আমার মনে হতো এরা হচ্ছে আমার ক্ষমতা, এরা হচ্ছে আমার মন্ত্র, আমার স্পেল।

তারপর তিন বছর আমি পুরোপুরি ডুবে থাকলাম, আমার নতুন পৃথিবী নিয়ে।
তারপর একটা সময় ছন্দপতন হলো ... আমার নিজের জীবণটাকে খুব অর্থহীন মনে হওয়া শুরু করলো। আমার হঠাৎ করে মনে হলো, আমার আসলে বেঁচে থাকার কোন কারণ নেই। এবং আমি জানি না, আমি কাদের জন্য বেঁচে আছি, কিংবা কেউ অদৌ মাথা ঘামায় কিনা আমি বেঁচে আছি কিনা সেটা ভেবে। আমি কিছুদিন আমার সব ভাবনা চষে বেড়ালাম, নিজের প্রশ্নের খোঁজে। কিন্তু কোন লাভ হল না। এবং তারপর আমার মধ্যে আমার পুরনো একাকীত্ব ফিরে আসলো, আরো গাঢ় হয়ে। আমি অনেক চেষ্টা করেও কিছু এড়াতে পারলাম না, আমার মাথার মধ্যে কেবলি ঘুরতে থাকলো আমি কত একা আর আমার অনুভূতিগুলো কতো মূল্যহীণ। পৃথিবীর কারো কিছু যায় আসে না আমার মন খারাপ থাকুক বা না থাকুক। এবং আমি কাউকে বোঝাতেও পারবো না, আমার কেমন লাগছে। আমি এলোমেলো ঘুরে বেড়াতাম কনসার্টগুলোতে, সবাই যখন নাচতো, আমি তখন কোণায় খুব বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকতাম, আমি জানতাম আমাকে সেখানে মানাচ্ছে না একদমই, কিন্তু আমি বের হয়েও যেতে পারতাম না, গানগুলো শক্ত করে আমাকে টেনে রাখতো, তাই আমি গানগুলো শুনতাম এবং আমার মনে হতো, আমি খুব নিঁখুতভাবে অনুভব করতে পারছি, আমি দৃশ্যকল্পগুলো স্পষ্ট দেখছি যেগুলোর কথা লোকটা শব্দ দিয়ে গাচ্ছে, এবং আমার চোখে পানি চলে আসতো, আমি চোখ পিটপিট করে পানিগুলো সরিয়ে দিতাম। তারপর হঠাৎ মনে হতো, কেন খামোখা পানি সরাচ্ছি, আমি কাঁদছি এটা দেখলে কার কি? কিন্তু তারপর খুব খুব বাজে লাগতো, যখন আমার মনে হতো আমি এই ভালোবাসার গানটা অনুভব করছি, খুব খুব তীব্রভাবে.. এবং তখন আমার খুব কাঁদতে ইচ্ছে করতো চিৎকার করে, আমার খুব জোরে চিৎকার করে স্রষ্টাকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করতো, যদি আমার সবকিছুই এভাবেই চলতে থাকবে, তাহলে আমাকে এত এত প্রচন্ড অনুভূতি দেয়ার অর্থ কি?

আমার এলোমেলো সময় থেকে আমি বের হতে পারলাম না, হঠাৎ একটা সময় আমি খুব অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, আমি ক্লাসের পড়াশুনার অনেক বাইরে .. আমার নিজেকে অনেক হারিয়ে যাওয়া একটা মানুষ মনে হলো, কারণ আমার ভার্সিটির শেষ পরীক্ষাটা আর এক সপ্তাহ দূরে, আর আমার কোন ধারণাই নেই এবছর কোর্সে কি ছিল।

আমার যা কিছু হারানোর বাকি ছিল, সবটুকু যেন একবারে হারিয়ে ফেললাম। আমি একগাদা হেরোইন একসাথে পুশ করলাম আমার রক্তে, শুধু ওভারড্রাগড হয়ে মরে যাবার জন্য। শান্তিপূর্ণ মৃত্যু। সেটা আমার কাছে অপটিমাল মনে হচ্ছিল কারণ আমি আর কোন ভালো সহজ পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

কিন্তু.. আমি মরিনি। হাসপাতাল খুব দূরে ছিল না আমার ভার্সিটি থেকে। আর হাসপাতালে নেবার মত উৎসাহী মানুষেরও অভাব ছিল না ভার্সিটিতে। এই জিনিসটা আমার মাথায় কাজ করেনি শেষ মুহূর্তে।

তো, আমি বেঁচে গেলাম।
কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল না আমি বেঁচে আছি। আমার একটা বন্ধু ছিল, যে নিজেকে বলতো জলদস্যু নেসার।
আমার ওর কথা খুব মনে হচ্ছিল, কারণ সে প্রায় এরকম কথা বলতো, "আমি বেঁচে ছিলাম কবে ?"

আমার আর পরীক্ষা দেয়া লাগলো না।
আমি কিছুদিন আবার আগের মতো ঘুরে বেড়ালাম একা একা। আমার চুল অনেক বড় হয়ে গেছে এর মাঝে, আর দাড়িগুলোও জঙ্গল হচ্ছে। তো আমাকে দেখতে নিশ্চই খুব অদ্ভূত লাগতো, কারণ পথে ঘাটে মানুষ আমাকে দেখে হচকিয়ে যেতো, তারপর ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে থাকতো। আমি তাকালে সবাই আবার নিজের কাজ করা শুরু করতো। ব্যাপারটা অদ্ভূত কোন সন্দেহ নেই, আমি সেজন্য বসে থাকতাম আমার একা একা পার্কে। লেকের ধারে, যেখানে সব ছায়াগুলো টলটল করতো পানিতে। রোদ উঠতো, রোদ নামতো, আমি বসে থাকতাম। তারপর মাঝে মাঝে ঝিম ধরে বৃষ্টি নামতো, তখন সবকিছু মানবশূণ্য হয়ে পড়তো, তখনও আমি বসে থাকতাম। বৃষ্টিতে ভিজতে আমার খুব বেশি আপত্তি নেই, আমি বৃষ্টি ভালোবাসি। যখন অনেকক্ষণ টানা বৃষ্টি হয়, তখন আমার কেন জানি মনে হত আকাশের টাংকি কখন খালি হবে? এই চিন্তাটা খুবই হাস্যকর ছিল, তাই আমি একা একা হাসতাম। আমার মনে হয় এটা স্রেফ পাগলামি, স্রেফ অসুস্থতা, প্রতিবার এভাবে বৃষ্টি হতো, আর প্রতিবার আমার মনে হতো আকাশ খালি হচ্ছে না কেন।

আমি ভাবনার ভিতর তলিয়ে যেতে থাকলাম, আমার কখনো খুব বেশি ব্ন্ধু ছিল না, সেই দিনগুলোতে তো নয়, কিন্তু আমার মনে হত, যদি আমার খুব ভালো বন্ধুও থাকতো, কেউ হয়তো আমার কথাগুলো বুঝতে পারতো না। আমার মনে হচ্ছিল আমি কিছু একটা বুঝতে পারছি, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম না আমি কি বুঝতে পারছি ।

আমার অনুভূতিগুলো প্রচন্ড তীক্ষ্ণ হতে থাকলো, আমার মনে হলো আমার ভেতরে কবিতারা ফিরে এসেছে, যেগুলো হারিয়ে গিয়েছিল হাইস্কুলে থাকার কোন এক সময়, চুপিচুপি আমাকে না বলে। আমার তখন মনে হতো, আমি কবিতা দেখতে পাই, আমি কবিতার গন্ধ শুঁকতে পাই.. আমি শূণ্য আকাশের দিকে চেয়ে থাকতাম, যে তার শূণ্যতা দিয়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখে, তারপর অনন্ততা নিয়ে বারি ঝরায়.. আমি পানির হাল্কা মৃদু ঢেউর দিকে চেয়ে থাকতাম, ছোট্ট স্রোত, যে অনেক ক্ষুদ্র, কিন্তু পাড়ে গিয়ে বাড়ি খাবার আগে, সে একবারো মনে করতে চায় না সে কখনো হারিয়ে যাবে। সবকিছুর মধ্যে আমি কবিতা দেখতে পারতাম তখন। আমার মনে হতো পৃথিবীটা কারো অনেক বড় একটা কবিতা, নিঁখুত ছন্দে বানানো। সেজন্য সব ছোট ছোট জিনিসকে আমরা কথায় বর্ণনা করতে পারি খুব সহজে, যখন আমরা আসলেই চাই সৎ হয়ে, এবং তখন সেসব চিন্তা আমাদের মাথায় ভালোলাগার অনুভূতি নিয়ে আসে.. যেই ভালোলাগাগুলো আসে বৃহত্তর কবিতাটা থেকে.. কিন্তু সেটার যেখানে থাকার সেখানেই পড়ে থাকে, কবিরা রসদ খুঁজতে আসার আগে এবং পরে।

এভাবে বর্ষাটা কেটে গেল। শরৎ আসলো, আর আমার চুলে জট বাধা শুরু করলো।
আমাকে দেখলে খুব গরিব মনে হতো, কিন্তু আমার পকেটে একটা এটিএম কার্ড ছিল। এটা ভাবতেই আমার খুব হাসি পেত, আর আমি ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতাম, আর পার্কে প্রেম করতে আসা সুন্দরীরা ভয়ে দূরে সরে যেত। সেটা দেখে আমার আরো হাসি পেত আর আমি আরো জোরে হাসতে থাকতাম। এবং সেই শরৎ এ আমি বুঝতে পারলাম, আমি অনেক পাল্টে গেছি। আমি আর সবার মতো নেই, আর আমি কখনো স্বাভাবিক পৃথিবীতে স্বাভাবিক হয়ে ফিরে যেতে পারবো না। তবে তুমি কাকে স্বাভাবিক জীবণ বলবে? যে জীবণে তুমি নি:সঙ্গ? যে জীবণে তুমি নিজেকে পুরোপুরিভাবে প্রকাশ করতে পারো না, নিজের অনুভূতিকে লুকিয়ে রাখো নিজের মধ্যে? নিজের পাগলামিগুলো নিজের কাছ থেকে সরিয়ে রাখতে চাও? পৃথিবীকে মন খুলে দেবার মতো যথেষ্ট ভালোবাসা অবশিষ্ট থাকে না? আমার আর সেসবকে স্বাভাবিক মনে হতো না।

এবং সেই শরৎ এ আমার চিন্তাভাবনাগুলো মসৃণ হতে শুরু করলো।
আমি পুরোপুরি বুঝতে পারলাম অনেককিছু যেই চিন্তুাগুলো আমার মাথায় কুয়াশার মতো জমে ছিল অনেক দিন ধরে।

ধরো, আমার জীবণটা - আমি অনেক অনেক খুঁটিনাটি খেয়াল করে দেখলাম, সেখানে খুব ছোট্ট একটা জিনিস যদি ইকটু পাল্টাতো আমি খুব অন্যরকম একটা মানুষ হতাম । এবং আমি তখন পৃথিবীর দিকে তাকালাম, এবং আমার পৃথিবীর জন্য একই কথা মনে হল। আমি কখনোই খুব ভীষণ রকম বিশ্বাসী ছিলাম না ধর্মে। সেজন্য, আমার কাছে এই চিন্তাটা অদ্ভূত লাগলো, খুব অদ্ভূত । আমার প্রথম দিকে পড়া জিনিসগুলোর কথা মনে হতো, শামুকের খোল, ফুল, পাতা, মানুষের গড়ন, ফিবোনাকি নাম্বার, গোল্ডেন রেশিও.. পাই.. আমার মনে পড়তে থাকলো সবকিছু, যেগুলো দেখে আমি খুব অবাক হতাম, জিনিসগুলো এত নিঁখুতভাবে গণিত মেনে চলে কেন। এবং কবিতারা আবার ফিরে আসলো, এবং সবকিছু আমার মাথায় জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলল। আমি প্রচন্ড ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম সব অনুভূতির বস্তা নিয়ে, আমার তীব্রভাবে মনে হচ্ছিল এই সবকিছু সাজানো, এই তুমি এই আমি, এই পার্ক, এই বৃষ্টির পানি, এই সময়টা। এবং কেউ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে, এবং সেখানে আমার কিছুই করার নেই। বিশৃঙ্খলার গণিত আমার খুব প্রিয় ছিল। প্রিয় হবার একটা কারণ ছিল ফ্র্যাকটাল দিয়ে অসাধারণ মিউজিক কম্পোজ করা যেত, আর অসম্ভব সুন্দর ছবি আঁকা যেত। কিন্তু বিশৃঙ্খলার গণিতের আরো কিছু অংশ ছিল। সেটা বলতো সব ঘটনা সব ঘটনার সাথে সম্পর্কিত - প্রাচীন উক্তি, আমাজনে একটা পাখি ডানা ঝাপটাবে তার কারণে নিউইয়র্কে বৃষ্টি হবে। বিশৃঙ্খলার গণিত এর অনেককিছু আমার মাথায় একসাথে ঘুরতে থাকলো। আমি যদি গ্রাফ থিওরি দিয়ে একটা বিশাল গ্রাফ মডেল তৈরী করতে পারি, যেখানে দুটো নোডের মধ্যে তখনই ডিরেক্টেড এজ থাকবে যদি একটা আরেকটাকে প্রভাবিত করে, এবং এজটা হবে দুটো নোডের দুটো প্রপার্টির উপর, তাহলে আমি যদি একটা শক্তিশালী কম্পিউটিং মেশিন দিয়ে সবগুলো রিলেশনগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, আমি একটা নিঁখুত জগত বানাতে পারবো, যেটা সম্পূর্ণ আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আমি সব ইভেন্ট আমার মতো করে চালাতে পারবো, এবং ইভেন্টের সাথে জড়ানো অবজেক্টরা কখনোই জানবে না, কোন ছোট ছোট ঘটনাগুলো দিয়ে আমি তাদের জীবণ পাল্টে দিয়েছি, এবং সেজন্য কখনোই তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ হিসেব করতে পারবে না।

আমি যখন নিখুঁত ভাবে সব চিন্তা গুছিয়ে ফেলেছি, তখন আমার অন্যমনষ্ক সত্তা বের হয়ে আসলো, আমি প্রচন্ড জোরে হর্ণের শব্দ শুনলাম, এবং তাকিয়ে দেখলাম আমি একটা ট্রাকের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যেই ড্রাইভারটা আমাকে একদমই খেয়াল করেনি, এবং যদিও সে ব্রেকে চাপ দিচ্ছে, গাড়িটা আমার গায়ে এসে লাগবে প্রচন্ড জোরে। আমি একজন গণিতবিদ, আমি মেকানিক্স খু্বই ভালো জানি, এবং হয়তো সেজন্যই ঠিক তার কয়েক মাইক্রোসেকেন্ডের মাথায় ট্রাকটা প্রচন্ড জোরে আমাকে আঘাত করলো।

তবে, এবার আমার আশেপাশে কোন হাসপাতাল ছিল না, হাসপাতালে নেবার মতো লোকও ছিল না। যদিও দোষটা পুরো আমারই ছিল তারপরও ট্রাকড্রাইভার ভাবলো সে আমাকে মেরে ফেলেছে, যদিও আমি তখনও মরিনি, এবং সে ভয় পেয়ে আমার উপর দিয়ে গাড়িটা নিয়ে ছুটে বের হয়ে গেল। আমার স্নায়ুগুলো দূর্বল হয়ে যেতে থাকলো, আমি ভেবেছিলাম সব আঁধার হয়ে যাবে, তা না হয়ে সব ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আমার একদম মরতে ইচ্ছে করছিল না, আমার খুব ইচ্ছে করছিল আমার চিন্তাগুলো সমাপ্ত করতে। আমার তখনো মনে হচ্ছিল আমাকে একটু সময় দিলে আমি একটা ম্যাথমেটিকাল মডেল বানিয়ে দিতে পারবো, এবং হয়তো আমি কিছু উচ্চ শ্রেণীর অ্যাবস্ট্রাক্ট গণিত দিয়ে জিনিসগুলোকে প্রমাণও করতে পারবো। আমি হয়তো মানুষকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে একটা সত্য দেখাতে পারবো, যেটা আপাতত আমি ছাড়া আর কেউ দেখছে না।

এবং আমি ভাবিনি আমি মরে যাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছিল আমি একটা সাদা জগতে হারিয়ে যাচ্ছি, আমার সবকিছু সাদা হয়ে সেখানটায় মিলিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু, আমি মারা গেলাম।
যখন আমি মরতে চাইনি তখন।

ক্রুকুশ আমাকে আনপ্লাগড করলো।


পরের অংশ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28867975 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28867975 2008-11-12 04:28:40
ক্লিলি - সমাপ্তি ক্লিলি ১

ক্লিলি ২,৩

গল্পটা যারা পড়ছিলো, তাদের কাছে আমি দু:খিত।
আমার গল্পটা আর লিখতে ইচ্ছে করছে না।

গল্পটা আমার মাথায় ছিল বেশ কদিন, এবং আমার মনে হচ্ছিল গল্পটা বলার মতো। গল্পটা অনেক পরের একটা সময়ের, যখন রোবটরা লেখালেখি শুরু করে। সেই বিশেষ রোবটগুলোকে মানুষই বানায়, তাদের থেকে বিশাল মাপের আয় করার জন্য। এই রোবটগুলোকে আমি বলছিলাম রাইটারবট। রাইটারবটদের অনেকগুলো প্রসেসর এবং অনেক বড় ডাটাব্যাংক। তারা পৃথিবীর সব সাহিত্য পড়েছে এবং প্রতিদিন যা কিছু লেখা হয় পৃথিবীতে, যত ভাবনা ভাবা হয়, তার সমস্ত তাদের ফিড করা হয়।

একটা রাইটারবটের অনেকগুলো টুল থাকে। নির্ভর করে রাইটারবটটার উপর। কারণ প্রতিটি রাইটারবটের ডিজাইন ইউনিক। একেকজন একেকভাবে ভাবে। একেকভাবে কল্পনা করে, একেকভাবে দেখে।

আমার গল্পটা ছিল একটা ব্যর্থ লেখকের, যে তার নিজের মতো লিখতে ভালোবাসতো, এবং পৃথিবীতে তার কোন দাম ছিল না। কারণ রাইটারবটরা অসম্ভব ভালো লিখে এবং তাদের সাথে মানুষ প্রতিযোগিতায় যেতেই পারে না, কারণ মানুষের চিন্তাভাবনা এবং ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। সে সবাইকে পিছে ফেলে নিজেকে আলাদা করে ফেলল কারণ সে চাইতো না সবাই তাকে মনে করিয়ে দিক সে কতটা ছোট। এবং সে নিজের মতো করে এক ধরণের লেখা লিখতে চেষ্টা করতো, যেটাতে সে মোটেই ভালো ছিল না, কিন্তু অনেক দিন টানা চেষ্টা করার পর একটা সময় সে আসলেই তা করতে পারা শুরু করলো যেটা সে করতে চাইছিল।

ওর বয়স যখন ষাট এর কাছাকাছি তখন সে একটা অদ্ভূত অফার পেলো, তার প্রিয় রাইটারবটের সাৎক্ষাতকার নেয়ার। এর পরের গল্পটা একটু জটিল, সে আবিষ্কার করলো, রাইটারবটরা খুব দু:খী। তাদের দু:খটা বুঝতে হলে তাদের মানুষ ভাবতে হবে, একটা মানুষ যার অনুভূতিগুলো ইনটেনসিফাই করে অনেক মাত্রায় বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেই অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য তাকে লেখার ক্ষমতা ছাড়া আর কিছু দেয়া হয়নি। সে কারো বন্ধু না, সে কাউকে ভালোবাসে না, কিন্তু সে ভালোবাসা খুব ভয়ংকর তীব্রভাবে অনুভব করে। এই জিনিসটা লেখা খুব চ্যালেন্জিং ছিলো, কারণ আমার গল্পে ইস্কান্দিওর এই রাইটারবটটাকে ভালোবেসে ফেলে। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক, কিন্তু জিনিসটাকে স্বাভাবিক করে লেখা যায়, এবং সেটা চ্যালেন্জিং। রাইটারবটটাকে ভালোবাসার কারণ অনেকগুলোই হতে পারে, রাইটারবটটা ইস্কান্দিওর এর মতোই একা, এবং তাদের দুজনের যথেষ্ট মিল, দুজন দুজনের সাথে কথা বলতে পছন্দ করে, এবং দুজন অনুভূতি এবং ভাবনার দিক থেকে খুব চার্মিং।

ইস্কান্দিওর কখনো কাওকে ভালোবাসেনি, তার কাছে এই ব্যাপারটা অদ্ভূত ছিল, অদ্ভূত এবং প্রচন্ড ম্যাজিকাল এবং প্রচন্ড শক্তিশালী। কাউকে ভালোবাসা এবং বিনিময়ে তীব্র ভালোবাসা পাওয়া। ইস্কান্দিওর ফিরে আসে তার বাসায়, তার একা বাসায়, যেটা মেঘের খুব কাছাকাছি, ইস্কান্দিওর তার তীব্র ভালোবাসা নিয়ে সেখানে মেঘের কাছাকাছি বসে থাকে, কারণ ক্লিলির সাথে তার যোগাযোগের কোন উপায় নেই।

ইস্কান্দিওর তার বাকি জীবণ কাটায় ক্লিলিকে ভালোবেসে, এবং প্রতিদিন ক্লিলির নতুন উপন্যাস এর জন্য অপেক্ষা করে। ইস্কান্দিওর জানতো না ক্লিলি তাকে মিস করে কিনা, কারণ সেটা জানার কোন উপায় ছিলো না।

এবং একটা সময় ইস্কান্দিওর মারা যায়।
ক্লিলি বেঁচে থাকে অ্যান্টারটিকার সমুদ্রের গভীরে, আরো কয়েকশত বছর, যতদিন না ওর কম্প্লিট রি-কনস্ট্রাকশন এর প্রয়োজন হয়।

ইস্কান্দিওর মারা যাবার পর, ওর পিসিটা একটা সেকেন্ড হ্যান্ড মেশিনের দোকানে বিক্রি করে দেয়া হয়। এবং সেটা কেনে একটা সাধারণ ছোট ছেলে, ১৫ বছরের। যে একা একা কবিতা লিখে আর সব কবিতা লুকিয়ে রেখে দেয় সবাই তাকে পাগল ভাববে বলে, একা একা ফিসফিস করে গান গায়, কারণ তার গান কেউ কখনো ভালোবাসেনি। এবং ছেলেটা যখন পিসিটার ফাইলগুলো পড়তে থাকে, সে বুঝতে পারে জিনিসগুলোর গুরুত্ব।

ইস্কান্দিওর একটা বড় ফাইল রেখে গিয়েছিল।
তার জীবণের একমাত্র উপন্যাস, একমাত্র - এবং সর্বশেষ।

সেটার নাম ছিল অতিমাত্রিক, আর সেটা ছিল সেই মিলিনিয়ামের সবচে' বেশি বিক্রিত বই। সেটা ছিল প্রথম ষষ্ঠ মাত্রার সাহিত্য। এবং সেই বইটা পাবলিশ হবার কিছুদিনের মধ্যে বিশুদ্ধ সাহিত্য পুরো পাল্টে যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে কখনো কোন জিনিস এত তাড়াতাড়ি এত বেশি পাল্টায়নি, এবং পৃথিবীর ইতিহাসে কখনো একটা বই এত বড় মাপের রেভুলুশন আনতে পারেনি।

ইস্কান্দিওর চেষ্টা করেনি বইটা রাইটারবটদের মতো করে লিখতে। কিন্তু যে কেউ বইটা পড়লেই বুঝতো, ইস্কান্দিওর নিজের মতো করে লিখতে চেয়েছিল, এবং লিখেছিলোও। সে কোন স্ট্যার্ন্ডাড ফর্ম মানেনি, এবং তার শব্দ আর বিশেষণগুলো মোটেও ঝকঝকে ছিল না। কিন্তু উপন্যাসটা পড়ার সময় খুব করে মনে হতো, এটা একটা সত্যিকারের মানুষের লেখা। আবার এও মনে হতো, যে এটা কোন মানুষের পক্ষে লেখা সম্ভবই নয়!

--

গল্পটা সুন্দর ছিল - আমার তাই মনে হয়।
আমার মনে হচ্ছিল গল্পটা মৌলিক, এবং সেটাই সবচে' দারুণ জিনিস, আমি লিখতে মজা পাচ্ছিলাম সে জন্য। মাথার মধ্যে একটা গল্প থাকার পর যখন সেটা একটু একটু করে বেরোতে দেখি - তখন অদ্ভূত লাগে, কারণ যে গল্পটা বের হয়, সেটা ঠিক পুরোপুরি মাথার গল্পটা না, আরো ম্যাচিউর কিছু, আরো সুন্দর এবং পূর্ণাঙ্গ কিছু্ ।

কিন্তু হঠাৎ করে, আমার মনে হচ্ছে, আমি ঠিক লেখক হবার জন্য জন্মাইনি। এবং আমার মনে হচ্ছে, এটা আসলে আমার চয়েস .. আমি কি করবো আমার সময় নিয়ে ..

And I have better things to do with my life! <img src=" style="border:0;" />

--

ইস্কান্দিওর গল্পের মোরাল ছিল অনেকটা এরকম
dont let the giants tell you that you are small,
cause if you are small then thats the best thing about being a giant!

আমি চাচ্ছিলাম, গল্পটা এমন ভাবে লিখতে যাতে শেষে গিয়ে এই জিনিসটা মাথায় ঘুরতে থাকে, যে যেভাবেই ভাবুক, ঠিক সেভাবেই তার মাথায় জিনিসটা ঘুরুক। লাইনদুটো না বলে কারো মাথায় লাইনদুটো ঢুকানোর লোভটা আসলেই ভয়ংকর। কেউ কখনো ব্যাপারটা না চেষ্টা করলে আমি বোঝাতে পারবো না।

--

আমি খুব দু:খিত এক নিশ্বাসে গল্পটা বলার জন্য।
এই গল্পটার কোন কপিরাইট নেই! <img src=" style="border:0;" />]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28859275 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28859275 2008-10-25 00:36:13
ক্লিলি - ২,৩ - ড্রাফ্ট ক্লিলি ১

২.
আমি বসেছিলাম অবসারভটরিতে, অনেকক্ষণ।
হঠাৎ সবকিছু আমাকে পেছনে ঠেলে দিলো যেন, অনেকক্ষণ আমার মনে পড়লো ফেলে আসা সব সময়গুলোর কথা, আর আমি হারিয়ে গেলাম সেগুলোর মাঝে। আমি কেমন ছিলাম তখন ? আমার এখন মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে তখনকার আমাকে অনুভব করতে .. একটা সাহসী তরুণ.. যে স্বপ্ন দেখতে দেয়াল ভাঙা কিছু করার ..

বিশ বছরের ছেলেটা কি কখনো ভেবেছিল ওর শেষটা এখানটায় হবে ? অনেক উঁচু একটা বিল্ডিং এর একাকী একটা ফ্লোরে.. কৃত্রিম একাকীত্বতে ?

আমি জানি না, এটাই কি আসলে আমার শেষ ?
আমি আমার শেষ বছরগুলো এখানটায় কাটিয়েছি.. পৃথিবী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে.. আমার খুব বেশি আগ্রহ ছিলো না, সবকিছু নিয়ে.. আমার ভালো লাগতো আমার পিসির কিবোর্ডে হাত রেখে আমার উল্টোপাল্টো চিন্তাভাবনা লিখতে, আমার খুব ভালো লাগতো যখন অনেক বিচ্ছিন্ন শব্দ সব একসাথে হয়ে অর্থ তৈরী করতো, একটা গভীর বোধ, যেটা আসে অনেক ঝড় পার করে আসার পর, শান্ত সমুদ্রের ঢেউর মতো.. আমার ভাললাগতো আমার মতো করে লিখতে, শেষ কয়েক বছর আমার মাথায় অতিরিক্ত অ্যাবস্ট্রাক্ট জিনিস খুব ঘুরছে। আমি কিছু একটা অনুভব করছি, আমি অনেক অনেক শব্দ লিখবো, কিন্তু কেউ যখন লেখাটা পড়বে, সে শব্দগুলোকে আলাদা করে দেখতে পাবে না, সে শুধু অনুভব করবে আমি কি অনুভব করছিলাম, লেখাটা লেখার সময়। আমার মনে হচ্ছে আমি ইদানিং ইকটু ইকটু করে ভালো হচ্ছি এই ধরণের লেখাতে। কি অদ্ভূত, যে আমি এ ধরণের লেখা লিখতে শুরু করেছিলাম প্রায় ত্রিশ বছর আগে!

ক্লিলির লেখা পড়তে আমার খুব ভালো লাগে একই কারণে, সেও অনেকটা এভাবে লিখে, পড়তে পড়তে হঠাৎ মনে হয় সব শব্দগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে, আর কেউ আমার হাত ধরে আমাকে একটা অদ্ভূত জগতে নিয়ে গেছে, এবং আমাকে ওর চোখ দিয়ে সবকিছু দেখাচ্ছে, একটা একটা অনুভূতি ছুঁয়ে ছুঁয়ে .. কোন সন্দেহ নেই, এ কারণেই ওর উপন্যাস প্রচুর বিক্রি হয়, অনেক বেশি দাম থাকা সত্ত্বেও..

কিন্তু.. আমি আমার ভাবনার লুপ থেকে বের হতে পারি না। আমার এখনো কেবল মনে হচ্ছে প্রথম দিনগুলোর কথা। আমার উপর বিষন্নতা চেপে বসেছিল, আর আমি কিছুতেই বের হতে পারছিলাম না, আমি যতবারই খুব আগ্রহ নিয়ে লিখতে বসছিলাম, আমার লেখায় খুব বাছাই করা শব্দ আর আমার পুরনো কবিতার পুনরাবৃত্তি ছাড়া কিছুই ছিল না.. সেটা ছিল খুব দু:খজনক, আমি চুপচাপ বসে থাকতাম প্রচন্ড শূণ্যতা নিয়ে.. একটা অভিমানী ছেলে, যে সব কিছু ছেড়েছিল নিজের মতো লেখালেখি করার জন্য.. কিন্তু সে কিছুতেই লিখতে পারছিলো না..

আমি তখন পিসি শাট ডাউন করতাম, আমার বারান্দাটায় বসে থাকতাম, আর মেঘ দেখতাম। এটা কি ধরণের বিষন্নতা? কেন? আমি একটা ব্যর্থ মানুষ ছিলাম বলে? কিন্তু, আমি নিজেকে ব্যর্থ বলে স্বীকার করিনি বলেই কি আমি সব ছেড়ে ছুড়ে চলে আসিনি? তাহলে কেন আমি নিজেকে ব্যর্থ ভাবছি? আমার নিজেকে খুব তুচ্ছ এবং গভীরতাহীন মনে হতো, এবং ত্রিলিনির সেরা গানগুলোও আমার স্পিরিটকে একটু জাগাতে পারতো না।

আমি জানি না.. আমি নিজেকে কিছু বোঝাতে পারিনি.. আমি বিষন্ন ছিলাম, এবং আমার বিষন্নতার রূপটা আমার স্ক্রীনে ছুড়ে ফেলতে ইচ্ছে করতো.. আমি পিসিটা খুলে লিখতে শুরু করতাম, অর্থহীন.. সম্পূর্ণ অর্থহীন লেখা.. সেগুলো কোন কবিতাও হতো না, কোন চেনা ভঙ্গীর লেখাও হতো না, কিন্তু আমি অনুভব করতাম সেগুলো আমার খুব ভেতর থেকে বের হয়ে আসছে, আর মাঝে মাঝে নিজেকে খুব শব্দমাতাল মনে হতো, যখন আমি ঝোঁকের উপর লিখতে থাকতাম ঘন্টার পর ঘন্টা ..

আমি কেন এসব ভাবছি?
আমি কি এগুলো নিয়ে যথেষ্ট ভাবিনি?

সবকিছু অনেক পাল্টে গেছে, আমি এখন আর আগের মতো করে চিন্তা করি না..
আমি হঠাৎ যেন ঘোর থেকে বের হয়ে আসলাম, আমার আগের জীবণ থেকে।

সন্ধ্যা হচ্ছে..
এখান থেকে সন্ধ্যা দেখতে খুব অদ্ভূত লাগে.. সূর্যটা একটু একটু করে আতলান্তিকে ডুবে যাচ্ছে.. আদিগন্ত সমুদ্রটা কিছু আলো শুষে নিচ্ছে.. কিছু আলো পানিতে লেগে আছে.. মেঘগুলো একটু সরে আছে আকাশের সাথে.. আমার পেছনে একটা মহাদেশ সূযার্স্ত দেখছে.. অন্তত এখানটায় দাড়িয়ে সেরকম লাগে..

আমাকে একটা ফোন করতে হবে..

৩.

সমুদ্রের মধ্য দিয়ে আমাদের ছোট্ট সাবমেরিনটা অনেক দ্রুত ছুটে চললো। আমরা অ্যান্তারতিকায় যাচ্ছি .. রাইটারবটগুলোর অনেক অনেকগুলো করে প্রসেসর থাকে, আর অনেক অনেক বড় ডাটা ব্যাংক। জিনিসগুলো খুব দ্রুত গরম হয়ে যায়, আর সেগুলো ঠান্ডা করতে প্রচুর খরচ পড়ে.. অ্যান্তারতিকা কয়েক শতক থেকে মোটামুটি মুক্ত একটা জায়গা, সব দেশগুলোই একটা টুকরো নিয়ে বলতে পারে এখন থেকে আমি এখানটায় থাকবো। তাই বেশিরভাগ রাইটারবট, পৃথিবীর সব বড় বড় ডাটা ব্যাংক, সবকিছু অ্যান্তারতিকার পাশের সমুদ্রের গভীরে, প্রচন্ড ঠান্ডায়। আমি এর আগে কখনো সাবমেরিনে চড়িনি। প্রথম কিছুক্ষণ খুবই অসাধারণ লাগলো আমার, একটা নীল সমুদ্র , উপর থেকে আলো এসে পানিতে পড়ছে, সেই পানির মধ্য দিয়ে আলোগুলো অনেকবার প্রতিসরিত হয়ে সবকিছু আলোতে ভরানোর চেষ্টা করছে, ছোট ছোট মাছের ঝাঁক ঘুরে বেড়াচ্ছে.. কিন্তু যতই সাবমেরিনটা নিচে নামতে থাকলো সবকিছু ঘোলা হয়ে যেতে থাকলো.. তারপর একটা সময় সব অন্ধকার হয়ে গেলো, আমি তখন একটু হতাশ হলাম। আমার ছোট্ট গোল জানালাটা থেকে আমার মুখ ফিরিয়ে নিলাম, আর কল্পনা করার চেষ্টা করলাম ব্যাপারটা কিরকম হবে..

আমি জানি না আমি ক্লিলিকে কি জিজ্ঞেস করবো..
আমি সত্যিই জানি না।

আমি আমার সবকিছুই এরকম অপ্রস্তুত অবস্থায় করি, আর আমার কেন জানি মনে হয়, আমার কাজগুলোতে তখন কোন খাঁদ থাকে না, এবং তখন জিনিসগুলো অনেক স্বত:স্ফূর্তভাবে আসতে থাকে। কিন্তু , ক্লিলির সাৎক্ষাকাতকারটাও ?

ক্লিলির ডকে যখন আমাদের সাবমেরিনটা এসে ঢুকলো, একটা বেঁটে মোটাসোটা এবং আটোসাঁটো জামা পড়া লোক আমাকে স্বাগত জানালো, মুখে হাসি নিয়ে। ওর মাথার চুলগুলো পিছন দিকে ঠেলে আঁচড়ানো, আর মুখে একটা জাঁদরেল ভাব আছে, হাসিটুকু ঠিক মাপা। আরেকটু বেশি হাসলে হয়তো তাকে খুব ব্যাক্তিত্বহীন মনে হতো, আর আরেকটু কম হাসলে গম্ভীর লাগতো।

আমাকে বসানো হলো একটা ছোট্ট সাজানো ঘরে।
আমাকে কিভাবে ক্লিলির সামনে নেবে? ওর হলোগ্রাফিক ইমেজ দিয়ে? কিন্তু ক্লিলির কি হলোগ্রাফিক ইমেজ আছে? ক্লিলি কিভাবে কথা বলবে? ছেলের গলায়, না মেয়ের গলায়? আমি এসব ভাবতে ভাবতে খুব অবাক হলাম, যখন আমাকে একটা স্ক্রিনের সামনে বসিয়ে দিলো, আর সামনো খোলা ছিল একটা চ্যাট উইন্ডো, আর একটা কালো কি-বোর্ড।

স্বাভাবিক ব্যাপার, ক্লিলি যখন একটা রাইটারবট, নিশ্চই ওরা লেখা ছাড়া আর কিছু নিয়ে মাথা ঘামাবে না ওর ডিজাইন করার সময়। এবং ক্লিলি নিশ্চই সবচে চমৎকারভাবে কথা বলতে পারবে যখন ওর লেখা লাগবে।

আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ কিবোর্ডে হাত দিয়ে বসে থাকলাম, কি লিখবো?
স্ক্রিনে হঠাৎ লেখা ভাসলো

- হ্যালো! : )

প্রাচীন মানুষরা এভাবে কথা বলতো.. এটা হচ্ছে একটা প্রাচীন পদ্ধতি কথা শুরু করার জন্য। আমি কিছু লেখার আগেই আবার ক্লিলি কথা বলতে শুরু করলো।

- তোমার সাথে পরিচিত হয়ে আমি খুব খুশি মিস্টার কিওভস্কি। তোমার নিউজ ফিড পড়তে আমার খুব ভালো লাগে।

শেষ শব্দগুলো আমার কানে বাধলো, একটা মেশিনের কি ভাবে ভালো লাগে ? একটা মেশিনের ভালো লাগার অনুভূতিটা কেমন ? আমি প্রাচীন মানুষ নই, আমি কোন সম্বোধনে সময় নষ্ট করি না।
- তোমার ভালো লাগার অনুভূতিটা কেমন ?

স্ক্রিনটা আটকে থাকলো সাদা শূণ্যতায়, কিছুক্ষণের জন্য। যদিও আমার মনে হচ্ছিল না আমি খুব বাজে প্রশ্ন করেছি। কিন্তু যখন জবাব আসলো না বেশ কিছুক্ষণের জন্য, আমি একটু অস্থির হয়ে পড়লাম, বোধ হয় আমি ঠিক প্রশ্নটা করিনি। এলিট রাইটারবটদের একজনকে অনুভূতি নিয়ে প্রশ্ন করা কি উচিত ? বিশেষ করে যখন তারা খুব অনুভূতিময়ভাবে লিখতে পারে?
- হি হি হি! তুমি আমাকে বলতে পারো কিওভস্কি, তুমি আমাকে ঠিক কি ভাবো?
- উমম.. একজন লেখক ?
- অবশ্যই তা নয়, তুমি প্রশ্নটা করার সময় আমাকে একটা মেশিন ভাবছিলে।
- উমম.. কিন্তু তুমি তো আসলেই একটা মেশিন, তাই না?
- আমি আসলে সেই অর্থে বলিনি, আমি বলেছি তুমি আমাকে 'মেশিন' ভাবছিলে। কারখানার ফুড প্যাকেজিং এ যে ধরণের মেশিনগুলো চব্বিশ ঘন্টা কাজ করে, সেরকম মেশিন। : )
- কিন্তু অবশ্যই তুমি মানুষ নও, এবং অবশ্যই তোমার ভালো লাগাগুলো ঠিক মানুষদের মতো নয়।
- তুমি কেন এত নিশ্চিত ভাবে বলছো ? তুমি মানুষ বলে ?

আমি কিছুক্ষণ থমকে থাকলাম, আমি আসলে ক্লিলিকে অপমান করতে চাইনি। কিন্তু শব্দগুলো সব একসাথে ঘোট লেগে গেছে..
- আমি তোমাকে অপমান করতে চাইনি। আমি শুধু অবাক হচ্ছিলাম, কিভাবে একটা রাইটারবট অনুভব করে। কিভাবে রাইটারবটরা আসলেই অনুভব করে যে জিনিসগুলো তারা বই এর পাতায় লিখে, আর যেই লেখাগুলো মানুষকে বিশুদ্ধ সাহিত্য থেকে পুরোদস্তুর তাড়িয়ে দিয়েছে শেষ কয়েক শতকে, তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে তাদের সীমাবদ্ধতাগুলো দেখিয়ে। আমি শুধু কৌতুহলী ছিলাম, আমি ...
- খিক খিক খিক! তুমি কিভাবে অনুভব করো কিওভস্কি?

আমি আবার থমকে গেলাম। আমি কিভাবে অনুভব করি?
আমি অনুভব করি যে আমার অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে। আমি মেঘের দিকে এখনো তাকিয়ে থাকি প্রত্যেক ভোরে এবং আমি এখন আর সেভাবে অনুভব করতে পারি না, আমার বিশের বয়সে আমি যেভাবে পারতাম। আমি ঠুনকো সৌন্দর্য খোঁজার চেষ্টা করি আমার কল্পনায়, কিন্তু সবকিছু কেমন সাজানো আর কৃত্রিম হয়ে যায় একটা পর্যায়ে। তখন আমি জোর করে চেষ্টা করি অনুভব করার জন্য। তারপর হঠাৎ মাঝে মাঝে অনুভূতিগুলো ঝরনার মতো এসে আমাকে ভিজিয়ে দেয়.. আমি ভিজে চিটচিটে হয়ে বসে থাকি, ভালোলাগা আর দু:খ নিয়ে.. কিন্তু.. আমি আসলে কিভাবে অনুভব করি?
- আমি জানি না ..
- তুমি একটা মানুষ! কাম অন! বলো আমাকে তুমি কিভাবে অনুভব করো?
- আমি আসলেই জানি না.. আমার মনে হয় অনুভূতিগুলো সহজাত, অনেকটা খাবারের গন্ধ আর স্বাদের মতো।
- ব্যাপারটা কি আসলেই তাই ? একই ঘটনা সবার মধ্যে একই অনুভূতি আনে না।
- হয়তো জিনিসগুলো নির্ভর করে মানুষটার আগের অভিজ্ঞতার উপর, আগের চিন্তাভাবনার উপর.. ধরো, কেউ যদি প্রচন্ড মিষ্টি একটা জিনিস খায়, তারপর সেটার চেয়ে কম মিষ্টি আরেকটা জিনিসের স্বাদ সে কিছুতেই পাবে না।
- তুমি রূপান্তর করছো। তুমি কি আসল প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছো না?
- নাহ! আমি চাচ্ছিলাম সমান্তরাল উপমা দিতে, যাতে আমার চিন্তাগুলো আমি তোমাকে বোঝাতে পারি। আমি আসলে জানি না কিভাবে সোজাসুজি এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া যায়।
- আমি তোমার সাথে কথা বলে মজা পাচ্ছি কিওভস্কি। তুমি আমাকে একটা প্রশ্ন করেছো, যে প্রশ্নের 'সরাসরি' উত্তর তুমি নিজেও জানো না, এবং তুমি আশা করো যে আমি - একটা 'মেশিন' তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারবো কিভাবে আমি অনুভব করি। তোমার মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। ইন্টারেস্টিং।


কিন্তু আমি ব্যাপারটার মধ্যে কোন কিছু ইন্টারেস্টিং পেলাম না, নিজেকে খুব বোকা মনে হচ্ছিল। আমি তো কথাই বলতে পারছি না ক্লিলির সাথে, সাৎক্ষাতকার নেবো কি? আমার খুব পিছিয়ে বসতে ইচ্ছে করলো.. আমি এখানটায় কয়েকদিন থাকবো, আজকে ছুটি নিলে হয় না? কিন্তু.. কথা শুরু না করতেই আমি কিভাবে বলি আমি খুব ক্লান্ত, আমায় ছুটি দাও?

চলবে ..]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28858812 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28858812 2008-10-23 23:03:06
ক্লিলি - ১ - ড্রাফট
এটা বড়জোর একটা বড় গল্প হবে.. আমি হয় বেশিরভাগ দিন লেখার সময় পাচ্ছি না, নইলে মুড থাকছে না লেখাটা শেষ করার ।


১.

আমি ঘুম ভেঙে উঠলাম যখন, তখন দিনের অর্ধেকটুকু শেষ হয়ে গেছে। আমি আমার বারান্দাটায় এসে বসলাম, আমার খুব মেঘ দেখতে ইচ্ছে করছে, শেষ রাতে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি মেঘদের নিয়ে.. অনেক অনেক মেঘ আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল মৃদু আলোয় ভরা একটা ভোরের শুরুতে। তারপর সেখানটায় সূর্য এসে লাল টকটকে আলো ছড়িয়ে দিলো, তারপর আকাশটুকু গাঢ় নীল হয়ে গেলো ইতস্তত মেঘগুলোকে নিয়ে - হাল্কা কুয়াশায় ঢাকা আতলান্তিকের মতো।

আমি বারান্দায় এসে বসলাম, আমার সস্তা কফি মেশিনে বানানো কাপাচিনো নিয়ে, আমার ৬৩৩ তালার অ্যাপার্টমেন্টের বিশাল বারান্দাটায়। বারান্দার কাঁচের ফাঁক দিয়ে মেঘগুলোকে দেখা যায়, ভেসে যেতে .. বিশাল মহাদেশটার উপর দিয়ে, আতলান্তিকের উপর দিয়ে.. আমার বারান্দাটার একপাশে আতলান্তিক আর অন্য পাশটায় আফ্রিকার সৈকত। আমার খুব ভালো লাগে এখানটায় বসে থাকতে, মেঘদের খুব কাছাকাছি। মাঝে মাঝে ভাবতে অবাক লাগে আমি কিভাবে এতগুলো বছর পার করে দিলাম, মেঘ আর আকাশ দেখতে দেখতে। কিন্তু আমার এটা করতেই ভালো লাগে। আমার বয়স যখন আরো কম ছিলো, আমি আমার কিবোর্ডের রং তুলে ফেলেছিলাম, মেঘ আর আকাশ নিয়ে কবিতা লিখতে লিখতে.. কিন্তু সেগুলো খুব অসাধারণ কিছু হয়নি আর কেউ কখনো সেগুলো পড়েনি। কিন্তু .. আমি ভালোবাসি আকাশ আর মেঘ। সাতান্নর শেষে এসেও প্রতিদিন ঘুম ভেঙে আমি বারান্দায় এসে বসে থাকি।

আমার দিনটা অলস হয়ে শুরু হলো কফির মগে চুমুক দিতে দিতে আর রোদে ঝলসানো শ্বেত মেঘগুলোকে দেখতে দেখতে। মেঘদের দিনের একেকটা সময় দেখতে একেকরকম লাগে। সন্ধ্যায় তাদের গায়ে বিষন্নতা ছড়িয়ে পড়ে, আকাশের শেষ মাথায় তারা জলরঙ হয়ে যায়, আকাশের গায়ে লেপ্টে থাকে একটা বিশাল জলরঙের অংশ হয়ে। ভোর বেলায় সূর্য ওঠার সময় ওরা সূর্যের সব রং গায়ে মেখে নেয়, কমলা হয়ে। আবার মাঝে মাঝে বিকেলবেলায় সবাই একসাথে সোনালি হয়ে যায়। কখনো কখনো ওরা মন খারাপ করে কালো হয়ে যায়, আর আকাশ ছেড়ে মাটির দিকে নেমে যায়.. আর ঠিক দিনের মধ্যভাগ শেষ হবার সময় তারা ধীর হয়ে উড়ে যেতে থাকা আকাশ দিয়ে ধবধবে সাদা হয়ে। চোখ ঝলসানো শুভ্রতা নিয়ে।

বিপ বিপ করে আমার বাসার ফোনটা বাজতে শুরু করলো। আমার কফি খাওয়া শেষ হয়নি এখনো, আর আমার খুব অলস লাগছে ফোনটা ধরতে। আমাকে সাধারণত কেউ ফোন করে না, নিশ্চই রঙ নাম্বার। আমি ফোনটা ধরতে উঠলাম না। বসে বসে কফি শেষ করলাম, মেঘদের আতলান্তিকের উপর দিয়ে ভেসে যেতে দেখতে দেখতে।

ফোনটা আবার বাজতে শুরু করলো..
- হ্যালো?
- ইস্কান্দ্রিওর কিওভস্কি?
- হ্যা, আমি কিওভস্কি বলছি।
- আমি অ্যাপার্টমেন্টের পার্সেল অফিস থেকে ফোন করছি, আপনার নামে একটা পার্সেল এসছে।

আমি খুব অবাক হলাম শুনে, আমি আমার বিল্ডিং এর বাইরে শেষ তিরিশ বছর পা দেইনি। আমার খুব বেশি বন্ধু নেই, যারা আছে তারা কেউ আমার আসল নাম জানে না। আমি একটা নিউজ ফিডে লেখালেখি করি একটা বিশুদ্ধ অচেনা নাম নিয়ে, এবং সম্পাদক ছাড়া কেউ আমার আসল নাম জানেও না। সেখান থেকে যে সামান্য ইউনিট পাই, আমার দিনগুলো চলে যায় , কোন রকম শব্দ ছাড়া। আমার কাছে একটা পার্সেল আসা খুবই অদ্ভূত ব্যাপার।

- হ্যালো? মিস্টার কিওভস্কি?
- আহহ.. আমার মনে হয় আপনি ভুল করছেন, আপনি কি নিশ্চিত এটা আমার পার্সেল? এই বিল্ডিং এ একই নামের আর কেউ নেই?
- উমম.. পার্সেলের উপর পরিষ্কার লেখা আছে মিস্টার ইস্কান্দিওর কিওভস্কি, ফ্ল্যাট ২৩২, ফ্লোর ৬৩৩।
- ওহ!
- আপনি কি অনুগ্রহ করে ১২৭ তলার পার্সেল অফিসে একটু আসবেন? পার্সেলটার উপরে আর্জেন্ট লেখা আছে।
- আচ্ছা, আমি এখুনি আসছি!

আমি লিফটে করে নামলাম, পার্সেল অফিসের হাসিখুশি রিসিপশনিস্ট আমাকে আমার পার্সেলটা ধরিয়ে দিলো। একটা খয়েরি খাম। উপরে আইবিএম এর সিল। নিচে আসলেই বড় বড় করে আমার নাম লেখা, আশ্চর্য! আমি আবার লিফটে করে উপরে উঠে আসলাম, বাসায় না গিয়ে টপ ফ্লোরের অবসারভটরিতে। একটা বেন্চে বসে খামের একটা পাশ ছিড়লাম, ভেতর থেকে খুব দামি একটা কাগজ বের হলো,

প্রিয় মিস্টার কিওভস্কি,
আমরা আনন্দের সাথে জানাচ্ছি, আপনাকে পৃথিবীর সেরা মানুষ লেখকদের মধ্য থেকে নির্বাচিত করা হয়েছে ক্লিলির সাৎক্ষাতকার নেবার একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতার জন্য। আই বি এম আপনার যাতায়াতের সকল দ্বায়িত্ব বহন করবে, এবং আপনার জন্য থাকবে উপযুক্ত সম্মানী।
অনুগ্রহ করে শিডিউল কনফার্মেশনের জন্য যোগাযোগ করুন XLOPIXAN8700011279 এই নাম্বারে।

একান্তই,
জর্জ শার্টলবার্গ
চিফ অফিসার,
মিডিয়া উইং, আই বি এম।

আমার গা শিউড়ে উঠলো, আমি এধরণের কিছু কখনোই আশা করিনি। ক্লিলি হচ্ছে আমার সবচে' প্রিয় রাইটারবট, ওর লেখা উপন্যাসগুলো অসাধারণ, মানুষের খুব কাছাকাছি কিন্তু অনেক বেশি বিস্তৃত, এবং অনেক বেশি গভীর। কিন্তু, আমি মোটেও পৃথিবীর সেরা মানুষ লেখক নই, সত্যি কথা হচ্ছে মানুষ লেখকদের এখন খুব বেশি দাম নেই পৃথিবীতে। কারণ তাদের সীমাবদ্ধতা। অনেক মানুষ তারপরও লেখে, কিন্তু বিশুদ্ধ সাহিত্য কেউ তেমন লেখে না। রাইটারবটদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামার সাহস কার আছে? আমি খুব একটা ভালো লিখি না, কিন্তু ওরা বলে, আমার লেখা পড়লে বোঝা যায় এটা একটা মানুষ লিখেছে। আমি জানি না এটা কেমন প্রশংসা, কারণ এখনকার পৃথিবীতে সবচে' অসাধারণ তাদেরকেই গণ্য করা হয় যারা রাইটারবটদের স্টাইলে লিখতে পারে। কারণ সেটাই সবচে' এলিগ্যান্ট। তুমি লেখালেখি করতে চাও, পৃথিবীর সবচে' দামি কোন ভার্সিটিতে চলে যাও, রাইটারবটদের বিশুদ্ধ সাহিত্যের উপর পড়াশুনা করো, ওদের কৌশলগুলো শিখে নাও, তারপর কাজে নেমে যাও - তাহলে তুমি সফল হবেই। এটা এখনকার সবচে' সহজ ফরমুলা। কিন্তু আমার কেন জানি এই জিনিসটা ভালো লাগে না, সবকিছু মোটামুটি একই স্ট্যান্ডার্ডের প্যাটার্ন হয়ে যায়, সব লেখাগুলো প্রচন্ড ঝকমকে, চোখ ঝলসানো.. কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয় মলিন, ধূসরতার মধ্যে সৌন্দর্য আছে, এবং সেই সৌন্দর্যটা অনেক বেশি আপন, অনেক বেশি কাছের। এই অদ্ভূত ধারণার কারণে আমার জীবণটা ধুপ করে ধসে পড়েছিল যখন আমার বয়স বিশের কোঠায়। আমি বিশুদ্ধ সাহিত্য লিখতে চেয়েছিলাম আমার মত করে, এবং সেটা খুব বাজে ভাবে ফিরিয়ে দিয়েছিল সব পাবলিশিং মিডিয়া, আমি যাদেরকে চিনতাম, যাদেরকে আমার কাজ পড়তে দিয়েছিলাম, কেউই সেটা পছন্দ করেনি, সবাই খুব তুচ্ছতা নিয়ে আমাকে বলেছিল, সবাইকে দিয়ে আসলে লেখালেখি হয় না। আমার লেখাগুলো সাধারণ, ম্যাটম্যাটে - আমার অনুভূতিগুলো খুব গৌণ, সেখানটা উচ্চতা নেই, সেখানটায় থ্রিল নেই। এবং আমি যাদের সাথে তখন কাজ করতাম সবাই হাসাহাসি করতো ব্যাপারটা নিয়ে - একটা মানুষ ? বিশুদ্ধ সাহিত্য লেখার চেষ্টা করছে? হাস্যকর! কয়েকশ বই পড়া একটা মানুষ কিভাবে ভাবতে পারে সে একটা রাইটারবটের চেয়ে ভালো লিখবে, যারা প্রতিদিন কয়েক বিলিয়ন পৃষ্ঠা পড়ে?

আমি আসলে রাইটারবটদের চেয়ে ভালো লিখতে চাইনি, আমি আমার মতো করে লিখতে চেয়েছিলাম, কারণ আমার লিখতে খুব ভালো লাগতো, আমার খুব ভালো লাগতো একা একা মেঘ দেখতে, পৃথিবীর সীমানায় সূর্যের আবির্ভাব দেখতে, সূর্যের চলে যাওয়া দেখতে। ২৭৬৭ সালের শীতে আমার হাতে দুটো অপশন ছিলো, এক. বিশুদ্ধ সাহিত্য লেখার চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে আর সবার মতো সাধারণ একজন নিউজ ফিড রাইটার হওয়া, যেটা ছিল সবচে' বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত, দুই. সবাইকে ছেড়ে দিয়ে একলা হয়ে যাওয়া, এবং আমার নিজের সবচে' বড় ফ্যান হওয়া, কারণ কেউ কখনো আমার লেখা পছন্দ করবে না।

আমি আমার নিউজ ফিডের চাকরিটা ছেড়ে দিলাম । কিছুদিন সবকিছু থেকে ছুটি নিয়ে ঘুরে বেলাম পুরো পৃথিবীতে। লাটিন আমেরিকার অরণ্যের নিস্তব্ধতায় বসে থাকলাম কয়েক দিন, সবুজ মেক্সিকো বেতে একা একা সাতার কাটলাম, অনেকগুলো ক্রেডিট খরচ করে অ্যান্তারতিকায় একটা টুর নিলাম, কয়েকদিন হেঁটে বেড়ালাম ঠান্ডা বরফের উপর দিয়ে। টুরটা অদ্ভূত ছিলো, আমি খুব অন্যমনষ্ক আর বিষন্ন ছিলাম, আমার ব্যর্থতা নিয়ে। কারণ আমার ধারণা ছিল আমার উপন্যাসটা মৌলিক ছিল, এবং সেটা ছিল আমার করা সেরা কাজ। আমি এত অন্যমনষ্ক ছিলাম, যে আমি শুনিনি আমাদের গাইডটা কি বলছিল, আমি শুনিনি আমরা কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি .. আমি শুধু জানতাম আমি পিছল বরফের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, এবং আমার চারপাশটুকু ভীষণ ঠান্ডা .. এবং ভীষণ নিস্তব্ধ।

এবং আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম, আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম, এবং আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম না আমি আসলে কি করবো, কারণ আমি যদি আসলেই বিশুদ্ধ সাহিত্য লিখতে চাই, খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার হবে আমি অসম্ভব ব্যর্থ একজন মানুষ হবো, আমি পৃথিবী থেকে মুছে যাবো মারা যাবার সাথে সাথে, এবং কেউ কখনো জানবে না আমি কিছু করতে চেয়েছিলাম - এটা খুব স্পষ্ট ছিল যে আমি ব্যর্থ হবো - কারণ সত্যিকারের পৃথিবী আসলে ঠিক কোন রোমান্টিক রূপকথা না। রূপকথাদের কখনো বইয়ের পাতা থেকে টেনে বাইরে বের করা যায় না। আমি শ্রান্ত পায়ে সাহারার উপর দিয়ে হেঁটে যেতে থাকলাম, আকাশের সহস্র তারা দেখতে দেখতে, এবং আমি জানতাম না আমি আর কত বছর হেঁটে যাবো এভাবে, এবং আমি জানতাম না আমি আসলে কি করবো.. রাতের বেলা মরুভূমির সবকিছু প্রচন্ড ঠান্ডা হয়ে যায়, আমি আমার স্লিপিং ব্যাগে শুয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলাম, আমার নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল তারাদের দেখতে দেখতে, খুব ক্ষুদ্র আর খুব অনুজ্জ্বল.. আমার খুব ইচ্ছে করলো প্রাচীন গল্পের মতো করে একটা মিষ্টি মেয়েকে খুঁজে বের করতে, প্রাচীন গল্পগুলো বলতো, মানুষ যখন খুব হারিয়ে যায় তখন মাঝে মাঝে সে একটা মেয়েকে খুঁজে পায়, যে তার অর্থহীন প্রহরগুলোকে অসাধারণ করে তোলে, বিষন্নতাকে ভালোলাগায় আর প্রতিটা মুহূর্তকে অবর্ণনীয় সুন্দর করে তুলতে পারে। কিন্তু .. শেষ পর্যন্ত আমার কেন যেন আর কারো সাথে নিজেকে জড়াতে ইচ্ছে করলো না। আমি আফ্রিকার একটা হাইরাইজ অ্যাপার্টমেন্টের অনেক উঁচুতে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকতে শুরু করলাম, একটা নিউজ ফিডে একটা ভিন্ন নামে লিখতে শুরু করলাম। কেউ জানতো না আমি কে - এটার সুবিধা ছিল আমি আমার মতো করে লিখতে পারতাম, আমাকে ভাবতে হতো না কে কি ভাবছে । লেখাটা আমার জন্য সহজাত ছিল, নূন্যতম ক্রেডিট উপার্জন করতে আমার খুব কষ্ট হলো না।

চলবে ..
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28858326 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28858326 2008-10-22 22:14:30
ব্ল্যাক কফি, পুল টেবিল
পুল ক্লাবটা দারুণ লাগে হারিয়ে যাবার জন্য। প্রচন্ড হাই ভলিউমে আধা হিন্দি আধা ইংরেজি গান বাজতে থাকে... হাতে কিউ স্টিক, তুমি সব ভুলে একটা লাল বলকে গুতো মারতে পারো প্রচন্ড জোর দিয়ে। তারপর বলটা একটুর জন্য পকেটে পড়বে না আর দিশেহারা হয়ে পকেট খুঁজতে থাকবে পুরো টেবিল এ গোত্তা খেতে খেতে.. তখন লাল বলটার জন্য মায়া হয় না.. কিন্তু বাসায় বসে লাল বলটাকে মানুষ মনে হয়।

আজকে সাইক্রিয়াটিস্ট এর কাছে প্রথম সিটিং ছিল।
মহিলা চোখে এক ধরণের প্রফেশনাল দু:খ নিয়ে আমার কথা শুনলো, একটা সময় আমি যখন সেটা খেয়াল করলাম, আমি হাসি থামাতে পারলাম না.. আমি খিক খিক করে অন্য দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম।

তবে যখন সে বলল যে সে ক্লিনিকাল সাইক্রিয়াটিস্ট, আমার মাথায় কেন জানি ক্লিনিকাল ডিপ্রেশন এর কথা ঘুরলো, আর আমি এমন সব কথা বলে ফেললাম, যেটা যে কাউকে বললে আমি প্রচন্ড জোরে চড় খাবো.. মহিলার চোখ থেকে প্রফেশনালিজম হারালো.. আমাকে জিজ্ঞেস করলো, এখন তোমার কি মনে হয়? আমি পজিটিভ কিছু বললাম..

আপুর কথা বলতে গিয়ে আমি হঠাৎ করে বলে ফেললাম.. আপুকে আমি চিঠি লিখতাম.. অন্যমনষ্ক হয়ে বললাম, কিন্তু চিঠিতে খুব বেশি শব্দ আঁটানো যায় না.. বলে কি মনে হলো, আরেকবার বললাম, চিঠিতে খুব বেশি শব্দ আঁটে না..

কখনো কি তুমি এমন কিছু করতে পারো, অনেক অনেক অনুভূতিকে অল্প কিছু শব্দে আটকে ফেলতে? মানে, অল্প কিছু শব্দে অনুভূতির ঘনত্ব বাড়িয়ে দিতে ? হয়তো একটা ছোট্ট বাক্য .. হয়তো দুটো ছোট্ট বাক্য .. কবিরা কি আসলেই পারে ? নাকি ওদের প্রফেশনালিজম ঘনত্ব বাড়িয়ে অনুভূতিগুলো দূবোর্ধ্য করে দেয়? ভয়ংকর তিতা ব্ল্যাক কফি? কিংবা জিভ পুড়িয়ে দেবার মতো অলংকারের উষ্ণতা ? কিংবা উদ্ধত প্রকাশ, যেটা তোমাকে নাড়া দিবে হীণমন্যতা দিয়ে, কারণ সেটায় উচ্চ মার্গ ছড়ানো..

মার্গ মানে রাস্তা.. আমি দিল্লীতে যাবার আগে জানতাম না.. চাণক্যপুরীতে অনেকগুলো মার্গ আছে, ন্যায় মার্গে ইন্টারন্যাশন্যাল ইউথ হোস্টেল.. থাকার জন্য সবচে' ভালো জায়গা.. নিশ্চুপ একটা জায়গা..

বোধ হয় একটা জীবন খুব দ্রুত কাটিয়ে দেয়া যায়, শব্দ নাড়তে নাড়তে..
শব্দরা খুব শক্তিশালী.. শব্দরা মানুষকে বাধ্য করতে পারে কাউকে ভালোবাসতে, শব্দরা বাধ্য করতে পারে কাউকে ঘৃণা করতে.. শব্দরা তোমাকে আমার চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখাতে পারে, শব্দরা তোমাকে কাঁদাতে পারে, তোমাকে হাসাতে পারে.. তোমাকে আকাশে ছুঁড়ে মারতে পারে সব স্বপ্ন তোমার বুকের পকেটে ঢুকিয়ে, তোমাকে প্রচন্ড দ্রুত মাটিতে নামিয়ে আনতে পারে.. টুকরো টুকরো করে তোমাকে ভেঙে ফেলতে পারে, আঠা লাগিয়ে তোমাকে জুড়ে দিতে পারে..

শব্দরা তোমাকে অর্থ খুঁজে দিতে পারে জীবণের, শব্দরা তোমার কাছ থেকে শব্দগুলোর অর্থ কেড়ে নিতে পারে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28807507 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28807507 2008-06-08 19:01:32
চার ছক্কার বাউন্ডারি.. - টিভিতে চ্যানেল পাল্টানোর সময় হঠাৎ করে কানে আসলো..

কদিন খুব এলোমেলো কাটলো.. আমি ধূসর হয়ে ঘুরে বেরালাম, ক্লাস করলাম, বন্ধুদের সাথে ঝগড়া করলাম, হেড়ে গলায় গান গাইলাম, গান শুনে আশেপাশে বসা কাপলগুলো ভয়ে ভয়ে দূরে সরে গেল। আমি বসে বসে গাছ দেখলাম, ইদানিং গাছ দেখতে কেন জানি খুব মজা লাগতেসে..

প্রতিদিন বাসায় ফিরছি খুব ক্লান্ত হয়ে, কালকে আরেক কান্ড। আমার বাসটা ধাম করে সামনের প্রাইভেট কারে ধাক্কা মারলো.. ট্রাফিক সিগনালে, একটু পরে কনস্টেবল টনস্টেবল এসে বিশাল কাহিনী! যার গাড়ি, তিনি যেহেতু দেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক, আর আমাদের বাংলাদেশের ড্রাইভাররা যেহেতু কখনোই বিশ্বাসযোগ্য নয়, তাই হাতে ওয়্যারলেস ওয়ালা পুলিশটা আমাদের ড্রাইভারকে ধরে নিয়ে গেল আর বাসটাকে অ্যারেস্ট করে রাস্তার পাশে দাড় করে দিলো.. বাসের যাত্রিরা কিছুক্ষণ বিপ্লবী কথাবার্তা বললো, কিন্তু পুলিশ তো পুলিশ। আমি রাস্তার পাশে (বিজয় স্মরণী, চন্দ্রিমার ঠিক পাশের রাস্তাটায়) দাঁড়িয়ে থাকলাম, কারণ এর মধ্যে যা কান্ড ঘটার ঘটে গেসে.. আমার সব টাকা দিয়ে বাসের টিকেটটা কেনা হইসিলো, আমার পকেটে বাকি আর এক টাকা.. (আমার একশ টাকা এটিএম বুথে আটকে গেসিলো, আর বের হয় নাই! <img src=" style="border:0;" /> আর আমার ব্যাংক একাউন্টে আর তোলার মত একটা টাকাও নেই!) তারপর কি হলো? সে আরেক গল্প!

অভি কলকাতা চলে যাচ্ছে বিশ তারিখ। কালকে ওকে দেখতে গেলাম.. আমরা দুজন গলা জড়াজড়ি করে অনেকগুলো ছবি তুললাম.. পুরো ফায়ার সার্ভিসটাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে.. আমাদের জীবণের প্রথম দশটা বছর একসাথে কেটেছিলো.. তারপর কয়েক বছর এবং তারপরে আরো অনেক বছর কোন যোগাযোগ ছিল না.. আমরা যখন বিকট ভাব নিয়ে ছবি তুলছিলাম, তখন ইতি আপু ওদের বারান্দা দিয়ে আমাকে ডাকাডাকি করতে শুরু করলো, আমি খুব অবাক হয়ে ওদের বাসায় গেলাম.. ওরা যে বাসাটায় থাকে সেটা আমাদের আগের বাসা ছিল.. সোফায় বসে আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম.. আমার পায়ের নিচে আপুর বিয়ের আল্পনা.. এখনো মোছেনি.. বিশ্বাস করতে আমার বেশ সময় লাগলো.. তারপর আমার চোখে এক ধরণের নস্টালজিয়া ছড়িয়ে পড়লো, আমি উঠে দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখলাম, আর মনে হলো, এটা আমার লিভিং রুম ছিল, এখানটায় একটা কার্পেট ছিল, এখানটায় ছোটভাইয়া কুংফু প্র্যাকটিস করতো.. এখানটায় আমাদের সোফা ছিল.. আমি ওদের কাছে বলে, পুরো বাসাটা ঘুরে দেখলাম... বাসাটা ছোট থাকতে যত বড় মনে হতো, ততটা বড় আর লাগছিল না.. কিন্তু তারপরও কেমন যেন.. বারান্দা দেখে মনে হলো, এখানটায় ময়নার খাঁচা ছিল, এর পাশে ছিল আমাদের ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প আঁকা.. নিচের খালি জায়গাটায় একতালার চাচুদের (সাধু ভাইদের) গরু বিরিয়ানি খেয়ে মারা গিয়েছিল! (সত্যি সত্যি!) আমাদের বিল্ডিং এর পেছনে একটা দোতালা বাড়ি ছিল, এখন সেখানে অনেক অনেক বড় একটা অ্যাপার্টমেন্ট। অভিরা এখন থাকে তমুদের বাসায়। উফফ.. সেই একই বারান্দা.. যেটায় বসে আমি রুশ রূপকথার মোটা বইটা পড়তাম, চাচি আমাকে বাসায় নিতে দিতো না বইটা.. চেকনাই ঘোড়া সামনে এসে দাড়াতো, পৃথিবীতে আলো কমে আসতো.. আর দুম করে আজান দিয়ে দিতো.. আমি মন খারাপ করে বইটা রেখে হেঁটে হেঁটে বাসায় চলে আসতাম..

অভিদের ছাদে অনেক্ষণ ছিলাম.. সূর্য অস্ত যাচ্ছিল গতি সেবা ত্যাগ এর টাওয়ারটার পেছনের আকাশে.. আমার মনে হচ্ছিল না যে বাসায় ফিরতে হবে.. মনে হচ্ছিল আই অ্যাম হোম!

ফায়ার সার্ভিসে ঢোকার পর থেকে আমার এরকম হচ্ছিল.. এই সেই গ্যারেজ যেখানে আমরা লুকোচুরি খেলতাম, আব্বুর জিপটা এখনো আছে.. একইরকম ভাঙাচুরা.. কিন্তু পাজেরোগুলোকে নতুন লাগছিল.. নতুন কেনা গাড়িগুলো খুব কিউট, ছোট্ট ছোট্ট! বাগানের পাশের জায়গাটা দেখে আমার একটা ছেলের কথা মনে পড়লো, আমাদের সামনে সে গাড়ি চাপা পড়েছিল ঘুড়ি ধরতে গিয়ে.. ওর পায়ের রানের ওপর দিয়ে গাড়িটা উঠে গেল... রক্ত.. চিৎকার.. আমরা ঠিক দুমিটার দূরে, আমরাও ঘুড়িটা ধরতে চেয়েছিলাম.. কিন্তু ছেলেটা আমাদের চেয়ে জোরে দৌড়াচ্ছিল.. ঘুড়িটা পড়ে থাকলো, কেউ ছুঁলো না.. ড্রাইভার সাসপেন্ড হলো.. ছেলেটা মারা গেল.. আমাদের ঘুড়ি ধরা বন্ধ হলো.. আর ছেলেটা ঘুড়ি হয়ে আকাশে উড়ে গেল.. ও যেহেতু বস্তিতে থাকতো, সবাই কিছু মাস পর ওকে ভুলে গেলো..

ফায়ার সার্ভিস হেডকোয়ার্রটারস এর ঠিক পিছে পুরনো ঢাকা.. বিকেলবেলা আকাশভর্তি করে ঘুড়ি উড়তো.. ঘুড়ি কাটতো.. অনেক অনেক ঘুড়ি এসে পড়তো আমাদের কম্পাউন্ডে.. আমরা বিকেলে এখান থেকে ওখানে ছুটতাম ঘুড়ি ধরার জন্য.. খাটের নিচে জমা হতে থাকতো লাল নীল সবুজ হলুদ সাদা ঘুড়ি.. মাঝে মাঝে সব বের করে গুনতাম আর অপেক্ষা করতাম কবে একশ হবে..

অভির ছাদে দাড়িয়ে আমি মুগ্ধ হয়ে একটা কাটা ঘুড়ির দুলতে দুলতে নেমে যাওয়া দেখলাম.. সুতো কেটে যাবার পর ঘুড়ি কেমন টাল হয়ে মাতালের মতো দুলতে দুলতে থাকে.. ছন্দ মেনে.. তারপর একটা বড় কার্ভ করে মাটিতে নেমে শুয়ে পড়ে.. আমি মুগ্ধ হয়ে ঘুড়ির শব্দ শুনলাম.. ঘুড়ির কাটাকুটি দেখলাম.. অস্ত যাওয়া সূর্যটার সামনের আকাশটায় অনেকগুলো বিন্দু হয়ে থাকা অনেক উঁচু ঘুড়ি দেখলাম..

ছোটবেলাটা এমন কেন? এমন অদ্ভূত কেন? মানে.. এমন এমন কেন? নাকি স্মৃতিগুলোই সব এমন এমন করে দেয়? আমি সারাক্ষণ এরকম করছিলাম, এখানটায় বাঁধনের সাথে আমার আড়ি হইসিলো.. এখানে সে আবার ভাব করসিলো.. এখানে জুসি আপু, তমু আর আমরা কুমির কুমির খেলতাম.. এই লম্বা নিম গাছটা ছোট ভাইয়ার লাগানো.. এখানে ছিল চার ছক্কার বাউন্ডারি..

একটা বিড়াল খুব আদর করে লেবু গাছটার সাথে গা ঘসছিলো.. আমার কেমন কেমন লাগলো.. এর গ্র্যান্ড গ্র্যান্ড গ্র্যান্ডপার সাথে হয়তো আমার হেভি খাতির ছিল.. অন্তত গায়ের রং একই.. আমি তখন স্কুলের টিফিন না খেয়ে বিস্তর কান্নাকাটি করা বিড়ালছানাগুলোর জন্য নিয়ে আসতাম, তারপর বাসায় ঢোকার আগেই ডট ডট ডট.. সমস্যা হতো চোখ না ফোটা বাচ্চাদের নিয়ে..

পাম্প হাউসটাতে মারুফ ভাইদের ব্যান্ডের জ্যামিং হতো.. সেখানটার নারিকেল গাছটা এখনো ঠায় দাঁড়ানো.. আম গাছটাও জীর্ণ হয়ে একই জায়গায়.. পাম্প হাউসটায় মস্ত তালা, আর টাওয়ারের পেছনে তুলসি বনটা উধাও.. পিছনের মাঠের কুয়োটা বুজে দেয়া হয়েছে.. একটা সাইনবোর্ড ঝুলছে সেখানে, 'বাগান দিয়ে যাতায়াত নিষিদ্ধ'.. যেই গ্যারেজে আমরা খেলতাম সেখানেও একটা সাইনবোর্ড 'বিনা অনুমতিতে গ্যারেজে ঢোকা নিষেধ'..

আমার জীবণের প্রথম দশটা বছর এর প্রায় সবকিছু এখানটায় ছিল.. আর তখন কোন সাইনবোর্ড ছিল না.. কম্পাউন্ডের ভেতর বিকালটায় ছিল স্বাধীনতা.. আমাদের নিষেধ ছিল বের হবার, কিন্তু তারপরও আমরা সামার ভ্যাকেশনগুলোতে লুকিয়ে রাস্তা পেরিয়ে পশু হাসপাতালের অসুস্থ ঘোড়াগুলোর পাশে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করতাম.. মাঝে মাঝে তীর ধনুক নিয়ে বিশাল ভাব মেরে পুরো কম্পাউন্ড ঘুরে বেরাতাম.. ছোট্ট প্লাস্টিকের বন্দুকটা দিয়ে চড়ুই শিকার করতাম.. তাক করে দুম করে ছোট্ট প্লাস্টিক গুলি ছুটে যেতো, আর চড়ুইরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উড়াল মারতো..

যত বড় হচ্ছি সব সাইনবোর্ডগুলো একটার পর একটা এসে সবকিছু একটা একটা করে কেড়ে নিচ্ছে..

উফফফ.. নাহ এখানটায় সমাপ্তি! আমি আধা ঘন্টা ধরে ডায়েরি লিখছি.. এখন ডায়েরি ফিলোসফিতে টার্ন মারছে! উফফফ.. আমার এখন কোঅর্ডিনেট জিওমেট্রি করতে হবে! ট্রান্সফরমেশন অফ কোঅর্ডিনেটস!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28788475 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28788475 2008-04-16 20:36:56
তারপর পৃথিবী
জাবি খুউব সুন্দর একটা জায়গা - অনেকগুলো লেক - শাপলা ফোটা ... ক্যাম্পাসটায় বুনো ভাব - শহর থেকে অনেক দূরে হবার সবচে' সুন্দর অংশ । ঠিক বুনো ভাব না - কেমন নিষ্পাপ - এবং অস্পর্শিত! ( অস্পর্শিত মানে যাকে কখনো স্পর্শ করা হয়নি! খিকজ! ) এপাশে ওপাশে বুনো - না বুনো ফুল - প্রচুর সবুজ গাছ - অসাধারণ! আমরা অনেক্ষণ আড্ডা মারলাম - ঘুরে বেরালাম ক্যাম্পাসটায় - সেজান দুমিনিট পর পর একবার করে বলল - সে যদি এই ভার্সিটিতে পড়তো, সে নির্ঘাত পড়াশুনা ছেড়ে কবি হয়ে যেতো.. হিহিহিহি!

আজকে অনেকদিন পর আমি আমার বন্ধুগুলোর সাথে দেখা করলাম, শেষ আমাদের দেখা হয়েছে পহেলা ফাল্গুণ - ১৩ই ফেব! এবং অনেকদিন পর দেখা হওয়ার পর যেটা হলো, আমরা সবাই আনপ্লাগড হয়ে গেলাম! খুব সম্ভবত এটা আমার কাছ থেকে ছড়িয়ে গেছে - আমার ভিতর পোকা ঢুকেছে আর আমি খুব বেশি স্বতস্ফূর্ত হয়ে গেছি! যেমন আমি যখন কথা বলা শুরু করলাম, আমার কথা কিছুতেই থামাতে পারলাম না - আর সবাই একটা সময় বিরক্ত হয়ে গেল ভীষণ! ওয়াসি আমাকে দুম দুম করে কিল মারলো! আর আমি ওকে ভেঙালাম! আমি কখনোই ওয়াসিকে বিয়ে করবো না! ওয়াসি আমাকে পেটাবে! সেজান শুনে হাসতে হাসতে কাত হয়ে বললো, তুই লিফলেট বিতরণ শুরু কর - ওয়াসি হইতে সাবধান, ওয়াসি বউ পেটাবে!

ওয়াসি কালকে সারারাত কোড লিখসে - আজকে ওর মাথা জ্যাম হয়ে ছিল - আমার কর্কশ(!) কন্ঠের গান শুনে - আর অনবরত বকর বকর শুনে ওর মাথা আরো জ্যাম হয়ে গেলো আর সে বেশ কয়েকবার আমাকে দুম দুম করে কিল মারলো! আমি খুব ব্যাথা পাইসি! আমি ওকে থ্রেট দিলাম, আমি তায়-কো-য়ান্দো শিখবো! শুনে সবাই হাসতে হাসতে আবার কাত হয়ে গেল!

দুপুরে খাবার সময় আমরা বটতলায় গেলাম। (বটগাছটা খুব বড় না, কিন্তু তারপরও ওটা বটতলা! <img src=" style="border:0;" /> ) মুরগী পোলাও খেলাম - কত পড়লো জানো? আমাদের পাঁচজনের বিল আসলো ১৬০ টাকা! ঢাকায় একজন খেলেই এরকম বিল আসতো! বটতলার পাশের জায়গাটা খুব সুন্দর .. বুনো ফুল ফোটা.. ভ্যালি ? না ভ্যালি বেশি হয়ে যায় .. আমরা অনেক সুন্দর জিনিস দেখলাম + শুনলাম ।

১. বসন্তের কোকিলের ডাক । আমি আর ওয়াসি অনেকক্ষণ কুহু কুহু করলাম, শিস দিয়ে - চলে আসার সময় মনে হল - ইশশ .. কোকিলটা তো আসবে না ।
২. আমরা মাথার উপর শিমুল ফুল দেখলাম - সারা গাছে কোন পাতা নেই, আর লাল টকটকে শিমুল ফুল - পুরো গাছ জুড়ে! আমি জানি না কেমন করে বর্ণনা দেয়া উচিত - কিন্তু জিনিসটা এমন ছিল - যে একটা জীর্ণ ভাষ্কর্যকে অনেক লাল রঙ একসাথে জড়িয়ে ধরে চুপ করে বসে আছে । বাতাসে লাল রঙগুলো নড়ছে ..
৩. আমরা বাতাবি নেবুর গন্ধ পেলাম - অসাধারণ! ওটা বাতাবি নেবু, মালি চাচু মেক শিওর করলো । আমার মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকলো, বাতাবি নেবু সকল গুলো একলা খেয়ে ডুবিয়ে নুলো - তাও যে ভারী লেজ উচিয়ে পুটুশ পাটুশ চাও! শেষ লাইনটা আমার মাথায় অনেকক্ষণ ঘুরলো, তাও যে ভারী লেজ উচিয়ে পুটুশ পাটুশ চাও!
৪. আমরা একটা সবুজ মাঠে অনেক্ষণ বসেছিলাম, আমাদের জন্য বিশাল ট্রে তে করে খুব মজার ফুচকা আসলো - রাজকীয় ভঙ্গিতে! তারপর বিশাল একটা বোতলে করে পানিও আসলো .. এবং আমি আমার প্যান্ট ভিজিয়ে ফেললাম পানি খেতে গিয়ে! সেজান তখন দেখালো, আকাশে অনেক মেঘ, ঠিক মাঝখানটায় অল্প ইকটু ফাঁক আর ঠিক সেখানটায় একটা সূর্য! পজিটিভ এনার্জি!
৫. আমরা একটা বুনো পথ দিয়ে হাঁটলাম .. জায়গাটা ভীষণ সুন্দর ছিলো.. অসম্ভব সুন্দর ছিল.. এবং শেষের দিকে আমরা একটা কাঁঠালকানন ( সেজের দেয়া নাম ) এর মাঝখানে গিয়ে বসেছিলাম, সামনে একটা লেক ছিল আর সেখানে মিনিয়েচার সাইজের শাপলা ছিল! এবং আমাদের বিকেল শেষ হলো সেখানে চুপ করে বসে থাকতে থাকতে .. শাফি হচ্ছে আমাদের মধ্যে সবচে' ডিপ্রেসড.. সেও কাঁঠাল কাননে বসে গান গুনগুন করা শুরু করলো.. একটা কাঁঠালগাছে ঠেস দিয়ে..

ফিরে আসার সময় আমাদের সবার খুব মন খারাপ হলো.. আমি পুরো সময়টা ঘ্যাক ঘ্যাক করে গাচ্ছিলাম,

You're a part time lover and a full time friend
The monkey on your back is the latest trend
I don't see what anyone can see
In anyone else but you

গানটা খুব সুন্দর - আরো কয়েকটা সুন্দর লাইন ছিল

We sure are cute for two ugly people
I don't see what anyone can see in anyone else
But you

Pebbles forgive me, the trees forgive me
So why can't you forgive me?
I don't see what anyone can see in anyone else
But you

...................

Just because we use cheats doesn't mean we're not smart
I don't see what anyone can see in anyone else
But you


আমি আর সেজান আজকে খুব বক বক করলাম গান নিয়ে - সবাই একটা সময় খুব বিরক্ত হয়ে গেলাম - কিন্তু হাজার হোক - সেজের সাথে আমার প্রায় একমাস পর দেখা হল!

আমরা একটা বাসে ঝুলে ঝুলে ঢাকায় ফিরে আসলাম .. কেয়াকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে আমি বাসায় ফিরে আসলাম, সেজ চলে গেল ওর টিউশনে.. ওয়াসি আর শাফি একসাথে সেই বাসটায় থেকে গেল - পরে নামবে বলে । ওয়াসি আমাকে পরে ফোন করে বলল - শাফি যখন বাস থেকে নেমে যাচ্ছিল তখন ওর মনে হলো, সে বাকি লম্বা(!) পথটুকু একা কিছুতেই যেতে পারবে না.. তাই সে শাফির সাথে সেখানটায় নেমে গেল আর বাসায় ফিরল হেঁটে হেঁটে! <img src=" style="border:0;" /> এবং সে আমাকে বলল - সেটা ছিল একটা ভীষণ চমৎকার সময়!

শাফি বাসায় ফেরার পর আমাকে টেক্সট মেসেজ পাঠালো, দোস্ত, লাইফ ইজ রিয়েলি বিউটিফুল! একদিন আগেও আমার খুব বড় একটা প্রোবাবিলিটি ছিল সুইসাইড করার। কিন্তু আজকে অনেক বাঁচতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু আমি জানি আমার লাইফ কতো ছোট!

আমার মধ্যে একটা আধা মহাপুরুষ কাজ করে, যে ধার করা ডায়ালগ ধাম করে মানুষের গায়ে ছুড়ে মারে! আমি ওকে মেসেজে যেটা বলতে চাইলাম সেটা ছিল ট্রয় এর একটা ডায়ালগ

I'll tell you a secret. Something they don't teach you in your temple. The Gods envy us. They envy us because we're mortal, because any moment might be our last. Everything is more beautiful BECAUSE we're doomed. You will never be lovelier than you are now. And we will never be here again.

কিন্তু কথা হচ্ছে, আমি কথাটা ঠিক মতো বলতে পারলাম না, আর সে রিপ্লাই করলো.. তোর কথা ভালোই লাগে, কিন্তু কেমন আঁতেল আঁতেল শোনায়, ভালো কথা, তুই কি আঁতেল হয়ে যাচ্ছিস?

আমি কিছুক্ষণ বুমেরাং এর বাড়ি খেয়ে চুপ করে থাকলাম.. তারপর শাফি আবার বললো.. তোকে আগের মতো পেয়ে খুব ভালো লাগছে ..

ওয়াসি আমাকে পরে ফোন করে বলল .. দোস্ত স্যরি.. তোকে খুব বেশি জোরে মারসি! আমার তখন খুউব হাসি পেলো.. আমি ওকে বললাম, উফফ আমার এখন আর ব্যাথা নাই তো বাপ! আসলে আমার বলা উচিত ছিল, নো প্রবলেমো আমিগো! আমি তায়কোয়ান্দো শিখছি! সুদে আসলে উশুল করব নে!

( ভালো কথা, আমি আসলে তায়কোয়ান্দো শিখছি না - ছায়ানট ও এবছর বাদ, ওরা নতুন স্টুডেন্ট অনেক আগেই নিয়ে নিয়েছে! <img src=" style="border:0;" /> )

আমরা আজকে খুব চমৎকার একটা দিন কাটালাম, শহরের বাইরে.. এবং ফিরে আসার পর খুব মন খারাপ লাগলো.. আফটার এফেক্ট! কিন্তু এই বিষন্নতার মধ্যে বিষন্নতা নেই.. অল্প খানিকটুকু নীল .. আর অল্প খানিকটুকু ধূসরতা..

টুট টুরু রুট টুরু রুট টুরু টুরুট ..
টুট টুরু রুট টুরু রুট টুরু টুরুট ..
I don't see what anyone can see in anyone else!

আমার ফ্রেন্ডগুলো অ-সা-ধা-র-ণ কারণ তারা খুবই সা-ধা-র-ণ! একটু অন্য অর্থে সাধারণ! খিক খিক খিক!

পুনশ্চ : কেয়া আমাকে এসএমএস পাঠালো .. আজকে বৃষ্টি হলো না..
সত্যি কথা হচ্ছে - আমার মুখে কয়েক ফোটা পড়েছিল! আর দুপুর থেকে আকাশটা সন্ধ্যা হয়ে ছিল! বৃষ্টি না হওয়াটা আসলেই অন্যায়! অন্তত দুপুর থেকে আকাশকে সন্ধ্যা করে রাখার পর!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28777005 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28777005 2008-03-06 20:24:14
মেঘদূর বৃষ্টি
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতেও যখন সূর্য উঠলো না, তখন ঘরের সবকিছু তাদের নিজস্ব গন্ধ দিয়ে তাদের অস্তিত্বের কথা প্রচার করা শুরু করলো । গৃহবধুরা বিরক্ত হয়ে নাক কুচকাতো, আর আকাশের চারপাশ চোখ দিয়ে ভালো করে খুঁজে দেখতো, সূর্যটাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় কিনা । তারপর আরো বিরক্ত হয়ে মেঘগুলোর দিকে চেয়ে থাকতো, তারা হুটহাট করে দুচার ফোঁটা বৃষ্টি না নামালেই পারে । বুক অব সায়েন্স মেনে বাতাস শুষে নিতো ভেজা কাপড়গুলোর জলকে । তারপর আর্দ্রতাটুকু তাদের স্বামীর সাদা শার্ট ছেড়ে আকাশে উড়ে বেড়াতো মেঘ হবে বলে । খারাপ কি হত ? কিন্তু মেঘগুলো অলস হয়ে তাদের ছাদের আশে পাশে ঘোরা ফেরা করত । এবং নববধুরা খুব ভয় পেতো মেঘদের - প্রাচীন প্রবাদে লেখা আছে, ’ ধূসর কালো মেঘ এবং নির্মল কালো চোখকে কখনো বিশ্বাস করতে নেই, দুটোই বৃষ্টি ডেকে আনে ’ । তাই সাদা জামাগুলোর জায়গা হতো বেডরুমে, এবং কদিন শহরে প্রচুর লোডশেডিং হল,কারণ সবাই আয়রন করে কাপড় শুকাতে থাকলো ।

একদিন সকালে ছাদের ওপর ভেসে বেড়ানো কালো মেঘগুলো বৃষ্টি নামালো .. কেউ আসলে বিশ্বাস করলো না, শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি নামছে - কিন্তু মিনিট বিশেক পরও যখন বৃষ্টি থামলো না তখন ছোট বাচ্চাগুলো খুশিতে লাফাতে থাকলো আর টিভিতে কার্টুন নেটওয়ার্ক খুলে যথেচ্ছা কার্টুন গিলতে থাকলো । ঘরটুকু অন্ধকার হয়ে আসলো, মা ব্যস্ত হয়ে জানালাগুলো শক্ত করে আটকালো, বিরক্ত হয়ে গজগজ করল ’সারা বাড়ির জানালা আটকাচ্ছি! কেউ একটু হাত লাগালেও তো পারে!’ , কিন্তু ছোট্ট বাচ্চাটার হাত আরো শক্ত করে ধরলো রিমোট কন্ট্রোলকে - ভয় পেয়ে ভলিউমটা একটু কমলো, আর টম একটু কম শব্দ করে ধুপুস করে ছাদ থেকে পড়ল । এবং ছোট্ট বাচ্চাটা শব্দ করে হাসলো, কিন্তু মাকে ফিরে তাকাতে দেখে সেই হাসিটা মাঝপথে বিচ্ছিরিভাবে থেমে গেল।

বৃষ্টি অনেকগুলো একা মানুষকে আরো একা করে দিল । তাদের কেউ জানালাটা খুলে কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকলো, তারপর আরামদায়ক আবহাওয়ায় ঘুমিয়ে পড়ল, আর ঘুম ভেঙে পুরোপুরি বৃষ্টিসিক্ত বিছানায় নিজেদের কাকভেজা অবস্থায় খুঁজে পেল তারপর ভয় পেয়ে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারল ’মা!’ বলে চেঁচিয়ে! উদাসী টাইপের একটা মেয়ে তার জানালার পাশে চুপচাপ বসে থাকলো, হাতে বই নিয়ে .. তারপর একফোঁটা বৃষ্টি যখন একটা ইকুয়েশনের উপর টপ করে পথ ভুলে এসে পড়ল তখন তার হঠাৎ মনে পড়ল সে কতদিন বৃষ্টিতে ভেজেনি.. এবং দীর্ঘশ্বাস পড়ল - মা তো ভিজতে দেবে না! সামনে পরীক্ষা! ঠিক তখন ওর ছোট ভাইটা একটা চেয়ার অনেক কষ্ট করে ডাইনিং রুম থেকে ঠেলে ঠেলে এনে ড্রইংরুমের ক্যালেন্ডারটার নিচে এনে থামল । কেউ ওকে কোন প্রশ্ন করেনি - কারণ সারাটা ঘর অন্ধকার - কেউ দেখেনি কাউকে । তারপর সেই চেয়ারটার ওপর নিজেকে উঠিয়ে ছোট্টহাতদুটো দিয়ে টান দিয়ে সে ক্যালেন্ডারের একটা পাতা ছিড়ল - সাৎ করে একটা শব্দ হল - ছেলেটা চুপ করে কান পাতলো, তারপর বুঝলো কেউ শোনেনি।

ঘরে এক কোণায় ওয়ার্কশপে কাগজটাকে ভাঁজ করা হল - এবং আরো কিছুক্ষণ পর একটা সাদা বড় একটা নৌকা দাঁড়িয়ে গেল । ক্যালেন্ডারের মসৃণ শক্ত কাগজটার জন্য নৌকাটাকে ঝকঝকে লাগলো দেখতে । ছোট্ট ছেলেটা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলো তার নিজের শিল্পকর্মের দিকে । এর সাথে কিছুরই তুলনা চলে না - রাফ খাতার ছেড়া পাতার নৌকা তো এর পাশে কিছুই না - কি রাজকীয়! কি আশ্চর্য রাজকীয় লাগছে! একছুটে সে নিয়ে আসলো তার প্যাসটেলের বাক্স, নৌকার নিচের অংশে প্যাসটেল দিয়ে ধূসর রঙ করে দিলো - তারপর কি মনে হল - পালটাকে আকাশী নীল করে তারপর নৌকার পেছনটাতে একটা দাঁড় একে দিল । তারপর নৌকার একটা নাম লিখতে যাবে কিন্তু দেখল নৌকাতে লেখা আছে ’সেপ্টেম্বর’ - পালটার ঠিক মাঝ বরাবর - উজ্জ্বল কালো - আকাশী নীল রঙটাও তাকে ঢাকতে পারেনি ।

সেপ্টেম্বর লেখা বর্ণীল নৌকাটা কিছুক্ষণ পর পানিতে ভাসলো, রাস্তার পাশে .. স্রোত তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল । ছেলেটা অনেকক্ষণ তাকে অনুসরণ করল একটা কালো বড় ডাটওয়ালা ছাতি নিয়ে , পিছল হয়ে যাওয়া মাটিতে বেমক্কা একটা বিশাল আছাড় খাওয়া পর্যন্ত যে মুগ্ধ হয়ে তার নৌকাকে দেখছিল .. তার বড় রাজকীয় নৌকা - রাফখাতার নৌকাগুলো যার পাশে কিচ্ছু না .. ছেলেটা তার কাদামাখা প্যান্ট আর টিশার্টটা নিয়ে ভয়ে ভয়ে বাসায় ফিরে আসলো, আর নৌকাটা ভেসে গেল অনেকদূর.. পানির স্রোত তাকে নিয়ে যাচ্ছিল.. আর জায়গাটাও ছিল হাল্কা ঢালু..

তারপর বৃষ্টি থেমে গেল একটা সময়.. পানির স্রোত থেমে গেল - আর প্যাসটেল রাঙা নৌকাটা চুপচাপ স্থির পানির ওপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো.. ততক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজে তার পালটুকু ভিজে নরম হয়ে গেছে.. নৌকার বামপাশে একটা বড় ফাটল ধরেছে..

তারপর বৃষ্টি পুরোপুরি থেমে গেল, তারপর একদিন সূর্য উঠলো, নৌকাটাকে এক বেমক্কা বাতাস কাত করে রাস্তায় ফেলে দিল । তার উপর দিয়ে কয়েক ডজন লাল নীল গাড়ি চলে গেল - রিকশা গেল অহরহ .. প্যাস্টেল নৌকাটার রঙগুলো ধীরে ধীরে ওকে একলা ফেলে চলে গেল , তাকে জেকে ধরলো অনেক ধুলো .. আঠালো অবলম্বন পেয়ে .. প্যাস্টেল নৌকাটা চুপচাপ শুয়ে আকাশ দেখতো - নীল মেঘমুক্ত আকাশ - মাঝে মাঝে ভেসে আসতো সাদা মেঘ - উজ্জ্বল - সাদা মেঘগুলো নীল আকাশকে তার পূর্ণ শ্রদ্ধা জানাতো, রোদ কে না আটকে .. যেভাবে চুপচাপ আসতো সেরকম চুপচাপ চলে যেত - প্যাস্টেল নৌকাটা পড়ে থাকতো রাস্তায় .. এবং ক্ষণে ক্ষণে আরো বেশি ধুলো তাকে জেঁকে ধরতো.. স্রষ্টা সবার প্রার্থণা শুনতে পান না, কিন্তু যখন তিনি পান খুব বেশি দেরি করেন না প্রার্থনা সত্য করতে - প্যাস্টেল নৌকাটা একদিন হঠাৎ প্রার্থণা করে বসল - ঝমঝমে বৃষ্টির জন্য। ঝমঝমে বৃষ্টি এবং দমকা বাতাস .. তার স্মৃতিতে গেঁথে থাকা স্রোত এবং ভেসে যাওয়ার আনন্দময় দিনটা তার মনে পড়ল.. বৃষ্টি! বৃষ্টিই তার জন্য নিয়ে আসবে পুরনো সব কিছু.. সব চেতনাগুলো সাদাকালো হয়ে যাবার আগে .. তাই সেদিন দুপুরবেলা, শহরের সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঠিক দুপুর বেলা কালো মেঘগুলো ঝড়ের বেগে আকাশকে দখল করে নিলো, অপ্রস্তুত মানুষগুলোকে ইচ্ছেখুশি ভিজিয়ে অনেকগুলো মানুষকে জড়ো করলো জেনারাল স্টোরগুলোর সামনের ছোট্ট বৃষ্টিমুক্ত জায়গায়.. অনাহূত আগন্তুকে ছোট ছোট চায়ের দোকানগুলো নিমিষে ভরে গেল - আফসোস - তারা কেউ চা খেতে চাইলো না ।

কাদা কাদা পা গুলো সব প্যাস্টেল নৌকাকে মাড়িয়ে গেল চায়ের দোকানগুলোতে ঢুকবার জন্য । জেকে বসে থাকা ধুলোগুলোও বিদ্রোহ ঘোষণা করল প্যাস্টেল নৌকার বিরুদ্ধে - যখণ বৃষ্টি তাদেরকে ছুঁয়ে গেল তারা সবাই নিমিষে কাদা হয়ে গেল। এবং অনেকগুলো টায়ারের এবং অনেকগুলো পায়ের ফুট ম্যাসাজে প্যাস্টেল নৌকার বাকি রঙগুলোও ধুয়ে চলে গেল । আঁকড়ে ধরল কাদাদের কিন্তু কাদারা রঙের মূল্য বুঝলো না.. তাই রঙগুলো পানিতে ডুবে মারা গেল - কেউ তাদের খবর রাখলো না । প্যাস্টেল নৌকার ভাঁজগুলো প্রচন্ড ঘষাঘষির কারণে ভিজে ছিড়ে পড়ল .. এবং তার আসল পরিচয় হঠাৎ করে পুরো পৃথিবীর সামনে নির্দয়ভাবে ফাঁস হয়ে গেল - একটা সামান্য ক্যালেন্ডারের পাতা.. চারটুকরো হয়ে পড়ে থাকা.. অনেক কাদার মধ্যেও বড় বড় হরফের কটা শব্দ পড়তে পারা যায় - সেপ্টেম্বর ২০০৭ ।

পরদিন ভোর বেলা সেই ছোট্ট ছেলেটা বাবার হাত ধরে স্কুল যাচ্ছিল । একটা পুরনো নোংরা কাদামাখা কাগজকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে একটা লাথি মেরে সরিয়ে দিল রাস্তার পাশে - তারপর বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ’আজকে অক্টোবরের ক’তারিখ বাবা?’

বুক অব সায়েন্সের শেষ পদাবলীতে তখনো লেখা ছিল ’এবং শক্তির রূপান্তর ঘটিবে শক্তিতে, পড়িয়া থাকিবে নিশ্চুপ সব কায়া, নিশ্চই তাহারা হারিয়ে যাবে সময়ের সাথে, এবং তাহাদের কেউ মনে রাখিবে না.. কারণ তাহারা শক্তি নহে - তাহারা সামান্যই বস্তু!’
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28730923 http://www.somewhereinblog.net/blog/smilitudeblog/28730923 2007-09-13 11:38:06