'পুলিশ থানা হাজত থেকে বের করে যখন আমার চোখ বাঁধে, তখনই বুঝতে পারি কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। মিজানসহ আমাকে চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। বারবার আকুতি জানাই, আমাকে যেন প্রাণে মারা না হয়। অনুভব করলাম, আমার পায়ে ধাতব কিছু একটা ঠেকল। মনে মনে আল্লাহর নাম নিতে শুরু করলাম। এরপর যা আশঙ্কা করছিলাম তা-ই ঘটল। আমার পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হলো। আমি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছি। এরপর শুনলাম আরেকটা গুলির শব্দ। সঙ্গে বন্ধু মিজানের আর্তনাদ। বুঝলাম তারও একই অবস্থা। এরপর আর কিছুই মনে নেই। সংজ্ঞা ফিরলে নিজেকে আবিষ্কার করি হাসপাতালের বিছানায়। আমি ভাগ্যবান, বেঁচে গেছি। তবে মারা গেছে বন্ধু মিজান। কী অপরাধে পুলিশ এমন করল কিছুই বুঝতে পারলাম না।' গুলশান থানা পুলিশের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলে গতকাল বৃহস্পতিবার এভাবেই নিজের গুলিবিদ্ধ হওয়ার বর্ণনা দিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন মানিক মিয়া।
তবে পুলিশ মানিকের এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, মানিক ও মিজান পেশাদার ছিনতাইকারী। বুধবার গভীর রাতে গুলশান এলাকায় তারা ছিনতাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ সময় টহল পুলিশের সঙ্গে তাদের বন্দুকযুদ্ধ হয়। আর এতেই ঘটনাস্থলে তারা দুজন গুলিবিদ্ধ হলে গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গতকাল ভোরে মিজান মারা যায়। এই ঘটনায় আসলাম ও জালাল নামে তাদের আরো দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে চার রাউন্ড গুলিভর্তি একটি রিভলবার।
পুলিশের কয়েকটি সূত্র, মিজান ও মানিকের পরিবারের সদস্যসহ একাধিক মাধ্যম থেকে জানা গেছে, রাজধানীর বাড্ডার নয়ানগর নতুন বাজার এলাকার লিজা সাউন্ড সিস্টেম নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক মিজানুর রহমান। মঙ্গলবার ভোরে গুলশান থানার উপপরিদর্শক আনিসুর রহমান গাড়ি ছিনতাইয়ের অভিযোগে প্রথমে মিজান ও পরে মানিককে তাদের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে।
মানিক কালের কণ্ঠকে বলেন, 'গ্রেপ্তারের পর আমার ও মিজানের সহায়তায় ওই দিনই বিকেলে আসলাম ও জালাল নামে আরো দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সবাইকে থানায় নিয়ে হাজতে আটকে রাখা হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় নির্যাতন। এসআই আনিস আমাদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। আমরা আপত্তি জানাই। এসআই আনিস বুধবার রাত ১টার দিকে মিজান ও আমার হাতে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে এবং চোখ বেঁধে গাড়িতে করে বাইরে নিয়ে যান। তাঁরা প্রথমে আমার বাম পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে একটি গুলি করেন। চোখ বাঁধা থাকায় কে গুলি করেছে বুঝতে পারিনি। এরপর শুনি আরেকটা গুলির শব্দ। তারপর এসআই আনিসের কণ্ঠস্বর, 'দৌড়া, দৌড়া। সামনের দিকে দৌড়া।' এরপর আরেকটা গুলির শব্দ। সঙ্গে মিজানের আর্তনাদ। এরপর সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলি।'
মানিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরো বলেন, 'ভাই, আমি ছিনতাইকারী না। সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবসা করি। এলাকায় আমার সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিন। পুলিশকে টাকা দিতে পারিনি বলে আমাদের এভাবে গুলি করে মেরে ফেলতে চেয়েছে। পুলিশ এখনো শাসাচ্ছে, সাংবাদিকদের কিছু বললে মাথায় গুলি করে মারবে।'
নিহত মিজানের স্ত্রী তাসলিমা বেগম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, মঙ্গলবার ভোরে এসআই আনিস নয়ানগরের বাড়িতে গিয়ে আমার স্বামীকে ছিনতাইকারী অভিযোগে জোর করে ধরে নিয়ে যান। পরে তাকে ছাড়াতে থানায় গেলে এসআই আনিস বলেন, 'মিজান দুইজন আসল ছিনতাইকারীকে ধরিয়ে দিয়েছে, যদি এক লাখ টাকা দিস, তাহলে তোর স্বামীকে হালকা মামলা দিয়ে আদালতে পাঠিয়ে দেব, নইলে ক্রসফায়ার দিয়ে বিদায় করে দেব।'
তাসলিমা বেগম আরো বলেন, ওই রাতেই তিনি তাঁদের ১০ বছর বয়সী একমাত্র মেয়ে লিজাকে সঙ্গে নিয়ে দুই হাজার টাকা নিয়ে রাতে থানায় গেলে এসআই আনিস তাঁকে গালিগালাজ করে বের করে দেন। পরে তিনি স্বামীর জন্য রুটি-কলা আর পানি কিনে দিয়ে আসেন। বুধবার ভোর রাতে এক পুলিশ সদস্য তাঁর মোবাইল ফোন দিয়ে মিজানের অবস্থা খারাপ উল্লেখ করে হাসপাতালে যেতে বলেন। খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে গিয়ে মর্গে স্বামীর লাশ দেখতে পান। চিকিৎসকরা তাঁকে জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর স্বামী মারা গেছেন।
হাসপাতালে মিজানের মা ছেলের লাশ দেখে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের বলেন, 'আমার পোলায় কী দোষ করেছিল, কেন ওরা এইভাবে গুলি করে মারছে। মানুষকে তো দূরের কথা কুকুর-বিড়ালকেও এভাবে কেউ মারে না।' এই কথা বলেই বৃদ্ধা সংজ্ঞা হারান।'
মানিক, তাসলিমা আর মিজানের মায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামালউদ্দিন বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাঁরা খবর পেয়ে গুলশান-বনানী সংযোগ সড়কের সামনে ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে একটি চক্রকে ধাওয়া করেন। একপর্যায়ে ৪২ নম্বর রোডে নির্মাণাধীন একটি বাড়ির সামনে ওরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করে। পুলিশও এ সময় পাল্টা গুলি ছোড়ে। গুলিবিদ্ধ দুইজনসহ চারজনকে আটক করা হয়। পরে গুলিবিদ্ধ মিজান ও মানিককে হাসপাতালে পাঠালে সকালে মিজান মারা যায়। তারা গুলশান এলাকার গাড়ি ছিনতাইকারী।
অভিযুক্ত এসআই আনিসের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'আমি মিজানের বাড়িতে অভিযান চালাইনি। মানিক আর মিজানের স্ত্রী আমার ওপর মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছে।' মিজানকে আটক করে থানায় নিয়ে আসার সময় স্থানীয় লোকজন অনেকেই তা দেখেছেন জানালে এসআই আনিস ওসি স্যারের সঙ্গে কথা বলতে বলে সংযোগ কেটে দেন। গ্রেপ্তার হওয়া আসলাম ও মিজান এ বিষয়ে কিছু জানায়নি।
বরিশালের মেহেদীগঞ্জ পাতারহাট এলাকার মৃত আজিজুল হক সিকদারের চার ছেলে এবং এক মেয়ের মধ্যে মিজান মেজো।
তবে তারা এ ব্যাপারে কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের বিরুদ্ধে ডাকাতির প্রস্তুতি, পুলিশের কাজে বাধা এবং অস্ত্র আইনে তিনটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ গতকাল তাদের অস্ত্র মামলায় তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



