ভূমিপুত্র (গল্প) পর্ব-১
আজ একটু তাড়াতাড়িই হোটেল থেকে বেরিয়ে এসেছে। বারী্গ্রামের কালী মন্দিরের গেইটে চা'য়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছে জয়। আর দোকানের মালিকের সাথে কথা বলছে। এমন সময় একটা লোক এসে বললো, চিরন্ময় দাস নাকি জয়কে দাসবাড়িতে যেতে বলেছেন। লোকটি চলে যাবার পর দোকানী জয়কে একটু সাবধান করে দিলেন। কিন্তু সাবধনতা কেন? তাই জয় বুঝতে পারলো না। অবশ্য জয়'র মনে কোন ভয় কাজ করছে না এই মূহুর্তে। বরং ভালোই লাগছে, কারণ এই পাড়ার শীর্ষ ব্যক্তি তাকে খবর পাঠিয়েছে। একবার যাওয়া দরকার। উনার কাছ থেকে অনেক কিছু জানা যাবে।
বাড়ির উঠোনে পুত্র আর নাতিদের নিয়ে বসে বিকেলের খোশ গল্পের আসরে চিরন্ময় দাস। প্রতিদিনই এভাবে বসা হয়। এটি এ বাড়ির ঐতিহ্য। বিকেলের এ সময়টাতে পূর্বপুরুষদের দাপট আর ব্যক্তিত্বের কীর্তন হয় এখানে। একটি বিষয় পুরোপুরি দাস বাড়ির পক্ষে, যা সাধারনত দেখা যায় না। এ বাড়ির সব পুরুষই একই মানসিকতা সম্পন্ন। গোঁয়ারতুমি, অন্যকে হীন করে আচরণ করা, অপরের সম্পদ লুন্ঠনের ইচ্ছা, সবই দাসবাড়ির মাটির সাথে মিশে আছে।
চিরন্ময় দাস যখন মনে মনে জয়'র আগমন কামনা করছেন, তখনই জয় দাস বাড়ির উঠোনে পা রাখলো। কর্তাও তখন জল চৌকি থেকে উঠে জয়'কে স্বাগত জানালেন, যদিও মনের মাঝে বিষ বিছিয়ে রেখেছেন উঠোনে পাতা শীতলপাটীর মতো। জয়কে শীতলপাটীতে বসতে বলে নিজের জলচৌকীর আসনে বসলেন চিরন্ময় দাস। এই পাড়ায় জয়'র আগমনের হেতু জানতে পেরে দাস বাবু জানালেন, " আরে বেটা শুন, জাত নিয়ে টানাটানি কি আর আমার মতো সুশীলেরা করে? ওসব তো চাষাদের কাজ। যারা কর্মে নিম্ন তারাইতো জাতে নিম্ন। অথচ আমার কামলা আমাকে জাত তুলে কথা বলে! আরে আমি দাস হয়েছি বলে কি পঁচে গেছি? এই তল্লাটে আমার চেয়ে আর কেইবা ধনী আছে। আচ্ছা বাবা বাদ দাও, কি খাবে বলো? ঘরে গুড়ের সন্দেশ, নারকেলের নাড়ু আর গাছের চম্পা কলা আছে। তোমার দিদি মনিকে বলেছিলাম একটু কালাজিরার পোলাও আর কাতলের মুড়িগন্ড করতে, কিন্তু বেচারীকে দেখতে আজ ডাক্তার এসেছে দুইবার।" দাস বাবুর কথামালা ভালোই উপভোগ করতেছিলো জয়। কিন্তু সেও আর বেশিক্ষণ বসলো না। ক'টা সন্দেশ আর একগ্লাস জল খেয়ে দাস বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছে জয়। এবার একটু গ্রাম দেখবে।
পাড়াটি আসলেই খুব সুন্দর। অপর আট দশটা হিন্দু পাড়ার মতো নয় এখানটার হালচাল। একটা গ্রামের পুরো অর্ধেক জুড়ে এই পাড়ার অবস্থান। সুদৃঢ় সমাজ তাদের।
শক্তিশালী না হলেও নড়বড়ে পঞ্চায়েতও আছে। সমাজ, সমাজপতি, উপাসনালয়, ঠাকুরবাড়ি সবই আছে। নেই শুধু রাশভারী কিছু জাত উপজাত। যেমন, গঙ্গোপাধ্যায় (পাধ্যায় সমূহ), ধর, কর্মকার, বিশ্বাস, ভট্টাচার্য না থাকলেও ভট্ট এবং আচার্য্য আলাদা আলাদা ভাবে আছে,। সূত্রধরের সূত্রের ভগ্নাংশটা ধরে রেখেছে ঝন্টু সূত্রধর। নেই নেই অনেক কিছুই নেই। কিন্তু গোত্রীয় টাইটেল কম থাকলেও তা নিয়ে বৈষম্যের কোন কমতি নেই। সুচারু এবং সুক্ষতর নোংরা ফ্যাসাদ তাদের প্রাত্যহিক রুটিন। "ডার্টি পার্ট অব সোসাইটি"। ডার্টি শব্দের সাথে থার্টি শব্দের উচ্চারণের ছন্দে হুবহু মিল। যদিও অর্থের গোঁজামিল। কিন্তু থার্টি পিস দাসের দাপটে পুরো পাড়া কিঞ্চিত ডার্টি সবসময়। বিত্তের অভাব তাদের কোন কালেই ছিলো না। কিন্তু চিত্তটা নিতান্তই সংকুচিত। চিত্তের ষ্টোরে ব্ল্যাংক স্পেস এক্সট্রা চর্বিতে ভরা। সাধারণের জন্য তা কেবলই হার্মফুল অয়েল। কদাচিৎ যদি সাধারনের বুকের সাহস বেড়ে গলাটা প্রতিবাদী হয়ে যায় তবে দাস টাইটেলের দোপেয়াজ রান্না করে ছাড়ে। তাদেরতো এই সম্বল, অপেক্ষাকৃত নিম্ন শ্রেনীর দাস টাইটেলের অধিকারী হয়ে দিনমজুর লালু সেনের হাতে কি হেস্ত নেস্তই না হলো চিরম্নয় দাস। অথচ শুধু এ পাড়াতে নয়, পুরো তল্লাটে এমন অর্ধেক বিত্তের মানুষও খুজে মরা অনর্থক এবং বাহুল্য।
জাত বৈষম্য যতোই থাকুক তা ঐ পাড়ার ভেতরই থাকে। নিজস্ব অবস্থান, জাতি সত্ত্বা, নাগরিক অধিকার সবই তারা জানে। এও জানে যে, তারা সনাতন ধর্মালম্বী এবং বাংলাদেশী। সংখ্যাগুরুও নয় আবার সংখ্যালঘুও নয়। দেশপ্রেম, অধিকার, নাগরিক দ্বায়িত্ববোধকে কখনোই সংখ্যাতত্বের অধীনস্ত করা যায় না। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা দিয়ে জাতিকে ভাগ করার নিয়ম এখানের অনেক হিন্দুর শাস্ত্রেই নেই। এটা কোন রূপ বা খোলস নয়। যখন দেখবেন রাম ঠাকুর বা লোকনাথের ছবির পাশে বাংলাদেশী কোন ক্রিকেটার বা দেশের কোন দর্শনীয় স্থানের ছবি ঝুলছে, থকন নিশ্চিতভাবেই জেনে যাবেন দেশপ্রেমে কখনওই ধর্ম গুরুর অবমাননা হয় না।
এই পাড়ার অধিকাংশ মানুষই পান চাষের সাথে জড়িত। পানচাষীদের স্থানীয় ভাষায় "বারী " বলা হয়, তারই সূত্র ধরে পাড়ার নাম "বারীগ্রাম"। ছোট বড় দুইশ'র উপর পানের বাগান আছে এই গ্রামে। পানের বাগান ছাড়াও গ্রামের বৈশিষ্টে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে একটি প্রকৃতির দান। বারীগ্রামের ঠিক বুকের মাঝখান দিয়ে শতবর্ষের স্বাক্ষি হয়ে বয়ে গেছে কৃষ্ণমহুরী খাল। মেঘনা নদী থেকে বড় হয়ে আসা হিজলী খালের মাথা থেকে শুরু হয়ে চিপচিপে শরীরের কৃষ্ণমহুরী মিশে গেঝছে হিজলী খালের লেজের সাথে। যাওয়ার সময় নিংড়ে নিয়েছে প্রায় ২৫টি গ্রামের বুকের উত্তাপ। ভাগ করে গেছে সমাজ ও সামাজিক জীবন। খাল এবং খালপাড়ের জীবন প্রাকৃতিক অলংকার হলেও বাস্তবে কিছুটা নাক সিঁটকানো।
সেই শুরুতে খালের দুপাড়ে গভীর বাঁশঝাড়। এর একটু এলেই ময়নামতি বিলের শেষাংষের পাড়ে সুদীর্ঘ কাশবন, আর উত্তর পাড়ে মিয়াবাড়ির পেছনের অংশে ঝাউবন। তারপরেই জলপাই ডাঙ্গা আর মাছিমপুর গ্রামের বন্ধনী একেবারেই নতুন লোহার পুল। পুল শেষে এগিয়ে এলেই শুধু তাল খেজুরের গাছ। খালের এ অংশের পানি বেশ স্বচ্ছ। দুপাড়েই বিস্তৃর্ণ চারণভূমি। গরু চাগল আর মহিষের পাল সীমাহীন মগ্নতায় সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত ঘাস গ্রহনে ব্যস্ত থাকে। কাব্যিক বর্ণনার রাখাল, বাঁশি আর সুরের বাস্তবিক প্রকাশ এখানে। এখানে এসেই খালের পানি হয়ে যায় প্রকৃতির রস। সৌন্দর্য এখানে ছুয়ে যায় উদারতার শীর্ষ চূড়া। প্রকৃতিই একমাত্র দাতা যার দান কখনওই করুণা নয়। কোনরূপ কৃপণতা নয়, নয় কোন স্বার্থপরতা। এ যে কেবলই বিলিয়ে দেয়ার জন্য। হিজলী খালের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়ে মাথা বোঝাই রূপ নিয়ে জলভর্তি খালের বেশে প্রাপ্ত যৌবনা উদাসী কোন নারী সাঁপের মতো এঁকেবেঁকে এ পথেই চলছে শতবছর ধরে। তারই দেহের ভাঁজে ভাঁজে অলংকার হয়ে গেঁথে আছে ঘন বাঁশ ঝাড়, কাশবন, ঝাউবন, তালখেজুরের সারি, আর তার হৃদয়ের বারতা নিয়ে ছুটে চলে ছান্দসিক জলরাশি।
চলবে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

