নোয়া (নতুন) খাল নামক একটি খাল থেকে নামাংকিত নোয়াখালী জেলা ভৌগলিক, কৃষি এবং অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্ব্পূর্ণ একটি জেলা। ১৮২১ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত ১৮৮ বছর(১)। এতো দীর্ঘ সময় ধরে নোয়াখালী একবার ভাঙে একবার গড়ে। ভাঙা গড়ার এবং অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝখানে রচিত হয়েছে সুখী এবং সমৃদ্ধ এক জনপদের। একেবারেই স্বাতন্ত্রিক আঞ্চলিক ভাষা, সংস্কৃতি নিয়ে এ জেলার পরিশ্রমী জনগোষ্ঠী কৃষি, শিল্পসহ রাষ্ট্রের উৎপাদন খাতকে গতিশীল রাখতে মাটি আঁকড়ে ধরে আছে। জেলার মোট আয়তন ৩০৬০১ বর্গকিলোমিটার, এটি বাংলাদেশের মোট আয়তনের ২.৪৪ শতাংশ। জেলার জনসংখ্যা কমবেশি ২৫ লাখ। সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে আমাদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৫.৪ শতাংশ হলেও নোয়াখালী জেলার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার তার চেয়ে বেশি (০৬ শতাংশ)। সাক্ষরতা হারের (৭বছর বয়সীর উর্দ্ধে) দিক থেকে দেখলে দেখা যায় আমাদের জাতীয়ভাবে এ হার ৪৫ শতাংশ হলেও নোয়াখালীতে সাক্ষরতার হার ৫০ শতাংশ(২)। প্রায় ২৫লাখ নাগরিকের মাঝে বাংলাদেশের নামকরা শিল্পপতি, বুদ্ধিজীবি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ কৃষক, জেলে এবং অন্যান্য সব পেশার লোকজনই আছে। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে যাদের নাম বেশি বেশি উচ্চারিত হয় তাদের অনেকেই নোয়াখালীর। কিন্তু নোয়াখালীর আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটের ওই বেশি বেশি উচ্চারিত ব্যক্তিবর্গের অবদান তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বরঙ জেলার কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী শ্রেণী জেলার নীট উৎপাদন এবং উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে আসছে।
দেশের শিল্পপতিদের মধ্যে ঈর্ষনীয় সংখ্যাই নোয়াখালীর। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতেও নোয়াখালীর রাজনীতিকদের সগর্ব অবস্থান। কিন্তু এসব অবস্থান কেবল পরিসংখ্যান আর তথ্যের বইতে। দু’একটি শিল্পগোষ্ঠী বাদে বাকিদের জেলার বাইরে শিল্প স্থাপন, কেবল কম মূল্যের শ্রমিকের ক্ষেত্রে স্থানীয় শ্রমবাজারের দ্বারস্থ হওয়া, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয়ের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে ব্যস্ততার দোহাই এসব অপ্রিয় দেখতে এবং শুনতে নোয়াখালীবাসী অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এ দুরাবস্থাকে কপাল/নিয়তি/বিধির বিধান হিসেবে ধরে নিয়েছে।
জেলার মোট জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য একটি অংশ প্রবাসী। একসময় কেবল মধ্যপ্রাচ্যে এদের দখল থাকলেও বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকাতেও নোয়াখালীর প্রবাসীদের সমান বিচরণ। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানকারীদের বেশিরভাগই অপেক্ষাকৃত দরিদ্র পরিবারের। পরিবারকেন্দ্রিক এসব মানুষ উপার্জনের বেশিরভাগ টাকাই দেশে পাঠিয়ে দেয়। পারিবারিক সচ্ছ্বলতায় তাদের অবদান ষোল আনা। এলাকার সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণেও এদের ভূমিকা প্রশংসনীয়। এ দৃশ্যপট উন্নত রাষ্ট্রে অবস্থানকারীদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উল্টো। তারা বরং অবস্থান নেয়া দেশেই সম্পত্তি কিনে নয়তো বা ভাড়া থেকে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার ধান্ধায় থাকে। ৫/৬ বছর অবস্থান করে দেশে এসে অবকাশ যাপনের জন্য প্রাসাদতুল্য বাড়িঘর নির্মাণ করে নামের শেষে চৌধুরী বা মিয়া প্রতিস্থাপন করে আবার বিদেশে পাড়ি জমায়। বছরে দু’একবার অবকাশে এসে দেশের মানুষকে ধন্য করেন। এ বাড়ি নির্মাণ করতে গিয়ে টাকার প্রলোভনে অথবা প্রভাব কাটিয়ে কিনে নেন কৃষকের ধানী জমি, অরণ্য অথবা জলাশয়। এ মূল্যায়ন সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিচারে, সবার ক্ষেত্রে নয়।
ধনী দরিদ্রের বৈষম্য দিনদিন বাড়তে থাকায় গ্রামের হাট বাজারগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ওইসব হাটবাজারের মূল ক্রেতারা দিনদিন দরিদ্র হয়ে পড়ায় ব্যাবসায়িক ব্যস্ততা কমছে আশংকাজনক হারে। স্থানীয় অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়লেও জিডিপির প্রবৃব্ধিতে সু-প্রভাবই ফেলছে। কারণ একজন শিল্পপতির অস্বাভাবিক উন্নতির সাথে একজন কৃষকের অস্বাভাবিক অবনতির যোগফল ভাগ হচ্ছে মোট অস্বাভাবিকতার সাথে। গ্রাম্য অর্থনীতি ধ্বংসের বিপরীতে শহরে গড়ে ্ওঠছে বিশাল বিশাল শপিং সেন্টার। কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট এবং সোনাইমুড়ি উপজেলার আমিশাপাড়া নামক দু’টি স্থানে জমির দামের পরিমান ঢাকা শহরের সমান। আমিশাপাড়ায় নির্মাণ হচ্ছে বসুন্ধরা সিটির আদলে ৮তলা বিলাসবহুল মার্কেট। সোনাইমুড়ি শহরে জমি বিক্রি হয় হাত মেপে। সবই উন্নত রাষ্ট্রে অবস্থানরত প্রবাসীদের খেল। অপরদিকে এ জেলার মোট মানুষের ৬৫ শতাংশ দারিদ্র্য অবস্থার মধ্যে বসবাস করে; দ্বিতীয়ত: জেলার মোট জনসংখ্যার মধ্যে ৫৪ শতাংশের মোট জমিজমা নেই, তারা ভূমিহীন; তৃতীয়ত: এ জেলার জনসংখ্যার ছয় হাজার চৌরানব্বই জনের বিপরীতে হাসপাতালের একটি শয্যা বরাদ্দ রযেছে; চতুর্থত: জেলার মোট আয়ে শিল্পখাতের অবদান রয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ এবং জাতীয়ভাবে আমাদের মাথাপিছু আয়ে ১৮ হাজার টাকা বেশি হলেও এ জেলার মাথাপিছু আয়ে মাত্র ১৩ হাজার টাকা। এরকম আরো আরো হতাশাজনক পরিসংখ্যান।
তবুও নোয়াখালীকে আমরা বলি অমিত সম্ভাবনাময় জনপদ। প্রাকৃতিক সম্পদ, ভৌগলিক অবস্থান, কৃষি, দক্ষ জনগোষ্ঠী, বুদ্ধিদীপ্ত ঐতিহ্য বিবেচনায় মাত্র কয়েকটি খাতে নজর দিলেই আমরা হতে পারি বাংলাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ জেলা। রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক খাতে রাখতে পারি গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
ধারাবাহিকভাবে উন্নয়নের জন্য চিহ্নিত ওই সকল খাতের বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
... ক্রমশ
১. নোয়াখালীর পুরাতন নাম ছিলো ভুলুয়া। ১৬৬৮ সালে ভুলুয়া থেকে নোয়াখালী নামকরণ করা হলেও জেলা হিসেবে স্বিকৃতি পায় ১৮২১ সালে।
২. জেলা তথ্য : নোয়াখালী, ২০০৫, সমন্বিত উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবস্থাপনা পরিকল্পানা প্রকল্প।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


