বৃদ্ধ কালে- যখন চামড়ার ভাঁজে মানচিত্র জ্বলবে ব্যর্থ অতীতের। প্রিয় দোয়েল, ঝলমল দুপুর, নারকেল পাতার চশমা; বিশেষ করে আমার সন্তান বার্ধক্যে খোঁচা মেরে প্রশ্ন তুলবে- বাবা মাটির দায় শোধের আর কতো? আমাদের জন্য রেখে যেও না কিন্তু- অনেক দায় সামনে। ... অবশ্যই সন্তানের চাইতে আমি বেশি চালাক। বলবো- ওহ্ ! বাবা আমাদের যৌবন ছিলো টানাটানির। ফরমালিন আর ভেজাল কীটনাশকের যুগে তোর মায়ের বুকের দুধের অকুলান ছিলো। তোর জন্য ডানো আর চেরিলাক কিনতে কিনতে দিন শেষ হতো। অন্য প্রশ্ন যেমন- তোমার যৌবনের বয়সসীমা কতো ছিলো, প্রতিদিন কয় ঘন্টা ঘুমাতে... আশাকরি এমন প্রশ্ন করার মতো বুদ্ধি আমার বীর্যে ছিলো না। তবুও নিষ্কলুষ বাতাসের মগজ যদি শিখিয়ে দেয়; তখন বলবো- তোর মা'র আবার ঘনপ্রস্রাবের ব্যারাম ছিলো, আমার বাতের অসুখ তার উপর হাই প্রেসার। আমরা পাশের ঘরের মতিনদের মতো সুস্থ্য ছিলাম না। মতিনের কথা আসতেই যদি তার মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলের কথা জিজ্ঞাসা করে। যদি তার জঙ্গী হওয়া নিয়ে আমার দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তোলে, তখন? তখন হয়তো ব্যবসার মন্দার কথা আর ক্ষুদ্র ঋনের ঝামেলার কথা বলে পার পাওয়া যাবে। সে ঝামেলাতো প্রায় ছয় মাস ছিলো।
এখন আমার সময় হয় না পাশের ঘরের মাদ্রাসা পড়ুয়া মতিনের ছেলের দিকে নজর রাখতে। সে কি পড়ছে, কি করছে? দেখতে রাজি নই গ্রামে বোরকা পড়া দলবদ্ধ মেয়েদের কর্মযজ্ঞ। কি বুলিয়ে শিখিয়ে চলছে আমাদের গৃহীনীদের। কোন ঐশী গ্রন্থের আলোয় আমাদের ঘর আলো করছে। ব্যবসায়ীক কাজে ছুটে যাচ্ছি প্রতিক্রিয়াশীলদের ব্যাংকে, অসুস্থ হয়ে লুলিয়ে লুলিয়ে তাদের ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের সাইনবোর্ডে চোখ রাখি। আমার এলাকার নির্বাচিত প্রতিনিধিকে প্রশ্ন করার সময় নেই, জবাবদিহিতায় বাধ্য করতে অপারগ। তারাতো কথা দিয়েছিলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের। আমরা সে কথা কখন বুঝে নিবো?
আমার সন্তান যখন দু'একজন যুদ্ধাপরাধীদের উত্তরসূরী বন্ধুদের কথা বলবে তখন আমিও বলবো পাওনাদারের টাকা শোধে সাহায্যের কথা। বলবো তার জন্মের সময় গাড়ি ধার দেয়ার কথা। আশাকরি সে বুঝবে, অবশ্যই বুঝবে।
তাকে আরও বলবো পুকুরের মাছে মড়ক লাগার কথা, ঘন ঘন জ্বর হওয়ার কথা, ভেজাল হাইব্রীডে ফসলের ক্ষতি, প্রতি বর্ষায় উঠোনে পানি উঠার ঝামেলা, ঘরের কাঠে উইপোকার আক্রমন, গরুর ক্ষুরারোগ... এমন আরো কতো সমস্যায় আমরা ভুগতাম। বলবো- বাবারে, চব্বিশ ঘন্টার একটা দিন, আট নয় ঘন্টা কাটতো ঘুমে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাগা মুতা শেষে তোর মা'র অসুস্থ শরীরের নাশতা খেয়ে যখন ব্যবসায় যেতাম। তখন অনাদায়ী দেনা খাতায় টুকতে টুকতে বুকের ব্যাথা টের পেতাম। কি রেখে যাবো তোদের জন্য! সবইতো মানুষের পেটে চলে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে দোকান বলে সারাদিন বালু ঝাড়তে ঝাড়তে হাত ক্ষয়ে গেছে। দেখ দেখ! আমার হাতে কোন রেখা নেই। ভাসান ঠাকুর ভাগ্য গণণা করতে পারে না।
আমার সন্তান আমার অনুগত। খুবই ভদ্র এবং বিনয়ী সন্তানের বাবা আমি। সে আমার সন্তান। শুধুই আমার। অবশ্যই তার কাছে আমাকে কোন জবাবদিহি করতে হবে না। তবুও দু:স্বপ্ন এসে হানা দেয় স্বপ্নে- রাতের আন্ধারে। এতটুকুন বাচ্চা এসে আমাকে প্রশ্ন করছে- " এতো ব্যস্ত ছিলে তুমি, কিন্তু আমাকে জন্ম দেয়ার সময় কখন পেলে? সন্তানের জন্য একটি হায়েনা মুক্ত সমাজ নির্মাণে ভূমিকা রাখতে না পারলে, কেনইবা জন্ম দিলে?"
আমার জবাব দেয়ার সময় পর্যন্ত স্বপ্ন টেকে না। বিছানায় থেকেই হাতড়াই জলের গেলাস।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


