সামনে পেছনে জোনাক জ্বালিয়ে চলা গাড়িসহ ওই রাস্তার পাশের ধানের খেতের আইল চষে দৌড়াতে থাকা যুবককে হঠাৎ দাঁড় করিয়ে বলেছিলাম- না’গো, এদিকে এখন আর অষ্টাদশের কুঁচি মেলানো শাড়ি পরা নায়িকারা আসে না, আপনি ডান পাশের শ্বেতপথ ধরে নেমে যান জলাশয়ের ঢালে; একটু এগুলেই নিরন্তর জ্বলতে থাকা মাঝ রাতের চাঁদের ছায়া পাবেন সামান্য জিরিয়ে নেয়ার জন্য... আপনি সুখী হবেন। দরজা বন্ধ কারাগারের খোলা জানালার ভেতরে বন্দী আমি তখনো চিৎকার করছিলাম আর যুবকটি হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছিলো একটু একটু করে ওই জলাশয়ের কিণারে, যেখান থেকে উড়েছিলো এ গ্রামের সম্ভাবনাময়ী কিছু বালিকার পায়ের নুপুর এবং নুপুরের নেশানীল জোছনার যৌবন পুরো আকাশে আকাশে। এখন একদল বালিকা শরীর থেকে কামপুরুষের প্রেমদৃষ্টি খুল খুলে রাখছে আর অন্য একদল বালিকা আগেই খুলে রাখা পায়ের নুপুরে আগুন লাগিয়ে পাশে পছন্দসই গল্পের পুস্তক আর গত শরতের বিখ্যাত সব স্থিরচিত্র মেলে রেখে শীত পোহাচ্ছে একশ একটি স্ত্রী মাড়কসার সাথে; তাদের মনে কুয়াশা নেই এবং আংগুলের ডগায় অভিমান নেই, বরং একই সাথে জাল ও সংসার বুনতে পারে বলে শরীর বেয়ে সুখ ছড়িয়ে পড়ছে জোনাক রোডের দু’ধারে। জোনাকরা এমনই ধারালো সুরে শব্দ করে, যেন আলোয় গলে গলে লোহারঙা শক্তকাঠিগুলো জানালা থেকে সরে শীতপোহানো বালিকাদের দেশে চলে যাবে, তারপর সুখে শান্তিতে বসবাসের কোন এক নিশ্চুপ অমাবশ্যায় ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাওয়া যুবকের জন্য ব্যাথা অনুভব করবে আর আমাকে অভিশাপ দেবে দু’হাত মাটিতে গেঁড়ে চোখ বন্ধ করে জোনাকের সুরে সুরে। অথচ শেষ নেই এই কারাগারের! শেষ নেই শারিরীক অন্ধকারের রাগ ক্ষোভের মিশ্রণে তৈরি সাদামাটা সকালের প্রথম দোয়েলের নাচের দূরত্বে আমার উদাস চাহনির অহেতুক পরিশ্রম; যার পরই ঘুমিয়ে পড়ি সামান্য সামান্য করে দোয়েলের পায়ের দাগে পরবর্তী নৃত্যের আনন্দসহ কারাগারময় নি:সঙ্গতায়।
যদি এ যুবকই আবার ফিরে আসে অপ্রাপ্তির খেরোখাতায় আমার নামের অংশে লালমার্ক সহ এক অপরিচিত অথচ সুন্দর অন্যকোন সময়ে জোছনার ফাঁকগলা ফর্সা পথের মাঝখানে বাকিসব পথিককে পেছনে ফেলে কেবল আমার জন্যই অকথ্য সব কবিতার অত্যাচারে পুড়ে যাওয়া তার একাধিক নি:শ্বাস সহ!
যদি সে প্রশ্ন তোলে- হে জানালাপাশী, কি নাম তোমার?
ওড়নায় কামড়ের তুফান তুলে রাক্ষুসী এক চাহনি এনে বলবো- পারু গো... ছোট্ট নাম আমার।
তারপর যদি প্রশ্ন তোলে জানালার পাশে কি বেশি সুখ?
– এ যুবক সুখ চেনে...! এমন আনন্দে আমার হা হা হা হাসির শব্দ শুয়ে থাকা জলাশয় পেরিয়ে প্রেমগামী যুবককে পাশ কাটিয়ে অন্যান্য যত্তোসব কাশ কেয়া ছুঁয়ে ছুঁয়ে মাথাভাঙা মন্দির ছাড়িয়ে মূর্ছা খাবে সাধু পুকুরের চার পাড়ে; যেখানে ক’দিন আগেও জারজ শিশুদের উৎসবে বাউল গানের আসর জমতো আর অর্বাচীন পথিকেরা জলে ডুব দিয়ে ফিরে না আসলে আমরা পাখি বলে গুনে নিতাম মানুষের শুমারীতে। হয়তো তারা এ যুবককে চেনে না বা চিনেও অস্বীকার করবে ঠিক ধরতে না পারা কোন ভয় থেকে; কারণ আগেও জোছনাক্রান্ত বড়পাখির শরীরে ভয় পেয়ে মোটাগাছের ছায়ার অমাবশ্যায় লুকিয়ে যেতে আরাম পেতো এবং চোখ বন্ধ করে শয্যা সংগীর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়তো অন্ধকার ভালোবেসে- তারা একে অপরকে ভালোবাসতো বলেই পাশাপাশি শুয়ে থাকতো এবং পূর্ণিমা খুঁজে পেতো এবং মিথ্যাচার করতো।
এখনও আমি জানালার পাশে স্থির। আর যুবকটি ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে জলাশয়ের পাশে ধান উঠে যাওয়া প্রাচীন চরের মতো হাহাকারের উৎসবে; যার বুক ভরে চিৎকার করে হাসে আমার ঘরের কোণ থেকে পালিয়ে যাওয়া এক জোড়া কবুতর, ওরা আবারও চৌচির ফাঁকে খুঁজতে থাকে সম্ভাবনার ধান অথবা শান্তনার পরিচ্ছন্ন বৃষ্টি ভেজা জোনাকের সংসার। আসার পথে ঝনঝন বেজে ওঠবে জামিনপ্রাপ্ত বালিকার নুপুর এবং পুনরায় মানুষ হওয়া পাখিদের গল্পগুজব। আজ একটি গাড়িতেও কোন লাশ যাবে না এবং কোন প্রসবমুখী নারী যাবে না অথবা স্ত্রীগামী পুরুষ যাবে না। জোনাকরোডে হাসতে হাসতে দুলতে দুলতে স্বপ্নবান মানুষেরা বকেয়া গল্প আদায় করবে আর কেবল ওই যুবকটিই ফিরে আসবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মে, ২০১২ রাত ১:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


