(১)
তিন মাস হলো মোজাম্মেল মারা গেছে। যদিও এ গ্রহ থেকে এখনো বিদায় নিতে পারেনি। বিদায় নেয়াটা খুব গুরুত্বের কিছু না। কিন্তু পৃথিবী যদি তাকে নাই ছাড়বে, তবে অপ্রয়োজনীয় ঘোষনা করলো কেন? গত সকালে দেখা গেলো নান্টুর দোকানের গলিতে সিগারেট খেতে খেতে যাচ্ছে। বিকেলের দিকে ইয়াসমিনদের বাড়ির চারপাশে ঘুরতে দেখা গেছে। অথচ তার মা এখনো বুক চাপড়ে মোজাম্মেল মোজাম্মেল বলে ম্যাৎকার করে। আগের চাইতে ফর্সা হয়েছে, দেখলেই বুঝা যায় কয়েক পাউন্ড ওজনও বেড়েছে। বয়স ত্রিশ পেরুনোর পর থেকে উচ্চতায় কোন পরিবর্তন আসে না। মৃত্যুর পরও না। এখন সুতী কাপড়ের চাদরে জমিদারি প্যাঁচ দিয়ে গ্রহের দায়িত্ববান দাসের মতো হাঁটাচলা করে।
রাতের শুরুতে মোজাম্মেল মহল্লায় নেই। আবার মানুষের মুখে মুখে এ ক’দিন অবিরাম ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুরো মহল্লায় অন্তত একশ মানুষতো তাকে নিয়ে ঘোর চিন্তিত। ধোঁয়া উড়াতে উড়াতে ন্যাংটা কালের বন্ধু জসিমের চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেও জসিম ছুঁয়ে দেখলো না। মোজাম্মেলেরইবা কি অমন গরজ পড়লো যে, চোখ উল্টিয়ে চেয়ে দেখতে হবে! মানুষ মরে গেলে তার সাথে কথা বলা যাবে না- এমন যুক্তিতে যে নি:শ্বাস ছাড়ে, তার সাথে অন্তত আত্মিক সম্পর্ক থাকতে পারে না। অথচ মরার আগেরদিনও মোজাম্মেলের সাথে বিড়ি ভাগ করেছিলো জসিম। ওই বিড়ির শেষ অংশ খেয়েছে আবু নাসের। নাসের এখন দেশে নেই। জীবিত থেকেই ইউরোপে গেছে শক্তি বিক্রি করতে। তবু দেশের জন্য কি টান। প্রতিদিন বাড়িতে একবার ফোন না করে ঘুমোতে যায় না। টান থাকলেই কি আর না থাকলেইবা কি। দেশেতো আর থাকতে পারলো না। অথচ মোজাম্মেল মরে গিয়ে দিব্যি মহল্লায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ বিষয়টাতে যে লজ্জিত হবার এমনকি অপমানে কিছুদিন ঘরের বার না হবার মতো যুক্তি আছে, তা ধরার মতো দেমাগ আবু নাসেরের নেই।
অতোততো ভেবে জীবিত মানুষগুলোকে বিরক্ত করার কোন মানে নেই। মোজাম্মেল এখন রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে। এ যায়গায় আসতে কখনোই আগ্রহী ছিলো না বেঁচে থাকতে। সেখানে কেনইবা যাবে? রেল ষ্টেশনেতো রেলগাড়ি থাকে না! আসলে আবার চলে যায়। ইয়াসমিন একবার বলেছিলো স্টেশনের ওভারব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে মোজাম্মেলের হাত ধরে পোলাপানের ঘুড়ি উড়ানো দেখবে। কিন্তু স্টেশনের মালিকদের ভয়ে মোজাম্মেল কখনো রাজি হয়নি। নেশা ধরা পতংগগুলো যদি প্রেমিকার সামনে মোজাম্মেলের প্যান্ট খোলা শুরু করে! এ ভয় মনের ভেতর সারাক্ষণ কুত কুত খেলতো। যদিও ইয়াসমিনকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেনি। চাচাতো ভাইকে বিয়ে করার পর ঘরে প্রথম সন্তান আসার আগ পর্যন্ত মোজাম্মেল ‘আমার ইয়াসমিন” বলার সুযোগ পেতো। নবজাতক মেয়েটি স্বামীর সাথে ইয়াসমিনের সম্পর্কের মাঝখানে সুকঠিন খুটি গেঁড়ে দিয়েছিলো। মৃত্যুর পর মোজাম্মেলের ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে। সে এখন অনেক কিছুই ধরে রাখতে পারে। এ মূহুর্তে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলোর ভিড়ে সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়া স্টেশন মালিকরা ব্যক্তিগত নৈপুন্য ধরে রাখতে ব্যস্ত। নেশার ঠোকরে শেষ হয়ে আসা মানুষগুলোর চোখে মুখে কোটি টাকার প্রশ্ন ঝুলে আছে। টাউন হল, পৌর হল, সিনেমা হল, দামী দামী রেস্টুরেন্ট, নাইট ক্লাব, সবকিছুতো ভদ্রলোকদের জন্য ছেড়ে দিলো। তবুও কেন তারা স্টেশনে আসে!
মোজাম্মেলের মৃত্যুর পর পৃথিবীর কোন পরিবর্তন হয়নি। প্রতিদিনকার মতো আজও সময়মতো ট্রেনের আসা যাওয়া হচ্ছে না। কিন্তু স্টেশনে কেন এলো, কি কাজ এখানে- মনে করতে পারছে না সে। পাঁচ ফুট গুন তিন ফুট স্কেলের একটি দৃশ্য চোখে ধরে রেখে মনে করার চেষ্টা করছে। ধরে রাখা ফ্রেমের মধ্যে অনেকেই ঢুকে পড়ছে, আবার বের হয়ে যাচ্ছে। কেউ স্থির নয়। ডান পার্শ্বের পিলার এর আড়ালে আজ রাতে ভাড়া যাবার জন্য একটি মানুষ দরদাম করছে। কিন্তু মনে হচ্ছে সে প্রতারিত হবে। কারণ কতজনকে সেবা করার জন্য ভাড়া যাচ্ছে, বিষয়টির কোন আলাপ হয়নি। এমন ম্যাড়ম্যাড়ে চুক্তিতে মেয়েটির যাওয়া ঠিক হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত মনে হয় মেয়েটি যাচ্ছে। আগামীকাল আবার এখানে আসতে হবে। এ ঘটনার ফলোআপ জানার দরকার আছে।
(২)
পেছনে পেছনে একটি মানুষ অনেকক্ষণ হেঁটে আসছে। এখন পর্যন্ত প্রায় দশটি গলি পেরিয়ে এলেও ওসবের কোনটিতেই তার বাসা নয়। এতদূর পর্যন্ত এক সাথে হেঁটে এলে সম্পর্কের সম্ভাবনা থাকে। মানুষটি কথা বলতে চাইলে মোজাম্মেল কি করবে, কথা বলবে? যদি প্রশ্ন করে “ভাই কই যাইবেন?” মোজাম্মেল কি বলবে? যদি সত্য বলতে যায়, তবে বলতে হবে “ইরেকথিয়াম মন্দিরের প্রথম দেবী এথেনার কাছে যাবো?” কিন্তু সে যদি এথেনার হাতে বসে থাকা পেঁচা দেখতে সাথে যেতে চায়, তখন কি করবে? অসমাপ্ত এ মন্দিরের নির্মানকাজ সমাপ্ত করতে মানুষের মাথার প্রয়োজন, আমি যাচ্ছি মাথা জমা রাখতে- এমন ভয় দেখিয়ে ঝেটিয়ে বিদায় করা যাবে। অন্তত এ ভরসা পাচ্ছে মোজাম্মেল। ভাবনা অন্য দিকে ঘুরিয়ে এথেনার পেঁচা বানানোর সময় শিল্পীর লুচ্চামির কথা মনে করে মুখে জমা থুথু গিলে খেলো। রতি দেবীর অর্ধাবৃত বুকের দিকে বড়বড় করে তাকিয়ে থাকা পেঁচার চোখ দু’টো অযথা স্বাভাবিকের চেয়ে বড়ো করে বানিয়েছে ফিডিয়াস। গ্রীকরা প্রেমিক ছিলো প্রেমিক ছিলো বলে এখনকার শিল্পবোদ্ধারা গদগদ আলোচনা করেন। অবশ্য কোন বর্বর মানুষ মানবতাবাদী হলে সেখানে ফাঁক ফোঁকর অনেক কম থাকে। তবে বুদ্ধিমান গ্রীকরা নিজেদের সংস্কৃতি সমৃদ্ধ করার আগ পর্যন্ত মানবতাবাদের দিকে ঝুঁকেনি। ইয়াসমিন কেবল প্রেম বুঝতো, মানবতাবাদ বুঝতো না। বিয়ের পর আর প্রেমও বুঝতে পারেনি।
দাদীর কবরের পাশে গতকাল একটি হাসনাহেনার চারাগাছ রুইয়েছিলো। আজ সেটাতে ফুল ধরবে। ফুল না ধরলে মোজাম্মেল হতাশ হবে। সে ফুলের ঘ্রাণ যেখানে শেষ হবে, ঠিক সেখানেই একটি চিঠি আসার কথা।কিন্তু গতকাল থেকে এখন পর্যন্ত তার মনের অবস্থার কোন পরিবর্তন নেই। দাদীর কবর দখল করে নিয়েছে অদ্ভুত সব লতাপাতা। কারো জন্ম পরিচয় ঠিক নেই। কয়েকটি লতা খুব বিচ্ছিরি। কবরের আর প্রাণ থাকলো না। মোজাম্মেল জানে না তার দাদী এখন কেমন আছে। মাটির ভেতরে ঠিকমতো দম ফেলতে পারছে কি না, এ নিয়ে চিন্তার কমতি নেই। পৃথিবীর কবরগুলো তার ভালো লাগে না। ভেতরে কোন আলোর ব্যবস্থা নেই, নি:শ্বাস বেরুবার দরজা জানালা কিছু নেই। দাদীর জন্য এ মূহুর্তে খুব কষ্ট অনুভব করছে। বেশি কষ্ট পেলে মোজাম্মেলের জলবিয়োগের তাড়া পড়ে, তাই কষ্টকে আর বাড়াচ্ছে না। তিনদিন হলো পুরুষাংগ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে করে হয়তো এক সময় তার চোখ দু’টোও হারিয়ে যাবে। কিন্তু শেষ ভরসা জিহ্বায় একবার পচন ধরলে আর রক্ষে নেই। তার আগেই হিসাব নিকাশ চুকিয়ে নিতে হবে।
পৃথিবীর আদিম মানুষগুলোর মগজ বেশ ওজন ছিলো। তাদের কবরগুলোও সুন্দর ছিলো। আয়তকার একচালা ঘরের মতো মাস্তাবার প্রাচীরে ইট পাথরের ফাঁক দিয়ে অন্তত কিছুটা আলো ঢুকতে পারতো এবং নি:শ্বাস বেরুতে পারতো। অন্ধকার ঘরে আর যাই হোক অন্তত স্বপ্ন দেখা যায় না। প্রচুর আলো দরকার। মোজাম্মেল চলে যাবার আগে একটি মাস্তাবা বানিয়ে নিবে। নইলে পৃথিবী ছাড়ার কোন মানে হয় না। পরনের প্যান্ট একটু নামিয়ে উরুর ওপর টুকে নিলো বিষয়টি।
(৩)
ট্রোজানের গোড়াগুলি ঢুকে পড়েছে মোজাম্মেলের চোখের ভেতর। ঈশ্বর যেভাবে ফাঁকি দেয়া শুরু করেছে, চোখের ভেতর সাংকেতিক উপন্যাসটি আর বাঁচানো গেলো না। অথচ বুকের ফাঁকে এখনো লুকিয়ে রেখেছে ইয়াসমিনের রংধনু। বেগুনি রং বাদ গেলো বলে নিতে রাজি হয়নি সে। ইয়াসমিন ফিউচারিজমকে স্বীকৃতি দেয়নি কখনো। কবি মারিনেত্তিকে উন্মাদ বলে বাতিল করে দিলো, তারপর থেকে দক্ষিণের জানালা আর খোলা রাখতে দেখা যায়নি। এভাবে আর কতো! সর্বশেষ হারিয়ে ফেললো কিউপিডের সবচে’ সুন্দর ঘুম ভংগি। এর আগে হারিয়েছে পিয়েটাকে। এভাবে সব ঘুম হারিয়ে গেলে মোজাম্মেল কি নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে! ভয়ে ভয়ে ফুসফুসের ভাঁজ থেকে মানচিত্রটি বের করে দেখে। অনেকদিনপর আবার মানচিত্রটি বের করলো সে। কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। দক্ষিণের দিকে দখলের উৎসব হবার মতো ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। চরের পর চর মানুষ জাগছে। নৃশংস জল কমছে। এ মানচিত্রের দায় শোধ না করে পৃথিবী থেকে যেতে পারবে না, কখখোনো না। ঈশ্বরের কাছে মানচিত্র বুঝিয়ে দিয়ে তারপর মাটির গায়ে জিহ্বা লাগিয়ে বুঝে নেবে রক্তের তাপমাত্রা। পরে অবশিষ্ট ঘুমভংগি নিয়ে বিদায় নেবে মোজাম্মেল। ঈশ্বর ছাড়া এ মানচিত্র আর কেউ বুঝবে না। তিনিই এর যত্ন নিবেন। প্রতিদিন নিয়ম করে জলে ভেজাবেন, রোদে শুকাবেন।
পুরো গোরস্থানে একটি পেঁচা ছাড়া আর কিছু দেখছে না। চোখ দু’টো এথেনার পেঁচার মতো নয়। কিন্তু কোন পুরাণে ঈশ্বরের পেঁচারূপী অবতরনের গল্প পড়েনি, তবে কি মোজাম্মেলের মৃত্যুর পর এ পরিবর্তন হয়েছে? ঈশ্বর বলেছিলেন, আজ তিনি কোনভাবেই ফাঁকি দিবেন না। অথচ এখন পর্যন্ত সাদা পোশাকের কোন আলোর মানুষ দেখা যায়নি। ঈশ্বরতো অবশ্যই কোন সুদর্শন মানুষের মতো হবেন। যদি ঈশ্বরের হাতে মানুষের সৃষ্টি হয়, অথবা মানুষের হাতেই ঈশ্বরের সৃষ্টি হলো-কথাতো একই, তবে ঈশ্বর অবশ্যই মানুষের মতো। পেঁচাটির গতিবিধি সন্দেহজনক। মোজাম্মেলের সাথে তার দূরত্ব কমে এসে এখন চার গাছে ঠেকেছে। এগিয়ে এসেছে আরো চারটি। কিন্তু কোন আলো নেই। মানচিত্র হাতে ধরা আছে শক্তভাবে। অনেক চেষ্টাও পেঁচা তার ঠোঁট বসাতে পারবে না। ধীরে ধীরে সব ভুলে যাচ্ছে। বারবার মনে পড়ছে ঈশ্বর আসার আগে ঘুম আসবে, তার আগে ভংগি আসবে। এতোদিন পর ক্লান্ত মোজাম্মেলের পেট থেকে বেরিয়ে পড়লো মাইকেলাঞ্জিলোর বাচাস। মানচিত্রের তর্জনী ধরে ঘুম ঘুম চোখে দাঁড়িয়ে রইলো সে।
(৪)
: এ নিন মানচিত্র। আমি চলে যাবো।
: কিসের মানচিত্র?
: বাংলাদেশের মানচিত্র চিনেন না?
: আমার দ্বিধা ফাঁকে কিছু মানুষ এ মানচিত্র বানিয়েছে। এসব আমার সৃষ্টি নয়, আনন্দ নেই।
: আর বাকিসব গানের দ্বায়িত্ব?
: আমি দেখেছি খালি পায়ের মিছিল আর জমিন ভরা ভাষণ। তারপর কিছু মনে নেই। তখন আমাদের ওখানে স্বস্তি ছিলো না। আমরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম। এ সময় অপেক্ষায় অস্বীকার কিছু তীব্র মানুষ মানচিত্র বানিয়েছে। এর দায়িত্ব ঈশ্বরকে নিতে বলো না। আমরা জানি এখানকার মানুষজন প্রতিদিন আমাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। সময়ে অভাবে মানচিত্রটির কোন তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এর গঠন প্রকৃতি কিংবা তেজ সম্পর্কে আমাদের কোন ধারনা নেই। প্রচুর মানচিত্র আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, দাপ্তরিক সংযোগহীনতায় প্রশাসনের শৃংখলা প্রায় ধ্বংস হতে চলেছে। তুমি চলে যাও। এখন আর মাস্তাবা নির্মাণ সম্ভব নয়। প্রচলিত কবরে শুয়ে পড়ো। বাদবাকি আনুষ্ঠিকতা আমরা সেরে নিবো। তোমার বিস্তর অপচয় হচ্ছে, আমরা বিপদে পড়ে যাবো।
(শেষ)
মোজাম্মেল আর নেই। মৃত্যুর তিনমাস দশদিনের মাথায় গ্রহ ছেড়ে চলে গেছে। মানচিত্র পড়ে আছে গোরস্থানের সবচে প্রাচীন কবরের পাশে। প্রতিদিন প্রচুর অসফল মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে – মৃত্যুর আগে এ নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মোজাম্মেলের বিদায় গ্রহবাসীর জন্য উল্লেখযোগ্য কোন ঘটনা নয়।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে মার্চ, ২০১৩ বিকাল ৪:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


