যখন আমি একজন বাবা-মা এর সন্তান :
মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েছি তাতে কি ? যারা বড় দুঃখে দঃুখিত হয়ে আমার বাবা-মা কে বলে, ঈশ্ তোমাদের বুঝি আর বংশ প্রদীপ জ্বলবে না, দেখার কেউ থাকবেনা....। মনে হয় আলোর ঝলকানি দিয়ে অন্ধ করে দিই ওদের চোখ, দেখিয়ে দিই আমার ভেতরে আলো তীব্রতা কত কঠিন। যে আলো দিয়ে যুগ যুগ ধরে কত বাবা-মায়ের মুখ আলোকিত করে আসছি। কতটি জাতির প্রতিনিধিত্ব করে পৃথিবীর বুকে জ্বালিয়ে দিয়েছি সত্যের আলোকবর্তীকা! তবু তোমাদের ঐ বংশে কি আমার আলো পৌছে না ? বলতে পারো, ঠিক কত আলো হলে তোমাদের বংশের ঐ প্রদীপটি জ্বলবে ?
যখন আমি একজন ভাইয়ের বোন :
যখন আমার ভাই আমাকে আবদার করে বলেছিল আপু এবার মেলায় কিন্তু আমাকে একটা বাঁশি আর একটা বল কিনে দিতেই হবে। আমি কি দিতে পারিনি ? ৭১’র যুদ্ধ থেকে প্রতিটি স্বাধীনতার যুদ্ধে যোদ্ধা ভাইয়ের কাতারে আমাকে কি চোখে পড়েনি! আমি যেমন আমার ভাইয়ের শক্ত হাত ধরে স্কুলে যেতে পারি তেমনি নিজের হাতটি শক্ত করে পাথর ভেঙে খাওয়াতে পারি আমার ভাই কে। সত্যিই পারি। তবে কেন সেই ভাইয়ের নাম ভাঙিয়ে হিংস্র নেকড়ের মত আমার মাংশের স্বাদ নিতে আসে আমাদের সমাজের ঐ মুখোশধারি জানোয়রের দল ?
যখন আমি পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী :
আমি এক পুরুষের অর্ধ অঙ্গ। জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখ। পুরুষের প্রেম, প্রেরণা, শক্তি, সাহস। আমি হলপ করে বলতে পারি, আমার ভেতরের রহস্য তোমার মাঝে যে তীব্র আকর্ষণ সৃষ্টি করে তা পৃথিবীর সমস্ত চৌম্বকীয় শক্তিকেই হার মানায়। সময় পেলে একবার চোখ বুঝে কল্পনা করে দেখো ,আমার ভালোবাসা তোমার কাছে শরতের জোসনা রাত, না হয় গ্রীষ্মের দুপুরে শীতল পাটির মত মনে হবে। আমাকে বাদ দিয়ে ও জীবন কে একবার ভেবে দেখো ; বর্ষার বিষণœ দুপুর ছাড়া আর কিছুই মনে হবেনা। বুকে হাত দিয়ে বলো তো তোমার কপালে আমার চুম্বন যুদ্ধ ক্ষেত্রে তোমাকে দ্বীগুণ শক্তি দিয়েছিলো কি না ? অস্বীকার করতে পারো তোমার মাথার রাজমুকুট ; সে কার জন্যে? এই অর্ধাঙ্গকে বাদ দিয়ে তোমরা কিসের উন্নতির কথা ভাবো! আজ তোমার অঙ্গের একটি অংশকে আঘাত করতে একটু ব্যাথাও লাগেনা তোমার, একটিবার ও কেপে ওঠে না তোমার ঐ পাষাণ বুক । তোমরা পুরুষ বটে !
যখন আমি মা:
আমার শরীরের বিন্দু বিন্দু রক্ত মাংশ দিয়ে তৈরি করেছি তোমাকে। পৃথিবীতেই নরক যন্ত্রনার স্বাদ নিয়েছি, তবু তোমাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছি। তোমার স্বার্থে নয়, নিজের স্বার্থে তোমাকে ভালোবেসেছি। কারন, তোমাকে ভালোবাসার মাঝে যে আত্বতৃপ্তি পেয়েছি তা পৃথিবীর কোন কিছুতে খুঁজে পায়নি। স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ও আমাকে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ আজ আমার পায়ের নিচে বেহেশ্ত’র বদলে তোমার পায়ের লাথি লাগে আমার বুকে। আজ আমার প্রিয় সন্তানেরা অতিরোক্ত ভালোবেশে আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে! তাদের প্রিয় টাকাগুলি খরচ করে আমার জন্য সুখ কেনে। প্রিয় সন্তানেরা, ভয় নেই, অন্তত তোমাদের কিছু বলবনা। কারণ ? আমি একজন মা।
কবি-জন মিল্টন নারীর হয়ে একটা কথা বলেছিলেন-
“আমাকে জানার স্বাধীনতা দাও, আমাকে অবাধে কথা বলার স্বাধীনতা দাও, আমাকে মুক্তভাবে কথা বলার স্বাধীনতা দাও। বিবেকের স্বাধীনতা দাও, চিন্তার স্বাধীরতা দাও। সবার উপরে দাও আমাকে মুক্তি।”
আমি বলতে চাই আজ পৃথিবীতে নারীর অবমূল্যায়ন দেখে নিজের প্রতি করুনা হয়। অন্যায়, অত্যাচার, অনাচার, অসম্মান, অপমান, ধর্ষণ -কোনটা বাদ আছে আর! তবু যখন মনে হয়, আমি কারো আদরের ধন, কারো শক্তির উৎস, কারো জীবনের বেহেশত্ হয়ে আছি, ছিলাম এবং থাকব, তখন নিজেকে ধন্য মনে হয়।
তোমাদের কাছে আমার একটাই চাওয়া- আমাকে মূল্যায়ন না কর অবমূল্যায়ন করনা, সম্মান কর আমার সততা কে, স্বীকার করে নাও আমার অস্তিত্বকে।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই নভেম্বর, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


