৩৮ বছর আগে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের কসাই নামে কুখ্যাত পাক সেনাবাহিনীর অধিনায়ক টিক্কা খান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান রাইফেলসের সদরদপ্তর এই পিলখানাতেই নৃশংস হত্যালীলা চালিয়েছিলেন। তখন পাকবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিলেন বাঙালি জোয়ানরা। আর আজ ৩৮ বছর পরে সেই পিলখানাতেই যে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হলো তাতে প্রতিপক্ষ কিন্তু পাক সেনারা নয়, বাঙালির সঙ্গে বাঙালির যুদ্ধে রক্ত ঝরলো বাঙালিরই! স্বাধীনতার পর বিডিআর বাহিনী সংগঠিত করার দায়িত্ব পড়েছিল মেজর জেনারেল চিত্তরঞ্জন দত্ত (বীরউত্তম)-এর ওপর। ৭২-এর আগস্ট মাসে তিনি দায়িত্ব নেন। বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআর নামকরণও তাঁরই। সেই চিত্তরঞ্জন দত্ত আজ এক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে জানিয়েছেন ঃ আমি ভাবতেই পারি না আমার হাত দিয়ে সংগঠিত এই বাহিনী এই রকম একটা রক্তাক্ত ঘটনার জন্ম দিতে পারে। আমি সহ্য করতে পারছি না। টেলিভিশনে দেখলাম মুক্তি পায়ার পর কয়েকটি শিশু তাদের বাবা মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আবু আবু বলে কাঁদছে। আমি টেলিভিশন বন্ধ করে দিয়েছি। বিডিআর জওয়ানরা অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত আমি জানি। তাদের প্রতি হয়তো অবিচারও হয়েছে। ক্ষোভ থাকতে পারে। কিন্তু তাই বলে এইরকম হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হবে ওরা? নারী হত্যা করবে? শিশুরা অনাথ হয়ে যাবে? ড্রেন থেকে, কামরাঙির চর কিংবা নবাবগঞ্জ এলাকা খেকে যখন একের পর এক সেনা অফিসারদের লাশ উদ্ধারের ঘটনা জানতে পারছিলাম--নিজের ওপরই ধিক্কার এল। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, আমি ৪নং সেক্টরের কমাণ্ডার ছিলাম। কিন্তু এখন বড়ো অসহায় লাগছে!' --জেনারেলের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে।
পিলখানায় সংগঠিত ঘটনার সঙ্গে টিক্কা খানের হত্যালীলার কি কোনো উদ্দেশ্যগত মিল আছে কোথাও? বিষয়টা নিয়ে নানান মহলে ভাবনা শুরু হয়ে গেছে। এই ঘটনার পেছনে অনেকেই বিদেশি শক্তি এবং দেশের অভ্যন্তরে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মৌলবাদী গোষ্ঠীর চক্রান্ত কাজ করেছে বলেও অনেকে মনে করছেন। প্রশ্ন উঠেছে, মূল লক্ষ্য কি তাহলে সদ্য ক্ষমতাসীন সরকার? মাত্র ৫০দিনের কার্য্যকালে হাসিনা সরকার এমন কিছু স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা নিতে চলেছে যা বেশ কিছু মহলের আদৌ পছন্দ হচ্ছে না। বিশেষ করে যুদ্ধপরাধীদের বিচার, মুজিব-হত্যার বিচার শেষ করা, মুজিবের অসাম্প্রদায়িক চেতনার পুন:প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন করে বাংলাদেশের বিকাশ উদ্যোগ--এসব ছাড়াওট্রানজিট ইস্যু, চট্টগ্রাম বন্দর ইস্যু, অনুপ চেটিয়াকে ভারতসরকারের হাতে প্রত্যার্পনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মাটিকে প্রতিবেশি কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলার কাজে ব্যবহার করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত--ইত্যাদি প্রকৃতপক্ষে কাদের পছন্দ নয়? বিএনপি-জামায়েতের আমলে চট্টগ্রাম বন্দরে ১০ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনার নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই। বাংলাদেশ গোয়েন্দা সংস্থার পাকিস্তানের আইএসআই-এর ছায়াসঙ্গী হয়ে ওঠার কারণে সংস্থার প্রধান সহ বেশ কিছু উচ্চপদস্থ আধিকারিককে বিদায় দেওয়া সহ বেশ কিছু সরকারি সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের সঙ্গে গলাগলিতে অভ্যস্তদের কাছে ভয়ানক বিপজ্জনক হয়ে ওঠার কারণে এমন ধ্বংসাত্মক কাণ্ড ঘটলো না তো? এমন কি ভাবা হয়েছিল, এরকম একটা ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটলে সদ্য ক্ষমতাসীন হাসিনা সরকার তা সামলাতে পারবে না এবং সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বার্থন্বেষী চক্রের অনুগতদের হাতে ক্ষমতা চলে যাবে এবং তারপর বছর খানেকের মধ্যে নির্বাচনের নামে প্রহসনের মাধ্যমে আবার ক্ষমতাসীন হওয়া যাবে? যদি সত্যিই এরকম কোনো নির্বোধ প্রত্যাশা এই ঘটনার জন্ম দিয়ে থাকে তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ কিভাবে রচিত হচ্ছে তা ঈশ্বরই জানেন। কিন্তু যা ঘটে গেল তার ক্ষতি পূলণ হবার নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এই আকস্মিক রক্তাক্ত পর্বটি কিন্তু চিরকালের জন্য কলঙ্কিত হয়ে থাকলো!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



