পশ্চিমা সংস্কৃতি জগদ্দল পাথরে পরিণত হয়েছে: লো ক্লোজিও
ফরাসি সাহিত্যে একটি অনন্য স্থান অধিকার করে নিয়েছেন জ্যঁ মারি গুস্তাভ লো ক্লোজিও। ইংরেজি সাহিত্যের সমঝদার ফরাসি ও মরিশীয় বংশদ্ভূত এই লেখক ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন ফরাসি সংস্কৃতিকে। প্রথাবিরোধী এই লেখক অনুপ্রেরণা পেয়েছেন লুতারমন্ট ও জোলার পাশাপাশি স্টিভেনসন ও জয়েসের লেখা থেকেও। তাকে কোনো একটা ছকে ফেলতে গিয়ে সবসময় হিমশিম খান সমালোচকরা। প্রকৃতপক্ষে ১৯৬৩ প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস `ল্য প্রসেস-ভারবাল' (জিজ্ঞাসাবাদ) থেকেই বিষয়বস্তুর মতো তাঁর লেখার ধরনও উল্লেখযোগ্যভাবে পাল্টে গেছে। মাত্র ২৩ বছর বয়সে লেখা এই উপন্যাসের জন্য তিনি থিওফ্রাস্টে রেনাওডট পুরস্কার জিতেছিলেন।
উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছোটগল্প ও অনুবাদ মিলিয়ে এ পর্যন্ত তাঁর লেখা পুস্তকের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ। এসব লেখায় পরিবেশ নিয়ে তাঁর উৎকণ্ঠা, পশ্চিমা যুক্তিবাদী চিন্তার অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং ইন্দো-আমেরিকান সমাজের প্রতি তার মুগ্ধতার প্রতিফলন দেখা যায়। ইন্দো-আমেরিকান সমাজের সংস্কৃতি নিয়ে লেখা `লা ফাতে চাঁতি' নামের চমৎকার প্রবন্ধে (১৯৯৭ সালে প্রকাশিত) তিনি বলেন, এ সমাজের অভিজ্ঞতা আমার গোটা জীবনকে বদলে দিয়েছে। বিশ্ব ও শিল্প সম্পর্কে আমার ধারণা, অন্যের সঙ্গে নিজেকে মেলানোর উপায়, আমার চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, এমনকি স্বপ্ন দেখার ধরনও পাল্টে দিয়েছে। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ত্রৈমাসিক প্রকাশনা `লাবেল ফ্রান্স' সাময়িকীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এই অপ্রত্যাশিত অবস্থার মুখোমুখি হওয়ার গল্প বলেছেন, বলেছেন তার মৌরিতানীয় শেকড়ের গল্প। সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে তাঁর চিন্তভাবনা, উপন্যাস ও সাহিত্য নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনার বিভিন্ন দিকও উঠে এসেছে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন `লা ম্যাগাজিন লিটারেইরি'র পণ্ডিত ও প্রদায়ক তীর্থঙ্কর চন্দ। ২০০৭ সালে এ সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল। বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য এটি অনুবাদ করেছেন ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ।
প্রশ্ন: আপনার লেখার জন্য আপনাকে মরমি, দার্শনিকতাসম্পন্ন ও পরিবেশবাদী হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এসব ধরন দিয়ে কি আপনি আপনাকে চিনতে পারেন?
জবাব: আপনি নিজের জন্য যা করেন তা বলে বোঝানো কঠিন। আমি যদি আমার গ্রন্থগুলোর মূল্যায়ন করি তাহলে বলতে হয়, সেগুলো অনেকাংশেই আমার মতো। অন্যদিকে, এটি আমাকে এবং আমার বিশ্বাসকে যতটা প্রকাশ করে তার চেয়ে বেশি প্রকাশ করে আমার আদর্শকে। আমি যখন লিখি, তখন প্রাথমিকভাবে আমি প্রতিদিনের সঙ্গে, প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে আমার সম্পর্ককে অনুবাদ করার চেষ্টা করি। আমরা একটা সংকটময় যুগে বিশ্বাস করি, যে যুগে আদর্শ ও চিত্রকল্পের এক নৈরাজ্যের মধ্যে পড়ে আমরা নাজেহাল। আজকের দিনে সাহিত্যের ভূমিকা সম্ভবত এই নৈরাজ্যের প্রতিধ্বনি করা।
প্রশ্ন: সাহিত্য কি এই নৈরাজ্যকে প্রভাবিত করতে পারে, একে রূপান্তরিত করতে পারে?
জবাব: সার্ত্রের সময়ে যেমন বিশ্বাস করা হত, একটি উপন্যাস গোটা দুনিয়াকে পাল্টে দিতে পারে, আমাদের এটা বিশ্বাস করার মতো দুঃসাহস আর নেই। আজকের দিনে লেখকরা কেবল তাদের রাজনৈতিক নপুংসকতাকেই লিপিবদ্ধ করতে পারে। আপনি যখন সার্ত্রে, কামু, ডস প্যাসোস অথবা স্টেইনবেকের লেখা পড়বেন তখন দেখবেন মানুষের ভবিষ্যৎ ও লিখিত বিশ্বের ওপর এই লেখকদের ছিল অসীম আস্থা। আমার মনে পড়ে, আমার বয়স যখন আঠার তখন আমি `লা এক্সেপ্রেসে' লেখা সার্ত্রে, কামু, মরিয়াকের সম্পাদকীয় পড়তাম। সেগুলো ছিল দায়বদ্ধ রচনা, যা পথ দেখাত। আমাদের জীবনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে যেসব সমস্যা পত্রিকায় লেখা সম্পাদকীয় সেসব সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে, আজকের দিনে এটা কি কেউ বিশ্বাস করে? সমকালীন সাহিত্য হচ্ছে নৈরাশ্যের সাহিত্য।
প্রশ্ন: আপনাকে যদি ব্যতিক্রমী এক লেখক মনে করা হয়, তবে তা মনে করার কারণ সম্ভবত এই যে ফ্রান্সই কেবল আপনার অনুপ্রেরণার উৎস নয়। আপনার উপন্যাস বিশ্বায়িত কাল্পনিক দুনিয়ার অংশ। কিছুটা রযাঁবো ও সেগ্যালেনের লেখার মতো। ফরাসি এই দুই লেখককেও কোনো একটা শ্রেণিতে ফেলে বিবেচনা করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন সমালোচকরা।
জবাব: প্রথমেই আমি বলব যে কোনো একটা বিশেষ শ্রেণিভুক্ত না হওয়ার বিষয়টি আমাকে আদৌ হতাশ করে না। আমি মনে করি, কোনো বিশেষ শ্রেণিতে না পড়াটাই উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য। অন্যভাবে বললে, এটা একটা বহুস্তরিক সাতিহ্য শাখা, যেটা সঙ্কর প্রক্রিয়ার একটা অংশ, এটি অনেকগুলো ধারণা মিশিয়ে বানানো চোলাই যা, চূড়ান্ত অর্থে, আমাদের এই বহু মেরুভিত্তিক বিশ্বের প্রতিফলন। আপনার মতো আমিও মনে করি, ফরাসি সাহিত্যের এস্টাব্লিশমেন্টের (প্রতিষ্ঠান)_ যা আঠার শতকের লেখকগোষ্ঠী এনসাইকোপেডিস্টেসের তথাকথিক বিশ্বজনীন ধারণার উত্তরাধিকার বহন করছে_ বাইরে থেকে আসা কোনো ভাবাদর্শকে `বিদেশি' বলে কোণঠাসা করে ফেলার একটা দুঃখজনক প্রবৃত্তি সবসময়ই ছিল। র্যাঁবো ও সেগ্যালেন তাঁদের সময়ে এজন্য মূল্য দিয়েছেন। এমনকি আজকের দিনেও দক্ষিণের দেশগুলোর লেখকদের লেখা এখানে তখনই প্রকাশিত হয়, যখন তারা এই `বিদেশি' ক্যাটাগরিতে পড়তে রাজি হন। এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হিসেবে মৌরিতানীয় লেখক আনন্দ দেবীর কথা আমার মনে পড়ছে। প্রকাশনা সংস্থা গ্যালিমার্ডের পাঠকের প্যানেলে থাকার সময় আমি তাকে পুরস্কৃত করার ব্যাপারে জোরালো সমর্থন জানাই। এর জবাবে তারা আমাকে জানায়, তাঁর পাণ্ডুলিপিটি যথেষ্ট `বিদেশি' নয়।
প্রশ্ন: অন্য সংস্কৃতির প্রতি আপনার এত মুগ্ধতা কেন?
জবাব: পাশ্চাত্য সংস্কৃতি একটা জগদ্দল পাথরে পরিণত হয়েছে। এই সংস্কৃতি যদ্দূর সম্ভব জোর দিয়েছে নাগরিকতা ও প্রযুক্তির বিভিন্ন দিকের ওপর। এতে করে অনুভূতি প্রকাশের অন্যান্য মাধ্যমগুলো রুদ্ধ হয়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে ধর্মীয় ও অন্যান্য অনুভূতির কথা বলা যায়। যুক্তিবাদের নামে মানুষের অজানা অধ্যায়গুলোকে দুর্বোধ্য করে তোলা হয়েছে। এই চেতনাই আমাকে অন্যান্য সভ্যতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
প্রশ্ন: আপনার আগ্রহের অন্যান্য সংস্কৃতির মধ্যে মেক্সিকো একটা বিশেষ স্থান এবং ইন্দো-আমেরিকান সংস্কৃতি নির্বিশেষ স্থান দখল করে আছে। মেক্সিকোর সঙ্গে আপনার পরিচয়টা কীভাবে?
জবাব: সামরিক বাহিনীতে থাকার সময় আমাকে মেক্সিকোতে পাঠানো হয়েছিল। ওই সময় দুই বছর আমি সেখানে ছিলাম। দেশটি ঘুরে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। বিশেষ করে আমি পানামায় গিয়েছি। সেখানে আমি এমবেরা জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে গিয়েছি। ভারতীয় এই বুনো এলাকার লোকজনের সঙ্গে আমি চারটি বছর (১৯৭০ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত) কাটিয়েছি। এটা একটা গভীর সঞ্চরণশীল অভিজ্ঞতা, কারণ সেখানেই আমি জীবনের অন্য একটা পথ খুঁজে পাই। ইউরোপে থাকার সময় আমি যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলাম সেটা সেখানে কোনো কাজেই আসেনি। এমরেরারা নিসর্গের ঐকতানের মধ্যে বাস করে, নিজস্ব পরিবেশে নিজেদের মতো থাকে তারা। তাদের কোনো আইনি বা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের দরকার হয় না। আমি এই হতবিহ্বল করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি দেখলাম এবং আমার ফিরে আসার পর যখন আমি এই কমিউনিটির সামাজিক ঐক্য নিয়ে কথা বলতে চাইলাম তখন সমালোচকরা আমাকে অপরিপক্ক, সারল্যবাদী ও `মহান বন্য' পৌরাণিকতার মোহে মুগ্ধ বলে অভিযুক্ত করল, যদিও আমি যা বলতে চেয়েছিলাম এসব তার সবটুকু নয়। আমি যেসব লোকদের মাঝে বসবাস করেছি তাদের আমি কখনোই বন্য বলতে পারব না, আবার তাদের আমি মহানও বলতে পারব না। তারা অন্য মানদণ্ড ও অন্য মূল্যবোধের মধ্যে বাস করে।
প্রশ্ন: আপনার জীবনকে আপনি এরই মধ্যে ভাগ করে ফেলেছেন। একভাগে আছে মরিসাসের নিউ মেক্সিকোর আলবাকারেক; যেখান থেকে এসেছে আপনার পরিবার। অন্যভাগে আছে নাইস; যেখানে আপনি বেড়ে উঠেছেন এবং আপনার মা এখনও সেখানেই আছেন। আপনার মতোই আপনার কথাসাহিত্যের চরিত্ররাও বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে থাকে। যেমন, `কিউর ব্রুলে এট অটরেস রোমান্সেস' গ্রন্থের প্রথম অংশে এমন দুই নারীর কাহিনী বলা হয়েছে যারা শৈশবে ওই দেশে ছিলেন। এটি এক স্মৃতিভারাতুর শৈশব। তারা দুজনেই তাদের অতীতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। এই দুই বোনকে কি এক যাযাবর জীবনের শিকার বলা যাবে?
জবাব: একই সময়ে দুই সংস্কৃতি অধিকারী হওয়ার শিকার তারা। মেক্সিকান ও ইউরোপীয় সংস্কৃতির মতো ভিন্ন দুটি সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটানো শিশুদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। মেক্সিকোর সংস্কৃতি হচ্ছে প্রত্ক্ষ্য, রাস্তানির্ভর ও বহির্মুখী আর ইউরোপের সংস্কৃতি হচ্ছে গৃহনির্ভর, অন্তর্মুখী ও বিদ্যালয়ের রীতিনীতি নির্ভর। আমি সংস্কৃতির এই দ্বন্দ্বটাই তুলে ধরতে চেয়েছি।
প্রশ্ন: তাহলে গ্রন্থের নামে এই `রোমান্স' শব্দটা কেন?
জবাব: বিয়োগান্তক কিছু পরিস্থিতি বর্ণনার জন্য হালকা শ্লেষপূর্ণ এই শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে। এই বইয়ে রয়েছে সাতটি কালো ছোটগল্প। রোমান্টিক কথাসাহিত্যে সামাজিক সত্যকে ছাপিয়ে ওঠে মানবিক অনুভূতি। আমি মনে করি, কথাসাহিত্যেরও ভূমিকা হচ্ছে ব্যক্তিক আবেগ এবং সমাজ, বাস্তবতা ও বিশ্বের সম্পর্কের মধ্যে অবিরাম যেসব স্খলন-পতনের ঘটনা ঘটছে সেসবের ওপর আলোকপাত করা। এই বইয়ের সব গল্পই বাস্তব ঘটনার ভিত্তিতে লেখা, যে ঘটনাগুলোকে আমি সঙ্গতিপূর্ণ করে নিয়েছি। এগুলো সত্য গল্প। এ গল্পগুলোর মধ্যে `ভাবাবেগে'র উপাদান আছে, যেটা আপনি পত্রিকার `সংক্ষিপ্ত সংবাদ' এর মধ্যেও পাবেন।
প্রশ্ন: আপনার গ্রন্থগুলোতে দেখা যায়, আঙ্গিকের সীমারেখা মুছে গিয়েছে। সেগুলো প্রথাগত কথাসাহিত্যের আখ্যানধর্মিতা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। আপনি কী মনে করেন, উনিশ শতকের কাছ থেকে উত্তরাধীকার সূত্রে পাওয়া এই উপন্যাস নামের সাহিত্য-আঙ্গিকে এখনও তার বুর্জোয়া উৎসের ছাপ্পা এমনভাবে লাগানো আছে যে, প্রকৃতপক্ষে এটি উত্তরাধুনিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্বের জটিলতার প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না?
জবাব: উপন্যাস তো কার্যতই একটা বুর্জোয়া আঙ্গিক। গোটা উনিশ শতক জুড়ে বুর্জোয়া বিশ্বের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য চমৎকারভাবে রূপায়িত হয়েছে উপন্যাসে। এরপরই এসেছে চলচ্চিত্র। উপন্যাসের প্রধান প্রধান চরিত্রগুলোকে কেড়ে নিল চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্র দেখিয়ে দিল যে, বিশ্বকে উপস্থাপনের উপায় হিসেবে এটি আরো বেশি কার্যকর। তাই লেখকরাও উপন্যাসের আঙ্গিককে আদর্শ ও অনুভূতি প্রকাশের জায়গা হিসেবে আরও একটু সম্প্রসারিত করার সুযোগকে কাজে লাগাতে চাইলেন। এই আঙ্গিকটি যে কতটা নমনীয় ও পরবর্তনশীল কেবল তখনই তারা তা বুঝতে পারলেন এবং সহজেই এই আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে থাকলেন। তখন থেকেই প্রত্যেক প্রজন্ম উপন্যাসকে নতুনভাবে নির্মাণ করতে চেয়েছে, নতুন নতুন উপাদান যোগে এটিকে নতুনরূপে আবিষ্কার করছে। মরিশীয় ঔপন্যাসিক অভিমন্যু উন্নাথের কথা মনে পড়ছে। সম্প্রতি তাঁর উপন্যাস `লাল প্যাসিনা'র অনুবাদ প্রকাশের পর আমি তাঁকে জানতে পেরেছি। এই উপন্যাস আপনাকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইউজিন স্যু'র কথা মনে করিয়ে দেবে। উন্নাথ উপন্যাসের প্রচলিত আঙ্গিকই ব্যবহার করেছেন, তবে তাতে মহাকাব্যের বিভিন্ন উপাদান ও ভারতীয় কাব্যের গান ও ছন্দ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রচলিত আঙ্গিককে পরাহত করতে চেয়েছেন। এর ফলে `দ্য ওয়ান্ডারিং জিউ', `লেস মিস্টিরেস দে প্যারিস' ও `রামায়ণ' ফিরে দেখার সুযোগ হয়েছে।
প্রশ্ন: উপন্যাসে আপনি আত্মজীবনীও জুড়ে দিয়েছেন। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ও নিজের ইতিহাসের মহাফেজ হওয়ার কারণেই কী আপনি আপনার উপন্যাসে আত্মজৈবনিক অভিব্যক্তি যোগ করেছেন?
জবাব: আমার প্রিয় উপন্যাসিক স্টিভেনসন ও জয়েস। তাঁরা তাঁদের জীবনের প্রথম দিকের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। লেখার মাধ্যমে তাঁরা তাদের জীবনের অতীতকে আবার জাগিয়ে তুলে সেই জীবনের `কেন' এবং `কীভাবে'গুলোকে বুঝতে চেয়েছেন। জয়েসের `ইউলিসিস' পড়লে দেখবেন, জয়েস সমসাময়িক কালের সঙ্গে তাঁর কাহিনীকে সম্পৃক্ত করতে চাননি, বরং তাঁর ভেতরকার সবকিছু, যা কিছু তাঁকে জয়েস করে তুলেছে, তা তুলে ধরতে চেয়েছেন। রাস্তার সেই হালকা ধ্বনি, টুকরো টুকরো কথা, বিদ্যালয়ের শাস্তি_ এসব তাঁকে বড় হওয়ার পরও আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এসব কিছুকেই পুনর্জীবিত করেছেন তিনি। নাইপলও ফিরে গেছেন স্কুলজীবনের প্রথম দিনগুলোর কল্পনায়। সাহিত্য তখনই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যখন তা জীবনের প্রথম দিকের সংবেদশীলতা, প্রথম দিকের অভিজ্ঞতা, প্রথম দিকের ধারণা ও প্রথম দিকের হতাশাগুলো কব্জা করতে পারে।
প্রশ্ন: আপনার বই পড়ে মনে হয়, আপনার চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে আপনার গড়া চরিত্ররা একটা জন্মভূমির সন্ধান করছে। সেই জন্মভূমি প্রথাগত জন্মভূমি ও সংকীর্ণ জাতীয়তার ধারণার ঊর্ধ্বে। যে দেশ থেকে গিয়েছেন সালমান রুশদি সেই দেশের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টায় নুতন এক সম্পর্কের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি `কাল্পনিক জন্মভূমি'র কথা বলেন। আপনার কল্পনার জন্মভূমি কেমন?
জবাব: আমি নিজেকে নির্বাসিত মনে করি, কারণ আমার পরিবার পুরোপুরি মরিশীয়। মরিশীয় লোকসাহিত্য, খাদ্য, কিংবদন্তি ও সংস্কৃতি ছিল আমাদের কয়েক প্রজন্মের আহার্য্য। এটা অত্যন্ত মিশ্র একটা সংস্কৃতি। ভারত, আফ্রিকা ও ইউরোপের সংস্কৃতির মিশ্রণ। আমার জন্ম ফ্রান্সে এবং আমি বেড়ে উঠেছি এদেশের সংস্কৃতিতে। বেড়ে উঠার দিনগুলোতে আমি নিজেকে বলতাম, অন্য কোথাও আমার একটা জন্মভূমি আছে। একদিন আমি সেখানে যাব, সেটা কেমন ছিল তা আমি জানব। তাই ফ্রান্সে আমি সব সময়ই নিজেকে একজন `বহিরাগত' মনে করেছি। অন্যদিকে আমি আমার সত্যিকারের দেশের মতোই ফরাসি ভাষাকে ভালবাসি। কিন্তু ফ্রান্সকে একটা জাতি হিসেবে ভাবলে আমি আবার একাত্ম হতে পারি না।
প্রশ্ন: আপনার পূর্বপুরুষরা ফরাসি ছিলেন? আপনার কি তাই বিশ্বাস করেন?
জবাব: লো ক্লোজিওরা এসেছে ব্রিটানির মরবিহান থেকে। বিপ্লবের সময় আমার এক পূর্বপুরুষ ফ্রান্সে পালিয়ে আসেন। তার মাথায় লম্বা চুল ছিল। বিপ্লবী বাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁকে চুল কেটে ফেলতে বলা হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ভারতে যাওয়ার জন্য তিনি পুরো পরিবার নিয়ে `লো কুরিয়ের দেস ইন্ডেস' নামের একটি বড় নৌকায় চেপে বসেছিলেন। মরিশাসে এসে তিনি নৌকা থেকে নেমে পড়েন। তার স্ত্রী যে দ্বীপ থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন সেখানে তখনও তার পরিবারের সদস্যরা রয়ে গিয়েছিল। লো ক্লোজিও পরিবারের মৌরিতানীয় অংশ এই দুঃসাহসী ও বিদ্রোহী পূর্বপুরুষের বংশধর। বস্তুত তিনি আমার পরবর্তী উপন্যাসের নায়ক। তিনি কীভাবে মৌরিতানিয়ায় বসতি স্থাপন করলেন আমি এখন তা-ই লিখছি। কোনো একটা কিছু থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য বিশ্বের অন্য প্রান্তে পাড়ি জমানো এই লোকটার সঙ্গে আমি একাত্মতা বোধ করি। আমার মনে হয়, আমি তাকে বুঝতে পারি।
প্রশ্ন: বলা হয়ে থাকে যে আপনি সম্ভাব্য নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। একটু কল্পনা করা যাক: আগামীকালই আপনাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হল। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আপনি কী বলবেন?
জবাব: এটা খুবই হাইপোথিটিক্যাল একটা প্রশ্ন। নোবেল পুরস্কার নিতে গিয়ে কী বলতে হয় জানি না, তবে জনসমক্ষে কী বলব সেটা আমি জানি। আমি যুদ্ধের কথা বলব, যে যুদ্ধ শিশুদের হত্যা করছে। এটিই আমাদের যুগের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা। মানুষকে এ বিষয়টি মনে করিয়ে দেওয়া এবং বিষয়টিকে কেন্দ্রে নিয়ে আসার একটা উপায় হচ্ছে সাহিত্য। আফগানিস্তানের নারীরা স্বাধীনতা পাচ্ছে না_ এর নিন্দা জানাতে স¤প্রতি প্যারিসের নারীমূর্তিগুলোর মুখ ঢেকে দেওয়া হয়। এটা খুবই ভালো কাজ। ঠিক একইভাবে সব শিশুমূর্তির বুকে বিশাল লাল দাগ দিয়ে সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে প্রতি মুহূর্তে ফিলিস্তিন, দক্ষিণ আমেরিকা বা আফ্রিকার কোথাও-না-কোথাও একজন শিশু বুলেটবিদ্ধ হচ্ছে। লোকজন এ নিয়ে কখনোই কথা বলে না!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

