বাংলাদেশের মানুষের বামপন্থি মানসিকতা ও সংস্কৃতির কথাই এতদিন শুনেছি। বামপন্থার ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের মতে ইতিহাসের প্রাচীন সময় থেকে এখানে বামপন্থার ঐতিহ্য রয়েছে। তারা বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের সাহিত্য, মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগের সাহিত্য পর্যন্ত চষে বিস্তর বামপন্থি উপাদান আহরণ করে দেখিয়েছেন, বাঙালির বামপন্থি মানসিকতা ও সংস্কৃতি কত দীর্ঘ সময়ের। বাঙালির এই দীর্ঘ বামপন্থি মানসিকতা ও ঐতিহ্যের সন্ধান পেয়ে এতদিন পুলকিত বোধ করেছি। কিন্তু কয়েকদিন আগে আমার সেই হরিষে বিষাদ নেমে এসেছে। ঘটনাটি এই রকম:
আমার অফিসে নতুন একজন কাজে যোগ দিয়েছেন। নতুন সহকর্মী আমার ডান পাশে বসছিলেন। ডান পাশে কয়েক দিন বসার পর আমার বাম পাশে তাঁর জন্য একটি আসন নির্ধারণ করা হয়। বাম পাশের আসনে বসার পর তিনি আমাকে একদিন বলেন: কী, ব্যাপার ষড় দা, আমি যে কয়দিন আপনার ডানে বসেছি সে কয়দিন আমার প্রতি আপনার মনোযোগ ছিল। বাম পাশে চলে আসার পর তো আপনি আমার দিকে তাকানই না।
তাঁর এই কথা আমার মানতে হল। কথাটায় সত্য ছিল। আমিও উপলব্ধি করলাম, বাম দিকে আমার মনোযোগ কম থাকে। আমি বললাম, দেখেন ডান দিকে তাকাতে তাকাতে অভ্যাস হয়ে গেছে। সচরাচর আমি ডানেই বেশি তাকাই। আপনি বামে গিয়েছেন বলে নয়। আমার অভ্যাসের কারণেই বামে তাকানো হয় কম। যে কারণে আপনার দিকে চোখ কম যায়।
ব্যাপারটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে আরও কিছু ব্যাপার থাকায় তা শেষ হয়েও হল না। আমি আরও ভেবে দেখলাম। ডানে বেশি তাকানোর অভ্যাসের পেছনে আরও কিছু কারণ আছে। মুসলিম পরিবারে জন্ম হওয়ার কারণে ডান হাত, ডান পা, ডান কাঁধ ও ডান দিক আমার কাছে অগ্রাধিকার পেয়েছে সব সময়। বামকে সব সময়ই আমি নেতিবাচকভাবে দেখেছি। ছোটবেলা থেকেই আমাকে তা দেখানো ও শেখানো হয়েছে। ব্যাপারটা যে শুধু মুসলিম পরিবারে জন্ম হওয়ার কারণেই হয়েছে তা নয়। বাঙালি সংস্কৃতিতেও ডানের একটা বিশেষ গুরুত্ব আছে। দুইয়ে মিলেই আমার ডানের টান প্রবল হয়েছে।
ভাত খাওয়া থেকে শুরু করে সব ভালো কাজ আমি ডান হাতে করেছি। পাছা ধৌত করা থেকে শুরু সকল খারাপ কাজ আমি বাম হাতে করেছি। আমার ডান কাঁধে পুন্যের ফেরেস্তা বসে আছে। আমার বাম কাঁধে যে ফেরেস্তা আছে সে পাপ লিপিবদ্ধ করছে। কোনো দিকে যেতে চাইলে ডান পা আগে বাড়িয়েছি সব সময়। নামাজ পড়তে বসে আমি সবার আগে ডান দিকে সালাম দিয়েছি। মুরুব্বিদের সব সময়ই ডান পাশে স্থান দিয়েছি। স্ত্রীর পাশে রিকসায় বা অন্য কোনো খানে বসতে গিয়ে ডান পাশে বসেছি।
ডানপন্থি এই সংস্কৃতি আমার ভেতরে গভীর প্রভাব ফেলেছে। আমার মানসিকতা আমার অজান্তেই ডানপন্থি হয়েছে। আমি সব সময়ই কারণে-অকারণে ডান দিকে বেশি ঝুঁকে থেকেছি। আমার মতো অধিকাংশ বাঙালিরও একই অবস্থা কি না তা জানি না। এ ব্যাপারে তারা নিজেরাই ভালো বলতে পারবেন।
বামপন্থিরা রাজনীতিবিদরা কি বিষয়টাকে আমলে নেবেন কি না তা-ও জানি না। তবে আমার মনে বাংলার মাটিতে বামেরা অনেক ভালো ইতিহাস গড়লেও জনগণের ও নিজেদের ভেতরের ডানপন্থি সাংস্কৃতি পরিবর্তনে সফল হতে না পারার কারণেই রাজনীতিতে তারা নিজেদের স্থায়ী ও শক্তিশালী অবস্থান গড়তে পারেননি এবং রাষ্ট্ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেননি।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১২:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



