১৯৮৩ সনে বিশেষায়িত ব্যাংক হিসেবে চালু হওয়া গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনুসের কর্মকান্ড, অবদান নিয়ে দেশের বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্টরা স্পষ্টতঃ দুইভাগে বিভক্ত। গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনুসের পক্ষের লোকজন বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের অসংখ্য মানুষ দারিদ্র্যের শিকল থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছেন, স্বাবলম্বী হয়েছেন। অপরদিকে বিরোধীদের বক্তব্য হল- গ্রামীণ ব্যাংক নতুনরূপে সুদখোর মহাজন হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেউ স্বাবলম্বী হয় না বরং চিরস্থায়ী দাসে পরিণত হয়।
উভয় পক্ষের লোকজনই নানা তথ্য উপাত্ত হাজির করেন। কিন্তু দেখা যায়, দুই ধরণের বিশ্লেষণই আগে থেকে কোন না কোন পক্ষাবলম্বন করে উপস্থাপন করা হয় অর্থাৎ বায়াসড। ফলে আমরা সাধারণ নাগরিকরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগি আসলে আমাদের কোন পক্ষ অবলম্বন করা উচিত।
অনেকে ড. ইউনুসের পক্ষে একটা যুক্তি দেখান- উনি একজন নোবেল লরিয়েট। উনার কর্মকান্ড ইউরোপ, আমেরিকা তথা পুরো বিশ্ববাসী মূল্যায়ন করেছে। তাই উনি নোবেল পাওয়ার যোগ্য হয়েছেন। উনি পুরো বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। আমার ব্যক্তিগত মতামত হল, নোবেল পদক প্রাপ্তি কোন মানুষের কর্মকান্ড মূল্যায়নের জন্য যথার্থ নয়। কেননা, হেনরি কিসিঞ্জার, শিমন পেরেজ, বারাক ওবামাসহ অনেক বিতর্কিত ব্যক্তি নোবেল পদক পেয়েছেন।
আমার পছন্দের অনেক ব্যক্তি পত্রিকার পাতায়, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে এমনকি ব্লগে ড. ইউনুস ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করে মতামত দিচ্ছেন। অনেকে বলছেন, ড. ইউনুস দেশকে কি দিয়েছেন সেটা জাতি হিসেবে আমরা আজ বুঝতে পারছি না কিন্তু একদিন হয়ত বুঝব। কিন্তু ওনারা ঠিক কতটুকু গভীরে গিয়ে অর্থাৎ কতজন তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণকারী মানুষের সাথে খোলামেলা আলোচনা করে সিদ্ধান্তে এসেছেন নাকি স্রেফ ড. ইউনুস একজন সাদাসিধে ভালমানুষ ও নোবেল লরিয়েট- এই জন্য এসি রুমে বসে তাকে সমর্থন করছেন করছেন সেটা স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে দৈনিক প্রথম আলো সংশ্লিষ্টদের একচেটিয়া প্রোপাগান্ডায় অন্ধের মত বিশ্বাস করার কোন কারণ দেখি না।
একটা কথা ঠিক- আমাদের এই দেশে স্বয়ং ফেরেশতারও ভুল বের করার মানুষের অভাব নাই। কেউ যদি দেশটার জন্য নিজের কলিজাটা কেটে দেন- তারপরও অন্যেরা সমালোচনা করে বলবেন- মাথাটা দিলে ভাল হত। আবার মাথা দিলে বলবেন পুরো শরীরটাই কেন দিল না ইত্যাদি।
গত কয়েকদিনে পত্রিকার পাতায়, টিভির আলোচনায় শুনলাম- কেউ বলছেন গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার ৬০%, কেউ বলছেন ৩০%। আমার কথা হল- ৬০% বা ৩০% কেন হবে? কেন সেটা সর্বোচ্চ ১০% হবে না? নাকি সুদের হার ১০% হলে ঋণগ্রহীতা সহজেই শোধ করে দিতে পারবে- এজন্য সুদের হার উচ্চ রাখা হয়? একটা মানুষ যদি জীবনে একবার ঋণ নিয়ে অল্প কিছুদিনের মধ্যে স্বাবলম্বী হয়ে যায় তাহলে তাকে আরও বেশি লাভের আশা দেখিয়ে আরও বেশি ঋণ নিতে উৎসাহিত করার কোন দরকার আছে? আমি যতটুকু জানি, বেশিরভাগ ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এভাবে মানুষকে বেশি বেশি ঋণ নিতে প্রলুদ্ধ করে যাতে ঐ অঞ্চলে তারা প্রচুর কাজ করছে সেটা উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের দেখাতে পারে। সেই সাথে ঋণগ্রহীতা মানুষগুলো চিরদিন তাদের কেনা গোলাম হয়ে থাকে। আমার এক বিদেশী সহকর্মী বলতেন, একজন ডাক্তারের কাছে একজন রোগী একটা বিজনেস অর্থাৎ কাস্টমার ছাড়া আর কিছুই না। তেমনি ব্যাংকের কাছে একজন ঋণগ্রহীতা স্রেফ একজন কাস্টমার। যদি একটি অঞ্চলের মানুষ ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে দারিদ্র্যকে জয় করে ফেলে তাহলে ঐ এলাকা থেকে নিশ্চয়ই ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে আসতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠান কি সেই সৎসাহস রাখে?
আমার মনে হয়, এখন সময় এসেছে গ্রামীণ বাংক, ব্র্যাকসহ অন্যান্য ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকান্ড সম্পর্কে সার্বিক ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের। সরকার এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার জরিপ পরিচালনা করে দেখতে পারে গত ত্রিশ বছরে আমাদের পল্লী অঞ্চলে ক্ষুদ্রঋণের নামে যে কর্মকান্ড চালু আছে তা সত্যিকার অর্থে দেশের সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক জীবনে উল্লেখযোগ্য কোন অবদান রাখতে পেরেছে নাকি ক্ষুদ্রঋণের নামে নতুন মোড়কে একদল শিক্ষিত ও চতুর শ্রেণীর মানুষ দেশের নিরীহ, আপাত বোকা, সাধারণ দরিদ্র মানুষদের শোষণ করে যাচ্ছে।
আমরা সাধারণ নাগরিকরাও কিছু কাজ করতে পারি। আমরা যার যার এলাকায় যখন যাই, তখন সাধারণ মানুষদের সাথে কথা বলে জেনে নিতে পারি- এলাকায় কোন কোন এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তাদের কর্মপদ্ধতি কেমন, সুদের হার কেমন, কত জন মানুষ উপকৃত হয়েছেন, আবার ঋণ নিয়ে বিপদে আছেন কে এবং কেন ইত্যাদি। এতে করে পুরো দেশের মানুষের মূল্যায়ন আমাদের তথা দেশের সুবিধাভোগী শ্রেণীর বুঝতে সুবিধা হবে। আমরা তখন সেই দৃষ্টিকোণ থেকে জনমত সৃষ্টি করতে পারব।
শেষ আরেকটা কথা হল, শীর্ষ মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোনে গ্রামীণ ব্যাংক তথা গ্রামীণ টেলিকমের শেয়ার হল ৩৪%। এই কোম্পানীর লাভের অংশটুকু গ্রামীণ ব্যাংক কোন খাতে ব্যয় করে এবং সেটা কেন গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার কমাতে ব্যবহৃত হয় না সেই বিষয়গুলো পুরো দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
অনেকে অনেকরকম মন্তব্য করতে পারেন, কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস- কেউ ধোয়া তুলসিপাতা নয়।
[এই বিষয়ে যে কোন তথ্যপূর্ণ ও বিশ্লেষণমূলক লেখার লিংক দিলে উপকৃত হব।]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

