‘তারা শ্রমিক সরকার নির্বাচিত করেছে, দেশ এটা মেনে নেবে না।’ ১৯৪৫ সালে ব্রিটেনের নির্বাচনী ভুমিধসের পর এক অভিজাত এই উক্তিই করেছিলেন। ঘটনা যতটা জানা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, ইরানের রাজপথেও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। পাশ্চাত্যের রাজধানীগুলোও মরিয়া হয়ে ইরানি প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদের পিছু হটা দেখতে চাইছে।
এটা ঠিকই যে বিরোধী প্রার্থী মির হোসেইন মৌসাভির সমর্থন রাজধানীর ধনীবৃত্ত ছাপিয়ে গেছে। লেবার পার্টির নেতা ক্লিমেন্ট অ্যাটলির বিরুদ্ধে উইনস্টন চার্চিলের সমর্থনও ধনীদের ছাপিয়ে মধ্যবিত্তের মধ্যেও বিস্তৃত হয়েছিল। ইরানে এখন মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশ, ছাত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা মৌসাভির পেছনে জড়ো হয়েছে। তারা এখনো মনে করছে যে ভোট জালিয়াতি ছাড়া তাদের পরাজয় ঘটতে পারে না।
পশ্চিমা গণমাধ্যমও তাই আনন্দের সঙ্গে তেহরানের তরুণদের বিক্ষোভের দৃশ্য প্রচার করে চলেছে। তাদের চোখে আহমাদিনেজাদ নিতান্তই এক ইহুদিবিদ্বেষী মৌলবাদী। কিন্তু অন্য আহমাদিনেজাদ, যিনি তাঁর দেশের স্বাধীনতার রক্ষক, যিনি টেলিভিশনে অভিজাত মহলের দুর্নীতি ফাঁস করে দেন এবং যিনি দেশের তেলসম্পদ ব্যবহার করে সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিব মানুষের অবস্থার উন্নতির জন্য সচেষ্ট, পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইরানি প্রেসিডেন্টের এই ভাবমূর্তি কখনো দেখানো হয় না।
মৌসাভি যেখানে সংস্কার ও বেসরকারীকরণ, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও পাশ্চাত্যের সঙ্গে আরও ভালো সম্পর্কের পক্ষে; সেখানে আহমাদিনেজাদ অবসর ভাতা ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ান, গরিবদের দেন সহজ সুদের ঋণ। মৌসাভি ‘মুক্তবাজারি পুঁজিবাদের’ পক্ষে এবং আহমাদিনেজাদের গরিবমুখী সামাজিক সহযোগিতা কর্মসুচির বিপক্ষে। তাই বিস্নয়ের কিছু নেই যে শ্রমিক শ্রেণী, ধর্মমনা মানুষ এবং গ্রাম-মফস্বলের বেশির ভাগ গরিব মানুষের মধ্যে আহমাদিনেজাদের শক্ত জনপ্রিয় ভিত্তি থাকবে। ২০০৫ সালে প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার সময়কার জনপ্রিয়তা ধরে রাখাও কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয় তাঁর জন্য। এমনকি গত মাসে নিরপেক্ষ মার্কিন জরিপ সংস্থা টেরর ফ্রি টুমরো এবং সেন্টার ফর পাবলিক ওপিনিয়নের জরিপেও উঠে আসে যে আহমাদিনেজাদ ২ঃ১ ভোটে জয়ী হতে যাচ্ছেন। আর টাইমস পত্রিকাও ঘোষণা করে, আহমাদিনেজাদই জয়ী হবেন।
কিন্তু যেই তেহরানের রাস্তায় মৌসাভির সমর্থকেরা ‘সবুজ বিপ্লবের’ ডাক দিল, কারচুপির প্রমাণহীন অভিযোগ তুলল, অমনি আহমাদিনেজাদের সমর্থনের নজিরগুলো সবাই যেন ভুলে গেল। বিরোধীদের অভিযোগের প্রধান ভিত্তি হলো কিছু কিছু আঞ্চলিক ভোটের অবাক করা ফল এবং তড়িঘড়ি করে সরকারিভাবে ফল ঘোষণা। অথচ ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগেই মৌসাভি নিজেই তাঁর বিজয় ঘোষণা করেছিলেন। সরকারি ঘোষণা আসে এরই প্রতিক্রিয়ায়। ভালো করে খেয়াল করলেই বোঝা যায় যে ফলাফল তেমন অস্বাভাবিক নয়। যেমন−মৌসাভি প্রায় চার লাখ ভোটে তেহরানে জয়ী হয়েছেন। এবং এটাও বিশ্বাস করা কঠিন যে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে এক কোটি ১০ লাখ ভোটের ব্যবধান জালিয়াতির ফল।
ইরানের রাজপথে পশ্চিমা মদদপুষ্ট মৌসাভির সমর্থকদের বিক্ষোভ যতটা নন্দিত, একই সময়ে আহমাদিনেজাদের সমর্থনে লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ ততটাই আড়াল করে রাখা হয়। আইরিশ টাইমস পত্রিকার এক সাংবাদিক এটা খেয়াল করেন, ‘কোনো কোনো এলাকায় মানুষের মনোভাব উৎসবমুখর। লাখ লাখ মানুষ নতুন করে পুনর্নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের পক্ষে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে মিছিল করতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে।’ তেহরান এখন এক শহরের মধ্যেই দুটি শহরে পরিণত হয়েছে। গরিবপ্রধান দক্ষিণ তেহরানের বিজয়মুখরতা আর উত্তর তেহরানের অভিজাত অঞ্চলের বিক্ষোভ যেন দুই আলাদা শহরের চিত্র।
মৌসাভির সমর্থকদের একটি অভিযোগ হলো, আজেরি মৌসাভির নিজ এলাকা, সেখানে তিনি আহমাদিনেজাদের অর্ধেক ভোট পেতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, গ্র্যাজুয়েট ও শহরের বিত্তবানেরা মৌসাভির সমর্থক। যুক্তরাষ্ট্রের এনবিসি টেলিভিশনে তরুণ ইরানিদের দেখানো হয়েছে, যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে সংস্কারের দাবি তুলছে। কিন্তু বাস্তবে মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ ইরানি ইন্টারনেট ব্যবহার করে।
ইরানের সমাজের এই শ্রেণীবিভাজন পশ্চিমা গণমাধ্যমে উপেক্ষিত। মৌসাভির তথাকথিত সংস্কার আন্দোলনের সমর্থন কেবল সুবিধাভোগী শ্রেণীর মধ্যে। সমাজের নিচুতলায় এর সমর্থন কম। মৌসাভি গোষ্ঠী ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরেকটু নরম কন্ঠে কথা বলতে চায়। যদিও তারা ইরানের পারমাণবিক বোমা অর্জনের পক্ষে, কিন্তু তারা হামাস ও হিজবুল্লাহকে মদদ দিতে চায় না। অন্যদিকে আহমাদিনেজাদপন্থীরা বিশ্বাস করে, কেবল দৃঢ়তার মাধ্যমেই আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পাশ্চাত্যের স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব। মৌসাভি যতই সংস্কারের কথা বলুন না কেন, ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় তিনি গণহারে বিরোধীদের হত্যা করেন। তাদের বেশির ভাগই ছিল বামপন্থী কর্মী। ইরাক-ইরান যুদ্ধেও তাঁর ভুমিকা প্রবল ছিল। ওই যুদ্ধে প্রায় ১০ লাখ ইরানি পঙ্গু বা নিহত হয়। সেই আমলে তাঁকে ‘অতিরক্ষণশীল’ বলা হতো। এবারও তাঁর পেছনে রয়েছে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আকবর রাফসানজানি ও মোল্লাতন্ত্রের একটি অংশ। রাফসানজানি ইরানের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। আহমাদিনেজাদ যে দেশের ধন-সম্পত্তির পুনর্বণ্টন করতে চান, তা তারা মানতে নারাজ।
ইরান এখন ফিলিস্তিন থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইরাকে বুশ সরকারের বিপর্যয়কর ব্যর্থতা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিস্তৃতি এখনো শেষ হয়নি। গত সপ্তাহে, ইরানে নির্বাচন শেষ হওয়ার আগেই, ওবামা ঘোষণা করেন, ‘মানুষ এখন নতুন সম্ভাবনার দিকে ঝুঁকছে।’ সর্বাধিক ভোট পেয়েও লেবাননে হিজবুল্লাহ জোটের পরাজিত হওয়াকেই তিনি ইঙ্গিত করেন; যদিও এর সঙ্গে ওবামার বক্তৃতার থেকে বড় আকারে ভোট কেনা-বেচার সম্পর্কই বেশি। ইরানেও তার প্রভাব পড়তে পারে। সেখানেও গোপনে অস্িথতিশীলতা সৃষ্টির কর্মসুচির পেছনে লক্ষ-কোটি ডলার ব্যয় করা হচ্ছে।
এর মধ্যে ইরাক ও আফগানিস্তানে প্রতিরোধ যুদ্ধ ও সহিংসতা আবারও বাড়ছে। শহরগুলো থেকে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে আনা হচ্ছে। আফগানিস্তানে আরও ২১ হাজার সেনা পাঠিয়ে দখলদারি স্থায়ী করার ব্যবস্থা নিচ্ছেন ওবামা। ন্যাটো বাহিনীর ওপর আক্রমণও সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আফগান যুদ্ধ প্রতিবেশী পাকিস্তানে ছড়িয়ে গিয়ে ২০ লাখের মতো উদ্বাস্তু সৃষ্টি করেছে এবং দেশটির উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে মার্কিন ড্রোন হামলা বেসামরিক হত্যাযজ্ঞ ঘটাচ্ছে।
কেউ যদি ভেবে থাকেন যে পশ্চিমা দখলদারি অতীতে পরিণত হতে যাচ্ছে, তাহলে তিনি ভুল ভাবছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটসের উক্তি প্রতিধ্বনিত করে ব্রিটিশ সেনাপ্রধান জেনারেল ডান্নাত সম্প্রতি বলেছেন, ‘ইরাক ও আফগানিস্তান কোনো ভুলের পরিণাম নয়−তারা হলো ভবিষ্যতের দিকচিহ্ন।’
এ রকম অবস্থায় ভেতর থেকে ইরানকে নাড়িয়ে দিয়ে স্বাধীন আঞ্চলিক শক্তির অবস্থা থেকে তাকে নির্জীব করে ফেলা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিরাট এক উপহার। এতে বাগদাদ থেকে বৈরুত পর্যন্ত সমস্ত অবাধ্য শক্তিকে বশ করা সহজ হয়। ইরাক আগ্রাসনের পর সেখানে যুক্তরাষ্ট্র যে গ্যাঁড়াকলে পড়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার পথও তাহলে খুলে যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে, জর্জিয়া, থাইল্যান্ডের মতো করে আরেকটা রংদার বিপ্লব তেহরানে ঘটানো ততটা সহজ নয়
সিউমাস মিল্নে: ব্রিটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকার আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক।
সূত্রঃ প্রথম আলো

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

