somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমি, অশীতিপর একজন বৃদ্ধ এবং একটি স্বপ্ন

১৩ ই এপ্রিল, ২০১১ সকাল ৯:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক.

"”বাবা, তুমি কেমন আছ?"” অশীতিপর বৃদ্ধ লোকটি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। তার সারা শরীর ঘামে ভেজা। পাতলা মলিন পাঞ্জাবির বাইরে দিয়ে ভেতরের জীর্ণ শরীরটা দেখা যাচ্ছে। মাথার সাদা চুলগুলো রুক্ষ, এলোমেলো। মুখমণ্ডলে ক্লান্তির ছাপ। চোখ দু’টো কোটোরের ভেতরে ঢোকানো।

আমি চুপ করে রইলাম। বলার মতো কোন ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ তার মাঝে অস্থিরতার সঞ্চার হলো। ডান হাত দিয়ে আমার শরীরটা তিনি স্পর্শ করতে চাইলেন। কিন্তু তারপরই হাতটা সরিয়ে নিয়ে একটু ইতস্ত:ত করে বললেন, ”"আমি মন দিয়া চা বেচতাছি। তুমি আইবা কইছিলা, কবে আইবা?"”

আমি মাথা নিচু করে ফেললাম। অনুশোচনা গ্রাস করলো আমাকে।

ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ খুলে দেখি চোখের কোণটা ভেজা। বিছানা ছেড়ে উঠে এক গেলাস পানি খেলাম।

দুই.

সময়টা ২০০৩ সালের মাঝামাঝি। আমি তখন সবে গ্র্যাজুয়েশনের ফাইনাল ইয়ারে উঠেছি। হোস্টেলেই থাকতাম। পড়ালেখার পাশাপাশি দু’একটা টিউশনি করাতাম।

শুক্রবার ছিল সেদিন। দুপুরে খাবার পর বের হলাম তমাদের বাসার উদ্দেশ্যে। গন্তব্য, বকশি বাজার মোড় থেকে রাজারবাগ। তমা আমার ছাত্রী, ভিকারুন নিসায় ক্লাস টেনে পড়ে।

দুপুরের কাঠফাটা রোদে দরদর করে ঘামছি আমি। রাস্তায় কোন খালি রিক্সা নেই। দু’একটা যাও এলো, রাজারবাগের দিকে যাবেনা। মেজাজটাই খারাপ হলো। দেরী করে গেলে তমার মা কথা শুনিয়ে দিতে ছাড়বেন না। যেন মাসে দুইটা হাজার টাকা দিয়ে আমাকে কিনে নিয়েছেন। তারপরেও ছাড়িনা টিউশনিটা। মনকে শান্তনা দেই, মাঝে মাঝে একটু খারাপ কথা না হয় শুনলামই, তারপরেও তো মাসে হাজার দু’য়েক টাকা আসছে।

পাশের টং দোকান থেকে একটা বেনসন ধরিয়ে এদিক ওদিক তাকালাম। একটাও খালি রিক্সা নেই।

”"স্যার, কই যাইবেন?"” পিছন থেকে হঠাৎ ক্ষীণ একটা ডাক শুনে আমি চমকে উঠলাম। ঘুরে তাকিয়ে দেখি, অশীতিপর সাদা শশ্রুমণ্ডিত এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। পরনে তার ময়লা একটা পাঞ্জাবি আর ছেড়া লুঙ্গি। আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু বৃদ্ধ অনেকটা জোর করেই তার রিক্সায় আমাকে নিয়ে উঠালো। তারপর তার শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে প্যাডেল মেরে অনেক কষ্টে রিক্সাটাকে অল্প খানিকটা নিয়ে গেল। বেশি দূর টানতে পারলোনা। কিছুটা দূরে গিয়ে একটা সময় রিক্সাটা থেমে গেল।

আমি নামলাম রিক্সা থেকে। বৃদ্ধ লোকটিও নামলো। অপরাধীর মতো সে মাথা নিচু করে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। ভাল করে খেয়াল করে দেখলাম, তার ডান হাতের তর্জনী ময়লা একটা কাপড় দিয়ে পেঁচানো। কেটে গিয়েছে মনে হয়।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "”মুরুব্বি, আপনার শরীরের অবস্থাতো ভালোনা, আপনি রিক্সা চালাইতেছেন ক্যান?"” বৃদ্ধ লোকটি বিব্রত ভঙ্গিতে আরও জড়সড় হয়ে দাঁড়ালো, যেন এত কঠিন একটা প্রশ্নের সম্মুখীন সে জীবনেও হয়নি। তারপর একটা সময় বললো, "”বাবা, রিশকা না চালাইলে আমারে আর আমার বউরে খাওয়াইবো কেডা?”"

আমি জিজ্ঞেস করলাম, "”ক্যান, আপনার ছেলে মেয়ে নাই?”" বৃদ্ধ বললো, "”বাবা, আমার বয়স আশি পার হইছে। দুইটা বেটা আমার। বিয়া দিছি ওগোরে। হ্যার পর বউ নিয়া আলাদা থাকে। আমার আর আমার বউরে খাওন দেয় না হ্যারা, খোঁজ-খবরও লয়না। না খাইয়া মারা যাওনের থেইকা রিশকা চালাইয়া যদি কিছু টেকা পাই..."” এক নি:শ্বাসে কথাগুলো বলতে গিয়ে হাঁপিয়ে গেলেন বৃদ্ধ, গলা ধরে এলো তার। ”"সারাদিনে কত টাকা কামাইছেন আজকে?"” - জিজ্ঞেস করলাম তাকে। তিনি বললেন, ”"দুপুর বারোটা থেইকা আধা বেলার লাইগা রিশকাডা নিছি। মহাজনরে চল্লিশ টেকা দেওন লাগবো সন্ধ্যার সুম। কিন্তু কেউ আমার রিশকায় উঠেনা বাবা। চালাইবার পারিনাতো, তাই...। এই পর্যন্ত বিশ টেকা কামাইছি। রিশকার চাক্কা ফুটা হইছিল, সাত টেকা খরচা হইছে সারাইতে। পকেটে অহনে বাকী তের টেকা আছে।”"

রিক্সাটা সাইডে চাপিয়ে রাস্তার পাশের চায়ের দোকানটাতে তিনি বসলেন আমার সাথে। ড্রামের ভেতর থেকে গেলাসে করে পানি নিয়ে ঢক ঢক করে এক নি:শ্বাসে শেষ করলেন। আমি তাকিয়ে দেখলাম অবহেলিত অশীতিপর এক বৃদ্ধ মানুষের পানি খাওয়ার দৃশ্য। তারপর তিনি দোকানের পলিথিনে ঝুলতে থাকা সস্তা দামের বন রুটির দিকে তাকালেন। পরক্ষণে চোখ ফিরিয়ে নিতেই আমার সাথে চোখাচোখি হলো। আমি মাথা নেড়ে বললাম, ”"আপনি পেট ভরে খান, নিশ্চিন্ত মনে খান, কোন টাকা আপনাকে দিতে হবেনা।"”

তার খাওয়া শেষ হলো। কোমরে পেঁচানো ময়লা গামছাটা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললেন, "”চলেন, রওনা হই।"” আমি বললাম, "”না, একটু কাজ আছে আমার।”" তারপর তাকে ওখানে দাঁড় করিয়ে রেখে হোস্টেলে ফিরে এলাম। মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছিল, এই মানুষটিকে একলা ছেড়ে দেয়া যাবেনা। কোন ভাবেই না। কিছু একটা করতে হবে এর জন্যে। পকেটে ছিল চারশো টাকার কিছু বেশি। বন্ধু সুকান্তকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ওর থেকে ধার নিলাম পাঁচশো টাকা। এই নয়শো টাকা নিয়ে আবার এলাম সেই বৃদ্ধ রিকশাওয়ালার কাছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ”"মুরুব্বি, আপনেরে যদি আমি চা-এর ফ্লাস্ক কিনা দেই, আপনে ঘুইরা ঘুইরা চা-বিস্কুট বেচতে পারবেন?"” তিনি প্রথমে একটু ইতস্ত:ত বোধ করলেন। তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে জানালেন, পারবেন।

এরপর তার রিক্সাটা হোস্টেলের ভেতরে একটা নিরাপদ জায়গায় রেখে তাকে নিয়ে গেলাম নিউমার্কেটে। দু’জনে মিলে ঘুরে ঘুরে অনেক দেখে শুনে একটা চা বিক্রির ফ্লাস্ক কিনলাম। তারপর চায়ের পাতা আর কাপ, মোয়া, বিস্কুট। সঙ্গে বেনসন, গোল্ডলীফ আর ক্যাপস্টান সিগারেটের প্যাকেট। আমি খুব ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, বৃদ্ধ মানুষটি হঠাৎ করেই যেন আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছিলেন। উত্তেজনায় তার হাত এখন আগের থেকে অনেক বেশি কাঁপছে। চায়ের ফ্লাস্ক কেনার সময় আমি প্রথমে একটা পছন্দ করলাম। কিন্তু তিনি বললেন, "”তাড়াহুড়া কইরোনা বাবা, দাম দিয়া একটা জিনিস কিনুম, দেইখা শুইনা কিনি, কি কও?”"

কেনাকাটা শেষ করে আমরা আবার ফিরে এলাম হোস্টেলে, যেখানে তার রিক্সাটা রেখে গিয়েছিলাম। এরপর একটা রিক্সাসহ রিক্সাওয়ালা এবং আরেকজন শুধু রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া করলাম তাকে আর তার নিজের রিক্সাটিকে তার বাসা পর্যন্ত পৌছে দেবার জন্যে। বিদায় নেবার সময় তিনি বললেন, "”বাবা, তুমি আইজকা যে কাজটা করলা, আমি সারাজীবন মনে রাখুম। গেণ্ডারিয়া রেল ইশটিশনের পাশে বস্তিতে আমি থাকি। ওইহানে গেলেই আমারে পাইবা। আর অহনে তো আমি ইশটিশনেই চা বেচুম। কবে আইবা তুমি?”"

”"আসুম মুরুব্বি, একটু সময় পাইলেই চইলা আসুম”।" - আশ্বস্ত করলাম তাকে। ”"আইসা আপনেরে একটা দোকান কইরা দিমু”।" -কথাটা বললাম মন থেকেই।

এরপর অনেক দিন পার হয়ে গেলো। পড়ালেখার পাট চুকিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়লাম। চাকুরীতে ঢুকলাম। জীবন যুদ্ধে লড়াই করতে করতে ভুলেই গেলাম সেই অশীতিপর বৃদ্ধের কথা।

তিন.

২০১০ সাল। অফিসের কাজে গেণ্ডারিয়া যেতে হলো। রেল ষ্টেশনের কাছের বস্তিতে যখন গেলাম, হঠাৎ মনে পড়লো সাত বছর আগের সেই বৃদ্ধ লোকটির কথা। কৌতুহল বশত: খোঁজ নিলাম। প্রথমে কেউ কিছুই বলতে পারলোনা। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর জানতে পারলাম, বছর দু’য়েক আগে এক চা বিক্রেতা বৃদ্ধ লোক চা বিক্রি করতে গিয়ে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা গিয়েছেন।

খবরটা শুনে আমি কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে থাকলাম। ২০০৩ সালের সেই দিন আমি তার নাম জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলাম। তাই, ওই মানুষটাই যে এই মানুষ, এটা প্রমাণ করাটা কষ্টকর হলেও মনে মনে বললাম, তাকে আমার একটা দোকান করে দেবার কথা ছিল, সেটা করে দিতে পারলামনা। আমি দোষী। বিধাতা, ক্ষমা করো আমাকে।

এখন মাঝে মাঝেই ওই স্বপ্নটা দেখি। একজন অশীতিপর বৃদ্ধ লোক এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, "”বাবা, তুমি কেমন আছ?"” আমি চুপ করে থাকি। তিনি তার হাত দিয়ে আমাকে স্পর্শ করেন, তারপর ইতস্ত:ত করে বলেন, ”"আমি মন দিয়া চা বেচতাছি। তুমি আইবা কইছিলা, কবে আইবা?”"

গল্পটি কানাডার টরন্টো থেকে প্রকাশিত 'সাপ্তাহিক আজকাল' পত্রিকার ২০ জুন ২০১৪ সংখ্যায় প্রকাশিত
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই আগস্ট, ২০১৪ ভোর ৬:০৭
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×