নীল হাটছিলো।
নতুন কেনা জুতোটা পায়ে লাগছে। হাঁটার চেয়ে বাসে যাওয়া ভালো। ভাবা মাত্র পপলস ডরফা প্লাটস থেকে একটি বাসে চড়ে বসলো। বিকালে সাজুগুজো করে ছেলে মেয়েরা বসে আছে সিটে। কারও কারও চোখে মুখে অপেক্ষার ছায়া। প্রিয় কারও সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে এই চেহারাটা হয়। নীল সেটা জানে।
জার্মানির বন শহরে সবুজ খুব বেশী। কখন যে এখানে বৃষ্টি হয়, আর কখন যে রোদে ঝকঝক করবে এই গ্রীস্মে কেউ বলতে পারে না।
:প্লিজ
শব্দটা শোনার পর নিজেকে একটু কুঞ্চিত করে সাইড দিলো নীল। এই লোকটি এই মাত্র একটি বাস ষ্টান্ড থেকে উঠেছে। চেহারার দিকে তাকালো সে। লোকটি নিশ্চিত বাঙ্গালী বা ভারতীয়। একটু হেসে নীল অন্তত ৬০ বছর বযসী এই লোককে জিজ্ঞাস করলো তিনি কোথা থেকে এসেছেন। পরিস্কার ইংরেজীতে বললেন, বাংলাদেশ থেকে।
: আপনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। আমিও বাংলাদেশের। বাংলায় বললো নীল।
: তাই নাকি , এখানে কি পড়তে এসছো ?
: না চাকরি নিয়ে এসেছি। সাংবাদিকতা।
: খুব ভালো। বন শহরে আমি এক সময় বেশ কিছুদিন ছিলাম। তা তোমাকে যে তুমি করে বললাম ...
: না আপনি তা বলতেই পারেন। এখন কোথায় যাচ্ছেন?
: যাচ্ছি..... বাড গুডার্সবাগে। তুমি?
: কোন গন্তব্য নেই। আজ ছুটি তাই ঘুরছি। আপনি যে দিকটায় যাচ্ছেন, আমি হয়তো ওদিকটায়ই যাবো।
: বেশ ভালো হলো। অনেকদিন আগে সেখানে ছিলাম আমি। আজ জানি না কেমন হযে গেছে সব। তুমি আমার সঙ্গে থাকবে।
: আপনি চাইলে।
সে সময় আমি সবে সরকারী চাকুরিতে ঢুকেছি। সরকারী চাকুরি মানেই হলো প্রথম থেকে নানা প্রশিক্ষন। আমিও তখন এমন একটি ট্রেনিং এ এসেছিলাম এই বৃষ্টি ধোঁয়া শহরে এসেছিলাম। শহরের এক কোণে বাড গুডার্সবাগে থাকতাম। তখন এই এলাকাটি বেশ জম জমাট ছিল। এখানে থাকতো নানা শ্রেনীর সরকারী চাকুরেরা। আমার ডরমিটরিটা ছিল, একটা কোণে পাহাড়ের গা ঘেষে। প্রতিদিন এক ঘেঁয়ে জীবন। টেনিং এর কারণে আমাকে বেশ ব্যস্থ থাকতে হতো। আকাশ যখন সবে ফিকে রং ধরেছে, তখন ঘুম থেকে জেগে ফিটফাট হয়ে বাস ধরে চলে যেতাম ট্রেনিং সেন্টারে। নিজের রান্না নিজেকেই করতে হতো।
পানি খাবো না বিযার খাবো তা নিয়ে আমার তখন সে যে কি চিন্তা। কারণ দুটোই এক দাম...
যাক...
একটু দম নিয়ে লোকটি বললো... আমার নাম হাসনাত হাই।
তোমার?
: নীল।
কী অদ্ভুত সুন্দর নাম। শুনলেই ভালো লাগে। এরপর আমার যদি আবার জন্ম হয়, নাম হবে নীল। কথাটি বলেই সুন্দর একটি হাসি দিয়ে দূরে তাকালো হাসনাত সাহেব। নীল দেখছে....
: চলুন নামি। এসে গেছি।
এখানে নেমেই হাসনাত সাহেব খুব করে দম নিলেন। বললেন, অনেক বদলে গেছে!
: কি বদলে গেছে?
:জীবন........
নীলকে সাথে নিয়ে হাটতে লাগলেন। বললেন, পথগুলো তো আগের মতই আছে। তাহলে খুঁজে পাবো.......
: কী?
: একটি দোকান। ৩৪ বছর আগের দোকান।
: সেখানে কি কিনবেন, এখানেই হয়তো পাওয়া যাবে।
: না যা খুজছি, তা কেবল ঐ দোকানেই পাওয়া যাবে।
: চলুন.....
নানা পথ ঘুরতে ঘুরতে তারা একটি পথের মাথায় এসে পৌঁছলো। জায়গাটি একটু নির্জন...., পাথরের টুকরো বিছানো পথ। ইউরোপে অনেক পথই এমন। তাই এখানে কেউ গায় না পিচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি...... এখানে ভালোবাসার সময় কোথায়।
: একটু ডানে বায়ে দেখে চিলতে লম্বা একটি দোকানে ঢুকলেন তিনি। পিছনে নীল....
তিনি খুঁজছেন, কাউকে খুঁজছেন। সেই পুরোনো দোকানের কোন সদাইপাতি তিনি দেখছেন না। দেখছেন না চকলেট কিংবা বিয়ার.....
:কাউকে খুঁজছেন?
মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলেন তিনি। ক্যাশের সামনে গিয়ে পরিস্কার ইংরেজীতে বললেন
৩৪ বছর আগে আপনার এখানে আরেকজন বসতো। সেই তরুনি..... কোথায়
উত্তরে যা আসবার কথা তাই হলো। দোকানি জানেন না।
................
সারা দিন খেটে খুটে এসে মানে ক্লাশ সেরে এসে এই দোকানে আসতাম। প্রায় প্রতিদিন। কোন না কোন জিনিস নিতাম এখান থেকে। এখানে বসতো এক মেয়ে সেই সকালে আসতো। আর রাতে যেত। একা। আমি প্রায়ই আসতাম। এটা নিতাম, ওটা নিতাম। কিছু না নিলেও আসতাম। দোকানি মেয়েটি..... নীল চোখের মেয়েটি আমাকে দেখে হাসতো। এক চিলতে হাসি। ওটুকুই সব। কথা হতো শুধু দাম দেয়ার সময়। পয়সা কত হয়েছে আর কত ফেরত দিচ্ছে... এই দুটোই। একদিন দুই দিন এভাবে ৪ মাস এখানে এসেছি প্রায়ই। তখন বিযে থা করিনি। অদ্ভুত এক ভালো লাগা ছিল। আমি যখন দোকানে ঢুকতাম, মেয়েটি কেবল আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো। না, ষাট বছরের জীবনে এত মায়াবী চাহনি আমি দেখিনি। হয়তো আর দেখবোও না।
আমি বন এ এসছিলাম গ্রীস্মে। কী সুন্দর ছিল সেই সব দিন। মাঝে মাঝে আকাশ কালো করে মেঘ আসতো। আমার বৃষ্টি ভালো লাগে। শীত আসার আগেই আমার সময় ফুরিয়ে গেল।
সেদিনও বৃষ্টি ছিল। বন এ আমার শেষ দিন। আমাকে পরদিন ফ্লাইট ধরে বাংলাদেশে ফিরে যেতে হবে। চাকুরিতে যোগ দিতে হবে।
শেষ দিন বলে কিছু কেনাকাটা ছিল।
সেগুলো সেরে.. এখানে এলাম। দুই একটা জিনিস নিয়ে মেয়েটির কাছে গেলাম। বিল দেবো। প্রতিদিনের মত হাসি দিযে সে বললো যত হয়েছে। আমি মানিব্যাগ বের করে টাকা দিতে দিতে বললাম.....
: আজই তোমার দোকানে আমার শেষ দিন। আমি কাল বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছি। কথা গুলো বলতে আমার বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে। আমি এত কথা তার সাথে আগে বলিনি। পয়সা ফেরত দেয়ার আগেই আমি দেখলাম... নীল চোখের মেয়েটির দুই চোখে জল। মুক্তো দানার মত দুই চারটি খসে পড়ছে....... আমি হাত দিয়ে সেই মুক্তো ধরতে চাইলাম.... পারলাম না.....
আমি বের হয়ে গেলাম দোকান থেকে.... আমি পিছনে ফিরে তাকাইনি.... তাকানো যায় না.....।
আমার এ জীবনে জার্মানিতে অনেকবার আসা হয়েছে। কিন্তু বর এ আসা হযনি। আজ চাকরি শেষ করে, অবসরে এসে একা এলাম আবার বন -এ। তাকে খুঁজতে। জানি পাবো না। তবুও এসেছি।
আসলে আমি মেয়েটির নাম জানি না..........
সাগর সরওয়ার
বন, জার্মানি
১৭ জুলাই, ২০০৮।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

