রাতে অফিসে রিপোর্টটি জমা দিয়েই আর অপেক্ষা না করে বেরিয়ে যাবো। সরাসরি গাবতলি। সেখান থেকে একটা বাসে উঠে চলে যাবো আরিচা। সেখান থেকে একটি চরে গিয়ে উঠবো। চিফকে বলে এলাম কয়েকদিন ফিরবো না। আমার বিষয়গুলোই এমন। কেন জানি অফিসকে কিছু বললে তা মেনেই নেয়। ভালোবাসা কি একেই বলে!
আরিচার রাত। ঘন কালো নিকশ অন্ধকার নদীটাকে ঘিরে। আমি কোথায় যাবো। উদ্দেশ্য নেই। নেই বিধেয়। আমি গল্পের মাল-মসলা খুঁজছি। নদীটা নাচছে। শব্দ হচ্ছে। এই অন্ধকারের নদীর পাড়ে ঢিমে আলোকে লক্ষ্য করে হাটতে থাকলাম। টিমটিমে আলো জ্বলছে যে নৌকায়, আমার আপাতত ওটাই লক্ষ্য।
ছিপছিপে নৌকা। ছই এর নিচে শুয়ে থাকা মানুষটাকে ডাকলাম। সে উঠলো। কত আর বয়স হবে ২৪ কি ছাব্বিশ। ঘুম জড়ানো চোখ।
: তোমরা কোথায় যাবে?
: আমরা এখন যাবো না। দেরি হবে। অন্যরা মাছ বিক্রি করতে গেছে। আসলে নিশুথে ভোরে আমাদের যাওয়া।
: আমাকে সাথে নেবে? আমার আঁকুতি।
: অপেক্ষা করেন। ওরা আসলে বলতে পারবো।
আমি নৌকায় উঠে বসলাম। নৌকা দুলছে। পানির সঙ্গে নৌকার কথা ...ছলাৎ ছল.. ছলাৎ ছল....চিলতে বাতাস, বুক ভরে নিশ্বাস নেয়ার।
আমার চোখ জুড়িয়ে আসছে। আমি নৌকার পাটাতনে ঘুমিয়ে গেলাম। যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন চারিদিকে পাখির আওয়াজ। শহুরে সাংবাদিকের নাকে আলকাতরার গন্ধ আসছে। পাশে বসে থাকা মানুষদের কয়েক জোড়া উৎসুক চোখ আমাকে দেখছে। আমি উঠে বসলাম।
একটু বয়সি লোকটি, যার চোখে মুখে ক্লান্তির চিহ্ন, চোয়ালের হার উপরে উঠে গেছে, সেই লোকটি কারিকর বিড়ির অধের্কাংশে টান দিতে দিতে বললো
: আপনি নাকি আমাদের সঙ্গে যেতে চেয়েছেন?
: জ্বি , আমি আপনাদের সঙ্গে যেতে চাই।
: কিন্তু আপনাকে নিয়ে আমরা আবার কি না কি বিপদে পড়ি, খুন ...টুন..
আমি বুড়োর মুখের কথা টেনে নিয়ে বললাম...
: না, না ওমন কিছু নয়। আমি ঘুরতে বেরিয়েছি।
: তাইলে ফেরিতে বা লঞ্চে চড়ে যে কোন জায়গায় চলে যান। আমরা যাবো দূরের চরে..।
আমি ধু ধু আবছা আবছা দূরের চরটিকে দেখলাম। ওই চরে যেতে আমার ইচ্ছে করছে। কিন্তু লোকগুলোর একে অপরের দিকে তাকানো দেখে আমার সন্দেহ ওরা আমাকে নিতে চাইছে না। আমি যাবোই। শেষ উপায়টি আমার কাছে আছে। সেটাই বললাম, মানে নিজের পরিচয় দিলাম। ছোট্ট ব্যগ থেকে বের করলাম, ক্যামেরা এবং নোট প্যাড। ওদের মনে হয় বিশ্বাস হলো।
আমাদের নৌকা ভেসে চলছে। উপরে নীল আকাশ। নীচে ঘোলা জলের শব্দ। প্রথম আমার সঙ্গে যে ছেলেটির পরিচয় হয়েছিল ওর নাম হালিম। আমাকে হালিম দেখিয়ে দিচ্ছে যমুনার বুকের জেগে ওঠা চরগুলোর নাম। একটি চরের নাম ডাকাতের চর। শান্তু পুরোনে এক চর । যতদূর দেখতে পাচ্ছি ভাঙ্গা সব ঘর। রোদে বিছানো জেলেদের বড় জাল।
ঐ চরের মেয়ে নিলুফার। কত আর বয়স হবে.. আঠারো বা উনিশ। ওকেই ভালোবাসতো হালিম। কিন্তু ওর বাবা মা মেনে নিল না। মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে দিলো অন্যখানে। আমাকে ছোট্ট করে গল্পটি বললো সে।
আমি শুনছি। নতিবপুর চরের কোল ঘেষে যাচ্ছে আমাদের নৌকা। দুপুর হয় হয়। থামলো এক জায়গায়। নৌকার পাটাতনের নিচ থেকে বের হলো আস্ত এক রুই মাছ। নিচে নেমে কয়লা আর খর কুটোর আগুনো জ্বলে উঠলো দুটো চুলো, সদ্য বানানো। প্রথমটাতে লাল চালের ভাত। অন্যটাকে নদী থেকে নেয়া পানিতে আধভর্তি পাতিল। আমি চুলোর পাশে বসে বসে রান্না দেখছি। গরম পানির মধ্যে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে লবন, হলুদ, খোসাওয়ালা আলু, মরিচের গুড়ো, পেয়াজ। আমি অন্য রকম এক রান্না দেখছি। মাছটাকে পরিস্কার করে কয়েক টুকরো করে ছেড়ে দেয়া হলো ফুটন্ত নুন-মরিচের পানিতে। এরপর অপেক্ষা। হালিম রান্না করছে। এর নাকি রান্নার হাত ভালো।
মিনিট পনের বিশ পর রান্না শেষের ঘোষণা। নদীতে গোসল সেরে বসলাম। নৌকার পাটাতনে রোদ এসে পড়ছে। সেই তাতানো রোদে লাল চালের ভাতে ধোয়া উঠছে। সবার সামনে থালায় ভাত। এরপর এক হাতা করে রুই মাছের ঘন্ট। আমি মুখে দিলাম। এক দুই তিন... করে ভাত চালিয়ে দিচ্ছি মুখে। আর কেবল ভাবছি.... খাবার এতো স্বাদের হয়!
খাওয়া শেষে আবার যাত্রা শুরু। আমাদের নৌকা ভেসে চলছে। আমি একটি গল্পের কাহিনী খুঁজছি......
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মে, ২০১০ দুপুর ১:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


